বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২০ জুন ১৯৭০
গল্প/কবিতা: ২০টি

সমন্বিত স্কোর

২.৮৭

বিচারক স্কোরঃ ১.৩১ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৫৬ / ৩.০

অস্থির মানে চঞ্চল

অস্থিরতা জানুয়ারী ২০১৬

বরফির বৈরিতা

বৈরিতা জুন ২০১৫

সে

ভালোবাসা / ফাল্গুন ফেব্রুয়ারী ২০১৫

শিক্ষা / শিক্ষক (নভেম্বর ২০১৫)

মোট ভোট ১৩ প্রাপ্ত পয়েন্ট ২.৮৭ নৈতিক শিক্ষা

জি সি ভট্টাচার্য
comment ৮  favorite ১  import_contacts ৩৫৭
আমি চঞ্চল।
আমার নাম এখন অনেকেই বে্শ জেনে ফেলেছে কাকুর গল্প লেখার কল্যাণে। আমার বন্ধু বাদল তো আমার নাম দিয়েছে ‘পরীর দেশের রাজকুমার’। আমি না কি একটা খুব খুব সুন্দর ছেলে বলে।
সে কথা যাক।
সুন্দর বা অসুন্দর হওয়া তো কারো নিজের হাতে নয়। কিন্তু বেশী সুন্দর ছেলে বা মেয়েদের অনেকেই বেশ হিংসে করে। আর তার ফল ও বেশ ভুগতে হয় তাদের অকারণে। এ আমি অনেক দেখেছি।
এখন আমি একটা মজার নৈতিক শিক্ষার গল্প লিখতে চেষ্টা করছি বসে।
কি আর করি? নেই কাজ তো খই ভাজ। স্কুলে যাওয়া তো কাল থেকে বন্ধ হয়েছে হঠাৎ।
তা হয়েছে কি তাই বলি আগে।
সে’দিন সন্ধ্যাবেলায় যথারীতি বাদল আমাদের বাড়িতে চলে এসেছিল আমার সাথে খেলবে বলে।
কাকু তখন আমাকে স্কুল থেকে নিয়ে এসে বাথরুম থেকে হাত পা মুখ ধুইয়ে এনে ড্রেস রুমে নিয়ে গিয়ে আমার স্কুলের সব পোষাক বদলাচ্ছিলো। আর একটু পরেই আমাদের দু’জনকেই জলখাবার খাইয়ে দিয়ে কাকু ছাদে খেলতে ও পাঠিয়ে দিল। কাকু আমাকে অন্য কোথা ও বা অন্য কারো সাথেই খেলতে ও পাঠায় না আর আমাদের গোটা ছাদটা ও মোটা লোহার জাল দিয়ে ঘেরা। এ’সবই সুরক্ষার জন্য। আমার বাপী পুলিশ অফিসার বলে না আমি রূপবান ছেলে বলে, তা কে জানে? হয়তো দুই কারণেই।
তা আমার কাকু সব কাজেই খুব চটপটে কিন্তু আমার কপাল মন্দ।
সবে খেলাটা শুরু হয়েছে আর ব্যাডমিন্টনের একটা ফোর হ্যান্ড স্ট্রোক খেলতে গিয়েই হয়ে গেল চিত্তির। কোথা ও কিছু নেই অকারণেই পা পিছলে মানে স্লিপ করে আলুর দম মানে আমি ধপাস ধাঁই হ’লুম। ভাগ্যে বাদল একলাফে এসে আমাকে ধরে ফেলল তাই আর চিৎপটাং হ’তে হ’লো না আমাকে কিন্তু কোমরে বেশ চোট তো লাগলোই। এমন অকারণে আছাড় আমি আর কখনো খাই নি তা ঠিক বলছি।
আমি তখন উঠতে ও পারছিনা দেখেই বাদল বলল-‘পে লোড তো মোটে একুশ কেজি……কাকুকে আর ডাকতে হবে না । ও আমি নিজেই..’.।
বাদলের যেমন সব কথা। আমরা কি একটা মহাকাশ যানে রয়েছি না কি যে পে লোড হবে? বললেই ছেলেটা বলবে- ‘তা আছিই তো । পৃথিবী নামক মহাকাশযানে’।
বোঝ ঠ্যালা।
আর বাদল আমার ওজন ও একটা এগারো বছরের ছেলের মতন ওজন বললে তো আর তা ও সত্যি হবে না। তেরো বছরের পরে ওজন তো বাড়েই ছেলেদের তা যতই রোগা ছেলে হই না কেন আমি। আর আমি তো এখন সবে চোদ্দোয় পা দিয়েছি।
তবে বাদল বেশ ব্যায়াম ট্যায়াম রোজ করে বলে দু’হাতে আমাকে সে অবলীলাক্রমে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে নিচে নিয়ে গিয়ে ঘরে বিছানায় শুইয়ে দিলো।
তাই দেখে কাকু ভ্রু কুঁচকে বলল-‘কি হয়েছে, বাদল?’
‘আচার...।‘
‘হুম।তা কিসের? আমের না তেঁতুলের?’
‘মনে হয় জলপাইয়ের, কাকু। হিঃ….হিঃ….হিঃ….’
‘তা তোমাদের খেলা তো গোল্লায় গেলো। এখন তোমরা কি করবে?’
‘তুমি তোমার এই পরী ছেলেটার এখন সেবা করো বসে। আর আমি বাড়ী যাই, কাকু। তবে ঘটনাটা বেশ সদেহজনক ভাবে হঠাৎ ঘটেছে, তা জানো তুমি কাকু? চঞ্চলের কিন্তু একটু ও দোষ ছিল না। ব্যাপারটা আমি ভাল বুঝছি না, কাকু। তুমি একটু সাবধানে থেকো। ঘটনা সন্দেহজনক’।
‘আমি তৈরী আছি এবং থাকবো বাদল তুমি তোমার রাজপুত্তুর বন্ধুর জন্য চিন্তা কোরো না। আগে ওষুধ খাইয়ে দিয়ে দেখি এখন, পরে না হয় কোমরে ওপায়ে মালিশ ও করে দেবো’।
তা সে রাতে কাকুকে সত্যিই নিজের এই ত্রয়োদশোত্তীর্ণ হাঁদা ছেলের সেবায় লাগতে হ’লো ডিনারের আগে। কাকু সরষের তেল ব্যবহার করে না আমার জন্য আমার দুধের বরণ ত্বক হলদে হয়ে যাবে এই ভয়ে। তবে গন্ধে মনে হ’লো ইউক্যালিপটাশের তেলে কাকু কোন হোমিওপ্যাথিক ওষুধ মিশিয়ে নিয়েছে।
রাত তখন মনে হয় দশটা কি এগারোটা হবে। আমি ঘড়ি দেখি নি। তবে কাকুর রান্না বান্না শেষ হ’তে দেরী হয়েছিল বেশ আমার দিকে নজর রাখতে গিয়ে। মাঝে মাঝেই এসে আমাকে দেখে ষযাচ্ছিল কাকু আর জিজ্ঞাসা করছিল ব্যথা বাড়ছে কি না।
আমি বিছানায় চুপটি করে পাশ ফিরে শুয়েছিলাম। স্পোর্টস ড্রেসটাও আমার বদলানো হয় নি। এখন কাকু এসে জানলা দরজা বন্ধ করে সে’গুলো সব ধীরে ধীরে সাবধানে খুলে ফেললো কাকু আমার ব্যথা জায়গায় না লাগে এমনভাবে আর তারপরে আমার পিঠে কোমরে ও পায়ে অবধি বেশ করে ওষুধ তেল মালিশ করতে শুরু করলো। আমার বেশ আরাম লাগছিলো তখন আর ব্যথা ও কমছিল।
তখন হঠাৎ কে যেন বলে উঠল-‘তা বেশ হয়েছে দেখছি’।
আমি বেশ চমকে উঠে তাড়াতাড়ি আর কিছু না পেয়ে মোটা বেড কভারটাই টেনে নিলুম। তাই দেখেই কাকু বলল-‘কে?’
‘আমি। নাম মনে করুন নীলরতনবাবু…..আমি মাষ্টার মশাই ছিলুম………’
‘আমি তো ঠিক চিনতে পারছি না আর দেখতে ও পারছি না আপনাকে’।
‘তা’তে আর হয়েছেটা কি, শুনি? আমাদের কি অতো সহজে দেখা যায়?’
শুনেই আবার চমকে উঠলুম আমি। কাদের দেখা যায় না সহজে রে বাবা? আমার বেশ ভয় ভয় করতে লাগলো।
‘তবে শুনছিটা কি করে আপনার কথা?’
‘সে তো তোমাদের সাউন্ড সিস্টেমের স্পিকারটার কল্যাণে। ভাবলুম যাই ছেলেটা কেমন আছে একটু দেখেই আসি না হয় গিয়ে।বিকেলে লুস্সু চ্যাংড়াটা ল্যাং মারায় ছেলেটা ছাদে জোর আছাড় খেয়েছে শুনলাম। ব্যাটা তো নিজে মার্কামারা হতকুচ্ছিত ছিলো কি না? তাই মনে হয় হিংসেয়…………….. তবে সে তুমি যাই বল ভাই, তোমার এই ছেলেটা কিন্তু সত্যিই দারুণ সুন্দর…আর রূপে গুণে অতুলনীয়। প্রায় গোটা দেশ তো ঘুরে এসেছি আমি……তাই বলছি’।
কাকু কিন্তু আমার এই প্রশংসায় গলে পড়বার পাত্রই নয়। উল্টে বেশ রাগতসুরে বলল-‘এই কাজটা আপনার কিন্তু মোটেই নৈতিক হয় নি। বিশেষকরে এতোরাতে আপনি হঠাৎ কারো বেডরুমে….. তা কতক্ষণ এসেছেন শুনি?’
‘তা মিনিট পনেরো হয়েছে বই কি’।
শুনে কাকু বেজায় রেগে বলল-‘ঘোর অনৈতিক। হ’লোই বা একটা ছোট ছেলে। কিন্তু দেখছেন যখন যে আমি ছেলেটার সুশ্রুষা করছি ঘরে কেউ নেই ভেবে তখন বিনা নোটিশে এসে…… আপনি বসে বসে দেখছেন কি বলে’?
‘সে বাপু তুমি যাই বলো ….বসে বলো বসে আর ভেসে বল ভেসে…..। ভারী তো একটা চোদ্দ বছরের ছেলে।তার আবার কথা কি? আর আমরা তো এখন মানুষের মধ্যে গণ্যই হই না। আমাদের নৈতিকতার বিচার তোমরা মানুষেরা করবেই বা কি করে? ইচ্ছে থাকলেই বা কি? আটকাতে পারবে? হুঁ…….’
‘ আর তবে তোমাকে এখন বলেই ফেলি যে আমি মানুষটা আগে ও খুব একটা সুবিধের ছিলুম সেটি যেন ভেবো না। আর তোমাদের ওই ভগবান ভদ্রলোক ও তেমনি ধুরন্ধর। বুঝলে। আমার মতন একজন নৈতিক শিক্ষককে একদম সোজা করে ছেড়েছেন। তবে স্বভাব………….তা শুনবে আমার গল্পটা?’
‘হুম….বলতে আজ্ঞা হোক…….আমার কাজ তো গেলো………….’
‘শোন, আমি ছিলুম এক কড়া হেডমাষ্টার কেননা তখন ও কর্পোরাল পানিশমেন্ট গোল্লায় চলে যায়নি হতচ্ছাড়া সব পাবলো আর স্কিনার ফিনারদের জ্বালায়। মনোবিজ্ঞানের না কাঁথায় আগুন। বদমায়েস সব ছেলেগুলোকে যদি আপাদ মস্তক রাম ধোলাই দিয়ে হাতের সুখই না করা যায় তবে মাষ্টারী করে হবেটা কি? ছাই……..? গালাগালিটা যা দিতাম সে সব তো ফাউ’।
‘আর তখন বেত তো চলতোই নানা নম্বরের। এক থেকে আট অবধি ছিল। তবে বড়জোর ছয় অবধি কাজে লাগানো যেত। যত বেশী নম্বর ততো সরু বেত। আট নম্বর গা কেটে বসতো। আর তার সাথে নানাধরণের অন্য সব শাস্তি ও কিছু কম ছিল না। যেমন ধরো ছেলেরা পড়া না করলেই নীলডাউন করা বা মোরগ বানিয়ে রাখা; কান ধরে ওঠবোস বা ক্লাশের বাইরে বা বেঞ্চে দাঁড় করানো থেকে শুরু করে খুব ঝাল কাঁচা লন্কা চিবোতে দেওয়া ও ডিটেনমেন্ট সবই চলতো। এমন কি ঘোরতর অপরাধী ছাত্র হ’লে আর একটু বড় মানে তোমার ছেলের মতন বয়সে যাদের লজ্জাবোধ বেশ একটু বেড়েছে মানে তেরো চোদ্দ বছর বয়স হয়ে গেছে আর কি, তেমন ছেলেদের ধরে সব পোষাক খুলে নিয়ে দু’হাত চেপে ধরে রেখে স্কুলের গেটের সামনে একঘন্টা দাঁড় করিয়ে রাখবার পরে প্রথমে মাঠে এবং তারপরে সব ক্লাশে নিয়ে গিয়ে ঘোরানো অবধি আকছার করা হ’তো। তখন কথায় কথায় গার্জেন কল করা বা টিসি দেওয়া কেউ জানতোই না। গার্জেনরা ও রাগ তো করতেনই না উল্টে বলতেন শাস্তিটা বেশ ভালোমতন দেবেন স্যার যাতে আমার গাধাটাও মানুষ হয়ে উঠতে পারে। এই সব কি তোমাদের এখনকার পি টি এ আর ছাইয়ের কাউন্সেলিংয়ে বাবার ক্ষমতায় হবে?
‘আর এর জন্য সব ক্লাশেই মনিটর ও অ্যাসিস্ট্যান্টদের গ্রুপ থাকতো যাদের নাম ছেলেরা দিতো জল্হাদ গ্রুপ। তা দিক কিন্তু এই ঠ্যাঙানী সিস্টেম ছিল খুব ফলপ্রসু…….’।
‘এই ফলটি হতো স্কুলের কড়া ডিসিপ্লিন। যা পড়ানো হ’তো তা সবাই মনে তো রাখতোই সাথে জীবনে অভ্যাস ও করে দেখাতে হ’তো ছেলেদের’।
‘যেমন একদিন আমি ক্লাশ ফাইভে গিয়ে পড়ালুম- ‘কখনো মিথ্যাকথা বলিবে না। গান্ধিজী আজীবন মিথ্যা বলেননি তাই ……..আজ তিনি আমাদের রাষ্ট্রপিতা। তোমরা ও বলিবে না’।
একটা অতি পাজির পা ঝাড়া দুষ্টু ছেলে বলে ফেলল-‘তাই তিনি আজ আর নেই। অকালে গুলী খেয়ে মরেছেন। আমাদের ও মরতে হবে, স্যার’।
ফলে তার কপালে তখনি জুটলো দশ ঘা বেত ও খালি গায়ে বেঞ্চে দাঁড়ানো। ছেলেটার বয়স কম মানে মাত্র দশ বছর । কি আর করা? তবে শাস্তির ফল হাতে হাতে ফলে গেল। পরদিন সে যখন বলে দিলো যে সে নিজে দেখেছে যে কোন বদমায়েস পিওন রোজ টিফিনে যে আদা আর নুন দেওয়া ভিজে ছোলা ছাত্রদের দেওয়া হ’তো তার থেকে বেশ কিছুটা চুরী করে নিতো তখন সেই ঘটনার পরে সেই পিওন পরমানন্দ যাদব সাসপেন্ড হয়ে গেল। তবে সে ছিল নামী গুন্ডা তাই তার দশদিন পরে ছেলেটি স্কুল থেকে বাড়ী ফেরার পথে অপহৃত হ’লো। আর তার খোঁজ রইলো না।
আমি দ্বিতীয় দিন পড়ালুম –‘কখনো না বলিয়া পরের মানে অ্ন্যের দ্রব্য মানে জিনিষ লইবে
না। এমন কি পথে কারো জিনিষ পড়িয়া থাকিতে যদি দেখ, তাহা ও তুলিয়া লইবে না। ইহা চুরী এবং মহাপাপ’।
সে’দিন ছিল দশ ক্লাশ।
একটা বছর ষোল সতেরে]র রাম শয়তান ছেলে বলল-‘ তাহলে জোর করে কেড়েই নেব তো. স্যার? বোঝো, কি বদমায়েস সব ছেলে ছিলো তখন আর এখনই বা সব কম যায় কিসে? হুঃ…………’।
‘তাই ব্যাস, আর তাকে ছাড়ি আমি কখনো? দশ মিনিট পরে সবাই দেখতে পেলো যে সেই ফর্সা ছেলেটা স্কুলের গেটের সামনে একদম খালি গায়ে স্ট্যাচু হ’য়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছে বিশ ঘা বেত খেয়ে। আর সত্যি বলছি রে ভাই। ফর্সা ছেলেদের বেত মেরে ও কি যে সুখ ছিলো তা কি আর বলবো? লাল লাল দাগড়া দাগড়া আর পরে কালসিটে পড়বার কি সুন্দর দাগ যে ফুটে উঠতো তাদের গায়ে সে আর কি বলে বোঝানো যায়? তোমার এই দুধের বরণ ছেলেটাকে দেখে বড় ইচ্ছে করছে যে এখনই ওর নরম পিঠে যদি দশ ঘা ও বেত মারতে পারতাম তবে তুমি নিজেই দেখতে পেতে কি সুন্দর দেখায়। এখন তো ছাই বেত ও আর না কি মেলে না। পড়াশুনো হবে কি ছাই দিয়ে? তখন তো প্রতি তিনমাস অন্তর একবাক্স করে বেত কেনা হ’তো সব স্কুলেই। আর কালো ভূত ছেলেগুলোকে যতই বেত মারো কিছু নয়………ছ্যাঃ’
‘পরের দিন কিন্তু সে আমাকে একটা একশো টাকার নোট এনে দিয়ে বললো- ‘স্যার, করিড়োরে পড়ে ছিল। নিশ্চয়ই কোন স্যারের পকেট থেকেই পড়ে গেছে কেননা আমাদের কারো পকেটেই তো একশো টাকার নোট থাকে না । তখন একশো টাকার অনেক দাম ছিল। মাইনেই তো পেতুম সাতশো টাকা’।
‘তা আমি অন্যায় করি নি বাপু। কয়েকজন সহকর্মিকে জিজ্ঞাসা ও করলুম ঠিকই কিন্তু কেউ যখন আমার টাকা বলে দাবী করলো না আমার কড়া জেরার মুখে পড়বার ভয়ে, তখন আর কি করা? জলয়োগের দোকানে গিয়ে বাধ্য হয়ে আমাকেই ক’দিন ভূরিভোজন করে ফেলতে হ’লো। টাকাটা তো আর নর্দমায় ফেলে দিতে পারি না আমি……হেঃ…..হেঃ…….হেঃ………’
‘আমি তৃতীয় দিন পড়ালুম –ছেলেরা শোন, কোন অপরিচিত লোকের সাথে মিত্রতা বা ঝগড়া করিবে না। তাহার উপকার ও যাচিয়া গিয়া করিবে না। পথে কোন অশক্ত মানুষকে দেখিলে রা কেউ যদি সাহায্য চায় তখন সাহায্য করিতে পার’।।
‘পরের দিন একটি ছেলে সকালে নদীতে চান করতে গিয়ে শুনলো….. বাঁচাও ….বাঁচাও…… চিৎকার। কে একজন ডুবছে। ছেলেটা জলে লাফিয়ে পড়লো। উদ্ধার ও করতো ডুবন্ত মানুষটাকে ঠিক কিন্তু সে এমনভাবে তাকে আঁকড়ে ধরলো যে………..’
‘কি আর করা? সে’দিন একটা শোকসভা করিয়ে স্কুলে ছুটি দিতেই হোল। কি করে যে ডুবন্তকে ধরতে হয় সাবধানে আর নিজেকে বাঁচিয়ে তাই সে কি জানতো?’

‘আর একদিনের কথা। ………সাইকেলে চেপে স্কুলে যাচ্ছি। আমার আগে আগে কয়েকটি ছেলে ও যাচ্ছে। এক জায়গায় হঠাৎ তারা দাঁড়িয়ে পড়লো। আর কি সব পরামর্শ করতে লাগলো। কিন্তু একটু পরে সবাই এগিয়ে যেতে তখন আমি এগিয়ে গিয়ে দেখি যে সে’খানে কার একটা মনিব্যাগ পড়ে আছে। খপ করে তুলে নিয়ে খুলে ফেলতেই হাতে পেলুম নগদ দু’শো টাকা। বাহবা……..আমার বরাতকে…….মাসের শেষে যখন হাতে একটা ও পয়সা নেই সেই সময়ে এ তো স্বর্গলাভ….স্কুলে যেতে ক্লাশে ছেলেরা অবশ্য তাদের নৈতিক শিক্ষার ব্যবহার রিপোর্ট করলো। আমি ও তাদের বাহবা দিলুম বইকি। নইলে নৈতিক শিক্ষার মান বাঁচে না’…….।
‘একদিন আবার আমি পড়ালুম—‘অন্যের জিনিষের বিষয়ে কৌতুহল দেখাইবে না। তাহা অন্যের কাছে চাহিবে না এমন কি ছুঁইবে ও না । যাহা তোমার জিনিষ নয় তাহাতে তোমার কোন অধিকার নাই’।
একটা অতি পাজী ছেলে বলে ফেলল-‘স্যার, এই স্কুলটা ও তো আমার নয়। এখানে আসতে ও আমি চাই না আর পড়বার কৌতুহল ও আমার একদম নেই। স্কুলে তো আসতে হয় খালি গালাগালি শুনতে ও বেদম মার খেয়ে মরতে। তাই এই স্কুলে আসবার অধিকার যারা স্কুল তৈরী করেছে তাদের দিয়ে দিন না’….
‘আর তখন একটা গোটা ঝাল লংকা তাকে চিবোতেই হ’লো। বিনা মার খেয়ে ও সে কেঁদে বাঁচে না তখন’।
‘এইভাবেই রীতি মতন নৈতিক শিক্ষা দিয়ে কর্ত্যব্য পালন করে চলেছিলাম আমি প্রাণপণে। তা বেশীদিন আর তা ও চললো না। ভাগ্যং ফলতি সর্বত্রে ন বিদ্যা ন চ পৌরুষঃ……….জানো তো?’
‘তা জানি বই কি স্যার?’
‘তবে শেষটা ও শোন………….কয়েকদিন পরে ভোর রাতে খুব ঝড় জল হ’লো। গ্রামে হ’লে সকালে আম টাম কুড়োতে যেতুম ঠিক। শহরে তো আর সে সমস্ত নেই তবু ও সকাল হ’তেই বেরোতে হ’লো কেননা রাত ভোর কারেন্ট নেই। গরমে অস্থির। আর খানিক দূর গিয়েই দেখি কার একটা পাতলা দামী চকচকে জয়পুরী লেপ ঝড়ে উড়ে এসে পড়ে আছে। ভিজে একসা। তখন শীত কাল নয় কিন্তু হয়তো কেউ কেচে শুকোতে দিয়েছিল বা ছাদের ঘরে রেখেছিল। ঝড়ে উড়িয়ে এনেছে। হাল্কা আর ওয়াশেবল জিনিষ তো তাই আমার বহুদিনের শখ ছিল কিন্তু পয়সার অভাবে কিনতে পারি নি। যা দাম…..’
‘ভাগ্যে পথে তখন ও জন মানব কেউ নেই। খপ করে তুলে নিতে গেলুম আমি নীচু হয়ে। তা তখন কি আর জানি ছাই যে লেপের আড়ালে একটা ঝড়ে ছিঁড়ে পড়া ইলেক্ট্রিকের তার ও আছে……কেন যে কারেন্ট বন্ধ তা জানতে পারা গেল ঠিকই তবে তার আর কোন দরকার রইলো না কেননা ফল যা হবার তাই হয়ে গেছে ….. তা বুঝলে কিছু এইবার?’
‘হুম, যা বোঝবার আমি বুঝেছি আগেই কিন্তু আপনি্ তো স্যার বেশ একটু ইয়ে মানে কি বলে স্যাডিস্টিক ইনকরিজিবল মানে এই মনে করুন যাকে বলে বেশ জিনিয়াস গোছের লোক ছিলেন কেননা নতুন নতুন সব শাস্তি আবিষ্কার করতেন ছেলেদের জন্যে আর সেই জন্য আপনার হাত ও নিশপিশ করতো আর ছেলেদের অভদ্রের মতন যা তা শাস্তি দিতে ও লজ্জা পেতেন না ……তাই ভাবছি………………..’
‘ভাববে আবার কি?’
‘ভাবছি যে আমি আমাদের ঘরে সময় অসময়ে বিনা অনুমতির আপনার এই অনুপ্রবেশ আটকাবো কি করে বলুন তো দেখি, স্যার?’
‘কি? কি বললে? তুমি মানুষ হয়ে কি না আমাকে আটকাবে? ছ্যাঃ……..এই শালার পদ্মপলাশ লোচন ছেলেকে আর আমি কোনদিন ও ছাড়বো? তুমি কি তাই ভেবেছ? আর তুমি তাড়াবে আমাকে? আরেঃ ছোঃ …..সুমেরু পর্বত যদি মক্ষিকায় নাড়ে….পড়েছ?’
‘হুম…..রামায়ণে আছে….’
কাকু এই কথা বলতেই দমাস করে দামী স্পিকারটা ফেটে চৌচির হয়ে যেতে কাকু –‘আরেঃ ….এ কি? এ…এ কি?’ করে উঠলো।
এইবারে আমি আমার টানা টানা চোখ দুটো আরো বড় করে বললুম –‘ও কাকু, তুমি মিছে ভাবছো কেন? ওনাকে আটকানো যাবে খুব সহজেই, কাকু। মানুষ হয়ে ও যাবে। ওনারা তো রামকে বলেন আম, হরিকে বলেন অরি আর মাধবকে বলেন যাধব। মানে ঠাকুর দেবতার নাম সহ্য করতেই পারেন না। তাই ভোরে উঠে রাম নামের একখানা ক্যাসেট না হয় চালিয়ে দিতে হবে………….’
কাকুর সাধের মিউজিক সিস্টেমের পরে এইবারে কালার টি০ভি০র স্পিকারটা থেকে আওয়াজ শোনা গেল-‘কি? কি বললি শয়তান ছেলে? ভয় নেই ডর নেই …..যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা। আজ আমি এই শালার ছেলের সুন্দর মুখ জন্মের মতন এখনই শেষ করে দিয়ে যাবই ……’
সেই বিকট স্বর শুনে আমি তো আঁৎকে উঠলাম।
আমাদের খাটের পাশেই একটা সেকেলে পালিশ করা কাঠের বড় আলনা ছিল। খুব ভারী আর জামা কাপড় বোঝাই করা। আমার তো মনে ও ছিল না। টি০ভি০টা তার পাশেই ব্র্যাকেটে বসানো ছিল । আওয়াজটা সেইখান থেকে আসছে মনে হ’তেই সে’দিকে তাকিয়ে দেখলুম আমি…..আর সঙ্গে সঙ্গেই….. ‘ও কাকু………….’.বলে চেঁচিয়ে উঠলুম।
দুলছে……সেই .গোটা ভারী আলনাটা সবসুদ্ধ ভীষণভাবে দুলছে। ভূমিকম্প না কি?
আর তারপরেই সেটা হঠাৎ হুড়মুড় করে সবশুদ্ধ এসে আমার মাথা ও মুখের ওপরে সশব্দে আছড়ে পড়লো। আমি ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলুম জোরে। কিন্তু আমার মুখ মাথা কিছুই ভাঙলো না দেখে ভারী অবাক হয়ে গেলুম আমি।
ও হরি …………….দেখি যে কাকু বাদলের মতনই ক্ষিপ্রতায় আমার বুকের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েই ডান হাত তুলে পড়ন্ত আলনাটাকে ধরে পেছন দিকে একধাক্কা মেরেই উঠে দাঁড়িয়ে টেবিল থেকে গঙ্গাজলের শিশিটা তুলে নিয়েছে।
এই শিশিটা কি কাকু আগেই টেবিলে এনে রেখেছিল? তা কে জানে? রোজ তো থাকে না।জলটা ও কি মন্ত্র পড়া? কে জানে?’
তবে আলনাটা পিছন দিকে ঠিকরে গিয়ে দেওয়ালে এক জোর ধাক্কা মেরে স্থির হ’লো। আর টি০ভি০ সেটটা ছিটকে এসে পড়লো তবে ছোট সেট তো। তাই তার অ্যান্টেনা আর কেবল কর্ড ও প্লাগের মোটা তারগুলোয় জড়িয়ে গিয়ে শূন্যেই ঝুলতে রইলো আর কাকু ও সেটা খপ করে বাঁ হাতে ধরে টেনে তুলে আবার ব্রাকেটে বসিয়ে দিলো।
কাকুর হাতে বেশ জোর আছে নইলে কাকুর মনে ইচ্ছে হয় যখন তখনই তো দেখি যে এখন ও আমাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে তিন বছরের ছেলের মতনই একটানে কোলে তুলে নেয় এবং ঘরেই পায়চারী ও করে আগের মতন। আমি কি আর সেই তিন বছরের কচি বাচ্ছা ছেলেটি আছি না কি?
তবে মজাটা মন্দ হচ্ছিলো না। এইবার একটা লোহার রড ঘরের কোন থেকে ছিটকে এসে আমার বুকে আছড়ে পড়লো সপাটে। বিদ্যুৎবেগে সেই রডটাকে একটা লাথি কষিয়ে দিলো কাকু লাফ দিয়ে।ঝন……ঝন….ঝনাৎ শব্দে সেটা ঘরের কোনে ছিটকে গেলো।
ছপাৎ……………….খানিকটা জল ছুঁড়ে দিলো কাকু আর সত্যি বলছি মনে হ’লো কি যেন একটা সাঁৎ করে সরে গেল আমার কাছ থেকে জানলার দিকে।
জানলার পাশেই খানিক দূরে ছিলো দরজাটা । কাকু জানলা বন্ধ করে সেটা ও হুড়কো দিয়ে বন্ধ করেছিলো। আর হুড়কোটা মোটা তার দিয়ে একদিকে দরজার ফ্রেমে আটকানো ও ছিলো। এখন হুড়কোটা লাফিয়ে উঠলো আর তার ছিঁড়ে সেটা ধেয়ে এলো আমার মাথার দিকে নির্ভূল লক্ষ্যে ……..অদ্ভূত কান্ড ……………
কাকু একটা লাঠি তুলে হুড়কোটার দিকে অব্যর্থ লক্ষ্যে এতো জোরে ছুঁড়ে মারলো যে দু’টোই ছিটকে গেল ঘরের আরেক কোনের দিকে………খটাস …..দমাস শব্দে………..
আবার ….ছপাৎ……
এইবার হঠাৎ দড়াম করে জানলাটা খুলেই আবার বন্ধ হয়ে গেল।
‘আপদঃ শান্তিঃ……’
এই বলে কাকু ফিরে এসে গঙ্গা জলের শিশিটা যথাস্থানে রেখে টেবিলের ড্রয়ার খুলে দেখি বিন্ধ্যাচল থেকে আনা মা বিন্ধ্যবাসিনির মন্ত্র পড়া লাল সূতো বার করছে। সূতোটা অনেকটা বড় তাই কাকু খানিকটা কেটে নিলো। তার পর কাকু আমার পাশে এসে দাঁড়িয়ে আমার গায়ে চাপা দেওয়া বেড কভারটা সরিয়ে দিয়ে আমার নরম চকচকে ডান হাতটা ধরে টেনে নিলো । তারপরে সেই মোটা মতন নরম সূতোটা আমার মণিবন্ধে কি সব মন্ত্র পড়ে বাঁধতে বসলো কাকু।
ওরে বাবা। তার মানে কাকু বাদলের সংকেত শুনে আগে থেকেই একেবারে তৈরী হয়েই ছিলো। এই না হ’লে কেউ আমার মতন একটা পরী ছেলেকে আগলে মানুষ করতে পারে? মা তো বলেই দিয়েছে কাকুকে যে তোমার ছেলে তুমি সামলা ও বাবা।ও সব আমার দ্বারা হবে না। ’
আর আমি ও কাকুর ছেলেই হয়ে গেছি সেই ছোট্ট বেলা থেকেই।
কাকু বলল-‘উঃ…… কি সাংঘাতিক সব জিনিষ রে বাবা….ঘরের ভেতরে ও আপদ কম নয় দেখি……..যাক গিয়ে। এইবার আমার মালিশটা আগে শেষ তো করি তারপরে ডিনার……..রাত বারোটা বাজিয়ে ছাড়লো দেখছি আজকে। তা যাক। কালকে আর তোমাকে আমি স্কুলেপাঠাচ্ছি না চঞ্চল। অন্তত পক্ষে ব্যথাটা পুরোপুরি না সারা অবধি । কি জ্বালাতন রে বাবা………..উঃ……..উঃ……’
এখন এই সব কথা বললে বা আমি লিখলে কেউ বিশ্বাস তো করবেই না উল্টে লোকে আমাদেরই পাগল বলবে ঠিক। তা বলুক গিয়ে। কি আর করা?
তাদের তো আর মাথায় কিছু এসে আছড়ে পড়ছে না আমার মতন আর শুকনো ছাদে আছাড় ও খেতে হচ্ছে না। যার ঘাড়ে পড়ে সেই বোঝে…… আর তখন সে বাপ রে বাপ …..বলে মানতে ও বাধ্য হয়। বাদল একটা জিনিয়াস ছেলে বলেই ঠিক কিছু সন্দেহ সে করেছিল আর তাই যাবার আগে সাবধান ও করে দিয়ে গেছিল কাকুকে। কাকু ও তো কিছু কম যায় না দেখি। সত্যি বাপু তাই হয়তো লোকে বলে যে জিনিয়াসদের দুনিয়া হয় আলাদা।
আমার কাকু যে কখন তৈরী হ’লো কে জানে বাবা তবে আমি তো ছাই এতো শতো কিছুটি সন্দেহ অবধি করিনি বুঝে ওঠা তো দূরের কথা। রতনে রতন চেনে।

আর আমার কাকু যা চাপা ছেলে না একটা। মুখে কিছুটি বলে না তবে কাজে করে ফেলে সব ঠিকই। ভূত প্রেত অপরাধী যেই হোক, তাদের চেয়ে খুব বেশী চটপটে আর জিনিয়াস না হ’লে তাদের হাতে রহস্যভেদির পরাজয় তো হবেই।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন