বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ অক্টোবর ১৯৮০
গল্প/কবিতা: ২৮টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

রজব বৃওান্ত

প্রেম ফেব্রুয়ারী ২০১৭

আলোর আশ্রয়

ঘৃণা সেপ্টেম্বর ২০১৬

কাকতাড়ুয়া

প্রায়শ্চিত্ত জুন ২০১৬

গভীরতা (সেপ্টেম্বর ২০১৫)

রোদদের মোগনোতা

আশরাফ উদ্ দীন আহমদ
comment ০  favorite ০  import_contacts ৩০৬
“গল্প”
ডানায় রৌদ্রের মগ্নতা
আশ্বিন মাসের রোদ যেন মাথার ওপর থেকে নামতে চায় না। হা হাভাতের মতো দাঁড়িয়ে থাকে তো থাকেই, নড়েচড়ে বসব এতোটুকু বালাই নেই। মুন্সী গরুগাড়ি সাজিয়ে গঞ্জের দিকে যাচ্ছে, গাড়ি ভর্তি আঁখের গুড়। সুরকি ফেলা সড়ক ধরে নবীন স্যাকড়ার ছেলের সদ্য বিবাহিতা বউ লছিমনে চেপে শ্বশুরবাড়ি যায়। ওপাশের আমবাগান থেকে ঝড়ো বাতাস একপশলা দমকার মতো ছুটে এসে দক্ষিণমুখো হয়।
কুমারটুলির মাটি-কাদার মানুষগুলোর মতো নছিপুরের মেয়ে মানুষরা বড় বেশি আবেগপ্রবণ। একটু-আধটু এলোমেলো বাতাসেই কেমন ভেঙে যায়। বিকেল এখনো হয়নি। শুকনো মাটির মেঠেল গন্ধটা ভারী বাতাসে নাকে এসে ধাক্কা দিচ্ছে, সুবিদ আলীর বউ হিরামনের প্রথম বাচ্চাটা মৃত হওয়ায় সারা গাঁয়ে কেমন একটা দুঃখ-দুঃখ বাতাস বইছে। সুবিদ আলী একজন মাটি কাটা মানুষ, কোদাল শক্ত করে ধরে তবেই তো মাটি কুঁপিয়ে জীবন যাপন।
কলাগাছের সারি ধরে তৈয়ব মিয়া এগিয়ে যায় বাড়িমুখো। গাছের ছায়ায় জীবনটাকে বাঁচানোর প্রয়াস কারো কমতি নেই। তারপরও দেশগাঁয়ে তেমন গাছে নেই, গাছকে শত্র“ ভেবে নিকেশ করছে যারা, তাদের মাথা ফেটে যাক গনগনে সূর্যের তাপে, তৈয়ব মিয়া গাছ ভালোবাসে বলেই গাছের ছায়ায় নিজেকে তৃপ্ত করে। বাঁশবাগানের ওপাশেই দরমাবেড়ার ঘরটা ছুঁয়ে যেটুকু আবাদি জমিটুকু আছে, তা সবই তৈয়ব মিয়ার পৈত্রিক বাস্তুভিটা।
শোলমারী গাঁয়ের গল্পটা অতোখানি বেগবান হতো না, যদি না যোগেন মাষ্টারের ছেলে রমেশ বৃত্তি পেয়ে অষ্টোলিয়া যেতো, যোগেন মাষ্টার স্বার্থক মানুষ বটে। তৈয়ব বলে, কিছু-কিছু মানুষের জন্যই এলাকার নাম-যশ বৃদ্ধি পায়, দেশ-গ্রামের মানুষজন মানে চেনে এবং মনে রাখে।
কুমারটুলির চায়ের দোকানেও যোগেন মাষ্টারের ছেলের বৃত্তি নিয়ে জোর আলোচনা। কোথায় নেই বা আলোচনা, তৈয়ব মিয়া এক ছাপোসা মানুষ, নৌকার মিস্ত্রী, নতুন নামাজি হয়েছে, নামাজের কায়দা-কানুন সবই জানতে চায় আদ্যপান্ত, সমাজের আর দশটা কর্মের চেয়েও তার ওই নামাজের সুরা-রুকু-সিজদা-কনুই সঠিক করা, অজু শুদ্ধ করাই লক্ষ্য বেশি, দাওয়ার নীচে রব্বানির মা এলোমেলো চুলে বসে আছে, শরীরে আর ক্ষমতা নেই, ছাগীটা বাচ্চা দিয়েছে দুদিন হলো, যতœ করতেও পারছে না সে, মাটির উনুনের সামনে বসে আছে কছিমালা বিবি। রব্বানি গত হয়েছে মাসখানিক, নছিমনের সাথে ওর ভ্যানের ধাক্কায় উল্টে যায়, তারপর কলজে ফেটে মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত উঠে মারা যায়, থানা-হাসপাতালে যাওয়ারও সময়টুকু দেয়নি। রব্বানির সদ্য বিয়ে করা বউ নির্বিকার, ভ্যানরিকসাটি যৌতুক দিয়েছে কছিমালার বাপে।
রব্বানির মা অতি শোকে কাতর আর অধিক শোকে পাথর এখন। একমাত্র ছেলে তার, নতুন সংসার,নতুন রোজগার, কচি মুখটা বারংবার চোখের সামনে ছুটে-ছুটে আসে, নিজেকে পারে না আর ধরে রাখতে। কছিমালা বিবি কেঁদে-কেটে কুল পায় না। সমাজের কিছুই আজ আর তার জন্য নয়। কেমন একটা খাপছাড়া মানুষ, স্বামী নামের মানুষটাকে চিনতে না চিনতেই হারিয়ে গেলো আর সে হলো বিধবা।
সড়কের ওধারে দোকানপাট সামান্য, সকাল-বিকাল সাত অঞ্চলের মানুষজন ওখানে ভীর করে, জটলা বাড়ে তখন। রব্বানির মুখটা কারো না কারো মধ্যে ভেসে ওঠে, কছিমালা ধন্দে পরে, নিজেকে তারপরও বাঁধে কঠিন বাঁধনে। পাশের বাড়ির ভাবী স্বাধনা এসে কথা বলতো আগে কতো, এখন আর আসে না, নদীর ঘাটে দু’ তিনদিন দেখা হয়েছিলো, আগবাড়িয়ে কথা বলতে রুচি হয়নি কছিমালার, অতি কাজের ভান দেখিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যায়, মুখে কিঞ্চিৎ হাসি ছিলো কি ছিলো না সেটুকুও দৃষ্টি দেয়নি।
রব্বানির বাপে তো আছে নামাজ নিয়ে, নামাজের মাসালা রপ্ত না হলে নামাজ শুদ্ধ হয় না। এর জন্য সময়টা বড় কথা। বাঁশবেড়ের রথীন হাজরা স্বপ্নাদেশে হুকুম পেয়ে রাতারাতি নিজ ধর্ম পরিবর্তন করে ফেললো কেনো, সে কথাও গাঁয়ে একটা বেশ শোরগোল ফেলেছে এরমধ্যে। পাড়ার মসজিদগুলোতে সে সংবাদ আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, আবোল-বৃদ্ধের মুখে-মুখে এখন বেশ ফেরে রথীণ হাজরার জীবনবৃত্তান্ত। যেন নিজ ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হলেই মানুষ হয় হিরো অর্থাৎ আল¬াহর শ্রেষ্ট ইনসান।
রব্বানির একমাত্র বোন শাহীদার মুখটা কেমন বিবর্ণ-পান্ডু। ওর ছেলেটাও মাটির সঙ্গে লেপ্টে আছে। রোগা পটকা যেন, শাহীদার বিয়ে দিয়েছিলো তৈয়ব মিয়া জোতজমি খানিক দেখে, সীমান্তের কাছাকাছি কোনো গাঁয়েই ছিলো ওর বাস। লেখাপড়া নেহাৎই কম ছিলো না, মহরম ছেলেটাও বেশ ভালো, শক্তি তাগাদ আছে, মাটিকে চষতে পারে, নিজ হাতে মাটিকে যে চাষাবাদের জন্য উপযোগী করতে জানে সেই তো আসল মালিক, কিন্তু কি এক গন্ডগলের কারণে মহরমকে সীমান্তের ওপাশ থেকে একদঙ্গল সস্ত্রস্ত্র বাহিনীর চকরাবকরা খাকি পোষাকের লোক এসে মাজায় দড়ি দিয়ে হিরহির করে টানতে-টানতে ধরে নিয়ে গেলো হঠাৎ একদিন, তারপর তো বছর খানিক হলো, ফিরে আর আসেনি, শহীদা অনেকবার বিডিআর ক্যাম্পে গেছে মহরমের খোঁজ নিতে, বরাবরই তারা বলেছে, সীমান্তের ওপারের লোকেরা তো নিয়ে গেছে বোন, আজো ফিরিয়ে দেয়নি, আমরা খোঁজ খবর নিচ্ছি, ফেরৎ দিলে তবেই না...
সীমান্তের লাগোয়া গ্রাম আনন্দহাটি, মাঝামাঝি গ্রাম, মাঝে সীমান্ত চৌকি, কে জানে কোথায় জীবনের শেষ। মানুষজন গরুগাড়ি আরামসে যাতায়াত করে আবার কখনো কাকতালীয়ভাবে সব বন্ধ। কার অদৃর্শে কখন কি হয় কেউই জানে না। সবই যেন উপরমহলের লংকাকান্ড ব্যাপার। মহরম আর ফিরে আসেনি, কেউ তার খবর দিতে পারেনি তারপর। ক্রমে-ক্রমে থিতিয়ে যায় সব একদিন, তবুও রাত্রি আসে দিন যায়, দিন শেষে রাত্রি নামে, মানুষ নড়েচড়ে বসে, হাটে-মোকামে গঞ্জে যায়, শাহীদার ঘরের চালে এলোমেলো বাতাস খেলে, দখিনা বাতাস, মাঝরাত্রে দরোজায় শব্দ ওঠে, শিকল ভাঙার শব্দ, ছেলেটাও আঁতকে ওঠে চিৎকার করে, বাড়ির অন্যরা কেউ কিছুই বলে না, যেন বা সবাই বধির, শহীদা যা বোঝার সমস্ত বুঝে যায় স্বামীর নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে, সবই বিধির বিধান, ছেলেটার কঁচি মুখটার দিকে তাকিয়ে স্বামীর ঘর ছাড়তে চায় না মন, কিন্তু কসাই শ্বশুর বড় বেশি নেশাতুর যেন, দেবর দুটোও কেমন গায়ে পড়া স্বভাবের। যেন আঙুর ফলের আশেপাশে ঘুরঘুর করলেই কারো গাছের আঙুর পেয়ে মুখে পুরে দিয়ে বলে, কে বলে আঙুর টক, চকচকে মুখের লাল রক্তিমাভা আলোটুকু শাহীদাকে ঘরের বাঁধন আলাদা করে, সে আর থাকতে পারেনি স্বামীর নির্মিত ঘরে, ঘরকে একসময় মনে হয় মানুষের বানানো ফানুস মাত্র, এটাই উড়ে যাবে এখনই, কে পারে রুখতে, একদিন শাশুড়ি গর্জে ওঠে, বসে-বসে আর অন্ন ধ্বংস না করে এবার ঘর ছাড়ো বাছা, আমার যে জমিদারী নেই গো বড়লোকের বিটি!
রব্বানির মা নির্বিকার, শাহীদার ছেলেটা খাই-খাই করে দিনমান, কোথায় পাবে এতো খাবার, নৌকার মিস্ত্রী শাহীদার বাপ, নতুন নামাজী, মন তার পড়ে থাকে মসজিদে, সংসার যে একটা ধর্মালয় সে কথা ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে আজকাল, নামাজই একমাত্র উপায় নিজেকে শোধরাবার, নামাজের কায়দা-কানুন সঠিক না হলে গুনাহ আরো দ্বিগুণ বাড়ে, রব্বানির বাপে তাই সর্তক সদাসর্বদা।
আঙুরা টকিজের সামনের মোড়ে অখিল নস্করের চায়ের দোকানের বাখারির বেঞ্চে বসে তবলীক জামাতের এক ভাই গল্পগুজব শুরু করে, সবই ধর্মীয় বয়ান। ওই খেঁজুর গাছের মধ্যে আছেটা কি বলো তো ভায়া... উপস্থিত সকলে নিশ্চুপ, কি বলবে ভেবে কুল পায় না। আসলেই তো আছে কি, কেউ তো এতোকাল এমনভাবে তলিয়ে দেখেনি কোনোদিন।
কিচ্ছু নেই, অতো ভাবোনি, ওই মাঠের গজানো আঁখের ভেতর আছে কি, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ওই সবই ভেল্কি, কি নেয়ামত ভাবোনি কখনো, নদীর পানির স্বাদ, ডাবের পানির স্বাদ, আঁখের রসের স্বাদ, খেঁজুর রসের স্বাদ, তালের রসের স্বাদ, মায়ের দুধের স্বাদ...কি ভিন্ন-ভিন্ন সোয়াদ, কি ম্যাজিক আমার পরম মাবুদ জানে, কি মিয়ারা তারপরও দিল খায়েশ করে সুবাহান্নাল¬াহ বলতে ইচ্ছে জাগছে না...
রাব্বানির বাপ তৈয়ব মিয়া দিনদুনিয়ার তামাম সাধ-আহলাদ ভুলে জামাত ভাইয়ের কথায় ডুবে যায়। নিজেকে বড় বেশি ধিক্কার দেয়। নিজের অজ্ঞানতার জন্য দায়ী সে নিজেই, কোরান-হাদিসের ব্যাখ্যা শোনা সকল মুসলমানের যায়েজ, ওয়াজ-নছিহত না শুনলে ইসলামী জ্ঞানের বহর বৃদ্ধি হয় না।
সীমান্ত লাগোয়া মসজিদ, দু’ দেশের লোকেরাই আজান শোনে, মুয়াজিনের আজানের সুমধুর ধ্বনি শুনে সকাল হয়। পাখি ডাকে, পাখির মতো মানুষগুলোও সুবেহসাদিকে বিছানা ছেড়ে কাজে ছোটে, শাহীদার শ্বশুরের এখন শাহীদার বাপের সঙ্গে গলায়-গলায় ভাব, পাশাপাশি দুটো গ্রাম হলেও ধর্মীয় দিক বিবেচনায় এনে কাছাকাছি চলে আসে। মসজিদের মুয়াজিন সাহেব বলে, পৃথিবীর সকল মুমিন মুসলমান একে অপরের ভাই, সকল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সব ভুলে ভায়ে-ভায়ে মিলনই ভ্রাতৃত্ব।
মসজিদের তেমন উন্নতি চোখে না পড়লেও তাবলীক জামাতের দলগুলো কখনো-সখনো আসে-টাসে আবার, হতে পারে সীমান্তলাগোয়া গ্রামটাকে দেখতে অথবা ধর্মীয় টানে হয়তো। সালাম-কালাম ঈমান-আকিদা-ইফদ বিষয়গুলো নিয়ে গুরুগম্ভীর তশকীর(আলোচনা) করে। রাব্বানির বাপের মতো মানুষগুলো শোনে, ভালোলাগে বলেই শুধু না, মউত সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হয়। বুকের ভেতরটা ফাঁপিয়ে ওঠে, কোথায় একটা কষ্ট বড় বেশি কুড়ে-ফুঁড়ে নিঃশেষ করে সবাইকে। করিমগঞ্জের মেলায় যাত্রাদল আসে, সেখানে রাতভর নাইট শো চলে, সার্কাস-পুতুলনাচ-যাদুখেলা-নাগরদোলা-ভ্যারাইটি শো...সব সবই হয়, সাতগাঁয়ের ছেলে-ছোকরা থেকে বুড়োরাও ছোটে, কোকিলের ডাক, নদীর জোয়ারকেও যেন হার মানায়। কে কার কথা শোনে, ঘরের বাঁধন ছিন্ন করে মরিচিকার পেছনে ছোটে, কিসের নেশা ওদের চোখে-মুখে, কিসের আনন্দে আজ বেগবান যুবসমাজ।
জামাত ভায়েরা সে’ সময় সীমান্তলাগোয়া মসজিদে নোঙর ফেলে, কোরান-হাদিসের কথা বয়ান করে, সুরেলা কন্ঠের বিমোহিত সুরে বাতাসও থেমে যায়। ঝোঁপঝাঁড়ে ভেতর থেকে ছুটে আসে কাঠঠোঁকড়া-গিরগিটি অথবা অন্য কোনো প্রাণী, দুনিয়া ভি বয়ান নয়, আখেরি বয়ান, আল্লাহ পাকের নসিতে(নির্দেশ) শুনে নিথর হয়ে যায়। তার শরীর শেষ পয়গম্বর মোহাম্মদ মোস্তাফা আহম্মাদ মোস্তফা রাসুল(সাঃ)এর নির্দেশিত দুনিয়ার ভি কামের, আখেরি মাজেজা হাসিল করতে তার হেকায়েত(উপদেশ) গ্রহণ না করলে নিস্তার নেই...
রবিবার জামাত ভায়েদের সওয়াল জওয়াব শুনে রব্বানির বাপ তৈয়ব মিয়া ঘাঁপটি মেরে যায়। নামাজের মশলাহ্(শাস্ত্রবিধি) না জেনে ইবাদত সহি হয় না, এবং ইবাদত সহি না হলে নামাজ-আকিদা সহি হয় না, নামাজ-আকিদা সহি না হলে সুরা-কেরাতের উচ্চারণ সহি হয় না, সুরা কেরাত সহি না হলে শওয়ালের পরিবর্তে গুনাহ সঞ্চিত হয়, ঘরে-সংসারে জীবনে টানাপোড়েন যেমন থাকে, ছেলে-মেয়ে সুখ চায় না, দ্বীনের কাজ আল¬াহ-রসুলের নির্দেশ মতো কাজ না করলে রোজহাসরের মাঠে এক হাত সূর্য মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে শাস্তি ভোগ করতে হবে, কারো সাধ্য নেই মুনাফেক-বেদ্বীন-নাস্তিক-বেদাত-বেচমিজকে রক্ষা করা।
রাব্বানির বাপ একসময় নমণীয় কন্ঠে বলে, হুজুর আমি তো কোনো কিছু সহি করতে পারি না, আল্লাহ-রসুল সম্পর্কে তেমন কিছুই জানি না, পেটে বিদ্যাও তেমন নেই একফোঁটা, আমার আখেরি-জিন্দেগীর সব কি তাহলে বৃথা।
জামাতি এক ভাই বলে ওঠে, আল্লাহ পাকের দরবারে সবাই বালক, শুধু খাস দিলে তওবা পড়ে নাও, আর নামাজ তরিকা-শিক্ষা নিতে তোমাকে তাবলীক জামাতে আসতে হবে, চিলাহ করতে হবে, এক চিলাহ দুই চিলাহ তিন চিলাহ...এক চিলাহ মানে চল্লিশ দিনের সফর, অনেকে এক বছর দুই বছর এমন কি সারাজীবন চিল¬াহ অর্থাৎ আল্লাহ পাকের রাস্তায় জীবনকে উৎসর্গ করে দেয়। দ্বীন ইসলামের সহি সুদ্ধ জ্ঞানের অন্সেসনে মানুষ তবলীকে আসে, নামাজের তরিকা-কায়দা রপ্ত করে, তার সামনে খুলে যায় কেতাবী পথ।
আরেক জামাতি ভাই বলে ওঠে, নামাজ সহি-শুদ্ধ না হলে সংসার-ধর্ম ধ্বংস হয়ে যায়, পাপে-পাপে ভরে যায় ইহকাল, পায়ে-পায়ে মুসিবত, জীবন বিভীষিকাময়তায় ভরে যায়, শান্তি হারিয়ে যায়, আসো ভাই আসো এক চিলাহ দিয়ে দেখো কি সুখ, পরম স্বর্গীয় শান্তি...
বাড়ি ফিরে রব্বানির মায়ের সামনে দাঁড়ায় তৈয়র মিয়া। কালো তমসাপূর্ণ একটা মুখ দেখে রব্বানির মা আঁতকে ওঠে। মানুষটার হলো কি, নতুন করে কি ঘটছে তার সংসারে, এমন আশংকায় অস্থির হওয়ার আগেই রব্বানির বাপে হাত চেপে ধরে, রব্বানির মা আমি মহাপাপে আছি বলে আমার সংসারে শান্তি নেই, আমি দোজখে পড়ে আছি এই সংসার-সংসার করে, আমাকে চিল¬াই যেতে হবে, তবলীক জামাতের চিল¬াই জীবনটাকে দিয়ে দেবো।
স্বামীর অকস্মাৎ এতোগুলো কথা শুনে রব্বানির মা তালগোল হারিয়ে ফেলে, কি বলতে হবে এখন, কি বা বলছে তার স্বামী, কোনো যোগসূত্র ধরতে পারে না, মলিন মুখে তাকিয়ে বলে, যা ইচ্ছে হয় করেন তাহলে...
রব্বানির বউ কছিমালাকে বাপ-ভায়েরা একদিন নিয়ে চলে গেলো। শাহীদার ছেলেটা মাটির সঙ্গে মিলেমিশে কাঁদে সারাদিন, সীমান্তে কড়া পাহারা দেয় দু’ দেশের প্রহরীরা, মাঝরাত্রে গোলাগুলীর আওয়াজে বাতাস ভারী। ফলসা গাছের পাতারা সাক্ষী, আরো সাক্ষী বুড়ো অশত্থ গাছটা। রব্বানির মা এখন অনেকটা সামলে নিয়েছে নিজের শোক, পুত্র হারানো শোক ভুলবার নয়, তারপর জীবন যাপনের তাগিদে কতো কিছুই তো ভুলে থাকতে হয়। রব্বানির বাপে বেশ আমোদেই আছে, তবলীক জামাতের সঙ্গে চিলাহ দেবে। দেশে-দেশে ঘুরে বেড়াবে, খাই-খরচ নিতে পারলে ভালো, নয়তো তবলীকের ভায়েরাই চালিয়ে নেবে, ধর্মের ব্যাপারে টাকা কোনো বিষয় নয়, মুমিন মাত্রই আরেক মুমিনের ভাই, দশের লাঠি একের বোঝা, জামাতি এক ভায়ের কথা শুনে মনে বড় শান্তি পেয়েছে সে।
বাড়িতে বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে বলে তৈয়ব মিয়া, আমার সংসারে শান্তি নেই, চারদিকে এতো হিংসে-হাহাকার কেনো আমি বুঝে গেছি, সবই আমার দোষ, আমি আল্লাহ পাকের জমিনে বসে আল¬াহকেই বেমালুম ভুলে গেছি, আমার পাপ আমার গুনাহ, আমি আর ঘরে বসে থাকবো না, চিলাহ যাবো, সারাজীবনই চিলাহ’ই কাটিয়ে দেবো। রব্বানির মা মলিন কন্ঠে বলে, মেয়েদের চিলাহ’ই নেয় না গো, আমিও চলে যাবো, সারাজীবন আর এই পোড়া হাড়ি ঠেলতে ভালো লাগে না...
আসরের আজান ভেসে আসে তারপর, শাহীদার ছেলেটা কেঁদে ওঠে, এলাকায় শোরগোল শোনা যায়। গতরাত্রে হাঁসখালিতে যে মেয়েটা সীমান্ত পারাপার হতে গিয়ে ধরা পড়েছে তাকে সদরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, রব্বানির মায়ের চোখে কালির চিহৃ, হাড়িতে ভাত নেই বলে নয়, স্বামী চিলাহ যাচ্ছে বলেও নয়, তার এখন একমাত্র শোক, আখেরি-জিন্দেগী সব বরবাদ হয়ে যাচ্ছে তার জন্য, মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়ে কি যে অপরাধ করেছে সে এখন তিলে-তিলে অনুধাবণ করছে নিজেই। তলে-তলে বুক ফেটে যাচ্ছে, কিন্তু মুখে কিছুই বলতে পারছে না, রব্বানির চলে যাওয়াটা অস্বাভাবিক, শাহীদার বাড়ি ফেরাও কি স্বাভাবিক, তারপর মুখ বুঁজে থাকে।
মাঝরাত্রে ঘরের চালে ঢিল পড়ে, রব্বানির বাপ নেই, শাহীদা নিদ্রাহীন চোখে তাকিয়ে দেখে জানালার দিকে, রব্বানির মা বিডিআর ক্যাম্পে ঝি-গিরি করে এখন। দু ’চারজন বিডিআর জোয়ান ‘খালা-খালা’ করে মুখ ফেনিয়ে ফেলে, রব্বানির মায়ের আনন্দের সীমা নেই, টিয়াপাখি রঙের ধানক্ষেতের দিকে চোখ পড়লে নিষ্ঠাবান কৃষকের মনটা যেমন বিহবলে গলে যায়, কৃষকবঁধুর মনটাও আনন্দে নাচে। আকাশে নীলের আচ্ছাদনে ঝাঁক-ঝাঁক বুঁনো পাখির ডানায় রৌদ্রের গন্ধ পেয়ে ভালোবাসাও আন্দোলিত হয়ে ওঠে। রব্বানির মা হেসে বলে, বাবারা তোমরা আমাকে ‘খালা’ বলো যখন, আমি কি তোমাদের আবদার ফেলে দিতে পারি, তোমরাই আমার মহরম যে।
বিডিআর এক জোয়ান মোলায়েম কন্ঠে বলে ওঠে, মা-বাপ সংসার-বউ ছেড়ে-ছুড়ে কোন্ ঝোঁপ জঙ্গলে মশা-মাছির রাজ্যে পড়ে আছি, আমাদের দেখার কেউ নেই গো!
শাহীদার উদ্ভিন্ন যৌবনা শরীরের দিকে চোখ ফেলে কথাটা বলে থেমে যায় একসময়। সাপের মতো লাইন ধরে রেলগাড়ি যেমন ঝিকঝিক শব্দ তুলে ছুটে যায়, রব্বানির মায়ের চোখ তেমনি মনে হয় রব্বানির বাপও সেই সাপের মতো সারিবদ্ধ হয়ে চিল¬াহ দিতে চলছে, এক চিলাহ...দুই চিলাহ...তিন চিলাহ...সারাজীবনের চিলাহ, শাহীদার একটা কাজ চায়, ছেলেটা কাঁদে, কষ্টের যন্ত্রণা ফুরায় না...একটা গুলী বুক ভেদ করে কোথায় যেন চলে যায়, ভিটেমাটি কেঁপে ওঠে সীমান্তরক্ষীদের গোলাগুলীর শব্দে। পাখিরা দূরে-দূরে সরে যায়, কোথায় একটা আশ্রয় তার সে জানে না, পাখিরা এখন বড়ই নিরাপদহীন।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন