বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৫ অক্টোবর ১৯৮০
গল্প/কবিতা: ২টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৭২

বিচারক স্কোরঃ ৩.৯৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৭৫ / ৩.০

ক্ষোভ (জানুয়ারী ২০১৪)

মোট ভোট ৩২ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৭২ ক্ষোভ

অপর্ণা মম্ময়
comment ২৬  favorite ২  import_contacts ৯১১
আজ আমার মেজাজটা ভীষণ খারাপ। মেজাজ খারাপের কারণটা কাউকেই বলতে পারছি না। এমনকি ক্লাসে যখন ছিলাম তখন আমার প্রিয় বন্ধু অভিজিতকেও বলতে পারিনি। শুনলেই তো বলবে - আরে এটা ব্যাপার না। বয়ঃসন্ধিকালে এমন একটু আধটু হয়ই। ও নিজেকে ইদানীং খুব জ্ঞানী ভাবে। সবসময় ওর ব্যাগে ক্লাসের বইয়ের পাশাপাশি গল্পের বই বা কোনো না কোনো বই থাকেই। আর এই বয়ঃসন্ধিকাল শব্দটা ইদানীং ও বেশি ব্যবহার করছে,আমি খেয়াল করেছি। এমনিতেই মেজাজ খারাপ থাকে তারউপর ওর এই ধরণের পণ্ডিতিতে মেজাজ আরও খারাপ হয়ে যায়। ওর ভাবখানা এমন যেন ও আমার চেয়ে বছর পাঁচেকের বড়। ইউনিভার্সিটিতে পড়ুয়া আমার খালাত ভাই রাব্বি ভাইয়ার মতোই সবসময় জ্ঞানের কথা বলে। তাই অভিজিতকেও কিছু শেয়ার করতে ইচ্ছে করে না আজকাল। কিন্তু অভিজিত ছাড়া ক্লাসে আমার তেমন প্রানের কোনো বন্ধুও নেই।
মেজাজ খারাপের কারণ অন্যদের চোখে তেমন বিশাল না হলেও আমার কাছে সেটা বিশাল মানেই রাখে। আমাদের যে সময়ে ক্লাস শুরু হয়, সে সময় প্রাইমারি সেকশনের বাচ্চাদের ছুটি হয়। ক্লাস শুরু হবার আধা ঘণ্টা আগেই আমি স্কুলে যাই যাতে কিছুক্ষণ খেলতে পারি বন্ধুদের সাথে। ক্লাস ফোরের দুইজন বাচ্চা আছে,ওরা জমজ দুই বোন। আজকে বোধ হয় ওদের বাবা ওদেরকে স্কুল থেকে নিতে এসেছিলো। এক বোনকে দেখলাম দৌড়ে ওর বাবার কোলে উঠলো আরেকজন ওর বাবার ডান হাত ধরে ঝুলতে লাগলো সেও কোলে উঠবে। এই দৃশ্যটা আমার এতো ভালো লেগেছিলো, আমি খেলা থামিয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তারপর থেকে আমাদের ক্লাসের ফাহিম কিছুক্ষণ পর পর কানের সামনে এসে বলে যাচ্ছিলো - দোস্তো,প্রেমে পড়ছিস? বলে দিবো সবাইকে?এক সাথে দুই বোনের প্রেমে পড়ছিস তুই !!! এই ফাহিমটা এতো খারাপ! ক্লাস সেভেনে পড়ে কেউ কখনো প্রেম করতে পারে? আমি যে কেন টিফিন টাইমে সেই দুই বোনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম সেটা আসলে কেউ কখনো বুঝবে না।
আমার ইদানীং দ্রুতই মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। কারণ আমি আজকাল বেশিই বুঝতে পারছি সবকিছু।আমি বেশি বুঝি আর এটাই হয়েছে যত সমস্যা। তবে রোজ মায়ের উপরে আমার মেজাজ খারাপ হয়। সারাটাক্ষণ খালি

নাহাজ, স্যারের হোমওয়ার্ক কমপ্লিট করেছ?
নাহাজ, কি ব্যাপার সন্ধ্যার সময়েই টিভিটা ছাড়লে কেন?
আজকে হুজুরের কাছে কয় পাতা কোরান পড়েছ?
সেধে সেধে দুধ,ডিম,মালটোভা কিনে খাওয়াই তো টের পাও না। যখন কপালে জুটবে না তখন বুঝবে।
বাসায় যতক্ষণ থাকি নাহাজ,নাহাজ শুনতে শুনতে অস্থির হয়ে যাই। নিজের নামটার উপরেই বিরক্তি লাগে আজকাল। মানুষের নিজের নাম নাকি সবচেয়ে প্রিয় মানুষের কিন্তু মায়ের মুখে আমার নাম শুনলে আমি আঁতকে উঠি রীতিমতো। আর সবচেয়ে বেশি মায়ের মুখে এটাই শুনতে হয়, আমার নাকি আজকাল পাখা গজিয়েছে। পাখা দুটো কাটতে হবে উড়াল দেয়ার আগে। আমি কী পাখি যে উড়াল দিবো? পাখা থাকলে আসলেই আমি উড়াল দিতাম অনেক দূরে...অনেক দূ...রে। আমার ভেতরে অনেক অশান্তি আজকাল কাজ করে। আমার কথা গুলো শুনতে পাকা পাকা লাগছে হয়তোবা কিন্তু আমিও অনেক গভীর কথা জানি, ভাবতে পারি, লিখতেও পারি। তফাতটা এই যে আমার বন্ধু অভিজিত বলে ফেলে, আমি বলি না। অভিজিত অনেক বই পড়ুয়া ছেলে তাই ওর ভাবের কথা শুনলে যে কেউই ভাববে ও বইয়ের কোনো লাইনই বলছে। তার উপর অভিজিত ক্লাসে ফার্স্ট হয়, আমি ফার্স্ট হতে না পারলেও দশের মাঝেই থাকি। আমি ভালো খেলতেও পারি না, ক্রিকেটও না, দৌড়াদৌড়িও না। এটা নিয়ে যদি বাসায় গিয়ে আবার মন খারাপ করি মা পাত্তাও দেয় না। কই একটু সান্ত্বনা দিবে, উল্টো বলে -
আয়নায় একবার নিজের চেহারা দেখো? খাওয়া দাওয়া করো না,হাতে পায়ে বল হবে কীভাবে! দিনরাত খালি দেখো কার্টুন,এ কারণেই তো হাত পা গুলো এতো চিকন চিকন!
এই কারণে আমার নিজের চেহারাটাও আয়নায় আমার দেখতে ভালো লাগে না। আমি খাই ঠিকই, যতটুকু আমার প্রয়োজন। কিন্তু মা ভাবে আমার আরও বেশি খাওয়া দরকার। আরও অনেকের মাকেই দেখেছি তারাও এমনটা ভাবেন তাদের সন্তানরা ঠিকভাবে খাওয়াদাওয়া করেন না। এই মা গুলো যে কবে বুঝবে। কী দরকার এতো জোর করে খাওয়ানো! আমি আমার মা'কে নিয়ে খুবই হতাশ!
আমার আজকাল পড়াশুনা করতে ভালো লাগে না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে বেশি ভালো লাগে। টান হয়ে শুয়ে সিলিং ফ্যানের ঘোরা দেখতে দেখতে আমি অনেক কিছুই ভাবি। মা ইদানীং এটা খেয়াল করেছে। সোজা বলে দিয়েছে চেয়ার টেবিলে বসে পড়বে। ফাঁকিবাজি করে ঘুমাবার যে পায়তারা করেছি সেটা আমার বুদ্ধিমতি মা নাকি বুঝে ফেলেছে। মায়েরা যে কেন এতো বেশি বোঝে! আর বোঝে তো বোঝে ভুলটাই বোঝে। বাসাতেই আমার থাকতে ইচ্ছে করে না। অভিজিত একবার বলেছিলো - যখন মেজাজ খারাপ লাগবে, কান্না আসবে তখন ডায়েরি লিখবি। রাগ জেদ সব লিখে ফেলবি। দেখবি মেজাজ একেবারে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। কিন্তু ডায়েরি লিখেও শান্তি নেই। আমার মা সেসব লেখা পড়েছে আমার অনুমতি ছাড়াই। ডায়েরিটা আমার পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে রেখেছিলাম। তালা চাবি দিয়ে ড্রয়ার আটকাবার বয়স নাকি আমার হয়নি, তাই সেটা খোলাই থাকে। বয়স আঠারো না হওয়া পর্যন্ত আমার সব কিছুই মায়ের। এ কেমন অবিচার! তাহলে তোমার সবকিছু পড়তে দাও না কেন আমাকে? এ কথায় মায়েরও সেই একই জবাব, বড় হও নি এখনো! আমি বড় হয়েছি বলেই অনেক কিছু বুঝতে পারি, অনেক কষ্ট আজকাল আমাকে স্পর্শ করে। আর বুঝতে পারি বলেই মায়ের মুখের উপর অনেক কথার জবাব আমি দিতে পারি না। সেই ছোট বেলা থেকে আমাকে একা হাতেই মা মানুষ করছে। যদিও মা উঠতে বসতে বলে - আমি জীবনেও মানুষ হবো না। আমি নাকি মায়ের কষ্ট বুঝি না। মায়ের কান্নাকাটি ভালো লাগে না, তাই সে কথার উত্তর আমি কখনোই দেই না। চুপ করে থাকি বলেই মা তার সন্দেহকে সত্যি বলেই ধরে নেয়, আরও কষ্ট পায়। মা যে কেন আমাকে বুঝতে চায় না! সব মাই-ই কী এমন!
আমার আজকাল স্কুল থেকে ফেরার পর মাঠেও খেলতে যেতে ইচ্ছে করে না। সিয়াম, আকাশ, নিপু, সঞ্জয়, আবদুল্লাহ ওরা অনেক ডাকাডাকি করে বাইরে মাঠে যাওয়ার জন্য। সবদিন যে ওদের ফিরিয়ে দেই সেরকম না। কিন্তু খেলতে গেলে প্রায়ই ওরা আমাকে ব্যাটিং এ পরে নামায়। চার কিংবা পাঁচ নাম্বারে, ফিল্ডিং খারাপ খেললেও আজেবাজে কথা বলে। এমন সব গালি ওরা মাঝে মাঝে দেয়, সেসব আমি শুনলেই মুখ দিয়ে বের করি না। রোজ তো একজন ভালো খেলতে পারে না। জাতীয় দলের ক্যাপ্টেনও তো মাঝে মাঝে খারাপ খেলে, আব্দুর রাজ্জাক তো মাঝে মাঝে অনেক রান দিয়ে ফেলেও উইকেট পায় না। আর সে তুলনায় তো আমি খুব বেশি বড় হইনি এখনো! সেদিন সন্ধায় বাসায় ফিরে মা'কে বলেছিলাম ক্রিকেট খেলা শেখার জন্য কোচিং এ ভর্তি হবো। নিপু আমার ব্যাটিং নিয়ে সেদিন খুব বাজে বাজে কথা বলেছিলো। দুইটা ক্যাচ মিস করাতে বলেছিলো -
ধুর মিয়া তুমি ফাউল। জিতা খেলা ক্যাচ মিস কইরা হারাইয়া দিছো !
কতোটা বজ্জাত এই নিপু। আমার ক্যাচ মিস করা নিয়ে চটাং চটাং কথা শোনালো কিন্তু সিয়াম যে সাত রানেই আউট হলো সেটা চোখে পড়লো না। আবদুল্লাহ তো রান আউটই হয়েছে। আমার বল দিয়েই ওরা খেলে আবার আমাকেই কথা শোনায়। বেইমান একেকটা। গতমাসে আমার ব্যাটটাও খেলতে গিয়ে তানভীর ভেঙে ফেলেছে। একেবারে দুই টুকরা হয়ে মাঠের দুই দিকে গিয়ে পড়েছে। মায়ের কাছ এজন্য বকাও খেয়েছি তাও ওদের কিছু বলিনি। আর আমাকেই কিনা বলে ফাউল! মাঝে মাঝে আবদুল্লাহর বাবা মাঠে খেলা দেখতে আসেন আমাদের। আংকেলও মাঝে মাঝে খেলেন। যেদিন আমি আংকেলের দলে পড়ি না,সেদিন আমার খেলতেও ভালো লাগে না। সেদিন যে আমি ইচ্ছে করেই আউট হয়ে যাই সেকথাও আমি কাউকে বলিনি। কিন্তু আবদুল্লাহটা অনেক হিংসুটে, আংকেল আমাকে একটু আদর করলে কোথা থেকে যেন দৌড়ে দৌড়ে আসে। ভাব খানা এমন যেন ওরই একলা একটা বাবা আছে।
ক্রিকেটের কোচিং এ ভর্তি হওয়া, মাসে মাসে ফি দেয়া সবকিছুর খরচ ছাড়াও খেলা প্র্যাকটিসের জন্য ক্রিকেটের একটা সেট কেনা জরুরী। কিন্তু শুনেছি সে সবের অনেক দাম। এসব কথা চিন্তা করেই কী মা এমন মন খারাপ করলো! ধুর আমি খেলাই শিখবো না। এমনিতে স্কুল থেকে এসে মা'কে বাসায় দেখি না। সকাল থেকেই কোচিং, কলেজে ক্লাস, আবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোচিং করিয়ে করিয়ে মা এতো ক্লান্ত থাকে, দেখতেও খুব খারাপ লাগে। আমার খেলার কোচিং এ ভর্তি হবার কথা শুনে যদি মা রাতেও কোচিং এ পড়াতে যায়! মায়ের একার আয়ে চলাটা নাকি কষ্ট হয়ে যায়, সেদিন কার সাথে ফোনে কথা বলার সময় যেন বলছিলো। মা আরও ছোট থাকতে আমাকে বলতো,
দেখো নাহাজ, চাইলেই সব কিছু পাওয়া যায় না। একটু বুঝতে শিখো। চাহিদা একটু কমাও!
তখন সেসব বুঝতাম না কিন্তু এখন দেখছি আসলেও তাই চাইলেই সব কিছু পাওয়া যায় না। এই যেমন আমার একটা স্যামসাং এর গ্যালাক্সি ট্যাব কিনতে ইচ্ছে করে, গেম খেলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু চাইলেই পাওয়া যাবে না জানি। ক্লাসে টিফিনের সময় নোফায়েলকে দেখছি লুকিয়ে লুকিয়ে খেলতে। একদিন টিফিনের সময় মাঠে খেলতে না গিয়ে আমি ক্লাসেই ছিলাম, তখন ওকে দেখেছি লুকিয়ে লুকিয়ে খেলতে। আমাকে ক্লাসে বসে থাকতে দেখে জানতে চেয়েছিলো -
তুমি আজ মাঠে খেলতে যাবে না?
ও ক্লাসে সবাইকে তুমি করেই বলে। সেদিন আমি ক্লাসে বসেছিলাম বলে ও কেমন উশখুশ করছিলো। পরে আমাকে ডাক দিয়ে দেখালো ওর ট্যাব। ও খেলেছে আর আমি দেখেছি। একবার ভদ্রতা করে বলেছিলো - তুমি খেলতে চাও? আমি মাথা নাড়িয়ে না করেছিলাম। টিফিন টাইম শেষ হবার আগেই ও সেটা ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখেছিলো। বলেছিলো - ক্লাসের কাউকে বলো না কিন্তু। আমি কাউকেই বলিনি। আর কাকে বলবো, আমার তো তেমন কোনো বন্ধুও নেই অভিজিত ছাড়া। আমি অভিজিতকেও যাতে না বলি সেটাও মনে করিয়ে দিয়েছিলো নোফায়েল। নোফায়েলের বাবার অনেক টাকা, ওর বাবা-মা দুজনেই ডাক্তার। ইশ আমাদেরও যদি অনেক টাকা থাকতো!
আমি অনেক ছোট থাকতেই একা একা স্কুলে যাই। একা মানে স্কুল ভ্যানে অন্য বাচ্চাদের সাথে। আমার একা যেতে আগেও ভালো লাগতো না। এখন ভ্যানে না গেলেও একজন বাঁধা রিকশাওয়ালা আছে, শফিক চাচা, তার রিকশায় যাই। স্কুলে গেলেই দেখা যায় বাচ্চারা তার মা না হয় বাবা, দাদা, নানা, নানুর সাথে স্কুলে আসে। এসব দেখলেই আমার মেজাজটা খারাপ হয়ে যায়। মায়ের তো সময়ই নাই আমাকে স্কুলে দিয়ে যাওয়ার কিংবা নিয়ে আসার। বাসার একটা চাবি আমার স্কুল ব্যাগেই থাকে। ঘরে ফেরার পর আমার যে কী দম বন্ধ লাগে! মা ঘর থেকে বের হবার সময় ঘরের দরজা-জানালা আটকে তারপর যায়। বাইরে থেকে ঢুকলেই কেমন একটা বোটকা গন্ধের মতো নাকে লাগে। তারপর জামাকাপড় বদলে খাওয়া নিয়ে বসি। আমি খাবারদাবার গরম করতে পারি না গ্যাসের চুলে জ্বেলে। ঠাণ্ডা খাবার খেতে ভালোও লাগে না। মা'কে যদি এ সময়টায় পেতাম! মাঝে মাঝে আমাদের ফ্যামিলি এ্যালবাম গুলো নিয়ে বসি। মা কিছু কিছু এ্যালবাম আলাদা করেছে, যা ড্রয়ারের বাইরে থাকে। ওখানে মায়ের সব প্রিয় মানুষের ছবি রাখা। বেশীরভাগই আমার ছবি, মায়ের বান্ধবী লুনা খালামনি, শাম্মী খালামনি, আমার মামা, নানু আর আমার কাজিনদের ছবি। এখানে একজন মানুষই নেই। তাই আমি অন্য এ্যালবামগুলো বেশি দেখি। কিন্তু মায়ের সামনে সেসব দেখা যায় না। আগের পুরনো ছবি গুলো দেখতে আমার ভালোও লাগে, আবার খারাপও লাগে।
ডিসেম্বরে ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলে স্কুল থেকে পিকনিকে যাবে। যারা যারা যেতে ইচ্ছুক তারা যেন নিজেদের নামের সাথে সাথে বাবা-মায়ের নাম, পিকনিকের চাঁদা সহ স্কুলের ফ্রন্ট ডেস্কে জমা দেয় - এই নোটিশের কথা মা'কে বলেছিলাম। মনে হয় যাওয়া হবে না পিকনিকে। কারণ মা বলেছিলো - দেখি চিন্তা করে। মা যে কথাটাই বলে দেখি, সেটার মানে হচ্ছে নেগেটিভ কিছু, যাওয়া হবে না, করাও হবে না। মা যে কোনও পাবলিক অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলে। বিয়ে, জন্মদিন, মিলাদ সব কিছুই। আমারও সেখানে যেতে ভালো লাগে না এখন। আমিও মায়ের মতো কেমন ঘরকুনো হয়ে যাচ্ছি দিন দিন। কোনো কিছুতেই আগ্রহ পাই না। আমার মনের কথাগুলো বলার মতো কাউকে পাই না আমি। ফাঁকা ঘরে মাঝে মাঝে খুব কান্না আসলেও কাঁদি না। মায়ের মুখে এতবার শুনেছি -
মেয়েদের মতো কথায় কথায় চোখের পানি ফেলবে না তো ! অসহ্য লাগে ছেলেদের ফিচ ফিচ করে কান্না করতে দেখলে। তাই এখন কম কাঁদি, অন্তত মায়ের সামনে কাঁদি না।
আমার মায়ের চোখেও আমি পানি দেখি না। কিন্তু পুরোপুরি না বুঝলেও বুঝি আমাদের জীবনের কোথায় যেন একটু ফাঁকা জায়গা আছে, যা পূরণ করা যাচ্ছে না কিছুতেই। আমি মাঝে মাঝে মায়ের ডায়েরি লুকিয়ে লুকিয়ে পড়ি। এখনো মা টের পায়নি কিন্তু তার এলোমেলো ভাবে লিখে রাখা কথা থেকে আমি আসল কারণ খুঁজে পাই না।
" জীবনটা বড্ড একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে।"
" ইদানীং খুব ক্লান্ত লাগে।"
" রাতে ঘুম হচ্ছে না আজকাল। একাকীত্বের অনুভব গুলো ভার হয়ে বুকের উপর বসে থাকে।"
" নাহাজ, আমাকে ছেড়ে কখনো যাবি না তো ? আমার খুব ভয় লাগে তোকে মাঝে মাঝে গম্ভীর হয়ে থাকতে দেখলে।"
এই ধরণের কথা লেখা থাকে মায়ের ডায়েরিতে। আমি বুঝে উঠতে পারি না এসবের মানে। আমি মা'কে ছেড়ে কোথায় যাবো? আড়ালে আড়ালে আমি অনেক কিছুই শুনেছি। আমাকে একলা পেলেই আত্মীয়-স্বজনরা খোঁচাতো বলে মা আমাকে আরও ছোট থাকতে কোথাও বেড়াতে নিয়ে গেলে চোখে চোখে রাখতো। সেসব কথার মানে আমি তখন বুঝতাম না। শুধু এটুকু বুঝি আমার জীবনটা আমার বয়সী অন্য সব ছেলের মতো স্বাভাবিক না। আমার ভেতরেও একটা কষ্ট কাজ করে কিন্তু ছেলেদের নাকি কাঁদতে হয় না তাই একটা বিরক্তি আমাকে ঘিরে থাকে। আমি আজকাল অনেক কিছু বুঝি কিন্তু মায়ের সামনে না বোঝার মতো করে থাকতে হয়। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে কেন আমি অন্যদের মতো বাবাকে কাছে পেলাম না? কেন বাবা আমাদের ছেড়ে অন্য কোথাও বাসা বাঁধলো? আমি জানি না এখনো কেন বাবাকে খুব মিস করি। বাবারা কি এতোটা কঠিন মানুষ হতে পারে কখনো?
এসব জিজ্ঞেস করার কোনো সুযোগ নেই আমার। কোনো একদিন আমিও বাবা হবো। আমি খুব ভালো বাবা হবো, সবাইকে দেখিয়ে দেবো। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। কিছুক্ষণ পর মা বাসায় আসবে। আমি এখন শরবত বানাতে শিখেছি, আজ মায়ের জন্য এক গ্লাস শরবত বানিয়ে রাখবো। মায়ের ক্লান্তিটা দূর করতে হলে আমাকে আরও বড় হতে হবে,অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে।মা'কে বোঝাবো আমিও তার কষ্ট একটু একটু বুঝতে পারি। কিন্তু মুখে বলতে কেমন লজ্জা লাগে। আমি খুঁজে খুঁজে চিনির কৌটো আর লেবু বের করি । ঠাণ্ডা পানি বের করে রাখি ফ্রিজ থেকে।কান পেতে থাকি কখন ডোর বেলের শব্দ পাবো!
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন