বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৩ ডিসেম্বর ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ১টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৪

বিচারক স্কোরঃ ১.৭৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৬৫ / ৩.০

আমি (নভেম্বর ২০১৩)

মোট ভোট ১১ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৪ চিঠি

এম এ আলিম
comment ১০  favorite ০  import_contacts ২৪৯
‘কেমন আছিছ,বাবা? কত দিন হয় বাড়িতে আসিস না ! ’ চিঠির কথাগুলো পুনঃ পুনঃ পড়তে লাগল সৈকত। এমন দরদমাখা চিঠি কালেভদ্রেই মিলে। চিঠিতে হয়ত পেট ভরে না ঠিকই কিন্তু কোন কোন চিঠির ভাষা হৃদয় ছুঁয়ে যায়। বাড়ির কথা খুব মনে পড়তে লাগল তার। কিন্তু কী আর করা এ মাসেও যে ছুটি হবে না। সেনাবাহিনীর চাকরি বলে কথা; তাও আবার নতুন চাকরি! বাবা শামসুল ভূইয়ার চিঠির উত্তরে লেখলো - আরও মাসখানেক দেরি হবে,দুশ্চিন্তা করো না।
অগ্রহায়ণ মাসের শেষ। ঝলমলে রোদ। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা পৃথিবীকে যেন আরো সুশ্রী করে তোলার নিরন্তর প্রতিযোগিতায় নেমেছে। গ্রামে এ সময় নতুন ধানের পিঠা-পায়েসের ধুম চলে। কত জাতের পিঠা ! কোন কোন আইটেম কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। শুধু যে হারিয়ে যাচ্ছে তা নয় নতুন নতুন আইটেমেরো জন্ম হচ্ছে। পুরাতন স্থলে নতুন জন্ম নেবে এটাই তো স্বাভাবিক। কেননা পৃথিবী শূন্যস্থানে বিশ্বাস করে না। প্রতীক্ষার পালা যেন আর শেষ হয় না।
গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে যখন মাঠ ঘাট বৃষ্টির অভাবে চৌচির হয়ে যায়,প্রকৃতিও তখন বৃষ্টির জন্য উন্মুখ হয়ে উঠে। ঠিক সে সময় ছেলে বুড়োরা যেমন একপশলা বৃষ্টির জন্য উৎসুক থাকে তেমনি শামসুল ভূইয়াও তার ছেলের সংবাদের জন্য ব্যাকুল,কখন চিঠি আসে।
দিন গড়িয়ে রাত। হঠাৎ সৈকতের চিঠি আসে। অন্ধলোক হঠাৎ চোখে দেখতে পেলে যে রকম আনন্দের অনুভূতি হয় তেমনি অবস্থা শামসুল ভূইয়ারও। এই বুঝি ছেলে রওয়ানা দিল! কত দিন হয় ছেলেকে দেখে না,মাত্র কয়েক মাস, কিন্তু তার কাছে এই কয়েকটি মাসই মনে হল কয়েক’শ শতাব্দি। ব্যাকুলতা উপচে পড়ে ভরা নদীর জোয়ারের মত। শতাব্দির নিংরানো আকাঙ্ক্ষা নিয়ে চিঠি খোলে। কিন্তু একি! মুহূর্তেই তার চোখ মুখ বিষণ্নতায় ছেয়ে যায়। প্রলাপের স্বরে বলে - নাহ! এবারো ছুটি পেলি না?
পরিবারের একমাত্র সন্তান সে। বাবা মায়ের সব স্বপ্ন,স্নেহ-ভালবাসার কেন্দ্রবিন্দু যে একমাত্র সেই। মা নীলা বেগম শামসুলের কাছ থেকে চিঠিটি নিয়ে বার বার হত বুলায়; যেন সে তার ছেলেকেই স্নেহ করছে! নীলা বেগমের চোখ অশ্রুতে সিক্ত হয়ে ওঠে। আচল দিয়ে আড়াল করে চোখ মুছার চেষ্টা করে,কিন্তু পারে না। এক সময় ঢুকরে কেঁদে ওঠে। সৈকতের বাবা শামসুল তাকে সান্ত্বনা দেয়। কিন্তু সে সান্ত্বনাতেই কি আর মায়ের মন ভরে! কাঁদো কাঁদো স্বরে শুধায় - ওগো! ছেলের মত তুমিও এত পাষাণ হলে? ওর না হয় ছুটি নাই,তাই বলে আমরাও কি তাকে দেখতে যেতে পারি না?
শামসুল নীলা বেগমের মাথায় হাত দিয়ে বলে
- অধৈর্য হয়ো না। মাত্র তো কটা দিন! দেখো, দেখতে দেখতেই কেটে যাবে।
- আমি বলি কি - তুমি একবার না হয় ওকে দেখে আস,আমি কিছু পিঠা করে দেই। কত দিন হয় ছেলেটা আমার হাতের পিঠা খায় না!
বলতে বলতে আবারও কণ্ঠধরে আসে নীলা বেগমের। শামসুল তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে এইবার আর না করতে পারলো না। আশ্বাসের মাত্রাটা তীব্র করে বলল- বেশ; পিঠা বানাও,আমি কালই রওয়ানা দেব।

পরদিন সকাল সকালই রওয়ানা দেয় শামসুল ভূইয়া। কিন্তু দুরত্ব বেশি হওয়ায় সেনানিবাসে পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় মধ্যরাত হয়ে যায়। মধ্যরাতে সেনানিবাসের অভ্যন্তরে ঢুকতে হলে অনেক জেরার সম্মুখিন হতে হয়। শামসুল ভূইয়া জন্মলগ্ন থেকেই কানে খাটো ছিল। কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে ছেলের বাসার দিকে হনহন করে চলতে লাগল সে। পেছন থেকে এক সৈনিকের উৎকণ্ঠিত কয়েকটি ধ্বনি ভেসে এল - থামুন!
- থামুন প্লিজ!
শামসুল ভূইয়া নিরুত্তর।
নেপথ্যে সৈনিকের আরও কর্কশ ধ্বনি ভেসে এল- থামুন ! থামুন!! থামুন!!! গুলি করব কিন্তু!
আকাশে তখন একফালি চাঁদ দূর দিগন্তে ম্লান হওয়ার অপেক্ষায়। শনশন বাতাস বইছে। কোথাও পাখ-পাখালির একটু কিচির-মিচির পর্যন্ত নাই। মানব প্রজাতির মত তারাও মনে হয় পরিবার পরিজন নিয়ে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। শামসুল ভূইয়া হনহন করে চলতে থাকে দক্ষিণের দিকে। অস্ত্রগারের পাশ দিয়ে যেতে হয়। দিনের বেলায় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল কি না তা শামসুল ভূইয়া খেয়াল করে নি। কিন্তু রাত দশটার পর থেকেই যেন দমকা বাতাস চারদিকের গাছপালার সাথে অসম্ভব ধ্বস্তা-ধ্বস্তিতে মেতে উঠেছে। দক্ষিণা বাতাসের প্রাবল্যে সে কর্তব্যরত সৈনিকের কর্কশ হাঁক-ডাক আরও পেছন দিকে নিয়ে গেল, তার কান পর্যন্ত পৌঁছল না। আকাশের বুক জুড়ে কালো মেঘের চড়াৎ চড়াৎ ধ্বনি ক্রমশই ভিতির সৃষ্টি করে চলছে। অবস্থা দেখে মনে হয় যেন এখনই বৃষ্টি নামবে। কিন্তু হচ্ছে না। খানিক পরই আবার হঠাৎ করে বাতাসের দমকা হাওয়া থেমে যায়। স্তব্দ হয়ে যায় চারপাশ। প্রকৃতিকে বুঝে ওঠা মাঝে মাঝেই মুশকিল হয়ে পড়ে। সৈনিক ভাবে হয়ত ডাকাত হবে। তাছাড়া যেহেতু বারবার ডাকার পরও সে থামছে না সেহেতু এক সময় তার ধৈর্যের চ্যুতি ঘটল। আইনের সঠিক প্রয়োগ করল। একটি গুলির শব্দ। চারদিকে যেন শব্দটি প্রতিধ্বনিত হয়ে মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল দূর থেকে দূরান্তরে। এরপর মনুষ্য শব্দহীন খাঁ খাঁ নীরবতায় রাত কেটে যায়।

সকাল বেলা। সেই কর্তব্যরত সৈনিক হাতমুখ ধুয়ে নাস্তা শেষ করে গুলি করা সেই ব্যক্তিকে দেখতে যাবে এমন সময় উর্ধ্বতন অফিসার কর্তৃক তলব আসে। অস্ত্রগার রক্ষার্থে সে আইনের সঠিক প্রয়োগের পক্ষে যুক্তি দেখায়। অনেক জেরার পর তাকে আপাদত ছেড়ে দেওয়া হয়। অনেকে কানাঘুষা শুরু করে দিয়েছে - এই লোক ডাকাত হতে পারে না। ডাকাতের কোন সরঞ্জামাদিই নেই তার কাছে। কেবল পাওয়া গেছে রক্তে রঞ্জিত কিছু পিঠা আর একটি চিঠি।
যে লোকটাকে নিয়ে এত রহস্যের ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে তাকে খুব দেখতে ইচ্ছে হল সৈনিকের। ভিড় ঠেলে ধীর পায়ে কাছে যায়। সূর্য তখন এক টুকরো মেঘের আড়ালে লুকিয়ে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে। রাতের সেই দমকা বাতাসের লেশও নেই। কিন্তু তথাপিও সেনানিবাসের নীরব এলাকা ক্রমেই সরব হয়ে উঠছে। পরিচিত অপরিচিত অনেকই এখানে আছে,আরো অনেকেই আসতেছে। সৈকতের বন্ধু নিলয়ও তার পিছু অনুসরণ করলো। পূর্ব পরিচয় ছিল না। চাকরি সূত্রই পরিচয়। চলাফেরা করতে করতে অনেকটাই সে সৈকতের অন্তরঙ্গ হয়ে উঠেছে। বাবা-মার স্নেহ ভালবাসার কথা প্রায়ই সে তার কাছে বলত। পৃথিবীতে সন্তানেরা বাবা মার জন্য এত ব্যাকুল থাকে! এত হৃদয়ের টান! সত্যিই নিলয়ের মনে সে পরিবর্তন করে দিয়েছে। নানামুখি গুঞ্জন শুনে বন্ধুর সহযোগিতার জন্য নিলয়ও এসেছে। সৈকত সামনে যেতেই অনেকই চাপা স্বরে বলতে লাগলো-আহা! এমন গ্রাম্য সহজ সরল লোকটাকে কোন পাষণ্ড সৈনিকেই না মারল! অনেক কিছু শুনেও সে শুনছে না। লাশের কাছে গিয়েই সে বজ্রাহত হল। বাবা বলে তীব্র চিৎকার করে উঠল সেই সৈনিক। তার সে চিৎকারের শব্দ বোমা বিস্ফোরনের শব্দের মতই চারদিকে প্রতিধ্বনিত হল। দর্শনার্থীরাও তখন নীরব। আকষ্মিক এ নাটকীয়তায় মুহূর্তেই সেখানে গভীর নীরবতা নেমে এল।বাবা! কথা বল।কথা বল বাবা! বাবা,কথা বল। আমি তোমার সৈকত! . . . আমি সেই পাষণ্ড!
বাবার রক্তাক্ত লাশ নিজের বুকে চেপে ধরে বলে – বাবা! আমি নিজের হাতে তোমাকে . . . বাবা।
তার আর্তচিৎকারে হাহাকার করে উঠে সেনানিবাস প্রাঙ্গন। কোথাও যেন তখন পিন পতনের শব্দটিও নেই। উপস্থিত দর্শনার্থীরাও অনেকেই তখন কেউ না দেখার ছল করে চোখের পানি মুছার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। আকাশে একটুকরো কাল মেঘ। মুহূর্তেই যেন সমস্ত আকাশ ছেয়ে যাবার উপক্রম করছে।
এরপর সৈকত আর কথা বলতে পারে নি। সে জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। ততক্ষণে সমস্ত সেনানিবাস জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সংবাদটি। দূর দূরান্ত থেকে সাংবাদিক এবং সেনাবাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও আসল এমন মর্মাহত সংবাদ শুনে। তার মাকেও সংবাদ দিয়ে আনা হল। নীলা বেগম কোন কথাই বলতে পারলেন না। কেবল নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিতে দিতে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন মুর্ছা যাওয়া ছেলের দিকে। এক সময় সৈকতের জ্ঞান ফিরে। সভা সেমিনার করা হল। সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত হল। সৈকতকে সামরিক সর্বোচ্চ পুরস্কারের সম্মানে ভূষিত করা হল। পুরস্কারও গ্রহণ করল সে। কেবল নীলা বেগমের মুখেই আর কোন কথা ফুটাতে পারলো না।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন