বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৬ এপ্রিল ২০১৯
গল্প/কবিতা: ২৩টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৭

বিচারক স্কোরঃ ২.৬৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.০২ / ৩.০

নষ্ট মানুষ

ঘৃনা আগস্ট ২০১৫

রমাকান্ত নামা--স্মৃতির প্রশাখা

কোমলতা জুলাই ২০১৫

স্মৃতি সততই দুখের

ব্যথা জানুয়ারী ২০১৫

ভালবাসি তোমায় (ফেব্রুয়ারী ২০১৪)

মোট ভোট ৩৭ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৭ মুনার ও এলাচ বাগানের মেয়েটি

তাপসকিরণ রায়
comment ২২  favorite ০  import_contacts ৮৩২
না,দেখতে তেমন ভাল নয়,শ্যাম বর্ণা,ছিমছাম চেহারা,উষ্কখুষ্ক চুল, কোথাও কোথাও মনে হয় জট বেঁধেও আছে। গাল তেমন মসৃণ নয়,রুটির গায়ের মত অনেকটা খসখসে। আজীবন ঠাণ্ডায় বসবাসের আর অবাধ ঘোরা ফেরার কারণে এমনটা ঘটে থাকতে পারে। তবে সেই মিষ্টি হাসি ? সেই অনাবিল দেহ ভঙ্গিমার আদল তার মধ্যে আলাদা একটা রূপ এনে দিয়েছিল। প্রকৃতির সহজাত পাওনাটুকু তার মাখা ছিল শরীরে। কতইবা তার বয়স হবে—বার,কি তের !
তার ভাষা আমার জানা ছিল না। বলা বাহুল্য,আমার ভাষা তার জানার কোন প্রশ্নই ওঠে না। এমন কি হিন্দির লেশমাত্র তার জানা ছিল না। তবু ভাল লেগেছে তাকে--তার চলা ফেরা,ভাব ভঙ্গিমা, তার খোলা হাসি,তার নীরব আপ্যায়ন।
কেরল প্রদেশের মুনার। বড় মনোরম জাগা--বহু উঁচুতে পাহাড়ের গায়ে বসে আছে এ মুনার। ছোট জাগা--পরিধি বেশী নয়,দূর দূরান্তের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দশ-বিশটা গ্রামের সীমারেখা যেমনটা হয়। এখানকার পাহাড় পর্বত এবং তার মাঝের সমতল ভূমি জঙ্গল বিস্তৃত। কিছু কিছু পাহাড়ের গায়ে টাটা কোম্পানির চায়ের প্ল্যানটেশন। এখানে দেখার মত চিড়িয়া ঘর,পশুপাখি নিবাস,কিছু মন্দির,ফুল বাগিচা,পথ চলতে চলতে দেখতে পাবার মত ছোট বড় ঝর্ণা,রংবেরঙের বনজ ফুলের সমারোহ ছড়িয়ে আছে পাহাড়-পর্বতের গায়ে--পথে ঘাটে মাঠে। মেঘে ঢাকা পাহাড়,পাহাড়-পর্বতের শীর্ষ দেশে চকচকে বরফের আস্তরণ—সূর্যোদয় সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্য—এ খানকার নয়নাভিরাম দৃশ্যাবলী।
এলাচি গাছ আগে কখনো দেখিনি--পাহাড়ের গায়ে গায়ে গজিয়ে ওঠা যে গাছটিকে এখানে অহরহ দেখা যায় সেটা হল এলাচ গাছ। ছোট ছোট নারকেলের চারার মত হাত দেড় দুই লম্বমান--দেখতেও বেশ সুন্দর--শোভনীয়।
এমনি এক এলাচ বাগান ঘেরা পাহাড়ের কোলে মেয়েটির বাস। নাম তার টুনাই। ওদের কুড়ে ঘর,নারকেল পাতার ছাউনির। টুনাই থাকে,আর ওর মা,বাবা। ওদের ঘরের পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে বড় ঝর্ণা—আমরা এটাই দেখতে গিয়ে ছিলাম। আমাদের মত কিছু কিছু ভ্রমণ রসিকরা এখানে এসে পড়েন। জাগাটার এক দিকে উঁচু পাহাড়ে অসংখ্য এলাচ গাছের প্রাকৃতিক শোভা। তারপর শুরু ঝর্ণা--আর তার কিছুটা দূর থেকেই শুরু হয়েছে পর পর অনেকগুলি চা বাগিচা। এমনিতেই চা বাগিচাগুলি দেখলে মনে হয় বেশ সুন্দর--সাজানো গোছানো ।
--তুমহারা নাম ক্যায়া হায় ?
বুঝতে পারেনি টুনাই--আমার আরও দু একবার এই একই প্রশ্ন তুলে ধরতে হয়ে ছিল তার সামনে,নাম ক্যায়া হায় ?
--নাম ? শব্দটা তার চেনা চেনা লাগছিল হবে। সে বেশ কিছু সময় নীরব থেকে বলেছিল,টুনটাই--এমনি ধরনের কিছু একটা ! কি বলেছিল--শব্দটা ধরতে পারিনি ঠিকমত--আমি বলে ছিলাম,টুনাই ?
ও অবাক হয়ে শুনেছিল,খিলখিল করে হেসে ছিল,অবশেষে ও নামটাই মেনে নিয়ে হবে,মাথা নুইয়ে সায় দিয়েছিল,হ্যাঁ।
জানতাম,নামটা আমি সঠিক উচ্চারণ করিনি। কিন্তু নাম দিয়ে কি হবে ?
প্রকৃতি এখানে খেলে বেড়িয়েছে। বড় বড় গাছেদের মাঝখানে ছোটছোট গাছেদের মেলা। কত না রংবেরঙের ফুল ফুটে আছে পাহাড় পর্বতের গা জুড়ে। পাহাড় পর্বতের গা বেয়ে ছোট বড় ঝর্ণার টুং টাং রণন ধ্বনি মনে মন্দ-মৃদুল ভাব নিয়ে আসে। যেন মৃদঙ্গ বেজে চলেছে--যেন ঝর ঝর বৃষ্টি পতনের ছন্দিত নামতা পাঠ হয়ে চলেছে !
...আজি ঝর ঝর বাদল দিনে...মনে পড়ছিল এমনি ধরণের কোন গান যেন কোথাও আমি শুনেছি। বেরসিক আমি,কখনো গানের কলি ঠিকঠাক মনে করে রাখতে পারি না !
মুনার আকর্ষণীয় একটি নাম। মুন,মানে চন্দ্রমা,চাঁদ,তবে কি এ শব্দ থেকেই এ জাগার নাম মুনার ? অথবা কে জানে কোন ভাষার ভাঙা শব্দ টুকরো থেকে এর সৃষ্টি ? সে যাই হোক না কেন--সুন্দর নাম--মনের গভীরতায় ভাবনার উদয় হবার মত নাম।
পাথরের ছোট ছোট টুকরো--তার একটাতে বসে গরম চা খাচ্ছিলাম। ছোট এক চালার তলে টুনাইদের চায়ের দোকান। ওর মা চা বানিয়ে দেয়। দু এক রকমের বিস্কুটও সাজানো দুটো কাঁচের বয়ামে। চায়ে চুমুক দিয়েই বুঝতে পারলাম--এলাইচি চা--এলাচির গুড়ো পড়েছে চায়ে।
চায়ের মেজাজ নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। দেখি বিকেলের পড়ন্ত রোদে দাঁড়িয়ে আছে টুনাই,সদা হাস্যময়ী মুখ,আমায় দেখা মাত্র হাসল। আমিও হাসলাম।
একটা অতি সাধারণ মেয়ে। তবু তার মিষ্টি হাসি--তার আয়ত চোখের তাকানো--সব মিলিয়ে আমি যেন চিরন্তন এক নারীকে খুঁজে ফিরছিলাম। ওকে নিজের অজান্তেই ডেকে উঠলাম,টুনাই !
ও আবার তাকাল আমার চোখের দিকে--মিষ্টি হাসল আর,এঁ, উত্তর দিয়ে লজ্জায় মুখ আড়াল করার চেষ্টা করল।
প্রকৃতি এখানে যেন বড় সজাগ--বন জঙ্গল পাহাড় পর্বতের মাঝখান দিয়ে আকাশ প্রবেশ করে গেছে। নীলাকাশ,পেঁজা তুলোর মেঘ। বৈকালিক পাখীদের ঘরে ফেরার দৃশ্য,সব কিছু বড় মনোরম লাগছিল।
--তুম কা শর...
পাশ ফিরে তাকালাম। টুনাই আমার পাশটিতে এসে দাঁড়িয়েছে। বড় কৌতূহলী হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মনে হল সে কিছু বলল, আমি কোথা থেকে আসছি বা আমার নাম ? এমনি কিছু কি জিজ্ঞেস করল ?
আমি আন্দাজ করে বললাম,বহুত দূর--মধ্য প্রদেশ...জবলপুর ...টুনাই কি বুঝল কে জানে ! তবে ওকে দেখে মনে হচ্ছিল, মুহূর্তে সে আনমনা হয়ে গেল--অনেক দূরের ভাবনায় চলে গেল !
ফিরতে হবে আমাদের। চা বাগানের পাশ দিয়ে গলিয়ারি ধরে আমরা পাহাড়ের অনেক নীচে এসে ঝর্ণা দেখতে নেমেছিলাম। এই ঝর্ণার পারেই টুনাইদের ঘর। ওদের ঘরের মত আরও দু তিনটে ঘর দেখলাম আশপাশে।
চারদিক অন্ধকার হয়ে যাচ্ছিল। সূর্যদেব বনের আড়াল হয়েছেন। আমাদের দু চারটে কথা আর ঝর্ণার অনবরত রব অসীম নির্জনতাকে মুখরিত করেছে। টুনাইদের নারকেল পাতার ছাউনি ঘরে টিমটিম আলো জ্বলছে। ফিরে যাবার আগে ওদের দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালাম। অবচেতন মন হয়তো ওকে এক পলক দেখার ইচ্ছেতে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু টুনাই ঘরের আড়ালে হবে। আর দশটা মানুষের মতই হয়তো টুনাই আমায় দেখেছে--আলাদা ভাবে আমার মাঝে ও হয় তো কিছুই খুঁজে পায় নি !
আমি নীরবে ফিরে যাচ্ছিলাম। ঝর্ণা পার করে এবার চা বাগানের ধার ঘেঁষে গলিয়ারী পথে পাহাড় ভেঙে আমাদের ওপরে উঠে যেতে হবে। পাহাড়ের পথের বাঁকে হঠাৎ একটা ছায়া আমার পাশটাতেই নড়েচড়ে উঠলো। কে হবে এখানে ? দু পা এগোতেই দেখি অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে টুনাই ! তার ছায়ামূর্তি আদল স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিলাম।
আমার মুখ থেকে কখন যেন বেরিয়ে এলো,টুনাই !
টুনাই কি সঙ্গে সঙ্গে আমার চোখের দিকে তাকাল ? নিশ্চয়ই তাকিয়ে থাকবে--ও জানে এ নাম আমার দেওয়া।
মুহূর্তের জন্যে থমকে গিয়েছিলাম,মনে হচ্ছিল,ওর মাথায় একটু হাত রাখি--ইচ্ছে হচ্ছিল ওর হাতটা তুলে নিই আমার হাতে।
কিন্তু কিছুই করা হল না। এখন যে অন্ধকার ছাড়া আমার চোখের সামনে আর কোন রূপই ফুটে উঠছে না ! তবু মনের ভেতর কাল্পনিক ফুল ফুটে উঠছিল। অমায়িক মায়াবিনী এক নারী মূর্তির ছবি ক্রমশ অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছিল।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন