বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৫ আগস্ট ১৯৬৬
গল্প/কবিতা: ১৫টি

সমন্বিত স্কোর

৬.০৮

বিচারক স্কোরঃ ৩.৬২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৪৬ / ৩.০

তবু আমারে দেবোনা ভুলিতে

এ কেমন প্রেম? আগস্ট ২০১৬

নীলকমল

রহস্যময়ী নারী জুলাই ২০১৬

অচিনপুর

শ্রমিক মে ২০১৬

গল্প - উপলব্ধি (এপ্রিল ২০১৬)

মোট ভোট ৪১ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৬.০৮ গল্পকারের গল্প

শামীম খান
comment ২৪  favorite ১  import_contacts ৭৪৫


হোক ঠিকানা আকাশ পারে আমায় তুমি ভুললে কেন
এই দেখো না কেমন আজো ছুঁয়ে আছি
ধমনী আর রক্ত কনায় সব ভাবনায় মিশে আছি , একের ভেতর দু’য়ে আছি
দূরে ভেবে আর ভুলো না , লক্ষ্মী সোনা , ভালো থেকো , প্রীতি জেনো
( ১ )
বিলাসগঞ্জের নাম এদেশের মানচিত্রে নেই । থাকলে ভাল হতো । নিসর্গের এক অনবদ্য লীলাভুমির সাথে নতুন করে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিতে হতো না । নামটা মনে পড়লে আজও অতীন্দ্রিয় এক ভাল লাগা আমাকে অতীতের পথে ডেকে নিয়ে যায় । পেছনে হেঁটে চলি এক , দুই , তিন ............... ত্রিশ বছর । বিভাগীয় পোস্ট অফিসের সুভাষ বাবু পোস্টিং অর্ডারটি হাতে দিয়ে বলেছিলেন , ‘বাংলাদেশের দক্ষিণে নিসর্গের যে রাজধানীটি আছে তার নাম বলতে পারবেন , রাজী সাহেব ?’ ছয় মাসের শিক্ষানবিশ পোস্টিং , খুলনার কোন দুর্গম থানায় হবে ভেবেছিলাম । জায়গাটার নাম দাদার কাছ থেকে শুনলে মন্দ হয় না । মাথা চুলকে অজ্ঞতা প্রকাশ করতে সুভাষ’দা খুশী হলেন বোঝা গেল । পকেটের রুপালী কৌটো থেকে এক খিলি সুগন্ধি জর্দা মাখা পান নিয়ে দু’পাটি দাঁতের ফাঁকে গুজে দিতে দিতে বলেলেন , ‘বিলাসগঞ্জকে নিসর্গের কন্যাও বলতে পারেন । ভারী সুন্দর জায়গা । চারিপাশে সুন্দরবন আর বঙ্গোপসাগরের নিঃশেষ জলরাশি । পেছনে অনেক দূরে বাংলাদেশ , এই সমাজ আর সভ্যতা । দেশের ভেতরে থেকেও একটু সতন্ত্র । সে কি শোভা ! যত দিন বেঁচে থাকবেন ভুলতে পারবেন না ।’ সত্যি নামটা সারা জীবন মনের কোনে জেগে রইল , শুধু শোভা নয় আরও একটি বিশেষ কারণে । আজ সেকথাটি আপনাদের শোনাতে চাই ।
গোড়াতে একটু নিজের কথা বলি । শহরের ছেলে আমি । জন্ম , বেড়ে ওঠা , পড়াশোনা সবই ঢাকায় । বাবার সহায় সম্পদ নেহায়েত মন্দ ছিল না । কখনো চাকুরী করবো ভাবিনি । দেখতে শুনতে নায়কোচিত না হোলেও গড়পড়তার চেয়ে যে একটু এগিয়েছিলাম , মেয়ে মহলে কদর দেখে সেটা ঠাওর করতে পারতাম । ইংরেজি সাহিত্যে পড়ছিলাম । ইউনিভার্সিটিতে নীলা নামে ডিপার্টমেন্টেরই একটি মেয়ে আমাকে চোখে চোখে রাখতো । প্রায়ই সারা ডিপার্টমেন্ট খুঁজে খুঁজে শেষে লাইব্রেরীতে এলে দেখতে পেতো , কোনার টেবিলে বইয়ে মুখ গুজে পড়ে আছি । সবই বুঝতে পারতাম কিন্তু ধরা দিতাম না । শেষ দিকে সে প্রায় ধরেই নিয়েছিল , প্রেম-বিয়ে-সংসার এসব আমার জন্য নয় , বৌয়ের চেয়ে বইয়েই আমার আগ্রহ বেশী । হ্যাঁ , পড়ার নেশা ছিল অদম্য । ছেলেবেলা থেকেই খুব পড়তাম। ক্লাসের বই , বাইরের বই কিছুই বাদ যেত না । অনার্স শেষে মাস্টার্সের ক্লাস শুরু করবো , সে সময়ে হঠাৎ করেই চাকুরীর বিজ্ঞপ্তিটা চোখে পড়লো । ডাক বিভাগের কর্মকর্তা বলে নয় বরং এটা ভেবেই ইন্টার্ভিউ দিতে বসেছিলাম যে , এ চাকুরীতে কাজের চাপ কম থাকবে । সারা জীবন বই পড়ে কাটিয়ে দিতে পারবো ।
রাজশাহীতে ছয় মাসের ট্রেনিং শেষে আমাকে জানিয়ে দেয়া হোল খুলনায় বিভাগীয় অফিসে যেয়ে রিপোর্ট করতে । যে সময়ের কথা বলছি তখন স্বাধীন দেশের বয়স মাত্র বছর দশেক । যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল ছিলনা । দক্ষিণের কয়েকটি থানা সদরের সাথে বিভাগীয় শহরের যোগাযোগ ছিল জলপথে , অর্থাৎ লঞ্চ , ষ্টীমার কিংবা নৌকায় চলাচল করতে হতো । বিলাসগঞ্জ হোল দাকোপ থানার একেবারে শেষ প্রান্তে । পোস্টিং লেটার নেবার সময়ে অফিস থেকে বলে দিল লঞ্চ ধরে দাকোপ চলে যেতে । ওখান থেকে বিলাসগঞ্জ দক্ষিণে উনিশ-বিশ মাইল । ভাঁটার সময় হলে নৌকায় ঘণ্টা চারেকের ব্যাপার । আমার সঙ্গী সামান্য জামা-কাপড় , বিছানা-পত্র আর বড় বড় দুই ট্রাঙ্ক বই । লঞ্চ দাকোপ পৌঁছুতে সূর্য চলে এলো মধ্যাকাশে । টার্মিনালে দাঁড়িয়ে থানা সদরের অনেকটা দেখে নিলাম । নামেই সদর । ইলেক্ট্রিসিটি নেই , রিক্সা নেই । হেরিং বোন ইট বিছানো রোড । দুটি পাকা দালান চোখে পড়লো । আকার-আকৃতি বলে দিল থানা কিংবা স্কুল হবে । টার্মিনালে টিকেট কালেক্টরের কাছে বিলাসগঞ্জের নাম উচ্চারণ করতেই দুহাত কপালে ঠেকিয়ে বললো , নমস্কার বাবু । ভুল না করলে আপনি নিশ্চয় ওখানকার নতুন পোস্ট মাস্টার । সকাল থেকেই আপনার জন্য একজন নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছে ।’ এবার কালেক্টর ‘জগা , এই জগা’ বলে হাক দিতেই পাজামার উপর ধূসর ফুলহাতার শার্ট চাপানো ত্রিশ পঁয়ত্রিশের একজন দেহাতী পুরুষ এগিয়ে এলো ,‘আজ্ঞে বাবু , আমার নাম জগন্ময় মণ্ডল । বিলাসগঞ্জের ডাক পিয়ন । আপনাকে নিতে এসেছি ।’ আমি জগন্ময় তথা জগার জড়তাহীন শুদ্ধ বাংলায় মুগ্ধ হলাম । টার্মিনালের সাথে বেঁধে রাখা একটি নৌকার দিকে হাত উঁচিয়ে সামনে এগুতে ইশারা করলো সে । জোয়ার শুরু হয়ে গেছে । ডিঙি চেপে পৌঁছুতে সন্ধ্যা হয়ে গেল । নৌকায় ছয় ঘণ্টায় অনেক কিছু জানলাম । এই অফিসে আমার আগে যিনি একটানা বিশ বছর কাজ করেছেন তিনি ছিলেন স্থানীয় । তার অবসরের পর এটিকে আপগ্রেড করা হয়েছে । কিন্তু কাউকে স্থায়ী করা যায়নি । আমার আগে দুজন এসেছিলেন পোস্টিং নিয়ে । কদিন থেকেই তদ্বির করে চলে গেছেন ।
( ২ )
জগন্ময় করিৎকর্মা মানুষ । আসার আগেই সে আমার জন্য থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে রেখেছে । পোস্ট অফিসের সাথে লাগোয়া ছোট্ট দুটি রুম নিয়ে আমার কোয়ার্টার । পরিষ্কার ঝকঝকে করে রেখেছে । আর রান্নার দায়িত্ব দিয়েছে স্কুলের দপ্তরি বৃদ্ধ রইস মিয়াকে । রাত্রে ঘুমুতে যাবার আগে কাছে পিঠে বাঘের ডাক শোনা গেল । জগন্ময় অভয় দিয়ে ঘরে ফিরল , ‘ও কিছু নয় বাবু । উনারা কখনো খাল পেরিয়ে এদিকে আসেন না ।’ এ অঞ্চলে বাঘকে নাম ধরে ডাকা হয় না । লোকজ বিশ্বাস , বনবিবির জাত-শত্রু দক্ষিণ রায় নিজে বাঘের বেশে বনে বনে ঘুরে বেড়ায় । বনবিবির পাশাপাশি তাই দক্ষিণ রায়কে ও পূজা দিয়ে তুষ্ট করে এরা । অজানা পল্লীতে বাঘের গর্জন শুনে চোখ থেকে ঘুম উড়ে গেল । অন্ধকারে সকালের প্রতীক্ষায় শুয়ে রইলাম ।
কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানিনা । খুব সকালে বাইরে এসে দাঁড়াতেই দুচোখ শান্ত হয়ে গেল । সত্যি অপরুপ । সামনে সমুদ্র , বামে আর পেছনে সুন্দরবন । জঠর-নাড়ী যেমন ভ্রূণকে মায়ের সাথে বেঁধে রাখে ডানের নদীটি সেভাবেই এ দ্বীপকে মুল ভূখণ্ডের সাথে জুড়ে রেখেছে । পরিপাটি দ্বীপ । চারিপাশে বাঁধ । সেটিই সড়কের কাজ করে । এক সারি দেবদারু স্বর্ণলতার শিরস্ত্রাণ পরে বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে সীমানা পাহারা দিচ্ছে । আশে পাশে একটি দুটি অকুলীন ঝাড় এসে নোঙর ফেললে দেবদারু-দলপতি তার মাথায়ও মুকুট পরিয়ে বলে , ‘এসো , এই স্বর্গ দ্বীপে তোমাকেও স্বর্ণ শোভায় বরন করে নেই’ । বাঁধ আর বনের মাঝে সরু খাল । নদীর পাড়ে বিশাল স্কুল । ‘পুরো দক্ষিণে এ স্কুলের সুনাম’ , জানাতে ভুললো না জগন্ময় । বিকালে আমাকে নিয়ে গ্রাম ঘুরে দেখাচ্ছিল সে । স্কুলের পাশে দেখলাম ছাত্রদের থাকার জন্য একটা পাকা হোস্টেলও আছে । তার পাশে একটি দালান-বাড়ীও নজরে পড়লো । জগন্ময় মনে করিয়ে দিল , চেয়ারম্যান রমেন বাবুর বাড়ী । নিত্যপ্রয়োজনীয় সবই আছে এখানে । বাজার , খেলার মাঠ , ক্লাব সব কিছুই সাজানো গোছানো । সন্ধ্যা নেমে এসেছে । সমুদ্র থেকে খোল বোঝাই মাছ নিয়ে জেলেদের ট্রলারগুলো ফিরে আসছে লোকালয়ে । একটু দূরে বাজারের শেষ মাথায় জেনারেটর চালিত বরফ কল । বরফে সাজিয়ে এই মাছ রাতারাতি ট্রলারে করে খুলনা পাঠানো হবে ।
বিলাসগঞ্জের তৃতীয় দিনেই বিনোদ বাবুর সাথে পরিচয় হয়ে গেল । স্থানীয় হাইস্কুলের অংক শিক্ষক । পোস্ট অফিসে এসেছিলেন জরুরী প্রয়োজনে , জগা তাকে আমার কক্ষে নিয়ে এলো । কিছু কিছু মুখ আছে সারা জীবন মনে রাখতে একবার দেখাই অনেক , ইনি তাদের একজন । ধ্যানমগ্ন ভাসা ভাসা চোখ । লম্বা চুল দুপাশ থেকে নেমে এসে কাঁধ ছুঁয়েছে । কৃষ্ণ বর্ণ , দীর্ঘ ছিপছিপে শরীর । বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই করলেও চেহারায় সে ছাপ পড়ে নি । বিয়ে-থা করেন নি ভদ্রলোক । ছেলেদের হোস্টেলের সুপারভাইজার । ওখানেই থাকা-খাওয়া । যাবার সময় আমাকে তার ঢেরায় আমন্ত্রণ জানাতে ভুললেন না । মনে হোল এই কদিনে কথা বলার মত একজনকে পাওয়া গেল । জগার মুখে শুনে অদ্ভুত লাগলো , তার নাকি দিন কাটে অঙ্ক কষে । পরদিন বিকালে পায়ে পায়ে তার ঘরে হাজির হলাম । দারুন কালেকশান ভদ্রলোকের । মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত শুধু বই আর বই । সবই গনিতের , এলান টারনিং , ডেভিড হিলবার্ট ইত্যাদি অনেক অচেনা নাম বইয়ের গায়ে ।
নিসর্গের রাজধানী একঘেয়ে হয়ে উঠতে এক মাসের বেশী সময় নিল না । মনে হলো ছয় মাসের প্রবেশনারী পোস্টিংয়ে নয় দ্বীপান্তরে পাঠানো হয়েছে । আশ্চর্য হোল নীলাকে খুব মনে পড়ছে । আমার হৃদয়ের কোনে বইয়ের স্তুপে যে ওর মুখছবি আঁকা ছিল এখানে না এলে হয়তো কোনদিনই এভাবে জানা হতো না । সময় কাটাতে বই পড়ি , বেনু’দার সাথে গল্প-সল্পও করি । দাদা ত্বাত্তিক মানুষ । গল্প তেমন জমেনা । তবু ছেঁড়া ছেঁড়া ভাবনাগুলোয় তার মতামত খুঁজি , সুযোগ পেলে তর্ক জুড়ে দেই । অনেকটা ছেলেমানুষি আরকি । দাদাও আমার একাকীত্ব বুঝতে পেরে গল্প করার চেষ্টা করে । ওর গল্পের সবটা গনিত নিয়ে । গনিত-জগতের বিষয়গুলি গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করে আর সারাক্ষণ সেই ভাবনার মধ্যে ডুবে থাকে । মাঝে মাঝে একটা নীল খাতায় কি সব নোটও করে , দেখেছি । এরিমধ্যে একদিন ওদের স্কুলের নমিতা ভদ্রের সাথে পরিচয় হলো । উঁচু ক্লাসে বাংলা পড়ান । বিয়ে হয়েছিল । অসময়ের ডাকে স্বামী তাকে নিঃসন্তান ফেলে চলে গেলেন , সেও দুবছর । বেশ ভুষায় বৈধব্য ধরে রাখতে না পারলেও স্বামীর পদবিটি আজো আঁকড়ে আছেন । ইতিমধ্যে বাবা রমেন বিশ্বাস তাকে নিজ গ্রামে ফিরিয়ে এনেছেন । বাড়ী সংলগ্ন স্কুলে চাকুরী করছেন নমিতা , তাতেও বাবার প্রভাব ছিল অস্বীকার করা যাবে না । দেশ , সমাজ কত এগিয়েছে , বাবার মেয়ে পিছিয়ে থাকবে কেন ! বৃদ্ধ চেয়ারম্যানের এখন একমাত্র সাধ , কোন উদার , শিক্ষিত ছেলের হাতে অকাল বিধবা মেয়ের হাতটি রেখে চোখ বুজেবেন ।
কদিন পরের ঘটনা । হেড মাস্টার নিবারন বাবু বাজারে যাচ্ছিলেন । হঠাৎ দেখা হতেই আপন জনের মত হাতটি মুঠোয় টেনে নিলেন । কিন্তু কুশল বিনিময়ের পর যা শোনালেন আমি তার জন্য তৈরি ছিলাম না । স্বরটি নীচু করে একটানা বলে গেলেন নিবারণ , ‘বলছিলাম মাস্টার মশাই এমনিতে ভাল মানুষ । বাইরে থেকে দেখতে ভোলা ভালা উদাস টাইপের । তবে অনেকে তাকে এড়িয়ে চলে । কিছু বদনামও আছে , অন্য ধরনের । লোকজন পেছনে ঠাট্টা-তামাশা করে । সে সব আমাকেই সামলাতে হয় । কি করবো বলেন , অনেক দিন একসাথে আছি । বড় ভাইয়ের মত সম্মান করে । বলছিলাম কি রাজী সাহেব , আপনি এসেছেন চাকুরী করতে । স্থানীয়দের সাথে কতটা মেলামেশা করা ঠিক সেটা নিশ্চয় আপনি নিজেই বুঝবেন । অপবাদ রটলে শেষে আমাকে দুষবেন না কিন্তু ।’ এরপর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ভিড়ের ভেতর মিলিয়ে গেলেন । এলাকার লোকজন বেনু’দাকে ঋষি-পুরুষ জ্ঞান করে । স্কুল প্রশাসন , সহকর্মী সবার ভেতর তার স্থান উঁচুতে । সেই বেনু’দাকে নিয়ে এসব কি বলে লোকটা , পাগল নাকি !
( ৩ )
দুদিন বাদে বেনু’দার ঘরে বসে কথা হচ্ছিল । বিষয় বস্তু বিবিধ , জগৎ সংসারের তাবৎ সমস্যা । এ জাতীয় আলোচনায় প্রায়ই আমি বক্তা আর আমিই শ্রোতা হয়ে পড়ি । আজও আমাকে সামনে বসিয়ে বেনু’দা সুযোগ পেলেই গণিত সাগরে ডুব দিচ্ছে । কয়েকদিন পুশে রাখা প্রশ্নটা আজ করে ফেললাম , তা বেনু’দা , একা রয়ে গেলে কেন ? প্রেম করে ছ্যাকা-ট্যাকা খাওনি তো ? কিছুক্ষণ অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠলো দাদা । তারপর একটু শান্ত হয়ে বলল , ‘প্রেম কি , সে ব্যাপারে আমার কোন ধারনাই নেই । সেটি জান তো !’
-বলতে চাইছ প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা কিছুই বোঝ না ?
-সবাই এ রসে সিক্ত হতে পারে না , রাজী । একটু খুলেই বলি । জন্মেছিলাম এক হত দরিদ্র পরিবারে , সম্ভবত চট্টগ্রাম শহরে । শৈশবের যেটুকু স্মৃতি মনে পড়ে তা শুধু দারিদ্র্য আর ডোমেস্টিক ভায়লেন্সে ঠাঁসা । বাবা আর মা দুজনে ছিলেন দুই গ্রহের বাসিন্দা । অনেকগুলো ভাইবোনের মধ্যে আমি একজন । দরিদ্র পরিবারে একতা , সহমর্মিতা এসব বেশী দেখা যায় । আমাদের ঘরে ব্যাপারটা ছিল উল্টো । তুচ্ছাতি তুচ্ছ বিষয়েও ঝগড়াঝাটি হতো । বাব-মা দুজনের কাছেই কারণে-অকারণে শাস্তি পেতাম । ছয় বছর পর্যন্ত এভাবেই বেড়ে উঠলাম । এক সন্ধ্যায় স্কুল থেকে ফিরে আমি সোজা শুয়ে পড়লাম । জ্বরে কাঁপছি । এমন সময় বাবা আর মায়ের মধ্যে বেঁধে গেল । এক সময়ে চিৎকার-হট্টগোলে হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেল । দরোজা খুলে যে দিকে দুচোখ যায় হাঁটতে শুরু করলাম । উদ্ভ্রান্তের মত হাঁটছিলাম । তুমুল গোলমালের ভেতর কখন আমি বাড়ীর বাইরে চলে এসেছি কেউ খেয়াল করেনি । সামনে বাস স্ট্যান্ডে একটি বাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে উঠে পড়লাম । আর কিছু মনে নেই । জ্ঞান যখন ফিরল আমি হাসপাতালে । পাশে এক সৌম্য দর্শন পাদ্রী বসে আছেন । বাসে জ্ঞান হারালে লোকজন মিশনারি হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল । ফাদার গোমেজ আমাকে বুকে টেনে নিলেন । আমৃত্যু সন্তান স্নেহে লালন পালন করেছেন , পড়াশোনায় উৎসাহ দিয়েছেন , স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন । ওঁর কাছে একরকম প্রেম-ভালোবাসা শিখেছি । সে প্রেম ঈশ্বরের ।
বেনু’দা থামলো । আমার জানতে ইচ্ছে করলো ও খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী কিনা । জীবন যাকে নিয়ে এতটা নির্দয় খেলা খেলেছে তাকে এ সব প্রশ্ন করা যায় না । দাদা বোধ হয় মন পড়তে পারে । বলল , আমার ঈশ্বরের নাম গণিত । আমি গণিতের পূজা করি । ভেবে দেখেছো , তোমাদের ঈশ্বর অসীম , আমার সংখ্যাগুলোও কিন্তু সীমারেখা টেনে শেষ করতে পারবে না । প্রেমের পৃথিবীতে আমার কোনদিন ঢোকা হয়নি । গ্লানি নেই । সারা জীবন যেটা সযত্নে পরিহার করেছি তার জন্য অনুতাপ করবো কেন !
গণিত আর ঈশ্বরের তুলনায় যদিও যুক্তি আছে , সহজেই তা ভেঙে দেয়া যায় । আলোচনা সে পথে টানতে ইচ্ছে হোল না । হেসে বললাম , তারপরেও তো কথা থাকে , বেনুদা । জ্যোৎস্না রাতে কারো হাতে হাত রেখে নদীর কুল ধরে হেঁটে যেতে মন চায়নি কখনো ?
বিনোদ’দা চুপ করে রইল । ব্রহ্মচারীর জন্য এটি নিষিদ্ধ প্রশ্ন , আমি জানি । রাত বাড়ছে । আলোচনায় ইতি টেনে আমি উঠে দাঁড়ালাম ।
ভেবেছি বেনু’দা কে কিছু গল্প-উপন্যাস পড়তে দেব । এতে যদি ওর মনোভূমিতে কোনদিন প্রেম প্রীতির বটবৃক্ষ না হোক অন্তত দুয়েকটি গুল্ম লতা জন্মে । দুদিন বাদে রশীদ করীমের ‘প্রেম একটি লাল গোলাপ’ বইটি তার টেবিলে রাখতেই স্মিত হাসল বেনু’দা , ‘তাহলে শেষতক রাজী আমাকে অন্য দুনিয়া দেখিয়েই ছাড়বে !’ এরপর প্রতিদিন একটি করে বই রেখে আসছি । হুমায়ূন , নিমাই , সমরেশ , শরৎ , সুনীল । ফিরিয়ে নেবার সময় বইটি নেড়ে চেড়ে বুঝতে পারিনা দাদা পড়েছে কি না । আমার সময়ও পাথরের মত ভারী হয়ে উঠেছে । একদিন খেয়াল করলাম চিঠির গোছায় অন্য কারো নয় নিজের নাম-ঠিকানাটি খুঁজছি আমি । ছয় মাসে বেনু’দার ভেতর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তন এসেছে । মাঝে মাঝে প্রেমের উপন্যাস চেয়ে নিচ্ছে । আগের ঢিলে ঢালা পোশাকের স্থান দখল করেছে ইস্ত্রি করা প্যান্ট-শার্ট । দুয়েকবার তাকে একেলা বসে গুনগুন করতেও শুনেছি । ভাদ্র মাস । রাত নেই , দিন নেই আকাশ কাঁদছে । মাঝে মধ্যে ক্ষণিকের জন্য সূর্যের মুখটি দেখতে পেলে পৃথিবী হেসে উঠে । বেরিয়ে খোলা হাওয়ায় বুক ভরে শ্বাস নেব , উপায় নেই । বাইরে প্যাচপ্যাচে কাদা । তার উপর আছে জোঁকের অত্যাচার । বইয়ের ভেতর মুখ ডুবিয়ে দিনাতিপাত করছি । এক বিকালে জগা খবর নিয়ে এলো , ‘বিনোদ বাবুকে শহরে নিতে হবে’ । তিন দিন দাদার ওখানে যাওয়া হয়নি । এর মধ্যে এমন কি ঘটে গেল ! জগার মুখে যা শুনলাম রীতিমত ভয়াবহ । দুদিন ক্লাস নিতে না আসায় সহকর্মী টিচাররা অসুস্থ ভেবে দাদার খোঁজ নিতে এসেছিলেন । এসে যা দেখলেন তারা হতভম্ব । সংগ্রহের দুর্লভ বইগুলো ছিঁড়ে ফালি ফালি করে এক সমুদ্র কাগজের মধ্যে বসে আছে বিনোদ’দা । দেরী না করে আমিও ছুটে গেলাম । দুজন শিক্ষক ঘরময় পায়চারি করছেন । বেনু’দা দেয়ালে ঠেশ দিয়ে আধা শোয়া । পাশে নমিতাদি , দুধের গ্লাসটি ধরে হাতে বাড়িয়ে রেখেছেন । পাশে বসতেই বেনুদা আমার কাঁধে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে উঠলো । বড়দের কান্না একটি বিশ্রী ব্যাপার । কিন্তু আমার কাঁধে যে মাথা রেখে কাঁদছে সে একটি বৃহৎ শিশু , কৈশোর আর যৌবনের হিসাবটা তার হারিয়ে গেছে গণিতের পৃথিবীতে ।
সেদিন সারা দুপুর ছিল ঝাঁঝালো রোদ্দুর । বিকেলে রোদের তেজ একটু কমতেই মায়ের শাসন ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে আসা কয়েকটি মেঘ শিশু জড় হোল ঈশান কোনে । সংগ দিতে পড়িমরি ছুটে এলো দস্যি হাওয়া । বাসা থেকে বেরিয়ে পড়েছি , ফেরা অসম্ভব । আকাশের দিকে তাকিয়ে দ্রুত পা চালালাম । বেনু’দার ঘর ফাঁকা । এদিকে ওদিকে কোথাও নেই । কি ভেবে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলাম । চিলেকোঠায় উঠতেই দু’পা আটকে গেল । রমেন বাবুর বাড়ীর ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল কেউ । হোস্টেলের ছাদে পেছন ফিরে বসে আছে বেনু’দা । আমার উপস্থিতি বুঝতেই চকিতে নুপুর পরা নগ্ন পা’দুটি পালিয়ে গেল । অভিসারিকার ব্যর্থ অভিসারের কষ্ট ছাপিয়ে আমার হৃদয় প্লাবিত হোল অনাবিল আনন্দে । যেমনটি কামনা করেছিলাম বেনু’দা আমাদের পৃথিবীতে চলে এসেছে ।
হেড মাস্টার নিবারন বাবুর ভেতরও লক্ষ্যনীয় পরিবর্তন এসেছে । একদিন আমাকে পেয়ে উচ্ছ্বাসে বলে ফেললেন , ‘একটা পুণ্য করে যাচ্ছেন রাজী সাহেব । বিনোদের জীবনটা সত্যি অর্থবহ হয়ে উঠেছে । ভাবছি নিজে গিয়ে নমিতার বাবাকে প্রস্তাবটা পৌঁছে দেব । বিনোদের আর কে আছে বলেন ? আমিই তো ওর গার্জিয়ান ।’ তার সহমর্মিতায় আমি মোহিত হলাম । স্বস্তির শ্বাস ফেলে বললাম , বোধ হয় আর দেরী না করাই ভাল ।
( ৪ )
হঠাৎ ঢাকা থেকে টেলিগ্রাম এসেছে । মা অসুস্থ ! অল্প সময়ে ব্যাগ গুছিয়ে ঘরের পথে পা বাড়ালাম । কারো কাছ থেকে ঠিক ভাবে বিদায় নেয়া হোল না । বাড়ীতে পা রেখে মনটা শঙ্কায় দুলে উঠলো । বাবা , মা কেউ নেই । পাশের বাসার জামিল চাচা বেরিয়ে এলেন । মাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে । হার্টের পুরনো সমস্যাটা শক্ত করে দেখা দিয়েছিল । আসার পর তিন দিনেই মা বেশ সুস্থ হয়ে উঠলেন । কিন্তু বিলাসগঞ্জে ফেরা আমার জন্য সহজ হোল না । রাখঢাক না করেই মা জিগ্যেস করলেন , আমার কোন পছন্দ আছে কি না । ঢাকায় এসে এরিমধ্যে কয়েকবার বিশ্ববিদ্যালয়ে নীলাকে খুঁজে এসেছি , কেউ তার কথা বলতে পারছে না । সবাই ভেবে নিয়েছে নীলার বিয়ে হয়ে গেছে । আমার নীরবতার সুযোগে মা বললেন , তোমার নিজের না থাকলে আমাদের একটি পছন্দ আছে । এবার একটি ছবি ধরলেন মা আমার সামনে । কি অবাক , চোখে চোখ রেখে হাসছে নীলা ! মায়ের দিকে চোখ তুলতেই মিষ্টি হাসলেন , তুমি চাকুরীতে যাবার পর মেয়েটি প্রায় খোঁজ নিতে আসতো । অমন মিষ্টি মেয়েকে আমি হাতছাড়া করি কি করে ? ওর বাবা-মায়ের সাথেও কিছুটা কথাবার্তা হয়ে গেছে ।’ বিয়ের পর দুসপ্তাহ কিভাবে কেটে গেল বুঝতে পারিনি । প্রবেশনারী পিরিয়ডের ছয় মাস আগেই শেষ হয়েছে । চাইলেই যেকোন জেলা শহরে পোস্টিং নেয়া যাবে । ‘খুব তাড়াতাড়ি বাসা ঠিক করে নীলাকে কাছে নিয়ে যাব’ , পাকা কথা দিতে হোল মাকে ।
অফিস শেষে সুভাষ বাবু যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন । আমার হাতে একটি চিঠি ধরিয়ে দিয়ে বললেন , ‘এবার কিন্তু কোন হিন্টস থাকছে না । বেস্ট অফ লাক ।’ তাড়া ছিল । খামটি খোলার সুযোগ মিলল লঞ্চে । বিলাসগঞ্জকে এতটা আপন করে ফেলেছি নিজেও বুঝিনি । বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠলো ।
দাকোপ থেকে ফের সেই নৌকা । আমাকে পৌঁছে দিয়ে মাঝিরা এই সন্ধ্যায়ই ফিরে যাবে । হাতে কয়েকটি অতিরিক্ত টাকা গুজে দিয়ে তাদের বললাম ফেরার আগে বাজার থেকে কিছু খেয়ে নিতে । কোথা থেকে যেন খবর পেয়েছিল জগা । দেখি হ্যারিকেন হাতে বেশ খানিকটা এগিয়ে এসেছে । ঘরে পৌঁছুতেই একটি বই এগিয়ে দিয়ে সে বলল , বাবুর চিঠি । শেষ পাতায় পেলাম বেনু’দার লেখা ,
প্রিয় রাজী ,
এ চিঠিটি যখন তোমার হাতে পৌঁছুবে তখন আমি অনেক দূরে । দুঃখ পেয়ো না । বান্ধবহীন জীবনে তোমাকে আমি গভীরভাবে ভালবেসেছিলাম । হয়তো ভাইয়ের মত , হয়তো তারও বেশী । সময় বৈরী ছিল । আমাদের আর দেখা হোল না । তুমি যাবার পর আমার নামে অপবাদ রটানো হয়েছিল । এমন কথা যা লিখতেও আমার ঘৃণা হয় । নমিতার জন্য খারাপ লাগবে । ওর হয়তো এ জনমে আর ঘর বাঁধা হবে না । আমার ভেতর ভালোবাসার বোধ জাগিয়ে তোলায় তোমার কোন অপরাধ ছিল না । নিজের উপর কখনো দোষ নিও না । ঐ কটি দিনই ছিল জীবনের মধুরতম মুহূর্ত । তুমি না এলে বিধাতার এই বিস্ময়কর সৃষ্টিটি সম্পর্কে কোনদিন জানা হত না , কৃতজ্ঞতার শেষ নেই তোমার কাছে । শুধু ঈশ্বরের কাছে অখ্যাত , অজ্ঞাতকুলশীল বিনোদ বিহারির ছোট্ট একটি প্রশ্ন রয়ে গেল , ‘আঁধার দেখাবে বলে আঁখি খুলে দিয়েছিলে ?’ ভাল থেকো ভাই । যুগ যুগ বেঁচে থেকো ।
বেনু’দা ।
আমি বজ্রাহতের মত বসে রইলাম । জগার কথায় সম্বিৎ ফিরল । চিঠির বাইরে যা জানার ছিল জগা নিজ থেকে গটগট করে বলে দিল , আপনি যাবার পর বিচার বসেছিল , বাবু । ভারী জঘন্য অপবাদ ছড়িয়েছিল মাস্টার বাবুর নামে । নিবারন বাবু নিজেই প্রমান হাজির করলেন , ক্লাস টেনের একছাত্র । বিনোদ বাবু শান্ত ভাবে সব শুনেছেন , প্রতিবাদ করেন নি । গভীর রাত্রে আমাকে আপনার বই পত্র পৌঁছে দিলেন । তারপর হাওয়া । কারো মনে কিছুই রেখাপাত করলো না । দুদিন পরে মৌয়াল দল যখন বিনোদ বাবুর রক্তমাখা জামা নিয়ে এলো তখন সবার চেতনা হোল । ছাত্ররা হেড মাস্টারের উপর ক্ষেপে উঠলো । ম্যানেজিং কমিটিও চড়াও হোল । ষড়যন্ত্র করেছিলেন স্বীকার করেও শেষ পর্যন্ত রক্ষা পেলেন না । লোকজন তাকে মাথা কামিয়ে নৌকোয় তুলে দিল । আর শুনতে পারছিলাম না ।জগন্ময়কে থামিয়ে বললাম , মাঝিরা বাজারে ঢুকেছে , খেতে । তাদের এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে বলে আমার বিছানা পত্র বেঁধে দাও । জগার বিস্ময় কাটাতে পকেট থেকে পোস্টিং অর্ডারটা টেবিলে রাখলাম ।
আকাশে চাঁদ উঠেছে । বিলাসগঞ্জের ছায়া পড়েছে রূপালী জলে । নৌকা চলতে শুরু করেছে । জ্যোৎস্নার আলোয় পেছন থেকে দেবদারু সারিটিকে যক্ষের ধন পাহারায় ব্রতী পাতালপুরীর এক দল শঙ্খিনীর মত লাগছে । বিলাসগঞ্জ , সৌন্দর্যের যক্ষ ভাণ্ডার । আমি দৃষ্টি ঘুরিয়ে গলুইয়ের দিকে ফিরে বসলাম ।
শেষ কথা
আমার গল্প থেমে গেছে কিন্তু গল্পকার এখান থেকেই শুরু করলেন । বিভাগীয় অফিসে যোগ দিয়েছি । পাখির নীড়ের মত একটি ঘর হয়েছে আমার , নীলাকে নিয়ে । সুখ সাচ্ছন্দের অভাব নেই । কিন্তু এত কিছুর পরেও যা খুঁজে পাচ্ছিলাম না সেটি হোল আনন্দ । দুসপ্তাহে ব্যাপারটা ধরে ফেললো নীলা । তারপর আমাকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে খুঁজতে লাগলো একজন উপযুক্ত ডাক্তার । সে সময়ে মনের অসুখের জন্য খুব বেশী ডাক্তার ছিল না । শেষতক আমরা একজনের খোঁজ পেলাম , সবচেয়ে বড় হাসপাতালটিতে । সন্ধ্যায় তার চেম্বার থেকে বেরুতেই দেখলাম ট্রলিতে করে একজন রোগীকে অপারেশন থিয়েটারের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে । লোকটির গায়ের রঙ আর দীর্ঘ চুল দেখে বুকের ভেতর ধক করে উঠলো । বোদ্ধা পাঠক নিশ্চয় ধরে ফেলেছেন । আমাকে আবার ছুটে যেতে হোল বিলাসগঞ্জ , সঙ্গে নীলা । নমিতা’দি আর চেয়ারম্যান বাবুকে নিয়ে যখন ফিরে এলাম সেই তিন দিনে বেনু’দার দুর্বল শরীরে একটু শক্তি ফিরেছে । সেটা কি শরীরের না মনের খুব বেশী বোঝা গেল না । মধুর হাসিতে দাদা ডান হাতটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিতেই আমি হাতটি নমিতা’দির হাতে তুলে দিলাম ।
বনে সেদিন বাঘের সাথে দাদার মরনপণ লড়াই হয়েছিল । কয়েকজন বাওয়ালী দূর থেকে আওয়াজ শুনে এগিয়ে আসে । তাদের মমত্বই একসময় মরনাপন্ন দাদাকে নিয়ে আসে নিকটস্থ ফরেস্ট অফিসে । ভাগ্যক্রমে সেদিন পরিদর্শনে এসেছিলেন খুলনার ডি এফ ও । দ্রুততম সময়ে স্পীড বোটে দাদাকে হাসপাতালে নিয়ে আসার মহানুভবতাটুকু পুরোটাই তাঁর । বাঘের দাঁতে বেনুদার বাম হাতটা শরীর থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল । পরপর চারটি অপারেশন করে হাতটি কিছুটা সারিয়ে তোলা গেছে । বেনু’দার কণ্ঠে কথাগুলো শুনতে শুনতে বুকের ভেতরটা শির শির করে উঠলো , ‘প্রিয় গল্পকার , জীবনে যে ভুলেও একবার তোমার স্ক্রিপ্টে ঠোঁট মেলায়নি কি অসীম মমতায় তাকেও তুমি গল্পের কেন্দ্রে ধরে রাখো !’
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন