বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৭ জানুয়ারী ১৯৯৪
গল্প/কবিতা: ৫টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৮১

বিচারক স্কোরঃ ২.০১ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

শেষ বসন্তের অপেক্ষায়

আমার আমি অক্টোবর ২০১৬

অমরার জালে শেষ নিঃশ্বাস

ঘৃণা সেপ্টেম্বর ২০১৬

অথর্ব আমি

ঘৃণা সেপ্টেম্বর ২০১৬

গল্প - আমার আমি (অক্টোবর ২০১৬)

মোট ভোট ১৮ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৮১ বেলা অবেলা

ভুতুম প্যাঁচী
comment ৭  favorite ০  import_contacts ১৭২
আটপৌরে কুঠুরিটার সবগুলো কোণেই পদচারণ ঘটেছে আমার। চল্লিশটা বছর তো পেরিয়েই গেল এ বাড়ির অন্দরমহলে নিজেকে সমার্পণ করেছি। আধহাত ঘোমটা উঠতে উঠতে চলে এসেছে কপালের শেষ সীমানায়। জবজবে তেলে ভেজা কুচকুচে কালো চুলেরা আজ সাদা হবার মিছিলে উত্তাল জনতা। দুপাশ কালো ক্ষেতের মাঝখানে আলভাঙা রক্তিম সিঁদুর আজ উবে গেছে প্রায়। টকটকে লাল শাড়িতেও চলে এসেছে ম্যাটমেটে বিবর্ণতা। চাওয়াগুলো সব চোরাবালিতে থুবড়ে পড়ে মিলিয়ে গেছে নিমিষেই। বার্ধক্যেরা একএক করে উড়ে এসে আপন করে নিচ্ছে শরীরটাকে। মন! তার আর কী? সে আজও তার মাঝে জিইয়ে রেখেছে ইচ্ছেগুলির নিভুনিভু প্রদীপ শিখা।

সাজের বাণে ভেসে যাওয়া এক সমুদ্র মানুষের মধ্যমণি আমি সেদিন। আধহাত লম্বা ঘোমটার আড়ালে গুটিসুটি দেয়া ষোড়শী কাব্য। সঙ্কোচের আবডাল ছিড়ে একটুখানি ঘোমটা উত্তোলন। ললাটের ভাঁজে পেয়েছিলাম এক স্বপ্নপুরুষের আঙুলের ছোঁয়া। সিঁথির ঠিক মধ্যিখানে অবলীলায় এঁকে দিলো আমার নতুন অস্তিত্ব। বুক জুড়ে তখন এক হাহাকারের ঢেউ ফনা তুলে নাচছে। সে ছিল ষোলো বছরের সম্পর্কগুলো থেকে দূরে যাবার চাপা কষ্ট। চোখজোড়া তখন ভেসে যাচ্ছে অশ্রুবাণে। হয়তো তার কয়েকফোঁটা লেপ্টে গেছে স্বপ্নপুরুষের হাতে। মনের ঈশানকোণ ঘেঁষে ছোট্ট এক টুকরা আনন্দ খেলা করছে। নতুন এক অস্তিত্ব অনুভবের আনন্দ।

সেই ছোট থেকেই দুরন্তপনার প্রতিটা বাঁধ ভেঙে দিয়েছি আমি। সারাদিন টইটই করে পুরো গ্রামে নিজের বিরাজমান হবার প্রমাণ রেখে এসেছি। বাড়ির উঠোন থেকে সরদার বাড়ির শাপলা পুকুর। মেরিদের পেয়ারা গাছ থেকে ছোট বাজারের চুড়ি ফিতার দোকান। সর্বত্রই ছিল আমার দস্যিপনার ছাপ। শাপলা পুকুর থেকে কত শাপলা যে চুরি করেছি তার হিসেব আমাদের স্কুলের গনিতের মাস্টারও রাখতে পারতেন না। শাপলাগুলো চুরির আশায় না, চুরি করতাম তাতে রঙ মেখে আমার স্বপ্নগুলো জিইয়ে রাখবো বলে। গহনা বানিয়ে নিজেকে রাজকুমারী সাজাবার ছলে। সরদার বাড়ির সেই বুড়ো দাদি! শরীরেরগাঁট বার্ধক্যের কষাঘাতে ভেঙে গেলেও শক্তি টলেনি একচুল। কতবার যে তার শুকনো হাড়ে লেপ্টে থাকা চামড়ার আঙুলের ফাঁকে আমার চুলের অপমৃত্যু ঘটেছে! শক্তির বেড়াজালে আটকাতে না পারলেও তার সামনে দাঁড় করিয়ে দিতাম গালাগালের এক আকাশ ছোঁয়া পাহাড়। মুখের ভেংচি দিয়ে তার চোখে আগুন ঝরাতাম। সেও ভাঙা চোয়ালের ওপর আছড়ে পড়ে আমাকে অভিশাপ দিত, 'তুই কুনোদিন কারু বউ হবার পারবিনা ঠাডাপরুনি। তুর মতো এমন শয়তানি দস্যি মাইয়া কুনো বাড়িত উঠাইত না।'
ভেংচিতে অব্যাহতি না দিয়েই ফুঁসতে ফুঁসতে চলে আসতাম। দূর থেকেও কানে আসত তার ভাঙা চোয়ালের ওপর অত্যাচারের কড়মড়ে শব্দ।

আহা! তার অভিশাপ যে কাজে আসল না। বউ তো আমি হয়েছি। এই সাতাশ বছরে আরও কত সম্পর্ক কুড়িয়ে আঁচলে বেঁধেছি! আজ বুড়ি থাকলে ক্ষোভে তার বুকের হাড়গুলো চড়চড় করে ফেটে যেত। তার অভিশাপের সংক্রমণে কর্ণযুগল পচেই গিয়েছিল প্রায়। এক সময় মনের গহীনে উঁকি দিয়ে দেখি সেখানে শুধু শূন্যতা আর শূন্যতা। ভয়েরচিহ্ন কপালের বিন্দু বিন্দু ঘামে দেখেছি। হঠাৎ শান্ত হয়ে গেলাম নীল মেঘেদের মতো। খুঁজতে থাকলাম আমার মাঝে এক অন্য আমিকে। বুকের ভেতরে ধুকপুক করা এক টুকরা ভয় নিয়ে খুঁজেই চললাম। তখন যেন অন্য আমিকে না পেলে পুরো আমিই অস্তিত্বহীন হয়ে যাবো। অনেক খোঁজার পর পেলাম এক শান্তশিষ্ট ষোড়শীকে। যার বুকে দানা বাধতে শুরু করে এক স্বপ্নপুরুষের দেখা পাবার আকাঙ্ক্ষা। যার ভাবনায় হারিয়ে যাওয়া গোধূলির দিগন্তে। মায়ের বকুনি কিংবা কারো অভিশাপ- আর ছোঁয় না আমায়। তাকে ঘিরে শত ইচ্ছা পুষে পুষে বড় করার বাঞ্চায় বিভোর আমি। রাত জেগে জেগে তাকে ভেবে একাকী কথা বলা। আনমনে নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি জমানো। ভরা জোছনায় ঘরের পেছনের শানবাঁধানো পুকুরপাড় এক অস্থির মায়ায় টানত যেন। আধোরাতে ইচ্ছেরা দাপাদাপি করেছে তখন। পা টিপে টিপে মায়ের ঘরে যাওয়া। নিঃশব্দে আলমারি থেকে মায়ের টকটকে লাল শাড়িটা নিয়ে নিমিষেই প্রত্যাবর্তন নিজের ঘরে। সেলোয়ারের ভাঁজে কুচি গুঁজে গায়ে জরিয়ে টিমটিমে আলোর ছোঁয়ায় আরশিতে নিজেকে দেখা। কপালের ঠিক মাঝখানে ছোট্ট একটা লাল টিপ। নূপুর পায়ে আলতো করে এসে বসা পুকুর ঘাটে। আকাশের বুকে জোছনার যৌবন ছড়িয়ে পড়েছে। পুকুরের কালো জলে আত্মরূপ দেখে লজ্জায় গলে পড়ছে। রূপোলী নেসার আসর জমিয়েছে পৃথিবীর বুকে। রূপোমাখা জোছনা আর কালো জলের মাখোমাখো প্রেম দেখে হিংসে হয়েছে খুব। পুকুরের জলে এক টুকরো ঢিল ছুড়ে তার আত্মপ্রকাশ করেছি। কিন্তু না, তখনো তারা লেপ্টে ছিল একে অপরের প্রেমে। শুধু উপরে আমি আর জলের নিচে ছোড়া ঢিলটা একা। মুখ বাকিয়ে বলেছি তখন, 'আমারও প্রেম হবে একদিন। এখানেই আসবো করতে তার প্রতিটা সুখ উন্মোচন। বুড়ির পুকুরের শাপলা এনে দিবে সে। অবাধ্য চুলেদের শাসন করে গুঁজে দিবে খোঁপায়। তিন জোড়া প্রেম হবে তখন এখানে। উপরে আমি আর সে, মাঝখানে তোমরা। আর জলের নিচে? জলের নিচে হবে এক জোড়া ঢিলের প্রেম।'

না, পারিনি আমি। সাতাশ বছর পেড়িয়ে গেল অনায়াসে। পারিনি আমার কথা রাখতে।

আগুনের বুকে ঘি ঢেলে সাতপাক ঘুরলাম। পা রাখলাম নতুন এক চৌহদ্দির উষ্ণ সীমানায়। ঘোমটার ফাঁক গলে যতটা দেখা গেল সবটাই অপরিচিত। আড়চোখে একখানা মুখ খুঁজেছি সেদিন। কালরাত্রি শেষেও খুঁজে পাইনি। ইতোমধ্যে অপরিচিত বাড়ির একটা একটা পড়তা আপন হতে লাগল। কোনো কালে না দেখা মুখগুলোর সাথে ধীরে ধীরে সম্পর্ক গড়ে উঠতে লাগল। শুধু আধো আধো দেখা একখানা মুখ তখনো স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। অপেক্ষার এগারো দিন কাটার পর সে এলো। এই প্রথম তাকে ভালো করে দেখলাম। শ্যামবর্ণ লম্বা সৌষ্ঠব দেহ। মুখের প্রান্তে খোঁচা খোঁচা দাড়িগোঁফের বিস্তর বিন্যাস। মাথাভর্তি এক ক্ষেত সমান কালো চুল। একে তো আমি চিনি! এই তো আমার স্বপ্নপুরুষ। শুধু চোখটা যেন অজানা কোনো গ্রহ। রক্তবর্ণ চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারিনি বেশিক্ষণ। সে চোখে খেলা করছিল কারো সাথে বিচ্ছেদের প্রতিটা ক্ষণ। বিচ্ছেদ! কার সাথে!

সময়ের স্রোতে ধীরেধীরে ভেসে গেছে সব। সমঝোতার কষাঘাতে পিষ্ট হয়েছে সে। আজও তার চোখের দিকে তাকাতে পারিনি। আজও ভরা জোছনায় পুকুরঘাটে তিনজোড়া প্রেম দেখা হয়নি।

এখন আর সরদার বাড়ির পুকুরে শাপলা ফোটে না। সেখানে গেলে শুধু শুনতে পাই এক পরিচিত কণ্ঠের চোয়ালভাঙা হাসি...!
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন