বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৮১
গল্প/কবিতা: ৮টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৬৬

বিচারক স্কোরঃ ২.১ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৫৬ / ৩.০

চলো দু'জনায়

দিগন্ত মার্চ ২০১৫

বিবর্ণ ভলোবাসা

ভালোবাসা / ফাল্গুন ফেব্রুয়ারী ২০১৫

লাল সবুজের দেশ

বাংলার রূপ এপ্রিল ২০১৪

দেশপ্রেম (ডিসেম্বর ২০১৩)

মোট ভোট ১৩ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৬৬ মুক্তির আলো

মনতোষ চন্দ্র দাশ
comment ৩০  favorite ২  import_contacts ৭৭৯
শিমলতায় নতুন ফুল ফুটেছে, পুঁইয়ের ডগাও বাড়ন্ত; ভোর বেলায় মসজিদের মাইকে ভেসে আসে মুয়াজ্জিনের আযানের ধ্বনি। সুউচ্চ মিনারের মাথাটা সাদা কুয়াশার চাদরে ঢেকে গেছে কিছুই দেখা যাচ্ছেনা। হলুদ সর্ষে ক্ষেতের আল বেয়ে,শিশির ভেজা ঘাস মাড়িয়ে ঘন কুয়াশার আঁধার ঠেলে বস্তা-পুটলী মাথায় নদীর ঘাটের দিকে চার-পাঁচ বছরের একটি মেয়েকে সাথে নিয়ে দু’জন পুরুষ ও মহিলা হেটে চলছে।
কনকনে ঠান্ডা শীতের কারনে ঘাটে তেমন লোকজনের আনাগোনা নেই। কিন্তূ যারা প্রকৃতির এই বৈরী আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে ঘাটে এসেছে তারা আর কেউ নয় রসুলপুর গ্রামের সদ্য প্রয়াত মৃত আব্দুল মিয়া’র ছেলে মজিদ ও তার পরিবার । স্ত্রী রাবেয়া ও মেয়ে আলেয়াকে সাথে নিয়ে গ্রামের মায়া মমতা ছেড়ে, বসত-ভিটা ফেলে কাউকে কিছু না জানিয়ে মজিদের স্বেচ্ছায় নির্বাসনে চলে যাওয়টা কেউ বুঝতে নাপারলেও নদীর জলে ভাসা শেওলার মতো দুঃখ কষ্টগুলো ব্যাথায় দুলতে থাকে।
মজিদকে গ্রাম ছাড়তে হলো- কেন? কিজন্য? কার কারণে নীরবে এই চলে যাওয়া? কি? এমন ঘটেছিলো যা মজিদের জীবনে অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। হঠাৎ সাইরেন বেজে উঠে, নোঙর ফেলে লঞ্চ ঘাটে ভিড়লো। মিনিট দশেকের মধ্যে নিজেকে মুক্ত করে ঢাকার সদর ঘাটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় লঞ্চ । পাড়ে দাড়িয়ে থাকা নারিকেল সুপারীর গাছ,পানের বরজ, চরের পাটক্ষেত পিছনে ফেলে জলের বুক চিরে এগিয়ে চলে লঞ্চ। বারান্দার রেলিংএ দাঁড়িয়ে মজিদ দৃশ্যগুলো দেখছে আর ভাবছে পিছনে ফেলে আসা অতীত দিন গুলোর কথা।
প্রবাহমান মেঘনার কোল ঘেঁষে ছায়া সুনীবিড় সবুজ শ্যামল আর দশটা গ্রামের মতো রসুলপুর গ্রাম। সারি সারি আম-কাঠাল,সুপারী,নারিকেল,পানের বরজ ঘেরা ঘন গাছ-গাছালির আড়ালে পুকুর পাড়ের পশ্চিমে ছোট্ট একটি বাড়ি। বাড়ির পাশেই রয়েছে গোয়াল ঘর,ধানের গোলা। সারাদিন পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ, কুকুরের ঘেউ-ঘেউ চিৎকার বাড়ি মাতিয়ে রাখে। এরপর রাত নেমে আসলেই সবকিছু একেবারে নিঝুম সুনসান। শোবার ঘরে শুয়ে আছে মজিদের অসুস্থ্য বাবা। পুরোনো ব্যাথাটা বেড়ে উঠায় যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে বৃদ্ধ আব্দুল মিয়া; মজিদের বউ রাবেয়া হারিকেনের চিমনিতে কাপড় গরম করে ছ্যাক দিচ্ছে শ্বশুরের শরীরে।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মুক্তি সেনাদের আশ্রয় দেয়ার অপরাধে সেদিন মজিদের বাবা আব্দুল মিয়াকে পাকসেনাদের ক্যাম্পে তুলে নিয়ে যা্ওয়া হয়। মানুষটাকে গাছের সাথে পিছমোড়া করে বেধে বেধড়ক পেটাতে থাকে। মুখ দিয়ে ফেনা তুললো, ব্লেডের আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত করে দেয় দেহ। নাকে মুখে সমানে ঢেলেছে গরম পানি। পাঞ্জাবী মেলেটারি অফিসার বুট দিয়ে পায়ের পাতা থেতলে দিয়ে বলছিলো-…‘হারামজাদে কুত্তে ক্যা ক্যামিনে,কাহা হ্যায় তেরি আওলাদ, মুক্তিকা নওজোয়ান ব্যাটা?কীসলিয়ে তেরি ঘরকা মুক্তিকা ফৌজ অ্যাইয়ে?ম্যাত বোল শ্যালে'। এত মার খেয়েও মুখ খোলেনি আব্দুল মিয়া- টর্চার সেলে নৃশংস সীমাহীন অত্যাচারের যন্ত্রনা সয়েছে তবুও স্বীকার করেনি ছেলে যুদ্ধে যাবার কথা। সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে ভাগ্যের জোরে সেদিন বেঁচে গিয়েছিলো মজিদের বাবা। সারা জীবনের জন্য বরণ করে নিতে হয়েছিলো পঙ্গুত্ব। যদিও একে বেঁচে থাকা বলেনা। হয়তো উপরওয়ালা স্বাধীনতার বিজয় উৎসব দেখার জন্য এই দিনটির অপেক্ষায় বাঁচিয়ে রেখেছিলেন মজিদের বাবাকে।
দেশ স্বাধীন!চারিদিকে আনন্দ মিছিল। যুদ্ধ শেষে গ্রামে ফিরে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে মজিদের সেকি কান্না!মানুষ বৃহৎ কিছু পাওয়ার আনন্দে তার সমস্ত দুঃখকষ্ট ভুলে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে; সব হারানোর মধ্যেও নতুন করে জীবনের উৎস খুঁজে নেয়। তেমনি মজিদও হারিয়েছে অনেককে- মমতাময়ী ‘মা,বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় স্বজনসহ পাড়া প্রতিবেশীদের'। যুদ্ধে রাজাকারদের সহযোগীতায় হায়নাদের হিংস্র থাবায় তছনছ হয়েছে সাজানো গ্রামটা। বসত ভিটায় দিয়েছিলো আগুন, বাদ যায়নি পাশের হিন্দু পাড়াও রাজাকাররা লুটপাট চালিয়ে দখল করে নিয়েছে বাড়িঘর জায়গা-জমি। কতশত মা-বোনের ইজ্জত হয়েছে লুন্ঠন, যুবতী মেয়েদের ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করেছে সারারাত। লাইনে দাঁড় করিয়ে নির্বিচারে পাখির মতো গুলি করে মেরেছে অসহায় গ্রামবাসীদের। ওদের অত্যাচারের হাত থেকে নারী-পুরুষ,আবাল-বৃদ্ধা-বণিতা রেহায় পায়নি কেহ। শ্মশান কিংবা গোরস্থানে সৎকার করতে দেয়নি লাশ। মাটিতে পরে থাকা নিথর নিস্প্রাণ মৃতদেহগুলো শিয়াল-কুকুর-শুকুনে খুবলে খুবলে খেয়েছে। ত্রিশলক্ষ শহীদের রক্তে, অনেক ত্যাগের বিনিময়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তূ রেখে গেছে শুধু নিষ্ঠুর বর্বরতার চিহ্ন। যার ক্ষত আজো বয়ে বেড়ায় মজিদের বৃদ্ধ বাবা।
দারিদ্রতার কারণে স্কুলের গন্ডি পেরুতে না পারলেও মজিদের বুকে ছিল অদম্য সাহস ও দেশপ্রেম। তার সেই শক্তিই প্রেরণা যুগিয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার। মুক্তিযোদ্ধা দলের সাথে যোগ দিয়ে বজ্রমুষ্টি হাতে উড়িছে নিশান, হাতে তুলে নিয়েছিলো মেশিন গান। র্দীঘ নয় মাস যুদ্ধে অনেক পাকিস্তানী হানাদার সেনাকে মেরেছে সে। ছিনিয়ে এনেছে বিজয়, মুক্ত স্বাধীন আকাশে উড়িয়েছে লাল সবুজের পতাকা। রসুলপুর গ্রামে যেকজন মুক্তিযোদ্ধা সামনা সামনি অপারেশনে অংশ নিয়েছিলো তাদের মধ্যে মজিদ অন্যতম। অথচ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধা লিস্টে ওর কোন নাম নেই। সরকার বাহাদুরের হিসাবের ঘরে নাম নিবন্ধন নাথাকায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়েও সে কোন সরকারী ভাতা বা সুবিধা আজ পর্যন্ত পায়নি। অবশ্য এ নিয়ে মজিদের মধ্যে কোন ক্ষোভ বা আক্ষেপ নেই। সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধারা সেদিন কিছু পাওয়ার আশায় যুদ্ধে যায়নি। দেশকে ভালবেসে নিজের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছে। দেশ স্বাধীন হয়েছে এটাই ওদের কাছে বড় পাওয়া।
কিন্তূ নিজ স্বার্থকে খাট করে দেখে লাভ কী হলো মজিদ কিংবা তার গ্রামের। যাদের রক্তে দেশ হয়েছে স্বাধীন, পেয়েছে বিজয়ের আলো সেই আষট্টি হাজার গ্রামের মধ্যে তার গ্রামও একটি গ্রাম। যেখানে পৌঁছেনি বিদ্যুতের আলো,গড়ে উঠেনি স্কুল,মাদ্রাসা, হাসপাতাল;বর্ষার পানিতে হাটু কাদায় পথ চলতে হয়। হতাশা আর বুক ভরা বেদনা নিয়ে শত দুঃখ কষ্ট সয়ে গ্রামের মায়ায় জড়িয়ে একটু সুখের আশায় রাবেয়াকে বিয়ে করে সংসার পাতে মজিদ। বছর ঘুরতেই ঘর আলো কর ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম দেয় রাবেয়া। মজিদ আকিকা করে মেয়ের নাম রাখে আলেয়া। স্ত্রী-মেয়েকে নিয়ে অসুস্থ্য বাবার সেবাযত্নে ও ফসলের মাঠে কাজ করে সময় কেটে যায় মজিদের। বেশ সুখেই ছিলো কয়েক বছর। গরীবের কপালে নাকি বেশীদিন সুখ সয়না সেটা মজিদের ক্ষেত্রেও বাস্তবে ঘটে গেল। গ্রামের নিঃর্স্বাথ পরোপকারী একমাত্র বাল্য বন্ধু খগেন ডাক্তারই ছিল তার একমাত্র ভরসা; সময় অসয়ে অসুস্থ্য বাবার পথ্য ও বিনা পয়সায় চিকিৎসা সেবা পেতো মজিদ। যুদ্ধের সময় খগেণ ডাক্তারকে নিয়ে একসাথে একই সেক্টরে যুদ্ধ করেছিলো। খগেন ডাক্তার যুদ্ধের সময় যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সমানে চিকিৎসা করে গেছে।টাকা পয়সা দেওয়া হোক বা নাহোক বাল্যবন্ধু ও সহযোদ্ধা হিসাবে হয়তোবা এই সহানুভুতিটুকু তার কাছে পেতো। হঠাৎকরে ডাক্তারের অকাল মৃত্যুতে অসহায় হয়ে পড়ে মজিদ।
এদিকে সারাদিনে সংসারে হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর অসুস্থ্য শ্বশুরের সেবায় নিজেও ক্লান্ত হয়ে পড়ে রাবেয়া। উনুনে চড়ানো ভাতের পোড়া গন্ধে হুশ হয়, দৌড়ে গিয়ে চুলার পাতিল নামায়। মজিদের হাট থেকে ফেরার নাম নেই,রাতের তরকারি রান্না বাকি; ক্ষুদা পেটে কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়েছে অনেক আগেই। অভাবের সংসারে টানাপোড়নে নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। তেলের অভাবে নিভে আসে হ্যারিকেনের আলো। এমন সময় অন্ধকার ভেদ করে মজিদের গলার আওয়াজ ভেসে আসে-‘ও...আলেয়ার মা কই গেলা তাড়াতাড়ি অ্যাইস এদিকে,ধরো বাজার থাইক্যা মাছ-তরকারি লইয়া আইছি, আন্ধারে কিছুই দ্যাহা যাইতাছেনা কই দ্যাহি হেরিক্যানডা এদিক দ্যাও তেল ভইরাদি’। হারিকেনটা জ্বালিয়ে মজিদ রাবেয়ার হাতে দেয়। ঘুমিয়ে থাকা মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে তন্দ্রায় চোখের পাতা লেগে আসে মজিদের।
হঠাৎ রাবেয়ার ডাক-‘আলেয়ার বাপ মেয়েরে নিয়া খাইতে আইস্যে-রান্ধন হইয়া গেছে হাত মুখ ধুইয়া মাইয়াডারে নিয়া মাদুর পাইতা বস,ততক্ষণে আমি আব্বাজানের খাওয়ন দিয়া অ্যাই’। মেয়ে আলেয়াকে সাথে নিয়ে ভাত খেতে বসে মজিদ ও রাবেয়া। খেতে খেতে দু’জনে বাবার চিকিৎসার কথা তুলে। রাবেয়া বলে-‘বাজানের অসুখতো দিনদিন খালি বাড়তাছে,অহনি শহরে লইয়া গিয়া ভালা ডাক্তার দেহান দরকার’। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মজিদ, রাবেয়ার কথার কোন উত্তর দেয়না। খগেন ডাক্তার যতদিন বেঁচেছিলো এই বিষয় নিয়ে ভাবতে হয়নি তাকে। টাকার অভাবে সংসারই ঠিক মতো চলেনা,দিনদিন মেয়েটাও বড় হয়ে উঠছে; স্কুলে ভর্তি করানোর সময় হয়ে গেছে কি করবে ভেবে উঠতে পারেনা মজিদ। অসুস্থ বাবার চিকিৎসা খরচ ও সংসারের ঘানি টানতে টানতে নিজেও যে শরীরে বার্ধক্যের টান অনুভব করে সেকথা বুঝতে রাবেয়ার অসুবিধা হয়না। লেখা পড়া শিখিয়ে মেয়েটাকে মানুষের মতো মানুষ করে বিয়েশাদী দিবে সে আশাও ক্ষীণ হয়ে আসে রাতের আঁধারে, দুঃচিন্তায় ফ্যাকাশে হয়ে আসে মজিদের চেহারা। এসব কথা ভাবতে ভাবতে রোজকার মতো ঘুমিয়ে পড়ে সবাই।
হঠাৎ রাতের নীরবতা ভাঙ্গে, দেখে মজিদের বাবা মাটিতে শুয়ে ব্যাথায় গোঁ-গোঁ শব্দ করছে; চোখে পানি, মুখ দিয়ে ফেনা পড়ছে। রাবেয়া স্বামীকে তাড়াতাড়ি ডাক্তার ডেকে আনার তাড়া দেয়। কিন্তূ অসহায় মজিদ। গ্রামে কাছে কিনারে কোথাও ডাক্তার কিংবা হাসপাতাল নেই। শুধুমাত্র নদীর ওপারে দূরে একমাত্র অবলম্বন রমজান ডাক্তারের ফার্ম্মেসী। পানি ভিজিয়ে এতরাতে রমজান ডাক্তার এখানে আসবেনা। অগত্য নিরুপায় হয়ে অসুস্থ্য বাবাকে নিয়ে ছুটে যায় ডাক্তারের কাছে। যদিও এর আগে কখনো সে এখানে আসেনি। কারণ রমজান ছিলো স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকারদের দলে। মুমুর্ষ বাবার চিকিৎসার কথা ভেবে মজিদ রমজান ডাক্তারকে ঘুম থেকে ডেকে উঠায়। এতো রাতে ঘুম ভাঙিয়ে যেন ভীষণ অন্যায় করে ফেলেছে,চোখেমুখে বিরক্তভাব নিয়ে এমন দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকায় রমজান। মজিদ বললো-‘ডাক্তার! বাবা জানি ক্যামন করতাছে মনে হয় আর বাঁচবোনা,তাড়াতাড়ি বাবারে দ্যাহ, চিকিৎসার ব্যবস্থা কর। যত ট্যাকা লাগে দিমু বাজানরে সারাইয়া তুলো’। রমজান বললো-‘এতো রাইতে ঘুম ভাঙ্গাইয়া জ্বালাইতে অ্যাইসস ক্যান,তোর ব্যাপে মরলে আমার কী?ক্যান এতোদিন তোর বন্ধু মালু খগেন ডাক্তারের চিকিৎসায় বাপরে ভালো করতে পারস নাই?খগেন নাই তাই ঠেকায় পইরা এহন আমার কাছে অ্যাইসস!যা...এতো রাইতে তোর বাবারে দ্যহনের মতন সময় আমার নাই। তাছাড়া তুই হইলি গিয়া দেশ প্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা, রাজাকারের শত্রু, তোরা ডান্ডিগো সাথে হাত মিলাইয়া দেশটারে ভাগ কইরা জাহান্নাম বানাইছোছ। যা তোগো কাছে কোন ঔষধ বেচুমনা আর তোর বাপেরও কোন চিকিৎসাও হইবোনা।
রমজানের কথাগুলো মজিদের কানে গরম সিসা ঢালার মত বুকের ভেতর তোলপাড় করে উঠল। চোখে মুখে যেন দাউদাউ করে আগুন জ্বলেছে, ইচ্ছে হচ্ছিল এমুহুর্তে রাজাকারটার গলা চেপে ধরে। কষ্টে চোখের পানি এসে যায়। মনে হচ্ছিল লজ্জায়,ঘৃণায় মাটিতে মিশে যায়।সেদিন বুকের ভিতরে চাপা ক্ষোভ,দুঃখে দম আটকে যন্ত্রনা অপমান সহ্য করে কোন প্রতিবাদ না করে নিজেকে সামলিয়ে মুমুর্ষ বাবাকে নিয়ে বাড়িতে ফেরত আসে। চোখের সামনে বিনা চিকিৎসায় ঔষদের অভাবে ধুকে ধুকে নিজের জন্মদাতা বাবাকে মরতে দেখে মজিদ। কষ্টে বুক ফেটে যায় কিন্তূ চোখে কোন জল নেই। রাবেয়া ও মেয়ে আলেয়া উঠানের কোনায় বসে বিলাপ করে কাঁদছে। মজিদ নিজের হাতে মাটি খুঁড়ে বাবাকে কবর দিয়ে আসে। মন যেন শোকে পাথর, হঠাৎ মাথায় জিদ চেপে বসে রাবেয়াকে ডেকে বলে-‘অহনি তৈয়ার হইয়া লও,আমরা আইজক্যাই গ্রাম ছাইড়া চইলা যামু!স্বামীর মুখে এমন কথা শুনে রাবেয়ার মাথায় যেন বাজ ভেঙ্গে পড়লো; কিংকর্তব্যে বিমূঢ় রাবেয়া বলে উঠে-‘কই যামু স্বামী-শ্বশুরের ঘরভিটা ছাইড়া, শ্বশুর মরছে এহনো দিন পার হয় নাই আর অহন তুমি এইরহম কথা কইতে পারলা আলেয়ার বাপ; তুমি মনে হয় পাগল হইয়া গেছো’। মজিদের মুখের দিকে তাকিয়ে রাবেয়া বুঝে যায় স্বামীর আদেশ পালনের তাগিদ। কাপড়-চোপড় গুচিয়ে মেয়েকে নিয়ে তৈরী হয় রাবেয়া।
ইতিমধ্যে লঞ্চ বুড়িগঙ্গা নদীর সদর ঘাটে এসে থামে। মজিদ ঢাকায় সম্পূর্ণ নতুন,এখানকার রাস্তাঘাট কিছুই চেনাজানা নাই তার। নতুন এই শহরে এক অপরিচিত লোকের দয়ায় ওদের ঠাঁই মিলে বস্তিতে। ভাড়ায় রিক্সা চালানোর কাজ নেয় মজিদ, রাবেয়াও বসে নেই, সেও গামের্ন্টসে কাজ করে। দিনরাত পরিশ্রম করে রাতে শোবার ঘরে দু’জনের একসাথে দেখা হয়। ততক্ষনে আলেয়া ঘুমিয়ে পড়ে বিছানায়। আলেয়াকে স্কুলে ভর্তি করানো হয়। বস্তির এক বয়স্কা নানি ওর দেখাশুনা,স্কুলে আনা নেওয়া,খাওয়া-দাওয়া,খেলাধুলা সহ সব কাজে সঙ্গী হয়ে যায়। একসময় বস্তির পরিবেশের সাথে মানিয়ে যায় ওরা। এভাবেই কেটে যায় বেশ কয়েক বছর। মজিদ ও রাবেয়া কিছু টাকা জমিয়ে একটা রিক্সা কেনে। নিজের রিক্সা চালায় মজিদ। রাবেয়াকেও আর চাকরীতে যেতে হয়না সেলাই মেশিন কিনে ঘরে বসেই অর্ডারী কাপড় সেলায়। এভাবেই ওরা নিজেদের সুখ দু:খ ভাগ করে নিয়ে পছন্দ,অপছন্দ,চাওয়া নাপাওয়াকে বিসর্জন দিয়ে তিলতিল করে টাকা পয়সা সঞ্চয় করে; মেয়ের লেখা পড়ার খরচ যোগায়।
মজিদ রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে মনের মধ্যে স্বপ্নের বীজ বুনে। টাকা পয়সা জমিয়ে গ্রামে জমি কিনবে,ছোট একটা হাসপাতাল বানাবে সে। মনে মনে শপখ নেয় বাবার মতো চোখের সামনে বিনা চিকিৎসায় ঔষদের অভাবে আর কারো যেন মৃত্যু নাহয়। মেয়েকে প্যারা মেডিকেলে ডিপ্লোমা ডাক্তারী পড়ানোর স্বপ্ন রয়েছে তার। সেও পাশ করে যেন মজিদের স্বপ্নের হাসপাতালে যোগ দিয়ে সহযোগীতা করতে পারে। মজিদের মাথার ভিতরে আজো ঘুরপাক খায় রমজানের কথাগুলো। দেশের যুদ্ধ শেষ হলেও মজিদের সংগ্রাম শেষ হয়নি এখনো । এই যুদ্ধ স্বপ্ন জয়ের যুদ্ধ,ক্ষুধা-দারিদ্র মুক্ত মৌলিক অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার যুদ্ধ। আর অন্য দশজন অসহায় মুক্তিযোদ্ধাদের মতো পরে পরে মার খাওয়ার দলে নয়। একদিন সে ঘুরে দাঁড়াবেই দেশ,মা,মাটি, মানুষের জন্য মুক্তির আলো ছড়াবে তার এই স্বপ্ন। এতটুকু সময় নষ্ট হতে দেয়না সে,ফজরের নামায পড়ে রিক্সা নিয়ে বেরিয়ে যায় স্বপ্ন পূরনের রাজপথে। তাই এই বৃদ্ধ বয়সে এসেও দিনরাত রিক্সার প্যাডেলে পা চালাতে হচ্ছে তাকে।
সময়ের স্রোতে দেখতে দেখতে ঢাকায় বিশ বছর কেটে যায়। এসএসসি ও ইন্টারে ভাল রেজাল্ট করে প্যারা মেডিকেলে ভর্তি হয় আলেয়া। যথারীতি ডিপ্লোমা পাশ করে সে। এর মধ্যে বিয়ে ঠিক হয় আলেয়ার। অনাম্বড় অনুষ্টানের মাধ্যমে কাজী ডেকে মেয়েকে বিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তূ সেই স্বামী সংসারের সুখ বেশীদিন সইলনা আলেয়ার কপালে। যৌতুকের টাকা না দেওয়া সংসার ভেঙ্গে যায় তার। তারপরও অদম্য মজিদ, পরাজয় মানেনা নীতি আর স্বপ্নের কাছে। তার জমানো টাকায় হাত দেয়না,সেই টাকা নিজের বা পরিবারের কোন কাজে লাগায়নি। রাবেয়াকেও বুঝতে দেয়না এতদিনে ব্যাংকে বেশকিছু টাকা জমিয়ে ফেলেছে সে। মেয়ে ও স্ত্রীকে সাথে নিয়ে অনেকদিন পর গ্রামে ফিরে আসে মজিদ। হাসপাতাল বানানোর জন্য জমি কিনে কাজ শুরু করে দেয়। আলেয়াও বাবার স্বপ্ন পূরনে তার লেখাপড়া ও শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে সহযোগীতা করে। সন্ধ্যায় গ্রামের ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাড়ির আঙিনায় পড়াতে বসে আলেয়া আর রাবেয়া দু:স্থ মেয়েদের সেলাই শেখায়। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার কল্যাণে তাদের এই মহতী উদ্যোগের কথা ছড়িয়ে পড়ে সংবাদ পত্র সহ বিভিন্ন টিভি মিডিয়ায়। তাদের এই কাজে এগিয়ে আসে দেশের মানুষ, সাহায্যের হাত বাড়ায় বৃত্তবানেরা; বিভিন্ন হাসপাতালের বিষেজ্ঞ ডাক্তারেরা স্বেচ্ছাশ্রমে বিনা পয়সায় চিকিৎসা সেবা দিতে রাজি হয়। ঔষদ কোম্পানীগুলো হাসপাতালে বিনামুল্যে ঔষদ সরবরাহের অভিপ্রায় ব্যক্ত করে। এত বাধা প্রতিবন্ধকতার সাথে লড়াই করে দেশের মানুষকে সাথে নিয়ে মজিদের হাসপাতাল বানানোর এই উদ্যোগকে সবাই প্রশংসা করে। রসূলপুর গ্রামবাসী দুহাত তুলে মজিদের জন্য দোয়া করে। যথারীতি ১৬ই ডিসম্বরে অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে সমাজের গন্যমান্য ব্যাক্তিদের নিয়ে হাসপাতালটি উদ্ভোধন করা হয়। হাসপাতালের নাম রাখা হয় মুক্তির আলো। যে আলো ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম থেকে গ্রামে। মজিদ, রাবেয়া ও মেয়ে আলেয়া তিনজনই হাসপাতালের কাজে জড়িয়ে যায় দেশের মানুয়ের আতর্মানবতায় সেবায়। পরাজিত শক্তির বিরুদ্ধে দেশপ্রেমের মধ্যে দিয়ে মধুর প্রতিশোধ নেয় মজিদ।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন