বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৬ জুলাই ১৯৮০
গল্প/কবিতা: ৩টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৪৮

বিচারক স্কোরঃ ২.৪৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.০৩ / ৩.০

ব্যথা (জানুয়ারী ২০১৫)

মোট ভোট ৪৪ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৪৮ আবছায়ায় জ্বলজ্বলে নীল দুটি চোখ

মাহমুদ হাসান পারভেজ
comment ১৯  favorite ১  import_contacts ৭৪০
১.
নভেম্বরের শুরুতেই হাড় কাঁপানো এক শীতের বিকেলে রাঙ্গু শেষতক মারা গেল। তার আগে ঘন ঘন আদুরে হাতগুলোর যাদুমাখা পরশ যেন বার বার তার হারানো মায়ের কথাই মনে করিয়ে দিল। কত বয়স হবে ওর? পনের কি ষোল দিন। আমার পুত্র সন্তানের বয়সের সমান কি! ঐটুকু নবজাতকের বেঁচে থাকার জন্য মায়ের ওম যে কি দরকারি! তবু শেষ চেষ্টা করেও হ’লনা। বাঁচানো গেলনা তুলতুলে লোমশ শরীরের ছোট্ট প্রাণটা।

জন্মের পর থেকে মা তার নরম শরীরের ওম দিয়ে যেইভাবে আগলে রাখতো- দীপার নরম হাতগুলো সেইভাবেই চেষ্টা করে যাচ্ছিল। না। লিকলিকে শরীরে মায়ের শরীরের অদৃশ্য সেই উষ্ণতা তবু কোনভাবেই ফিরে এল না। দীপার হাতের তালুতে ছোট্ট মুখটা গুঁজে দিয়ে শেষবারের মত ও কেবল আমার চোখে চোখ রাখতে পারলো। ওর ভেজা আর্ত চোখের চারপাশে কালসিটে পড়ে গিয়েছিল। গর্তের ভেতরে ঢুকে যাওয়া চোখদুটি কোন রকমে সে মেলে রাখলো। টের পেলাম- কোটরাগত সেই জ্বলজ্বলে নীল চোখের তারায় তখন মৃত্যুর আবছায়া ঘোরাফেরা করছিল! আর শেষমুহুর্তে অস্ফুট ‘মিউ মিউ’ গলায় ও যেন আমাকে বলে গিয়েছিল- যদি পারো, আমার নিষ্প্রাণ শরীরটা আমার মায়ের কাছে ফেরত দিও।

নিঃসাড় সেই তুলতুলে দেহটা দীপা তখনও ধরে ছিল। যেমন করে কোন মা তার নয় মাসের গর্ভজাত শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার পরপর আলতো করে ধরে রাখে- শরীরের সাথে- ঠিক সেইভাবে। সেই সন্তান চিরদিনের মত উড়ে গিয়েছিল অদৃশ্য কোন জগতে। আর বিচ্ছিন্ন এই মহাকালে তার নিথর দেহ পড়ে থাকে মায়ের বুকে। যে বুকটা আসলেই শুন্য। সন্তান হারানো কোন মায়ের মতই দীপার চোখ ভিজে উঠল। ভাষাহীন ও নিরব কাজল মাখা বাঁধ না মানা অশ্রুরা যেন টপাটপ পড়েই হারিয়ে যাচ্ছিল মৃত শরীরের লোমগুলোর ভেতরে।

রাঙ্গুকে হারানোর শোকে দীপার ভেতরটা সেদিন দুমড়ে মুচড়ে উঠেছিল। সে দুই হাতে রাঙ্গুকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকল। আবাসিক হোটেল রুমের বাইরে তখন ভারি কুয়াশার কুন্ডলিরা দ্রুতই নিকশ এক অন্ধকারের সন্ধ্যা নামিয়ে আনল। আর আমার চলে যাবার সময়ও হয়ে এসেছিল। দীপাকে সান্তনা দেওয়ার মত কোন ভাষা আমার জানা ছিলনা। ‘কাল দুপুরের আগেই আবার আসছি- ভাল থেক’ বলেই আমি হোটেলটা থেকে বেরিয়ে পড়লাম।

আমাকে তখন ফিরতে হবে পঞ্চাশ মাইল দুরের অন্য আরেক শহরে। যেখানে আমার সন্তানেরা থাকে-পরম যত্নে আর স্নেহমাখা আদরের পরশে- তাদের অতি প্রিয় মা আর দাদা দিদার সাথে। হোটেল থেকে বেরিয়ে আমি মোটর বাইকটা স্টার্ট করলাম। হেড লাইটটা জ্বালিয়ে দিলাম মহসড়কের পাসিং লাইন বরাবর। যে লাইনগুলো সোজা গিয়ে ঢুকলো আমার শহরে। যে শহরে আমরা বাস করি বহুকাল ধরে। আমাদের পূর্ব পুরুষের রেখে যাওয়া ছোটবড় ঘরগুলোর সাথে মিলেমিশে- সেই একই বাড়ীতে। যেখানে সকলের শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে সুখ-দুঃখ আর হাসি কান্না আমরা ভাগ করে নিতে শিখেছিলাম কোন অদৃশ্য উপায়ে।

আমি সেই বাড়ীতে ফিরলাম রাত দশটায়। ছোটরা তখন ঘুমিয়েছে। আমি পরিবারে অন্যদের সাথে নিয়মিত কথোপকথন আর গুরুত্বপুর্ণ সাংসারিক আলোচনাগুলো শেষ করেছিলাম- মনের ভেতরে থাকা গোপন প্রেমিককে জাগিয়ে রেখেই। যে প্রেমিক পুরুষ গত হয়ে যাওয়া দুটো দিন আর গভীর রাত অবধি জেগে জেগে কাটিয়ে দিয়েছিল নিঃসঙ্গ দীপা আর রাঙ্গুর সাথে। সেই রাঙ্গু- যাকে সাঁওতাল রাজার একমাত্র জীবিত বংশধরের গ্রাম থেকে তুলে আনা হয়েছিল। যে গ্রামের নাম রঙ্গন গাঁ। আর সে নামের স্মৃতিকে জড়িয়ে দীপা বিড়াল ছানাটির নাম রেখেছিল- রাঙ্গু।

২.
মাঝরাত। আমার চোখে ঘুম নাই। চিরপরিচিত ও ঘনিষ্ট পারিবারিক বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি তখন আমার শিশু সন্তানটির চুক চুক করে খাওয়ার শব্দ শুনতে পারছি। আর গত সন্ধ্যায় মরে যাওয়া ছানাটার কোটর ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা চোখদুটো তখন আমার বন্ধ চোখের পাতায়। ভিষণ নীল জ্বলজ্বলে সেই চোখ দুটো। আমি কি করে ভুলে থাকি সেই চোখ! আর এই ঘর? আমার গুমোট অস্থিরতায় তখন প্রকট সিদ্ধান্তহীনতা। কষ্মিনকালেও আমি এ ঘর- এ বিছানা ছাড়তে পারবনা। এ অসম্ভব! এই যে আমার পুত্র- যে মাত্র ক‘দিন আগে এই পৃথিবীর আলো দেখেছে। ওর নিশ্চিন্ত মায়ের শরীরের সাথে লেপ্টে জড়িয়ে ধরে একটু পর পর নিজের চাহিদা জানান দিচ্ছে। সে তো আমারই আরেক অংশ। তাকে আমি ফেলে যাই কি করে? ও ঘরে আমার আরেক অংশ- যে আমার বড় কন্যা। দিদার সাথে পরম স্নেহ জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। ঘুম থেকে জাগলেই যে বাবার জন্য অনেকদিনের নিয়ম মতো অপেক্ষা করবে শুধু একটি মাত্র কথা শোনার জন্য- ‘শুভ সকাল বাবা’। তাকে ফেলে যাই কি করে? অথচ আমার জন্য অপেক্ষায় আরো একটি ঘর। যে ঘরের স্বপ্নে নিঃসঙ্গ দীপা কয়েকশ মাইল দুরের শহর থেকে চলে এসেছিল। শুধু ঘরের জন্য। একটা মাত্র ঘর!

‘কি হয়েছে! কোন সমস্যা?’ হ্যাপী জিজ্ঞেস করতেই টের পেলাম সে জেগে আছে। আর নিরবে জ্বলতে থাকা ঘরের নীল বাতির আলোয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সে আমাকে লক্ষ্য করে যাচ্ছিল। আমার অস্থিরতা যাতে কোনভাবে টের না পায়- স্বাভাবিক ভাবেই বললাম, ‘ না, এমনি। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল’। ঘুম জড়ানো গলায় সে আবারও তলিয়ে গেল। শুধু শুনতে পেলাম- ‘ও’। যার অর্থ হতে পারে- দীর্ঘ গর্ভ ও প্রসবজনিত বিরতিতে অপেক্ষমান স্বামীর জন্য স্ত্রীর আপ্তবাক্য- ও। এই তো আর কয়েকটা মাত্র দিন। একটু ধৈর্য ধর- আমার প্রাণভোমরা।
কিন্তু হ্যাপী কোনভাবেই জানলনা যে- তার প্রাণভোমরাটি এখন অন্য কোন ফুলে। সমস্ত অপেক্ষা আর ধৈর্য-শুড় যেখানে বিলীন হয়ে গিয়েছিল- সেই মন মাতানো ফুলের গোলাপী পাপড়ির অজস্র আকর্ষণে। যার মধুরসে নীল বিষাক্ত হয়ে উঠেছিল প্রাণভোমরাটি। আর কেবল একটা কথাই বলতে পেরেছিল। ইটস আ সুইট নভেম্বর!

৩.
সে রাতটা কেটেছিল এক অজানা অস্থিরতায়। বারবার ফিরে আসছিল- সেই জ্বলজ্বলে নীল চোখ দুটো। মৃত্যুর আবছায়ায় যে চোখদুটো কেবলই বলে যাচ্ছিল যে- যদি পারো, আমার নিষ্প্রাণ শরীরটা আমার মায়ের কাছে ফেরত দিও। কথাগুলো কেন যে মাথার ভেতর প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করলো!
সে রাতের পর দিনটা ছিল আমার সপ্তাহান্তিক ছুটি। আর নিয়ম মতো সকাল বেলা আমার কন্যাকে বললাম ‘শুভ সকাল-বাবা’। লেপের ভেতর গুটিয়ে থাকা কন্যা গত সপ্তাহের আঁকিবুকি খাতাটা সে তার বালিশের তলা থেকে বের করে আমার দিকে তুলে ধরল। আমি দেখলাম- সাদা ক্যানভাসে সে প্যাস্টেল দিয়ে এঁকে রেখেছিল একটা নাম না জানা বড় পাপড়িওয়ালা ফুল। একেকটা পাপড়ি একেক রঙের। নীল হলুদ সবুজ আর নানা রঙিন। তার পাশে তারকাখচিত যাদু কাঠি হাতে ছোট্ট পাখায় উড়তে থাকা এক ঝাঁকড়াচুলের ঝলমলে পরি। যে পরি তার নিয়মেই ফুল ফুটিয়ে যাচ্ছে। অবিরত। প্রতি ভোরে। আমার ছোট্ট মেয়েটার মতই ঘন কালো আর ঝাঁকড়া সে চুলগুলো। আমি অভিভূত হয়ে ছবিটাকে দেখলাম। আর কি আশ্চর্য! সেই পরির চোখদুটোও নীল জ্বলজ্বলে!

এই ছুটির দিনে দুপুরের আগেই আমার সেই শহরে ফিরে যাওয়ার কথা। যে শহরে আমি মৃত রাঙ্গুর জ্বলজ্বলে নীল চোখ আর নিঃসঙ্গ দীপাকে ফেলে এসেছিলাম। যে শহর আমার নতুন কর্মস্থল। অন্যান্যদের সাথে অফিসের ক্যাম্প হাউজের একটা গেস্টরুমে আমার দৈনিক রাত-বাস। সেখানে দীপাকে রাখা অসম্ভব বলেই শহরের কোন একটা আবাসিক হোটেলে উঠেছিলাম- এই বলে যে সে আমার বিবাহিতা। আর বিবাহিতদের মতই সে হোটেলে আমরা গত দুই রাত কাটিয়েছিলাম। আর অপেক্ষায় ছিলাম। একটা যুতসই বাসা-বাড়ী পেয়ে গেলে সেখানে আমরা উঠে যাব। যেখানে একটা ছোট্ট থাকার ঘর থাকলেই চলবে। আর বিয়েতে দীপার কোন বিশ্বাস ছিলনা। সে মনে করে, আত্মা শুদ্ধ হলেই- মানুষ পবিত্র হয়।

দীপা আমার সবকিছুই জানে। আমার পরিবার। আমার ঘর। আর আমার খুঁটিনাটি সব। তবু কেন সে আমাকে বিশ্বাস করেছিল? এ প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নাই। আর আমি সেই লোক- যে শেষপর্যন্ত কোন কথাই রাখিনি। না সেই জ্বলজ্বলে নীল চোখের আকুতি। না নিঃসঙ্গ দুর শহর ছেড়ে চলে আসা দীপার চার দেয়ালের একটামাত্র ঘর। যে ঘরটা তার কোনকালেই ছিলনা। শীতকালের রাস্তায় পুরনো কাপড়ের হকার বাবার বড় মেয়ে দীপা। যে বাবা নেশার রাজ্যে বিকিয়ে দিয়েছিল নিজের বাবা জীবন। আর যার মা ছোট ছোট তিনটে মেয়েকে রেখে চলে গিয়েছিল উজানের কোন শহরে। আরো একটা নতুন ঘরের নেশায়।

সে অনেককাল আগের কথা। সবটাই দীপার কাছ থেকে শোনা। হয়তো তেমন করেই ছুটে এসেছিল দীপাও। সন্ধ্যারাতে মোটরবাইকের হেডলাইটের আলোতে যেভাবে এসে আছড়ে পড়ে পতঙ্গের দল। অথবা কোন উল্কাপিন্ড যেমন করে শব্দহীন রাতে আকাশের বুকে ঝরে পড়ে- ঠিক সেভাবেই।

সারাদিন পরিবারের সাথে সপ্তাহান্তিক ছুটি কাটিয়ে আমি ফিরে চলছিলাম সেই ফেলে আসা শহরের রাস্তায়। যেখানে আমার ফিরে যাওয়ার কথা ছিল- দুপুরের আগেই। যেখানে অপেক্ষা করে আছে একটা মৃত তুলতুলে শরীর আর তার একমাত্র জীবিত সঙ্গি। আমি ভাবছিলাম যে দীপা কি ভাবছে। আমার ফিরে আসার কথা ছিল সেই দুপুরের খাবারেরও আগে। আর আমি সেখানে ফিরে আসছি ঠিকই। কিন্তু নিয়মমাফিক অন্য সপ্তাহান্তিক ছুটি শেষের সন্ধ্যাগুলোর মতই।

রাস্তাজুড়ে সাদা আর ঘন কুয়াশার ভেতর দিয়ে আমি মোটরবাইকটা চালিয়ে যাচ্ছিলাম যতটা দ্রুত যাওয়া যায়। সে নিশ্চয়ই ভেবেছে আমার অপারগতা। আমার ভীরুতা। আমার শঠতা। সে কি জেনে গেছে আমার অপবিত্র আত্মার ভাষা? সে আমাকে ঘৃণা করেছে নিশ্চয়ই। আর বারবার মনে হল- হোটেলে অন্তত ফোন করে একবার বলতে পারতাম আমার অপারগতার কথাগুলো। অথবা সৌজন্যবশতঃ একটা খোঁজও তো নিতে পারতাম।

৪.
রাত আটটার কিছু পরে আমি হোটেলে এসে পৌঁছালাম। হোটেলের নিজস্ব গ্যারাজটায় মোটরবাইকটা রাখছি তখন পরিচিত গেটম্যান জানাল, ‘ম্যাডাম তো সন্ধ্যায় বেরিয়ে গেল। বলল- সকালে একটা বাসা খুঁজে পেয়েছে- সেখানে যাচ্ছে’ আমি চুপ থাকলে সে আরো জানালো ‘কিন্তু এখনো ফিরলনা’। এক অজানা আশঙ্কা আমার হৃদযন্ত্রকে নিস্তব্ধ করে দিতে চাইল। অনেক প্রশ্ন আমাকে যেন ঘিরে ধরে রাখল। এক পা ও সরাতে পারছিলাম না। গেটম্যানকে শুধু বললাম- ‘দাঁড়াও দেখছি’।

মোটরবাইক সেখানেই দাড় করিয়ে রেখে গেলাম হোটেলের দোতলায় রিসেপশনে। আমার উদ্ভ্রান্ত চোখ রিসেপশন টেবিলের ওপারে থাকা চাবি বোর্ডটায়। যেখানে সেই পরিচিত রুম নম্বর এর চাবিটা তখনও দুলছিল। রিসেপশন থেকে চাবিটা হাতে নিয়ে দ্রুত হেঁটে উঠে গেলাম সেই রুমে। যেখানে তখনও দীপার উষ্ণ শরীরের গন্ধটা আটকে ছিল। আর খুঁটিয়ে দেখলাম সাজিয়ে রাখা কামরাটা। না দীপার ট্রাভেল ব্যাগটা তখনও কাঠের তাকের ভেতরে আছে। আমি সস্তি বোধ করলাম।

আর তখনই মনে হল রাঙ্গুর মৃতদেহটার কথা। দেখলাম টেবিলের ওপর উপুড় করে রাখা নীল সাদা ফুলের ছবি আঁকা হ্যাটটা। যে হ্যাটটা ডাকযোগে দীপার গত জন্মদিনে উপহার হিশেবে পাঠিয়েছিলাম। আর এবার যেটা মাথায় পরেই দীপা এই শহরে এসে ঢুকেছিল। আর সেই হ্যাটটাতে করে মুড়িয়েই আমরা রাঙ্গুকে তুলে এনেছিলাম সাঁওতাল রাজার একমাত্র জীবিত বংশধরের সেই রঙ্গন গাঁ থেকে। দিকভুল করা গেরস্ত বাড়ীর উঠানের পাশের ফাঁকা রাস্তা থেকে। যেখানে দুধের বাচ্চাটা ডেরা থেকে কৌতুহলবশতঃ একাই তার মাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছিল। মা হয়তো তার একদল দুধের বাচ্চা ডেরায় রেখে বেরিয়ে পড়েছিল। নিজের পেটের জন্য শিকার করতে নেমে এসেছিল রাস্তার অন্যধারে ছোট্ট ঝোপটায়। সফল শিকারি মা ফিরে এসে হয়তো দেখেছিল তার সবচাইতে সবল ছানাটি আর নেই। এ পাশ ও পাশ কোন পাশেই তাকে আর সে খুঁজে পায়নি। তারপর হয়তো সে ছটফট করেছিল অনেকক্ষণ বা গত দুইদিন ধরেই। কি ভেবেছিল মা বিড়ালটা? শিকারি কোন জন্তুর হাতে পড়েছিল তার সবচাইতে সবল শিশুটা?

৫.
টেবিলের ওপর নীল সাদা ফুলের ছবি আঁকা হ্যাটটা উপরে তুলতেই দেখলাম- নিথর শুকনো আর গুটিয়ে থাকা দেহটা। এখন আর কোনভাবেই যে দেহে তুলতুলে ভাবটা নেই। তার বদলে যেন লোমশ একটা উদভ্রান্ত শরীর। আর ছোট্ট হাঁ করা মুখের ওপর নেতিয়ে পড়া গোঁফক’টার ফাঁকে খুব তীক্ষ্ণ ও সরু জোড়া দাতগুলোকে দেখাচ্ছে অসম্ভব রকমের হিংস্র। আর সেই জ্বলজ্বলে নীল চোখদুটো আবারো ফিরে গিয়েছিল অক্ষি কোটরে।

দুদিন আগে অচেনা বিশ্বাসঘাতক এই শহরে আমরা তাকে নিয়ে এসেছিলাম খুব আদরে। আর স্নেহময় পরশে। প্রথম রাতে সেই সবল ছানাটি বেশ খেলা করতে থাকল দীপার সাথে। আমার সাথে। লেজ নাড়িয়ে ঘন ঘন মিঁউ মিঁউ করল। ছোট ছোট লাফে সে পেরিয়ে যেতে পারলো এ কোল থেকে ও কোলে। মাঝে মাঝে ফোলা লোমশ শরীরটা দীপার গায়ে গা ঘেঁষে ওম নিতে থাকল। দীপাও ওকে নকল মা সেজে নানা রকম বুলিতে ভুলিয়ে রাখতে চাইল। দীপা ছড়া কাটলো- গাঙ শালিকের মা- দিচ্ছে ডিমে তা।

সে মধ্যরাতে নীল সাদা ফুল আঁকা হ্যাটটার ভেতর থেকে জেগে উঠল। হেঁটে বেড়ালো ভারী কম্বলের ওপরে। যার তলায় দুটো উষ্ণ শরীর- পাশাপাশি। একে অন্যকে আবিষ্কারের নেশায় মত্ত। সে আবিষ্কারের নেশা ভেঙ্গে আমরাও খেলতে থাকলাম সেই ছোট্ট রাঙ্গুর সাথে। যে এসেছিল আমাদের প্রণয়ের প্রতিক হয়েই।

অথবা দীপার একাকিত্বের সঙী হিসেবে। সেদিন আমিই তো ছানাটিকে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে দীপার হাতে দিয়েছিলাম। এই শহর থেকে অনেক দুরের সে রঙ্গন গাঁ থেকে। যেখানে কোন একটা কাজে আমরা গিয়েছিলাম শেষ সাঁওতাল রাজার বংশধর এর বাড়িতে। তার সাথে গল্প করতে। আর ছবি তুলতে। সেই গাঁয়ের কোন এক গৃহস্থ বাড়ীতে রাঙ্গুর মা থাকে। তার আরো ভাইবোনদের সাথে। সেদিন আমি কিসের ঘোরে ছানাটাকে তুলে দিয়েছিলাম দীপার হাতে? কেন বলেছিলাম- তোমার একা জীবনের অন্যতম সঙ্গি। ঠাট্টার হাসিতে দীপাও একটা অসম্ভবকে সম্ভব বানিয়ে বলতে পেরেছিল- বুঝিনা বুঝি!

আমরা বাজার থেকে কেনা দুধ থেকে শুরু করে পারুটি আর টোস্ট কিনে এনেছিলাম ওকে খাওয়াবো বলে। নকল বাবা মায়ের আদর দিতে চেষ্টা করেছিলাম আমরা। আমাদের অনিশ্চিত প্রণয়ের এই গোপন কামরায়। যেখানে আমরা মিলিত হয়েছিলাম এক অসীম মুক্তির আনন্দে! নিশ্চিত সংসার ফেলে এসে অনিশ্চিত সংসার খেলায়। সে কি কেবল দেহ আবিষ্কারের নেশায় নাকি অন্য কিছু?

আমার নিজেকে খুনি মনে হতে লাগল। আর তখনই পেশাদার খুনির মতই আমি নিথর রাঙ্গুর শরীরটাকে লুকিয়ে ফেলতে চাইলাম। দ্রুতই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। হোটেলের শার্সি জানালাটা একটানে খুলে দিলাম। সাদা শীতের একটা কুন্ডলি জোর করে ঢুকে পড়লো ঘরে। দ্রুত মৃতদেহটা হ্যাটটায় মুড়িয়ে পেঁচিয়ে ফেললাম। আর সেই খোলা জানালা দিয়ে ওটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম বাইরে। অন্ধকারে। শুন্যে। আমার জানা নাই সে শুন্যে কি ছিল? কোন বাড়ীর ছাদ? নাকি ডোবা জলাশয়? নাকি শহরের কোন গলি রাস্তা? নাকি কিছুই না? আমি সেটা জানতেও চাইনি।


দরজায় খুব জোরে জোরে ধাক্কা দেওয়ার শব্দ আসছে। আমি কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম! নাকি জেগে ছিলাম? আমার আর কোন স্মৃতি অবশিষ্ট নেই নাকি? হ্যাঁ। মনে করতে পারলাম। আমি তো সেই হোটেলটাতে। দীপার জন্য অপেক্ষা করছি। কিন্তু সে কি আর ফিরে আসে নাই? এই এত রাত অব্দি সে কোথায় আছে? আমি শুনতে পারছি- দরজার ওপাশ থেকে এক সাথে অনেকগুলো মানুষের আনাগোনা আর ফিসফাসও ভেসে আসছে। সবাই দরজার ওপারে। আবার জোরে জোরে দরজাটাতে ধাক্কা দিচ্ছে? কারা ওরা? ওরা কি হোটেল কতৃপক্ষ? নাকি দারোগা পুলিশ? দীপা কি আবার ফিরে এসেছে? নাকি চলে গিয়েছে অন্য কোন ঘরের টানে? অন্য কোথাও- যেখানে পবিত্র আত্মার মানুষ থাকে! আমি আর কিছুই জানতে চাইনা। তোমরা দরজা ভেঙ্গে ফেল। তবু আমি দরজার ভেতরেই থাকতে চাই। এই ঘরে। একা। আবছায়ায় জ্বলজ্বলে নীল দুটি চোখের সঙ্গি হয়ে।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন