বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩১ ডিসেম্বর ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ৪টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৭৫

বিচারক স্কোরঃ ১.৭৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ৩ / ৩.০

শুন্যতা (অক্টোবর ২০১৩)

মোট ভোট ১০ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৭৫ এক কাপ চা

ইব্রাহীম রাসেল
comment ৩  favorite ১  import_contacts ৪৯১
পৌষের প্রভাত। পুরোশহর তখনও ঘুমিয়ে। রোজকার চেয়ে কুয়াশার বাড়াবাড়িটা আজ বেশিই। কিন্তু আদিবাতো নির“পায়। দীর্ঘ ছয়টি বছর পর ভালোবাসার মানুষটি দেশে ফিরেছে। ভোর চারটায় শাহজালাল আš—র্জাতিক বিমান বন্দরে এসে পৌঁছেছে মানুষটি। ছয় বছরের তৃষ্ণার্ত চোখ তার ব্যাকুল হয়ে আছে। কুয়াশার প্রতিকূলতা কি করে তাকে র“খবে । ড্রাইভার এতো সকালে না আসাটাই ¯^াভাবিক। একাই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে।
২০০৬-এ চাকুরীর সুবাদে অষ্ট্রেলিয়ায় যেতে হয় রেহানকে। এখন ২০১২। পুরো ছয়টি বছর গুণে গুণে পার করেছে আদিবা। যদিও বর্তমানে মানুষ পৃথিবীর যে প্রাšে—ই থাকুক না কেন যোগাযোগটা হাতের মুঠোয়। আদিবা আর রেহানেরও সেই ¯^াভাবিক যোগাযোগটুকু ছিল। কিন্তু যে হৃদয় ভালোবাসে সে হৃদয় তো এইটুকুতে তুষ্ট নয়। প্রিয় মানুষকে কাছে পাবার ব্যাকুলতা তার পরিমাপহীন। রেহান যে বছর অষ্ট্রেলিয়ায় যায় সে বছরই জানুয়ারি মাসে তাদের পরিচয়। মাত্র ছয় মাস সুযোগ হয়েছিল তাদের নিয়মিত ¯^শরীরে যোগাযোগ করার। তারপরই প্রযুক্তির আশ্রয়। তাদের পরিচয়টা হয়েছিল অদ্ভুত এক ঘটনার মধ্য দিয়ে।
আদিবা তখন ফার্মগেটে ভার্সিটি ভর্তি কোচিং করত । এক বিকেলে কয়েকজন সহপাঠী বন্ধুসহ জিয়া উদ্যানে ঘুরতে যায়। কিছু¶ণ পায়চারির পর একটি খোলা জায়গায় ঘাসের উপর বসে। ওদের পাশেই কতগুলো ছেলে মিলে আড্ডা দিচ্ছিল। খানিক দূরে কতগুলো পুঁচকে ছেলেদের ক্রিকেট খেলা চলছিল। এরই মধ্যে ভাগ্নে হাজির, মামা চা লাগবো? আদা চা। লননা মামা! এক কাপ চা দেই। আদিবা সবাইকে চা দেয়ার কথা বলে। পাশের ছেলেগুলোও চা নেয়। দু’দলই চা খাচ্ছে আর নিজেদের নানা কথা নিয়ে হাসাহাসি করছে। হঠাৎ পুঁচকে ক্রিকেটারদের দিক থেকে বল এসে প্রথমে আদিবার কাপে লেগে দ্বিতীয় ড্রপে পাশের ছেলেগুলোর মধ্যে একজনের কাপে গিয়ে পড়ে। আদিবার চা পুরোটাই ওর বাম হাতে পড়ে। ওর হাতে ফোসকা পড়ে যায়। বন্ধুরা ব্য¯— হয়ে পড়ে হাতে কিছু একটা লাগানোর জন্য। পাশের ছেলেটির কাপে বলটির দ্বিতীয় ড্রপ হওয়ায় তেমন জোড়ে লাগেনি। ছেলেটি আদিবাদের দিকে এগিয়ে আসে। তাদের মধ্যে একজনকে প্রশ্ন করে, কি ভাই বেশি লেগেছে। উঁকি দিয়ে আদিবার হাতটা একবার দেখে। আদিবার বন্ধুদের আশ্ব¯— করে বলে- দেখি ভাই কি করা যায়, বলেই দৌড় দেয় উদ্যানের কোণে পুলিশ বক্সের দিকে। মিনিট খানিকের মধ্যে হাতে একটি স্যাভলন ক্রিমসহ দৌড়ে আসে। কাউকে কিছু না বলেই ক্রিম বের করে আদিবার হাতে লাগাতে শুরু করে। ওর বন্ধুরা প্রথমে একটু আশ্চর্য হলেও পরে বিষয়টি ¯^াভাবিক ভাবেই নেয়। আদিবার হাত জ্বলানো ভাবটা একটু কমে আসে। ছেলেটি যেভাবে ক্রিমটা লাগাল মনে হল সে যেন আদিবার কতদিনের চেনা। খুব আপন অনুভব করে সে। জানেনা কেন? এর মধ্যেই ছেলেটির দলের অন্যসবাই এসে জড়ো হয়। ছেলেটি তার নাম বলে রেহান। আদিবারাও একে একে সবার নাম বলে। কে কি করছে বলে। রেহান বলে, আমি মাস্টার্স শেষ করেছি এবছরই। রেহান সবার ফোন নম্বর চায়। আদিবার বন্ধুরা কয়েকজন নম্বর দেয়। এক পর্যায়ে আদিবার দিকে তাকিয়ে বলে, আপনার নম্বরটা পি­জ! আদিবা তার ফোন নম্বরটা বলে। অন্য কোন মেয়ে হলে হয়তো নম্বরটা দিতে নির“ৎসাহিত হত। কিংবা আদিবাও হত। কিন্তু রেহানকে কেন জানি সে না বলতে পারেছিলনা। পরিস্থিতিটাই এমন হল যে নিজের ভেতরে কোন অসম্মতির টের পাইনি সে। সন্ধ্যা হয়ে আসায় যে যার মত চলে আসে।

হঠাৎ একদিন রেহানের ফোন। কেমন আছেন? আপনার হাতের স্পটটা কি শুকিয়েছে? আদিবা ¯^াভাবিক উত্তর দেয়, হ্যা ভালো। আপনি?
ওদিক থেকে রেহান বলে আমি কিন্তু আরো একটা প্রশ্ন করেছিলাম।
আদিবা একটু হেসে জ্বি হাতের স্পটটা শুকিয়েছে।
রেহান বলে, ওকে থ্যাংকস গড। তারপর বাই বলে রেখে দেয়। ব্যাস এইটুকুই ছিল প্রথম ফোনে কথা।
তারপর মাঝে মাঝেই নানান ইস্যু তৈরি করে আদিবাকে ফোন করত রেহান। আদিবাও তার ইস্যুগুলোর ঘোরপ্যাচে আটকে যেত। জানেনা সেটা ইচ্ছে করে না অনিচ্ছায়। কথা চলতেই থাকতো। এভাবেই দিনে দিনে তারা বাহ্যিক ইস্যু ছেড়ে কখন যেন জীবনের ইস্যুর দিকে ঝুঁকে পড়ে! একটা সময় আসে যখন রেহান ফোন না করলে আদিবার দিনাটাই মেঘাচ্ছন্ন হয়ে যেত। প্রতিদিন বিকেলে যত কাজই থাকুক একপলক দেখার জন্য রেহান ছুটে আসত ফার্মগেটে । আদিবাও কোচিং শেষে বের হত। দুজনে বজলু ভাইয়ের টং দোকানে এক কাপ চা খেত। সেই ফাঁকেই আদিবাকে অপলক দেখা। ¶ুদ্র ¶ুদ্র বাক্যালাপ। আবার মাঝে মাঝে এমনও হত হঠাৎ করে উধাও হয়ে যেত রেহান। এক দিন, দুই দিন তবে তিন দিনের বেশি কখনো হতনা। আর এই সময় ফোনেও তেমন একটা কথা বলতো না। পরে যখন দেখা হত নিজের স্টাইলে একটা ডায়লগ মেরে দিত ‘দেখ, তৃষ্ণাই যদি না হয়, কী তৃপ্তি বলো জল পানে?’ আদিবা জানত মানুষটা নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে অনেক ভাবে। আর সেজন্যই তার এই ছোটাছুটি। তাই এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে কখনো বাড়াবাড়ি কিছু হতনা। দুজনের মাঝে বোঝাবুঝিটা ছিল সত্যিই ঈর্ষার।

সেদিন ছিল শুক্রবার। ২০০৬ এর জুন মাসের শুর“র দিকে। সাকালবেলাই রেহানের ফোন- আদিবা, আজকে সারাদিন কিন্তু আমার সাথে থাকছ। আদিবা বলে- কী ব্যাপার! বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ এমন সিদ্ধাš—? রেহানের ভাষ্য- দেখ, আজকে শুক্রবার। আমাদের অফ ডে। অনেকদিন কোথাও বের হই না। আবহাওয়াটাও অনুকূলে। সুতরাং সিদ্ধাš—টা কি অযৌক্তিক? আদিবার আর কিছু বলেনা। সে জানে নাছোড় বান্দা রেহান। ওর কথার প্যাচ কাটিয়ে কোনোদিনও সে কুলিয়ে উঠবে না। ওকে আসছি, বলে ফোন রেখে দেয়। সকাল নটার দিকে দুজন মিলিত হয় দোয়েল চত্বরে। হেঁটে হেঁেট চলে আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে। ‘আবার আসিব ফিরে ধান সিঁড়ি নদীর তীরে....’ রেহানের ফোনে রিং বেজে ওঠে। সে পকেট থেকে ফোনটা বের করে, খানিক কপাল কুচকে বলে, হঠাৎ বড় ভাইয়া! ফোন রিসিভ করে। ওপাশ থেকে বড় ভাইয়া কি কি যেন বলে, রেহান শুধু শোনে। ফোন রাখে। আদিবা জানতে চায়- কী বলল ভাইয়া? রেহান কিছুটা ¯—ব্ধ। শীতল কণ্ঠে বলে- আগামী শুক্রবার আমার ফ্লাইট। অনেক দিন থেকেই ভাইয়া অষ্ট্রেলিয়াতে আমার জন্য চেষ্টা করছিল। তোমাকে বলা হয়নি কারণ এতো তাড়াতাড়ি যে সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে আমিও নিশ্চিত ছিলাম না।
একটু ধাক্কা খায় আবিদা। আবার সামলে নিয়ে বলে- ওকে, ঠিক আছে। তুমি তো আর এমনি এমনি যাচ্ছ না, নিজের ক্যারিয়ার বিল্ডআপ করতে যাচ্ছ, সমস্যা কোথায়?
রেহান বলে- কিন্তু তুমি! তুমি কি পারবে আমার জন্য দীর্ঘ সময় অপে¶া করতে?
আদিবা বলে- আরে আমাকে নিয়ে ভেবনা। সবে মাত্র ভার্সিটি স্টুডেন্ট। গ্রাজুয়েশন শেষ করতে চার বছর তো পাচ্ছি। এর মধ্যে তুমিও একটা ভালো সুযোগ পাচ্ছ।
এতো কঠিন কথাগুলোও আদিবার সহজ উপস্থাপন দেখে রেহানও একটু ¯^¯ি—বোধ করেছিল সেদিন।

হঠাৎ চোখে পড়ে লাল আলোয় বিমান বন্দরের নামটা । এয়ারপোর্টে চলে আসে সে। সকাল হওয়ায় রা¯—া ফাঁকাই ছিল। পুরোনো কথা ভাবতে ভাবতে একটা ঘোরের মধ্যেই ছিল এত¶ণ। কুয়াশা তখনো কাটেনি। মুঠোফোনে রেহানকে বলে, আমি পৌঁছে গেছি।
রেহান মনে মনে আশা করছিল আদিবা হয়ত ভেতরে এসে তাকে রিসিভ করবে। একটু বিস্মিত হল, তাও লাগেজ নিয়ে বেরিয়ে আসল। গাড়ির দরজাটা খুলেই রেখেছিল আদিবা। রেহান উঠতেই সাঁই করে টান। আদিবার এমন আচরণে মনে হলো সিনেমায় হিরোকে নিয়ে হিরোইন পালাচ্ছে। পিছনে ধাওয়া করছে ভিলেন শ্বশুর। রেহান একটু অবাক হয়েই- কি ব্যাপার আদিবা! এমন ভাবে গাড়ি চালাচ্ছ কেন?
আদিবা বলে- কোনো কথা নয়। চুপ করে সুবোধ বালকের মতো বসে থাকো। কি ব্যাপার দেখতে থাক। আদিবা একটানে জিয়া উদ্যানে চলে আসে। লেকের মাঝামাঝি ওভার পুলের কাছে এসে কড়া ব্রেক। গাড়ি পার্ক করে রেহানের হাত ধরে এক রকম টেনে টেনে নিয়ে আসে সেই ঐতিহাসিক স্থানে। যেখানে তাদের পরিচয়। ঘাসের ওপর বসে পড়ে দুজন। কুয়াশা অনেকটা কেটে গেছে। উদ্যানের পল­বাচ্ছাদিত বৃ¶ের ফাঁক দিয়ে সোনালী রোদ এসে পড়ল আদিবার মুখে। দীর্ঘ ছয় বছর পর আবার নতুন করে রেহান তার প্রিয় মানুষটাকে আবিস্কার করে। আগের চেয়ে আরো বেশি ফর্সা হয়েছে আদিবা। ভেতরে ভেতরে একটা পুলক অনুভব হয় তার।
আদিবা বলে-কেন এখানে এসেছি জানো? দীর্ঘ ছয়টি বছর প্রতি মাসে অš—ত একবার হলেও এখানে এসেছি এবং ঠিক এই জায়গায় বসে তোমাকে অনুভব করেছি। কারণ এখান থেকেই আমার তোমাকে পাওয়া।
রেহান মুগ্ধ হয়। আরো বেশি টান অনুভব করে আদিবার জন্য। সত্যিই সে ভুল করেনি। জীবন চলার পথে এমন একটা মানুষের দেখা সে পেয়েছে। থ্যাংকস গড বলে একবার আকাশের দিকে তাকায়।
হঠাৎ তাদের কানে ভেসে আসে- চা খাবেন, আদা চা। চা খাবেন....... রেহান তাকিয়ে দেখে সেই ভাগ্নে। যার চায়ের সূত্র ধরেই তাদের পরিচয়। রেহান হাত ইশারায় ভাগ্নেকে ডাকে।
ভাগ্নে এসে যথারীতি- এক কাপ চা দেব মামা? আদা চা.......।
রেহান-আদিবা দুজনেই হেসে ওঠে। রেহান বলে- ভাগ্নে তুই যাবি আমাদের সাথে? সারা জীবন চা বানিয়ে খাওয়াবি। ভাগ্নে কোন কথা বলেনা। চায়ের ফ্লাক্স হাতে উল্টো দিকে হাঁটতে শুর“ করে। চা খাবেন? আদা চা ...........
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন