বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৫ আগস্ট ১৯৬৬
গল্প/কবিতা: ১৫টি

তবু আমারে দেবোনা ভুলিতে

এ কেমন প্রেম? আগস্ট ২০১৬

নীলকমল

রহস্যময়ী নারী জুলাই ২০১৬

অচিনপুর

শ্রমিক মে ২০১৬

শীত / ঠাণ্ডা (ডিসেম্বর ২০১৫)

এক শরতের গল্প

শামীম খান
comment ২০  favorite ২  import_contacts ৯৭১

গৃহস্থলি ফেলে এলাম দেখব তোমায় বলে
দুচোখ ভরে দেখতে দিলে কই
সূর্য পাটে সাধ অধরা ফিরছি আপন কুলে
আমি তোমার এমন তো কেউ নই
( ১ )
অবিশ্বাস্য । যেটা ভাবছি , সেটাই ফলে যাচ্ছে । ভাবছেন আলাদীনের চেরাগ বা জলদেবতার বর পেয়েছি কিনা ? না পাইনি , তবে বলতে পারেন ইচ্ছা পূরণের মাহেন্দ্রক্ষনে পৌঁছে গেছি । ঘোর নাস্তিক হয়েও তাই ঘটনা প্রবাহে বেশ অবিভুত আমি । দু সপ্তাহ আগের সকাল থেকেই শুরু করি । অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছিল । মুশলধারা যাকে বলে । এগারোটা নাগাদ বাড়ীর সামনের রাস্তায় হাঁটু পানি জমে গেল । বিকেলে দলের কাজে বাইরে যাবার কথা আছে । আশায় রইলাম , এখনি বৃষ্টি থেমে গেলে হয়তো প্রোগ্রামটা করে ফেলা যাবে । শেষতক দুপুরটা কাকভেজা ভিজে জেলখানার ম্যাড়মেড়ে বাসি রুটির মত হয়ে গেলে আর বুঝতে বাকী রইলনা আজকের প্রোগ্রাম অটো-ক্যান্সেলেশানের স্ট্যাটাসে পৌঁছে গেছে । মধ্যাহ্ন ভোজের পাঠ শেষ হতেই ভেতর থেকে একটা সিয়েস্তার আবেদন এলো । পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড শেষে বর্ষণের এই দুপুরে শরীর আর মন একটু বেশী স্বাধীনতার দাবী তো করতেই পারে । চারটার টিউশানিতে আজ আর নাইবা গেলাম , ভাবতে ভাবতে প্রায় ভেঙে পড়া খাটটির দিকে এগিয়ে চলেছি , হঠাৎ নাদেরের কথা মনে পড়লো । আহ , কতদিন দেখিনা । দুজনা ঠিক ভাই ছিলাম , না বন্ধু , আজো তা জানা হয়নি । এই খাটে দিনের পর দিন এক বালিশে শুয়ে রাত কেটেছে আমাদের , ছেলেবেলা থেকে একটানা সতেরো বছর । এ ঘর আজো দিনে দারিদ্র্য আর রাতে স্বপ্নের দখলে । শুনেছি সিয়াটলে ডাক্তার হিসেবে নিজেকে বেশ গুছিয়ে নিয়েছে নাদের । বছর সাতেক হোল আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছে । প্রথম বছর যোগাযোগ ভালই ছিল । তারপরই হোল নারী যোগ আর বন্ধু বিয়োগ । দুজনার মাঝে দাঁড়িয়ে গেছে আমাদেরই আরেক সহপাঠী , সেঁজুতি ।
অন্য গোলার্ধে পুরো এক বছর পার করে নাদের হঠাৎ উপলব্ধি করলো সেঁজুতিই তার জন্য সবচেয়ে পারফেক্ট ম্যাচ । ওর হাত পেতে চেয়েছিল নাদের । কিন্তু সেঁজুতি সে হাত আগেই বাড়িয়ে বসেছিল আমার দিকে । নিজের কথা না হয় পরে বললাম , মুল ঘটনায় যাওয়া যাক । শেষের দিকে ফোন করাই বন্ধ করে দিয়েছিল নাদের । আমি কল করলে হু হা টাইপের উত্তর দিত , কুশলের শব্দগুলোও ভারী ভারী ঠেকতো । জেলে যাবার আগে শেষবার কথা হয়েছিল । বলেছিলাম কিভাবে নির্দোষ হয়েও পরিস্থিতির কারনে ফেঁসে যাচ্ছি । সত্যি বলতে কি , আটলান্টিকের ওপার থেকে ভেসে আসা সেদিনের শীতল কণ্ঠস্বরটি যে আমার পরম ভাই কিংবা বন্ধুর , বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল । এই ক’বছরে নিজ থেকে একবারও আমার বা মায়ের খোঁজ নিল না । মায়ের মৃত্যুতে ছয় ঘণ্টার প্যারল পেলাম । বাড়ীটা খাঁ খাঁ করছিল । মাদ্রাসার কয়েকটি এতিম ছেলে শুকনো মুখে ঘোরা ফেরা করছিল । আমার আবেগহীন জীবনে কখনো অশ্রুপাতের ঘটনা ঘটেছে , মনে পড়ে না । মায়ের লাশের পাশে দাঁড়িয়েও তেমন ভাবান্তর হোল না । প্রহরী পরিবেষ্টিত হয়ে ফিরে চলেছি । মনে পড়লো , মা নাদেরকে আমার সমানই স্নেহ করতেন । হঠাৎ আমার দুচোখ ভরে উঠলো । পাশে বসা গম্ভীর প্রকৃতির জেল দারোগা পকেট থেকে রুমালটি বাড়িয়ে দিয়ে অন্য দিকে চেয়ে রইলেন ।
বৃষ্টির বেগ বাড়ছে । ভাঙ্গা জানালা গলে হু হু করে ঢুকছে ভেজা হাওয়া । একই সাথে অন্য একটি ঘুলঘুলি দিয়ে আমার বত্রিশ বসন্তের একটি উপেক্ষিত সুর আচমকা ঢুকে পড়ে লঙ্কাকাণ্ড শুরু করেছে । অতি ব্যবহারে থেবড়ে যাওয়া বালিশটাকে দুপাশে দুঘা বসিয়ে দিতেই পেটটা মসৃণ , রমনীয় হয়ে গেল । শুনেছি এক বিদেশিনীকে বিয়ে করে সংসার পেতেছে নাদের । শ্বেতাঙ্গ বঁধুরাও কি বাদামি স্বামীকে কোলে মাথা রেখে ঘুম পাড়িয়ে দেয় ? অশিষ্ট ভাবনাগুলো সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মত আছড়ে পড়ছে মনের তটভূমিতে । এমন বেসামাল সময় জীবনে কমই এসেছে । সন্ত্রস্ত কণ্ঠে আমি আত্মসম্মোহনের শব্দগুচ্ছ উচ্চারণ করলাম , ছবি , তোমার হৃদয়ে দেশ মাতৃকা ছাড়া আর কারো স্থান নেই । মেহেনতি জনতা ছাড়া তোমার কোন আপন জন নেই , কেউ ছিল না কোন কালে .............. ।
আমাদের দেশে কখনো বিকেলে ডাক আসে না । আজকে এলো । পোষ্টম্যান একটি চিঠি ধরিয়ে দিয়ে গর্বিত হেসে বলল , ‘ভাবছিলাম কালকে দিবানি , পরে আপনার কথা ভাইবে চইলে আলাম’ । বেকারদের সাথে ডাক পিয়নদের একটা গভীর সম্পর্ক থাকে , এক সময়ে আমারও ছিল । কিন্তু এই লোকটিকে পাঁচ বছর আগে কেন সারা জীবনেও দেখিনি , হলফ করে বলতে পারি । পকেটে মাত্র বিশটি টাকা আছে কয়েকটি সিগারেটের দাম । রাতে প্রলেটারিয়েটদের নিয়ে একটা কবিতা লিখবো ভেবেছিলাম । লোকটির হাতে নোটটি গুজে দিয়ে আমি চিঠিতে মন দিলাম । ঢাকা থেকে প্রোফেসর খোদা বক্স নামে একজন পাঠিয়েছেন । কি অসম্ভব ব্যাপার , এ নামে কাউকে আমি চিনি না ! অথচ প্রাপকের স্থানে স্পষ্ট লেখা –
সাবিউর রহমান ( ছবি )
৩৬/৬ , আর কে রোড
খুলনা ।
বাইরের মোড়কটি খুলতেই বেরিয়ে এলো আরেকটি চওড়া খাম । নাদেরের চিঠি !
প্রিয় ছবি ,
অনেক শুভেচ্ছা । ব্যস্ততার কারনে যোগাযোগ রাখতে পারিনি অনেক দিন । পারবি কিনা জানিনা , ক্ষমা করতে চেষ্টা করিস । সাথে একটা চেক পাঠালাম । ঘুষ নয় , আমার প্রথম বেতন । অনেক দিন ধরে আগলে রেখেছি , তোর জেলের মেয়াদ শেষ হবার অপেক্ষায় । পুরনো সেই প্রতিজ্ঞার কথা মনে আছে তো ? সামান্থাকে বিয়ে করে ফেলেছি , সেও দুবছর । সেঁজুতিকে নিয়ে আমার আর কিছুই ভাববার রইল না ।
খালাম্মার মৃত্যুর সময় আসতে পারিনি , শর্ট নোটিশে টিকেট পাওয়া সম্ভব হোল না । ছেড়ে যাওয়া কাছের মানুষদের জন্য দোয়া করাটা যদি সবচেয়ে বড় ব্যাপার হয় তবে সেটা করে চলেছি , প্রতি ওয়াক্তে । তবু মন কাঁদে , শেষ দেখাটা দেখতে পেলাম না । সেদিন স্বপ্নে দেখা হোল । আমরা পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি , খাল্লামা দরোজায় দাঁড়িয়ে দোয়া পড়ে আমাদের আমাদের বুকে ফুঁ দিচ্ছেন । সারা রাত আর ঘুম এলো না , এপাশ ওপাশ করতে করতে সকাল হয়ে গেল । দুপুরে মেইল এলো বিখ্যাত রেক্সন হাসপাতাল থেকে , আমাকে ডেকে পাঠিয়েছে । স্যালারীসহ খুবই দারুণ প্যাকেজ । চোখে জল এসে গেল । সারা জীবন এই এতিম ছেলেটিকে পুত্র স্নেহে বেঁধে রেখেছেন । আজ মৃত্যুর পরেও দোয়া করতে ভুলেন না । তোদের কথা সামান্থাকে বলেছি । ও আমার কাছের মানুষদের দেখতে চায় । বেশ শান্ত স্বভাবের মেয়ে । আয় না একবার উড়াল দিয়ে , আমার ছোট্ট সংসার দেখে যাবি । ভিসা টিকেটের ব্যবস্থা আমার , তুই শুধু ঠিক কর কবে আসবি ।
যোগাযোগ রাখিস । ভাল থাকিস ।
ইতি
তোর নাদের ।
দ্র. এখান থেকে এক প্রবাসী দেশে ফিরছিল । কোথায় আছিস , সে ব্যাপারে নিশ্চিত নই বলে এখানকার এক বন্ধুর বড়ভাইয়ের ঠিকানায় চিঠিটা পাঠালাম ।
নীচে দুটি মোবাইল নম্বর একটি নাদেরের অন্যটি প্রোফেসর খোদা বক্সের ।
মনে পড়ে ক্লাস এইটে দুজন একসাথে বৃত্তি পেয়েছিলাম । প্রথম ছয় মাসের টাকা একবারে হাতে পেয়ে সে কি আনন্দ ! বাবা তখনো বেঁচে আছেন । ভয়ে ভয়ে দুজনে সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম , সিনেমা দেখার অনুমতি চাই । রাশভারী বাবা নিউজ পেপারটা সামনে মেলে ধরতে ধরতে বললেন , সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার মধ্যে বাসায় ফেরা চাই । তিন সপ্তাহ ধরে পিকচার প্যালেসে একটা মারদাঙ্গা ছবি চলছিল । উপচে পড়া ভিড় । নায়ক নায়িকার অভিসারে কাবাব মে হাড্ডি ভিলেনের উপস্থিতি । কি ভীষণ মারপিট । কেউ হারতে চায় না । হঠাৎ হলের ভেতর নারী কণ্ঠের কান্নায় ঘোর কাটল । ড্রপ সিন । অবিশ্বাস্য ব্যাপার । গর্ভবতী এক মহিলা ছবি দেখতে এসেছিলেন । হলের ভেতরেই বাচ্চা ডেলিভারি হয়ে গেছে । কয়েকজন মহিলা দর্শক চারিপাশে শাড়ী টাঙ্গিয়ে নবজাতক আর মাকে আলাদা করে দিয়েছেন । হাজারো চোখে বিস্ময় আর উৎকণ্ঠা । এ্যাম্বুলেন্স আসতে আসতে ঘণ্টা খানেক পেরিয়ে গেল । শো বন্ধ করে ম্যানেজার ঘোষণা দিলেন , আগামী কাল পুরো ছবিটি এই টিকিটে আবার দেখানো হবে । ছবিটি আর দেখা হয়ে ওঠেনি আমাদের । বাসায় ফিরে আবিষ্কার করলাম ভিড়ের ভেতর দুজনেরই পকেটমার হয়ে গেছে । ক্লাস নাইনের একটি ছেলের প্রথম উপার্জন খোয়ানোর ব্যথা পুত্র শোকের চেয়ে কম কিনা জানি না , তিনরাত ঘুমুতে পারলাম না । লজ্জা আর ভয়ে কাউকে কিছুই বলিনি । নাদেরতো স্কুলে যাওয়াই ছেড়ে দিয়েছে । চতুর্থ দিন স্কুল থেকে ফিরে দেখলাম , কেঁদে ও দুচোখ লাল করে ফেলেছে । ঠিকানাবিহীন এই পড়ুয়া ভাইটির কষ্ট মনটাকে ছুঁয়ে গেল । জোর করে নিয়ে গেলাম বড় রেস্টুরেন্টে । ওর পছন্দের খাবার পরিবেশন করা হোল । বারবার খোঁচাচ্ছিল , এত টাকা কোথায় পেলাম । রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছি , শুনে ভোলাভালা নাদের গভীর আগ্রহে খাবারটা শেষ করলো । ভোজন সেরে গেলাম পোশাকের দোকানে , প্রিয় পোশাকে ওকে দারুন দেখাচ্ছিল । শিক্ষিকা মায়ের সঞ্চয়ে সেই প্রথম আর সেই শেষ হাত রাখা আমার । অভিভূত নাদের সেদিন বলেছিল , যদি কোন দিন বড় কিছু হতে পারি , আমার প্রথম উপার্জন হবে তোর । আমিও বোধ হয় ওর কথার পিঠে এভাবেই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম । বিষয়টা এতোই হাল্কা ছিল যে আর কখনো আমরা এসব মনে করিনি । আমরা নই , আমি । নাদের ঠিকই মনে রেখেছে । সাতটি বছর আগে ছেড়ে যাওয়া বন্ধুর অভাবিত প্রত্যাবর্তনে জড়ের মত স্থির বসে রইলাম আমি ।
( ২ )

বিত্তে বাড়ে বাসনা - বলে কিনা জানি না , পরের দুদিনে অর্থ আর প্রভাব-প্রতিপত্তির পিপাসায় আমার বুকটা বারবার শুকিয়ে উঠেছে । কেউ দামী গাড়ীতে চড়ে ঘুরছে দেখলে নিজেকে কল্পনা করছি চালকের সিটে । গাড়ীর নির্মাণে শোষিত শ্রমিকের কথা ভেবে বুক ভারী হচ্ছে না । ব্রিফকেস হাতে দশটা-পাঁচটার কেতা দুরস্ত কর্পোরেট কর্মকর্তাকে দেখলে মুহূর্তে নিজেকে ভেবে নিচ্ছি তার জায়গায় । অফিসের দারোয়ানের অপুষ্ট শরীর বা তারও পেছনে দারিদ্র্য পীড়িত একটি পরিবারের ভাবনা এসে মনকে পীড়া দিচ্ছে না । সম্মোহনের মন্ত্রগুলোও ভোঁতা হয়ে গেছে । বিবেকের চালুনিতে বোধ করি তৈরি হয়েছে বড়সড় কিছু ছিদ্র , বুঝতে পারলাম কাল সন্ধ্যায় । দিনান্তে কাজ সেরে ফিরে যাচ্ছিল এক যুবক । পেশীবহুল হাতদুটোয় চোখ আটকে রইল অনেকক্ষণ । নিজের দুর্বল বাহুগুলো কেন বটবৃক্ষের বলিষ্ঠ শাখার মত হলনা , ভাবতে ভাবতে বুকের মধ্যে একটা অচেনা কান্না গুমরে উঠলো । মনে হোল , হায় আমি যদি আরও সুন্দর হতাম , হতে পারতাম একজন সুপুরুষ কবি , একজন নাজিম হিকমাত !
আয়না দেখার অভ্যাস ছেড়েছি ছেলেবেলায় । জেলের পাঁচ বছর তো হাতের আন্দাজে চুল আঁচড়ানোর কাজটি সেরে নিয়েছি । আজ ঘুম থেকে উঠে মুখে পানি ছিটিয়ে দিতেই হঠাৎ দেয়ালের পারা খোয়ানো পুরনো আয়নায় চোখ পড়লো এবং রীতিমত চমকে উঠলাম । আমি কি বদলে গেছি , নাকি আগাগোড়াই এমন ছিলাম ! আয়নায় দাঁড়ানো সুপুরুষ লোকটিকে কেউ রমনী-মোহন বললে মোটেই বাড়াবাড়ি হবে না । বিহ্বল চোখের অবিশ্বাসটা ফিকে হবার আগেই দরোজায় কড়া নাড়ার শব্দ এলো । চোখ কপালে তুলে আমি অবলোকন করলাম , অভাজনের দরোজায় দাঁড়িয়ে আছেন প্রকাশনা জগতের প্রবাদ পুরুষ , আরিফ কবীর । কাল পার্টি অফিসে কে যেন বলছিল , ব্যক্তিগত সফরে কবীর সাহেব এসেছেন এ শহরে । নিজেই চেয়ার টেনে বসেতে বসতে প্রশ্ন করলেন , কবিতা লেখেন কতদিন ?
-ছেলেবেলা থেকেই , তবে ওগুলো কতটা কবিতা হয় তা নিয়ে আমার নিজেরই সংশয় আছে ।
-আপনি জেলে থাকতে একটা কবিতা ছাপা হয়েছিল ‘আলোর সকাল’ প্রত্রিকায় । কবিতাটা আমি পড়েছি । খোঁজ খবর নিয়ে আরও দুয়েকটি লেখা পেয়েছি আপনার । ইন ফ্যাক্ট সেই সুত্রেই আজ আপনার বাসায় আসা । আপনার কাছে কি পাণ্ডুলিপি রেডি আছে ?
-দুঃখিত , কখনো এভাবে ভাবিনি । তবে কয়েক ঘণ্টা সময় পেলেই রেডি করে দেয়া যাবে ।
-বেশতো , কাল বিকেল চারটায় আমার ফ্লাইট । দুপুরের আগে যে কোন সময়ে আমার বাড়ীতে ওটা পৌঁছে দিলে চলবে । আমি কি বলবো খুঁজে পাচ্ছিলাম না । হ্যান্ড শেক করে সঙ্গীসহ কবীর সাহেব বিদায় নিলেন । আমি গায়ে চিমটি কেটে নিশ্চিত হলাম , না , এটা কোন স্বপ্ন ছিলনা ।
চনমনে ফুর্তিতে রিক্সায় চেপে বসলাম । ভীষণ আগ্রহ জন্মেছে ঘরবাড়ী নিয়ে । বাড়ীটাকে সাজিয়ে বাসযোগ্য করে তুলতে হবে । নিউ মার্কেটের সামনে যেতেই একটা জটলা চোখে পড়লো । নিশ্চয় কোন পকেটমার ধরা পড়েছে । সেদিনও এমন জটলা পাকিয়েছিল । গণধোলাই ছিল অবধারিত । অপরাধতো আর ছোট খাটো না । প্রকাশ্য দিবালোকে জনাকীর্ণ রাজপথে এক যুবতী ঠোঁটে ঠোঁট চেপে জড়িয়ে ধরে আছে সমবয়সী এক যুবককে ! জটলার ভেতরে সবচেয়ে উৎসাহী দাড়িওয়ালা এক লোকের কব্জিটি সজোরে চেপে ধরে চড়া গলায় আমি ইংরেজিতে বলতে শুরু করলাম । কি বলেছিলাম মাথা মুণ্ডু কিছুই মনে নেই । শুধু মাথায় রেখেছিলাম এরা ইংরেজি বুঝে না , সমীহ করে । মারমুখী জটলা হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো । একটু ভরসা পেলাম , মেনটাল ডিজিজ , ডাক্তার , অ্যাপয়েন্টমেন্ট শব্দগুলো কাজ করছে । লোকগুলো মুখচাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো । দাড়িওয়ালা নিজেই রিক্সা ডেকে আমাদের ধরাধরি করে উঠিয়ে দিল । পাশে গ্যাঁট হয়ে বসে রইল সেঁজুতি । বাড়াবাড়ির ভয়ঙ্কর পরিনাম তাকে একটুও ভীত করতে পারেনি , মুখাবয়ব জুড়ে সেঁটে আছে বেপরোয়া বাজীর বিজয় পতাকা ।
( ৩ )
কয়েক বছর পর ছাদে উঠলাম । পুরনো দালান , সিঁড়িতে শ্যাওলা জমে গেছে । এইতো আর ক'টাদিন । ডেভেলপারের সাথে কনট্রাক্ট করে ফেলেছি । বর্ষা শেষ হলেই কাজ শুরু হবে , গড়ে উঠবে সাততলা ভবন । আমার দাদা তৈরি করেছিলেন বাড়ীটা । দক্ষিণের লোনা জলে বয়সের চেয়ে বেশী বুড়িয়ে গেছে । সিঁড়ির পাশেই আছে একটা চোরা কুঠরি । ব্রিটিশ আমলে বিপ্লবী ভীম রায়কে দাদা এখানে লুকিয়ে রেখেছিলেন দীর্ঘদিন । পরিস্থিতি শান্ত হলে বেরিয়ে এসে ভীম রায় হাসতে হাসতে বলেছিলেন , ‘যে অপরাধ করেছি ধরা পড়লে গোরা সাহেবরা বড়জোর একমাসের জেল দিতো । কিন্তু সোলায়মানের হাতে ধরা পড়ে পুরো তিনমাস জেল খাটলাম’ । সব স্মৃতিই একসময়ে অনন্তে হারিয়ে যাবে , কোন চিহ্ন রইবেনা ।
ছেলেবেলায় আমার আর নাদেরের একটা প্রিয় কাজ ছিল ক্যারাম খেলা । ছাদের উপর নারিকেল গাছের ছায়া পড়তো । শেষ দুপুরে মেতে উঠতাম আমরা । একসময়ে পাশের বাড়ী থেকে গামলা ভর্তি পেঁয়াজ-মরিচে মাখানো মুড়ি নিয়ে হৈ-চৈ করতে করতে সেখানে হাজির হত সেঁজুতি । কথায় বলে , তিনে গোলমাল । সেঁজুতি এলে সেটাই ফলে যেত । হট্টগোল থামাতে একসময়ে মাকে আসতে হতো । তাঁর প্রশ্রয়ে সেঁজুতির হাতে নিয়মিত হেনস্তা হতাম আমরা । যুদ্ধ স্থগিত রেখে আমরা নতুন সুযোগের অপেক্ষায় থাকতাম । এইচ এস সি’র আগেই জড়িয়ে পড়েছিলাম সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে । স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম কিভাবে নতুন নতুন হাজারো মানুষের সাথে তৈরি হচ্ছিল অদৃশ্য বাঁধন , একই সাথে পুরনো বাঁধনগুলো ক্রমশ শিথিল আর দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল । বন্ধুদের সাথে খুনসুটির দৃশ্যগুলোর অবতারনা হতো কালেভদ্রে । এরই মধ্যে সেঁজুতি হাতে তুলে নিল চারুকারু । নাদের মেডিক্যাল সায়েন্স । আর আমি , বিশ্ববিদ্যালয়ে নাম থাকলেও পার্টিতে ফুল টাইমার ।
মাতৃহীনা সেঁজুতিকে মা একটু বেশীই পছন্দ করতেন । সেই সুযোগে আমাকে উত্তক্ত করতো ও । প্রথম প্রথম হালকা ভাবে নিয়েছিলাম । পরে বুঝেছি , এটা ছেলেমানুষি নয় , ছেলেমানুষির ছলে অন্যকিছু । প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিপ্লবী আমি , ওর ডাকে সাড়া দেয়া সম্ভব ছিল না । আমার শীতল ব্যবহারে ওর বোঝার কিছুই বাকী ছিল না । তবু একের পর এক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল । এক সন্ধ্যায় ছুটতে ছুটতে এলো ,
-এই ছবি , টিপটা আমাকে পরিয়ে দে না ।
-পারবো না , তুই আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজে পরে নে ।
-আয়নাটা ভেঙে গেছে ।
-তাহলে মায়ের কাছে যা ।
-খালাম্মা রান্নাঘরে । হাত ব্যস্ত ।
আমি হাত বাড়িয়ে টিপটি নিয়ে কয়েনের মত ছুঁড়ে দিলাম ছাদে । বুক ভাঙ্গার কষ্ট যে কতটা তীব্র ওর মুখের দিকে একবার তাকিয়েই তা পড়ে নিলাম । খানিক্ষন গম্ভীর চোখে চেয়ে রইল আমার দিকে । তারপর ছুটে চলে গেল । আমি হাঁপ ছাড়লাম , এ পথ থেকে ওকে ফেরাতেই হবে । একটু পরে মায়ের চিৎকার শুনে ছুটে ভিতরে গেলাম । ভাঙ্গা কাঁচে রক্তাক্ত সেঁজুতির হাতদুটো । মা শক্তি দিয়ে ক্ষতগুলো ধরে রেখেছেন । উদ্ভ্রান্তের মত গোঙাচ্ছে সেঁজুতি ।
আরও পরে , অনার্স পরীক্ষা শেষে এক সন্ধ্যায় বাড়াবাড়ির চূড়ান্ত করে ফেললো । এই ছাদে বসেই ধারালো ব্লেডে কব্জি কাটলো নিজের । ভয়ঙ্কর রক্তারক্তি ব্যাপার । ধরাধরি করে সবাই নিয়ে গেলাম হাসপাতালে । ডাক্তার তাকে সারজিক্যাল ওয়ার্ডে এডমিট করতে অস্বীকার করলো । বর্ডার লাইন পারসোনালিটি ডিসওয়ার্ডার । কঠিন মনের অসুখ । মনে পড়লো তিন দিন আগের একটি ঘটনা । গভীর রাতে দরোজায় টোকা পড়লে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল । বেরিয়ে দেখি সেঁজুতি । ক্লান্ত আর অচেনা লাগছে ওকে । টেনে টেনে বলল , একটা সিগারেট হবে ? আমি সিগারেট খাই না , স্মরণ করিয়ে দিতেই একটা বিদ্রূপাত্মক হাসি ছুঁড়ে দিল , দিনে দিনে তুই কি মেয়ে হয়ে যাচ্ছিস , ছবি ! হঠাৎ আমার সন্দেহ হোল , পাগল হয়ে যাচ্ছে সেঁজুতি ।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ আঃ রহমানের ত্বত্তাবধানে দেয়া শুরু হোল হাই ডোজ এনটিসাইকোটিক মেডিসিন । একটু একটু করে স্বাভাবিক হয়ে উঠছিল । সেদিন পার্টি অফিসে কয়েকটি জরুরী কাজ সেরে বাড়ী ফিরতে ফিরতে মাঝ রাত হয়ে গেল । মা অপেক্ষা করছিলেন । প্লেট এগিয়ে দিতে দিতে বললেন , খোকা , মেয়েটির দিকে একবার ফিরে দেখ। সংসারে বাবা ছাড়া কেউ নেই । সবকিছুর বিনিময়ে তোকে পেতে চায় । একটা মেয়েকে শান্তি দিতে না পারলে গোটা জাতির জন্য কিসের শান্তি আনবি তুই ? মায়ের কথা দূরাগত তারার কান্নার মত শোনাচ্ছিল । কিন্তু আমি যে আমার ক্ষুদ্র জীবনের ফয়সালা আগেই করে ফেলেছি । সিদ্ধার্থকে আটকে রাখে সাধ্যকি যশোদার । নীরবে খাবার শেষ করে উঠে এলাম । মা বারান্দার কোনে ঝুলতে থাকা একটুকরো আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন ।
( ৪ )

বাড়ীটা নতুন করে সাজিয়েছি । বসার ঘরে সেট করেছি চওড়া রঙিন টি ভি , নতুন সোফা , দেয়ালে দামী পেইন্টি । মেঝেটা মুড়েছি মোলায়েম নীল কার্পেটে । ইনডোর প্লান্টের পাশে জ্বলছে সুদৃশ্য শেড ল্যাম্প । ঘরটা একেবারে ঝকঝক করছে । মিউজিক সিস্টেমটা চালিয়ে দিতেই ভেসে এলো জগজিৎ সিংয়ের গজল । সে সুরের সাথে মিশে যাচ্ছে ঘরের কোন থেকে ছড়িয়ে পড়া লেমন-গ্রাস এসেন্স । তবু মন বসছেনা , এসবই যেন রাত না পোহাতেই মিইয়ে পড়া রজনীগন্ধা । পায়ে পায়ে চলে গেলাম ছাদে । শরতের জ্যোৎস্না ধোঁয়া রাত । পেঁজা পেঁজা মেঘের ভেলা ভেসে চলেছে নিরুদ্দেশে । সেঁজুতির মুখচ্ছবি ভেসে উঠলো মনে । এক সন্ধ্যায় একটু দূরে বসে আবৃতি করছিল রফিক আজাদের ‘যদি ভালবাসা পাই’-
যদি ভালবাসা পাই আমার আকাশ হবে দ্রুত শরতের নীল
যদি ভালবাসা পাই জীবনে আমিও পাব মধ্য অন্তমিল ............
গদ্যময় জীবনের কথকতায় একটুখানি অন্তমিল খুজেছিল মেয়েটি । প্রত্যাশায় কাঙালের মত বারবার হাত পেতে দাঁড়িয়েছিল আমার দরোজায় । আমার শীতল ব্যাবহারে বার বার ভেঙে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়েছে তার হৃদয় । কেন আমি এতটা নিষ্ঠুর হয়েছিলাম ? অকস্মাৎ চোখদুটো অগ্নিগিরির মত জ্বলে উঠলো , লাভার সাগরে দগ্ধ বিদগ্ধ হচ্ছে আমার পাপ । একসময়ে অনুশোচনা ক্লিষ্ট মনে কামনা করলাম , আহ , যদি আরেকবার সুযোগ পেতাম ভালোবাসার ঋণ পরিশোধের ! ভাবতে না ভাবতেই নতুন লাগানো ডোর বেলের আওয়াজে চমকে উঠলাম । কিন্তু নীচে নামতে নামতে আমার পাদুটো আড়ষ্ট হয়ে এলো । দুয়ারের ওপারে যদি সত্যি দাঁড়িয়ে থাকে আমার তৃতীয় ইচ্ছে পুরন , নিশ্চিত ফাটল ধরবে নিরীশ্বরবাদিতার ভিতে । আমার ছায়ায় বেড়ে ওঠা অন্য আমি চরণ ধরে ফেরাতে চায় আমাকে ।
দরোজায় দাঁড়ানো মহিলা দুটিকে প্রথমে ভিখারি ভেবে ভুল হোল । পরে বুঝলাম পাগল । একজন ফর্সা মত ছোট খাটো । অন্যজন সেঁজুতি সয়ং । আমাকে চিনতে পারেনি । আমার কিন্তু ভুল হয়নি , হাতের কাঁটা দাগগুলো কঙ্কনের মত উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল । আর চোখদুটো চির চেনা । দুইজন অপ্রকৃতস্থ রমনীকে আশ্রয় দিতেই সহসা মনে পড়লো আজ সন্ধ্যায় টি ভি’তে ফ্লাস নিউজ দেখাচ্ছিল , কোন এক হাসপাতাল থেকে কয়েকজন মানসিক ভারসাম্যহীন রোগী পালিয়ে গেছে । আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল ।
মাথার মধ্যে হাজারো চিন্তা একসাথে জড় হয়েছে । এখানে রেখেই এদের চিকিতসা করা যায় , নামজাদা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ আঃ রাহমানতো আছেনই । কিন্তু আইন আমাকে ছাড়বে না । ইতিমধ্যে দুজনকে আলাদা করে ফেলেছি । ফর্সা মহিলাকে মায়ের ঘরে ঢুকিয়ে তালা মেরে দিয়েছি । এক গ্লাস দুধ খেয়ে বেচারী ঘুমাচ্ছে মায়ের বিছানায় । সেঁজুতির কাঁধে হাত রাখলাম , আমাকে তুই চিনতে পারছিস না পাগলী ! নিজের গলার স্বর অচেনা আবেগে বুজে গেছে , গো গো শ্বব্দ ছাড়া নিজেই কিছু শুনতে পেলাম না । সেঁজুতি অনেকক্ষণ আমার মুখের দিকে চেয়ে রইল । মুখ থেকে লালা ঝরে পড়ছে । গভীর আবেগে আমি লালা মুছে বুকে জড়িয়ে ধরলাম । বুকের সাথে লেপটে রইল সেঁজুতি । বুক থেকে সরিয়ে চোরা কুঠরিতে তালা লাগাতে কষ্ট হচ্ছিল । আমার ভিতরে যে এতটা কোমল একজন মানুষ লুকিয়ে ছিল , জানতাম না ।
ফ্লাশ নিউজটা এখনো দেখানো হচ্ছে । আমাকে শক্ত হতে হবে । মন স্থির করে হাতে সেলফোন তুলে নিলাম । ওইতো ওপাশ থেকে রিঙের আওয়াজ আসছে -
-হ্যালো , আমার নাম , ঠিকানা নোট করে নিন............ হ্যাঁ হ্যাঁ , আমার এখানে একজন অপ্রকৃতস্থ মহিলা আশ্রয় নিয়েছেন । হ্যাঁ হ্যালো , শুনতে পাচ্ছেন ফর্সা মত , একটু বেঁটে । ......... মধ্যবয়সী , হালকা গড়ন .................. ৩৬/৬ আর কে রোড । হ্যাঁ হ্যাঁ , আমি বাসাতেই আছি ..................

পুনশ্চ- রুঢ় বাস্তবের ভেতরও অনেক ঘটনা জন্মে যা কল্পনাকে হার মানায় । সেগুলোকে সেভাবে দেখা হয়ে ওঠেনা । আমার জীবনের এই তিনটি ঘটনা পর্যায়ক্রমে না ঘটলে হয়তো এভাবে দেখতে পেতাম না । এ গল্পের জন্মও হতো না । কখনো কখনো মনে হয় আকাশের ওপারে যিনি বসে আছেন জগত সংসারের গুঢ় রহস্য রক্ষার্থে তিনি ইচ্ছে করেই দূরে থাকেন । আবার তাকে ভুলে আমরা যখন দূরে যেতে থাকি , খুব দূরে যাবার আগেই কাছে টেনে আনেন , অসীম মমতায় ...............


আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন