বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৭৯
গল্প/কবিতা: ১৯টি

সমন্বিত স্কোর

১.৩

বিচারক স্কোরঃ ০.৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ০.৬ / ৩.০

পাগলা রাজু ও সুপার ট্রান্সফার ডোর

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নভেম্বর ২০১৬

ভালোবাসি তাই

ঘৃণা সেপ্টেম্বর ২০১৬

অষ্পষ্ট গোধুলী

ঘৃণা সেপ্টেম্বর ২০১৬

শীত / ঠাণ্ডা (ডিসেম্বর ২০১৫)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ১.৩ মীনা ও ন্যাড়া ভূত

জসিম উদ্দিন জয়
comment ৬  favorite ১  import_contacts ৯০৩
মীনা আপু! মীনা আপু! দেখে যাও টেক্ টিভিতে এই মাত্র একটি খুব মজার রোবট দেখালো। রোবটটি সম্পূর্ণ মানবীয় রোবট। রাশিয়া দেশের সরকার সন্ত্রাস আর দূর্নীতি দমন করতে ৫০টি রোবট তৈরি করেছে। আপু তাড়াতাড়ি এসে দেখে যাও।
মীনা ও মামা আনোয়ার সাহেব সহ অনেকেই একসাথে খাবার টেবিলে খাবার খাচ্ছে। রাজুর কথায় মামা হেসে উঠে বলে “রাজু তুই দূর্নীতির কি বুঝিস”। রাজু মামার কথার পাল্টা জবাবে জানিয়ে দিলো “কেনো সেদিন আমি খবরের কাগজে পড়েছি” দূর্নীতিতে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ান হয়েছে। অবশ্য আমিও একদিন স্কুল দাবা প্রতিযোগিতায় প্রায় চ্যাম্পিয়ান হয়েছিলাম। কিšু‘ দূর্ভাগ্য, অবশেষে চ্যাম্পিয়ান হতে পারি নাই, শেষের দিকে মন্ত্রীর খেলাটা নিয়ে একটু চালাকি করতে যেয়ে মোটা চশমাওয়ালা হুজুর স্যারের হাতে ধরা পড়ে যাই। সবাই আমাকে খেলা চোর, খেলা চোর, বলে তাঁড়িয়ে দিলো। মামা রাজুর কথায় প্রথমে হতভম্ব হলেও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার হাসতে হাসতে কথার মোড় ঘুরিয়ে বলে “শোন রাজু রোবটগুলো নিশ্চয় সোভিয়েত রাশিয়ানরা তৈরি করেছে।”
রাজু ঃ জি মামা, খুব আদর্শবান রোবট, এগুলোকে আমাদের বাংলাদেশে আনা দরকার। তাহলে স্কুলের বন্ধুরা আমার বাবাকে ঘুষখোর পুলিশ অফিসার আর চাঁচ্চুকে ভুয়া রাজনীতিবিদ বলতে পারবে না। আমার কèাস ফ্রেন্ড সাজু আমাকে ঘুষখোরের বাচ্চা বলে বকা দিয়েছে। অবশ্য আমি মাইন্ড করি নাই, কারন আমার বাবা সত্যি সত্যি আস্ত একটা ঘুষখোর। রোবটগুলো খুব তাড়া তাড়ি নিয়ে আসতে হবে রোবটগুলি আমার বাবা ও চাচ্চুকে আদর্শ, নীতিকথা এগুলো শিখিয়ে দেবে।
রাজুর কথা শুনে মীনা খুব অপমান বোধ করে রাজুকে চুপ করতে বলে। মামা এক গাল মিষ্টি হেসে কথার মোড় অন্যদিকে ঘুরিয়ে বলে “শোনো রাজু, সোভিয়েত রাশিয়ানরা এখন চাঁদের দেশে বসবাস করার জন্য ঘরবাড়ি বানাবার পরিকল্পনা করছে। রাজু তুই উড়োজাহাজ আবিস্কারকের নাম জানিস ? রাজু হিঃ হিঃ করে হেসে বলতে পারছে না, এরই মধ্যে মীনা চট করে বলে ফেলে, ‘উড়োজাহাজ আবিস্কার করেন দুই ভাই ইলভার রাইট আর অলভির রাইড’ ওনারা দুইজন সোভিয়েত রাশিয়ান। মামা হিঃ হিঃ করে হেসে বলে শুধু তাই নয় পৃথিবীর প্রথম মহাকাশ যাত্রীর নাম ইউরিন গ্যাগারিন, তিনি ছিলেন সোভিয়েত রাশিয়ার নাগরিক। মীনা ভিন দেশীদের এতো প্রশংসা শুনে অপমান বোধ করলো। সে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করে বললো ‘হাজার গীতিকার, কবি, সাহিত্যিকের রূপসী বাংলাদেশ সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে এই দেশটি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দেশ। এই দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য আমাদের গর্ব। মহান ২১শে ফেব্র“য়ারীকে সামনে রেখে সারা বিশ্বে পালিত হয় বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস। হাজারও ভাষার পাশাপাশি বিশ্বের চতুর্থতম ভাষা হিসাবে মর্যাদা লাভ করেছে বাংলা ভাষা। রবীন্দ্রনাথ, অমর্ত্য সেন, ডঃ মোঃ ইউনুস এর মত তিন বাঙালী ব্যক্তি পেয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ নোবেল পুরষ্কার। মীনা চোখে মুখে বাংলাদেশের প্রতি গভীর মমত্ববোধ। তাই মীনার চোখে মুখে ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের কথা। মামা সম্প্রতি ইউরোপ থেকে এসেছে, মামার বেশীর ভাগ সময় কাটে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। তাই বাংলাদেশ সম্পর্কে তার ধারণা কম। মীনা মামাকে জোর অনুরোধ জানিয়ে বললো মামা উত্তর পাড়ায় যে বিশাল বটগাছ আছে সেই বটগাছের নীচে বাউলদের গান হবে। সেখানে সাত গ্রামের বাউল, ফকির, কবি, গীতিকাররা আসবে। মামা আমাদের দেশের বাউল গান শুনলে তোমার অনেক ভালো লাগবে। মীনার কথা শুনে মামা এক কথায় রাজি হয়ে যায়। তরিঘরি করে রাতে খাবার শেষ করে। উত্তর গ্রাম মীনাদের বাড়ী থেকে দুই মাইল দূর হবে। অমাবশ্যার রাত গ্রামের আঁকাবাকা পথ, কখনো ঝোপঝাপ, বাঁশঝাড় বা খালবিল পার হয়ে যেতে হবে বাউলগান দেখতে। মীনা, মামা, রাজু সকলেই সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়। সাথে নিলো একটি টর্চ লাইট, হারিকেন বাতি।
মীনা ও রাজু শহরের আধুনিক সভ্যতায় বড় হয়েছে। মামা আনোয়ার সাহেব মীনা ও রাজুকে সাথে নিয়ে এই প্রথম গ্রামের বাড়ীতে বেড়াতে এসেছে। ঘর থেকে নেমে উঠোনের কিছুটা কাছে আসতেই মামার চোখ পড়ে যায় পাশের বাঁশবাগানে। মামা বাঁশবাগানের দিকে তাকিয়ে রাজুকে বলতে লাগলো
বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই,
মাগো আমার সোলক বলার কাজলা দিদি কই।
কবিতাটি কে লিখেছেন? রাজু হাটতে হাটতে একটা সহজ হাসি দিয়ে বলে কেন যতিন্দ্র মোহন বাগচী। রাজু মুখটা খানিকটা গম্ভীর করে বলতে থাকে “উনি মিথ্যে কথা লিখেছেন” কোথায় বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ নেই শুধু অন্ধকার, আর কটমট আওয়াজ হচ্ছে ভেতর থেকে। মামা রাজুর কথায় আবারও হেসে উঠে বলে, “আজ তো অমাবশ্যার রাত, তাই চাঁদ উঠেনি। পূর্ণিমার রাত হলে ঠিকই বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠতো। রাজু মামার কথায় বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বলে তুমি জানো আমার স্কুলের বন্ধুরা আমাকে সাহসী ছেলে বলে ডাকে।
মামা মাথা নেড়ে বলে কেন?
রাজু বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বলতে থাকে, একদিন আমাদের স্কুলে একটা মজার ঘটনা ঘটেছে। বক বক করে ইংরেজি ব্যাকরণ পড়াচ্ছেন বেরসিক কাবলু স্যার। স্যারকে দেখতে মোটা তাজা পন্ডিতের মতো চেহারা। তাই সবাই এই স্যারকে ভয়ানক স্যার বলে ডাকতো। সেদিন শ্রেণী কক্ষের সবাই টের পেলো স্যার একটা “আস্ত, ভিতুর ডিম”। মিয়াও মিয়াও শব্দ করে হঠাৎ একটি কালো কুচ কুচে বেড়াল উড়ে এসে জুড়ে বসলো স্যারের টেবিলের উপর। স্যার ভয়ে এক চিৎকার দিয়ে শ্রেণী কক্ষের পেছন বেঞ্চের নিচে পালিয়ে যায়। স্যারের চিৎকার শুনে শ্রেণী কক্ষের সবাই ভয় পেয়ে থর থর করে কাঁপতে থাকে। বেড়াল তখনও টেবিলের উপর বসে মিয়াও মিয়াও করছে। ভয়ানক কালো এবং বড় অনেকটা বন্য বেড়ালের মতো। কিন্তু আমি এই সামান্য বেড়ালটাকে ভয় পাবো। তবুও ভয় করছে বেড়ালটার দিকে তাকিয়ে ভয়ানক কুচকুচে কালো, সাহস করে আমার হাতের ইংরেজি ব্যাকরণ বইটা ছুড়ে দিলাম বেড়ালটার উপর। বেড়ালটা মিয়াও মিয়াও করে পালিয়ে যায়। কাবলু স্যার আস্তে আস্তে কাতরাতে কাতরাতে পেছন থেকে উঠে দাড়ালো। রাজুর দিকে তাকিয়ে বললো ‘সাবাস রাজু’ আজ থেকে তুমি সাহসী ছেলে রাজু বলেই স্যার যেই তার নিজ চেয়ারে বসতে যাবে তখন দেখতে পেলো ইংরেজি বইটা এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে আছে ফ্লোরে। সাথে সাথে বদরাগী অকৃতজ্ঞ স্যার আমাকে কান ধরে বেঞ্চের উপর দাঁড়া করিয়ে বলে “অভদ্র ছেলে কোথাকার এবার ভদ্র ছেলের মতো বেঞ্চের উপর কান ধরে দাঁড়িয়ে থাক”। “কথায় আছে না উপকারীরে বাঘে খায়” কি আর করবে স্যারের কথায় কান ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম।
মামা রাজুর কথা শেষ হতে না হতেই হোঃ হাঃ হাঃ করে হাসতে থাকে। মামার হাসিটা রাজুর পছন্দ হলো না। তাই সে প্রতিবাদ করে বলতে থাকে “মামা তুমি হাসছো একদিন তোমাকে ঠিকই প্রমাণ করে দেবো আমি কত বড় সাহসী ছেলে”। কথাটা শেষ হতে না হতেই মীনার হাতে টর্স লাইটের বাতিটা হঠাৎ করে নিভে যায়। এরই মধ্যে রাজু বাঁশবাগানের দিকে তাকালো “মিয়াও মিয়াও কট কট করে বাঁশবাগান থেকে বেরিয়ে এলো একটা জীব। জীবটা কালো কুচ কুচে, অন্ধকারে জীবটাকে দেখে ঠিক চেনা যাচ্ছে না, জীবটার চোখ দুটি টর্স লাইটের আলোর মতো জ্বল জ্বল করছে। রাজু জীবটার মিয়াও আর কটমট শব্দ শুনে “এক চিৎকারে লাফিয়ে পড়ে মামার উপর। মামাকে জড়িয়ে ধরে ভূত ভূত, আস্তো একটা কালো ভূত বলে চিৎকার করতে থাকে। মামা টর্স লাইটটি ধপ্ করে জ্বালিয়ে দেখে এটা ভূত না, এইতো দেখি একটা কালো কুচে কুচে বেড়াল। মামা এবার দম ফাটানো হাসিতে হেসে ওঠে। সাথে মীনাও হাসছে। রাজু আস্তে আস্তে চোখ খুলে দেখে একটি কালো বেড়াল মিয়াও মিয়াও করে চলে যাচ্ছে। সাহসী রাজু একটা ভীতুর ডিম এর পরিচয় দিলো, তাই মাথাটাকে নিচু করে আছে, কোন কথা বলছে