বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৬ নভেম্বর ১৯৬৭
গল্প/কবিতা: ৩০টি

সমন্বিত স্কোর

৬.০৬

বিচারক স্কোরঃ ৩.৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.২৬ / ৩.০

অতি-নাটকীয়

ভালোবাসা / ফাল্গুন ফেব্রুয়ারী ২০১৫

লেজ

অসহায়ত্ব আগস্ট ২০১৪

দিনের আঁধার

রাত মে ২০১৪

গর্ব (অক্টোবর ২০১১)

মোট ভোট ১১৭ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৬.০৬ না-মানুষ

মোঃ আক্তারুজ্জামান
comment ১০৯  favorite ১৫  import_contacts ১,০২২
ঈদের বেতন বোনাসের টাকাটা হাতে নিয়ে হত- বিহবল হয়ে বসে থাকে নুরু কেরানী| দু :শ্চিন্তায় তার কপালে ঘাম জমে যায়| মাথাটাও একটু যেন ঘুরে উঠে- আজকাল এমনটা হয়| একটু অস্থির, একটু দিশেহারা ভাবটা মনে জাগলেই মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠে| অথচ একসময় কেউ মাথা ঘুরানোর কথা বললে অনেকটা টিটকারী মেরে সে বলতো- সে কী তোমার মাথাতো দেখছি মাথার জায়গায়ই ঠিক বসে আছে- ঘুরছে না তো!

ছোট ছেলে সুমনটার খুব শক্ত একটা অসুখ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে| দুদিন আগে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার পর ডাক্তারের কৌশুলী কথা শুনে নুরু কেরানীর বুকে একটা হিম শীতল ভয় একটু একটু করে তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে| ছেলেটার চোখের পাতা, হাত পাগুলি যেন একটু একটু করে প্রতিদিনই ফুলে উঠছে, শরীরে চুলকানি হচ্ছে| যন্ত্রনায় অস্থির হয়ে সে রাত দিন উঠ বস করে কাটায়| বেশ কয়েক দিন ধরেই লেখা পড়া বন্ধ করে সে বিছানায় পড়ে আছে| ও হায়ার সেকেন্ডারীতে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে|

বড় ছেলে সুজন একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে ইলেকট্রিসিয়ানের কাজ করে| ও লেখা পড়াটা করলো না| ক্লাস এইটে উঠেই বলল- আব্বা আমি আর পড়ব না| আমার খুব কষ্ট হয়| শুধু শুধু টাকা পয়সা নষ্ট করার দরকার নেই| তার চেয়ে আমি বরং কিছু করে আপনাকে সাহায্য করি| দুজনে আয় করলে সুমনের লেখাপড়াটাও ভালো হবে|

সুমনের লেখা পড়া ছেড়ে দেয়ার কথায় নুরু কেরানীর কষ্ট হয়েছিল সত্যি কিন্তু বাস্তবতাটুকুও সে বুঝতে পেরেছিল| ছেলের চোখে আত্মসমর্পণের আকুতি ফুটে উঠেছিল- ও লেখা পড়াটাকে ভালোবাসতে পারেনি বা জয় করার চ্যালেঞ্জ হিসেবেও নিতে পারেনি| সত্যি সত্যি ছেলেটা আর পড়ল না| মহল্লার এক লোকের পিছনে ঘুরে ঘুরে মাস তিনেক বিদ্যুতের কি কাজ করলো| তারপর নিজে নিজেই একদিন ইলেকট্রিসিয়ানের চাকুরীটা যোগাড় করে নিল| ছেলেটা নুরু কেরানীর সংসারের বোঝা টানাটা সত্যি সত্যি অনেকটা সহজ করে দিল| ভালই চলছিল দিনগুলি| কিন্তু সুমনের অসুখটা সব তালগোল পাকিয়ে দিল| একদিন ডাক্তার দেখিয়ে এটা ওটা পরীক্ষা নিরীক্ষা করতেই অনেকগুলি টাকা খরচ হয়ে গেল| ঈদ এসে গেছে, ঈদের আগেই আবার সুমনটাকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে| ল্যাব টেস্টের রিপোর্টগুলি দেখাতে হবে|

অফিস থেকে বাড়ী ফিরে রাতে একসময় বেতন বোনাসের টাকাটা গিন্নীর হাতে তুলে দিয়ে বড় অসহায় ভাবে নুরু কেরানী বলল- নাও রাখো| রিপোর্টগুলি নিয়ে সুমনকে আবার ডাক্তার দেখাতে হবে| কত টাকা লাগে কে জানে? ইদ এসে গেল কিছুই করা হলো না| এবার ঈদের জন্য কিছু করার দরকার নেই| আল্লাহ আল্লাহ কর, দেখো ছেলেটা যেন তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠে| ঈদের তো আর মাত্র তিন চার দিন বাকী তুমি শুধু ওদের দুভাইকে একটা করে শার্ট কিনে দিও| ঈদে একটু নতুন জামা পেলে ছেলে দুটোর মন ভালো থাকবে|

দুদিন পর অফিস থেকে ফেরার পথে নুরু কেরানী সুমনের ল্যাব টেস্টের রিপোর্টগুলি নিয়ে আসে| রাতে শুয়ে পড়ার আগে গিন্নিকে একবার স্মরণ করিয়ে দেয়- সব গুছিয়ে রেখো| কাল একটু আগেই অফিস থেকে ফিরব, সুমনকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে| আর ভালো কথা ওদের জন্য কেমন শার্ট কিনে আনলে দেখাও তো দেখি!
-তুমি-ই কিনে দিও| তোমার রাজপুত্তুর্দের ওসব জক্কি ঝামেলা আমি একেবারেই সইতে পারব না| কেরানী গিন্নি মুখ গোল আলুর মত করে রাখে|

বাজারের কাজটা বরাবরই কেরানী গিন্নী করে থাকে| নুরু কেরানী বাজার করলেই 'ধরা'- দোকানীদের চাতুরীর জাল ছিড়ে একটুও বেরুতে পারে না সে| কদাচিত তরিতরকারীর বাজারে গেলে- এটা দাও আধা কেজি, ওটা দাও এক কেজি, দু আটি শাকও দিয়ে দাও| সব শেষে মোট দামটা সে দোকানীকে দিয়ে দেয়| বাসায় ফিরলে গিন্নী যখন জানতে চায়- করল্লা কত কেজি নিল গো? নুরু কেরানী তখন উত্তর দিতে পারে না| দোকানীর সাথে দর দাম করাটা একদমই এড়িয়ে যায় সে| যে একাজটা খুব ভালো করতে পারে সেই মানুষটা কী কারণে ছেলে দুটোর জন্য শার্ট কিনাটাকে ঝক্কি মনে করছে নুরু কেরানী তা বুঝতে পারে না|

- কেন কি হলো? মাত্র দুটো শার্ট কিনার মাঝে আবার জক্কি ঝামেলার কি আছে? নুরু কেরানী অবাক হয়ে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকায়|
-তোমার ছোট সাহেবজাদার শুধু শার্টে হবে না| একজোড়া জুতো লাগবে| তাও যে সে জুতো না| এক জোড়া জুতোর দাম নাকী বারো'শ টাকা| সারাটা দিন কত করে বললাম, বোঝালাম, দেখ তোর একটা অসুখ আগে সুস্থ হয়ে নে| বেচে থাকলে কত জুতো কিনতে পারবি| শেষের দিকে নুরু গিন্নির গলাটা ধরে আসে|
- ও তো মানুষ না! নুরু কেরানীর অসহায় গলায় হতাশা আর কষ্ট ফুটে উঠে|

সুমনটা বরাবরই এরকম| যা চাইবে তা চাই- ই চাই| ওটা না পাওয়া পর্যন্ত আর নিস্তার নেই| ও অনেকটা উচ্চাভিলাষী, তাই ওর নজরটাও উপরের দিকে-টিভি, পত্র পত্রিকার বিজ্ঞাপনের দামী দামী জিনিস পত্র দেখলে ওর চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠে| নিজেকে ও সব সময় পরিপাটি করে রাখায় ব্যস্ত| সংসারের কোনো কাজে কোনো সময় ও হাত লাগিয়ে দেখে না| এমন কি গোসল করার পর গোসল খানায় ভিজা কাপড় চোপড়গুলিও একটু তুলে রাখে না| অর মধে গুণ বলতে একটাই জিনিস আছে- ও খুব ভালো ছাত্র| অন্য দিকে সুজনটা হয়েছে ওর বিপরীত চরিত্রের| সময় পেলেই মাকে সবজি কুটা থেকে শুরু করে ঘর ঝাড়ু দেয়া, সবার কাপড় চোপড় ধোয়া কোনটাই বাদ যায় না| অফিস টাইমের বাইরেও এর ওর বাসায় ছোট খাটো কাজের জন্য ডাক পড়লেই ছুটে যায়| চাকুরীর বাইরে টুকিটাকি কাজ করে বাড়তি টাকাটা দিয়ে মাছটা, সবজিটা কিনে আনে| মাঝে মধ্যে বেশি টাকা পেলে বাবার জন্য, মায়ের জন্য নয়তো সুমনের জন্য কাপড় চোপড়ও কিনে আনে|

নুরু কেরানী আর তার গিন্নি দুজনই মন খারাপ করে নি:শব্দ, গুম হয়ে বসে থাকে| এমন সময় সুজন অফিস থেকে ফিরে| ঘামে ভেজা শার্টটা খুলে বারান্দার রশিতে ছড়িয়ে দেয়| তারপর উদোম গায়ে এসে ফ্যানের নীচে বাবার পাশে বসে| বাবা মায়ের দুজনের মুখের দিকে একবার নজর বুলিয়ে মাকে বলে- মা কি ব্যাপার! আপনাদের মন খারাপ ক্যান?

বেশ কয়েক বার খুচিয়ে খুচিয়ে মায়ের মুখ থেকে কথাটা আদায় করে ছাড়ে| তারপর সারা মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে- ও যা চায় দিয়ে দেন| আমার কিছু লাগব না|
- তোর লাগবে না কেন? মা অনেকটা খেকিয়ে উঠে|
- আমি বড় না? সুজন হাসে|
- আহারে বড় আমার! বিশ মিনিটের বড় হওয়ায় তোর যদি কিছুই না লাগে| ও কেন মিনিট বিশেকের ছোট হয়ে একটু কম নিতে পারে না?

সুমনের জমজ ভাই সুজন লজ্জা পেয়ে ফিক করে লাজুক হাসি হেসে ফেলে| মাকে বলে- অত কথা বইলেন নাতো| আমার ঈদ টিদে নতুন কাপড় চোপড় এইসব ভাল্লাগে না| তাছাড়া ও ছাত্র মানুষ ওর এসব লাগে| ও যা চায় তা দিয়ে দিবেন| টাকার কথা ভাববেন না| রঞ্জুদের বাসার একটা বড় ওয়েরিং এর কাজ আছে| কালই রাত জেগে কাজটা করে দিব, কাজটা করে দিলেই দুই হাজার টাকা পাব|

পরের দিন সুজন একটু আগে ভাগেই বাসায় ফিরে আসে- তাও সন্ধ্যা পেরিয়ে যায়| রঞ্জুদের বাসার কাজটা করার জন্য সে একটু ব্যস্ত| পরনের জামা কাপড়টা বদলানোর জন্য বারান্দায় যায় লুঙ্গিটার জন্য| অন্ধকারে বারান্ধার লাইটের সুইচটা টিপে দিয়েই সে চমকে উঠে- আব্বা আপনি অন্ধকার বসে আছেন কেন? চাঁদ উঠে গেছে| এবার উনত্রিশ রোজায়ই ঈদ হবে| ঘরে যান গিয়ে দেখেন টিভিতেও ঘোষণা দিচ্ছে|
নুরু কেরানী পাথরের মূর্তির মত চুপ করেই বসে থাকে| ছেলের কথার এক বিন্ধুও তার কানে ঢুকে না| সুজনও একটু অবাক হয়| বাবার কাঁধে হাত রেখে বলে- আব্বা আপনার মন খারাপ?

নুরু কেরানী এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না| দুহাতে মুখ চাপা দিয়ে সে কোনোমত নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করে নীচু গলায় বলে- বাবারে, সুমনটা আর বাচবে না| ওর নাকি দুটো কিডনি-ই নষ্ট হয়ে গেছে|

একটা কষ্ট সুজনের হৃদপিন্ডটাকে যেন খামচে ধরে| চোখের সামনে তার জলজ্যান্ত ভাইটা আজ আছে আর দিন কয়েক পরে থাকবে না এই ভাবনাটা তাকে নিমিষেই গ্রাস করে ফেলে| সে ধীব পায়ে বাপের কাছে গিয়ে দাড়ায়| বাপের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে শান্ত গলায় বলে- আব্বা, রোগ থাকলে তার চিকিত্সাও আছে| সুমন দেখবেন ভালো হয়ে যাবে| আমরা ওকে বড় ডাক্তার দেখাবো| নতুন কিডনি লাগাবো|

- ডাক্তার বলেছে তাতে লাখ লাখ টাকার দরকার রে বাপ| নুরু কেরানী ডুকরে উঠে|

-আব্বা আপনি আজই দেশের বাড়ী রওয়ানা দেন| আমাগো বাড়ীটা গিয়া কারো কাছে বিক্রী করে দ্যান| সুজনের চোখের তারায় আলো ফিরে আসে|
- তাতে আর কয় টাকা আসবে রে বাবা| একটা কিডনির দামী নাকি কয়েক লাখ টাকা!
আব্বা আমরা কিডনি কিনতে যাব কোন দু:খে?- বলেই সুজন বাবার দিকে পিঠ করে ঘুরে দাড়ায়| শার্ট টা উপরের দিকে টেনে তুলে কোমরের একটু উপরে মেরু দন্ডের দুপাশে হাতের আঙ্গুল ঘুরিয়ে দুটি বৃত্ত একে বাবাকে দেখানোর চেষ্টা করে|
- আব্বা আমার দুইটা কিডনি আছে একটা সুমনরে দিলে আমার কিছু হবে না| কয় দিন একটু রেস্টে থাইকা, শাক সবজি ফলমূল, বেশি বেশি পানি খাইলে সব ঠিক হয়ে যাবে| আপনি কোনো চিন্তা করবেন না|
নুরু কেরানী পাগলের মত বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে ছেলের কান্ড দেখছিল| একটা গর্ব তাকে সহসাই আচ্ছন্ন করে ফেলে| চোখ দুটি ভরে উঠে, প্রায় বুজে আসা গলায় সে চিত্কার করে বলতে থাকে- ঐ, তুই তো এই লোভ লালসা আর স্বার্থে গড়া দুনিয়ার কোনো সাধারণ মানুষ নারে| তুই ভিন গ্রহ থেকে নেমে আসা কোনো মহা পুরুষ!
এক গর্বিত পিতা সন্তানের বুকে মাথা রেখে পরম নির্ভরতায় কেঁদে চলে......
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • সালেহ  মাহমুদ
    সালেহ মাহমুদ আক্তার ভাই, মুঠোফোনে অভিনন্দন জানিয়েছি বলে পোস্ট করতে ভুলে গিয়েছিলাম। কিছু মনে করবেন না। বিজয়ের জন্য অভিনন্দন গ্রহণ করুন। ধন্যবাদ।
    প্রত্যুত্তর . ১৭ নভেম্বর, ২০১১
  • রোদেলা শিশির (লাইজু মনি )
    রোদেলা শিশির (লাইজু মনি ) এক গর্বিত পিতার সজল নয়ন তুলে এনেছেন কথার মালায় .......................! অনেক ভালো লাগলো ...!
    প্রত্যুত্তর . ১৮ নভেম্বর, ২০১১
  • শামীম খান
    শামীম খান পড়তে পড়তে দুচোখ তপ্ত পানিতে ভরে উঠলো । দারুন লেখা । ভীষণ ভাবে ছুঁয়ে দিয়েছেন মনকে । শুভ কামনা রইল ।
    প্রত্যুত্তর . ১ জানুয়ারী, ২০১৫