বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৮ অক্টোবর ১৯৬৫
গল্প/কবিতা: ৩৭টি

সমন্বিত স্কোর

বিচারক স্কোরঃ ১.৪ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ০.৬ / ৩.০

বালুকায় পদচিহ্ন

শ্রমিক মে ২০১৬

ফারাক

শ্রমিক মে ২০১৬

আছমাদের কাব্য

ফাল্গুন ফেব্রুয়ারী ২০১৬

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী (সেপ্টেম্বর ২০১৪)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট গন্তব্যঃ আপাতত মানসিক হাসপাতাল

মোঃ মোজাহারুল ইসলাম শাওন
comment ২  favorite ০  import_contacts ৫৫৮
‘একটা সমিকরন খুজঁতেছিঃ কস্ট কিভাবে জয় করে কস্ট কমানো যায়?
কেউ কি একটু বুদ্ধি দিবেঈঈন ? স্যার, এক্টু বুদ্ধি চাই!’

সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে বিছানার ওপর শুয়ে শুয়ে রাস্তার এক ফকির মিস্কিনের এরূপ অদ্ভুত ডাক শুনে সজিব তালুকদার নিজের কানকেই অবিশ্বাস করতে শুরু করল। আজকাল কৈশোরের দুষ্টুমির ধরন পালটেছে, সেরুপ কিছু কি? কান পাতল আবারো। একই ডাক, অদ্ভুত আহবানঃ ‘একটা সমিকরন খুজঁতেছিঃ কস্ট কিভাবে জয় করে কস্ট কমানো যায়? কেউ কি একটু বুদ্ধি দিবেঈঈন …… স্যার, এক্টু বুদ্ধি চাই!’
জীবনে অনেক পদের ফকিরি আহবান শুনেছে সে, যেখানে আল্লাহ, রাসুল(সা) থেকে মা বাবার ক্যান্সার বা শিক্ষার জন্য সাহাজ্য...! কিন্তু আজকের এই ডাক শুনে আর বিছানায় থাকতে পারল না; দ্রুত বারান্দায় এল। দোতালার বারান্দা থেকে নিচে তাকিয়ে দেখে খুব বেশি হলে ৩০-৩২ বৎসরের এক তরুণ, চাপা ডেবে গেছে, পরনে এক্টি মেরুন হাফ হাতা মলিন সার্ট, নিচে উরুতে ছেরা ছেরা ২-৩ জায়গায় এক্টি জিন্স প্যান্ট, যার ছেরা অংশ ডিজাইন না আসলেই দারিদ্রতার ছাপ বোঝা মুস্কিল। তবে কথার ধরনে মনে হচ্ছে শিক্ষিত তরুন। হয়ত বড় লোকের বখাটে সন্তান; না না বড় লোক নিয়ন্ত্রিত এই সমাজে বড় লোকের সন্তানদের বখে যাওয়ার সম্ভবনা থাক্লেও, রাস্তায় নামার ইতিহাস নাই। বড়লোকী সমাজ তাদের দোষ গুলো ঢেকে আগলিয়ে রাখে। সজিব তালুকদার বুঝে গেল এ অবশ্যই মধ্যবিত্তের মেধাবী সন্তান। যাদের ধংস অনেকেই চান, এমনকি সমাজের শাসন কর্তারাও। সজিব দ্রুত বাসার নিচে চলে এল। তরুনকে ডেকে তাদের বাসার গ্যারেজের পাশে বাবার গেস্ট রুমে বসাল। অনেক কথা বলতে হবে...... অনেক কিছু জানার আছে। সমাজ সংস্কৃতি, পরিনিতি ; অনেক কিছু!

***
সজিব তালুকদার বয়স ৪৮ বৎসর। অবিবাহিত এবং প্রবাসি। দীর্ঘ ১৫ বৎসর দক্ষিন আফ্রিকার রাজধানীতে চাকুরি করে করে ৬ মাস হল দেশে এসেছে। বিদেশের অনেক কিছুই এইদেশে অচল। তবুও দেশের মংগল করতে সদা মনপ্রান কাঁদে। এদেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর্কিটেকচারে ডিগ্রি করে সে গিয়েছিল বিদেশে, বাবার আগ্রহে। যখন ছাত্র ছিল তখন প্রলেতারিয়েত শক্তির দোসর হয়ে কত স্লোগান দিয়েছে, আন্দোলন করেছে। সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সে সময় সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের আন্দোলন তুঙ্গে। ছাত্রদের মধ্যে বৈষয়িক বিষয় ততটা মাথাচারা দিয়ে উঠেনি। দেশের জন্য এবং নিজেদের জন্য তাদের চিন্তা চেতনায় তেমন কোন সমস্যা করেনি। নীরবে নিভৃতে সেই ছাত্র আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিল এই সজিব। কিন্তু বাবা তার ভিতরের অদম্য যুদ্ধ করার সমাজকে নিয়ে ভাবনার এই ইচ্ছা বুঝতে পেরে, দেশে ছেলেকে রাখতে ভয় পেয়েছেন। সজিব তার জীবনের অনেক কিছুকে ছেড়ে সে সময় বাবার প্রবল ইচ্ছায় এবং চাপে দেশ ছেড়েছে। দেশ ছাড়ার সাথে সাথে হারিয়েছে তার প্রানে উদ্যম আনার কারিগর, তার প্রেয়সি নাহার বানু কে। যে ছিল ততকালিন সময়ের খুব তীক্ষ্ণমেধার এক নারীনেত্রি ! অনেক অনেক বড় বড় নেতাকে বাদ দিয়ে ভালবেসেছিল তাকে, একটি সুখের সংসার করবে বলে। কিন্তু দক্ষিন আফ্রিকার প্রথম ৩ বৎসরের কঠিন সময় পার করতে গিয়ে নাহার বানুকে তার হারাতে হয়। সে এক আলাদা কাহিনী। সজিব তালুকদার আজীবন একাকী থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। সমাজ না তার নিজের ওপর অভিমানে এই ইচ্ছা সে কাউকে খুলে বলেনি ! যেমন এখনও দেশে না বিদেশেই থাকবে স্থায়ীভাবে তা কেউ জানেনা, সজীবও কাউকে জানায় নি !

***
আগত তরুণ অনেক্ষন মাটির দিকে মুখ করে বসে আছে। কি ভাবছে তা স্পষ্ট করে বোঝা যাচ্ছে না। তবে চেয়ারে এত সম্মান করে বসতে দেয়ায় সে কিছুটা অস্বস্থিতে আছে, মুখের চেহারায় এমন মনে হচ্ছে !
সজিবঃ কি খাবে বল?
তরুনঃ কিছুনা, যা দেবেন তাই খাব। আমি সর্বভুক !
সজিবঃ মজার মত কথা বলতে পার, তুমি ! সর্বভুকের খাওয়ার তালিকা কি বলবে?
তরুনঃ যার খাওয়ারই নিশ্চয়তা নাই, তার কি খাদ্য তালিকা থাকে?
সজিব বুঝতে পারে এই তরুনকে হারানো তার কাজ নয়। প্রচণ্ড মেধা আর আক্রোশে তার অন্তরে আলোক দ্যুতি ছড়াচ্ছে। তাই আর কথা না বলে বাসা থেকে সকালের নাস্তা যা হয়েছে ২ জনকে দিতে কাজের ছেলেকে বলে পাঠাল।
সজিবঃ তোমার বাড়ি কই?
তরুনঃ আমি সর্বহারা। আমার কোন বাড়ি নাই।
সজিবঃ কি বল এসব? সত্যি করে বল। কোথায় তোমার বাড়ি, বাড়িতে কে কে আছেন?
তরুনঃ কেউ নাই, কেউ নাই। আমি একা। আমি এই দেশের মালিক !
সজিবঃ হা হা হা। তুমি মালিক? মালিকেরা বুঝি রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে?
তরুনঃ রাস্তায় ঘুরছি নাকি? আমি কষ্ট লাঘবের মন্ত্র খুঁজছি। আমি আমার দেশের ধূলিকণা, মাটি পানি সব ঘুরে ঘুরে পরীক্ষা করে দেখছি, কই আছে কষ্ট লুকিয়ে?
সজিব এই সময় আনমনা হয়ে যায়। প্রবাস জীবনে অনেক টাকা আয় করেছে। কিন্তু নাহার বানুর কথা মনে হলে বুকের ভিতর চিন চিন করে ওঠে। আচ্ছা এই চিনচিনে ব্যথাকে কি কষ্ট বলা যায় ? সেকি কষ্টের কারণ নিয়ে ভেবেছে, ভেবেছে এর উৎস নিয়ে? উৎস বেড় করা ছাড়া কি কোন সমাধান আসে? ছাত্র জীবনে আকাশ ভাইয়ের অর্থনীতি পরেছে অনেক। তার ব্যাখ্যায় বুঝেছে আমার এই দেশ তার সমস্যার উৎসে ভাবে না, তাই আমার দেশের ব্যবস্থাপনায় গোজামিলে ভরা ! কাজের ছেলে নাস্তা নিয়ে আসে। বাথরুম দেখিয়ে তরুণ কে বলা হয় পরিস্কার হয়ে আসতে। তরুণ হাসতে হাসতে বাথ রুমে যায় আর মনের সুখে গান ধরে...
‘আমারও প্রান যাহা চায়
তুমি কি বুঝ সখা ভাবিয়া দেখ
কি ভাল আর কিবা অন্যায়
আমারও প্রান যাহা চায় !’
সজিব বোঝে এইটি তরুনের নিজের বানানো গান। প্রানের মাঝে জমে থাকা বেদনার প্রকাশ ! মান্না দে, না না হেমন্তের কণ্ঠে এই গান আরও সুন্দর হত ! ওর কানে তরুনের কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হয়ঃ
‘তুমি কি বুঝ সখা ভাবিয়া দেখ
কি ভাল আর কিবা অন্যায়... !’

***
তরুণ কে নিয়ে নাস্তা পর্ব সেরে তরুণকে লুঙ্গি দিয়ে গোছল করতে বলে সজিব। কোন মতেই রাজি করান গেল না। তাই সে আবারো গল্প করতে বসল।
সজিবঃ তা দেশের মালিক ভাবছ কেন?
তরুনঃ কেন, আমি কি এই দেশের জনগন নই? আমিই তো মালিক !
সজিব এই উত্তর শুনে হা করে তাকিয়ে থাকে তরুনের চেহারায় ! এক সময়ের প্রলেতারিয়েত সংগঠনের নেতা হয়েও সে কখনো নিজেকে মালিক হিসাবে চিন্তা করেনি তো। কিন্তু তরুনের কথা শত ভাগ ঠিক ! সংবিধানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে জনগণই এদেশের মালিক। দ্রুত এই তরুনের জন্য কিছু করতে ইচ্ছে হয় তার। সজিবও ভাবে এই ছেলের সাথে নিজেও কষ্ট লাঘবের মন্ত্র খুজতে বেড় হবে। একাকী এই জীবনে সে অনেক কিছুই করেছে। কিন্তু জনগনের জন্য না পারুক এই তরুনের কষ্ট যদি সে কিছুটা লাঘব করতে পারে, তো নাহার বানুকে হারানোর গুমরে ওঠা ব্যাথাকে সে কিছুটা কমাতে পারবে ! আবারো এই তরুণকে নিয়ে সে ভাবে। কিভাবে এই তরুণকে লাইনে আনা যায়? সজিবের মনে হয়... কষ্ট কে জানতে কষ্ট নিয়েই নাড়াচাড়া করতে হবে। প্রথমে এই তরুনের খুব গোপন কষ্টে আঘাত দিতে হবে ! কিন্তু কি এই তরুনের গোপন লালিত কষ্ট?
সজিবঃ তা ভাই, তুমি কষ্ট নিয়ে গবেষণা করে কি কি পেলে বলবে? আমিও তোমার সাথে কাজ করতে চাই যে!
তরুণের চোখ চক চক করে জ্বলে উঠে। কোন এক অজানা শিহরণে তরুণ চমকে উঠে, যেন এক মৃদু বজ্রপাতের আলো তার মুখে ঝিলিক দিয়ে উঠল। সজিব বুঝে কাজ হবে ... সে এইবার আবার জিগায়ঃ
সজিবঃ ভাই, তুমি আমাকে তোমার সঙ্গি করবে কি?
তরুণঃ করব। তোমাকে একা নয় গোটা দেশের মানুষ কে নেব, সাথে। কিন্তু...
সজিবঃ কিন্তু কি? এখানে কোন কিন্তু চলবে না।
তরুণঃ এই সঙ্গে নেবার আগে ২ টি কাজ অবশ্যই করতে হবে। কষ্ট লাঘবের মন্ত্র খুজে বেড় করতে হবে আর কষ্ট করার প্রতিজ্ঞা করতে হবে।
এই কথা গুলো খুব গোছালো ভাবে বলা দেখে সজিব ভ্যাবাচ্যাকা খায়। প্রথমে সে ভাবছিল এই তরুন একজন পাগল। সিজোফ্রেনিয়ার কোন রোগী ! কিন্তু এই গুছিয়ে কথা বলা দেখে হটাত মনে হয় কোন গোয়েন্দা সংস্থার গোপন শিকারি নয় তো?
সজিবঃ শোন,তুমি কি কিছু বেড় করতে পেরেছ?
তরুণঃ না, এখনও পাইনি। এদেশের মানুষ সুজুগ সন্ধানী। এরা অন্যের করা কাজে নিজেরা সুবিধা নিতে চায় ! বড্ড সুবিধাবাদী।
সজিবঃ কিন্তু নিজের সুবিধা না পেলে কাজ করে কি লাভ?
তরুণঃ ওহ হো, আর বসা যাবে না... সুবিধবাদিদের এজেন্ট এখানেও...
সজিবঃ এই তুমি আমাকে অপমান করছ। আমি তোমার সাথে থাকতে চেয়েছি ... ভুলে গেলে নাকি !
তরুণঃ উহু হবে না, সুবিধাবাদিরা কষ্ট করে কিছু পেতে চায় না...
সজিবঃ কিন্তু আমি তোমাকে খুব ভালবেসে ফেলেছি। আমি তোমার সাথে থাকতে চাই...
তরুণঃ তুমি আমাকে ভুল বুঝাচ্ছ ! তুমি আমার মোট রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে পারবে না। তুমি পারবে না...
বলেই উঠে পরে। সজিব হাত ধরে তাকে বাসায়। চা আনতে বলে...। কাজের ছেলে চা এনে দেয়। তরুন চুক চুক শব্দ করে চা খায়। যেন কোন এক বিড়াল ছানা বাটিতে করে আসল দুধ মজা করে খাচ্ছে ...!

***
তরুন চুপ করে বসে থাকে। সজিব তালুকদার এক দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে থাকে। কোথায় যেন এক নিমগ্নতা লুকিয়ে আছে এই তরুণের ভিতর ! যত দেখে ততই মায়া পরে যায়। যদি তার কোন ছোট ভাই থাকত ! সেতো একমাত্র পুত্র, একাকী মানুষ !
সজিবঃ এই তুমি গোছল করে ফ্রেস হও, দুপুরেও একসাথে খাব।
তরুণঃ বিরক্ত করছ কেন? খাব কিন্তু গোছল করব না। আমি ঘুমাব। ঘুম থেকে উঠে খেয়ে চলে যাব।
সজিবঃ আমি তোমাকে নিয়ে বুড়িগঙ্গা নদিতে ঘুরতে যাব, যাবে?
তরুণঃ যাব। বুড়িগঙ্গার বুকে অনেক কষ্ট লুকিয়ে আছে, দেখব ও কষ্ট জয় করে কিভাবে বেঁচে আছে !
সজিবঃ তাহলে ঠিক আছে, রেস্ট নাও... বিকেলে বেড় হব !
সজিব কাজের ছেলেকে লক্ষ্য রাখতে বলে উপড়ে দুই তালায় চলে যায়। এই তরুন তার একাকী জীবনের ভাবনায় একটি বড় ধাক্কা দিয়েছে। কি করা যায়...ভাবতে বসে । তরুণের দুর্বলতা এখনও কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। দুর্বল পয়েন্ট বেড় করতে না পারলে... ওকে কাবু করা যাবে না !
দুপুরে চুপ চাপ খেয়ে নেয় তরুন। সজিব বিকেলে ওকে নিয়ে বেড় হয় বুড়িগঙ্গার উদেশ্যে। বুড়িগঙ্গার পানিতে কেমন এক রঙের ছাপ। কেমন এক হাল্কা কিন্তু তীব্র ঝাঁঝাল গন্ধ। যারা ২০ বৎসর আগের নদি দেখেনি, তারা এই গন্ধ পাবে না। নৌকা নদি দেখেনি, তারা এই গন্ধ পাবে না। নৌকা উঠেই তরুন খুব চঞ্চল হয়ে উঠে। অস্থিরতায় নাকি ইচ্ছে করে নৌকাকে দোলাতে শুরু করে। সজিব ভয় পায়না, কারণ সে খুব ভাল সাঁতারু। সজিব তাকে থামতে বললে সে চিৎকার দিয়ে উথে...কেন থামবে? কেন??
সজিবঃ নৌকা ডুবে গেলে মরে যাব। আমাদের কষ্ট লাঘবের সমিকরন কে বেড় করবে?
তরুণঃ আমি বেড় করেই মরব। এই নদিতে অনেক কষ্ট, আমার বোনের জীবনের কষ্ট...।।
সজিবঃ কি বল এসব, তোমার বোন কই পেলে?
তরুণ চুপ মেরে যায়। এক্কেবারে চুপ। সজিব বুঝতে পারে তরুণের মনের কোন গভীরের লুকানো কষ্টে আঘাত পরেছে। সজিব কষ্ট লাঘবের জন্য এই সমিকরনের দিকে মন দেয়। এই তরুণের কষ্ট লাঘবে বোন সুত্র কাজে আসবে ! সজিবের মনে আনন্দের ঝিলিক দেয় !


***
নৌকা ভ্রমন যখন শেষ হয় তখন ঢাকা শহরের প্রতিটি বাড়িতে বিজলি বাতি জ্বলছে। রাত শুরু হয়েছে। তরুন একটি কথাও আর বলেনি। সজিব তাকে নৌকা থেকে নামতে বললে সে চুপ চাপ নেমে যায়। এরপর নদীর পাড় ধরে হাঁটতে শুরু করে। সে কি দ্রুত তার পা চালানো। সজিব দৌড়েও তাকে ধরতে পারেনা। হটাত মনে পরে জেনারেল জিয়ার কথা। সেও এমন করে হাঁটত ! সজিব একবার তার খাল কাটায় সঙ্গ দিতে গিয়ে দেখেছিল... দেশের প্রেমে মানুষ এত্ত জোরে হাঁটতে পারে ! কই গেল সেই সব দিন। এখনকার শাসকদের কি অসীম নিরাপত্তা। এই নিরাপত্তায় যা ব্যয় হয়, তা দিয়ে ৫ বৎসরের নিচের সকল শিশুর চিকিতসা সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। সজিবের মনে কি সব চিন্তা ভর করে। এক চায়ের দোকানের সামনে গিয়ে তরুণ থামে। এতে সজিব তার কাছে আবার আসতে পারে।
সজিবঃ চা খাবে?
তরুণঃ খাব। তুমি খাবে?
সজিবঃ তুমি খাওয়ালে খেতাম !
তরুণঃ হা হা হা,আমাকে কষ্ট দিতে চাও?
সজিবঃ কেন, এখানে কষ্টের কি হল?
তরুণঃ আমি এই দেশের মালিক। আমি কাঙ্গাল ! এই দেশের মানুষ গুলো শাসকদের কৃপার কাংগাল। তুমি আমাকে উপহাস করছ !
সজিব দুই হাতে কানে ধরার অভিনয় করতে থাকে, দেখে তরুন খুব সুন্দর করে হাসে। চুপচাপ চা খেয়ে ওরে রিক্সা নেয়। রিক্সা গিয়ে বুয়েট ক্যাফেটেরিয়ার সামনে থামে ! হটাত করে তরুন কাঁদতে থাকে... এই কান্নার শব্দে বুয়েটের দালান গুলো কেপে উঠে ! তরুণের কান্নার মাঝে একবার একটি নাম মুখে শোনা যায়...রানু ! রানু ফিরে আয় বোন !
সজিব তরুণকে চেপে ধরে শহিদ মিনারের পাদদেশের সিঁড়িতে বসে পরে। সজিবের কিছুই বলা লাগে না, তরুণ বলে যায় তার মনের ভিতরের চেপে রাখা কথাঃ
এই বুয়েটে পড়ার সময় সে যখন ৩য় বর্ষে, তখন একদিন তার ছোট্ট বোন ঢাকায় বেড়াতে আসে। বিকেলে তাকে নিয়ে বুড়িগঙ্গায় নৌকা ভ্রমনে যায়। ছোট্ট বোন দুষ্টুমি করে নৌকা দোলাতে থাকে, সে খুব মজা করে হাসে। তরুণ খুব ভাল সাঁতার পারে বলেই কিচ্ছু বলে না। কিন্তু কি যে হয় নিজের দোলায় নিজেই ছিটকে পরে যায় নদিতে। মাঝি ঝাপ দেয়, সে ঝাপ দেয় কিন্তু কেউ আর তাকে খুজে পায় না... পরেরদিন তার লাশ পাওয়া যায় কেরানিগঞ্জের তীরে... !

তরুন এইটুকু বলেই থেমে যায় । সজিব বলে তারপর ? ...
তরুন চমকে ওঠে। বলে এরপর আমার জীবনের গান থেমে যায়। সব কিছু ছেড়ে দিয়ে কোনমতে ডিগ্রি নিয়ে বেড় হই। রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি সব একাকার লাগে। কোন কাজে মন বসাতে পারিনা। বুঝি কাজে মন বসাতে হলে মনে কষ্ট লাঘব করতে হবে ! কষ্ট লাঘবের এক সমিকরণ বেড় করতে হবে ! আমি এই দেশের মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে এই কষ্টের রঙ, তথ্য উপাত্ত খুজতে শুরু করি... ১০ বৎসরে আমার বন্ধুরা, আমার পরিবার আমাকে পাগল বলে ছেড়ে গেছে... আমি কষ্ট লাঘবের সমিকরণ খুঁজে চলছি ...আজো।

***
সজিব হাত ধরে নিয়ে চলে তরুণকে আবারো ওর বাড়ি। তার মনে দৃঢ় বিশ্বাস এই তরুণের কষ্ট লাঘবের ভিতর দিয়েই নিজের ভিতরের প্রিয়তমাকে হারানোর কষ্ট লাঘবের সমিকরণ পাওয়া যাবে। এতদিন সে কষ্ট চেপে রেখেছে, একাকিত্ব বরণ করে ব্যাথা ভুলে থাকতে চেয়েছে মাত্র! রাতে এক বিছানায় ঘুমায় সজিব তালুকদার আর তরুণ । সকালে নাস্তা খেয়ে দুইজনে বেড়িয়ে পরে শহরে... সজিবের গন্তব্য আপাততঃ শহরের কোন এক ভাল মানসিক হাসপাতালে তরুণের প্রথমতঃ চিকিতসা, এরপর দুইজনের সম্মিলিত চেষ্টায় দেশের মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য লড়াই করা !
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন