বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫
গল্প/কবিতা: ৫৩টি

সমন্বিত স্কোর

৬.০১

বিচারক স্কোরঃ ৩.৬১ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৪ / ৩.০

কোথায় পাব তারে

প্রেম ফেব্রুয়ারী ২০১৭

সূতোর প’রে যে জীবন

আমার আমি অক্টোবর ২০১৬

ভালোবাসার অন্তরালে

ঘৃণা সেপ্টেম্বর ২০১৬

অন্ধকার (জুন ২০১৩)

মোট ভোট ৪০ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৬.০১ গভীর গোপন!

রীতা রায় মিঠু
comment ২৭  favorite ১  import_contacts ১,৫৭২
এক

বেশ অনেকক্ষণ হয়ে গেল, অক্সিজেন সিলিন্ডারটির দিকে তাকিয়ে আছে মুনিয়া। সিলিন্ডারের বুদবুদ গুনছে, হিসেব কষছে, আর কতক্ষণ আম্মিকে আটকে রাখা যাবে! আগের চেয়ে অনেক ধীর হয়ে এসেছে আম্মির বুকের উঠা-নামার গতি। ডাক্তার বলেছে, অক্সিজেন সিলিন্ডারের দিকে খেয়াল রাখতে, বুদবুদের পরিমান কমে আসার সাথে সাথে আম্মির জীবন প্রদীপের সলতেটাও ক্ষীন হতে থাকবে, একসময় দপ করে নিভে যাবে মাহেলা বেগমের ৭০ বছরের পুরানো জীবন প্রদীপ।। মুনিয়া লক্ষ্য করে, আম্মি এখন অনেকটা সময় গ্যাপ দিয়ে নিশ্বাস ফেলছে। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে, গভীর অচেতনে আছে জেনেও মায়ের সাথে কয়েকটি কথা বলতে চাইছে মুনিয়া, ঘরটা ফাঁকা হওয়ার অপেক্ষায় আছে। খুব বেশী কিছু বলার নেই, কয়েকটি কথা, যা সারাজীবন আম্মি তাঁর আদরের কন্যাটিকে শোনাতে চেয়েছিল, অথচ কন্যা তা এড়িয়ে গেছে, সেই বিষয়েই কথা বলবে। মেয়ের উপর নাকি মায়ের অনেক অভিমান হয়েছে, ছোট ফুপিকে বলেছে,
“মুনিয়াকে কিছু কথা বলতে চেয়েছিলাম, সময় থাকতে ও শুনতে চাইলো না, তোমার সাথে তো ওর খুব খাতির, তোমার কাছেই বলে যাব কয়েকটি কথা, আমার মৃত্যুর পর ওকে জানাবে”।
গতকাল ফুপি মুনিয়াকে এই কথাগুলো বলেছে। ভয়ে ভয়ে মুনিয়া ফুপির কাছে জানতে চেয়েছে, আম্মি কী বলেছে! ফুপি বলেছে, শেষ পর্যন্ত আম্মি নাকি আর কিছু বলেননি। এটা শুনেই মুনিয়ার ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়েছে, আম্মিকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করেছে। মুনিয়া জানে, আম্মি কী বলতে চেয়েছিল! ভাগ্যিস ফুপিকে কথাগুলো বলেনি, মুনিয়া চায় না, মনের গহীনে জমে থাকা কষ্টগুলো আর কেউ জেনে ফেলুক। পৃথিবীতে শান্তিতে বেঁচে থাকতে গেলে কিছু কষ্ট গোপন রাখতে হয়, একেবারে অন্ধ কুঠুরীতে তালাবন্ধ করে রাখার মত করে রাখতে হয়, কক্ষনও দিনের আলোতে বের করতে নেই। অশান্তি বাড়ে, সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। অনেক ঠেকে মুনিয়া এগুলো শিখেছে। ওরও তো কত ‘গোপন’ আছে, ও তো চাইলেই সেগুলো প্রকাশ্য আলোয় নিয়ে আসতে পারে, কিন্তু ও তা করে না। আম্মির মত খুব চাপা স্বভাবের হয়েছে ও, কিছু কিছু গোপনকে মনের সিন্দুকে তালা দিয়ে রেখেছে!

মরে গেলে মানুষ কোথায় যায় কেউ জানেনা, তাই কিছু পালক রেখে যেতে চায় প্রিয়জনের কাছে, আম্মিও তার কয়েকটি পালক, যা অতি গোপন সিন্দুকে রেখেছিলেন, ওগুলোই মুনিয়াকে দিতে চেয়েছিলেন। মেয়ে আসবে অপেক্ষায় ছিলেন, মেয়ে সময়মত আসেনি বলেই অভিমান করে ছোট ননদের কাছে সব বলে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা করেননি, গোপন সম্পদ মনের সিন্দুকে রেখেই কবরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন! ‘কবর’ শব্দটির প্রতি মাহেলার অনেক ভয় ছিল। সব সময় বলতো, “মৃত্যুর পরে কী আছে জানিনা, তবে কবরে যেতে হবে ভাবলেই ভয় করে। কেমন একা একা মাটির নীচে থাকতে হবে, দম বন্ধ হয়ে আসবে”! মুনিয়া হাসতে হাসতে বলেছিল, “দম তো কবরে ঢোকার আগেই বন্ধ হয়ে যাবে আম্মি, নাহলে কবরে যাবেই বা কেন!” আম্মিও হেসে ফেলতো। মানুষটা একা থাকতে ভয় পেত, অন্ধকার ভয় পেত, কারেন্ট চলে গেলে মুনিয়াকে ডাকতো তাড়াতাড়ি করে মোমবাতি জ্বালিয়ে দেয়ার জন্য। সেই মানুষটি আর কয়েক ঘন্টার মধ্যেই মাটির নীচের অন্ধকার গহবরে ঢুকবে! ভাবতেই কেমন লাগছে!

মুনিয়ার এখন খুব তাড়া, ওর কেবলই মনে হচ্ছে, আম্মিকে এভাবে যেতে দেয়া ঠিক না, যাওয়ার আগে আম্মিকে জেনে যেতেই হবে, তার ‘গোপন’ কষ্টগুলো, না-বলা কথাগুলো আদরের মুনিয়াপাখীর অজানা নয়, মুনিয়াপাখী সব জানে, এতদিন আম্মিকে তা বুঝতে দেয়নি। মায়ের কষ্টগুলো তো শুধুই কষ্ট ছিল না, ওগুলো ছিল একরাশ অপমান, বুকের পাঁজরে জমে থাকা নিরেট অন্ধকার! এমন অপমানের কথা মায়ের মুখ থেকে শুনতে চায়নি বলেই মুনিয়া আম্মিকে এড়িয়ে যেতো।



আজ সকাল থেকে মুনিয়া আম্মির পাশে ঠায় বসে আছে, এক মুহূর্তর জন্যও টুল ছেড়ে উঠে কোথাও যায়নি, দু’বার শুধু বাথরুমে যেতে হয়েছিল। আম্মির অনেক আদরের পাখী ছিল সে, আদর করে প্রায়ই আম্মি ওকে ‘মুনিয়া পাখী’ ডাকতো। আর কিছুক্ষণ পরেই ‘মা পাখী’টা খাঁচা খুলে উড়ে যাবে, ‘কন্যা পাখী’ থেকে যাবে খাঁচার ভেতর, হ্যাঁ, খাঁচাই তো, মুনিয়া তো খাঁচার মধ্যেই আছে, আম্মি কী জানে, তার আদরের পোষা মুনিয়া কোন নরক যন্ত্রণার ভেতর দিন কাটাচ্ছে! আম্মি কী জানে কত কষ্ট করে, কত অপমান সয়ে মুনিয়া দিন কাটায়, আম্মি কী জানে কত গোপন ব্যথা জমে আছে তার ছোট্ট মুনিয়ার বুকে। কে জানে, হয়তো আম্মি ঠিকই বুঝতে পেরেছে মুনিয়ার গোপন ব্যথার কথা, ঐজন্যই হয়তো বা শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেছে, বলবে বলবে করেও ফুপির কাছে কিছু বলেনি, তার মুনিয়াপাখীর জীবনে ্নতুন করে কালো ছায়া ফেলতে চায় নি।
মুনিয়া জানে, আম্মির যা কিছু বলার ছিল, তা ওর আব্বুর বিরূদ্ধে। কিন্তু সমস্যা হলো, আব্বুকে মুনিয়া অনেক বেশী ভালোবাসে। এই পৃথিবীতে মুনিয়া ছাড়া আব্বুর আর কেউ নেই! আব্বুর সাথে কারোরই সু-সম্পর্ক গড়ে উঠেনি। কারণও আছে, যৌবনে আব্বু খুব রাগী ছিলেন, রাগটা ছিল পাগলা ধরনের, হাতের সামনে যা পাবেন, যাকে পাবেন, তার উপর দিয়েই রাগের ঝাল মেটাবেন, এমন বাজে ধরণের রাগ ছিল। বেশীর ভাগ সময় হাতের কাছে ‘আম্মি’কে পেতেন, ঝাল আম্মির উপর দিয়েই ঝাড়তেন। অবশ্য কিছুক্ষণের জন্য, রাগ পড়ে গেলেই আব্বু অন্যরকম হয়ে যেতেন। এখনতো আব্বু মাটির মানুষ হয়ে গেছে, কারো সাথেই আর রাগ করেন না, কিন্তু কারো সাথে আর নতুন করে সু-সম্পর্ক তৈরী হয় নি।



এই মুহূর্তে এই রুমে আব্বু ছাড়া আর কেউ নেই। তোতাই কিছুটা সময়ের জন্য বাইরে বের হয়েছে, হয়তো দীঘির পাড়ের বেঞ্চিতে বসে আম্মির জন্য একা একা কিছুক্ষণ কাঁদবে, আম্মির কোলপোঁছা ছেলে, খুব চাপা স্বভাবের, নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা করেনি, বৃদ্ধ বাবা-মাকে সাথে নিয়ে কাটিয়ে দিল যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময়, স্কলারশীপ পেয়েও আমেরিকা গেলো না, মায়ের আঁচলের তলায় থেকেছে। আম্মি আদরের তোতাইকে ছেড়ে, একমাত্র কন্যা মুনিয়াকে ছেড়ে, কলিজার টুকরা বাবলুকে ছেড়ে চিরতরে চলে যাচ্ছে, কোথায় কোন সুদূরে, ওখানে কী আরও বেশী আলো আছে নাকি গভীর অন্ধকার, কেউ জানেনা! ভাইয়াকে দেখতে চেয়েছিল, একনজরের দেখা যাকে বলে! সেটাও হলো না, ভাইয়ার কাজ থেকে ছুটি মিলেনি! ভাইয়া যে রাতে ফোন করে আম্মিকে জানালো তার ছুটি না পাওয়ার কথা, তার পরের রাতেই আম্মিকে ক্লিনিকে নিয়ে আসা হয়েছে।

সিভিয়ার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট, ডাক্তাররা অনেক চেষ্টা করেছেন, কিন্তু মাহেলা বেগমের শরীর বিদ্রোহ করেছে। একই সময় কয়েকটি অর্গ্যান অকেজো হয়ে পড়েছে। মাহেলা বেগমের কিডনী পুরোপুরি ফেল করেছে, হার্ট খুবই দূর্বল, তার চেয়েও বড় কথা, মাহেলা মুনিয়া এবং বাবলুর মুখ না দেখেই কোমায় চলে গেছে! গত সাতদিন মাহেলাকে ‘লাইফ সাপোর্টে’ রাখা হয়েছিল, যদি জ্ঞান ফিরে আসে, সেই আশায়। না, মাহেলা বেগমের জ্ঞান ফিরে আসেনি, এরমধ্যেই পর পর দু’বার স্ট্রোক করেছে, ইন্টারন্যাল ব্রেন হেমোরেজ হয়েছে, মিরাকল কিছু না ঘটলে মাহেলা বেগমের জ্ঞান ফিরে আসার কোন সম্ভাবনা দেখতে পান নি ডাক্তার। মাহেলা বেগমের পরিবার থেকেও জানানো হয়েছে, উনাকে শান্তিতে চলে যেতে দেয়া হোক। মুনিয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল সবাই, গত পরশু মুনিয়া রাজশাহী থেকে একাই চলে এসেছে।

কেমন একটা ঘোরের মধ্যে আছে মেয়েটা, তিনদিন হয়ে গেলো, মায়ের বেডের পাশে বসে বসে নীরবে কেঁদে চলেছে। ছোট ভাই তোতাইকে জিজ্ঞেস করে জানতে পেরেছে, পুরোপুরি অচেতন হয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে আম্মি অস্পষ্ট স্বরে বলতে পেরেছে,
“আমার মুনিয়াপাখীটা, আমার বাবলুসোনা, আমার তোতাই”----ব্যস! এই ছিল শেষ কথা!




মুনিয়া ওর মায়ের অসুস্থতার সংবাদ পেয়েছে বেশ কিছুদিন আগে, কিন্তু সংসারের বেড়াজাল কেটে সময়মত বের হয়ে আসতে পারেনি। দজ্জাল শাশুড়ি আটকায়, স্বামী আটকায়, ওরা ভেবেছে মুনিয়াকে বুঝি মায়ের মিথ্যে অসুখের সংবাদ দিয়ে আব্বু ডেকে পাঠিয়েছে। কত ঝগড়া, কত কথা কাটাকাটি হয়েছে কয়েকটা দিন। শেষে মুনিয়া ওর স্বামী জুয়েলকে বলেই ফেলেছে,
“আমার আম্মি যদি মরে যায়, এরপরের দিনই তুমি আমার মরা মুখ দেখবে। যা বললাম, নোট করে রাখো। জেলের ভাত খাওয়ার জন্য রেডী থাকো, মা-বেটা মিলে যা করেছো গত পনেরো বছর ধরে, খুব সংক্ষেপে লিখলেও একটা ছোটখাটো উপন্যাস হয়ে যাবে। তোমাদের চরিত্রের এই কৃষ্ণকালো দিকটি আমার বন্ধু রূপাকে বলে দেবো, ও সব সময় গল্পের প্লট খুঁজে বেড়ায়, আমার জীবনের গল্প শুনলে ও আগামী ঈদ সংখ্যার জন্য একটা উপন্যাস লিখে ফেলতে পারবে। মনে রেখো, ঈদ সংখ্যা উপন্যাস, সারা দেশের মানুষ পড়বে”।

মুনিয়াকে এমন উগ্র মূর্তিতে দেখে জুয়েল কিছুটা ভড়কে গেছে। কিছুক্ষণ পরেই নাইট কোচের দুটি টিকেট কিনে নিয়ে এসে মুনিয়ার হাতে দিয়ে বলেছে,“রেডী হয়ে থেকো, রাতের বাসে রওনা হবো”। মুনিয়া টিকেট ছুঁয়েও দেখেনি, বলেছে, “আমার আম্মি তার একটা মাত্র মেয়েকে কয়েকটা দিন কাছে পেতে চেয়েছিল, সুখ-দুঃখের দুটো কথা হয়তো বলতো, তোমরা আমাকে যেতে দাওনি, এখন আম্মি কোমাতে চলে গেছে, আর কোনদিন কথা বলবে না, আমি গিয়ে শুধু তার মুখটা দেখবো, তার কথা শুনতে পাবো না! তোমরা কেন এমন করলে? আম্মি কী বুঝেনি ভেবেছো কেন তার মুনিয়াপাখী তার কাছে যেতে পারলো না! এখন তুমি ভালো মানুষ সেজে স্ত্রীকে পাশে নিয়ে শাশুড়ীর বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াবে, আম্মা, আম্মা গো বলে ভড়ং দেখিয়ে কাঁদবে, ওটা তো আমি হতে দেবো না! তোমার আম্মাও একদিন মারা যাবেন, মৃত্যুর আগে নিজের মেয়েকে কাছে পেতে চাইবেন, তখন যদি তোমার দুলাভাই তার বউকে না পাঠায়, আমি যদি বেঁচে থাকি, দেখবো তোমাদের মা-বেটার মুখের এই রোশনাই পালটে কীভাবে আষাঢ়ে মেঘ হয়ে যায়! যাক গিয়ে, আমার সাথে তুমি যাবে না, আমি একা একাই যাব। বাস স্টেশানে গিয়ে একটা টিকিট কিনে নেয়া খুব সমস্যা হওয়ার কথা না”।



দুই


গত পরশুদিন খুব সকালে মুনিয়া গাবতলী এসে পৌঁছেছে। সেখান থেকে একটা অটো নিয়ে সোজা ওর ছোট চাচার বাড়ী, ঘন্টা দুই বিশ্রাম নিয়ে ক্লিনিকে চলে আসে। সেই থেকে আম্মির পাশে বসা। আত্মীয় স্বজন, পাড়া–পড়শীতে ভীড় হয়েছিল এই দুটি দিন। কাউকে তো আসতে বারণ করা যায় না, সবাই আম্মিকে ভালোবাসে, তাই ছুটে ছুটে আসে মানুষটাকে শেষবারের মত দেখতে।
আরোগ্য নিকেতন নামের মোটামুটি দামী ক্লিনিকের দোতলার একটি কেবিনে রাখা হয়েছে মাহেলা বেগমকে। মাহেলা বেগমের স্বামী, আশরাফউদ্দিন সাহেব, গত আটটি দিন ধরে স্ত্রীর কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করছেন। আইসিইউতে কাউকেই প্রবেশ করতে দেয়া হয় না, তিনি আইসিইউ’র বারান্দায় বসে থেকেছেন, খাওয়া দাওয়া ঠিকমত হয়নি, ঘুম ঠিকমত হয়নি, মুনিয়া লক্ষ্য করেছে, কয়দিনেই আব্বুর চেহারা নষ্ট হয়ে গেছে। মুখটার দিকে তাকানো যায় না, কেমন অসহায় দুটি চোখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকেন।







নাহ! আর দেরী করা ঠিক হচ্ছে না, আব্বুর কাছে এগিয়ে গিয়ে মুনিয়া বললো, “আব্বু, তুমি কী আমাকে দশটা মিনিট আম্মির সাথে একা থাকতে দিবে? আম্মির সাথে কয়েকটা কথা সেরে নিতে চাই”।

মেয়ের এমন উদ্ভট কথা শুনে আশরাফ সাহেব একটু চমকে গেলেন, বললেন, “কাঁর সাথে কথা বলবি, তোর আম্মা তো এই দুনিয়াতে নেই, দেহটা পড়ে আছে, পাখী খাঁচা খুলে উড়ে গেছে সেই কবেই। আমি কত ডাকলাম, চোখের পাতাটাও কাঁপায়নি। পঞ্চাশটা বছর একসাথে কাটালাম, আমার গলার স্বর চিনতেই পারলো না”।

মুনিয়া বলে, ‘আব্বু, তুমি কী বুঝতে পারছো যে আম্মি আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে?”

-তোর কী তাই মনে হয়? মাহেলা আমার চেয়ে বারো বছরের ছোট, ওর তো আমার আগে যাওয়ার কথা নয়। ও কোথায় যাবে আমাকে ফেলে? আমার সাথে কথা না বলে ও চলে যাবে? আমার কাছ থেকে বিদায় নেবে না?

-মুনিয়ার বুকটা মুচড়ে উঠে। আব্বুকে ও খুব ভালোবাসে, আব্বুর মত এত ভাল মানুষ খুব কম দেখা যায়। একটাই দোষ, আব্বুর অনেক রাগ, মেজাজ খারাপ হলে হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। আম্মির উপর কত রাগারাগি করেছে, সে সকল অতীত কী মনে পড়ে যাচ্ছে এই বুড়ো মানুষটির! মনে মনে কী ক্ষয়ে যাচ্ছে আব্বু! মুনিয়া পরশুদিন এসেই ছোট চাচীর কাছে শুনেছে, আব্বু নাকি ডাক্তারদের কাছে অনেক অনুনয়-বিনয় করেছে, আম্মির সাথে একটু কথা বলতে চেয়ে। ডাক্তাররা বলেছে, রুগী কথা বলার অবস্থায় নেই। আপনজন দেখলে রুগী অস্থির হয়ে পড়বে, কান্নাকাটি করবে, হিতে বিপরীত হতে পারে! সেই থেকে আব্বু আইসিইউ’র বারান্দায় বসে আছে। চাচা নাকি অনেকবার বলেছে, বাসায় গিয়ে একটু বিশ্রাম নেয়ার কথা। আব্বু যায়নি, বলেছে, “মাহেলাকে একা রেখে যাই কীভাবে? ও তো একা থাকতে ভয় পায়। আমি তো এখানে ভালই আছি, তবুও তো ওর কাছাকাছি আছি।



মুনিয়া আবার বলে, -আব্বু, তোমার কী মনে হয় যে আম্মির কাছে আমাদের সকলের মাফ চাওয়া উচিত! আমার মাফ চাওয়া উচিত, তোমার মাফ চাওয়া উচিত! তোতাইয়ের মাফ চাওয়া উচিত! ভাইয়া তো আসতে পারলো না, ভাইয়ার হয়ে আমি মাফ চাইতে পারি। আমরা এতকাল আম্মির উপর অনেক জুলুম করেছি, আব্বু, আম্মি চলে যাচ্ছে! কোথায় যাচ্ছে আম্মি, কোন সুদূরে যাচ্ছে! আমি সইতে পারছি না, আম্মির সাথে শেষবারের মত কোন কথা হলো না। আব্বু গো, আম্মি চলে যাচ্ছে, আমরা কেউ আম্মিকে ধরে রাখতে পারলাম না!

-মা রে! এখনই ওভাবে কাঁদিস না, মানুষটা এখনও আমাদের মাঝে আছে, হয়তো তোর কান্না শুনতে পাচ্ছে, শুধু চোখ দুটো খুলতে পারছে না বলে তোকে কাছে ডাকতে পারছে না। মুনিয়া, তোর আম্মির কাছে মাফ চাইতে বলতেছিস? অনেক কষ্ট দিয়েছি তোর আম্মিকে, তাইনা? ঠিক আছে, মাফ চাইবো, কিন্তু সে কী আমার আকুতি শুনবে?

-আব্বু, আমি কোন একটা বইয়ে পড়েছিলাম, খুব মনপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করলে নাকি আত্মার সাথে আত্মার যোগসূত্র তৈরী হয়, আমরা তো জীবনের অনেক কিছুই জানিনা, কত রহস্য আমাদের চারপাশে, সেইজন্য বলেছি, চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কী! তাছাড়া তুমি তো আম্মির কাছে মাফ চাওয়ার জন্যই আটটা দিন ধরে ক্লিনিকে বসে আছো।





মেয়ের কাছে ধরা পড়ে গিয়ে এতটুকু বিব্রত হলেন না আশরাফ সাহেব। মুনিয়ার কথায় বিব্রত হওয়ার কিছু নেই। মেয়েটাই একমাত্র উনাকে কিছুটা হলেও বুঝতে পারে। আশরাফ সাহেব জানেন, মুনিয়া তার আব্বুর পক্ষ নিয়ে আম্মির সাথে কত ঝগড়া করেছে। মাহেলার আদরের টুকরা মেয়ে! আর সাতটা দিন আগে এলেই মা’কে হয়তো জ্ঞানে পেতো। মেয়েটা বোধ হয় খুব একটা ভাল নেই। জামাই বাবাজীকে বাইরে থেকে তো ভালই মনে হয়, তারপরেও মেয়েটাকে এতদিন পাঠালো না কেন? মানুষের চরিত্র, কত কিছু অজানা অন্ধকারে ঢাকা পড়ে থাকে, ঢাকনা খুললে আসল রূপ দেখা যায়। মেয়েটা তার মায়ের স্বভাব পেয়েছে, খুব চাপা। স্বামী-শাশুড়ীর বিরুদ্ধে কোন নালিশ করেনা, কিন্তু আশরাফ সাহেবের কাছে সব খবর আসে। মেয়েটা শশুরবাড়ীতে খুব একটা ভাল নেই। নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছে, কাউকে দায়ী করতে পারবে না। উনার মত ছিল না এই বিয়েতে, কিন্তু মায়ের কাছ থেকে সমর্থণ পেয়েছে, মাহেলা বলেছে, “আমার বিয়ে হয়েছে বাবা মায়ের পছন্দে, আমার মতামত নেয়া হয়নি, সারাজীবন এর কাফফারা দিয়ে গেলাম! আমার মেয়ের বিয়ে হোক ওর নিজের পছন্দে। এমনও হতে পারে, মেয়ের কপাল মায়ের চেয়ে শতগুণে ভাল। মনের মত স্বামী-সংসার পেয়ে আমার মেয়ে রাজরাণী হয়ে থাকবে”।
স্ত্রীর কথাগুলো আশরাফ সাহেবের বুকে শেলের মত বিঁধেছিল। উনি জানেন, মাহেলা বেগম তার সংসারে অনেক খেটেছে, কিন্তু মনে সুখ ছিল না। শেষের দিকে মাহেলা উঠতে বসতে উনাকে খোঁটা দিতেন। উনি যৌবনে স্ত্রীর উপর অনেক খবরদারী করেছেন, মাঝে মধ্যে দুই একটা চড়-চাপরও দিয়েছেন, কিন্তু মাহেলাকে তিনি প্রাণের চেয়েও বেশী ভালোবাসতেন। মাহেলা হয়তো তা বুঝে উঠতে পারেননি। মেয়ে বিয়ের ব্যাপারে স্ত্রীর মুখে অমন কথা শুনে তিনি আর কিছু বলেন নি। আজ মনে হচ্ছে, উনাদের কৃতকর্মের ফল মুনিয়া ভুগছে, উনি শুনেছেন, মুনিয়ার স্বামী আর শাশুড়ী মিলে মুনিয়ার উপর অনেক অত্যাচার করে।

মেয়েটা সেই সকাল থেকে মায়ের জন্য আকুলি-বিকুলি করছে, সহ্য করা যাচ্ছে না।
আশরাফ সাহেব মুনিয়ার কাছে গিয়ে বললেন, “তুই ঠিকই বলেছিস, আয় আমরা সবাই মিলে এই অনন্তলোকের যাত্রীনিকে শুভ বিদায় জানাই। উনার সাথে যা কিছু অন্যায় করেছি, তার জন্য ক্ষমা চাই, বলেই আশরাফ সাহেব মাথা নীচু করে মাহেলা বেগমের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কিছু বললেন।

আশরাফ সাহেব স্ত্রীর মাথায় কিছুক্ষণ হাতটা দিয়ে রাখলেন, মুনিয়া খেয়াল করলো, আব্বুর মুখের চামড়া কাঁপছে, আব্বু কান্না সামলাতে চেষ্টা করছেন। মিনিটখানেক অপেক্ষা করে মুনিয়া বললো,

“আব্বু, দেখো, অক্সিজেন সিলিন্ডারে বুদবুদ কমে যাচ্ছে, আম্মির সাথে আমাকে কথা বলতেই হবে, আম্মি শুনুক অথবা নাই শুনুক, আমার মনের শান্তির জন্য হলেও আমি আম্মির সাথে কথা বলতে চাই। ধীরে হলেও এখনও তো শ্বাস পড়ছে, কানের কাছে মুখ নিয়ে বলবো, নিশ্চয়ই মাথায় পৌঁছে যাবে কথা। তুমি দশটা মিনিটের জন্য আমাকে একা ছেড়ে যাও, প্লীজ আব্বু, কাউকে ঢুকতে দিও না!

মুনিয়ার অনুরোধে ওর বাবা কেবিনের স্যুইং ডোরটা আলতো করে ঠেলে বাইরে যেতেই ঘরটা একেবারে ফাঁকা হয়ে গেলো। এই মুহূর্তে কেবিনে মুনিয়া আর মাহেলা বেগম ছাড়া আর কেউ নেই। মাহেলা বেডে চিৎ হয়ে শোয়া, মুখে অক্সিজেনের মাস্ক লাগানো, বুকটা থেকে থেকেই উঠা-নামা করছে। দুই চোখের পাতা পুরোপুরি বোজা, ক্লিনিকের দেয়া ধবধবে সাদা চাদর বুক পর্যন্ত টেনে দেয়া আছে। দেখে মনে হচ্ছে মানুষটা বুঝি গভীর ঘুমে অচেতন, শত ডাকেও জাগানো যাবে না। এমনই প্রশান্তির ছোঁয়া লেগে আছে মাস্কের বাইরের অংশটুকুতে।

আটদিন ধরে একটানা যমে মানুষে টানাটানি, শেষে মানুষ পরাজিত হলো। মাহেলা এখন শুধু অক্সিজেনের উপর বেঁচে আছে। বেঁচে আছে মানে, নিথর দেহে শুধু বুক উঠা-নামা করছে, যে কোন সময় এটাও থেমে যাবে।





তিন


মুনিয়া বাথরুমে ঢুকে চোখে মুখে খুব ভাল করে পানি ছিটোলো কিছুক্ষণ, সারাদিনের ক্লান্তি আর চোখের জল, মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। মুখটাতে কেমন একটা আঠালো তেলতেলে অনুভূতি হচ্ছিল। হ্যান্ড সোপ লিক্যুইড হাতে নিয়ে খুব করে ঘষে ফেনা তুলে অনেকক্ষণ ফেনাটার দিকে তাকিয়ে থাকলো। এই ফেনাটুকু গলে যেতে কতক্ষণ লাগতে পারে? অনেকটা ফেনা, কতক্ষণ লাগবে, দশ মিনিট, বিশ মিনিট নাকি ত্রিশ মিনিট! আম্মু কী তখনও শ্বাস ফেলবে? ডাক্তার বলেছে, লাইফ সাপোর্ট খুলে দিলে ধীরে ধীরে রুগী নিস্তেজ হয়ে যায়, মস্তিষ্কে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমান নাকি বেড়ে যেতে থাকে, তাই ব্রেনসেলগুলো ডেড হয়ে যেতে শুরু করে। ব্রেনসেলগুলো ডেড হয়ে যায় বলে রুগীর কোন অনুভূতি থাকে না, হার্ট যতক্ষন চলে, রুগীর দেহ ততক্ষণ বেঁচে থাকে। অর্থাৎ, এই যে মুনিয়া এত তোড়জোর করছে আম্মির সাথে কথা বলার জন্য, সবই নিষ্ফল হয়ে যাবে! তাই কী হয়! ডাক্তাররা কী সব জানে? উনারা কী জানে, মুনিয়াকে তার আম্মি কত ভালোবাসে! মুনিয়ার আসার অপেক্ষায়ই তো আম্মি বেঁচে ছিল। আম্মি নিশ্চয়ই মুনিয়ার কথা শুনতে পাবে!


মুনিয়া খুব আলতো করে ওর ঠান্ডা হাত মায়ের কপালে স্পর্শ করলো, ওর মনে হলো, ঠান্ডা স্পর্শ পেয়ে আম্মির চোখের পাতা খুব হালকা করে কেঁপে উঠেছে। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ওর দুই চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় পানি পড়তে শুরু করেছে। বুকে অনেক সাহস সঞ্চয় করে নরম করে ডাকলো,
-আম্মি, আম্মি, তুমি কী আমার ডাক শুনতে পাচ্ছো? আম্মি, আমার সোনা আম্মি গো, তুমি কী আমার ডাক শুনতে পাচ্ছো!

মাহেলা বেগমের অচৈতন্য দেহ একইভাবে নিথর হয়ে পড়ে আছে। বুকের উঠা-নামার গতি আগের চেয়েও শ্লথ হয়ে এসেছে। মুনিয়া পণ করেছে, আম্মির এতকালের না-বলা কথাগুলো আজকে ও শুনবে। আবার ডাকলো, আম্মি, আম্মি কথা বলো, আম্মি তুমি মনে মনে কথা বলো, আমি শুনতে পাব সব। এই রুমে তুমি আর আমি ছাড়া আর কেউ নেই, আমাদের আশেপাশে, সমগ্র বিশ্ব চরাচরে আজ কাউকে থাকতে দেই নি। আম্মি, তুমি নিঃসংকোচে বলে যাও তোমার না-বলা কথাগুলো। কোনরকম অস্পষ্টতা রেখো না, তুমি বল আমি শুনি। তুমি ছোট ফুপির কাছে নাকি বলেছো, আমার উপর তোমার অনেক অভিমান আছে, কী অভিমান নিয়ে তুমি চলে যাচ্ছো, আজ তোমাকে বলতে হবে। নাহলে আমি তোমাকে যেতে দেবো না!

আম্মি, তুমি কী আব্বুকে ক্ষমা করেছো? জানো, আব্বুটার চেহারা ভেঙ্গে চৌচিড় হয়ে গেছে। আমি তো এলাম গত পরশু দিন, তার আগে থেকে আব্বু আইসিইউ’র বারান্দায় বসা, ঠায় বসে থাকা যাকে বলে। একা একা মনে হয় কাঁদে, পুরুষ মানুষ, কারো সামনে ভাঙ্গেনা। হাতের রুমালটা ভেজা দেখেছি, আমার চোখকে ফাঁকী দেয়া অত সহজ নয়। তুমিও পারবে না আমাকে ফাঁকী দিতে।
-আম্মি, তোমার ধারণা ছিল, আমি আব্বুর পক্ষ টেনে কথা বলতাম, তোমার দুঃখ বুঝতে চাই্তাম না। কতদিন তুমি আমাকে ফোন করে বলেছিলে, আমাকে কাছে পেলে খুব গোপন কিছু কথা শোনাবে। আমি বোধ হয় তোমার গোপন কথাগুলো সম্পর্কে ধারণা করতে পেরেছি। তোমার গোপন কথা তো সব আব্বুকে ঘিরে, তাইনা আম্মি?

আচ্ছা, আব্বুর সাথে ঠিক কখন থেকে তোমার মনোমালিন্য শুরু হয়, বলোতো! আমি তো সেই ছোটবেলাতেই দেখতাম, রেগে গেলেই আব্বু তোমাকে ‘তুই’ তোকারী’ করে সম্বোধণ করতো। আব্বু যখনই বলতো, “তোরে, তোরে দ্যাখ কী করি। ইতর মহিলা কোথাকার!”
আম্মি বিশ্বাস করো, আব্বুর মুখ থেকে এমন কথা বের হতে শুনলেই আমি মনে মনে আল্লাহকে ডাকতাম, “ আল্লাহ, ও আল্লাহ, আমার আব্বুকে ভাল করে দাও, আব্বু কেন আম্মুকে বকছে?

তুমি আব্বুর সামনে বাজারের ফর্দ মেলে দিতে, আর আব্বুর মাথা গরম হয়ে যেত। শুরু হয়ে যেত বকাবকি। আরেকদিন তো নিজের চোখে দেখলাম, কী নিয়ে যেন আব্বু তোতাই কে বকছিল, কানে ধরে বারান্দায় উঠ-বোস করাচ্ছিল। হাতে ধরা স্পঞ্জের স্যান্ডেল দিয়ে বোধ হয় দুই এক ঘা দিয়েওছিল। তোমার কাছে খুব খারাপ লেগেছে বাইরের মানুষকে দেখিয়ে আব্বুর ছেলে শাসন করার ব্যাপারটা। তুমি কিছু একটা বলে উঠেছিলে, কী বলেছিলে, আমার মনে পড়ছে না, কিন্তু স্পষ্ট মনে আছে, তোমার কথা শুনে রেগে গিয়ে হাতের স্যান্ডেল দিয়ে আব্বু তোমার পায়ে মেরেছিল। তুমি হাঁটু ভাঁজ করে খাটের উপর বসা ছিলে। ফর্সা পায়ের হাঁটুর দিক থেকে শাড়ীর পাড় বোধ হয় সরেছিল, সেই ফর্সা হাঁটুতেই আব্বু মেরেছিল। আমি কী ভয় পেয়েছিলাম, আল্লাহকে এত ডেকেও শেষ পর্যন্ত এমন কুৎসিত দৃশ্য দেখতেই হলো। কিন্তু তারপরেও তো তোমাদের মধ্যে অনেক ভাব ভালোবাসা দেখেছি।

-আম্মি, ও আম্মি, তুমি কী আমার কথা শুনতে পাচ্ছ? আমি তোমার গভীর গোপন কথা সব জানি, কীভাবে জেনেছি, তা বলবো না। তুমি কেন ভাইয়ার জন্য আলাদা টান বোধ করতে, তা কী জানিনা ভেবেছো? ভাইয়ার জন্মানোরই কথা ছিল না। বিরাট বড় সংসারের চাপে আব্বু এত তাড়াতাড়ি সন্তান চায় নি। ভাইয়া তোমার পেটে আসতেই আব্বু মরীয়া হয়ে উঠেছিল, অ্যাবরশান করানোর জন্য। তুমি রাজী হচ্ছিলে না, আব্বু একদিন মশারী খাটিয়ে দেয়ার ছলে তোমার পেটে পাড়া দিয়েছিল, তবুও ভাইয়া পেট থেকে বের হয়নি। আম্মি, আম্মি গো, আব্বুর এই অপরাধ আমি আমার মৃত্যু পর্যন্ত ক্ষমা করবো না। আব্বু কোথা থেকে যেন উলটা পালটা শেকর-বাকর, বড়ি নিয়ে এসে তোমাকে খাইয়েছিল, সেটাতেও কিছু হলো না, ভাইয়া কঠিন পণ করে তোমার জঠরে বসেছিল।
এরপর যখন ভাইয়ার জন্ম হলো, ভাইয়ার জীবন সংশয় দেখা দিল। তুমি ছিলে মাত্র আঠারো বছরের তরুণী, সন্তান পালনের কিছুই শেখোনি, একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করেছিলে, আল্লাহ তোমার বাবলুকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। আম্মি, দেখো, আমি তোমার গভীর গোপন কথা আগে থেকেই জানি, তোমার আরও অনেক দুঃখ ছিল, আব্বু তোমাকে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যেতে চাইতো না, সারাটা জীবন আব্বু নিজের ভাই-বোনদের দিক টেনে গেছে, তোমাকে কত সময় কতভাবে অপমান করেছে! কথার ছলে তুমি একদিন বলেছিলে, আব্বু নাকি রেগে গেলেই তোমার পিঠে গুমুর গুমুর করে কিল বসাতো! কথাটা তুমি হাসতে হাসতে বলেছিলে, কিন্তু শুনে পর্যন্ত আব্বুর প্রতি ঘৃণায় আমার নাক-মুখ কুঁচকে গেছিল।

আম্মি, তোমার রান্না কত চমৎকার ছিল, সারা দুনিয়ার মানুষ তোমার রান্না খেয়ে হাত চাটতো, অথচ আমরা যদি বলতাম, আমাদের আম্মির রান্না অনেক ভাল, সাথে সাথে আব্বু বলে দিত, “আমার আম্মার রান্না ত খাস নাই, আমার আম্মার রান্না সবার চেয়ে সেরা”! তোমার মুখটা কালো হয়ে যেত, কিন্তু এই নিয়ে কিছু বলতে না। আব্বুর চরিত্রের এই অন্ধকার দিকটি আমি কোনকালেই পছন্দ করতাম নয়া, একদিন বলেছিলাম, “সব সন্তানের কাছে তার মায়ের রান্নাকেই শ্রেষ্ঠ মনে হয়, তোমার কাছে তোমার আম্মার রান্না ভাল, আমাদের কাছে আমাদের আম্মির রান্না ভাল”।
তোমার আরেকটি না-বলা দুঃখের কথাও আমি জানি, আব্বু তোমাকে রাতের বিছানাতেও যন্ত্রণা দিত, একটা বয়স পরে মেয়েদের অনেক শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়, হরমোনাল চেঞ্জের কারণে দৈহিক মিলনে অনেক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়, আব্বু বোধ হয় সেটা মানতে চাইতো না। প্রতি রাতে তোমাকে কষ্ট দিত, কারো কাছে মুখ ফুটে বলতে পারতে না, সয়ে যেতে। একদিন বলেছিলে, রাতে তোমার ভালো ঘুম হয়না! আমি নিজেও তো নারী, আমার কী আর বুঝার কিছু বাকী ছিল! কিন্তু কী করবো বলো, বাপের বিরূদ্ধে এসব নালিশ কোন মেয়ে শুনতে পারে? নাকি শোনা উচিত! আব্বু আমার আব্বু, আমি কী করে তোমার মুখে আব্বু সম্পর্কে এই সব বিভৎস অভিযোগ শুনতে পারতাম, তুমিই বলো! তুমি নিজেও অনেকবার বলেছো, আমার আব্বু হচ্ছে পৃথিবী শ্রেষ্ঠ বাবা, আর সর্ব নিকৃষ্ট স্বামী! পৃথিবী শ্রেষ্ঠ বাবার মেয়ে হিসেবে আমি কী করে সহ্য করতাম এই সব অভিযোগ! সেজন্যই এই প্রসঙ্গ এলেই তোমাকে এড়িয়ে চলতাম!

আম্মি, আর কিছু কী ‘গোপন’ আছে তোমার সিন্দুকে! মনে হয় নেই। এবার আমার গোপনটুকু ফাঁস করে দেই। কারণ তোমার তো একটা ‘মুনিয়াপাখী’ ছিল, তার কাছে গোপনটুকু প্রকাশ করতে চেয়েছিলে, আমার তো কোন পাখী নেই, সবগুলো একেকটা বেড়াল। দুধ চুরী করে খেয়ে মুখ মুছে ফেলে। তোমার দুইটা নাতিই হয়েছে মুখ মোছা বেড়াল। তুমি যে এত ভালোবাসতে, ওদের মনে তার জন্য কোনই কৃতজ্ঞতা বোধ নেই।এই যে আমি একা একা ছুটতে ছুটতে এসেছি, ওরা তো একবার জিজ্ঞেসও করলো না, নানুর কী হয়েছে, নানু কেমন আছে? তিনদিন হয়ে গেল আমি এখানে, ওরা কেউ আমাকে একটাবারের জন্যও ফোন করেনি। ওদের একজনের বয়স ১৩, আরেকজনের ১০। আদর ভালোবাসা, মায়ের স্নেহ বুঝার বয়স হয়েছে দুজনেরই, অথচ ওরা বুঝে না। ওরা কিন্তু ওদের দাদীকে চোখে হারায়, বলতো এটা কী করে সম্ভব হয়েছে! আমি বিয়ের পর থেকে এতটাকাল মুখ বুঝে থেকেছি। তোমার জামাইকে তো তোমরা কত ভাল জানো, সে মানুষ হিসেবে হয়তো সত্যিই ভাল, তবে স্বামী হিসেবে বিশ্বের নিকৃষ্টতম স্বামী সে। তোমাকে সব কথা খুলে বলবো না, বলতে পারবো না, যাওয়ার আগে জেনে যাও, তুমি যেমন করে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম স্বামীর সংসার জীবন দিয়ে করে গেছো, আমিও তেমন করেই বিশ্বের নিকৃষ্টতম স্বামীর সংসার করে যাচ্ছি। খেয়াল করো, আমি কী বলেছি, আব্বু যদি হয় পৃথিবী নিকৃষ্ট স্বামী, জুয়েল তাহলে বিশ্বনিকৃষ্ট স্বামী।

আম্মি, আমার আব্বুর সংসার তুমি করেছো, কারণ আব্বু নিকৃষ্ট আচরণ করতো যখন আব্বুর মাথায় রাগ চড়ে যেত, কিন্তু যখন আব্বু ভাল, তখন আব্বুর মত ভাল মানুষ কী তুমি কোথাও খুঁজে পেয়েছো? পাওনি। কারণ তুমিই বলেছো, আব্বু খুব অভাবের মধ্যে বড় হয়েছে বলে হৃদয়টা কঠিন হয়ে গেছে, কিন্তু জুয়েল তো অভাবের মধ্যে বড় হয় নি, দুধ ঘি খেয়ে বড় হয়েছে, ওর স্বভাব কেন এত উগ্র! আমি প্রেম করে বিয়ে করেছিলাম, তাই তোমাদের কাউকে দোষারোপ করতে পারিনি, এখনও কাউকে দোষ দেই না। কিন্তু প্রেম করেছি বলেই কী সারা জীবন নীরবে সয়ে যাব? আমি কী ঝিনুক যে নীরবে সব সয়ে যাব দিনের পর দিন! ও প্রায়ই আমাকে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে বলে, পান থেকে চুন খসলেই তেড়ে মেরে আসে, কথায় কথায় দেখে নেবে বলে হুমকী দেয়! তালাক দিয়ে দেবে বলে। একজন শিক্ষিত মানুষের মুখে ‘তালাক’ শব্দটা শুনলেই কেমন গা ঘিনঘিন করে উঠে, ছিঃ!

আম্মি, প্রায় দশ মিনিট হয়ে গেছে, তোমার শ্বাস আরও ক্ষীন হয়ে এসেছে। যে কোন মুহূর্তে তুমি খাঁচা ভেঙ্গে পালাবে। আমার উপর অভিমান নিয়ে যেও না, আমি তোমাকে প্রচন্ডভাবে মিস করবো। সারাটা জীবন মিস করবো, আমার আম্মি গো, আমার আম্মিসোনা, তুমি কোথায় চলে যাচ্ছ, যেখানেই যাও, আল্লাহ তোমাকে বুকে আগলে রাখবে। তোমার বিপদের দিনে রুখে দাঁড়াইনি, কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শিখিনি বলেই রুখে দাঁড়াইনি, কিন্তু অন্যায়কে অন্যায় বলেই জেনেছি। আব্বুর হয়ে তোমার কাছে আমি করজোড়ে ক্ষমা চাইছি, আম্মি গো, শেষ দমটা ফেলার আগে আব্বুকে ক্ষমা করে দাও।

আম্মি শোনো, বেশ কিছুদিন আগে তোমার ট্রাঙ্ক ঘাঁটাঘাঁটি করে রান্নার রেসিপি খাতা খুঁজছিলাম, মনে আছে? তুমিই বলেছিলে ট্রাঙ্কের ভেতর তোমার খাতা আছে, সেই খাতাটার ভেতরের ভাঁজে কয়েকটি চিরকুট ছিল, তুমি হয়তো ভুলে গেছিলে চিরকুট গুলোর কথা, তোমার ‘গভীর গোপন’গুলো আমার হাতে এভাবেই চলে এসেছে। চিরকুটগুলো পুড়িয়ে ফেলেছি, কিন্তু চিরকুট পোড়া ছাই থেকে মনে মনে শক্তি সঞ্চয় করেছি, আর মাথা নীচু করে থাকবো না। প্রতিবাদের আগুন চোখে জ্বালিয়ে জুয়েলকে বলে এসেছি, আমার গভীর গোপনগুলো রূপাকে বলে দেবো। রূপা উপন্যাস লিখে বই আকারে প্রকাশ করবে। হা হা হা হা!! জুয়েল ভয় পেয়েছে আম্মি। আমি কিন্তু সত্যি বলছি, এবার থেকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে শিখবো। তুমি শুধু আমার জন্য একটু দোয়া করো। আম্মি, ভাইয়াটা নিশ্চয়ই কেঁদে আকুল হচ্ছে, একটু আগেও ফোন করেছিল, কান্নার আওয়াজে কোন কথা শুনতে পাই নি। ভাইয়ার জন্য মন খারাপ করো না, তোমার দোয়া ওকে মেইল করে পাঠিয়ে দেবো। আম্মি, তোমার প্রতি আমরা যত অন্যায় আচরণ করেছি, যত ব্যথা দিয়েছি, তুমি ক্ষমা করে দাও। তুমি শান্তির দেশে যাচ্ছ? আচ্ছা, ওখানে ভালো থেকো।

মাহেলা বেগমের শিয়রে মাথা রেখে আকুল হয়ে কাঁদছিল আর একমনে কথা বলে যাচ্ছিল মুনিয়া। দরজার বাইরে থাকা সোফাতে বসে অপেক্ষা করছিলেন আশরাফ সাহেব, ক্লান্ত শরীরে ঝিমুনি মত এসেছিল, নার্স এসে আশরাফ সাহেবকে ‘নানা’ বলে ডাকতেই আশরাফ সাহেবের চটকা ভেঙ্গে গেলো। তাকিয়ে দেখে ছিপছিপে গড়নের শ্যামল স্নিগ্ধ চেহারার নার্স মেয়েটি উনার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, আশরাফ সাহেব জানতে চাইলেন,“ আম্মা, উনি কী এখনও আছেন”? মেয়েটি বললো, “না থাকার মত, রুগীর অবস্থা খুব খারাপ, যে কোন সময় শেষ দম বেরিয়ে যাবে, আপনি ভেতরে আসেন, আপনার মেয়ে বোধ হয় কাঁদতে কাঁদতে মায়ের শিয়রে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে! আসেন আপনি, মেয়েকে জাগান, ছেলেকে সংবাদ দেন, মায়ের মুখে একটু পানি দিয়ে যাক!”
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন