বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩১ ডিসেম্বর ১৯৮২
গল্প/কবিতা: ৭টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

কম্বল জড়ানো কাল বিড়াল

ত্যাগ মার্চ ২০১৬

সীমান্তে গাঁদা ফুল

ফাল্গুন ফেব্রুয়ারী ২০১৬

হিসাব

অস্থিরতা জানুয়ারী ২০১৬

বৈরিতা (জুন ২০১৫)

অক্টোপাস

মনিরুজামান লিংকন
comment ৪  favorite ১  import_contacts ৪০৭
টিনের বাক্্রটা পড়েছিল একরকম ফাঁকা। মধ্যে একটা টুপি, তজবিহ্ আর লম্বা পাঞ্জাবিটা ছিল ফিতে ছাড়া। বাক্্রটা ছিল মসজিদের ঈমামের । যিনি পালিয়েছিলেন ভয়ে। ভয়টা ছিল ছুড়ির, যা ছিল চকচকে এবং উদ্ধত। আর একাত্তরের গেইদ্যার হাতে।
গেইদ্যা চোরা সে রাতে হাত বুলিয়েছিল নিজের দাড়িতে। চোর উপাধি ঘুচাতে দাড়ি যেন আরও আগোছালো হয়ে পড়ছিল। ঠিক যেন অপরিপক্ক হাতে ছাটা বনসাই। সে তৈরি হচ্ছিল এ’শার নামাজ পড়ানোর জন্য। যদিও তখন সে দোয়া কুনত জানত না। মুসুল্লিরা বুঝতে পেরেছিলেন মুক্তি হুজুর আউট, রাজাকার হুজুর ইন।
সে রাতে আরও ভয়াবহ কিছু অপেক্ষা করছিল মজিদের বাড়িতে। মায়ের সাথে দেখা করার জন্য মজিদ সেদিন বাড়িতে এসেছিল। গেইদ্যা সে খবরটা টের পেয়েছিল। পাকসেনারা ছুড়ি বসিয়েছিল মজিদের বুকের উচ্চতায়। স্টেইনলেস স্টিল ছুড়িতে ঠিক যেন বেকার ঈস্টে ফুলানো ময়দার কেক কাটা। গোপন কথা ফাঁস করানোর শেষ অপকৌশল হিসাবে , বৃদ্ধা মাকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল চোখের সামনে। নিচে গড়িয়ে নামা লাল উষ্ণতার দিকে তাকিয়ে মজিদ হেসে বলেছিল,” মানষিক অশান্তির থেকে শারিরীক শাস্তি উত্তম”। আর শত্রæদের প্রতি উক্তিটা ছিল তাদের নির্মমতার চরম অবজ্ঞার ঘোষনা পত্র পাঠের মত।
পাক সেনাদের দ্রুত কাজ শেষ করার জন্যই যেন গেইদ্যা বড় হুজুরকে বলেছিল,” ষাড় গোসল করানো শরীর। অত সহজে মরন নাই। দোযখে যাইতে লেইট হইবে মনে হয়”। বড় হুজুর উর্দুতে পাক সেনাদের কিছু বলেছিল। মূহুর্তেই কয়েকটা গুলির শব্দ হয়েছিল উদ্বোধনি অনুষ্ঠানে আতশবাজির ছন্দের মত। গড়ানো কুসুম গরম রক্ত ছড়িয়ে পড়ছিল উঠোনে। পিপড়ে গুলোকে আমন্ত্রন জানাননোর জন্যে লুঙ্গিটাও ছিল রক্ত ভেজা।
রক্ত শুকানোর আগেই গেইদ্যা চোরা বড় হুজুরের পক্ষ থেকে নাম পেয়েছিল গিয়াস উদ্দীন আল অযম। আর অনামিকায় বিবাহপূর্ব আংটির মত সহযোগি এখলাস মোল্লাকে।
আশেপাশের মানুষরা বিড়াল চলে যাওয়ার জন্য যেন অপেক্ষা করেছিল। তারা ইদুরের গর্ত থেকে বেড়িয়ে এসেছিল লাশ দাফনের জন্য। শরীর থেকে রক্তের দাগ মোছায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। আর তারা বাম চোখটার আধবোজা কোটর থেকে জমাট রক্ত বের করছিল ভেজা কাপড়ের টুকরো দিয়ে। যতœ ছিল, আর ছিল কোন শকুনের চোখ এড়ানোর তাড়া।
সে রাতে শুধু রেহাই পেয়েছিল ষাঁড়টা। ওদের টের পাবার আগেই ষাঁড়টা পালিয়েছিল। মজিদের লাল ষাঁড়। গেইদ্যারা নতুন অভিভাবক হিসাবে হাস, মুরগী আর ছাগল গুলো তুলে নিয়ে গিয়েছিল সে রাতে।
পরদিন সকালে গেইদ্যা পরিপূর্ন রাজাকার হিসাবে ঘুম থেকে উঠেছিল। দরজার বাইরে এখলাস মোল্লা দাড়িয়েছিল ষাঁড়ের দড়ি ধরে। এখলাস মোল্লা ইতোমধ্যে গেইদ্যাকে হুজুর ডাকতে শুরু করেছিল। ষাড়টাকে দেখিয়ে বলেছিল,” মইজ্যার লাল ষাঁড়। হুজুর যদি কবুল করেন”। গেইদ্যা বলেছিল,”ওরে হুজুরগো দাওয়াত দে। এমনিতেই মইজ্যার বউ ছিল না, হুজুরগো কত কষ্ট গেছে কাইল রাইতে। দেখছো গরুটাও কেমন হুজুরগো পেটে যাওয়ার জন্য টকটকে লাল হইছে। দেখ বোবা পশুও বোঝে হুজুরগো পেটে গেলেই বেহেশ্ত”। ভক্তিভরা এই হুজুরগোর একজন ছিল বড় হুজুর আর অন্য হুজুররা ছিল পাক সেনারা।
ষাঁড়ের মাংষ পাক¯হলি পার হয়ে অন্ত্রে পৌছানোর পর গেইদ্যা পেটের মধ্যে গড় গড় শব্দ শুনতে পেয়েছিল। বদনা হাতে দৌড়ানোর মত কোন ব্যাপার ছিল না। কিন্তু তার চোখের পাতা আপনা আপনি খুলে গিয়েছিল। সে দেখছিল বিছানার পাশে দাড়ানো ষাঁড়টাকে। মজিদের লাল ষাঁড়! সে উঠতে পারছিল না যাচাইয়ের জন্য। সে শুনতে পেয়েছিল ষাঁড়টার পক্ষ থেকে অভিষাপের সবটুকু। যেখানে ষাঁড়ের ভাষা বোঝার অভিষাপও ছিল !
পরদিন থেকেই সে অনুভব করছিল অভিষাপ জিনিষটা টয়লেট ছাড়া পেট খারাপ সামলানোর মত ব্যাপার। রাস্তা দিয়ে হেটেও শান্তি ছিল না। হয়ত দূর থেকে কোন ষাঁড় মুখের ঘাস ফেলে তাকে ডাকতো,”এই গেইদ্যা, এই রাজাকার, কই যাও”। এমনকি ঝগড়া থামিয়েও এক ষাড় অন্য ষাড়কে বলতে শুনত,”দেখ রাজাকার গেদু যাইতেছে। দিনতো আর বেশি নাই। পূর্নিমার রাইত হইবে ওর শেষ রাইত”। লাল, সাদা, কাল সব ষাড়ের একই গান, পূর্ণিমার রাত হবে শেষ রাত। সে পূর্ণিমার রাত ভয় পেতে শুরু করেছিল। অবশেষে সে ঠিক করেছিল পরামর্শক হিসাবে কোন রাজাকারের ষাঁড় এনে পোষার জন্য। এখলাস মোল্লা সব শুনে নিজের সাদা ষাঁড়টাকে উপহার দিয়েছিল।
তদবিরকারি।
তোষামোদকারি।
সাদা ষাঁড়।
সাদা ষাঁড়টা আজ্ঞাবহের মত হুজুর হুজুর করত ঠিকই কিন্তুু ঠিক করে বলতে পারছিল না কোন দিন সেই পূর্ণিমার রাত। অন্য ষাঁড়রা নাকি তার থেকে সব কিছু লুকাতো। এমনকি জাত খাওয়া রাজাকার ষাঁড় বলেও পর্যন্ত ডাকত। তাই সাদা ষাঁড়টা প্রতিটা পূর্ণিমার রাতে গেইদ্যাকে সতর্ক করে দিত ঘরের বাইরে না বেরুনোর জন্য। এর বেশি উপকার করতে পারছিল না।
গেইদ্যা পোষা ষাঁড়ের পরামর্শে অন্য ষাড়গুলোকে এরানোর জন্য ভিন্ন পথে হাটা শুরু করেছিল। যেন অত্যাচার এরানোর এর তেকে ভাল আর কোন উপায় খুজে পাচ্ছিল না।
হঠাৎ করেই একদিন একটা লাল ষাঁড়, সবুজ মাঠে লাল বৃত্তের মত চোখে পড়েছিল। মনে হচ্ছিল বাংলাদেশের পতাকা। গেইদ্যা পালিয়েছিল ভয়ে। পিছন ফিরে যতবার তাকিয়েছিল, দেখতে পেয়েছিল লালটাকে ঘিরে সবুজের বিস্তৃতি ক্রমশ বাড়ছে। একসময় তা দিগন্ত ছুয়েছিল।
¯^াধীনতার প্রথম সূর্যে গেইদ্যার পূর্ণিমার ভয়টা বেড়েছিল। বড় হুজুরের পালিয়ে যাওয়ার সংবাদে তা দ্বিগুন হয়েছিল। লুটের অর্থ, আর হাল ভাঙ্গা রাজনীতির সুযোগে গেইদ্যা নিজেকে অনুভব করেছিল অক্টোপাসের মধ্যে।
বিশ্বাসঘাতক।
সুযোগ সন্ধানি।
বর্ণচোরা।
অক্টোপাস।
দিনে দিনে পূর্ণিমার ভয়টা কেটে গিয়েছিল। রাজনীতি চলে এসেছিল পূর্নিমায় নিজেকে পরখ করে দেখার মত অনুকূলে। বড় হুজুর ফিরে এসেছিল ¯^গর্বে। হঠাৎ করেই বৃদ্ধ গেইদ্যার মধ্যে জেগে উঠেছিল, কোন এক পূর্ণিমায় কিশোরীর হাত ধরে চাঁদ দেখার বাসনা ।
কেটে গিয়েছিল দিন,মাস,বছর। মুক্তিকামী মানুষগুলোর হাড়ের উপর একটু একটু করে মাংষ জমেছিল। তারা চিহ্নিত করেছিল ঘাপটি মারা অক্টোপাস।
এক পূর্ণিমার রাতে এখলাস মোল্লা গেইদ্যাকে খবর দিয়েছিল, ”হুজুর, বড় হুজুর ধরা খাইছেন। জনগন আজ তার বিচার করবে। আপনি যদি তার পক্ষে সাক্ষ্য দেন তবেই সে মুক্ত”।
হঠাৎ করেই গেইদ্যা অনুভব করেছিল বুকের মধ্যের মরুদ্যান। দেথতে পেয়েছিল পূর্ণিমার রাতে ভয় না পাওয়া প্রমানের সুযোগ। সে চৌকাঠের বাইরে পা রেখেছিল। দূর থেকে সাদা ষাঁড়ের বাচ্চা সাদা ষাঁড় জুনিয়র চেচিয়ে সতর্ক করেছিল,” হুজুর আজ পূর্ণিমা”!
এখলাস মোল্লা দেখছিল,একটা লাল ষাঁড়ের অর্ধ চন্দ্র দুই শিং এর ভাজে আটকা পড়া গেইদ্যার পা ঝাপটানো! শুনতে পেয়েছিল, দূরে শিয়ালের ডাক আর তাল পাতায় দীর্ঘ প্রতিক্ষিত শকুনের ডানা ঝাপটানোর শব্দ।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন