বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ জানুয়ারী ১৯৭৫
গল্প/কবিতা: ৩৯টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৭৮

বিচারক স্কোরঃ ৩.১৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৬৩ / ৩.০

ঋতুবিহারী

কি যেন একটা জানুয়ারী ২০১৭

ত্রিভুজ সংসার

আমার আমি অক্টোবর ২০১৬

মধু বাউল

ঘৃণা সেপ্টেম্বর ২০১৬

দুঃখ (অক্টোবর ২০১৫)

মোট ভোট ১৯ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৭৮ তিষ্ঠ ক্ষণকাল

মোজাম্মেল কবির
comment ১০  favorite ০  import_contacts ৫৮৫
ভবিষ্যত বর্তমান হয় বর্তমান অতীত হয়। মানুষকে পিছনে ফেলে ছুটে চলে অন্ধ সময়। আমির হোসেনের সময় শেষ। পৃথিবীর সময়ের হিসাবে সে অতীত হয়ে যাচ্ছে । মহাকালের সাথে মিশে যাচ্ছে সে। এই সময় মানুষ অসময়ে অতিমানব হয়ে উঠে। আমির হোসেন যাবার আগে কিছু বলে যেতে চাইছে কিন্তু কে শোনে তার কথা! -আমি মারা যাচ্ছি এটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না। তোমাদের সাথে এর চাইতে অনেক জরুরী কথা আছে আমার। এটা তোমাদের শোনা দরকার। আমার কথা তোমরা খুব মনোযোগ দিয়ে শোনো। আমার কথা কি তোমরা শুনতে পাচ্ছ না? একবার ছেলে আনোয়ার এর দিকে আরেকবার স্ত্রী রহিমার দিকে তাকিয়ে বলে যাচ্ছে আমির হসেন। কিন্তু বললে কি হবে। তারা শুধু ঠোট দুটি নাড়াচাড়া করতে দেখছে। মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছে না।

মৃত্যুর ঠিক কয়েক মুহূর্ত আগে আজীবন মনের মধ্যে তাড়া করা মৃত্যুভয় দূর হয়ে গেলো মন থেকে। মৃত্যু এ যেন তেমন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নয়। জন্ম আর মৃত্যুর ব্যবধান মনে হচ্ছে মাত্র ন্যানো সেকেন্ডের। অনেক দীর্ঘ পথ এখনো যেতে হবে তাকে। এখানে সময় নষ্ট করার মতো সময় তার হাতে নেই। ট্রেন হুইসেল দিয়ে যখন স্টেশন ছেড়ে চলে যেতে থাকে তখন বিনা টিকিটে প্ল্যাটফর্মে দাড়িয়ে বন্ধুর সাথে খোশ গল্প করার সময় হাতে থাকে না ঠিক তেমনই সময় নেই আমির হোসেনের।
নিস্তেজ দেহটি পড়ে আছে বিছানায় কিন্তু মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বেড়ে গেছে লক্ষ গুণ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়াশোনা করা সাতাত্তুর বয়সী আমির হোসেনের মাথায় এখন পদার্থ বিজ্ঞানের জটিল থিওরি থেকে শুরু করে রসায়নের বিক্রিয়া সব কাজ করছে। তার চোখের সামনে দিয়ে ভেসে যাচ্ছে গ্যালাক্সি। কৃষ্ণগহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে সময়... তার শরিরের ব্যাকটিরিয়া ভাইরাস গুলো দৈত্য দানবের মতো দেখতে পাচ্ছে।
মস্তিস্কে সংরক্ষিত কোটি কোটি টেরাবাইট স্মৃতি রিভিউ হচ্ছে। সে সব দেখতে পাচ্ছে সব শুনতে পাচ্ছে। মাঝে মাঝে শরিরের সমস্ত শক্তি দিয়ে তার কথা গুলো বলে যাচ্ছে। তার কথা তার কানে বাজছে, শুধু তার পাশের মানুষ গুলো কিছু বুঝতে পারছে না।
আমির হোসেনের বিরক্তি বাড়ছে। তার মতো কেউ দেখতে পাচ্ছে না। তার মতো শুনতে পাচ্ছে না। এই মুহূর্তে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চলমান অনেক গুলো ঘটনা এক সাথে ভেসে উঠছে তার চোখের সামনে। সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে এই মাত্র হিমালয়ে নয় জন পর্বতারোহীর একজন মারা গেলো। ঢাকা বিমান বন্দর থেকে একশ ছিয়ানব্বই নাম্বার হজ ফ্লাইট পাঁচশ ষোল জন যাত্রী নিয়ে রানওয়ে থেকে উড়াল দিলো। লিবিয়াতে একই পরিবারের ছয় জন গুলি খেয়ে মরলো। ভুমধ্য সাগরে দুইশ সাতাশ জন শরণার্থী নিয়ে একটি নৌকা ডুবে গেলো। এই সবই দেখতে পাচ্ছে আমির হোসেন। কিন্তু সব তার কাছে তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা। মহাকালের যাত্রায় এই সব নগণ্য ঘটনার কোন মূল্য নেই। তার জরুরী কথা গুলো তার পরিবারের শোনা দরকার। তার স্ত্রী সন্তান আর কাছের সব মানুষকে নির্বোধ মনে হচ্ছে।
-কাকে বলবো? যাকে বলি সে বুঝে না। বুঝেও বুঝে না নাকি সত্যিই বুঝে না বুঝি না। নাকি বুঝতে চায় না। ইচ্ছে নেই... সময় নেই... বুঝার সাধ্য নেই... আমিও যেমন, যা শুনেছি এতদিন শুনতে চাইনি অথচ কান পেতে ছিলাম অযথাই। আমির হোসেন যেতে যেতে একবার পিছন ফিরে তাকায়...
হাসে... বলে -তোমার তুমিকে আগে বুঝনি তুমি আমির হোসেন!

আমির হোসেন মারা যাচ্ছে। উনিশ শ আটত্রিশ সালে এক শীতের ভোর রাতে আমির হোসেনের জন্ম। জন্মের পর তার বাবা কানে কানে আযান শুনিয়েছিলো। এখনো তার কানে বাজছে বাবার আযানের শব্দ। এই তো কিছুক্ষণ আগের ঘটনা। তার পর বড় হতে হতে ভুলে ভরা জীবনের শুরু। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ক্ষণে ক্ষণে ভুলে যাওয়া। মিথ্যা কথা বলা প্রতারণা করা আর মানুষের চোখে ভালো থাকার ভান করা। কর্মজীবনে তার মতো সৎ নিষ্ঠাবান বিচারপতি আরেকজন নেই বলে সবাই জানতো। ভালো মানুষ হিসাবে মানুষ তার তুলনা করতো। আজ আমির হোসেনের পরমাত্মা জেগে উঠেছে। বার বার শেষ বারের মতো তাগিদ দিচ্ছে -সব ভুল আমির হোসেন ... সব মিথ্যা... তুই সব স্বীকার করে যা। আসার আগে তোর গোপন অপকর্মের মাশুল তোর স্ত্রী সন্তানকে দিতে বলে আয় । বলে দে, তুই বিশ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে খুনের আসামীকে খালাস দিয়েছিলি। বলে দে, টাকার বিনিময়ে মিথ্যা মামলায় বিনা দোষে জহুর আলীকে চোদ্দ বছর সাঁজা দিয়েছিলি। জহুর আলীর বউ বেশ্যালয়ে জীবন কাটাচ্ছে। বলে দে আমির হোসেন তোর এই ছয়তলা বাড়ির পুরোটাই ঘুষের টাকায় তৈরি। বলে দে তোর স্ত্রী সন্তান সবার শরীরে ঘুষের রক্ত বইছে। আমির হোসেন একে একে সব বলতে চাইছে কিন্তু তার কথায় কেউ কান দিচ্ছে না।

বাতি নিভে যাওয়ার আগে যেমন একবার ধপ করে জ্বলে উঠে ঠিক তেমনই আমির হোসেন কিছুক্ষণের জন্য বর্তমানে ফিরে এলো। সে দেখতে পাচ্ছে তার শোবার ঘর। পাশে রাখা তার চেয়ার টেবিল। বুকশেলফ শত শত বই। যে বই এর কিছু পড়া হয়েছে বাকী সব আজীবন শোভা পেয়েছে শুধু। আভিজাত্য প্রকাশের জন্য দেশী বিদেশী শত শত বই তাকে সাজিয়ে রেখেছে। পড়া হয়নি কোন দিন। আজীবন মনে লালন করেছে গোপন লালসা। মানুষকে শুনিয়েছে সুন্দর সুন্দর কথা। সে আজও মানুষের কাছে খুব ভালো মানুষ। এই সুযোগে সব বলে যেতে চাইছে স্ত্রী সন্তানদের কাছে।
একটা তেলাপোকা বালিশের একপাশ থেকে মুখের উপর দিয়ে অন্য পাশে বার বার যাওয়া আসা করছে। সুড়সুড়ি লাগছে খুব। ইচ্ছে হচ্ছে হাতের মুঠোর মধ্যে নিয়ে আছাড় দিয়ে মাটিতে ফেলে দিতে। শরীরের সমস্ত শক্তি খরচ করেও হাতটা মুখের কাছে আনতে পারছে না আমির হোসেন। শুধু মাথাটা ডান বাম করা যাচ্ছে কোন মতে। ডানে বায়ে তাকিয়ে অনেক গুলো মুখ দেখছে। বার বার বলছে তেলাপোকাটা সরিয়ে দে। কেউ তার কথা শুনছে না। আমির হোসেন খুব স্পষ্ট করেই বলছে কিন্তু কেউ তার কথা বুঝতে পারছে না। তার যে খুব বিরক্তি লাগছে এটাও কেউ বুঝতে পারছে না। বড় মেয়ে রানুকে বিছানার পাশে বসে কাঁদতে দেখে মাথায় হাতটা রাখতে ইচ্ছে হচ্ছে। হাত চলছে না।
এবার একটু স্পষ্ট করে বলতে পারলো –কি রে মা রানু কাঁদছিস কেন? ছেলে আনোয়ার মুখ থেকে শুধু রানু শব্দটা বুঝতে পারে। বাবার মাথায় হাতটা রেখে বলল –বাবা, রানু আপা তো আসেনি, চট্টগ্রাম থেকে রওনা দিয়েছে। গাড়িতে আছে।
রহিমা এক কাপ কুসুম গরম পানি আর একটা চামিচ নিয়ে স্বামীর মাথার পাশে বিছানায় বসে। স্ত্রীকে দেখে আমির হোসেন চোখ বড় করে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। প্রথমে চিনতে পারেনি। কিভাবে চিনবে ঠিক চল্লিশ বছর আগের যুবতী রহিমা। মুখ থেকে যৌবনের জ্যোতি ছড়াচ্ছে। অন্য পাশে ছেলের বউ দোয়া পড়ে মুখে ফু দিচ্ছে। স্ত্রী আর ছেলের বউ দুজনকেই এক বয়সী মনে হচ্ছে। এমন কেন মনে হচ্ছে আমির হোসেন বুঝতে পারছে না। সে একটু চিন্তা করে বুঝার চেষ্টা করছে, তার মাথা ঠিক মতোই কাজ করছে, বরং একটু বেশীই করছে! শরীর যতটা নিস্ক্রিয় মাথা তত বেশী সক্রিয়। বিশেষ করে ফেলে আসা দিন গুলোর প্রতিটি দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠছে। মাঝে মাঝে বুকের মধ্যে ঢক ঢক শব্দটা থেমে যাচ্ছে আবার সচল হচ্ছে। কিন্তু মাথা কাজ করছে ঠিক মতো। সেই পঞ্চাশ বছর আগের ঘটনাও স্পষ্ট মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে এইতো কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা। অনুতাপ হচ্ছে, ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু ক্ষমা চাওয়ার মতো শক্তি দেহে অবশিষ্ট নেই।
বিয়াল্লিশ বছর আগে রানুর জন্মের সময় আমির হোসেন মনে মনে চাইছিলো স্ত্রী রহিমা একটা পুত্র সন্তান জন্ম দিয়ে মারা যাক। রহিমা মরেনি। একটা কন্যা সন্তান জন্ম দিয়ে বেঁচে থাকলো। আমির হোসেন তার মনের এই গোপন চাওয়ার কথা কাউকে বলতে পারেনি। এরপর অনেক অত্যাচার নির্যাতন চলেছে রহিমার উপর। আজ ক্ষমা চাইতে ইচ্ছে করছে। কোন জড়তা নিয়ে নয় খুলাখুলি বলতে ইচ্ছে করছে। বলার শক্তি নেই। একবার শুধু রহিমার মুখের দিকে চেয়ে চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পরে। রহিমা আঁচলের কোনায় মুখ ঢেকে ঢুকরে কেঁদে উঠে। যেই অপরাধের কথা মানুষ জানেনা তার ক্ষমা পাওয়া কতো কঠিন...
ছেলে আানোয়ারের দিকে তাকিয়ে বলছে মফিজের কথা। দেশ স্বাধীনের পরের বছর অভাবের দিনে কিছু টাকা কর্জ দিয়ে দলিলে সই করে মফিজের ভিটা বাড়ি সহ নয় বিঘা আবাদী জমি নিজের করে নেয় আমির হোসেন। মফিজ মনের দুঃখে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে। আমির হোসেন গ্রামের মানুষকে গল্প শোনায় স্কুল মাষ্টারের সাথে মফিজের স্ত্রীর পরকিয়া প্রেম ছিলো। মানুষ জানে সেই দুঃখেই মফিজ আত্মহত্যা করেছে। তিন ছেলে মেয়ে নিয়ে মফিজের বউ গ্রাম ছাড়া হয়। আমির হোসেন আনোয়ারকে বলছে -বাবা আনোয়ার, মফিজের সন্তানদেরকে খুঁজে বের করে জমি ফিরিয়ে দিয়ো... আমির হোসেন ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে এই কথাটি বার বার বলছে। ছেলে শুধু দেখলো বাবা তার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
-বাবা তোমার কোন ভয় নেই বাবা। তুমি আজীবন অনেক নেক আমল করেছো। অনেক মানুষের উপকার করেছো। কতো মানুষ তোমার জন্য প্রাণ থেকে দোয়া করছে! তুমি ভালো হয়ে যাবে বাবা। আনোয়ার বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে থাকে।
-এই বাড়ি বিক্রি করে গরীব মানুষকে বিলিয়ে দে। সব হারাম রোজগারের টাকায় তৈরি। মফিজের জমি ফিরিয়ে দে। তোদের নিজের কিছুই নেই। সব মানুষের সম্পদ... সব...। আমার হাতে আমার মহাকালের চাবি তুলে দে। আমি যে শুন্য হাতে ফিরে যাচ্ছি বাবা...
সবাই শুধু দেখতে পেলো আমির হোসেনের হাত পা কাঁপছে। ঠোট দুটি কাঁপতে কাঁপতে মুখ দিয়ে ফেনা বেরিয়ে শরীরটা নিথর হয়ে গেলো। আমির হোসেনের কথা স্ত্রী সন্তান কেউ শুনতে পেলো না। আমির হোসেন মহাকালের চাবি পৃথিবীর আবর্জনায় হারিয়ে মনের দুঃখে শুন্য হাতে ফিরে গেলো। যেতে যেতে আমির হোসেনের দুঃখ-
ভবের হাটে এসেছিলাম
তিষ্ঠ ক্ষণকাল কাটিয়ে গেলাম
রেখে গেলাম ধনরত্ন
নিয়ে গেলাম ছাই ভস্ম...
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন