বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৯১
গল্প/কবিতা: ২টি

আমি (নভেম্বর ২০১৩)

কবি সম্মেলন

subir Pereira
comment ৯  favorite ০  import_contacts ২৪৪
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরীর খোলা মাঠে বিশাল প্যান্ডেল সাজানো হয়েছে। ষ্টেজের সামনে দেয়া হয়েছে প্লাষ্টিকের চট এব্ং পিছনের দিকে গোটা তিরিশটা চেয়ার। আজকে জাতীয় কবি সম্মেলন। উতপল মাষ্টারের ছিন্নমুল কবিতা পরিষদের জাতীয় কবি সম্মেলন। পেরেরা সাব আয়োজক কমিটির আহবায়ক। সে খুব টেনশনে আছে। লোক সমাগম হবে তো? টেনশন হলে তার ব্লাড প্রেসার বেড়ে যায়। আজো তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। মাথা কেমন যেন ঝিম ঝিম করছে। বমি বমি ভাব।দাঁতের ব্যাথাটাও বেড়েছে। গায়ে সামান্য জ্বরও আছে। সে চুপচাপ ষ্টেজের পিছনে একটি চেয়ারে বসে আছে।

সম্মেলন নিয়ে মহা ঝামেলায় আছে বনি।বড় কাজের ছেলে। সে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছে। কতজন আসল, কে কে কবিতা পাঠ করবে, কে কোথায় বসবে। এসব নিয়ে তার চিন্তার শেষ নেই। কিছুক্ষণ পর পর সে মাইকের মাউথপিছে ফু দিয়ে দেখছে মাইক ঠিক আছে কিনা। সকাল থেকেই মাইকটা ঠিক মত কাজও করছে না। এজন্য মাইকম্যান ছেলেটাকে থাপ্পড় পর্যন্ত দিতে হয়েছে। এখন ছেলেটাকেও দেখা যাচ্ছে না। কোথায় কি হচ্ছে না হচ্ছে, কিছুক্ষণ পর পর বনি পেরেরা সাবকে রিপোর্ট দিচ্ছে।

সকাল দশটা বাজে। অনুষ্ঠান শুরু হবে এগারোটায়। ইতোমধ্যে অনেক কবি এসে গেছে। কিন্তু নয়ন মাষ্টার ও উত্পল মাষ্টারের খোঁজ নেই। নয়নের আজ উপস্থাপনা করার কথা। এতে বনির সামান্য আপত্তি ছিল। কারণ সে জানে নয়ন কাজে একটু ঢিলা স্বভাবের। প্রতিটি কাজে সে দেরিতে আসবে। কিন্তু এত ক্ষণেউতপলের তো চলে আসার কথা! সংগ্ঠনের সভাপতি যদি দেরীতে আছে, সে স্ংগঠন চলে কেমনে? বনি কি যে ফাপরে আছে, তার খবর কে নেয়?

পেরেরা মাথায় লাল পট্টি বেঁধে ঝিম মেরে বসে আছে। সে ভাবছে কবি সম্মেলন হবে তো? কবিরা আসবে তো। আর প্রধান অতিথী? কে জানে আজ তার কপালে কি আছে। বনি হাতে বড় একটি ফাইল নিয়ে পেরেরা সাবের কাছে ছুটে এলো।
-দাদা খারাপ খবর আছে।
-বলো, কি খারাপ খবর। তোমার খারাপ খবর শোনার জন্য মাথায় লাল পট্টি বেঁধে বসে আছি।বল।
-দাদা দুই বদ মাষ্টারের এখনো খবর নাই। নয়ন মাষ্টার নাকি, বাউলের আখড়ায় সারা রাত পড়েছিল। আর উত্পল মাষ্টার শিউলীকে নিয়ে বিউটি পার্লারে ঝিম মেরে বসে আছে। আচ্ছা কন তো বদ মাষ্টারদের কি আক্কেল। খোদায় জানে আজ কি হবে।
- দুই বদেরে ফোন করেছ?
-করেছি দাদা। নয়ন ফোন ধরে বলল, 'কোন শালায় রে।' বুঝতে পারছি সারা রাত গাঞ্জা টানছে।
-উত্পল মাষ্টারের কি খবর?
-ঐ যে বললাম বিউটি পার্লারে, শিউলী পার্লারে সাজ-গোজ করে আর, সে ঝিম মেরে বসে আছে। আমি বললাম এতো সাজাসাজির কি আছে? এটা তো কবি সম্মেলন। বিয়ে বাড়ী তো না। যাই দাদা দেখি ওদিকের কি খবর।

পেরেরা এবার রীতিমত ঘামছে। যে কোন সময় পড়ে যেতে পারে।দাঁতের ব্যাথার সাথে জ্বরের পরিমানও বেড়ে যাচ্ছে। সে দুইটা টাইনেনল খেয়ে চুপ করে বসে আছে। এর মধ্যে দুই বদ মাষ্টার চলে এসেছে। পেরেরা কোন কথা বলছে না। নয়নের চোখ লাল। কথা ঠিক মত বলতে পারছে না। ব্যাটা উপস্থাপনা করবে কীভাবে? উত্পল শিউলীকে নিয়ে সরাসরি পেরেরা সাবের সামনে। এসেই পেরেরাকে জিজ্ঞাস করে, 'পেরেরা দেখ তো শিউলীকে কেমন লাগছে?
পেরেরা হা করে শিউলীর দিকে তাকিয়ে আছে। মুখে এমন মেক-আপ করেছে যেন যাত্রা দলের আলেয়া। আর চুলগুল ফুলিয়ে ইয়া বড় মাথা বানিয়ে রেখেছে। পেরেরা বলল, শোন উত্পল আসছ দেরিতে যাও দেখ ওদিকের কি অবস্থা।
-' বললে না তো শিউলীরে কেমন দেখাছে?
-খালেদা জিয়ার মত। হইছে? যাও এবার।

বনি আবার এলো। পেরেরা জানে বনি আসা মানে আরও একটা খারাপ খবর।
-বল বনি, খারাপ খবরটা আগে বল?
-দাদা, নয়ন মাষ্টারের সাথে লুসি উপস্থাপনা করবে না। সে গাঞ্জার গন্ধ সহ্য করতে পারে না। আর নয়ন মাষ্টারও ঠিক মত উচ্চারণ করতে পারছে না। কথা নাকি জড়িয়ে যাচ্ছে।
- এক কাজ কর।উত্পল মাষ্টারকে বল লুসির সাথে উপস্থাপনা করতে ।
-দাদা বলেছিলাম।কিন্তু শিউলীর দিকে তাকিয়ে উত্পল সরাসরি না করে দিয়েছে। শোন বনি, লুসি কোন সাধারণ মেয়ে না যে সে একাজ করতে পারবেনা। সে একাই একশ। আমার বিশ্বাস সে সব সামলাতে পারবে। ইতোমধ্যে লুসির চলে এসেছে।
-দাদা, বদ মাষ্টারে অক অক করে বমি করেছে। ওরে কাট-আপ করে দিলাম। আমি একাই উপস্থাপনা করব।
-লুসি তোমার যা ইচ্ছে তা-ই কর। আমি চোখে অন্ধকার দেখছি। লুসি তুমি আর বনি আমার একমাত্র ভরসা। তোমাদের দুজনের উপর আমার আস্থা আছে। যাও দিদি, একটু সামাল দাও। লুসি চলে গেল।মেয়েটা খুব চটপটে। যে কোন সমস্যায় পেরেরা প্রথমে লুসিকে দায়িত্ব দিবে।ঈশ্বর মেয়েটাকে অনেক গুণ দিয়েছেন। ওর জন্য একটা ভালো ছেলে দেখতে হবে।
আবার বনি চলে এলো।
-দাদা খারাপ খবর
- বল জাহাপনা, বান্দা খারাপ খবর শোনার জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছে।
- দাদা বিরাট গ্যাঞ্জাম লাগছে। চেয়ার সব দখল হয়ে গেছে। কেউ আর সামনে চটের উপর বসতে চাইছে না। নয়ন মাষ্টার এক বুড় মতো কবিকে, সামনে বসতে বলেছিল। আর যায় কোথায়। ঐ বুড়ো শুরু করে দিয়েছে হৈচৈ। সে বলেছে সব ইয়াং কবিরা বসবে চটে, আর বয়স্ক কবিরা চেয়ারে। দাদা, হাতা হাতির মত অবস্থা। দুই দল হয়ে গেছে। ইয়াং আর বুড়া।
-যাও এখান থেকে, ওদের মারপিট করতে বল।
-দাদা, মারপিট শুরু হয়ে গেছে। বুড়াদের সাথে ইয়াংরা হেরে যাচ্ছে। বুড়ার সংখ্যা তো অনেক। ওদের গায়ে জোড় না থাকলে কি হবে। মুখ সাথে আছে না? দেখেন ওরা ইয়াংদের দিকে সমানে থু থু দিতেছে। ইয়াংরা সামনে যেতে সাহস করছে না।

পেরেরা এবার সত্যি সত্যি অজ্ঞান হয়ে যাবে। লুসি তাকে একটা ডাব এনে দিয়েছে।'দাদা এটা খাও ভাল লাগবে।' পেরেরা ডাবটা খেয়ে নিলো। এবার তার এক্টু ভাল লাগছে। এর মধ্যে বনি আবার আসল। পেরেরা সাব বলল,'হুজুর বলেন কি সংবাদ নিয়ে এসেছেন?' বনি পেরেরার এমন আচরণে অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
-দাদা আবার সমস্যা। প্রধান অতিথী আসতে পারবেনা। তার সচিব আসার কথা ছিল সেও আসতে পারিবেনা। বল দাদা কি করি।
-যাও নয়ন মাষ্টাররে চেয়ারে বসিয়ে দাও।
- দাদা চিন্তা নাই প্রধান অতিথী তার বউকে পাঠিয়ে দিয়েছে। সাথে বাড়তি একজন এসেছে। সচিবের বউ।
-ভালোই তো।একটার সাথে আরেকটা ফ্রি।
-দাদা, মুশকিল হলো এরা দুজনেই নাকি কবিতা লিখে। কবিতাও নিয়ে এসেছে। পাঠ করতে চায়।
-এদেশে 'ক' উচ্চারণ করতে পারলেই কবি হয়ে যায়। যাও লুসিকে নামগুলো দিয়ে আসো। বনি চলে গেল।
এমন সময় বয়স্ক মতো এক কবি আসল। গায়ে ধুলোবালি মাখা।সেই নাকি প্রথম মারামারি শুরু করেছিল।সে এসেই পেরেরার সামনে একটি চেয়ারে বসে পড়ল। পেরেরা দা কেমন আছেন? বুইড়া বলে কি পেরেরা দা!
-বলেন জাহাপনা।
- ছি ছি আমাকে জাহাপনা বলছেন কেন?
-আপনি দাদু মানুষ আমাকে দাদা বলতে পারলে আমি কেন চুপ থাকব, বলেন?
বুড়ো হা হা করে হাসছে। এই কবির বাড়ী কালীগঞ্জের,রাঙ্গামাটিয়া। নাম জন ডি, কস্তা। অনেক লেখা লিখেছে। কিন্ত কেউ ছাপাতে চায়। পেরেরা তাকে লেখা ছাপার আশ্বাস দিয়েছিল বলে, সে খুশিতে পেরেরাকে দাদা, আবার সময় সময় গুরু ডাকে। মুখে একটি দাঁতও নেই। কথা বুঝা যায় না।বুড়ো বলল, একটা কবিতা লিখেছি। আজকের মারপিট নিয়ে। কবিতার নাম 'কবিদের যুদ্ধ।' আমি আবৃত্তি করব।
-মাশাল্লা! করেন করেন। দাঁতবিহীন কবির আবৃত্তি তো কোন দিন শুনি নাই। এবার শুনা হবে। আমার ভাগ্য ভাল এমন কবির আবৃত্তি আজ শুনব।যা এখান থেকে।
-বুঝলে পেরেরা দা, নয়নের কাছে একটা বিড়ি চেয়ে খেয়েছিলাম। তার পর থেকে মাথা ঝিম ঝিম করছে। অকারণে হাসি পাচ্ছে। জীবনে বহু বিড়ি খাইছি। এইটার স্বাদ-গন্ধ আলাদা! পেরেরা দা, আপনার নাকি দাঁতে বেদনা?
-দেখে বুঝতে পারছেন না? এতো বেশী কথা বলেন ক্যেন?
-পেরেরা দা, আমার কোন দাঁতও নাই ব্যাথাও নাই। এই দেখেন কোন দাঁত নাই। হা হা হা। পেরেরা দা, চা-পানের ব্যাবস্থা নাই?
- এই বনি, সুমন্ত এই বুইড়ারে চা-পান দাও তো।
-ছি ছি দাদা আমারে বুইড়া বলছেন কেন?
-বনি, সুমন্ত এই জোয়ানরে কফি আর গোল্ডলিফ সিগারেট দাও।
-দাদা বড় রসিক মানুষ। হা হা হা। পেরেরা দা, খুব ক্ষিধে পেয়েছে। ডায়াবেটিক রুগী তো। কোন পাক পরশের আয়োজন নাই?
-এই যে ধরেন ডাব। যান ডাব খান।
-রসিকতা করলেন দাদা। ভীতরে পানি নাই তো?
-ভীতরের সাস আছে, ভেঙ্গে সাস খান।
-ভাঙ্গব কিভাবে ?দা-কাচি তো নাই?
-যা এখান থেকে নয়ন মাষ্টারের মাথায় ভাইঙ্গা খা।
-ঠিক বলেছেন। ওর মাথায় আজ ডাব ভেঙ্গে খাব। বদে আমারে চটিতে বসতে বলে! মাষ্টার দাঁড়া, আজ তরে খাইছি। তোর মাথায় আজ ডাব না ফাটাইছি তো, আমার নাম জন কবি না।
-বনি বনি এই জোয়ানরে এখান থেকে নিয়ে যাও তো।
বনি চলে এলো, জোয়ান দাদু চলেন, বাইরে চলে।
বুড়ো চলে গেল। পেরেরার আবার মাথা ধরছে।সাথে দাঁতের ব্যাথা। বমি বমি লাগছে। গা থেকে জ্বরটা এখনো নামেনি। লুসিকে বলতে হবে,আরও একটা টাইনানল দিতে। পেরেরা চোখ বন্ধ করে আছে। ওদিকে লুসির কন্ঠ শোনা যাছে,'সুপ্রিয় কবিতা প্রেমী কবি ভাই বোনেরা, সুস্বাগতম...
সাথে সাথে পেরেরার জ্বর ছেড়ে গেছে।েখন তার খুব ঘুম পেয়েছে। চোখে তন্দ্রা ভাব চলে এসেছে। সে শুনতে পাচ্ছে বনি এসে বলছে,'দাদা এক বুইড়া কাশতে কাশতে পেসাব করে দিছে। আরেক ডায়াবেটিক রুগী খাবার চায়। আরেক বুইড়া নাক ঢেকে ঘুমাচ্ছে... বলেন তো কোন দিকে সামলাই....
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন