বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৩টি

গল্প - প্রেম (ফেব্রুয়ারী ২০১৭)

জঠরে

আশা জাগানিয়া
comment ০  favorite ০  import_contacts ৪৬
লেখালেখির সুবাদে ’ওর’ সাথে পরিচয় হয়েছিল ফেসবুকের শেরপুরের পেজে। বর্তমান সময়ে ফেসবুক, ব্লগ, অনলাইন পত্রিকার কারণে লেখালেখি করার সুযোগ বেড়ে গেছে অনেক বেশি। যার কারণে আবাছা ধানে যেমন ’চিটা’ থাকে তেমনি ভালো লেখার সাথে অনেক মানহীন, মন্দ লেখাও বেশ জাঁকিয়ে বসেছে পাঠকের সামনে। এই পাঠক লেখকরা দেশের সীমানা পেরিয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রবাসী লেখকরাও হাত খুলে লিখতে পারছে। চলছে সাহিত্য রচনা। দেশপ্রেমটা বোধকরি দেশের বাইরে গেলে বেশি অনুভূত হয়। চোখের আড়াল হলে মনের আড়াল হয় কথাটাকে একেবারে মিথ্যে করে দিয়ে প্রবাসে গেলে দেশপ্রেম যেনো আরো বেড়ে যায়। মনের ভেতর আকুলি বিকুলি করে দেশ-মা-মাটি। দেশের মাটির গন্ধটা বুক ভরে নেবার জন্যে কেমন হাসফাস করে বুকের ভেতরটা। যাঁরা লিখে নিজেদের প্রকাশ করতে পারেন তাঁরা হয়তো কিছুটা ভাগ্যবান। কেননা লিখতে না পারা গোষ্ঠীরা নিজের ভেতরে আকুল করা প্রাণের কথা কেবল আড্ডায় প্রকাশ করতে পারেন। অথবা লং ডিস্টেন্ট ফোনকল বা ফেসবুক, ভাইবার, স্কাইপের মাধ্যমে চলে ভাব-ভালোবাসার কথা বিনিময়। লেখালেখির জন্যে বিশেষ করে যারা এখনও তেমন বিখ্যাত হয়ে উঠেননি তাঁদের ফেসবুক পেজ বা এই ধরণের অনলাইন সাইটগুলো বেশ সুবিধে করে দিয়েছে। এখানে একই সময়ে দেশে বসে বা দেশের বাইরে বসেও একই বিষয়ের উপর বা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা সম্ভব। আমার ব্যাপারটাও তেমনই ছিল। প্রথম জীবনে তিক্ত একটা অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশ ছাড়লেও দেশের জন্যে, মা’র জন্যে সবসময়ই মন কেমন কেমন করতো। আর 'কেউ' যেনো বুকের ভেতর বড় নীরবে, আমি যেনো শুনতে না পাই তেমন করে দীর্ঘশ্বাস চাপতো। বুকের ভেতর সেই লুকিয়ে দীর্ঘশ্বাস চেপে যাওয়া না দেখা অদৃশ্য কারো জন্যেও মন কোন অবসরে হাহাকার করে উঠতো।

’ওর’ সাথে সম্পর্কটা ঠিক কীভাবে ব্যাখ্যা করবো বুঝতে পারি না কখনো। দীর্ঘসময় দেশের বাইরে থাকালেও ওর সাথে কখনো মুখোমুখি দেখা হবে ভাবিনি। বাস্তব জীবনে আমি বড্ড কাঠখােট্টা ধরণের মানুষ। আবেগের চেয়ে যুক্তি দিয়ে চলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। প্রত্যাশাগুলোকে শূন্যের কোঠায় রেখে সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করি। প্রাপ্তি যা কিছু তাকে বোনাস মনে করি। স্বামী তার পেশাগত জীবন নিয়ে মহাব্যস্ত। ছেলেও এখন আমাকে ছাড়াই স্কুলে যেতে পারে। অনেকগুলো বছর পরে এবার মনে হলো দেশ যেনো সত্যিই আমাকে ’আয়' 'আয়’ বলে ডাকছে। মায়ের কণ্ঠও যেনো কেমন দূর্বল হয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে। স্বামী, সন্তান, সংসার জীবন থেকে কিছুদিনের ছুটি নিয়ে একাই চড়ে বসলাম হাওয়াই জাহাজে।
যখন দেশ থেকে প্রবাসে এসেছিলাম তখনও আমি একাই ছিলাম। বড় বিধ্বস্ত, বিবর্ণ, ভয়ার্ত সেই আমি এখন অনেক আত্মবিশ্বাসী। বড়মামার কাছে আমার ঋণের শেষ নেই। মামা দেশ থেকে আমাকে আনার ব্যবস্থা না করলে হয়তো এতোদিনে আমি আস্তাকুড়ে পঁচে মরতাম। এতোবছর পর দেশে ফিরেছি। মায়ের কাছ থেকে যেনো সরতেই মন টানে না। এদিক সেদিক করেই বেশ ক’টা দিন চলে গেল। দেশে ফেরার পরও দেখা করার প্রয়োজন মনে করিনি দু'জনের কেউই। ওপাশ থেকে আসলে কী হচ্ছিল জানি না। দেখা করার কোন তাগিদ আমার কাছে অন্তত প্রকাশ করা হয়নি। কিছুদিন আগে ওর একটা জরুরী দরকারে দেখা করলাম। মানুষের মনের খোঁজ কি মানুষ নিজেই পায় সবসময়? অবচেতন মন ঠিকই কোন প্রয়োজন সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। যেনো সেই প্রয়োজনেই দেখাটা হয়। প্রথম দিনই আসতে দেরী করলো। হ্যাঁ, সময়টা ঘড়ির কাটায় গুনে গুনে ছয় মিনিট। কিন্তু অপেক্ষার এই ছয় মিনিট যে কখনো কাটিয়েছে সেই কেবল বুঝতে পারবে কেমন করে কাটে সেই সময়। আমি আবেগী মানুষ নই। দেখে গলে যাওয়ার বদলে খুব রাগ হয়েছিল সেদিন। কিন্তু সময় বড্ড অদ্ভুত, হয়তো রোমান্টিকও বটে! নইলে আমার এই বর্ণহীন, কাঠখােট্টা জীবনে এতো রোমান্টিকতায় মাখামাখি সময় আসবে কেন? বয়সে বেশ অনেকটা ছোট ছিল। কিন্তু ওর ব্যক্তিত্ত্ব ছিল আকাশ ছোঁয়া। অথবা তার চেয়েও বেশি। কি জানি কিসের সাথে তুলনা করবো ওর ব্যক্তিত্বের ভারকে। কাঠখোট্টা, যুক্তিবাদী এই আমি যেনো এতোগুলো বছর পর এক নতুন আমিকে আবিস্কার করলাম। ওর ব্যক্তিত্ব, কথা বলার ভারিক্কির কাছে আমি নিজেই যেন এক কিশোরী।
হয়তো আমার বয়ঃসন্ধির শুরুতে বিয়ে হলে ওর বয়সী এক ছেলেও থাকতো । সেকথা দুষ্টুমি করে কখনো বলতে দ্বিধা করতাম না । কখনো ওর পরিবার নিয়ে খুব বিশেষ কথা হয়নি। জানি ছোট এক ভাই আর এক বোন আছে। ওরাও পিঠাপিঠি দু’জনে কলেজে পড়ে। বাবা অবসর প্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা। দু'জন লেখালেখি নিয়ে, দু'জনকে নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত সময় কাটাতাম যে পরিবারের কথা সবিস্তারে জিজ্ঞেস করার ফুরসত পাইনি ।
এই সম্পর্কটাকে আমরা দু'জনের কেউই প্রেম বলে স্বীকার করতাম না। কিন্তু তা আদতে প্রেমই ছিল কিনা সেকথা কে বলতে পারে। নইলে সরাসরি কেউ কারো দিকে খুব ভালো করে না তাকালেও রাজ্যের স্নেহ, ভালোবাসা, রোমান্টিকতা উপচে পড়তো ।
স্বীকার করতে বাঁধা নেই ওর চেয়ে ভালো জীবনে আর কেউ আমায় বাসে নি। ওর চেয়ে স্নেহ, মায়ায় জীবনে আমায় কেউ জড়ায় নি।
এতো ভালোবাসা আমি কেবল আমার ছোট ছেলের ভালোবাসার সাথেই তুলনা করতে পারি। অথবা আমার বাবার সাথে। বয়সে অনেক ছোট হয়েও যেনো বুক ভরা রাজ্যের স্নেহ, মমতায় ভরে রাখতো ও আমায়।

নিজেকে চিনতে পারছিলাম না। পাগলের মতো ভালোবাসে ফেলেছিলাম। হ্যাঁ, পাগলের মতোই। পাগলরা যেমন নির্লজ্জের মতো নিজের পছন্দের মানুষকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায় তেমন করেই ওকে আঁকড়ে ধরে রাখতে মন চাইতো আমার।
প্রথমে ভেবেছিলাম শুধু ওর গল্পকবিতা লেখার গুনটাকে ভালোবাসি। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে বুঝেছি ওর যেকোন বিষয় নিয়ে অবলীলায় লিখে যাওয়া ঝরঝরে গল্প কবিতাতো বটেই ওকেও ভালোবেসে ফেলেছি। ভালোবেসে ফেলেছি ওর কাছের, পাশের মানুষগুলোকেও। যাদের কাছে ও ভালো থাকতে পারে।
মেয়েদের জীবনের প্রথম হিরো নাকি হয় 'বাবা'। আমার জীবনে তেমন কোন সুখ স্মৃতি ছিল না। দেশে ফেরার আগে এক সান্ধ্যভোজের আড্ডায় কথা হচ্ছিল টিপু ভাইয়ের সাথে। দারুণ প্রাণবন্ত, হাসিখুশি সরকারী উচ্চ পদস্ত কর্মকর্তা এই ভদ্রলোক পেশাগত কাজে কিছুদিনের জন্যে এখানে এসেছেন। সেই সান্ধ্যভোজে টিপু ভাই সেদিন বলেছিলেন তাঁর মেয়ের জীবনে সেইই হিরো। সেদিন কথাটা শুনে খুব ভালো লাগলেও মনের ভেতর কেমন যেনো একটা ভোঁতা ব্যথা অনুভব করতে পারছিলাম। আমার জীবনে তো তেমন কেউ নেই!
সেই আমিই অবাক হয়ে খেয়াল করলাম ’ও’ আমার জীবনের হিরো হয়ে বসে আছে। কেন? প্রশ্ন আসতেই পারে। আমার বেড়ে উঠা স্মৃতিতে আমার বড় ভাইয়েরা হিরো হতে পারে নি। হয়েছিল শুধুই অভিভাবক, শাসনকর্তা। আমার স্বামী হয়তো আমার হিরো হতে পারতো। কিন্তু জানি না আমার কাঠখােট্টা আচরণের কারণেই নাকি সে পুরুষ বলেই শাব্দিক অর্থেই সে স্বামী হতে চেয়েছিল সবসময়। 'স্বামী' শব্দের অর্থ যে প্রভু সেই প্রভুই ছিল আমার স্বামী।
বাবার সেই ভালোবাসার জায়গাটা বরাবর শূন্যই থেকে গেছে।
কেমন অদ্ভুতভাবে ও আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট হয়েও একই সাথে প্রেম-ভালোবাসা, স্নেহ, মায়া-মমতা দিয়ে আমাকে এতোটাই জড়িয়ে ফেলেছে যে, ওকে ছাড়া আর কাউকেই 'হিরো' ভাবতে পারি নি।
খুব ইচ্ছে করতো ও আমাকে নিয়ে গল্প লিখুক। হয়তো কখনো সত্যিই আমাকে নিয়ে লিখবে। কিন্তু সেই প্রকাশিত গল্প পড়ার সুখ থেকে নিশ্চিত বঞ্চিত হবো আমি। সেই সুখকর খবরটা না জেনেই পরপারে পাড়ি জমাবো। হয়তো মনের ভেতর পাগলামী একটা আশা রিনরিন করে বাজবে। পরপারে যদি দেখা হয় আমার হিরোর সাথে। তাহলে বাবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিবো। বাবা, তোমার অবর্তমানে ওই ছিলো আমার হিরো।
ও যেন একই সাথে আমার আশ্রয়দাতা বাবা, স্নেহের পুত্তুলী সন্তান আর রোমান্টিকতায় ভরা প্রেমিক । যে প্রেমিকের সাথে আমার হাত ধরে বসে থাকা বা কপালে চুমু খাওয়া ছাড়া আর কিছুই হয় নি। মনেও আসে নি আর কিছুর কথা।
আমরা দু'জন এই রোমান্টিক প্রেমময় বন্ধুত্বের বাইরে আর কোন সম্পর্কে জড়াতে পারবো না জানতাম । জানতাম দু'জনেরই সামাজিক সীমাবদ্ধতার কথা । আর তাই কখনো এইসব বাঁধা ভাঙ্গার চিন্তাও করতাম না । কেন করতাম না? হয়তো সাহস ছিল না অথবা আর কিছু হয়তো বা। প্রকৃতি আড়াল থেকে মুচকি হেসেছিল।

ওদের বাসায় সেদিন হঠাৎ করেই নিয়ে গেল ও আমায় । ওর মা দেশে গেছেন জমিজমার কীসব ভেজাল মেটাতে। বাসায় শুধু বাবা আর কলেজ পড়ুয়া দুই ভাই বোন আছে।
আমি খুব স্বচ্ছন্দেই গেলাম ওদের বাসায়। ওর মা না থাকুক বাকীদের সাথে না হয় পরিচিত হওয়া যাবে। ওর বাবার নামায শেষ হলে দেখা করতে গেলাম ভদ্রলোকের সাথে ।

করিম মণ্ডলের সাথে আমার আবার দেখা হবে আমি কল্পনাও করতে পারিনি । যেই সংসারে বাবা থাকে না সেখানে কন্যা শিশুদের নিয়ে মায়েদের দুশ্চিন্তার অন্ত থাকে না। একটা ভালো পাত্র দেখে বিদেয় করতে পারলেই যেনো সকল দুশ্চিন্তার শেষ হয়। বিয়ের সম্পর্ক বোঝার আগেই কেন আমায় বিয়ে দেয়া হয়েছিল তা সংসারের দায়িত্বে থাকা বড় ভাইকে জিজ্ঞেস করতে পারিনি অভিমানে। এতোটুকুন মেয়ে বিয়ে, শরীর এসবের কীই বা বোঝে। এক ভয়ার্ত হরিণ শিশুর উপর হায়েনার ঝাঁপিয়ে পড়া সেই ভয়ানক বাসর রাতের আতঙ্ক থেকে মুক্তি পেতে বিয়ের পরের দিন ভোরেই পালিয়ে ছিলাম। চলে এসেছিলাম শেরপুর থেকে কিন্তু সাথে করে আরেকজনের অস্তিত্ব নিয়ে এসেছিলাম না বুঝেই । তার পরের মাসগুলো ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়। বড় ভাইয়ের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে গিয়েছিল জীবন। মা কেবল লুকিয়ে চোখের জল ফেলতেন। আমি আর ফিরে যেতে চাই নি। ওই পরিবার থেকেও আর নিতে আসে নি। পরিবারের মান মর্যাদা ধুলিস্যাৎ করে তাদের সম্মানে চুনকালি মেখে পালিয়ে এসেছি। সেটাই ছিল আমার বড় অপরাধ। কেউ খোঁজ নেয়নি কোন সে ভয়াবহ কারণে পালিয়ে ছিলাম। সবাই ধরে নিয়েছিল নির্ঘাৎ আমার আর কারো সাথে লটর পটর আছে।
প্রসব বেদনার শেষ সময়ের জটিলতার কারণে আমাকে আর বাসায় রাখতে মায়ের সাহস হয় নি। হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল। বাচ্চাটা কেমন হয়েছিল দেখার সৌভাগ্য হয়নি আমার। হাসপাতাল থেকেই করিম মণ্ডল আমার ছেলেকে মা হারা করে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর আর জানতে পারি নি। আমাকে কঠোরভাবে নিষেধ করে দেয়া হয়েছিল যেনো ছেলের দাবি নিয়ে কখনো মণ্ডল পরিবারের সামনে না দাঁড়াই।
জানতে পারিনি অনেকগুলো বছর দেশত্যাগী ছিলাম বলেও।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন