বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ জানুয়ারী ১৯৭৪
গল্প/কবিতা: ২৪টি

চাঁদও অপেক্ষায় রাখে

এ কেমন প্রেম? আগস্ট ২০১৬

ভাবতে গিয়ে দিন চলে যায়

রহস্যময়ী নারী জুলাই ২০১৬

সেই দুটি চোখ

ফাল্গুন ফেব্রুয়ারী ২০১৬

প্রত্যয় (অক্টোবর ২০১৪)

কাশবনের বাতাস

সহিদুল হক
comment ৬  favorite ০  import_contacts ৫৬৪
-- যদি সত্যিই আমাকে ভালবাসতে তাহলে নিজস্ব বাড়ি আর ঝাঁ চকচকে একখানা গাড়ির ব্যবস্থা করে ফেলতে এতদিনে

-- কিন্তু ভাড়া বাড়িটাই বা মন্দ কি, আর দু-চাকাতে দুজনে যখন বেরোই প্রকৃতি কেমন মোলায়েম হাত বুলিয়ে দেয় গায়ে, এ সি কারও তুচ্ছ তার কাছে।

-- রাখো তোমার দু চাকা আর ভাড়া বাড়ি স্ট্যাটাস বলে কোন শব্দ জানা আছে তোমার? ঐ যে বোসবাবু তোমারই সমপদে থেকে নিজস্ব বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়নি বুঝি?

-- তা হয়েছে, তবে দু দুবার ঘুষ নেওয়ার অপরাধে চাকরি-খোয়ানোর তীরটাও তো বেরিয়ে গেছে কান ঘেঁষে সেটা বুঝি শোনো নি?

-- না শোনার কি আছে? কান ঘেঁসেই তো গেছে, খোয়াতে তো হয় নি, তুমি না কমার্সের ছাত্র ছিলে? পড়োনি 'নো রিস্ক নো গেইন?'

-- পড়েছি, তবে 'রিস্ক মানে ঘুষ নেওয়া' যে স্কুলে শেখানো হয় সেই স্কুলে পড়া হয়ে ওঠেনি।

-- তাই বুঝি, তা 'নিজের ভাল পাগলেও বোঝে' এ কথাটা নিশ্চয় জানা আছে?

-- তা আছে, তাছাড়া পাগল হতেও তো আর বেশি দেরি নেই,নিজের সাথে বিড়বিড় করা তো শুরুই হয়ে গেছে বহুদিন পাগল হয়ে গেলে নিজের ভাল ঠিকই বুঝে যাবো তখন

-- বিড় বিড় তো করবেই,তোমার ঐ সেকেলে সাধু-বাক্য শোনার লোক পাবে কোথায়?নিজেকেই তো শুনতে হবে, আর তুমি ভাল বাসতে জানো না বলে ভেবো না
আর কেউ জানে না।

-- বরটির আর জবাব দেওয়া হলো না,কেননা বধুটির মুঠোফোনে চটুল রিং টোন, নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়া মধ্য-তিরিশের দুই সন্তানের জননী বধূটি তখন উচ্ছল কিশোরী।

-- 'কেমন করে ভালবাসতে হয় সত্যিই হয়তো শেখা হয়ে ওঠেনি আজও' বরটি বিড় বিড় করতে থাকে ...


বরটি অর্থাৎ আমার ন্যাংটা বেলার বন্ধু অখিলেশ পশ্চিম আকাশে শরতের ডুবন্ত সূর্যটার দিকে তাকিয়ে বিড় বিড় করেই চলে।যেন ডুবে যাওয়ার আগে সূর্যটা তাকে জানিয়ে যাবে ভালবাসার আধুনিক সূত্রখানি।

* * *

কলেজের ডাকসাইটে সুন্দরী স্নিগ্ধার প্রেমপ্রার্থীর অভাব ছিল না। অথচ সবাইকে অবাক করে দিয়ে সেই স্নিগ্ধা প্রেমে পড়লো কি না ছা-পোষা কেরানির ছেলে মুখচোরা অখিলেশের ! যদিও ছাত্র-হিসাবে বেশ মেধাবী ছিল অখিলেশ। গায়ের র্ং শ্যামলা হলেও সুগঠিত শরীরের অখিলেশকে সুদর্শনই বলা যায়। তার আরও একটা গুণ হলো কবিতা লেখা। কলেজের ফাংশনে তার গমগমে গলায় যখন স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করতো আমরা সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতাম।

একদিন কলেজের গেটে সামনে সুমিতাকে ছল ছল চোখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো অখিলেশ। জিজ্ঞেস করলো, 'কি হয়েছে?'
সুমিতা বললো, শুনেছো তো বোধ হয়,আমার বাবা একজন মহিলার সাথে লিভ টুগেদারে আছে,আমাদের কোন দায় নেয় না, মা সেলাইয়ের কাজ করে, আমিও টিঊশন পড়াই, কিন্তু তাতেও চার জনের গ্রাসাচ্ছাদনটাই কোনরকমে হয়, বাড়তি খরচ জোগানো সম্ভব হয়ে ওঠে না, ছোট ভাই-বোন দুটোকেও তো লেখা-পড়া শেখাতে হচ্ছে, এদিকে আমার সারা বছরের ফীজ বাকি, পরীক্ষাতেই বসতে পারবো না, ভাবছি কলেজ ছেড়ে দেবো।

অখিলেশও ছাত্র পড়াতো, আর সেদিনই হাজার চারেক টাকা পেয়েছিল। সেটি সুমিতার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিল, এটা রাখ, আর কলেজ ছাড়ার চিন্তা মাথা থেকে সরা।

সুমিতা লজ্জিত হয়ে বলেছিল, না না অখিলেশদা, এ টাকা আমি নিতে পারবো না, নিজেকে ভিখারীর পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারবো না।

ছি ছি, এমন কথা বলতে পারলি? ঠিক আছে, এটা ধার হিসাবেই রাখ, চাকরি পেলে ফেরত দিস।

-- আর যদি চাকরি না পাই?

-- বিয়ের পর বরের কাছ থেকে নিয়ে ফেরত দিবি।

শুধু সুমিতা নয়, এভাবে মানুষের বিপদে-আপদে সাধ্য মতো পাশে থাকতে দেখা যেত অখিলেশকে।

* * *

বিয়ের পর থেকেই জড়িয়ে শোয়া অখিলেশ-স্নিগ্ধার অভ্যাস। বড় ছেলে সুজয় জন্মাবার পর রাতের ঘুম চলে গিয়েছিল অখিলেশের।স্নিগ্ধার এমনই গাঢ় ঘুম যে, ছেলের কান্নাতেও সে ঘুম ভাঙতো না। অখিলেশই ভিজে কাঁথা বদলে শুকনো কাঁথা বিছিয়ে দিত। যদিও ছেলেকে শোয়াতো দেওয়াল ঘেঁষে, মাঝে থাকতো স্নিগ্ধা, এ পাশে অখিলেশ। মেয়ে অনুশ্রীর বেলাতেও একই ঘটনা। এখন অবশ্য মেয়ে আলাদা ঘরে থাকে আর ছেলে থাকে ড্রয়িং রুমে।

গোধূলির সূর্য অখিলেশকে কোন সূত্র না জানিয়েই অনেক ক্ষণ আগেই বিদায় নিয়েছে। ঢেকে রাখা রাতের খাবার একা একাই খেতে হয়েছে অখিলেশকে।ছেলেটা বোধ হয় এখনও কম্পিঊটারে গেম খেলছে , তরবারির আঘাতে আহত হওয়ার তীব্র আর্তনাদের শব্দ ভেসে আসছে মাঝে মাঝে। মেয়েটি সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছে। ওরাও কি টের পায় বাবা-মায়ের সম্পর্কের ওঠা-পড়া? ইদানিং ওদের কথা-বার্তাতেও কেমন যেন অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করছে অখিলেশ। সুজয় সেদিন বলছিল, 'দেখো বাবা, কোন্ দিন আমি মায়ের মোবাইলটা আছাড় মেরে ভেঙে ফেলবো, সেদিন যেন আমাকে দোষ দিও না।' অনুশ্রী মায়ের ন্যাওটা ছিল, ইদানিং সেও যথা-সম্ভব মাকে এড়িয়ে চলে।

সুমিতা আমাকে প্রায়ই ফোন করে। সে এখন নার্সিং ট্রেনিং নিয়ে সরকারি হাসপাতালে নার্সের চাকরি পেয়েছে। মা আর ভাই-বোনদুটির দায়িত্ব তার কাঁধে। ফোনেই সেদিন বলেছিলাম, তোর বিয়ের নেমন্তন্ন থেকে আর কতদিন বঞ্চিত রাখবি?

সুমিতা বলেছিল, আমার কথা ছাড়ো কবিরুলদা, তোমার বন্ধু অখিলেশদার খবর কি?
-- আচ্ছা, তুই যতবার আমাকে ফোন করিস ততবারই শুধু অখিলেশের কথা জানতে চাস, তাহলে সরাসরি অখিলেশকেই তো ফোন করতে পারিস?
-- না না কবিরুলদা, অখিলেশদা এখন বিবাহিত, বউ যদি কিছু ভেবে বসে?
-- আমিও তো বিবাহিত?
-- তোমার ব্যাপারটা আলাদা। বৌদিকে তো আমি চিনি, আমাকে নিজের বোনের চেয়েও বেশি ভালবাসে।
-- কেন স্নিগ্ধা-বৌদি তোকে ভালবাসে না?
-- তার সঙ্গে তো আমার আলাপই নেই। জানোতো অখিলেশদার বিয়েতেও আমি যেতে পারিনি।শুধু কলেজেই যা দেখেছি, অসাধারণ সুন্দরী, কিন্তু আলাপ করার সাহস হয়নি কোনদিন। যাক গে, গত সপ্তায় অখিলেশদার সাথে রাস্তায় দেখা হয়েছিল, কেমন যেন গম্ভীর অন্যমনস্ক, উস্কো-খুস্কো চুল, জিজ্ঞেস করতেই বললো, 'ওসব কিছুনা, অফিসে খুব কাজের চাপ তো তাই।' বলো না কবিরুলদা, অখিলেশদার বাড়িতে কি কিছু হয়েছে? শুধু তোমাকেই তো অখিলেশদা সব কথা বলে।
-- অখিলেশ হ্যাজ বিন আনডান সুমিতা, রং চয়েস, রং চয়েসের মাশুল দিতে হচ্ছে এখন ওকে, জাঁদরেল পুলিশ অফিসারের স্বেচ্ছাচারী মেয়েকে বিয়ে করে ভিতরে বাইরে ও নিঃস্ব হয়ে গেছে। সব সময় কেমন বিড় বিড় করে আপন মনে, ওর ছেলে-মেয়ে দুটিও বোধ হয় মানিসিক রোগের শিকার, কেমন যেন অ্যাবনর্মালি বিহেভ করে।আমি অবাক হই, স্নিগ্ধা এক দিকে স্বেচ্ছাচার চালিয়ে যাচ্ছে, আবার অন্যদিকে অখিলেশকেও রেহাই দিতে চাইছে না, জানিস তো এখন আইন বউদের পক্ষে, কিছু বলতে গেলেই টু নাইন্টি এইটের ভয় দেখায়।
-- এ কি বলছো তুমি কবিরুলদা? অখিলেশদার মতো একটা মানুষের এই অবস্থা?" সুমিতার গলার আওয়াজ বুজে আসে, ও যে কাঁদছে স্পষ্ট বুঝতে পারি । ওকে শান্ত্বনা দিয়ে বলি," আচ্ছা সুমিতা, আমি আর তুই মিলে অখিলেশের জন্য কিছু করতে পারি না?

* * *

অখিলেশ ঘরে ঢুকে দেখে খাটের মাঝখানে পাশবালিশ, ওপাশে দেওয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে স্নিগ্ধা। ছেলের ঘর থেকে এখনও আর্তনাদের শব্দ ভেসে আসছে।
ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে নেমে আসে অখিলেশ। গত পরশু মেজদা ফোন করেছিল, মায়ের শরীরটা খুব খারাপ। স্নিগ্ধাকে বলেছিল, চলো গ্রামের বাড়িতে গিয়ে মাকে একটু দেখে আসি।" স্নিগ্ধা বলেছিল, "আমার এক বান্ধবীর জন্মদিন আজ। আমাকে আজ সারাদিন সেখানেই থাকতে হবে, ফিরতে রাত হবে, তোমাকেও গ্রামের বাড়িতে যেতে হবে না, ছেলেমেয়েদুটোকে দেখো।" অখিলেশ বলতে যাচ্ছিল, প্রতি সপ্তাতেই তোমার কোন না কোন বান্ধবীর বাড়িতে অনুষ্ঠান থাকে? কিন্তু বলতে পারে নি।বললেই এটা-সেটা ভাঙ্গচুর শুরু করে দেবে। অশান্তি আর ভাল লাগে না।

অথচ মায়ের কত স্বপ্ন ছিল তাকে ঘিরে।তিন ভাইয়ের মধ্যে সে-ই ছিল মেধাবী।বৌদিরা মাকে তেমন যত্ন-আত্তি করে না।মা বলতো, তুই চাকরি পেলে আমি নিজে পছন্দ করে বউ আনবো, দেখবি সে আমাকে নিজের মায়ের মতোই দেখবে।তোর বাবা কষ্ট করে হলেও তিন ছেলের জন্য তিনখানা ছাদ দেওয়া ঘর বানিয়ে দিয়ে গেছে, বিয়ের পর যেন গ্রাম ছাড়িস না বাবা। হাজার হোক বাপের ভিটে। বড় রাস্তাও তো কাছে, তোর আপিসে যাতায়াতে কোন অসুবিধে হবে না।"
কিন্তু স্নিগ্ধাকে কিছুতেই বো্ঝানো যায় নি, নাক সিঁটকে বলেছিল,এর চেয়ে শহরের ভাড়া-বাড়ি শত গুণ ভাল।

রাস্তা দিয়ে হাঁটতে থাকে অখিলেশ। রাস্তার পাশে একটা শান-বাঁধানো গাছের তলায় বসতেই পকেটের মোবাইলটা কেঁপে ওঠে। এত রাতে আবার কে ফোন করলো? অন্যমনস্কভাবে ফোনটা রিসিভ করে কানের পাশে ধরে অখিলেশ।গলাটা খুবই চেনা। এ এমন একখানি গলা একমাত্র যে গলা শুনলে তার বিড় বিড়ানি থেমে যায়, দখিনা বাতাস বুকটাকে শীতল করে।
--"অখিলেশদা, ঘুমাও নি এখনও? ঠিকই অনুমান করেছিলাম, ঘরেও নিশ্চয় নেই, ঠিক নিচে নেমে রাস্তার ধারে বসে আছো একা একা?

অখিলেশ চমকে ওঠে। সুমিতা কি আশেপাশে কোথাও লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে ফোন করছে?

-- অবাক অচ্ছো বুঝি? ভাবছো আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি? য়াজ্ঞে না, আমি আমার শোবার ঘর থেকে তোমাকে ফোন করছি। শুনলাম আমার মা নাকি আমাকে বোঝানোর দায়িত্ব তোমাকে দিয়েছে? কিন্তু জেনে রাখো, যতই বোঝাও বিয়ে আমি করছি না।

-- কিন্তু তোমার মা যে ছেলেটিকে তোমার জন্যে ঠিক করেছে সে তো খুবই সুপাত্র, শুনেছি আমার চেয়েও বড় চাকরি করে, আমার চেয়েও হ্যাণ্ডসাম?

-- ঠিকই শুনেছো, কিন্তু আমি তাকে যে ঠকাতে পারবো না।

-- মানে?

-- মানে আর কি, আমার মনটা যে অন্য একজন চুরি করে বসে আছে।

-- তাই বুঝি? তা সেই ভাগ্যবানটা কে শুনি?

-- যদি বলি তুমি।

-- এ কি বলছিস সুমি? এ যে শোনাও পাপ, আমার বউ-বাচ্চা আছে জেনেও এ কথা বলতে পারলি? সবাই যে আমাকে ছি ছি করবে?

-- অখিলেশদা, আমি সব শুনেছি কবিরুলদার কাছে, এভাবে সম্পর্কের লাশ কোলে নিয়ে পড়ে থাকতে থাকতে তুমি শেষ হয়ে যাচ্ছো অখিলেশদা, মর্যাদা-খোয়ানোর ভয়, মিথ্যা মামলার ভয়, ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যত নষ্ট হওয়ার ভয় তোমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। এত ভয় নিয়ে বেঁচে থাকা যায় না অখিলেশদা, শোনো নি 'যো ডর গয়া উও মর গয়া'? এবার একটু সাহসী হও, দেখবে জীবন কত সুন্দর, সত্যের ওপর ভরসা হারিও না, মিথ্যে সাময়িক বিড়ম্বনা দেবে হয় তো, পরিণামে সত্যমেব জয়তে ...

-- গোধূলির সেই পশ্চিম আকাশটা এখন ঝকঝকে পরিস্কার, একটু আগেও পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘের বদলে অকালের ঘন কালো মেঘটা ঢেকে রেখেছিল আকাশটা, হঠাৎই যেন ঘুম ভাঙলো শরতের , খালপাড়ের কাশবন থেকে বাতাস এসে মেঘটাকে সরিয়ে দিল, শরদিন্দু উচ্ছল হাসিতে মুঠো মুঠো মুক্তো ছড়িয়ে দিল পশ্চিম আকাশে ...
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন