বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৮
গল্প/কবিতা: ১২টি

অভিসার

প্রেম ফেব্রুয়ারী ২০১৭

আঁধারে আমাকে থাকতে দাও

প্রেম ফেব্রুয়ারী ২০১৭

নিরুদ্দেশে বাটি চালান

কি যেন একটা জানুয়ারী ২০১৭

গল্প - কি যেন একটা (জানুয়ারী ২০১৭)

পাহারা ও নিভে যাওয়া হারিকেন

কাজী জাহাঙ্গীর
comment ১৫  favorite ০  import_contacts ২৪০
শহর ছেড়ে পালাতে পালাতে সবাই যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। একটা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে সবাই হন্যে হয়ে দিগ্বীদিক ছুটে চলেছে অহোরাত্রী। হানাদার বাহিনীর টহল এড়িয়ে শহুরে ফাঁকা রাস্তা পেরিয়ে এদিক ওদিক এখনো দু’চার জন লোক দৃষ্টিগোচরে আসে যারা জীবনের মায়া ছেড়ে দিয়েছে অথবা আশ্রয়ের শেষ সম্বল বাড়ীটার মায়া ছাড়তে পারেননি তাই পালা করে লুকিয়ে চুরিয়ে এগলি ওগলি করে হলেও বাড়ীটার দিকে নজর রাখছে কেউ কেউ। যদিও স্ত্রী সন্তান পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে গ্রামের কোন এক নির্জন পাঁড়া গাঁয়ে যেখানে দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারনে হয়তো হানাদার সৈন্যরা এখনো পৌছুতে পারেনি। তারপরও নিত্য আতংকে দিনাতিপাত করছে নিরস্ত্র বাঙালীরা।
মার্চের উত্তাল দিনগুলো পেরিয়ে যখন হানাদার বাহিনীর আক্রমনে রাজধানি ছাড়িয়ে বিভাগীয় শহরগুলোও আক্রান্ত হতে লাগলো সেই রকমই এক সময়ে দক্ষিণহালিশহর গ্রামের নিজের বাড়ীটা ছেড়ে কর্ণফুলী নদীর পূর্বপাড়ের দেয়াং পাহাড়ের কোলঘেষে জামতলী গ্রামের নানার বাড়ীতে স্ত্রী সন্তানকে রেখে আসতে যাচ্ছে আবুসালিক। নিজের সচ্ছল সংসারের সবকিছু ফেলে এসে স্ত্রীপুত্রের জীবন নিরাপদ করার আশায় বাচ্চাকে কোলে কাধে নিয়ে যখন কর্ণফুলীর বুকে ভেসে যাচ্ছিল সাম্পানের পাঠাতনে বসে, মনটা তখন ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছিল বারবার। তিল তিল করে উপার্জনের সবটুকু দিয়ে যে সংসার দাড় করিয়েছিল সেখানে সব কিছুই ছিল- সুন্দর পরিপাটি ছাউনি, গোলাভরা ধানের মন-মাতানো ঘ্রাণ আর পুকুর ভরা মাছ। সবকিছুই আজ বিশাল এক শুন্য হয়ে ধরা দেবে নিজের চোখের সামনে এ যেন কিছুতেই ভাবতে পারছেনা সালিক। সবচেয়ে বেশী ভয় হয় আগুন নিয়ে, হানাদার সৈন্যরা যেভাবে আগুন দিয়ে বাড়ীঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে সেই ভাবনাটা মনে আসতেই কি যেন একটা ঘটে যায় মস্তিষ্কের গোপন কুটিরে, যেন একতারার তারের মতই টিং করে ছিড়ে যায় অন্তরের তার আর হতাশার কালো হাত যমদুত হয়ে গলা আঁকড়ে ধরে সালিকের। তবুও স্ত্রী পুত্রের সামনে নিজেকে অনেক কষ্টে শক্ত করে রাখে সে কেননা তাদের সামনে সালিকই এখন একমাত্র ভরসা, তারতো ভেঙে পড়লে হয়না। এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে সালিক একটা সিদ্ধান্তে স্থির হতে চায়, স্ত্রী পু্ত্রদের নানার বাড়ীতে রেখে যেকোন প্রকারে ফিরে আসবে সে। গোলাভর্তি যে ধান রেখে এসেছে সেগুলো সে কিছুতেই হাতছাড়া হতে দিবে না। হানাদারদের মাত্রারিক্ত আক্রমনের কারনে যদিও পাহারাদলটা ভেঙে গেছে তবুও পরিস্থিতি বুঝে বাড়ী গিয়ে ধানগুলো বিক্রি করে হলেও জামতলীর বাজারে একটা অস্থায়ী ব্যবসা দাড় করিয়ে কিছু আয়-রোজগার করার ভাবনাটা মাথাটায় বড্ড পিন পিন করতে থাকে তার।
………..
নৌবাহিনীর ঘাঁটিটা দক্ষিণহালিশহর গ্রামেরই অংশ, তারপরে দু’চার গ্রাম ফেলে গেলেই পতেঙ্গা, যে এলাকায় রয়েছে বিমান ঘাটি সহ সামরিক স্থাপনা। তাই এ অঞ্চলের মানুষরা সেই র্মাচ থেকেই হানাদারদের আক্রমনের শিকার হতে শুরু করেছিল। এছাড়াও রয়েছে গ্রামে গ্রামে বিহারীদের চালিয়ে যাওয়া চোরাগোপ্তা হামলা, লুটপাট আর তুলে নিয়ে যাওয়ার আতংক। গ্রামের কিছু সাহসি লোকজন গ্রামের ভিতরে ঢুকার রাস্তাগুলোতে ঠেলাগাড়ী, গাছের গুড়ি ইত্যাদি ফেলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা চালালেও অস্ত্রধারীদের সাথে পেরে উঠেনা নিরস্ত্র গ্রামবাসী। শক্ত সামর্থ যুবকদের কেউ কেউ যুদ্ধে যাওয়ার আশায় গ্রাম ছাড়লেও অনেকে চলেগেছে আত্মগোপনে। অধিকাংশ বাড়ীতে শিশু বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা ছাড়া পুরুষ লোক না থাকায় গ্রামটাকে পুরুষ শুন্য হিসাবেও ধরা নেয়া যায়, যদিওবা রাতের বেলায় লুকিয়ে থাকা যুবকরা বেরিয়ে এসে সংঘঠিত হয়ে পাহারা বসায় লুটপাট হানাদার সৈন্যদের হামালা ঠেকানোর আশায়। এরই মধ্যে একদিন একদল পাকসেনা ঢুকে পড়ল সালিকদের বাড়ীতে। পুরুষ শুন্য বাড়ীতে সেদিন একজনই ছিলেন সালিকের বড় ভাই ছবির সাহেব। দরজায় টোকা পড়তেই মহিলাদের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ল, ঘরের শিশুরা তখন মশারীর নীচে ঘুমানো, সালিকে স্ত্রী আশ্রয় নিল ঘরের পেছনের দিকটায় কাঁচা পায়খানার পার্শ্ববর্তী ঝোপে। হানাদার সৈন্যদের চিৎকার চেচামেচিতে অগ্যতা ছবির সাহেব গলা খাকারি দিয়ে দরজা খুলতে গেলেন। সৈন্যদর হৈ হুল্লুড়ে মশারীর মধ্যে ইতমধ্যেই একজন কান্নাজুড়ে দিয়েছে।
-দরওয়াজা খুলনে মে ইতনা দের কিউ
দরজা খুলতেই এটা বলেই দু’ঘা লাগিয়ে দিলেন কমান্ডার। কিছু বলার সুযোগ পেলেন না ছবির সাহেব, তিনি তাকিয়েতাকিয়ে দেখলেন বাকী সৈন্যরা ঘরে ঢুকেই হাতাহাতি শুরু করে দিয়েছে। ছবির সাহেবের স্ত্রী ঘরেই ছিলেন, সলিকের কান্নারত ছেলেটার কান্না থামানোর চেষ্টা করতে লাগলেন তিনি মশারীর ভিতরে।কমান্ডার বলে উঠল
-নাম কেয়া হে তোমারা
- আবু ছবির
-অউর কউন কউন হে?
ছবির সাহেব মোটামুটি উর্দু/হিন্দী বুঝতেন এবং বলতেও পারতেন।
-হামারা বিবি বাচ্চে হে
ইতিমধ্যে তল্লাশির নামে বাকিরা ঘরের কাপড় চোপড় আসবাব সব তছনছ করে ফেলেছে। হঠাৎ একজন চিৎকার করে বলে উঠল
-সাব ইহাপে বমব হে,
ওটা বলতেই বাকীরা ছবির সাহেবের দিকে অস্ত্র তাক করে ধরল।সাথে সাথে কমান্ডার ছবির সাহেবের ঘাড়ের দিকে শার্টের কলার ধরে এক ধাক্কায় সিন্দুকটার দিকে নিয়ে গেল।
মাঝখানের ঘরটায় তখনকার দিনে ব্যবহৃত একটা পুরোনো চৌকোনা সিন্দুক রাখা ছিল, মাসের প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামাগ্রী রাখা থাকত ভিতরে আর সাথে কিছু কাপড় চোপড়। আর সিন্দুকের উপরে থাকত কাঁথা-বালিশ লেপ-তোষক। চাবিটা সিন্দুকের সাথে লাগানোই ছিল। তাই সৈন্যরা ঢাকনা উল্টে ভিতরে রাখা কাপড় চোপড় দ্রব্য সামগ্রী তছনছ করে এই ঘটনা ঘটায় । ছবির সাহেব বলে উঠলেন
-সাব, এটা বোম নেহি হে সাব। এটা কাপড়া ধোনে কা সাবান হে সাব।
-কিছ তারহা সাবুন ইয়ে দেখাও, বলেই কমান্ডার ছবির সাহেবকে ধাক্কা দিয়ে সিন্দুকের সামনে ফেলে দিল। সিন্দুকের কোনা একটা পলিথিনে মোড়া চট্টগ্রামের অতি পরিচিত বাংলা সাবানের গোল্লা(গোলাকার বলের মতন)হাতে নিতেই সবাই যার যার অস্ত্র তাক করে সটান হয়ে একটু তফাতে সরে গেল। পলিথিন থেকে বল সাবানটা বের করে ছবির সাহেব বলতে লাগলেন
-এই যে দেখেন সাব, ইয়ে সাবান হে, কাপড়া ধুনে কা।
ছবির সাহেবের মনে হল কেউ বিশ্বাস করছেনা তার কথা।সবাই অস্ত্র তাক করা অবস্থায় নিরুত্তর কয়েক মিনিট হতবাক হয়ে তার হাতের গোল্লা সাবানটার দিকে তাকিয়ে থাকল। হানাদারদের তাক করা বন্দুকের দিকে তাকিয়ে দেখে ছবির সাহেবও একটু ভড়কে গেলেন। যেকোন মুহুর্তে বন্দুকগুলো গর্জে উঠতে পারে তার বুকের উপর।ছবির সাহেব ভাবলেন এভাবে চুপসে গেলে চলবে না, ঘরে থাকা দু’ভাইয়ের বউ আর বাচ্চাদের বাঁচাতে হবে। কিন্তু কি করবেন তিনি, আতংকে যেন নিজের মাথার চুল নিজেই ছিড়তে চাইলেন। পরিস্থিতি যে খুবই নাজুক হয়ে যাচ্ছে তিনি খুবই উপলদ্ধি করতে পারছেন। নিজের জন্য ভাবছেন না তিনি, নিজের স্ত্রী, ছোট ভাই সালিকের স্ত্রী ও বাচ্চা এদের কথা ভেবেই যেন তিনি কেঁপে কেঁপে উঠছেন। ছেলেটার কান্নার শব্দে নিজেকে বড় অসহায় মনে হল তার, এই জীবনগুলোকে কি করে বাঁচাবেন তিনি। জানোয়ারের বাচ্চাগুলো এখনি কি তাকে গুলি করে দেবে, তাকে মেরে ফেলে হায়েনা গুলো কি তাহলে ঘরটাতে আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দেবে, সালিকের ছেলে ঐ যে ছোট্ট সোহেল, সে কি তাহলে ঐ আগুনেই পুড়ে মরবে, ছোট ভাইয়ের বউ যে ঐ ঝোপে লুকিয়ে আছে সে বাঁচতে পারবে তো, তার স্ত্রী কারিমাও ঐ মশারীর ভিতরে- সেও কি তাহলে ঐ আগুনে…. না না আর ভাবতে পারছেন না তিনি।
কয়েক সেকেন্ডের চুপসে যাওয়া পরিস্থিতি থেকে হঠাৎ করে ছবির সাহেবের চোখগুলো যেন জ্বলে উঠল, টেবিলের উপর টিম টিম করে জ্বলতে থাকা হারিকেনটা হঠাৎ দপ করে উঠলো যার ফলে ঘরের আবছা আলোর পরিবেশটা একটুযেন উজ্জ্বল হয়ে গেল। তেল শুকিয়ে হয়তো হারিকেনটা নিভে যাবে,কিন্তু ওটার ঐ দপ করে উঠার আলোতে কি যেন একটা দেখতে পেলেন ছবির সাহেব কঞ্চি দিয়ে বাঁধা বেড়ার পাড়ে। তিনি ভাবতে থাকেন এইটা যে সাবান বেটারা যদি বিশ্বাস করতে না পারে তাহলে ঘটে যেতে পারে মহাবিপদটি। ভাবতে লাগলেন সাবানের গোল্লাটাকে যদি কেটে দেখানো যায় তাহলে হয়তো…..
কিন্তু এখনতো দা–ছুরি কিছুই হাতের কাছে নেই। আর সাবান কাটার ছলে যদি তার হাতে ছুরি আসে খানসেনারা ওটাকেও আক্রমনের অস্ত্র ভেবের ঘটিয়ে দিতে পারে অনাকাঙ্খিত ঘটনাটি। ঠিক এমনই এক মুহুর্তে ছবির সাহেব চোখগুলোকে অনেকটা জোর করে বড় করে বুঝতে চাইলেন বেড়ার ফাঁকে চকচক করে উঠা ঐ জিনিষট আসলে কি। একটা বড় নিশ্বাস পড়ল তার বুক থেকে, মনের অজান্তেই জপে উঠলেন-ওফ, এযাত্রা মনে হয় বাঁচা গেল, আল্লাহর কাছে হাজার শোকর, রক্ষা কর আল্লাহ। ঐ চকচকে জিনিষটাকে চিনতে পেরেই ছবির সাহেবের মাথার গোপন কুঠিরে এতক্ষণে চুর্ণর্বিচুর্ণ কোষগুলো কি যেন একটা অলৌকিক ছোঁয়ায় জুড়ে যেতে লাগলো আবার। সাথে সাথে তিনি একটু উচ্চস্বরেই বলে উঠলেন-
-ইয়ে দেখিয়ে সাব, বলেই বেড়ার পাড়ে ঝুলতে থাকা সাবান কাটার ধাতব তার’টা গোল্লাসাবানের মাঝখানে বসিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে যেন একটা টান দিলেন, আর বাংলা সাবানের গোল্লাটা দু’ভাগ হয়ে দু’টুকরা দু’দিকে পড়ে গেল। চট করে দু’হাতে দু’টুকরা তুলে নিয়ে মেলে ধরলেন কমান্ডারের চোখের সামনে এবং আঙুল দিয়ে টিপে টিপে দেখাতে লাগলেন। খেয়াল করলেন তবুও কমান্ডারের ভ্রুগুলো কুচকে আছে, বাকীরাও তাক করা অস্ত্র এখনো নামিয়ে নেয়নি। হারিকেনের আলো আরো একটু কমে গেল। আলো কমে যাওয়ায় বাচ্চাটার কান্নাও আরেকটু বেড়ে গেল যেটা হয়তো সেনাদের বিরক্তির কারন হতে পারে। ছবির সাহেব তাদের বোঝাতেই তাই যেন অস্থির হয়ে পড়েছেন। আবার তাই দু’ভাগেরে এক ভাগ সবানটা নিয়ে আরেকবার দু’ভাগ করে নিয়ে কমান্ডারের চোখের সামনে ধরে রাখলেন।
কমান্ডারের চোখগুলো এবার যেন স্বাভাবিক হলো, বাকী সৈন্যরা অস্ত্র নামালেও কমান্ডারের চোখের কেমন যেন একটা ঈশারায় তারা সরব হল।
-সাব সব কুচ দেখ চুকা, অউর কোই নেহি হে।
ছোকরা সৈন্যটার উত্তরটা বুঝতে পেরে ছবির সাহেব মনে মনে একটু আস্বস্থ হলেও রাজ্যের চিন্তা যেগুলো মাথায় ভর করে আছে ওগুলোর চাপ যেন ক্রমেই বেড়েই চলছে এই মানসিক অত্যাচার থেকে মুক্তি পাবার আশায়। ছবির সাহেব কমান্ডারের মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন অধির আগ্রহে আর মনে মনে ভাবছেন শালারা এখনো কেন বিদেয় হচ্ছে না কেন। হারিকেনটার আলো আরো কমে গেছে, একজন গিয়ে এক ঝটকায় হারিকেনটা হাতে নিয়ে কমান্ডারের চোখের সামনে ধরে বলতে লাগলো –
- সাব ইয়ে তো খতম হনে যাতা লাগাহ। কমান্ডার বলে উঠলো
- ছব্বির তোমারা বাত্তি নিভনে লাগা , ইসকো জ্বালাও।
- সাব, হামারা সব তেল খতম হো চুকা, আব হামকো আন্ধেরেমে থাকনা হোগা সাব, হাম কেয়া করে সাব। কথা শেষ হতে হতেই এক সৈন্য লাথি দিয়ে ছবির সাহেবকে ফেলে দিল।তিনি কোমরে ব্যাথা পেয়ে কঁকিয়ে উঠলেন। কমান্ডার সৈন্যটাকে থামালেন হাত দিয়ে,
- ছব্বির ইয়ে তুম কেয়া বলতে হ
- সাব হাম আপকো দেখায়েঙে,হামারা তেলকা বোতল খালি হে সাব, আপ চাহে ত হাম দেখায়েঙে, তেল নেহি হে সাব। ছবির সাহেবের কন্ঠে কাকুতি মিনতি ঝরে পড়ছে।
- তোমারা বউকো ইহাপে বুলাও
এবার যেন ছবির সাহেবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল, ওদিকে সালিকের বাচ্চা ছেলেটা ক্ষণে ক্ষণে কান্না জুড়ছে এখনো। তিনি ধরে নিলেন এবার তার নিশ্চিত মৃত্যু, তবুও বুকে সাহস নিয়ে নরম সুরে বললেন-
-সাব, আপ মুসালমান হে হামভি মুসালমান হে। হামারা ধরম মে আউরাত কো বেগানা আদমি কা ছামনে নেহি আনা চাহিয়ে।
-আচ্ছা তুম হামকো ধরম শিখানা চাতা হে।ছোকরা সৈন্যটা আঘাত করতে উদ্যত হলে কমান্ডার থামালেন।
-নেহি সাব, হাম আপকা দয়া চাহ তে হে, আপ-হাম সব এক জাত হে সাব, মুসালমান হে সাব।
কথাটা শেষ না হতেই হারিকেনটা নিভে গিয়ে ঘরটা অন্ধকারে নিপতিত হলো, ঠিক তখনই ঘাটায় বাড়ীর মুখে পাহারারত এক সৈন্যের চিৎকার শুনা গেল, সে কাকে যেন জিজ্ঞেস করলো
-কউন হে উধার, কউন হে উধার..
বলেই বাড়ীর দক্ষিনে পুকুর পাড়ের নল খাগড়ার ঝোপের দিকে গুলি ছুড়ে দিল। বেটার হয়তো মনে হয়েছে ঐ ঝোপে কি যেন একটা নড়ে চড়ে উঠেছে। ভেবেছে হয়তো ঝোপের মধ্যে কেউ লুকিয়ে আছে।ঐ চিৎকার আর গুলি শব্দ শুনে সৈন্যরা ছবির সাহেবকে টেনে হিছড়ে উঠোনের আবছা আলোতে নিয়ে এনে ফেলল আর কয়েকজন মিলে এলোপাথাড়ি লাথি দিতে দিতে দেহটাকে থেতলে দিতে লাগলো। ছবির সাহেব মাটিতে পড়ে থেকে আল্লাহকে স্মরণ করে দুআ-দরুদ পড়তে লাগলেন, দুজন সৈন্য উনার দিকে বন্দুক তাক করে ছিল কিন্তু কমান্ডার দৌড়ে গেল ঘাটায় পাহারারত সৈন্যটার দিকে…..
…………..
সাম্পানের পাঠাতনের উপর বাচ্চা ছেলেটা কোলে নিয়ে বসে কর্ণফুলীর জলে ভাসতে থাকা সালিক কিছুতেই ভুলতে পারছে না গতকাল রাতের ঘটনাটা। গ্রামের যুবক ছেলেদের বসানো পাহারাটা দলটা গতকাল খুব কাজে দিয়েছে। হায়েনা হানাদার সৈন্যদলটা অনেক ক্ষণ ধরে ছবির সাহেবের উপর অত্যাচার চালাচ্ছে, সালিকসহ পাহারা দলের দশ জন যুবক ঘাপটি মেরে আছে মাঝখানের বাড়ীটার পেছনে কালু ড্রাইভারের রান্নাঘরের বারান্দায় মুরগীর আড়াইলের পাশে। অনেকক্ষণ ধরে হানাদার সেনারা ঐ ঘর থেকে বের না হওয়ায় বাড়ীর মুখে ঘাটায় পাহারারত সৈন্যটাকে নাড়াতেই সালিক শফিককে বলেছিল পুকুরের পূর্বপাড়ের নল খাগড়ার ঝোপে পাথর ছুড়ে শব্দ সৃষ্টি করতে,পরে শফিক আর কামাল দুজনেরই ছোড়া পাথরে পর পর দুবার শব্দ হওয়ায় সৈন্যটা আক্রমন করতে ছুটে গেছে,তখনই পাহারা দলটি রাতে্র অবছা আলোয় বুঝতে পারছিল ছবির সাহেবকে টেনে হেচড়ে ঘর থেকে নিয়ে এসে উঠোনে ফেলে ইচ্ছেমত লথি দিয়ে চলছে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কান্না রত দেহটার উপর। আর ঐ সৈন্যটা ‘কে ওখানে কে ওখানে’ বলতে বলতে ঝোপের মধ্যে গুলি ছোড়া শুরু করে দিয়েছিল আরও দেখা গেল ঘর থেকে বেরিয়ে আসা কমান্ডার সৈন্যটির দিকে ছুটে এল ছবির সাহেবকে ফেলে । দুএক মিনিটের মধ্যে বন্দুক তাক করা সৈন্যগুলোও তাদের কমান্ডারের সাথে যোগ দিল। অনেক খোজাখুজি করে ঝোপর মধ্যে গুলি চালিয়ে কাউকে না পেয়ে শেষ পয্যন্ত হায়েনা গুলো বাড়ী থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।
বুকের সাথে লাগানো কোলের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা বাচ্চা ছেলেটা হঠাৎ কেঁদে উঠায় সন্বিত ফিরে পেল সালিক, চোখের পাপড়িগুলো বেশ কবার হচকচিয়ে মাথাতুলে তাকাতেই সে দেখতে পেল কর্ণফূলীর ঐপাড়ের জামতলীর ঘাট দেখা যাচ্ছে, দেখা যাচ্ছে জামতলী বাজারের দিকে চলে যাওযা ধুসর মেঠো পথ……।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন