বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৫ আগস্ট ১৯৬৬
গল্প/কবিতা: ১৫টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৬৭

বিচারক স্কোরঃ ২.৫৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.১ / ৩.০

তবু আমারে দেবোনা ভুলিতে

এ কেমন প্রেম? আগস্ট ২০১৬

নীলকমল

রহস্যময়ী নারী জুলাই ২০১৬

অচিনপুর

শ্রমিক মে ২০১৬

অসহায়ত্ব (আগস্ট ২০১৪)

মোট ভোট ৩৫ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৬৭ জীবনের স্রোত

শামীম খান
comment ১৮  favorite ০  import_contacts ৮৪০
দুই জন যুবক স্ট্রেচারটি একরকম হাওয়ায় ভাসিয়ে নিয়ে অপারেশন রুমে ঢুকে পড়লো । এক্সিডেন্ট ভিকটিম । নয়-দশ বছরের একটা ছেলে । অজ্ঞান , রক্তাক্ত । মাথায় বড় আঘাতের চিহ্ন । উদ্ধার কর্মীরা পোশাক খুলে সাদা চাঁদরে ঢেকে দিয়েছে । পুরো শরীর-নাক-মুখ রক্তে একাকার । নাড়ীর স্পন্দন সুক্ষ , তীরে আছড়ে পড়তে ব্যর্থ মৃতপ্রায় নদীর ছোট ছোট ঢেউয়ের মত ।
যারা দয়া করে তুলে এনেছেন তারা এর কেউ নন। নাম পরিচয় জানা খুব জরুরী । তবে আমার জন্য আরও জরুরী এক্ষুনি অপারেশন শুরু করা । নার্সকে নামহীন হিসাবে রেকর্ড করে অপারেশন টেবিলে তুলতে বললাম । আজ ডাঃ কামরুলের ছুটি । আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট ও । না থাকায় ভালই হয়েছে । কাজে খারাপ না কিন্তু খুবই নার্ভাস । সাবের সাহেব আজ এনেস্থেটিস্ট । রেডিই আছেন ।
লাইটগুলো জ্বলে ওঠার আগেই সাবের বাচ্চাটির ক্ষীন চেতনাবোধকে কৃত্রিম নিয়ন্ত্রনে নিয়ে নিয়েছেন । কাজ একটু একটু করে এগিয়ে চলেছে । এক জন নার্স পেছন থেকে রক্তের ক্রস ম্যাচিং রিপোর্ট পড়ে শোনালো , ও নেগেটিভ ! সেরেছে । আমার জানা মতে ডোনার লিস্টে গত ছয় মাসে ও নেগেটিভ ব্লাড আসেনি । অবশ্য আমি নিজেই ও নেগেটিভ । কাজ থেকে মুখ না তুলে অর্ডার করলাম , ‘ ইমিডিয়েটলি দুই ব্যাগ ব্লাড কালেক্ট কর । সাবের ! পালস, প্রেশার আর অক্সিজেন ছ্যাচুরাশন দেখে নেক্সট স্টেপ বল’।
কোথাও কাঁদছে কেউ । ও টি’র বাইরে । মনে হচ্ছে চেনা জানা কেউ , বোবা কান্না । সুলতানা নিশ্চয় এত দিন পর ছেলেকে পেয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছে । খোকা বোধহয় এতক্ষনে গোসল সেরে মায়ের হাতে খাচ্ছে । ছেলে ফিরেছে , আমাকে একটা কল দিয়ে জানালেও পারতো লতা । লতা ওর আদরে ডাকা নাম । ছোট্ট একটুকরো অভিমানের বাষ্প তৈরি হোল আমার মনের কোনে । মা আর ছেলের প্রতীক্ষিত মিলনের আবেগ ঘন মুহূর্ত । অস্ফুটে বললাম , ব্যস্ত বাবাকে ক্ষমা করে দিস , খোকা !
হঠাৎ একি ! গাউনের ফিতে বাঁধতে বাঁধতে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকছে ডাঃ কামরুল । কামরুলকে কে ডাকল ভাবতেই হোঁচট খেলাম । কানে কানে ও কি যেন বলছে সাবেরকে । ‘নীরব’ শব্দটি শুনেছি শুধু , ও তো আমার খোকার নাম !
মুহূর্তে আমার মাথায় ভেঙ্গে পড়লো প্রকাণ্ড আকাশটা । বোঁ বোঁ করে ঘুরে উঠলো মাথা । হিসাবের পেছনে একটি হিসাব আমি নিমিষেই মিলিয়ে ফেলি । পৃথিবীর করুনতম আর্তনাদ ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে এই মাত্র । আকাশ ছোঁয়া এক সুনামি খড় কুটার মত ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে । আমি জেনে গেছি নামহীন এই বালকের বাবা কে ! পিছন থেকে কামরুল আমাকে জড়িয়ে ধরে পাশাপাশি রাখা দ্বিতীয় অপারেশন টেবিলটিতে শুইয়ে দিতে দিতে বলল , ‘হ্যা স্যার , আপনার জানা খুব জরুরী । শীতের ছুটিতে সব ক্যাডেটদের বাড়ী পৌঁছে দিচ্ছিল ওরা । দুই মাইল দূরে বাসটি এক্সিডেন্ট করেছে । আরও চারটা ক্যাজুয়ালি টি আসছে । সবই আমি সামলে নেব স্যার । একটুও ভাববেন না । যা কিছু আমার আছে আজ আমি সবটা কাজে লাগাবো স্যার । আপনি প্লীজ শান্ত থাকেন , ঘাবড়াবেন না । ও নেগেটিভ রক্তের যে একজন ডোনার ও পাওয়া যায়নি !’
ঘূর্ণাবর্তে উড়তে থাকা পাখির একটা পালকের মত দিগ্বিদিক জ্ঞানহীন হয়ে গেছি আমি । কামরুলের কণ্ঠে দৃঢ়তা শুনতে পাচ্ছি । সে যে একটা ছোট্ট নৌকার মাঝি , সাগরের বিশাল ঢেউয়ে আশা নিরাশায় দুলছে সে নাও। ছইয়ের ভেতর শুয়ে আছে আমার খোকা । কামরুল কি পারবে মৃত্যুর তেপান্তর থেকে আমার সন্তানের নিভু নিভু জ্বলতে থাকা জীবন প্রদীপটিকে বাঁচিয়ে আনতে প্রানের সৈকতে !
ব্লাড ট্রান্সফিউশনের আয়োজন এখানেই নিয়ে এসেছে টেকনিশিয়ান । শুয়ে শুয়ে দেখছি আমি , পাশের অপারেশন টেবিলে নীরবকে সামনে রেখে কামরুলের হাত চঞ্চল হয়ে উঠেছে , অলৌকিক এক দ্যুতি খেলছে তাঁর চোখে মুখে । টেকনিশিয়ান শুন্য ব্যাগটি রাখল আমার পাশে । মোটা একটা সুই আমার শরীর থেকে টেনে নিতে শুরু করেছে জীবনের স্রোত । পৃথিবীর সবটুকু প্রত্যাশা নিয়ে আমি রক্তের থলেটার দিকে তাকিয়ে থাকি । এক বাবা তার ছেলের জন্য আর কি বা দিতে পারে !
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন