বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ জানুয়ারী ১৯৭৪
গল্প/কবিতা: ২৪টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৭১

বিচারক স্কোরঃ ২.৭১ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২ / ৩.০

চাঁদও অপেক্ষায় রাখে

এ কেমন প্রেম? আগস্ট ২০১৬

ভাবতে গিয়ে দিন চলে যায়

রহস্যময়ী নারী জুলাই ২০১৬

সেই দুটি চোখ

ফাল্গুন ফেব্রুয়ারী ২০১৬

দেশপ্রেম (ডিসেম্বর ২০১৩)

মোট ভোট ২০ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৭১ কঙ্কালপুরের কাহিনী

সহিদুল হক
comment ৮  favorite ০  import_contacts ৫০৬
মুদিখানার ধীরেন সাহা বললো, নুন তো নেই, কাল রাতে সুভাষদারা সব তুলে নিয়ে গেছে।
--য়্যাঁ? সে কিগো ! পুরো বস্তা? এত নুন নিয়ে সুভাষদারা করবে কি শুনি?
--সে খবরে তোমার কাজ কি?
--বা রে, কাজ নেই? রাঁধতে গিয়ে দেখি নুন বাড়ন্ত, ছুটে এলুম তোমার দোকানে, এখন বলছো নুন নেই, ওদিকে কর্ত্তা গেছে মাঠে হাল দিতে, ভাত নিয়ে যেতি হবে তার লেগে, কী যে করি, দেখি জীতেন কাকুর দোকানে পাই কি না।
--এ তল্লাটের কোনো দোকানে নুন পাবে না গো।
য়্যাঁ? কেন কি হয়েছে? নুনের আকাল পড়েছে বুঝি!অন্য অনেক জিনিসেরই আকাল পড়ে শুনিচি, নুনের আকাল পড়ে এই পেত্থম শুনলুম।
-- আরও কত কি শুনবে ! গলা নামিয়ে ভয়ার্ত ফিসফিসানি গলায় বীণাপাণির কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ধীরেন সাহা বললো, এই সুভাষদারা য্যাদ্দিন খ্যামতায় থাকবে ত্যাদ্দিন এমন অনেক আজব খবর পাবি।
--কিন্তু তুমিও তো শুনিচি সুভাষদাদের দলকেই ভোট দ্যাও?
-- দেই কি আর সাধে?বউ-বাচ্চা নিয়ে ঘর করতি হয় যে ! দেখেছো তো চটের পাশে ওদের একজন লোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে কে কাকে ভোট দিচ্ছে?বিরোধীদের ভোট দিলে ঐ জয়ন্তদের মতো অবস্থা হবে যে!
--কেন জয়ন্তদের কি হয়েছে?
--সে কী গো ! শোনো নি ? কাল রাতে জনা দশেক বসে বাড়ির ছাদে মিটিং করছিল।সুভাষদারা অস্তর-শস্তর নিয়ে ওদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বেচারারা ছুটে পালিয়ে কেউ ঝোপের আড়ালে, কেউ কারও বাড়িতে গিয়ে লুকিয়েছিল। ওরা পিছনে ধাওয়া করে সেখান থেকে টেনে বার করে কাউকে কুপিয়ে কাউকে গুলি করে মেরেছে গো!
--য়্যা সে কি গো! কোনো মানুষ এমন করতে পারে ? আমার দাদা বলে, এখন তো আমরা স্বাধীন, ইংরেজরা চলে গেছে, অনেক রক্তের বিনিময়ে নিজেদের শাসন ফিরে পেয়েছি আমরা। এখন মানুষই ঠিক করবে কে সরকার চালাবে। যে কোনো দল করার অধিকার আছে আমাদের।অবিশ্যি সেই দলকে নাকি দেশের সংবিধান মেনে চলতি হবে।
--তোমার দাদা বুঝি পার্টি করে?
-- হ্যাঁ, বিরোধী দলের মস্ত নেতা।
-- তুমি সাবধানে থেকো, ওরা জানতি পারলি ----।
--কেউ হয়তো সামান্য বেঁচে ছিল,কিন্তু মরা-আধমরা সবাইকে গরুর গাড়িতে তুলে কংসাবতীর পাড়েনিয়ে গিয়ে মাটিচাপা দিয়ে দিয়েছে শুনলুম।" গলা আরও নামিয়ে ধীরেন সাহা বলে,সেই জন্যিই তো নুনের এত আকাল!
-- কেন নুন দিয়ে কি হবে?
--তাও জানো না? ঐ লাশগুলোর ওপর বস্তা বস্তা নুন ঢালে ওরা, যাতে গন্ধ না বেরোয়, আর মাংসগুলো যাতে তাড়াতাড়ি ঝরে যায়।
-- ও মাগো, মানুষ যে এত নিষ্ঠুর হতে পারে ভাবা যায় না!
-- এবার আমরাও বুঝি ওদের নিষ্ঠুরতার হাত থেকে ব্যঁচবো না। তুমি এখন যাও, তপন আসছে, সুভাষদার লোক।
-- হ্যাঁ যাই, দেখি এখন কি করি, মানুষটা নুন ছাড়া যে কিছুই খেতে পারে না গো।

হন্তদন্ত হয়ে বীণাপাণি বাড়ির দিকে রওনা দেয়। হঠাৎই এলোপাথাড়ি বোমা-গুলির আওয়াজ শুনতে পেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বীণাপাণি। না, আওয়াজগুলো অনেক দূর থেকে আসছে। বেশ কদিন ধরে বৃষ্টি হয়নি, রাস্তার কাদাগুলো সাইকেলের চাকা আর মানুষের পায়ের ছাপ নিয়ে শুকিয়ে আছে। আকাশের দিকে তাকায় বীণাপাণি, বেলা দশটার কম হয়নি। তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে বাড়ির উঠোনে পা দিয়েই হাঁক পাড়ে, " মা মণি--, মা মণি--।"
কোন সাড়া-শব্দ নেই। মেয়েটা এখনও ফেরেনি ? আবার রাস্তায় বেরিয়ে আসে বীণাপাণি। দূরের বুড়ো বট গাছটার কাছে রাস্তাটা বাঁক নিয়েছে, সেদিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটা সাইকেল চালিয়ে লালগড়ের বাজারে পড়তে যায়। আরিফুল ইসলাম নামের একটা ছেলে সেখানে ঘর ভাড়া নিয়ে ছাত্র পড়ায়।
*

মা মণি আরিফুলকে জিজ্ঞেস করে , আচ্ছা দাদা, তুমি তো অনেক লেখাপড়া শিখেছো, তোমার রেজাল্টও তো শুনেছি আমাদের স্কুলের অনেক টিচারের চেয়েও ভাল, তা হলে চাকরি পাওনি কেন?
-- সরকারী পার্টির ধামা-ধরা না হলে চাকরি পাওয়া মুশকিলরে। তা ছাড়া চাকরি পাওয়ার জন্যে সেভাবে চেষ্টাও করিনি। এই সরকারের অধীনে চাকরি করতে মন থেকে সায় পাই না।
-- সে কি কথা! মানুষ চাকরি পাওয়ার জন্যে কত কী না করছে, আর তুমি বলছো ---
-- জানিসতো নেতাজী সুভাষ আই সি এস পরীক্ষায় পাশ করেও চাকরি নেননি, দেশের জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন !
-- সে তো ইংরেজ আমলে। এখন তো আমরা স্বাধীন।
-- সত্যিই কি স্বাধীন? ঐ শুনতে পাচ্ছিস না বোমা-গুলির আওয়াজ? যে জন্য তোরা এখন বাড়ি ফিরতে পারছিস না। এই কি স্বাধীনতা?
-- হ্যাঁ, সত্যিই তো। মা ভীষণ চিন্তা করবে।
-- এই যে তোরা এত কষ্ট করে পড়তে আসছিস, কী শিখছিস বলতো? এমন সিলেবাস করা উচিত যাতে ছেলেমেয়েদের মনে দেশপ্রেম জাগে, দেশের একজন সৎ ও সুযোগ্য নাগরিক হয়ে উঠতে পারে।সে সব হচ্ছে কই? চারিদিকে শুধু হিংসা আর হানাহানি। মানুষকে মানুষের শত্রু বানানো হচ্ছে। আর ইংরাজি শিক্ষার কি অবস্থা করেছে বলতো! গ্রামার ছাড়া কি ভাষা শেখা যায়? সেই গ্রামারটাই তুলে দিয়েছে এই সরকার। এ যেন চাবি ছাড়াই তালা খোলার চেষ্টা। আসলে এ সবই অশুভ পরিকল্পনার অঙ্গ। মানুষকে অজ্ঞ করে রাখতে পারলে ওদের সুবিধা।কিন্তু সত্যিকে তো আর বেশিদিন চাপা দিয়ে রাখা যায় না। বিশেষ করে পাড়ায় পাড়ায় টি ভি-খবরের কাগজ পৌঁছে যাওয়ার ফলে ওদের আসল রূপ ধীরে ধীরে মানুষের কাছে ধরা পড়ছে। তোরা শিক্ষক-দিবসের দিন আমাকে যে ডায়েরিটা উপহার দিয়েছিলি তাতে কয়েকটা কবিতা লিখেছি।শুনবি?
ঘরের পঁচিশ জন ছাত্র-ছাত্রীই সমস্বরে বললো, হ্যাঁ দাদা শুনবো।আরিফুল টেবিলের ড্রয়ার থেকে ডায়েরিটা বার করে পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে একটা জায়গায় থামে, তারপর বলে, যে দিন সন্ধিগ্রামে পায়ে হাওয়াই চপ্পল-পরা গায়ে পুলিশের উর্দি-পরা শাসক-দলের ক্যাডাররা পুলিশের সঙ্গে মিলে জমি-বাঁচাও আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নিরীহ নিরস্ত্র গ্রামবাসীদের উপরে গুলি চালালো সেই দিনের ঘটনা উপলক্ষেই এই কবিতা। তোরা তো জানিস, পুলিশি অভিযানের আগে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী যিনি আবার পুলিশ বিভাগেরও মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, পুলিশ যেখানে বাধা পাবে সেখানেই অবস্থান করবে, জোর করে ঢুকবে না।গ্রামবাসীরা রাজ্যের অভিভাবকের সেই কথায় আস্থা রেখে নিজেদের ভিটে-জমি রক্ষা করার শপথ নিয়ে নিরস্ত্র মহিলা ও শিশুদের প্রতিবাদ মিছিলের সামনে এগিয়ে দিয়েছিল, যাতে পুলিশ-বাহিনীর দয়া-মায়া জাগ্রত হয়।অথচ সেদিন যা অত্যাচার হলো, ইংরেজরাও বুঝি অত অত্যাচার করেনি। আমি মনে করি সর্বদা সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরে থাকা আমাদের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর ইঙ্গিত ছাড়া কোন পুলিশ-কর্তাই অত বড় ঘটনা ঘটানোর সাহস দেখাতো না।যাই হোক, কবিতাটা তাহলে পড়ি?
সকলে সমস্বরে বললো, হ্যাঁ দাদা।আরিফুল কবিতাটা উদাত্ত কণ্ঠে পড়তে শুরু করে-
সফেদ লেবাস আর অমৃত ভাষণ
হ্যামলিনের বাঁশির মতো এতদিন
তোমাকে করেছে তার অনুসারী;
আজও কি কাটেনি তোমার সে আচ্ছন্নতা?
মায়া চোখের ছায়া সরিয়ে দেখো--
কালো পোশাকটাই এতদিন সাদা লেগেছে তোমার চোখে।
এক কুশলী যাদুকর অথবা এক মায়াবী রাক্ষস
দিনের আলোয় যার ভুবন-মোহিনী রূপ
মানুষকে কাছে টানে, যার বচনামৃত পান করে
জ্ঞানী-গুণীরাও বাহবা দেয়, রাতের অন্ধকারে
তারই নির্দেশে নররাক্ষসেরা কৃষকের শিরোচ্ছেদ করে
কৃষক-রমণীর ইজ্জত নেয়,শিশুদের দু পা ধরে চিরে
পাশবিক উল্লাসে মেতে ওঠে। তুমি টিভির পর্দায়
সেই নৃশংসতার দৃশ্য দেখো, অথবা সংবাদপত্রে
তার বিবরণ পড়ো, গরিবের মঁসিহার হাতে গরিবের
এই লাঞ্ছনায় তুমি ব্যথিত হও যতটা বিস্মিত হও
আরও বেশি, কিন্তু ভেবে দেখো, এতে বিস্ময়ের
কিছু নেই, তুমিই একদিন উজাড় করে দিয়েছো তাকে ক্ষমতা,
তোমারই দেওয়া সে ক্ষমতার এহেন প্রয়োগ।

তাই আজ আর নীরব দর্শক অথবা
নীরব পাঠক হয়ে থাকা নয়,এসো প্রতিবাদ করি।
তুমি তো জানো ,হিংস্রতার বিরুদ্ধে
জোটবদ্ধ প্রতিরোধই একদিন মানুষের
উত্তরণ ঘটিয়েছিল আদিমতা থেকে মানবতায়।
তাই আজ আর মুমূর্ষু রোগীর মতো
নলবাহিত অক্সিজেন নয়,এসো
খোলা আকাশের নিচে দাঁড়াই,
ফুসফুস ভরে গ্রহণ করি মুক্ত বাতাস।

আজ আর কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো
বিচ্ছিন্ন মতবাদে নিজেকে বন্দি রাখা নয়,
ই্জমের বাধকতা থেকে বেরিয়ে,
এসো মানবতাবাদে দীক্ষা নিই;
আজ আর কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নয়,
ছোটো ছোটো স্বার্থ-বাসনা জলাঞ্জলি দিয়ে
এসো রুখে দাঁড়াই।
উলঙ্গ রাজার সেই সাহসী শিশুটির মতো
আসল রূপটা টেনে বার করি।
আজ আর কোনো নেতা-নেত্রী বা
গুরু-পীরের ডাকে নয়,
এসো বিবেকের ডাকে সাড়া দিই।

কবিতাটা পড়ার পর ছাত্রছাত্রীদের তাকাতেই সবাই বলে ওঠে, আরও একটা পড়ো দাদা।
বাইরে বোমা-গুলির আওয়াজটা আরও তীব্র হয়েছে। মনে হচ্ছে কপালে লাল ফেট্টি বাঁধা মুখে কালো কাপড় জড়ানো বাইক-বাহিনী আরও কাছে এসে পড়েছে। এই অবস্থায় ছাত্রছাত্রীদের চলে যেতে বলা যায় না।
আরিফুল ডায়েরির অন্য একটা পাতা খুলে আরও একটা কবিতা পড়তে শুরু করে -
দেশপ্রেম আজ এলাকা দখলের লড়াই
দেশপ্রেম আজ মিথ্যা প্রতিশ্রুতির বড়াই
দেশপ্রেম আজ ভোটের বাক্সে বন্দি
দেশপ্রেম আজ আখের গোছানোর ফন্দি
দেশপ্রেম আজ জনতার মুখে ললিপপ গুঁজে
ক্ষমতার স্বাদ নেওয়া
দেশপ্রেম আজ ভাইয়ে ভাইয়ে লড়াই বাধিয়ে
সব কিছু লুটে নেওয়া।

কবিতা পড়া থামিয়ে আরিফুল ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে বলে, ক্ষুদিরাম, নেতাজী সুভাষ, বিনয়-বাদল-দীনেশ, বাঘা যতীন, সূর্য সেন,মীর নিশার আলির এই বাংলায় আরও এক সংগ্রামের বড় প্রয়োজন। স্বাধীনতা আজ গুটি কয়েক মানুষের হাতে বন্দি। ছিনিয়ে নিতে হবে আবার তা।করতে হবে আরও এক স্বাধীনতা আন্দোলন। দেশ-মাতৃকাকে করতে হবে মুক্ত এই ক্ষমতালোভী নয়া শোষকদের হাত থেকে।স্বাধীনতার সুফল পৌঁছে দিতে হবে আম জনতার হাতে।
গোলাগুলির আওয়াজটা আর শোনা যাচ্ছে না।আরিফুল বললো, তোরা এবার যা। বাড়ির লোক চিন্তা করছে। সাবধানে যাস সবাই।

মামণি ব্যাগটা সাইকেলের কেরিয়ারে আটকে সাইকেলে উঠে পড়ে। বেশ জোরে জোরে প্যাডেল ঘোরায়। না জানি মা কত কি চিন্তা করছে। স্বরূপদার সঙ্গে তার সম্পর্কটা মা অবশ্য ভালভাবেই নিয়েছে। ছে, দেখিস সামনে তোর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা, বেশি বাড়াবাড়ি করিসনে। স্বরূপদা অবশ্য একটু বাড়াবাড়ি করতে চেয়েছিল। বলেছিল, "তোমার কোনো ক্ষতি হবে না, আজিকাল বার্থ কন্ট্রোলের কত কিছু বেরিয়েছে।" সেও অবশ্য জানে। বান্ধবীদের কাছে সব শুনেছে। বীণা তো ওর বয়ফ্রেণ্ডের সঙ্গে রোজই প্রায়--। কিন্তু স্বরূপদা আজকাল সব সময় কেমন যেন মনমরা হয়ে থাকে। জিজ্ঞেস করে জেনেছে, যতীনবাবুর বাড়িতে কদিন ধরে যারা ঘাঁটি গেড়েছে তারা নাকি শাসিয়ে গেছে, তাদের সশস্ত্র শিবিরে যোগ না দিলে পরণতি ভাল হবে না। গত কালই মেসেজ পাঠিয়ে জানালো, "তোমাকে বুঝি আর আমার পাওয়া হবে না।" না স্বরূপদা না, ও কথা আর লিখো না, তোমাকে ছাড়া আমি যে বাঁচবো না গো।
দূর থেকে মাকে দেখতে পেল মামণি। বুড়ো বটগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে আছে।

মেয়েকে ভাত বেড়ে দিয়ে পাখার বাতাস করতে থাকে বীণাপাণি। এমন শীতের দুপুরেও কী রকম গরম পড়ছে দেখেছিস?
-- কই আমারতো তেমন গরম লাগছে না। ঐ দেখো মা, বাবা ফিরে আসছে, তুমি ভাত নিয়ে যাওনি?
--নুন আনতে গিয়ে দেরি হলো। তাছাড়া তুই আসছিস না দেখে--
জীবন ঘড়াই ঘরের দাওয়ায় উঠেই বীণাপাণিকে বলে, আর বুঝি সুখে শান্তিতে থাকতে দেবে না ওরা।মাঠে সুখেন বলছিলো কাল রাতে নাকি সব বাড়িতে গিয়ে ওরা শাসিয়েছে, বলেছে সব জোয়ান ছেলেকেই অস্ত্র-শিক্ষা নিতে হবে আর মেয়েদের ওদের জন্য রান্না করে দিয়ে আসতে হবে।এ কি মগের মুলুক? আমরা কি সমাজ-বিরোধী গুণ্ডা যে অস্ত্র-শিক্ষা নিতে হবে? এর একটা প্রতিবাদ হওয়া দরকার। আজ রাতে হরি মন্দিরের সামনের উঠোনে গ্রামের সবাই বসা হবে।

গ্রামের প্রায় সব পুরুষ মানুষ জমা হয়েছে মন্দির-চত্বরে।ধীরেন পাত্রকে গ্রামের সবাই মান্য করে।তিনি বললেন, শুনলাম পশ্চিম পাড়ার সব বাড়ি থেকে ওরা জোর করে চাল-ডাল-তেল-সবজি আদায় করে নিয়ে যাচ্ছে কদিন ধরে। আমাদের পাড়াতেও আজ সকালে বলে গেছে সবকিছু ওদের ডেরায় পৌঁছে দিতে হবে।মেয়েদের গিয়ে রান্না করে দিয়ে আসতে হবে।
পশ্চিম পাড়ার অবনী ঘড়াই বললো, তুমি ঠিকই শুনেছো ধীরেন দা, তাও আমরা মুখ বুজে মেনে নিয়েছিলুম, কিন্তু আমরা কারও সাতে-পাঁচে নেই, দিব্যি খেটে-খুটে চাষ-বাস করে সংসার চালাচ্ছি, আমাদের জোয়ান ছেলেরা কেন অস্ত্র-শিক্ষা নেবে? এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।শাসক দলের ক্যাডার বলে যা খশি তাই করবে?
ধীরেন সাহা বললেন, এ সব মুখ বুজে মেনে নেওয়া যায় না।চলো সবাই মিলে ওদের কাছে জানতে চাই, ওরা কী চায়?
গুরুপদ ঘড়াই বললো, কী আর চাইবে, সামনে ভোট আসছে, সন্ত্রাস করে বিরোধীদের নিকেশ করে এলাকার দখল নিতে চাইছে।এর পিছনে ওদের বড় বড় নেতা-মন্ত্রীর হাত আছে।
গ্রামের জোয়ান ছেলে স্বরূপ বলো, তা বলে ভয় পেয়ে ঘরে বসে থাকলে তো চলবে না।চলো সবাই মিলে ওদের কাছে যাওয়া যাক। দরকার হয় ওদের নেতাদের সঙ্গে আমরা আলোচনা করবো। জানতে চাইবো কেন আমাদের নিজেদের ইচ্ছা মতো বাঁচতে দেওয়া হবে না।
সকলে সমস্বরে বলে উঠলো, ঠিক বলেছে স্বরূপ।
রাতটা শলা-পরামর্শ করেই কেটে গেল। সকাল হতেই সকলে মিলে ধুলো-ভরা রাস্তার দুধারে পুকুরে ভেসে থাকা কলমির গন্ধ নিতে নিতে, রাস্তায় ছুটে আসা মুরগির ছানাদের গা বাঁচিয়ে, দোয়েল-শ্যামার কাকলি শুনতে শুনতে এগিয়ে চলে জতীনবাবুর বাড়ির দিকে।মাঠের মাঝখান দিয়ে যাওয়া বিদ্যুতের তারে বসে নীলকণ্ঠ পাখি তাদের দেখে আনন্দে না বিষাদে কে জানে লেজ নাড়িয়েই চলে।

জতীনবাবুর দোতলা বাড়ির কাছাকাছি আসতেই বাড়িটা থেকে উড়ে আসতে লাগলো ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি। একটা গুলি লাগলো গৌরব ঘড়াইয়ের বুকে। প্রাক্তন সৈনিক মুক্তিপদবাবু ছুটে গেলেন ছেলের কাছে।তিনি জানেন, বুকে গুলি লাগলে কেউ ব্যঁচে না। তবু নাড়ি টিপতে লাগলেন ছেলের। মনে হলো যেন নাড়ি চলছে।বুকে হাত দিলেন, মনে হল যেন ধক ধক করছে। কোথা থেকে গৌরবের স্ত্রী ছুটে এসে নিথর স্বামীর বুকে লুটিয়ে পড়ে আর্তনাদ করে উঠলো। মুক্তিপদবাবু বুঝলেন, ছেলেটা তাঁকে ফাঁকি দিয়ে সত্যি সত্যিই বিদায় নিয়েছে চিরতরে তাঁরই চোখের সামনে।
স্বরূপ ছিল সামনের দিকেই। একটা গুলি এসে লাগলো তার পেটে। অমিত পাত্র ছুটে গেলেন ছেলের কাছে। চোখের সামনে ছটফট করতে করতে জোয়ান ছেলেটা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো।
বীণাপাণি তখন গোবর জমাচ্ছিল।গুলির শব্দে ছুটে যায় যতীনবাবুর বাড়ির দিকে। মামণির বাবাটাও যে ওখানে রয়েছে। বীণাপাণিকে দেখে কে একজন বললো, দে দে এই মেয়েছেলেটাকেও শেষ করে দে। তারপরেই গুলি, মাথার খুলিটা দুভাগ হয়ে উড়ে গেল।
আরও কত যে আহত-নিহত হলো তার হিসাব কে রাখে!মামণি স্বরূপের মৃতদেহটা দেখলো তারপর মায়ের দুভাগ হয়ে যাওয়া খুলিটার দিকে চোখ পড়তেই জ্ঞান হারালো।
*

মামণি ঘড়াইয়ের আজ সকাল সকাল ঘুম ভেঙে যায়।আরিফুলদার স্বপ্ন বুঝি সত্যি হতে চলেছে।সেদিনের সেই নৃশ্ং ঘটনার বিরুদ্ধে সারা দেশের মানুষ ভয়-ডর উপেক্ষা করে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে।এবার সকলে ভোট দিয়েছে গণতন্ত্রের পক্ষে। দীর্ঘ চৌত্রিশ বছরের হিটলারি শাসনের এবার বুঝি অবসান ঘটতে চলেছে। আরিফুলদা বলেছে, গণ মানে মানুষ। তাহলে মানুষের শাসন কি প্রতিষ্ঠিত হবে এবার? কদিন ধরেই টিভির খবরে দেখছে, সাড়ে তিন দশক ধরে জমিয়ে রাখা রাশি রাশি কঙ্কাল উদ্ধার হচ্ছে প্রায় প্রতিদিনই। শুয়ে শুয়েই মামণি জানালা দিয়ে দেখতে পায়, সূর্যটা আজ যেন বড় বেশি উজ্জ্বল। আরও আশ্চর্য হয়ে যায়, সামনের চারণ-জমিটার রক্তে রাঙানো ঘাসগুলোর সব লাল রঙ শুষে নিচ্ছে নতুন সূর্য, ধীরে ধীরে ঘাসগুলো আবার সবুজ হয়ে উঠছে। আনন্দে বিছানায় উঠে বসে মামণি।
স্বরূপদা, তুমি দেখে যেতে পারলে না এই স্বাধীনতা। তুমি না আমাকে ছুঁতে চেয়েছিলে? এই তো আমি, হাতটা একটু বাড়াও না গো, বাড়াও না আর একটু...।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • মোঃ আক্তারুজ্জামান
    মোঃ আক্তারুজ্জামান অনেক সুন্দর গল্প। ভাবনাকে বাস্তবতার কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা সার্থক হয়েছে।লেখকের প্রতি অনেক অনেক ধন্যবাদ।
    প্রত্যুত্তর . ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৩
  • মোঃ মহিউদ্দীন সান্‌তু
    মোঃ মহিউদ্দীন সান্‌তু অসাধারন একটা গল্প, ভালো লেগেছে খুব।
    প্রত্যুত্তর . ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৩
  • সূর্য
    সূর্য দারুন জমজমাট গল্প। বেশ ভালো লাগলো।(পুনশ্চ: চৌত্রিশ বছরের গল্পতো পড়লাম। তার পরের পাঁচবছর নিয়ে একটা গল্প পড়ার আকাঙ্খা জানিয়ে রাখলাম, নইলে যে আপেক্ষিকতা থেকে যাবে...)
    প্রত্যুত্তর . ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৩
    • সহিদুল হক সঙ্গত আকাঙ্খা,অবশ্যই পূরণ হবে ইনশা আল্লাহ! আন্তরিক ধন্যবাদ সুন্দর মন্তব্যের জন্য।ভাল থাকুন নিরন্তর।
      প্রত্যুত্তর . ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৩