না। মীনা তার হাতের হারিকেন বাতিটার আলো একটু বাড়িয়ে দিলো। মামা রাজুর ভয় পাওয়া দেখে রাজুর হাতটি শক্ত করে ধরে। বাড়ীর আঙ্গিনা ছেড়ে লম্বা সড়ক দিয়ে হাটতে থাকে। তখন সড়কটির আশপাশ গভীর অন্ধকার। মামার টর্স লাইটের আলো লাগাতার জ্বলছে। মীনা তার হারিকেন বাতিটা শক্ত করে ধরে আছে। দক্ষিণা বাতাস শোঁ শোঁ বেগে মীনার হারিকেন বাতিটার উপর আক্রমণ করছে। দক্ষিণা বাতাসে হারিকেন প্রায় নিভে যাচ্ছে। মীনা দক্ষিণা বাতাস এর হাত থেকে হারিকেনটা বার বার আড়াঁল করার চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে মামার টর্স লাইটের বাতিটা কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। গভীর অন্ধকার নিজের হাত দুটিকেও ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। রাজু ভয়ে মামাকে জড়িয়ে ধরে। হঠাৎ মামার টর্স লাইটের আলো জ্বলে উঠে ঠিক তখনই মীনার হাত দু’টি রাজু ধরবার জন্যে এগিয়ে যায়। টস্ লাইটের আলোর মধ্যে মীনার হাত দু’টিকে অদৃশ্য ভূতের হাতের মতো দেখা যাচ্ছিলো। রাজু হাত দুটি দেখে ভূতের হাত, ভূতের হাত, আমাকে মেরে ফেলবে বলে চিৎকার করতে করতে মামার ওপর লাফিয়ে পড়ে। মামা রাজুর ভার সামাল না দিতে পেরে ধপ করে মাটিতে গরুর গোবরের উপর পড়ে যায়। রাজু আর মামার এই কান্ড দেখে মীনা হিঃ হিঃ হাসতে থাকে। মামা খুব অপমানিত বোধ করলো। আস্তে আস্তে কোমর কাতরাতে কাতরাতে উঠে দাঁড়ালো। রাজু লজ্জায়, আর রাগে দাঁত কটমট কটমট করে এক লাফে উঠে দাঁড়ালো। মীনার হারিকেন বাতিটা নিবু নিবু করছে। মীনার হারিকেনের তেল প্রায় ফুরিয়ে আসছে। মামা, রাজু, মীনা হাঁটছে সড়ক দিয়ে। সড়কের পাশেই ছোট্ট একটা পুরোনো খাল। খালটির পানি প্রায় শুকিয়ে গেছে। কচুরিপানা আর আবর্জনায় পরিপূর্ণ খালটি, অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ করে শো ... শো ... বেগে ঝড়ো হাওয়া বইছে, মাঝে মাঝে হালকা বৃষ্টির ফোটা। ঠিক তখনই মীনার হাতের হারিকেন বাতিটাকে কে যেনো উড়িয়ে নিয়ে দূরে ফেলে দিলো। হারিকেনের বাতিটাও গেলো নিভে। রাজু আবারও হঠাৎ ভয় পেয়ে লাফিয়ে উঠলো। রাজুর ভয় পাওয়া দেখে মামা আবার টর্স লাইটের আলো রাজুর দিকে জ্বালিয়ে দিলো। দেখে একি সর্বনাশ! কে যেনো রাজুর প্যান্ট খুলে দিয়েছে। রাজু বিস্ময় চোখে নিচে তাকিয়ে দেখে ঠিক তাইতো। রাজু ভয়ে জড়সড় হয়ে বলে ওঠে ’মামা ভুত আমার প্যান্ট খুলে দিয়েছে’। মামা হাসতে হাসতে বলতে লাগলো, রাজু তুমি একটা টিকটিকি। তোমার সাথে টিকটিকির মিল রয়েছে। মীনা অবাক হয়ে বলে মামা কিভাবে মিল রয়েছে ? মামা হাসে আর বলে ভয় পেলে টিকটিকির লেজের পেশীতে প্যাচ পড়ে। ফলে ফাটল অংশের কশেরুকা দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায় এবং লেজটি খসে পড়ে। ঠিক সেভাবেই ভয় পেয়ে রাজুর প্যান্টই খুলে গেলো। রাজুর কান্ড দেখে মীনা হিঃ হিঃ করে হাসছে আর বলছে রাজুর নতুন একটা নাম পাওয়া গেলো টিকটিকি রাজু।

গভীর অন্ধকারে বাতিটা আর খুঁেজ পাওয়া গেলো না। এই গভীর অন্ধকারের মধ্যে রাজু, মামা ও মীনা ভয়ে জড়সড় হয়ে হাটছে। এতই অন্ধকার একজন আরেকজনকে দেখতে পাচ্ছে না। রাজু একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলে “এখন আমাদের সবাইকে ভূতে মেরে ফেলবে, রাক্ষসী ভূত আমাদের আস্তো গিলে খাবে। রাজু ও মীনা মামার হাতটা ভালো করে চেপে ধরে সামনের দিকে হাটছে। হঠাৎ আচমকা তাঁকিয়ে দেখে পাশের খালটায় পঁচা কচুরিপানা থেকে দাউ.... দাউ করে দাবানলের মতো আগুন জ্বলে উঠলো, আগুনটা ক্রমশঃ উপরের দিকে উঠে আসছে। মীনা এক চিৎকার দিয়ে মামার কাছে ছুটে যেয়ে বলে মামা ভূতের আগুন আমাদের জ্বালিয়ে মারবে। মামা বলে কোথায় আগুন নেই তো। মীনা তাকিয়ে দেখে আগুন নিভে গেছে মীনা তখনও ভয়ে থর থর করে কাঁপছে। মামা মীনাকে সান্তনা দিয়ে বলে শোনো মীনা ভূত বলে কিছু নেই। এটা ভূতের আগুন নয়। এর সাইন্টিফিক ব্যাখ্যা আছে। মীনা আগ্রহ নিয়ে বলে কি ব্যাখ্যা মামা?
ঃ শোনো পেট্রোলিয়াম প্রাপ্ত গ্যাসে ৮৫% ভাগ মিথেন থাকে। কয়লা হতে প্রাপ্ত গ্যাসেও মিথেন পাওয়া যায়। তাহলে মনোযোগ দিয়ে শোনো এই যে কচুরিপানা জলাভূমিতে গাছ, নানা জাতীয় পাতা ও বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ পচনের ফলে এ গ্যাসের সৃষ্টি। যা জলাভূমিতে পচন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন হয়। একে জলগ্যাস বা মার্স গ্যাসও বলা হয়। এ গ্যাসের সাথে অনেক সময় সামান্য পরিমান ফসফিন (চঐ৪) মিলে মিথেন উৎপন্ন হয় যাতে সহজে আগুন ধরে যায়। এটাই হলো সেই আগুন। যেই আগুনকে তুমি ভূতের আগুন বলে ভয় পেয়েছো।

মামার সাইন্টিফিক ব্যাখ্যার প্রতি মীনা কোন প্রকার মনোযোগ দিতে পারলো না। কেননা মীনার মনের ভেতর তখন ভীষণ ভূতের ভয়। কিছুক্ষণ আগে ঘোর অন্ধকারে কে যেনো হারিকেন বাতিটা উড়িয়ে নিয়ে গেছে। হারিকেনটাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মীনা ও রাজু খুব শক্ত করে মামার হাত দু’টি ধরে সামনের দিকে হাটছে। সড়কটির আর কিছু দূর অগ্রসর হলেই একটা পুরোনো বাড়ী। গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে হলে সেই ভয়ানক বাড়ীটির ভেতর দিয়ে যেতে হবে। বাড়ীর ভেতর মাটি দিয়ে তৈরী ঘরগুলি ভেঙ্গে পড়েছে। সেই ভাঙ্গা মাটির ঘরটির ভেতর থেকে হালকা একটু নীল আলো বাহির থেকে দেখা যাচ্ছে। ভূতুরে বাড়ীটির চারপাশ ঘেষে লতাপাতায় জঙ্গল হয়ে আছে। এরই মধ্যে রাজুর পিপাসা পেয়েছে। এই গভীর অন্ধকারে পানি কোথায় পাবে? ভূতুরে বাড়ীটি ছাড়া আশে পাশে কোন বাড়ী ঘর নেই। রাজু পানির পিপাসায় বিরক্ত শুরু করেছে। চিৎকার করে বলছে পানি খাবে। মীনা মামাকে ঐ ভাঙ্গা মাটির ঘর দেখিয়ে বলে “মামা দেখো ঐ যে ঘরটিতে আলো দেখা যাচ্ছে, সেখানে নিশ্চয়ই কোন মানুষ রয়েছে। চলো মামা সেখান থেকে পানি নিয়ে আসি। মামা মীনাকে খুব সতর্কতার সাথে বারণ করে বলে “খবরদার সেই ঘরে যাবে না। সেই ঘরে এক ডায়নী বুড়ি থাকে, আস্তো গিলে খাবে। সেটা নিষিদ্ধ ঘর কেউ যায় না সেখানে। সেই ঘর থেকে প্রায়ই একটি বুড়ির হাসি কান্নার শব্দ শোনা যায়। সেই ঘরের বুড়িটা একটা অদৃশ্য বুড়ি। মাঝে মাঝে দেখা দিয়ে আবার অদৃশ্য হয়ে যায়। মাঝে মাঝে অশরীরিভাবে বাড়ীর আঙ্গিনায় এসে রাক্ষুসী ডায়নী বুড়ির মতো হাসে। মামার কথাগুলি শুনে ভয়ে মীনা ও রাজুর শরীর শিউরে উঠলো। এরই মধ্যে এক অদৃশ্য কন্ঠ ভেসে এলো
ধুপ .... ধাপাস পায়ের শব্দ কে যেনো বলছে
হাউ মাউ খাও, মরা মানুষের গন্ধ পাও,
মীনা কোন কিছু বোঝার আগেই দৌড়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু বেশী দূর যেতে পারলো না। এক অজানা শক্তি পা দু’টিকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। মীনা উচ্চ স্বরে চিৎকার করতে লাগলো। কিন্তু মীনার চিৎকার কেউ শুনছে না। ভয়ে মীনার কন্ঠ স্তব্ধ হয়ে আসছে। এরই মধ্যে শো ... শো ... শব্দ করে ধপ করে সামনে উপস্থিত হয় একটি লোক। লোকটি অস্পষ্ট, ভয়ানক। মাথা ন্যাড়া, একটি চুলও নেই। শুধু কি চুল? চোখের পাপড়ি নেই, ভ্রু নেই। মীনা এই ন্যাড়া লোকটিকে দেখে ভয়ে চোখ বন্ধ করে ন্যাড়া ভূত, ন্যাড়া ভূত বলে চিৎকার করে মামাকে ডাকতে থাকে। কিন্তু কে শুনবে মীনার চিৎকার। আশে পাশে তো কেউ নেই। তাছাড়া মীনার কন্ঠ থেকে ভয়ে শব্দ বেরুচ্ছে না। মীনা হাউ মাউ করে কাঁদছে আর ন্যাড়া ভূতটাকে অনুনয় বিনয় করছে বাঁচবার জন্য। ন্যাড়া ভূতটা মীনাকে এক ধমক দিয়ে বলে “চুপ করো মেয়ে, কান্নাকাটি করলে একবারে গিলে খাবো”। আ ..... খা ..... খাপ ..... আমি ন্যাড়া ভূত। তুমি দৌড়ে কোথায় যাচ্ছিলে জানো? আর এক কদম পা বাড়ালে তুমি এই বিশাল কুয়োর মধ্যে পড়ে যেতে। এই ভয়ানক কুয়োতে পড়লে তোমাকে আর বাঁচানো যেতো না। আমি তোমাকে বাঁচানোর জন্য এই রূপ ধারণ করেছি। মীনা তাকিয়ে দেখে ন্যাড়া ভূতটার দিকে, মুখমন্ডল দেখতে ভীষণ ভয়ানক কালো। মীনা বললো, ন্যাড়া ভূত তুমি বুঝি এই কুয়োতে থাকো। ন্যাড়া ভূত হুংকার দিয়ে বলে “না”। ন্যাড়া ভূত তখন খুব রাগান্বিত স্বরে বলে শোনো মেয়ে, এই কুয়োতে রয়েছে আমার মা, বাবা, ভাই সহ এই গ্রামের অনেক মৃত লাশের কংকাল। মীনা ভয়ার্ত তাকিয়ে দেখে একটি ময়লা আবর্জনা লতাপাতা ভর্তি একটি বিশাল বিপদজনক ‘কুয়া’। কুয়া থেকে পঁচা গন্ধ বেরুচ্ছে। মীনা আর এক কদম পা বাড়ালে সেই কুয়াতে পড়ে মারা যেতো। কুয়াটা দেখে মীনা ভয়ে আঁতকে উঠলো। অবাক হয়ে ন্যাড়া ভূতটার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপরও মীনার মনের ভেতর ভীষণ ভয়। ন্যাড়া ভূতটার উপর মীনার মোটামুটি আস্থা ফিরে পেলো। কিন্তু পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না। তবুও মীনা কাঁপা কাঁপা কন্ঠে ন্যাড়া ভূতটাকে বলতে থাকে “তোমার বাবা, মা, ভাই কিভাবে এই কুয়োতে পড়েছিলো।”

ন্যাড়া ভূতটা হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে চুপ বোকা কোথাকার । সবাইকে কি তোমার মতো বোকা ভেবেছো। মীনা ন্যাড়া ভূতের ধমক খেয়ে চুপ করে রইলো। ন্যাড়া ভূতের এই রকম উদ্ভট আচরণ মীনার ভালো লাগছে না। সে ন্যাড়া ভূতটাকে মনে মনে ঘৃণা করতে লাগলো। ন্যাড়া ভূতের চোখকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য চোখের আড়ালে মীনা সুযোগ খুঁজছে পালাবার জন্য। যেভাবেই হোক ন্যাড়া ভূতের খপ্পর থেকে বাঁচতে হবে। ন্যাড়া ভূতটা আকাশপানে তাকিয়ে হোঃ হাঃ করে হাসতে হাসতে মীনার দিকে তাকাতেই মীনা এই রকম অদ্ভুদ হাসি দেখে আরো ভয় পেয়ে যায়। চোখ বুজে দিলো এক দৌড়। দৌড়ে বেশি দূর এগুতে পারলো না, ঝুপ করে পুকুরের পানির মধ্যে যেয়ে পড়ে। মীনা পুকুরের পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে আর বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করছে। কিন্তু এই গভীর রাত্রে এখন সবাই গভীর ঘুমে অচেতন, কে শুনবে মীনার চিৎকার। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই মীনাকে পানিতে ডুবে মরতে হবে। এরই মধ্যে ন্যাড়া ভূতটি পানিতে ঝাপিয়ে পড়ে এবং পানি থেকে মীনাকে উদ্ধার করে পুকুর পাড়ে নিয়ে আসে। পুকুরের পানিতে মীনার পেট ফুলে আছে। ন্যাড়া ভূতটি প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে মীনার পেট থেকে সমস্ত পানি বের করে দিলো। মীনা আস্তে আস্তে সুস্থ্য হয়ে জ্ঞান ফিরে পেলো। মীনা হা করে তাকিয়ে থাকে ন্যাড়া ভুতটার দিকে। মীনা ন্যাড়া ভূতটাকে আরো বেশি করে ভুল বুঝতে লাগলো। মীনা ভাবছে এই ন্যাড়া ভূতটাই তাকে ধাক্কা মেরে পানিতে ফেলে দিয়েছে। মীনা ন্যাড়া ভুতটাকে আরো বেশি করে ঘৃণা করতে লাগলো। এবারও পালানোর বুদ্ধি বের করতে থাকে, যেভাবেই হোক পালাতে হবে। তখন গভীর রাত রাজু ও মামাকে হারিয়ে ফেলেছে পথ ভুলে। মীনা একা একা বসে ভাবছে কী করবে ? কিভাবে এখান থেকে পালাবে। মীনার চোখ এদিক সেদিক ছটফট করে তাকাচ্ছে। ন্যাড়া ভূতটা মীনার ভাবভঙ্গি লক্ষ্য করলো। মীনার দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলতে লাগলো “এই তুমি দৌড়ে পালাতে গেলে কেন? মরবার বড় সাধ জেগেছে? আবার যদি দৌড়ে পালাবার চেষ্টা করো একটা আছাড় মেরে পেটের নাড়ি ভুড়ি বের করে ফেলবো। মনে রেখো আমি একটা ন্যাড়া ভূত। ন্যাড়া ভূতটা কলা গাছের একটা পাতা ছিড়ে মাটিতে বিছিয়ে দিয়ে বললো” মীনা তুমি এখানে চুপ করে বসে থাকো। একটু পরে তোমার মামা তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে এখানে আসবে। তোমাকে একা ছাড়া যাবে না। তাহলে তুমি বিপদে পড়ে যাবে।
কথাটা শোনা মাত্রই মীনা খুব করুণ দৃষ্টিতে ন্যাড়া ভূতটার দিকে তাকালো। আচ্ছা ন্যাড়া ভূত আমাকে এখানে কতক্ষণ বসে থাকতে হবে ন্যাড়া ভূত কথাটা শোনা মাত্রই রেগেমেগে আবারও ধমক দিয়ে বলে “এই মেয়ে বেশী কথা বললে কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখবো। মীনা একদম চুপ। কথা বলছে না, ভাবছে অন্য কিছু। কখন মামা আসবে। কিছুক্ষণ পরে ন্যাড়া ভূতটা মীনাকে উদ্দেশ্য করে বলে” মীনা তুমি কোন ক্লাসে পড়।
মীনা ঃ ৫ম শ্রেণী।
ন্যাড়া ভূত ঃ হুম খুব ভালো কথা। শোনো মেয়ে সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের নাম বল।
মীনা ন্যাড়া ভূতের মুখে মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললো, কেন বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ বলেই মীনা মাথা চুলকাচ্ছে আর কিছু মনে পড়ছে না।
ন্যাড়া ভূত মীনাকে আবার হুংকার দিয়ে বলে শোনো বোকা মেয়ে ৫ম শ্রেণীতে পড় এখনও সাত বীরশ্রেষ্ঠের নাম জানো না। ইচ্ছে করছে এখনই তোমার কানটি ছিঁড়ে ফেলি। আমি ন্যাড়া ভূত আমিই বলছি সাত বীরের নাম মুখস্থ করে নাও .........
সিপাহী মোস্তফা কামাল, ল্যান্স নায়েক মুন্সি আব্দুর রব, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান, ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ, সিপাহী হামিদুর রহমান, মোঃ রুহুল আমীন, ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর, মীনা হাঁ করে তাকিয়ে দেখে ন্যাড়া ভূতটার দিকে। ন্যাড়া ভূতটাকে প্রশ্ন করে আসলে তুমি কে? বলোতো ... ....

ন্যাড়া ভূত ঃ হাউ মাউ করে হুংকার দিয়ে উঠলো। এই বেয়াদব মেয়ে এত বেশী জানতে চাও কেন? দেখছো না আমি ন্যাড়া ভূত। ঐ যে লতাপাতা ঘেরা ভাঙ্গা পুরাতন মাটির ঘরটি সেখানেই আমি থাকি। যেখান থেকে নিবু নিবু নীল বাতির আলো দেখা যাচ্ছে সেই আলোটিই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। ঐ যে বাড়ীটি, ঐ বাড়ীর ২০০ গজ এর মধ্যেই আমার আনাগোনা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে এই গ্রামের ক্ষমতাসীন মানুষদের আমি ঘৃণা করি যারা যুদ্ধের বছর এই দেশের সাথে বেঈমানী করেছে। তার পর থেকে আমি এই গ্রামের বিচ্ছিন্ন একটা মানুষ। এখন আমি মানুষ নই ন্যাড়া ভূত।

ন্যাড়া ভূতটা কথাগুলো বলছে তাঁর চোখ বেয়ে ফোটা ফোটা পানি পড়ছে। এই নিষিদ্ধ কুয়াটার কাছে এই গ্রামের কেউ আসে না ভয়ে। মীনা তুমি জানো এই যে কুয়াটা এটার পাহারাদার একমাত্র আমি। কেন জানো?
মীনা মনে মনে ভাবছে খুব মজার রহস্য হবে তাই মীনা একটু হাসি দিয়ে বললো “তুমি পাগলা ন্যাড়া ভূত। কুয়াটার পাহারা দাও কেন?
ন্যাড়া মীনার পাগল শব্দটা শুনে খুব দুঃখ পেল। তবু বলতে লাগলো “শোনো মীনা ১৯৭১ সালে আমাদের দেশে একটি মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিলো। স্বাধীনতার যুদ্ধ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, একটি বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার জন্য এই যুদ্ধ হয়েছিলো। তখন আমি ছোট ছিলাম। অত্যাচারী খান সেনাদের গতিবিধি লক্ষ্য করে বিভিন্ন খবর এনে দিতাম মহান মুক্তিযোদ্ধাদের। যারা আমাদের দেশের গর্বিত সন্তান ছিলো। বাসা থেকে ভাত রান্না করে, গাছের ডাব পেড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়াতাম। তারপর গ্রামের মাতবর, চেয়ারম্যান, ঘটকসহ কিছু দুষ্টু লোক ছিলো রাজাকার-আলবদর বাহিনীর নেতা। সেই দুষ্টু লোকেরা পাকিস্তানী অত্যাচারী খান সেনাদের বলে দেয় আমার কথা। আমি তখন পালিয়ে যাই। খান সেনারা আমাকে না পেয়ে আমার বাবা, মা, ভাই সকলকেই ধরে নিয়ে যায়। পরের দিন জানতে পারলাম, খান সেনারা সবাইকে মেরে ফেলেছে। লাশগুলো কুয়ো‘র মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এটাই হলো সেই কুয়ো। বলেই ন্যাড়া ভূত ছোট বালকের মতো প্রথমে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে, এবং কিছুক্ষন পরেই হাউ মাউ করে কাঁদতে থাকে। এরই মধ্যে মসজিদ থেকে ভেসে আসে ফজরের আযান। ন্যাড়া ভূতটা মা, বাবা, ভাই বলে তখন চিৎকার করে কান্না করতে করতে কোথায় যেনো উধাও হয়ে যায়। মীনা নিজের অজান্তে কখন যে ন্যাড়া ভূতটার ওপর ভীষণ মায়া জন্মালো টের পায়নি। তাই মীনাও মুখ ফুটে বলে ফেললো ‘ন্যাড়া ভূত তুমি যেয়ো না’। কথা শুনে যাও। ন্যাড়া ভূত তুমি যেও না .........। মীনা ন্যাড়া ভূতটার কাছ থেকে আরো কিছু জানতে চেয়েছিলো। কিন্তু ন্যাড়া ভুতটা মুহুর্তের মধ্যে কোথায় উধাও হয়ে গেলো ভাবতেই মীনার চোখ বেয়ে পানি পড়তে থাকে। এরই মধ্যে ভোরের আলোয় চারিদিক আলোকিত হয়ে ওঠে। রাজু, মামা সহ গ্রামের অনেক লোক মীনার কাছে ছুটে আসে। মামা মীনাকে জড়িয়ে ধরে আবেগ কন্ঠে বলতে থাকে “মীনা তুমি এক দৌড়ে কোথায় হারিয়ে গেলে সারা গ্রাম তন্য তন্য করে খুঁজেও কোথাও তোমাকে পেলাম না। মীনার চোখে পানি। মীনার সমস্ত শরীরের কাপড় ভেজা। মীনা তাকিয়ে দেখে সেই ভয়ানক কুয়াটার দিকে। কুয়াটার ঠিক অপর দিকে ভয়ানক পুকুর। একটু দূরেই সেই ভয়ানক ডাইনী বুড়ির বাড়ীটা। সব কিছুই আছে। মীনা মামার সাথে হাটছে আর পেছন ফিরে শেষবারের মতো ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে কুয়া, পুকুর ও পুরোনো ডায়নী বুড়ির বাড়ীটার দিকে।

মীনা বাড়ীতে ফিরে মামাকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলে। মামা মীনার কথা শুনে হোঃ হাঃ করে হাসতে হাসতে বলে “মীনা শোনো ভূত এর অর্থ ভূ মানে পৃথিবী, ত মানে তোমার অর্থাৎ ভূত মানে ‘পৃথিবীটা তোমার’ এখানে ভূত বলে কোন জীব নেই। মামা আবারও হাসতে হাসতে বলতে থাকে “শোনো মীনা তুমি যাকে ন্যাড়া ভুত বলছো সে তো আমাদের গ্রামের রমিজ পাগলা। গ্রামের সবাই তাকে ন্যাড়া রমিজ পাগলা বলে ডাকে। এক অদ্ভুদ একটা মানুষ, শুধু শুধু মানুষের উপকার করে বেড়ায়। দিনের বেলায় তাকে দেখা যায় না। রাতে হঠাৎ হঠাৎ দেখা যায়। মীনা হতভম্ব হয়ে মামার কথাগুলো শুনছে আর ভাবছে ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া বাবা, মা, ভাই বোন হারানো ন্যাড়া ভূতটির কথা।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন