বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৮টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

৩১

অতীতকে পিছনে ফেলে নতুন

নতুন এপ্রিল ২০১২

বর্ষা ভেজা মন

বর্ষা আগস্ট ২০১১

ভালবাসায় বর্ষা

বর্ষা আগস্ট ২০১১

মুক্তির চেতনা (মার্চ ২০১২)

মোট ভোট ৩১ গুলি

লিয়া ferdous
comment ১৪  favorite ০  import_contacts ৩৫১
ছেলেটির আর্তনাদে ঘরে বসে থাকা যাচ্ছে না। কিন্তু ভাইয়া আমাকে কিছুতেই বাইরে যেতে দিচ্ছে না। কিছুক্ষন আগে শাসিয়ে গেছে “খবরদার তুই ঘর থেকে বের হবি না, যা করার আমরা করব।” আমিও সে কথা মেনে নিয়ে দাতমুখ খিচে ঘরে বসে আছি।
ও ঘরে ছেলেটির চিৎকার প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। এখন মনে হচ্ছে একটি আহত কুকুর যেন পানির জন্য হাসপাস করে সর্ব শক্তি দিয়ে আর্তনাদ করছে। আমি হাতের টুকটাক কাজ সারছি। না জানি ভাইয়ারা কি করছে।
এখানে আমরা এসেছি ১৫ দিন হল। এর আগে অন্য ক্যাম্পে ছিলাম। আমি এই ক্যাম্পের একমাত্র ডাক্তার ও নার্স। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা ও চিকিতসার জন্য ভাইয়ারা প্রায় আমার কাছে ছুটে আসে। ফারুক আমার বড় ভাই। আমরা দু ভাই বোনই একই ক্যাম্পে থাকি।
এ পর্যন্ত অনেক রুগী দেখেছি। আর কোন রুগী এলেই সবাই স্বসব্যস্ত হয়ে আমার কাছে ছুটে আসে। কিন্তু আজ একদম ব্যতিক্রম। অবশ্য ব্যতিক্রম হবার কারন আছে। আজ যাকে আমাদের ক্যাম্পে আহত অবস্থায় আনা হয়েছে সে আমাদের চরম শত্রু পাকিস্তানী হানাদার। আজ সকালে অপারেশন শেষে আহত অবস্থায় ভাইয়া ওকে আমাদের ক্যাম্পে নিয়ে আসে। ভাইয়া কিভাবে যে এতবড় রিস্ক নিল বুঝলাম না। আর একে কেনই বা এখানে আনা হয়েছে ভেবে আমি অবাক হচ্ছি। ভাইয়াকে কখনই আমি এতটা অবিবেচক হতে দেখিনি। ভাইয়ার নির্বুদ্ধিতায় আজ আমরা সবাই যদি বিপদে পড়ি তবে এই দেশের কাছে কি জবাব দেব। এত বড় ভুল সীদ্ধান্ত ভাইয়া কিভাবে নিল?
খুট করে দরজায় শব্দ হল। ভাইয়াসহ সিরাজ ভাই নিয়াজ ভাই আমার ঘরে এল। ভাইয়া বলল, “শিউলী চল। একটা অপারেশন করতে হবে।” আমি খুবই বিস্মিত হয়েছি। ভাইয়া এ কি বলছে! গিয়াস ভাই আর নিয়াজ ভাই মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কিছু বলতে যাব ওমনি সিরাজ ভাই বললেন, “তারাতারি চলো, অবস্থা খুব একটা ভালো না।”
আমি চুপচাপ বেড়িয়ে গেলাম। ও ঘরে ঢুকে আর্তনাদে বিকৃত চেহাড়ার কুকড়ে থাকা লোকটির দিকে চাইতেই ঘেন্নায় আমার সারা শরীর শিউরে উঠল। আমাকে কিনা চিকিতসা করতে হবে আমাদেরই চরম শত্রুকে? ডাক্তার হয়েছি বলে আমার কি কোন বোধ শক্তি নেই? দেখলাম দরজায় ভাইয়ারা দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে চোখের ইশড়ায় তাগাদা দিল তাড়াতাড়ি কাজ করার জন্য। আমি লোকটির দিকে মনযোগ দিলাম। ভাইয়া সাহায্য করতে এগিয়ে এল। গুলিটি ঠিক তাঁর বুকের নিচে পেটের উপরের দিকে এসে লেগেছে।
প্রায় দু ঘন্টা পর আমি গুলিটি বের করতে সমর্থ হলাম। পাশে প্লেটে গুলিটি রাখতেই টুং করে শব্দ হয়ার সাথে সাথে লোকটি যেন একটু কেপে উঠল। ভাইয়ারা ব্যন্ডেজ করতে লেগে গেল। আমি হাত মুখ ধুতে বের হয়ে গেলাম।
বিকেল বেলা একবার চেকাপ করতে ও ঘরে গিয়ে দেখি ছেলেটি চোখ মেলে চেয়ে আছে। আমি পালস চেকাপ করতে ওর হাত ধরতেই অন্য হাত দিয়ে আমকে চেপে ধরল। আমি চমকে উঠে ভয়ার্ত চোথে তাকাতেই দেখলাম যাকে আমি বিকৃত চেহাড়ার একটি লোক বলে ভেবেছিলাম সে প্রচন্ড মায়ায় জড়ানো চোখের একটি যুবক। একমুহুর্ত যেন আমি ওর চোখে হাড়িয়ে গিয়েছি। ততক্ষনাতই বুঝলাম আমি তো ভুল করছি। এ তো মায়া নয়, মায়াজাল। আমাদের জন্য চরম দুর্দিনের একমাত্র কারন তো এরাই। আমাকে অবাক করে দিয়ে ছেলেটি কথা বলে উঠল। “ডাক্তার আমার শরীরের ভিতর থেকে যে গুলিটি বের করেছেন ওটা কি ফেলে দিয়েছেন?” আরে এতো দিব্যি বাংলা বলছে। ততক্ষনাত আমি বেডের পাশের টেবিলে রাখা প্লেটটা দেখলাম গুলিটা এখনো ওখানেই আছে। আমি হাতটি ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম, “কেন?”
ছেলেটির চোখ চকচক করে উঠল। বলল, “ওটা আমাকে দিন প্লিজ।”
আমি চুপ করে রইলাম। ছেলেটা আবারও বলল, “কৈ? আমাকে দিন না ওটা।”
খুব অবাক হলাম, কেন সে এটা চাচ্ছে? এটা দিয়ে সে কি করবে?
“ওটা আপনার কি দরকার?”
“আমি আপনাকে বোঝাতে পারব না, ওতা আমার কতটা আপন। আপনাকে আমি বোঝাতে পারবো না।”
“আপন। ও জিনিস আবার কারো আপন হয় নাকি?”
“আপনাকে কি করে বোঝাই? এটা আমার মায়ের দেয়া প্রথম ও শেষ উপহার।”
“মায়ের দেয়া মানে? এটা আপনি কি বলছেন?”
“বললে আপনি বিশ্বাস করবেন না। আমি জানি আমি আর বেশিক্ষন বাচতে পারব না।প্লিজ আমাকে ওটা দিন।”
“আগে আমাকে বলুন।”
ছেলেটি কিছুক্ষন আমার দিকে চেয়ে তারপর বলা শুরু করল।
“আমার বাবা পাকিস্তান সেনাবাহীনীতে চাকুরী করে। আমার জন্মের আগে বাংলাদেশে একটা ট্যুরে আসেন। এখানে এসে তিনি আমার মাকে বিয়ে করেন। বাবা মাকে নিয়ে পাকিস্তান চলে যান। আমার যখন আঁট বছর মা তখন মারা যান। বাবার আদর কি তা কখনো বুঝি নি। তারপর সৎ মায়ের সংসার। বাবা একরকম জোর করেই আমাকে আর্মীতে দিয়ে দেন। আর নিতান্ত দ্বায়িত্বের খাতিরে আমি বাংলাদেশে এসেছি যুদ্ধ করতে। কিন্তু এখানে এসে যেন আমি আম্র মায়ের গায়ের গন্ধ পেয়েছি। যেন আমার মাকে পেয়েছি। আমার মন কিছুতেই যুদ্ধে সায় দেয় না। একজনের সাথে কথা বলে মুক্তিযুদ্ধা কোমান্ডার গফুরের ঠিকানা নেই। তারপর দিন গুনি কবে পালাবো। কবে মাকে বাচাতে যুদ্ধ করব। বিশ্বাস করুন আমি একটা গুলিও বালাতে পারি নি।একটাও না। কেউ বিশ্বাস করবে না জানি। আমি পালাই। কমান্ডার গফুরের উদ্দেশ্যে রওনা হই। পথে একটা গোলাগুলির মুখে পড়ে যাই। গুলি লাগে আমার গায়ে। তারপর এরা আমাকে এখানে নিয়ে আসে। আমি জানি এরা আমাকে বাচাতে চাইলেও বাচাতে পারবে না। মৃত্যুকে ভউ পাই না। মায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার চেয়ে মরে যাওয়া ভাল।”
আমি হতভম্ভ হয়ে কথা গুলো শুনছিলাম। নিজের কানকে বিশাস করতে পারছি না। উঠে ভাইয়াদের কাছে যাব এমন সময় উনি আবার আমাকে ডাকলেন, “প্লিজ প্লিজ। আমার হাতে গুলিটা দিয়ে যান।” আমি কাঁপা হাতে প্লেট থেকে গুলিটা নিলাম। ছেলেটি হাত বাড়িয়েই আছে। ওর হাতে গুলিটা দিতেই হাত গুটিয়ে বুকের উপর রাখল। আমি ছুটে ঘর থেকে বের হয়ে গেলাম। এখনি ভাইয়ার সাথে কথা বলতে হবে। ভাইয়াকে পেলাম না। সিরাজ ভাইকে পেয়ে ভাইয়ার কথা জানতে চাইলাম। শুনলাম আমাদের কমান্ডার সাহেব এসেছে তাঁর সাথেই ভাইয়ারা মিটিং করছে। আমার মুখ শুকিয়ে গেল। বুঝলাম আলোচনার বিষয়বস্তু কি হতে পারে। নিয়ম অনুযায়ী ঘাতককে হত্যা করা হবে। ভাইয়ারা জানতেও পারবে না।

সন্ধ্যা বেলা দুটো গুলির শব্দে চেতনা ভাঙ্গল। ধীর পায়ে ক্যাম্পের পাশের বাগানে গিয়ে দেখলাম ছেলেটার লাশ নিথর হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু চোখে মুখে যেন একটা আনন্দের ঝলক। ওর ডান হাতটি তখনো মুঠ করে ধরা। মুঠের ভিতর সেই গুলিটি।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন