বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ জানুয়ারী ১৯৭৫
গল্প/কবিতা: ৩৯টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৯

বিচারক স্কোরঃ ২.৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.১ / ৩.০

ঋতুবিহারী

কি যেন একটা জানুয়ারী ২০১৭

ত্রিভুজ সংসার

আমার আমি অক্টোবর ২০১৬

মধু বাউল

ঘৃণা সেপ্টেম্বর ২০১৬

ভালোবাসা / ফাল্গুন (ফেব্রুয়ারী ২০১৫)

মোট ভোট ১৪ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৯ শিমুল ফুলের রঙ

মোজাম্মেল কবির
comment ২০  favorite ১  import_contacts ১,২৯৮

আমি শুধু অদূরে দাড়িয়ে তাকিয়ে থাকি তার চলে যাওয়া পথের দিকে। ভালবাসতে নাকি দুজনের পাগলামী লাগে। আমার ক্ষেত্রে গালামীটা ছিল শুধুই আমার একার। বুড়ো শিমুল গাছে তখনো অনেক ফুল ফোটে। শিমুলের ডালে বসে পাখি ঠোকর দিয়ে তার পায়ের কাছে ফেলে দেয় একটি শিমুল ফুল। পথে পরে থাকে ফুলটি। সেদিকে খেয়াল নেই তার। অন্য কিছু ভাবতে ভাবতে ডানে বায়ে না তাকিয়ে চলে যায় সে। সবুজ চিরে সাদা একটি রেখা। সবুজ ঘাসের মাঝখানে পায়ে হাটা পথ। এই পথে প্রতিদিন হেটে যায়।
তখন চিঠির যুগ। ভালবাসি মুখে বলা এতটা সহজ ছিলোনা। বুকে একটুখানি সাহস থাকলে চিঠিতে ভালবাসার বার্তা পাঠাতো কেউ কেউ। সিনেমা নাটকে ভালবাসি বলতে শোনা যেতো। আমি দাড়িয়ে থাকতাম শুধু শিমুল তলায়। সেদিনও দাড়িয়ে ছিলাম। এখনি আসবে সে। বুকে ভয়। মা বুঝি কান ধরে বাড়ি নিয়ে যাবে। পিছন থেকে মায়ের কন্ঠ শুনে বুক পানিশূন্য হয়ে গেলো -কি করছ এই খানে? মায়ের কঠিন প্রশ্ন।
-কিচ্ছু না মা, এমনেই খারইয়া আছি।
-আমি কিছুই বুঝিনা মনে করছস! আবার ধমক দিয়ে মা বললো।
-মা তুমি বেশী বুঝ।
-আমি বেশী বুঝি? যা ইচ্ছা তাই কর... বাড়িতে আয় আইজকা। যা কথা তর বাপের সামনেই হইবো।


মা বাবার ধারণা আমি নষ্ট হয়ে গেছি। বিশ্বাস করুন আমার মনের মধ্যে কোন পাপ ছিলো না। ভালবাসার সাথে নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্পর্ক কি তা আমি জানিনা। হিসাব মিলাতে পারিনা ভালবাসলে মানুষ কি ভাবে নষ্ট হয়ে যায়, অন্তত আমার বেলায় না। এতে আমার ইচ্ছে অনিচ্ছের কোন হাত ছিল না। একটা মায়া ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে আমার বুকের মধ্যে ঢক ঢক... ঢক ঢক... শব্দ বেজে উঠতো। চোখে অন্ধকার দেখতাম। শরিরের সব শক্তি মুহূর্তেই ফুরিয়ে যেতো। আমি বুঝি অবশ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পরবো। দুরন্ত বাঁচাল আমি তার সামনে দাড়িয়ে নির্বোধ হাবাগোবা নির্বাক হয়ে যেতাম। তার নাম মুখে নিতে ভয়, তার নাম কানে শুনতে ভয়... এই আমার নষ্ট হয়ে যাওয়ার সারকথা।

শুরুটাই ছিলো আসলে ভয় দিয়ে। ছোটকালে মাটির ব্যাংকে পয়সা জমিয়ে চারশ টাকায় একটা পুরনো গিটার কিনেছিলাম। মনে ভয় নিয়ে গিটার হাতে বাসায় যাই। বাবা গিটার হাতে বাসায় ঢুকতে দেয়নি। একটু বড় হয়ে এক উস্তাদের কাছে বেহালা শিখতে গিয়েছিলাম। উস্তাদ বললেন -যারা ভালো বাঁশী বাজাতে পারে তাদের জন্য বেহালা সহজ হয়। বাঁশী হাতে কয়েক বছর ব্যর্থ চেষ্টা চলে। বাঁশীতে ঠোট ছুঁইয়ে মনে আশংকা নিয়ে ফু দেই... ভিতর থেকে শক্তি পাই না। মনে ভয় -পাড়া পড়শি বিরক্ত হয়ে ধমকায় কি না... মনে আশংকা নিয়ে যেমন সাধনা হয় না তেমনি ভালবাসা হয় না।
বুক ভরা সাহস নিয়ে যুদ্ধে সৈনিকের মৃত্যু যেমন জয়, ভয়ে ভয়ে জয়ী হলেও ভিতরে পরাজয় লুকিয়ে থাকে। বার বার আমার ভয় জয়ী হয় পরাজিত হই আমি। আমার কাছে ভালবাসার ভিন্ন নাম ভয়।
আমার নষ্ট হয়ে যাওয়ার অপরাধে বাবা মা আমাকে শাস্তি স্বরূপ নির্বাসনে পাঠালেন। আপাতত তিন বছরের সাঁজা। অন্তত তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরে আসা যাবে না।


চিঠির যুগ শেষ হয়ে তখন মানুষের হাতে হাতে মোবাইল ফোন উঠতে শুরু করেছে। জাকিরের হাতেও ফোন। আমার ভায়ের ধারণা আমি প্রবাসে থেকে বাচাল হয়ে গেছি। মোবাইল ফোনে মানুষ এতো কথা বলে! ফালতু কথা! কামরাঙ্গা গাছে টিয়া পাখি বসে কি না, কৃষ্ণচুড়া গাছে কেমন ফুল ধরেছে? আর সেই বুড়ো শিমুল গাছটা... বাঁশবনে বকের বাসাটা কি এখনো আছে? ঘুরে ফিরে বাঁশ বন শিমুল গাছ কামরাঙ্গা গাছ তলায় কেন আমি ফিরে যাই তা জাকির ভালো জানে। ঘুরে ফিরে ঝুমুরের বাড়ির চার পাশ।
জাকির। আমার ভাই বললে ভুল হবে। যদিও চাচাতো ভাই কিন্তু এর সাথে শৈশবের বন্ধু যোগ করলে যে সম্পর্কটা হয় তাই। শৈশবে এক সাথে স্কুলে আসা যাওয়া। কৈশোরে স্কুল পালিয়ে সিনেমা হলে মর্নিং-শো দেখা। সব কিছুর স্বাক্ষী সে। তার সাথে আরেকটা বিষয় না বললেই না -ঝুমুরের প্রতি আমার মনের দুর্বলতার খবরটি সেই প্রথম জানে। তাই হয়তো দিনে দুই চারবার প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ফোন কল চলে যায় ওর নাম্বারে। মাঝে মাঝে বিরক্ত হয় আমি বুঝি।
আরে তুই কি বুঝবি প্রবাস জীবনের যন্ত্রণা!বসন্তে তোর ঘরের পাশে কদম গাছে কোকিলের কুহু কুহু ডাক তোর কানে বাজেনা, ভালো লাগেনা। কিন্তু কয়েক হাজার মাইল দূর থেকে আমি শুনতে পাই। বর্ষা এলে ব্যাঙের ডাক শুনতে পাই। চোখ ভিজে যায় জলে। এই কষ্ট বুঝবিনারে ভাই!
দেশের মাটি আলো বাতাশ রোদ্র ছায়া বৃষ্টির জল কি জিনিস তা কি করে বুঝবি তুই। যখন দেশে ছিলাম তিন বেলা মায়ের হাতের রান্না খেয়ে সকাল বিকাল কথায় কথায় তর্ক করেছি। বিদেশের মাটিতে বসে মায়ের মুখটা মনে হলেই চোখ জলে ভিজে যায়।

পড়ালেখা প্রায় শেষ। ঝুমুরের হাতে আমার লেখা প্রথম প্রেমপাত্রটি পাঠাই জাকিরের হাতে। ভয়ে ভয়ে দিন কাটে সম্মতি কি অসম্মতি কিছু একটার অপেক্ষায়। দিন সাতেক পর জাকির পৌছে দেয় প্রত্যাখ্যান বার্তাটি। তার পর আর অপেক্ষায় থাকার প্রয়োজন হয়নি। জাকির অনেক বার বুঝিয়েছে আমাকে -ভাই, ভুলে যা। তোর সাথে ওর হবে না... ।
আমার সাথে হয় নি। তার পরেও মন ফিরে যেতে যেতে বার বার পিছু ফিরে তাকায়। হবেনা বললেই সব শেষ হয়ে যায়? তার পর আর কোন কথা থাকে না? মন বার বার বলেছে কি যেন কিছু একটা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। কিছু একটা কথা বাকী রয়ে গেছে। যা এখনো আমার শোনা হয়নি, ঝুমুরের শেষ কথাটা বলা হয়নি। হতে পারে আমার আশংকা আর মনের ভয় বুঝতে পেরে সে বিশ্বাস রাখতে পারেনি। হতে পারে আরও অনেক কিছু। যা এখন আর হিসাব করে লাভ নেই। কারণ তিন বছর পর আমার আর দেশে আসার প্রয়োজন হয়নি।

প্রথম তিনটি বছর ক্যালেন্ডারের পাতায় দিন গুনেছি। এই তো আর মাত্র চার পাঁচ মাস বাকী। এতো দিনে আমার মা বাবার বিশ্বাস হয়েছে যে আমি নষ্টের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছি। ভালো রোজগার করছি। প্রতি মাসে বেশ ভালো অংকের টাকা পাঠাচ্ছি পরিবারের কাছে। ছোট বোনটার ভালো বিয়ে হয়েছে। ঘটনাটা ঘটে গেছে আমি দেশে আসার আগেই। তার পর আর ফিরে আসার ইচ্ছে হয় নি।


সেই শৈশবের ভয় আজো আমার পিছু ছাড়ে নি। ছোট কালে গিটার হাতে বাবার সামনে সাহস করে যদি বলে ফেলতাম, অথবা বায়না ধরে -বাবা আমার গিটার বাঁজাতে খুব ইচ্ছে। প্রতিবেশীর ভয় তুচ্ছ করে বাঁশীতে যদি বুকের সব শক্তি দিয়ে সুর তুলতাম। তবেই হয়তো ভয়কে সহজেই জয় করতে পারতাম। কিন্তু শেষ জয়টা আমার জন্য খুব জরুরী। এইবার শুধু আমার জন্য না আমার মায়ের জন্যও। এতো দিনে আমার মায়ের কাছেও যে শিমুল তলার সেই পায়ে হাটা পথটা ভালো লাগতে শুরু করেছে।


অনেক অত্যাচার নির্যাতন মেনে নিয়ে ঝুমুর দুই বছর জাকিরের সংসারে টিকে থাকার চেষ্টা করেছে। পারেনি। জাকিরের মনে অযথাই সন্ধেহ ঝুমুর ঘরে একা বসে বসে শুধু আমার কথাই ভাবে । পর পুরুষের কথা মনে আনা পাপ এই পাপের সাঁজা পেতে হবে। অন্যায় সাঁজা মেনে নিয়ে পরিত্যক্তা ঝুমুর বাবার বাড়ি ফিরে যায়। কলেজে ভর্তি হয় পড়াশোনা শেষ করতে। এখনো সে সেই পুরনো পথেই হেটে যায়। আগের মতোই বিষণ্ণ চোখ এড়িয়ে যায় পথে পরে থাকা শিমুল ফুল।

আমাকে এক সময় সেই পুরনো পথের টানে ফিরে আসতেই হলো। সাত বছর পর। এখনো ঝুমুর আমাকে একটা জড় পদার্থের মতোই পাশ কেটে চলে যায়। আজও যেমন চলে গেছে। তবে আজ আমাকে দেখে ঝুমুরের মুখ ভয়ে আর লজ্জায় রাঙা হয়ে যেতে দেখলাম। দুই গালে যেন শিমুল ফুলের রঙ ধরেছে। এখন আমার মনে উচ্ছল গিটারের টুং টাং শব্দ, সাহসী বাঁশীর সুর । আমার মায়ের চোখের দুই ফোটা আনন্দের জলে ভেসে গেছে আমার ভয়।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন