বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ ডিসেম্বর ১৯৭১
গল্প/কবিতা: ২৪টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৩৭

বিচারক স্কোরঃ ২.৩৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.০৪ / ৩.০

মাঝ বয়সী শিশু

দুঃখ অক্টোবর ২০১৫

মুরগি

দুঃখ অক্টোবর ২০১৫

অকৃতজ্ঞ

ব্যথা জানুয়ারী ২০১৫

অসহায়ত্ব (আগস্ট ২০১৪)

মোট ভোট ১৭ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৩৭ সালিস

ওয়াহিদ মামুন
comment ১৫  favorite ০  import_contacts ৫৭৫
এক

জ্বর হয়েছে মাসুদের। তাই বিছানায় শুয়ে ছটফট করছে। পূর্ব রাজাবাজারের এই বাসায় মাসুদ ও তার বাল্যবন্ধু জাহাঙ্গীর থাকে। মাসুদ একটা গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ-এর গার্মেন্ট শাখায় এবং জাহাঙ্গীর এক প্যাকেজিং কোম্পানিতে চাকরি করে। জাহাঙ্গীর অফিস থেকে এখনও ফেরে নি। শরীরের মধ্যে তীব্র অস্বস্তি হওয়ায় ও সবকিছু অসহ্য লাগায় মাসুদ ‘‘মা, মা’’ বলছে আর প্রলাপের ন্যায় মূল্যহীন ছেলেমানুষী কথা আউড়ে যাচ্ছে। জ্বর হলে ওর ভিতর থেকে আপনা-আপনিই এভাবে কষ্টের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এতে শরীর ও মনের যন্ত্রণা কিঞ্চিৎ কম অনুভূত হয়।

সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। এমন সময় শিখা এলো। শিখা গার্মেন্ট-এ চাকরি করে। একই গ্রামে তাদের বাড়ি হলেও ও একই শহরে দু’জন থাকলেও কয়েক বছর পর পরস্পরের দেখা। তাই ওকে দেখে মাসুদ খুব অবাক ও অপ্রস্তুত হয়ে গেল। শিখার পরনে ঢিলে-ঢালা সালোয়ার কামিজ। পরিপাটিভাবে ওর মাথা, গলা ও বুক ওড়নায় আবৃত। পায়ে এক ইঞ্চি উঁচু হিলওয়ালা স্যান্ডাল। ওর হাতে একটা টিফিন কেরিয়ার।

শিখাকে মাসুদ বললো, ‘‘আরে, শিখা যে! কেমন আছিস?’’
শিখা বললো, ‘‘ভালো। জাহাঙ্গীর ভাইয়ের কাছে শুনলাম যে আপনার জ্বর হয়েছে। তাই দেখতে এলাম।’’
মাসুদ বললো, ‘‘বাসা খুঁজে পেলি কিভাবে?’’
শিখা বললো, ‘‘ইচ্ছা থাকলে ঠিকই খুঁজে নেওয়া যায়। আপনার শরীর এখন কেমন?’’
মাসুদ বললো, ‘‘ শরীর খারাপই। কিন্তু তুই আমাকে আপনি করে বলছিস কেন?’’
শিখা সামান্য হেসে বললো, ‘‘আপনি একজন মার্চেন্ডাইজার। আর আমি সামান্য শ্রমিক। আপনাকে তো আমার আপনি করেই বলা উচিৎ।’’
মাসুদ বললো, ‘‘আমরা একসাথে পড়তাম। সে হিসাবে আমরা তো বন্ধু। কাজেই তুই যদি আর আপনি করে বলিস তবে কিন্তু তোকে বাসা থেকে বের করে দেব।’’
মাসুদের আন্তরিকতায় শিখার চোখ ছল ছল করে উঠলো। সে বললো, ‘‘আচ্ছা ঠিক আছে, আর বলবো না।’’
টিফিন কেরিয়ারের দিকে ইঙ্গিত করে শিখা আবার বললো, ‘‘তোর জন্য সামান্য খাবার তৈরী করে এনেছি।’’
মাসুদ বললো, ‘‘তুই আবার এসব করতে গেলি কেন?’’
মাসুদ কথা বলছিলো আর মাঝে মাঝে সামান্য কাতরাচ্ছিলো। তাই মাসুদের কপালে হাত দিয়ে শিখা দেখলো যে গা খুব গরম। সে ব্যস্ত হয়ে পানি নিয়ে এলো। তারপর মাসুদকে কায়দামত শুইয়ে ওর মাথা ধুয়ে দেওয়া শুরু করলো।

তেজগাঁও শিল্প এলাকার ট্রাক স্ট্যান্ডের পূর্বে বেগুনবাড়িতে শিখা থাকে। জ্বরের কারণে মাসুদ খুব অসহায় বোধ করছিলো। শিখার উপস্থিতিতে মনে ভরসা পাওয়ায় অসহায় ভাব এখন অনেকটা দূর হয়ে গেছে।

শিখারা খুব দরিদ্র। ওদের জমি-জমা নেই। শুধু বাড়িটুকুই সম্বল। ওর বাবা বাজারে কুলির কাজ করতেন। ওরা চার ভাই-বোন। শিখাই সবার বড়। শত প্রতিকুলতার মাঝেও শিখা পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলো। এস.এস.সি. পাশ করার পর ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তিও হয়েছিলো। কিন্তু ইন্টারমিডিয়েটে পড়া অবস্থায় ওর বাবা প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হন। তারপর থেকে তিনি অসুস্থ। শিখাদের পরিবারে একমাত্র ওর বাবাই উপার্জন করতেন।

শিখা খারাপ ছাত্রী ছিল না। ওর ইচ্ছা ছিল আরও পড়াশোনা করার। কিন্তু একটা বিত্তহীন সংসারে কেউ যদি উপার্জন না করে তবে পড়াশোনা তো দূরের কথা বেঁচে থাকাই তো অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই সে বাধ্য হয়ে পড়াশোনা বাদ দিয়ে ঢাকায় এসে গার্মেন্ট-এ চাকরি নিয়েছিলো। সেই থেকে সে ঢাকাতেই আছে। অন্যদিকে মাসুদ উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। সে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে রাজশাহী ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিলো। ওখান থেকে একাউন্টিং-এ অনার্স ও মাস্টার্স কমপ্লিট করে ঢাকায় এসেছিলো।

মাসুদের মাথা ধোওয়ানো শেষ হলে গামছা দিয়ে মাথা ভালো মত মুছে দিল শিখা। মাসুদের বেশ ভালো লাগছে এখন। শিখা টিফিন কেরিয়ার থেকে খাবারগুলো বের করলো। প্লেটে করে এগিয়ে দিয়ে মাসুদকে খেতে বললো।
মাসুদ বললো, ‘‘তুই খাবার এনেছিস। কিন্তু আমার মুখে তো রুচি নেই। কিছুই খেতে ভালো লাগছে না। তুই ওগুলো রেখে দে, আমার যখন ইচ্ছে হয় তখন খেয়ে নেব।’’
মাসুদের আপত্তি সত্ত্বেও শিখা একটা পিঠা এগিয়ে দিয়ে বললো, ‘‘প্লিজ, এইটা অন্ততঃ খেয়ে নে।’’
মাসুদ পিঠাটা খেতে লাগলো।
শিখা বললো, ‘‘কিছুদিন পরেই তো ঈদ। বাড়ি যাবি না?’’
মাসুদ বললো, ‘‘হ্যাঁ যাবো। তুই কেনাকাটা করেছিস?’’
শিখা বললো, ‘‘আমার আবার কেনাকাটা। তবুও বাড়ির সকলের জন্য কিছু করেছি, আরও করতে হবে।’’
মাসুদ বললো, ‘‘আচ্ছা তুই বিয়ে করছিস না কেন?’’
শিখা কেমন যেন আনমনা হয়ে গেল। বললো, ‘‘বাবা অসুস্থ। ভাই-বোনরা এখনও বড় হয়ে ওঠে নি। মা সবসময় দুর্ভাবনা করেন। আমি সকলের জন্য এখন যেভাবে করতে পারছি বিয়ে করলে তো সেভাবে হয়তো করতে পারবো না। আর আমি যদি কিছু করতে না পারি তবে তাদের কি হবে? এসব ভেবে বিয়ে করার সাহস পাই না।’’
শিখা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। মাসুদও আর কোনো কথা খুঁজে পেল না।

কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর শিখা বললো, ‘‘ওষুধপত্র ঠিকমতো খাস। রাত বেড়ে যাচ্ছে। আমাকে এবার যেতে হবে।’’
মাসুদ ওকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য উঠতে গেল। কিন্তু শিখা ওকে উঠতে দিল না। তারপর বললো, ‘‘আসি, নিজের যত্ন নিস।’’

মাসুদ ওর গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইলো। ওর ওড়নার ভিতরে বড় খোঁপাটি বোঝা যাচ্ছে। শিখার প্রতি অনেক সমবেদনা অনুভব করলো সে। একজন মেয়ে হয়েও শিখা পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে যেভাবে জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে তা ভেবে মাসুদ ওর প্রতি খুব ভক্তি টের পেল। মাসুদ এতদিন শুধু শুনে এসেছে যে শিখা ঢাকায়ই থাকে। কিন্তু কোনোদিন ওর খোঁজ-খবর নেয় নি। অথচ শিখা তার জ্বরের খবর পেয়ে তাকে দেখতে এসেছে। মাসুদ মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো যে এখন থেকে শিখার খোঁজ-খবর নিবে।

দেখতে দেখতে ঈদুল আযহা এসে গেল।


দুই


ঈদের দিন ঈদগাহ মাঠে বন্ধুদের অনেকের সঙ্গেই দেখা হলো মাসুদের যাদের সঙ্গে বছরের অন্য সময় এখন আর তেমন দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। নামাজ শেষে তাদের, মুরুব্বীদের এবং আরও অনেকের সঙ্গে কোলাকুলি করলো। কোলাকুলির সময় কুশল বিনিময় হলো।

গাজীউর, আনোয়ার, মানিক, জাহাঙ্গীর, মাসুদ ও আরও কয়েকজন ঈদগাহ মাঠের পাশে গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে গল্পে মেতে উঠলো। অনেকদিনের জমানো কথা পরস্পরের সঙ্গে বিনিময় করতে লাগলো। আনোয়ার ব্রিজ খেলার প্রস্তাব দিল। অন্যরাও তাতে আগ্রহ প্রকাশ করলো। এটা পাকাপাকি হলো যে দুপুরের পর সবাই মানিকদের বাড়িতে ব্রিজ খেলতে বসবে।

যথাসময়ে একে একে সবাই মানিকদের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলো।

খাটের উপর বসে খেলা শুরু করলো। মানিক আর আনোয়ার এক পক্ষে এবং অন্য পক্ষে মাসুদ ও গাজীউর। অন্যরা খেলা দেখতে লাগলো। খেলায় ওরা এমনই মগ্ন হয়ে গেল যে সন্ধ্যা পার হয়ে যাচ্ছে কিন্তু সেদিকে কারও খেয়াল নেই। খেলা চলছেই। খেলার মাঝে একসময় মানিকের মায়ের পাঠানো খিচুরি আর মাংস তাড়াহুড়া করে খেয়ে নিয়েছিল এই যা।

রাত হয়ে গেছে। হঠাৎ মোবাইলে শিখার ফোন এলো। সে মাসুদকে বললো, ‘‘আমি খুব বিপদে পড়েছি। তুই একটু আমাদের গ্রামের স্কুলের ওখানে আসতে পারবি? এলে আমার খুব উপকার হতো।’’
মাসুদ বললো, ‘‘ঠিক আছে আসছি।’’
নিজের কার্ডগুলো আরেক বন্ধুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে মাসুদ বের হয়ে গেল।

এই গ্রামে বেশ কয়েকটা সমাজ আছে। কিছু পরিবার মিলে একেকটি সমাজ গড়ে তোলা হয়েছে। যাদের মাঝে ভালো সম্পর্ক বিরাজ করে তারাই সাধারণতঃ এক সমাজের অন্তর্ভুক্ত হয়। অনেক সময় এক সমাজের লোক অন্য সমাজে চলেও যায়। সব সমাজ সমান নয়। কোনো সমাজে অল্প সংখ্যক পরিবার আছে আবার কোনো সমাজে অধিক সংখ্যক পরিবার। সমাজের কার্যকারিতা সারা বছর লক্ষ্য করা না গেলেও দুই ঈদের সময় তা বোঝা যায়। যারা কোরবানি দেয় তারা মাংসের একটা অংশ নিজেদের সমাজে প্রদান করে। সকলের মাংস জমা দেওয়া শেষ হলে সব মাংস একত্রিত করে ছোট ছোট ভাগ বসানো হয়। সমাজের যারা কোরবানি দিতে পারে না সাধারণতঃ তাদেরকেই এই মাংস পরিবারের সদস্য সংখ্যা অনুসারে দুই, তিন কিংবা চার ভাগ করে দেওয়া হয়।

শিখার ছোট ভাই কামরুল সমাজের সেই মাংস আনার জন্য গেলে ওদের সমাজের এক মুরুব্বী গোছের লোক জয়নাল হোসেন তাকে মাংস দিতে আপত্তি জানান এই বলে যে তার বোন শিখা চাকরির নামে ঢাকায় অসামাজিক জীবন-যাপন করে বেড়ায়। কাজেই তাদেরকে গোশত দেওয়া যাবে না। এরপর এ নিয়ে অনেক কানাঘুঁষা শুরু হয়ে যায়। মানুষের কল্পনার গতি তো অবাধ। আর এ ধরণের বিষয়ের প্রতি মানুষের অত্যধিক আগ্রহ থাকে। যেহেতু শিখা একা ঢাকায় থাকে সেহেতু খারাপ কিছু কল্পনা করতে তো তাদের বাধা নাই। ফলে এ ব্যাপারে উপস্থিত সকলের উৎসাহ বাড়তে থাকে। এক সময় লোক পাঠিয়ে শিখাকে স্কুল প্রাঙ্গণে ডেকে এনে সালিস বসানো হয়।

শিখার বাবা অসুস্থ হওয়ার পর জয়নাল হোসেন তাকে দেখতে তার বাড়িতে গিয়েছিলেন। তখন শিখা তার সামনে দিয়ে আসা-যাওয়া করার সময় তার কু-দৃষ্টি শিখার উপর পড়ে। কয়েকদিন পর শিখাদের পরিবারের অসহায়ত্ব ঘোচানোর অজুহাত দাঁড় করিয়ে স্ত্রী এবং সন্তান-সন্ততি থাকা সত্ত্বেও তিনি শিখাকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব পাঠান। কিন্তু নিজ পরিবারের কথা ভেবে এবং লোকটা বাবার বয়সী হওয়ায় তাকে বিয়ে করতে শিখা অস্বীকৃতি জানায়। এতে জয়নাল হোসেন ভিতরে ভিতরে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেও মান-সম্মানের কথা ভেবে অনেক কষ্টে নিজেকে শান্ত করেন।

বাবার অসুস্থতার কারণে একসময় শিখাদের অবস্থা শোচনীয় পর্যায়ে গেলেও ওদের সংসারটা সাম্প্রতিক সময়ে বেশ ভালোভাবেই চলছিল। কিন্তু মানুষের একটা স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হলো, কারও উন্নতি চোখে পড়লে, কাউকে উপরের দিকে উঠতে দেখলেই কিভাবে তাকে নিচের দিকে টেনে নামানো যায় সেই ঘৃণ্য ধান্দায় সে নিজেকে নিয়োজিত করে। এ কারণে শিখাদের এই ভালো থাকাটা আশেপাশের কতিপয় হিংসুটে মানুষের সহ্য হচ্ছিলো না। এ কারণে ছোট মনের দু’একজন মানুষ জয়নাল হোসেনকে শিখার ব্যাপারে কু-মন্ত্রণা দিয়েছিলো।

এই কু-মন্ত্রণার কারণেই এতদিন পর জয়নাল হোসেনের অপমানের পুরানো ক্ষত মনের মধ্যে তাজা হয়ে উঠেছে। এই ক্ষতই তাকে উদ্বুদ্ধ করেছে শিখাকে এবং সেইসাথে তার পরিবারের সকলকে নাজেহাল করতে। তাই শিখার উপর এরূপ মিথ্যা কালিমা লেপন করলে তার ভবিষ্যৎ জীবনের যে চরম ক্ষতি হবে এ কথাটি একবারও না চিন্তা করে শিখার বিরুদ্ধে কুকুরের মত তিনি ঘেউ ঘেউ করে উঠেছেন।

মাসুদরাও শিখাদের সমাজেরই অন্তর্ভুক্ত। মাসুদের বাবা বেশ প্রভাবশালীও। তাই শিখা মাসুদকে ফোন করেছে এই আশা করে যে মাসুদ হয়তো শিখাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করবে।

গ্রামের সরকারী প্রাইমারী স্কুলের ওখানে উপস্থিত হলো মাসুদ। স্কুলের পাকা বারান্দায় কোরবানির মাংসের ভাগগুলো বসানো হয়েছে। গ্রামের বেশির ভাগ পশু কোরবানি স্কুল প্রাঙ্গণেই দেওয়া হয়। এই নিয়ম অনেক আগে থেকেই চলে আসছে।

মাসুদ স্কুলের ভিতরে ঢুকলো। অনেক লোক একত্রিত হয়েছে সেখানে। একপাশে শিখা মাথা নিচু করে সংকুচিতভাবে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকজন বয়স্ক লোক এক সারিতে বসে আছেন। জয়নাল হোসেনও তাদের মধ্যে আছেন। তিনিই সালিসের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তিনিই সমাজের প্রধান সেজেছেন। মাসুদের বাবা এখানে নেই। তিনি সাধারণতঃ এ ধরণের ঝামেলায় জড়ান না। কিন্তু এরূপ সালিসে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মত ক্ষমতা ওনার আছে।

জয়নাল হোসেন সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘‘আমাদের গ্রামের একটা সুনাম আছে। শিক্ষা-দীক্ষার কারণে অন্যান্য গ্রামের লোকেরা আমাদের গ্রামকে ঈর্ষার দৃষ্টিতে দেখে। আর এইরকম একটা গ্রামের মেয়ে হয়ে আমাদের আফজাল হোসেনের মেয়ে শিখা গার্মেন্ট-এ চাকরির কথা বলে ঢাকা শহরে বেলেল্লাপনা করে বেড়ায়। এতে আমাদের গ্রামের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আমরা গ্রামের সুনাম এভাবে নষ্ট হতে দিতে পারি না। হয় শিখাকে চাকরি ছেড়ে দিয়ে গ্রামে চলে আসতে হবে নতুবা তারা গ্রামের কারও সাথে মিশতে পারবে না, গ্রামের লোকরাও তাদের সাথে মিশবে না। তাদেরকে ‘এক ঘরে’ করা হবে। আর কোরবানির মাংসও তাদেরকে দেওয়া হবে না।’’
সকলের উদ্দেশ্যে হাত তুলে তিনি আবার বললেন, ‘‘আপনারা সবাই কি আমার কথার সাথে একমত আছেন?’’
বেশিরভাগ লোক তার কথায় সম্মতি জানালো। জয়নাল হোসেন পরিতৃপ্তি সহ এদিক ওদিক তাকাতে লাগলেন।

মাসুদ খুব অবাক হলো। জীবিকার তাগিদে শিখা ঢাকায় থাকে। কর্মের বিনিময়ে টাকা রোজগার করে নিজেকে এবং বাড়ির সবাইকে চালায়। অথচ তার উপর মিথ্যা বদনাম চাপানো হচ্ছে কেন?

জয়নাল হোসেন পূণরায় বললেন, ‘‘এ ব্যাপারে কারও কি কিছু বলার আছে?’’
পাশ থেকে একজন বলে উঠলো, ‘‘আপনি একটা ফয়সালা দিয়েছেন, এতে কার আবার কি বলার থাকতে পারে?’’
এরপর শোরগোলের মত শুরু হয়ে গেল।

পরিস্থিতি শান্ত হলে শিখা কম্পিত ও কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বললো, ‘‘আমি চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাড়ি চলে এলে আমাদের সকলের পেটের ভাত জোগাড় হবে কিভাবে? আমাদেরকে তো অনাহারে মরতে হবে। আর আমি ঢাকায় কি করি তা যাচাই করে এলেই তো হয়।’’
জয়নাল হোসেনের পাশ থেকে একজন ধমক দিয়ে বলে উঠলো, ‘‘বেয়াদব মেয়ে কোথাকার। মুরুব্বীর সঙ্গে কিভাবে বিনয় সহকারে কথা বলতে হয় সেটাও জানো না? মুখে মুখে আবার তর্ক করছো!’’
শিখা আবারও কিছু বলতে যাচ্ছিলো কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন ‘‘এই চুপ’’ বলে ওকে থামিয়ে দিল।

নরম ও দুর্বল পেয়ে শিখাদের উপর একটা অযৌক্তিক ও অমানবিক ফয়সালা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাই মাসুদ প্রতিবাদ করবে বলে মনে মনে প্রস্তুত হয়েছিল। কিন্তু শিখাকে যেভাবে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেওয়া হলো তাতে এই পরিচিত, বয়স্ক ও সমাজের চোখে সম্মানীয় লোকদের সামনে মাসুদ এসবের বিরুদ্ধে একা কিছু বলার সাহস হারিয়ে ফেললো।

কিছুক্ষণ পর শিখা কাঁদতে কাঁদতে বললো, ‘‘ঠিক আছে, আপনারা যদি আমার বাড়িতে থাকাটাই মঙ্গলজনক মনে করেন তাহলে আমি তাই করবো।’’
জয়নাল হোসেনের মুখে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠলো। তিনি একজনকে বললেন, ‘‘এই, ওদেরকে মাংস দিয়ে দাও।’’
এরপর উপস্থিত লোকজন ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল।

শিখা তার ভাইয়ের বাহু ধরে মাংসের ওখানে নিয়ে গেল। ওর ভাই ব্যাগ বাড়িয়ে ধরলো। একজন দুই ভাগ মাংস ব্যাগে তুলে দিল। মাংস নিয়ে ভাই-বোন বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটতে লাগলো। মাসুদ লজ্জিতভাবে ওদের কাছে গেল।
শিখা মাসুদকে বললো, ‘‘তুই তো আমার সম্পর্কে সবই জানিস। তোর বাবা যদি আমাদের পক্ষে কিছু বলতেন তবে ওনারা আমাদের এমন ক্ষতি করতে পারতেন না।’’
মাসুদ অজুহাত দাঁড় করতে চাইলো। বললো, ‘‘কি করবো বল, আমার বাবা নিজের সম্মান বজায় রাখার স্বার্থে আসলে এসব জায়গায় আসেন না।’’
শিখা আর কিছু বললো না। মাসুদ জ্বর নিয়ে যখন একাকি অপরিচিত জায়গায় ছটফট করছিল তখন শিখা সামান্য হলেও মাসুদের সেবা করেছিলো। কিন্তু মাসুদ নিজের এলাকায়ও শিখার জন্য কিছুই করতে পারলো না। তাই মাসুদের মুখে কোনো কথা এলো না। ভাইটিকে নিয়ে শিখা এগিয়ে চললো। মাসুদ অপরাধীভাবে দাঁড়িয়ে ওদের চলে যাওয়া দেখতে লাগলো।

শিখার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি ঝরছে। ও চাকরি না করলে পরিবারের সকলের পেটের জ্বালা মিটবে কিভাবে? ওর পায়ের নীচ থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছে। কোনো অবলম্বন খুঁজে পাচ্ছে না সে। দু’চোখে অন্ধকার নেমে আসছে। জীবনের চাকা সচল রাখার জন্য সে ঢাকায় চাকরি নিয়েছিল। কিন্তু তারা গরীব বলে অসহায়ত্ব যেন তাদের পিছুই ছাড়ছে না।

কয়েকদিন পর ঢাকার উদ্দেশ্যে গাড়িতে চড়ে বসলো মাসুদ। বিকাল তিনটায় পাবনার বেড়া বাস স্ট্যান্ড থেকে গাড়ি ছেড়ে দিল।

বাইরের দিকে তাকিয়ে মাসুদ দেখলো যে বর্ষার পানি কমতে শুরু করেছে। পানির মধ্যে সবুজ আমন ধানের তাগড়া গাছগুলো একদিকে হেলে পড়েছে। এই পড়ন্ত বিকেলে একটা করুন ভাব জেগে উঠলো মাসুদের মনে। শিখার কথা মনে পড়লো। ওদের সংসারটা এখন চলবে কিভাবে? শিখার, তার বাবা-মা’র ও তার ভাই-বোনদের জন্য মনটা হু হু করে উঠলো। চোখ দুটো ছল ছল করে পানিতে ভরে গেল।

এলেঙ্গা পৌঁছানোর পর যাত্রাবিরতি দেওয়া হলো।

সবাই গাড়ি থেকে নামতে শুরু করেছে। হঠাৎ মাসুদ জানালা দিয়ে দেখলো যে বাইরে একজন মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে। তার মুখের এক পাশ দেখে মনে হলো সে শিখা। চমকে উঠে মাসুদ দ্রুত গাড়ি থেকে নামলো। তাকে অনুসরণ করে এগিয়ে গেল। পিছন থেকে দ্রুত হেঁটে পাশ দিয়ে তার সামনে গিয়ে দেখলো যে সে শিখা নয়। সে অন্য একজন মেয়ে।

নিজের নির্বুদ্ধিতার কারণে খুব লজ্জা পেল মাসুদ। সংকোচের সঙ্গে মাথা নিচু করে সে আবার গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন