বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৮
গল্প/কবিতা: ১২টি

অভিসার

প্রেম ফেব্রুয়ারী ২০১৭

পাহারা ও নিভে যাওয়া হারিকেন

কি যেন একটা জানুয়ারী ২০১৭

নিরুদ্দেশে বাটি চালান

কি যেন একটা জানুয়ারী ২০১৭

গল্প - প্রেম (ফেব্রুয়ারী ২০১৭)

আঁধারে আমাকে থাকতে দাও

কাজী জাহাঙ্গীর
comment ০  favorite ০  import_contacts ৫৭
বিদ্যুৎ নেই, ইচ্ছে করছে না মোমবাতি নিয়ে তাতে অগ্নিসংযোগ করি। অফিস থেকে ফেরার পর শুন্য ঘরটার শুন্য বিছানায় দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসে একটু বিশ্রাম নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমি নেই, শুন্যতার হাহাকারে মস্তিষ্কের ঘুনপোকাগুলো বারবার যেন আমার কানের কাছে মিছিলের মত শুধুই আমার একাকীত্বের মুহুর্ত্গুলোকে অসম্ভব রকমের শ্লোগানে শ্লোগানে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছিল ‘নেই-নেই’ বলে চারিদিক থেকে। বাইরে থেকে কড়া নাড়ার শব্দের মত খিল দেওয়া দরজার কপাটটা বাতাসের কাপুনিতে ক্ষণে ক্ষণে খট খট করে উঠছে। পর পর দু’বার কেউ এসেছে ভেবে দরজা খুলে বিমর্ষ হলাম বাতাসের কারসাজি বুঝে। সারাঘরটা আমার কাছে এখন গুহার মত মনে হচ্ছে। বিদ্যুৎ যাওয়ার পর মুঠোফোনের বাটন টিপে বড়জোড় দে’শলাইটা খুজে নেওয়া যায়, মোমদানিটা ঠিক জায়গায় আছে কিনা দেখা যায় বা ড্রয়ার খুলে চাবিটাকে খুজে নেওয়া যায় কিন্তু বিছানায় মাথার উল্টোদিকে যেখানে তোমার ছবিটা বড় করে দেওয়ালে টাঙানো আছে সেটি আর কিছুতেই দৃষ্টিগোচরে আসছেনা, নিস্তব্দ গুহার মাঝে ঘুটঘুটে অন্ধকার ছাড়া যেন আর কিছুই নেই। মনে হল নিস্প্রাণ দেহটা এলিয়ে দিয়ে মুঠোফোনটা বুকের উপর রেখে পড়েছিলাম অনেকক্ষণ ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত গুহাবাসীর মত।
কিন্তু আর যেন পারছিনা, ইতিমধ্যে দু’একটা মশক সঙ্গীত কানের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, হয়তোবা এভাবে পড়ে থাকলে প্রথমে গণসঙ্গীত পরে এক দঙ্গল মশকের খোরাক হতে হবে। তবুও মনটা কিছুতেই মস্তিষ্ককে নির্দেশ দিচ্ছে না দিয়াশলাইটা খুঁজে নিতে। সন্ধ্যারাতের লোডশেডিংটা রাতের যৌবনপ্রাপ্ত না হওয়ার আগেই যেন তাকে একরাশ আঁধার ঢেলে দিয়ে বাধ্যতামুলক প্রৌঢ়া রাতের অবয়ব দিয়ে দিয়েছে । গুহায় বসে বসে এলোমেলো ভাবনাগুলো যেন আমাকে আরো আঁধারের যাত্রী করতে চাইছে, মনে জেদ চেপেছে এতক্ষণ পরেও যখন বাল্বগুলো জ্বলে উঠছে না, তবে আমিও আর আলো জ্বালাবো না । দেখি কতক্ষণ আর আমার ঘরটা গুহায় পর্যবসিত থাকে । হঠাৎ বাইরের দিকটা কেমন যেন বেশি নিস্তব্দ মনে হওয়ায় দরজার কপাট খুলে দুয়ারে এসে দাঁড়ালাম । চারিদিকটা যেন ঘুটঘুটে অমানিশার চাদরে ঢাকা । বেডরুমটা দোতলায় হওয়ায় বেলকনিতে দাঁড়ালেই পাশপাশি তিন বাড়ি পর্যন্ত কারো ছাদের বাগান, পাশের বাড়ির সারি সারি নারিকেল গাছগুলো, আর এক বাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল কাঠবাদাম গাছটার সবুজ প্রলেপ মনটাকে চাঙ্গা করে তুলতো । কিন্তু সন্ধ্যা রাতেই প্রৌঢ়া হওয়া এই রাতে কোনো কিছুই আর স্পষ্ট করতে পারছি না । বুঝতে পারছি নারিকেলের পাতাগুলোও নিস্তব্দতার সাথে সই পেতে বাড়ির ছাদে বাঁশের ডগায় বাঁধা এন্টেনার মত ডালপালাবিহীন দণ্ডাকৃতির গাছটার মাথায় নিশ্চুপ হয়ে আছে ।
তারপরেও মনে হল একাকীত্ব ছেড়ে আমি গুহামুখের সবুজে বিচরণ শুরু করেছি । আমার ভিতরে সেঁটে থাকা ‘তুমি’ চিন্তার পেরেক মারা শেকলটা হঠাৎ করে প্রকৃতি ভাবনায় ছেদ পড়াল যেন । কেন জানি না গুহার আঁধারে ফেলে আসা তোমার দেয়াল ছবিটার মত তোমাকে ঘিরে থাকা ভাবনাগুলো ক্ষণিকের জন্য পেছনে ফেলে আমি দৃষ্টির পলকোদ্ধার করতে চাইছি অন্ধকার বেলকনিতে দাঁড়িয়ে । দোতলা ভবনের উপর আমার গুহামুখটার একটা বিশেষত্ব আছে । দুই ইউনিটের দালানটার দোতলায় আমার ইউনিটে যেতে নিচতলার সিঁড়ি বেঁয়ে উঠে বারান্দার মত বেলকনিটা ছাদের কার্নিশ থেকে হাত দু’হাত বাইরে পর্যন্ত বিস্তৃত এবং উন্মুক্ত । আর এই বারান্দার সাথেই সংযুক্ত আমার গুহামুখ । তাই ঐ যে বললাম সামনের তিন বাড়ির কথা , শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষায় ঘরের দাওয়ায় বসেই আমি পান করতে পারি প্রকৃতির সৌন্দর্য সুরা । দক্ষিনের বাম পাশের জানালাটা খুললেই যেন বসে পরি কুঁড়ি ফোঁটা গাছটার মগডালে । পেছনের ছোট বেলকনি যেখানে দু’জন পাশপাশি দাঁড়ানো যাবে মাত্র, তার কাছ ঘেঁষেই লক লক করে যেন উপরে উঠে গেছে খেজুর গাছটা । ঐ বেলকনিতে বসেই ভাবতে পারি আমি যেন খেজুর তলায় বসে আছি ।
কিন্তু আমার পাশেই একটা জায়গা আছে ‘খেজুরতলা’ নামে , তাই বন্ধুদের যখন বলি আমি খেজুর তলায় থাকি অনেকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসে “খেজুরতলার কোন দিকে আপনার বাড়ি?” পরেই খেজুর গাছের আসল ঘটনাটা বয়ান হলে ক্ষণিকের জন্য সকলে হেঁসে হেঁসে হৃদপিণ্ডটাকে একটু চাঙ্গা করে নিতে পারি, অথচ আমার চারপাশে এখন লোডশেডিং এর বদৌলতে এতই আঁধার যে, কোন কিছুরই অস্তিত্ব খুঁজে বের করতে পারছি না আমি । বারান্দায় দাঁড়িয়ে গুমোট আকাশের আবছা আলোয় কোনোরকমে বুঝতে পারছি ছাদের গ্রিল বেঁয়ে হাত পাতা করতলের মত কাঁকরোলের পাতাগুলো যেন একটু একটু নড়ছে, ঘি রঙা কাঁকরোল ফুল বা গায়ে কাঁটা ওঠা ঝুলে থাকা কাঁকরোলগুলোকে কিছুতেই দৃষ্টি গোচর করতে পারছি না । চিকন চিকন ডগাগুলোর নড়াচড়া অনুধাবন করা যাচ্ছে শুধু । এই যখন অবস্থা, দুই কদম এগিয়ে গিয়ে বারান্দার রেলিঙের কাছে যেতে অসম্ভব ধরনের একটা ভাললাগা পরশ আমার সারা গায়ে যেন হাত বুলালো বিদ্যুতের অভাবে ঘুরতে ভুলে যাওয়া ফ্যানের পাখাগুলোর মতো স্থির জায়গায় না থেকে গরমোত্তপ্ত গুহায় তখনই গায়ের শার্টটা খুলে ফেলেছিলাম, খালি গায়ে ছাঁদের কার্নিশ ছাড়িয়ে যাওয়া বারান্দাটার রেলিং ধরতে আসা মাত্র তাই আকাশ থেকে ছিটকে আসা জলবিন্দুগুলি সারা শরীরে যে পরশ বুলালো সেটা এক বাক্যে বলতে পারি অসাধারন লাগল ।
সত্যিই এতক্ষণ খেয়াল করার দৃষ্টি ছিল না, লক্ষ্য করলাম কার্নিশের বাইরে ঝুলন্ত অংশটা ভিজে আছে, ঠিক কার্নিশ সমান করে কে যেন স্কেল দিয়ে দাগ টেনে সোজা করে পানি ছিটিয়ে দিয়েছে । দাগের দু’পাশটা দু’রকম বাইরের দিকটা রেলিং পর্যন্ত ভেজা ভেজা আর দাগের ভিতর দিকটা এখনো শুকনো এতেই নিশ্চিত হলাম আকাশ থেকে জলের মত কিছু একটা পরছে । কিন্তু কিভাবে পরছে কেমন করে বলি?
টিপটিপ, ফোঁটাফোঁটা, গুড়িগুড়ি, কোনটার সাথেই মিলাতে পারছি না এটা কেমন ধরনের ক্ষরণ আকাশের। শ্রীনগর বা জম্মুর ভূস্বর্গে ছেড়া-পেঁজা তুলোর মতো বরফ কুচি উড়তে দেখেছি, তার সাথেও মিলছেনা। তবে ঠিক কেমন জানি নায়াগ্রার কথা মনে পড়ছে, প্রপাতের পানিগুলো এত উপর থেকে পড়তে পড়তে অনেকাংশই হাওয়ায় উড়ে যায়। আর আশে পাশে দর্শনার্থীর গায়ে সেই জলভেজা বাতাস বসিয়ে দেয় পানির হালকা আস্তরণ। হয়তো বা সেরকমই, আঁধারে দেখতে পাচ্ছি না তবে অনুভব করতে পারছি সেরকমই জলধারা উপর থেকে গড়িয়ে পড়ছে নীচে, অনেক উপর থেকে পড়তে পড়তে হাওয়া হয়ে যাওয়া জলকণারা। কিন্তু লাভটা কি হল, তোমার যে ভাবনাটা ভেবেছিলাম গুহার মধ্যে ফেলে এসেছি আবার যে সেই ভাবনাগুলোই আমার স্নায়ু বেয়ে মস্তিষ্কের দিকে অগ্রসর হতে লাগল। নায়াগ্রা জলপ্রপাতের কথা মনে হতেই তোমার চেহারাটা আবার এমন করে মনে হতে লাগল যেন তোমাকেই ছেড়েই আমি একাকী দাড়িয়ে আছি নায়াগ্রার কানাডা অথবা আমেরিকা অংশের কোন একা জায়গায় যেখানে এই হাওয়ায় ভাসা জলকণা ফোটা ফোটা জমতে শুরু করেছে আমার উদোম গায়ে।
এই যে সুন্দর একটা মুহুর্ত, তুমি কি আর সময় পেলেনা আমাকে ছেড়ে যেতে ? আচ্ছা তুমি কেমন বলতো , তোমাকে চট্টগ্রাম রেখে ঢাকার চাকুরীটা একবছরও করতে পারলাম না, প্রতিরাতে একটা নির্দিষ্ট সময়ে কথা বলার জন্য দোকানির সাথে চুক্তি করা এনালগ টেলিফোনের রিসিভারটা কানের কাছে চেপে রেখে কত উৎকন্ঠাই না ঝাড়তাম দুজনে, তারপরও মাত্র ৩৬৫টা দিনও পেরুতে পারলাম না। আমার ভালবাসার জলধারা আবার তোমার সাগরবেলায় আছড়ে পড়ল। বিলীন হলো সব উৎকন্ঠার লোমশ বেদনাগুলো। অথচ আজ গুহার মত এই বিদ্যুৎশুন্য ঘরটায় আমাকে একা রাত্রিযাপন করতে হবে ভাবতেই আমার গা শিউরে উঠছে। গ্রীষ্মের ছুটি হয়েছে তাতে কি, সেজন্যে পুরো ছুটিটাই কি বাপের বাড়ী গিয়ে কাটাবে ?
অন্ধকারে একাকী দাড়িয়ে আসলে আমি যতই উতলা হই, এখানেত কোন দখিনা নেই আমার বার্তা তোমাকে পৌছাবে। আকাশের মেঘগুলো তেমন জমকালোনা মাঝে মাঝে সাদা মেঘের ফাঁক দিয়ে ধবধবে সাদা নিশীপ্রদীপ চাঁদটার হালকা আলোকচ্ছটাও ধরা পড়ছে চোখে। মনে হচ্ছে মেঘেদের খাঁচা ভেঙে কিছুতেই বেরিয়ে আসতে পারছেনা সে। যার কারনে অমানিশার মতো কুচকুচে বর্ণ ধারন করেছে, তার সাথে পাঁচ ফোড়নের মত যুক্ত হয়ে এই বিদ্যুৎহীন মুহুর্তগুলোর গরাদের সাথে যেন একাকীত্বের শেকলে বাধা পড়ে আছি তুমিহীন আমি। আমার পায়ের কাছে টবে ডায়ন্থাস’র পাতায় চোখ পড়তেই ফলাকাকারের পাতাগুলোর খাঁজের সফেদ দাগগুলো স্পষ্ট হওয়ায় বুঝতে পারলাম এ অন্ধকারে ওরাও আমার একাকীত্বের সাথী হয়েছে।
আমার অন্তরের খাঁজগুলোতে প্রেয়সীর জন্য ভালবাসার ক্ষরণ যেন নির্বাক করে দিয়েছে ওদেরও। অসময়ে কোন দিক থেকে যেন কাকের কা কা স্বরে কান্নার সুর শুনতে পেলাম। গুহাটায় বারবার চোখ ঘুরিয়ে দেখছি কোন আলোর ঝলকানিতে বাল্বের টাংস্টেন তারটা ঝলসে উঠে কিনা সে আশায়। কিন্তু বিধি বাম, বিদ্যুত গেছে দুর পরবাসে। এবার জলকণা গুলোও গুড়িগুড়ি হয়ে এসেছে, গা’টা ছোপ ছোপ জলে ভিজে উঠেছে। মাথার কালো পশমগুলো বেয়ে জলকণাগুলো পিঠে গড়িয়ে পড়ছে । অগত্যা আবার গুহায় প্রর্তাবর্তন হলো আমার। ক্ষতি নেই আঁধার পৃথিবী আমার প্রেয়সীকে জানিয়ে দাও, এধরনের বিদ্যুতহীন ঘুটঘুটে আঁধারের মুহুর্তগুলোতে এখন আমাকে একাকীত্ব গ্রাস করলেও আমার অন্তরের গহীনে প্রোথিত তার মুখ। আর সেই মায়াবী মুখের আলোয় আমি ফিরে যাই তার সঙ্গ ভরা সজীব স্মৃতির মোহনায়। তাই এখন আমি সুবীর নন্দীর সুরে সুর তুলতে পারি ‘আঁধার আমার ভয় করে না, চোখ থেকে সব আলোর সূর্য্য মুছে দাও, দা..ও আধাঁরে আমাকে থাকতে দা্ও’...।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন