বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৩৪টি

সমন্বিত স্কোর

৭.২

বিচারক স্কোরঃ ৪.৫৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৬৫ / ৩.০

লক্ষ যোজন দূরে

ত্যাগ মার্চ ২০১৬

প্রেম

ফাল্গুন ফেব্রুয়ারী ২০১৬

শিক্ষক, তক্ষক

শিক্ষা / শিক্ষক নভেম্বর ২০১৫

পরিবার (এপ্রিল ২০১৩)

মোট ভোট ৮৪ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৭.২ তৃতীয় দিন

এশরার লতিফ
comment ৪১  favorite ৪  import_contacts ১,৯০৬
[আমার শ্বশুর সাহেব বাংলা একাডেমীর প্রাক্তন পরিচালক কবি ওবায়দুল ইসলামের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। মৃত্যু ৫ অক্টোবর ২০১২। ওনার লেখা একটি গান ও একটি কবিতার কিছু পঙক্তি এই গল্পের অন্তর্গত হলো। গানটি হুমায়ূন আহমেদ সাহেবের ‘অয়োময়’ নাটকে প্রথম প্রচারিত হয়েছিল।]

৫ এপ্রিল ২০১৩

রুমা জানালা দিয়ে নীচে তাকিয়ে আছে।

মেঘ আর মেঘ। মেঘের ফাঁকে ফাঁকে মোচড়ানো কাগজের মত ধূসর পর্বতমালা। জানালার পাশেই প্রপেলারটা দ্রুত ঘুরছে। এত বড় বিমানে প্রপেলার? না, জেট প্রপালশন ইঞ্জিন। রোলস রয়েসের কারখানায় বানানো। প্রপেলারের মত একটা পাখা বাতাসকে ভেতরে টেনে ঘন করছে। তারপর গ্যাসের সাথে মিশে ইঞ্জিনের পেছনে তীব্র বিস্ফোরণ। ড্র্যাগ্‌ কমছে, লিফ্‌ট্‌ বাড়ছে, বিমান ভাসছে আকাশে। বছর বছর ইঞ্জিনের ডিজাইন বদলে যাচ্ছে। যেটুকু বাতাস টানা হয় তার ব্যবহারে এফিসিয়েন্সি বাড়ছে। নতুন নতুন প্যাটেন্ট হচ্ছে।

এফিসিয়েন্সি। আমি যা পেলাম আর আমি যা দিলাম, তার অনুপাত। রুমার অতি প্রিয় শব্দ। শুধু রুমা কেন, ইঞ্জিন নিয়ে যারা কাজ করে তাদের সবার। কতবার রুমা বললো বাংলাদেশ যাওয়াটা এবার এফিসিয়েন্ট হবে না, বাবা সেই পর্যায়ের অসুস্থই নয়। রানা একরকম ধাক্কা দিয়েই পাঠিয়ে দিচ্ছে। নিদার ডাজ ইট মেইক এনি একনমিক সেন্স। যা খরচ হবে, আরও কিছু জমিয়ে গাড়িটা আপগ্রেইড করা যেত।

বিমানবালা কোমল পানীয় রেখে গেছে। রুমা পেছন থেকে ওর যাওয়া দেখছে। আওয়ারগ্লাস ফিগার। মনের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। ‘আচ্ছা রানা আবারও কারো সাথে অ্যাফেয়ার করছে না তো? বাবা আমার, ওর এত উৎসাহ কেন?’

৬ এপ্রিল ২০১৩

রুমা হাল্কা করে বাবার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। ‘এখন কেমন লাগছে?’ ‘ভালো রুমা, খুব ভালো’। ফিরোজ সাহেবের মোটেও ভালো লাগছে না। মেশিন নিয়ে কাজ করে করে রুমার আঙ্গুলগুলো লোহার মত শক্ত হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে কেউ তার মাথায় পাঁচটা লাঙ্গলের ফলা চালাচ্ছে। অন্য কারও আঙ্গুল হলে ফিরোজ সাহেবের ইচ্ছে হতো মটকে দিতে। রুমার কথা আলাদা। এক সময় রুমা ছিল তার অতি আদরের মেয়ে। রুমা তখন লেখাপড়ায় তুখোড়, ভালো আবৃত্তি করে, নতুন কুঁড়ির খ শাখায় পর পর তিনবার চ্যাম্পিয়ন। ফিরোজ সাহেব মোটামুটি নিশ্চিত ছিলেন এই মেয়েটি ইন্দিরা গান্ধী কিম্বা মারগারেট থ্যাচার জাতীয় কিছু একটা হবে। ফিরোজ সাহেবের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। রুমা এখন হাজার ইঞ্জিনিয়ারের মাঝে আরও একজন ইঞ্জিনিয়ার। বাঙ্গালী ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারদের ভেতর ক’জনের মৌলিক মেধা আছে? এক এফ আর খান সাহেবই ছিলেন ব্যতিক্রম।

ফিরোজ সাহেবকে আরও বেশী ভাবিত করে রুমার পরিবর্তন। তিনি টেরও পাননি কবে কী ভাবে তার এই প্রজ্ঞাময়ী হৃদয়বতী মেয়েটি একটা রোবটে পরিণত হলো। রুমা যেন সব কিছু বিচার করে সময় অথবা মুদ্রার অঙ্কে। ও কি বোঝে না যে জীবনের গণিতে ‘দি হোল্‌ ইজ গ্রেটার দ্যান দি সাম অফ ইট্‌স্‌ পার্‌ট্‌স্‌’?

রুমার প্রতি এক সময় তার মায়া ছিল ভুবন ভাসানো । সেই মায়া গিয়ে পড়েছে এখন রুমার মেয়ে টুম্পার উপর। রুমা যে এক কথায় মেয়েকে নিয়ে চলে আসবে এতটা আশা উনি করেননি। ফিরোজ সাহেব এ কারনে তীব্র আনন্দ বোধ করছেন। তিনি অপেক্ষা করছেন কখন তার আদরের নাতনিটি কাছে এসে বসবে। বিস্ময়কর সব গল্প শুনে চোখ বড় বড় করে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকবে। সব ঠিক থাকলে কাল টুম্পাকে ইস্টার্ন প্লাজা নিয়ে যাবেন। ইস্টার্ন প্লাজায় এখন অনেক সুন্দর সুন্দর চাইনিজ খেলনা পাওয়া যায়। টুম্পার জন্য অনেকগুলো খেলনা কিনবেন। তারপর গাওসিয়া মার্কেটে যাবেন। সেখানে টুম্পাকে নিয়ে জিলিপী খাবেন। নুর মিয়াকে গ্লাস ধুয়ে ভালো করে লাচ্ছি বানাতে বলবেন। স্নেহ চিরকালই নিম্নগামী।

‘আমি একটু আসছি’ বলে রুমা বারান্দায় চলে এলো। বাবা দিব্যি ভালো আছে। উঠতে পারছে, বসতে পারছে। একটু থেমে থেমে হলেও কথা বলছে। অবস্থা মোটেও মরণঘাতী নয়। তাহলে ওর আসার মানেটা কি? এই সপ্তাহে একটা আর্টিকেল জমা ছিল। হাই ইম্প্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে। জমাটা হলো না। সবচেয়ে রাগ লাগছে রানার উপর। রুমা এখন বিরক্ত মুখে মোবাইলের স্পর্শ-বোতাম টিপছে।

রানাদের ল্যান্ডলাইনে বার বার রিং হয়ে কেটে যাচ্ছে। রানার উঠতে ইচ্ছে করছে না। অনেকদিন পর টমকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। রুমা নেই। কোন টেনশন নেই। ধরা পড়ার ভয় নেই। এ দেশে আইন করে ব্যাপারটাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু মেঘমালার উপর থেকে নেমে আসা নূরানি কিতাবের ভাষ্য মতে ওর জন্য অপেক্ষা করছে দোজখের আগুন। সূরা আল আরা’ফের ৮১ আয়াতে লেখাই আছে ‘তোমরা তো কামবশতঃ পুরুষদের কাছে গমন কর নারীদেরকে ছেড়ে। বরং তোমরা সীমা অতিক্রম করেছ’। তারপরও রানা নিজেকে সংবরণ করতে পারছে না। মধ্যবয়সে হঠাৎ জেগে ওঠা অমোঘ এক আকর্ষণ পতঙ্গের মত তাকে ধেয়ে নিচ্ছে ভয়াবহ আগুনের দিকে। ফোনের রিং বেজেই যাচ্ছে। রানা বিরক্ত মুখে ফোন ধরল।

রুমা বললো ‘হোয়াট এক্‌জ্যাক্টলি অ্যাম আই ডুইং হিয়ার?’
‘কেন রুমা কি হয়েছে?’
‘তোমাকে কে বলেছে যে বাবা মুমূর্ষু?’
‘কেন ডক্টর জাহিদই তো বল্লেন ওনার অবস্থা এখন আনপ্রেডিক্টেব্‌ল্‌। যে কোন সময় যে কোন কিছু হয়ে যেতে পারে।’
‘আনপ্রেডিক্টেব্‌ল্‌ মাই ফুট। বাবার কিছুই হয়নি। আমি নিশ্চিত বাবা নাতনিকে দেখার জন্য ডক্টর জাহিদকে দিয়ে ফোন করিয়েছেন ’
‘সেটা আমি কীভাবে বুঝব রুমা। এখন বের হতে হবে, রাখছি। এসে ফোন করব’

ফোনটা রেখেই রানা টমের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। হি হ্যাজ টু মেইক দা বেস্ট আউট অফ হার অ্যাবসেন্স।

বারান্দা বরাবর ঝুমার ঘর। ঝুমা এই মাত্র নামাজ শেষ করেছে। পর্দার ফাঁক দিয়ে রুমাকে দেখা যাচ্ছে। রুমা অস্থিরভাবে বারান্দায় পায়চারী করছে। বড় আপু আগের মতই আছে। কোথাও নেই, কিছুতে নেই অথচ মোক্ষম সময়ে এসে সব তাড়াহুড়োর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়াবে। রুমা যদি উত্তর মেরু হয়, ঝুমা দক্ষিণ মেরু। উত্তর মেরুতে থাকে বেপরোয়া মেরু ভল্লুক আর দক্ষিণ মেরুতে কালো কোট পরা সাদাসিধে পেঙ্গুইন। বড় আপু ছিল ভীষণ একরোখা। লক্ষ্য একবার স্থির করলে তা অর্জন করবেই। বাংলা সিনেমার ভাষায়, ছলে, বলে অথবা কৌশলে। অথচ প্রথম দর্শনে রুমাকে মনে হবে খুব নাজুক আর এলেবেলে ধরণের। এটা ওর নেচারাল সারভাইভাল মেকানিজম। ঝুমার বদ্ধমূল ধারণা আপু একজন আজন্ম মুখোশ পরিহিতা মানবী। ধীরে ধীরে মুখোশটা মুখের সাথে লেপ্টে গেছে। আপু নিজেও হয়তো জানে না কতটা ওর মুখ আর কতটা মুখোশ। হঠাৎ পুরনো কথা ভেবে ঝুমার মনটা তিক্ত হয়ে গেলো।

৭ এপ্রিল ২০১৩

ভোরবেলা ঝুমা হারমোনিয়াম নিয়ে বসেছে। ‘তোমার অসীমে প্রাণ মন লয়ে যত দূরে আমি ধাই/ কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই’। রুমা দু’কাপ চা হাতে ঘরে ঢুকলো। ঝুমা সব সময় এই জাতীয় গান গায় কেন? অসীম, মৃত্যু, এই সব না থাকলে হয় না? গত রাতে গেয়েছে ‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে/ বন্ধু হে আমার রয়েছ দাঁড়ায়ে’। আরও তো গান আছে। ‘আলো আমার আলো ওগো আলোয় ভুবন ভরা’ গাইতে পারে না? যত আলো, তত সোলার প্যানেল, সেই পরিমান বিদ্যুৎ। যেমন কাজের কথা তেমন কাজের জিনিস।

‘তুই কী এখনো রেডিওতে গান করিস?’
‘হ্যা আপু, মাঝে মধ্যে টিভিতেও করি’
‘আমাকে কেউ বলেনি তো’
‘তুমি তো যোগাযোগ রাখো না। রাখলে জানতে। এখন অনেক টি ভি চ্যানেল, আগের চেয়ে সুযোগ বেশী।‘
‘বিয়েটিয়ে তো আর করবি না ঠিক করেছিস’
ঝুমা কিছু না বলে চায়ে চুমুক দিলো। চা বিস্বাদ লাগছে।
‘আমি তোর সাথে একটা বিরাট অন্যায় করেছিলাম। এখন আর দুঃখিত-টুঃখিত বলে লাভ নেই। তাও বলছি , আই অ্যাম সরি অ্যান্ড আই মিন ইট’

ঝুমা চুপ করে আছে। কাপটা মেঝেতে ছুঁড়ে ফেললে ভালো লাগতো। ঝুমাকে চুপ থাকতে দেখে রুমা বললো,

‘অন্যায় একটা চেইন রিয়েকশনের মত। একজনের উপর অন্যায় হলে সেও আরেকজনের উপর অন্যায় করে, সেই জন আবার আরেকজনের উপর...’
‘তোমার কথা ঠিক না আপু। আমি কিন্তু কারও প্রিয় মানুষকে ভাগিয়ে নেইনি’

রানার জন্য ঝুমা যতটা দুঃখ পেয়েছে তার চেয়ে অনেক বড় দুঃখের হাত থেকে বেঁচে গেছে। পানিতে ভাসা বরফের উপরের শুভ্র এক ভাগ দেখেছে ঝুমা। পানির নীচের অন্ধকার আট ভাগ দেখছে রুমা, প্রতিদিন, আট প্রহর, আট বছর ধরে।

দুপুর দুটোর দিকে জাফর চাচা এলেন। রুমা দরজা খুললো। রুমা ঢাকায় জানলে জাফর চাচা এখন আসতেন না।

‘চাচা, কতদিন পর। যান বাবাকে দেখে আসুন। তারপর আপনার সাথে একটা লম্বা সিটিং দিব।‘
‘লম্বা সিটিং?’
‘আমার কৈশোরের গল্প হবে। আপনি তো আমার বয়ঃসন্ধিকালের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছেন। আষ্টেপৃষ্ঠে মানে জানেন তো চাচা? এর মানে হলো সর্বাঙ্গে।’

জাফর চাচা কিছু না বলে হন হন করে ফিরোজ সাহেবের ঘরে ঢুকে গেলেন। আধ ঘন্টা পরে জাফর চাচা ফিরোজ সাহেবের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। রুমা কাছেই ছিল। এই পিছলা লোকের উপর বিশ্বাস নেই।

‘চাচা, আপনি তো ঘামছেন, এখানে আসুন। একমাত্র এ ঘরেই এ সি আছে’

জাফর চাচা সাদা রঙের লখনউ স্টিচের কাজ করা পাঞ্জাবী পড়েছেন। মুখে কাঁচা পাকা দাঁড়ি। চুল দাঁড়িতে মেহেদী লাগানো।

‘কি বলবে বলো, তোমার চাচির জন্য দুটোর মধ্যে ঔষধ নিয়ে যেতে হবে’
‘চাচি কি আপনাকে ভালো মত জানেন? নাকি না জেনেই অসুস্থ?’
‘ষোল-সতের বছর আগের ঘটনা নিয়ে এখন ঘাঁটাঘাঁটি করছ কেন?’
‘ষোল-সতের বছর আগের কী নিয়ে যেন ঘাঁটাঘাঁটি করছি চাচা? ও হ্যাঁ মনে পড়েছে। নতুন কুঁড়িতে আমি আবৃত্তিতে প্রথম হলাম। বাবার কাজ ছিল। বাবা আপনাকে অনুরোধ করল তার মেয়েকে বাসায় দিয়ে আসতে। আপনি চাচির সাথে দেখা করার কথা বলে আমাকে আপনাদের বাসায় নিয়ে গেলেন। চাচি আর নিশা তখন বাসায় নেই। আপনি অবাক হবার ভান করলেন। আসলে চাচি তো তখন প্রেগন্যান্ট, বেশ ক’দিন ধরেই নিশার নানা বাড়ি। তাই না?’

ঝুমা চা বিস্কুট নিয়ে এসেছিল। বাতাস ভারী দেখে টেবিলের উপর রেখে বেরিয়ে গেলো।

‘আপনি ফ্রিজ থেকে আইসক্রিম এনে আমাকে দিলেন। একটা ডিভিডি ছাড়লেন। গা গুলানো নীল ছবি। তারপর সোফায় এসে বসলেন, আমার পাশে। আমার হাঁটুর কাছে আলতো করে হাত রাখলেন। সেই হাত হঠাৎ বিশ্বভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিলো। আমি ভয়ে হিম হয়ে গেলাম। আপনি ধীরে ধীরে আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলেন। আষ্টেপৃষ্ঠে শব্দটার মানে আবার বলব?
‘না’
‘আমার সব জামা কাপড় তখন মেঝেতে ছড়ানো। হঠাৎ নাভির নীচে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করলাম। আধঘন্টা পর আপনি প্রিয় বন্ধুর মেয়েকে বাসায় রেখে আসলেন। পথে কি বলেছিলেন মনে আছে?’
‘এখনো বলছি, তোমার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না।’
‘হুম...অদ্রি কেমন আছে? গত মাসে অস্ট্রেলিয়া চলে গেলো তাই না’
‘হ্যাঁ , অদ্রির কথা আসছে কেন?’
‘আপনার আপন বোনের মেয়ে তাই’
‘তাই কি?’
‘তাই ভাবছি আপন বোনের মেয়েকে মানুষ কীভাবে রেইপ করে’
‘তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে’
‘চাচি দেখলে ওনার মাথা আমার চেয়েও খারাপ হবে’
‘কী দেখলে?’
‘ধারণকৃত চলমান দৃশ্য। প্রথমবারেরটা নেই। বাকি চারবারেরটা আছে’

জাফর চাচা কপাল থেকে টপ টপ করে ঘাম পড়ছে।

‘অদ্রিকে নিয়ে ভাববেন না, ওর চেহারা ঝাপসা করা যাবে। আপনার চেহারা শার্প করে দেব যেন অনেক দূর থেকে বোঝা যায়। সমস্যা একটাই। মূল ক্যাপশন কী হবে?, রেইপ লিখব, ধর্ষণ লিখব নাকি বলাৎকার লিখব? তাছাড়া চাচা, পিডোফাইল শব্দের কোন যুতসই বাংলা পাচ্ছি না। আপনি গুরুজন, একটা পরামর্শ দিন তো’

জাফর চাচা দুই পা হাঁটুর নীচ থেকে কাঁপছে।

‘আসলে কি জানেন চাচা, ষোল বছর ধরে প্রতি শুক্রবার তিন ঘন্টা সময় আপনার পেছনে বরাদ্দ। পুরোদস্তুর গবেষণা বলতে পারেন। আপনাকে ঘিরে একটা নেটওয়ার্ক বানিয়েছিলাম। এখন জালটা গোটানোর মত অবস্থায় এসেছে। এই তো চাচির বোনের মেয়ে রোকসানা গত মাসে আপনাদের বাসায় বেড়াতে এলো, মনে আছে? মাঝ রাতে হঠাৎ দুটো ভারী হাত ওর বুক চেপে ধরল? কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার বলুন তো? যা হোক চাচা এখন বাসায় যান, দুটোর মধ্যে ঔষধ নিয়ে যেতে হবে না? আপনার যায়গায় আমি হলে নিজের জন্যেও কিছ ঘুমের বড়ি কিনতাম’

চাচা চলে যাওয়ার পর ফিরোজ সাহেবের ঘরে এলো রুমা। বাবা ঘুমুচ্ছে। মুখটা অনেক শুকিয়ে গেছে। খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। চোখ দুটো ভেতরে বসা। পেটের ডান দিকটা ফোলা। হঠাৎ করেই বাবা বয়স যেন দশ বছর বেড়ে গেছে। বাবা কি ঘুমের মধ্যে কষ্ট পাচ্ছে? ঠোঁট এক পাশ একটু বেঁকে আছে কেন? এই প্রথম মনে হলো বাবা সত্যিই অসুস্থ।

‘টুম্পাকে রেডি হতে বলো রুমা, ইস্টার্ন প্লাজা যাবো’ ফিরোজ সাহেব হাল্কা করে চোখ খুললেন।
‘একা পারবে?’
‘হুম’
‘আমি খাবার নিয়ে আসছি’

খাবারের ব্যাপারে বাবা ভীষণ শৌখিন। গরুর মাংসের ভুনা ছাড়া কখনই ভাত খাবে না। সাথে মাছ মাংসের আরও দুটো পদ থাকতে হবে। প্রতি মাসের তৃতীয় মঙ্গলবার বাবা বন্ধুদেরকে বাসায় দাওয়াত করে খাওয়াবে। বাজারের সবচে বড় রুই মাছ, মাত্র জবাই করা খাসীর মাংস, সেরা চালের মোরগ-পোলাও, গলদা চিংড়ির ভুনা, বগুড়ার দই, কুমিল্লার রসমালাইয়ের ব্যবস্থা হবে। এসব করে করে প্রতি মাসেই অনেক ঋণ হয়ে যায়। এমন ভোজন রসিক মানুষটা তিন মাস ধরে জাউ ভাত আর পেঁপে ভর্তা ছাড়া কিছুই গিলতে পারছে না। মা বেঁচে থাকলে খুব কষ্ট পেত। ভাঙ্গা হাট ফেলে দাওয়াত-খেকো বন্ধুরাও যে যার ডেরায় ফিরে গেছে। বাবা নিশ্চয় আবার ভালো হয়ে উঠবে। আবার হাট বসবে, দাওয়াত-খেকো বন্ধুরা দুধের মাছির মত একে একে ফিরে আসবে। ভালোমন্দ মানুষের আগমনে বাসাটা গম্‌ গম্‌ করবে।

ঘুম ভাঙ্গার পর থেকেই ফিরোজ সাহেবের বমি বমি লাগছে। তিনি ঝুমাকে ডাকলেন। ঝুমা ঘরে ঢুকার আগেই বিছানার উপর গল্‌ গল্‌ করে বমি করে দিলেন। ঝুমা দৌড়ে বাথরুম থেকে বালতি নিয়ে এলো। ঝুমা বাবার চোখে হাত দিয়ে রেখেছে। এখন ঠিক বমি হচ্ছে না। বালতি কাঁচা রক্তে ভরে যাচ্ছে। ঝুমা চাচ্ছে না বাবা নিজে এ দৃশ্য দেখুক।

চারটার সময় এ্যাম্বুলেন্স এলো। ফিরোজ সাহেব তেতালা থেকে হেঁটেই নীচে নামলেন। অনেক ক্ষণ টুম্পার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর এ্যাম্বুলেন্সে উঠলেন। ঠিক সাড়ে ছ’টার সময় ফিরোজ সাহেবকে জরুরী বিভাগ থেকে ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিটে আনা হলো। ফিরোজ সাহেবের এখন শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বুকটা গাড়ির পিস্টনের মত ওঠানামা করছে। রক্তচাপ আর হৃদস্পন্দন কমে আসছে। ফিরোজ সাহেব রুমার হাত ধরে বললেন ‘কত দিন তোর গলায় কোন গান শুনি না মা’।

রুমা যে একদিন গান গাইত তা সে নিজেও ভুলতে বসেছে। ও কিছুটা আড়ষ্ট আর গম্ভীর গলায় বাবার প্রিয় গানটি ধরলো,

‘আসমান ভাইঙ্গা জ্যোৎস্না পড়ে,
আমার ঘরে জ্যোৎস্না কই,
আমার ঘরে এক হাঁটু জল,
পানিতে থৈ থৈ’

গান শুনতে শুনতে ফিরোজ সাহেব লাইফ সাপোর্টে চলে গেলেন। গালের কষ বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। ধীরে ধীরে একটার পর একটা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ অকেজো হয়ে যাচ্ছে।

৮ এপ্রিল ২০১৩

মৃত্যু না বলে প্রস্থান বলাই ভালো, যেন চোখের পলক। রুমা ঢাকা এলো পাঁচ তারিখ। ছ’ তারিখে মনে হলো বাবার কিছুই হয়নি, বাবা ভং ধরেছে। সাত তারিখে মৃত্যু। আজ আট।

বাবার জন্য কষ্ট হচ্ছে। মানুষটা নেই। আবার এক ধরণের স্বস্তিও লাগছে। যাক, সংক্ষিপ্ত ভ্রমণটা শেষ পর্যন্ত এফিসিয়েন্ট হয়েছে। ইট ওয়াজ ওয়ার্থ দি কস্ট্‌। সময় আর খরচ দুটোকেই এখন জাস্টিফাই করা যাচ্ছে।

রুমা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। মনের খুব ভেতরে কোথায় একটা কাঁটা খচ খচ করছে। বাবার লেখা কবিতার দুটো লাইন যেন মাথা থেকে আর বেরুচ্ছে না,

‘আমিও নদীর মত মোহনা অবধি,
কেমন একাকী, দেখো কেমন একাকী’

রোলস রয়েসের বানানো পাখাটা ঘোরা শুরু করেছে। হু হু করে চৈত্রের বাতাস ঢুকছে জেট ইঞ্জিনে। একটু পরেই বিমান আকশে ভাসবে। আকাশে সাদা আর ধূসর মেঘের মেলা। বৃষ্টি আসবে হয়তো একদিন। কিন্তু এখন নয়। এখানে নয়।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন