বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৮ অক্টোবর ১৯৬৫
গল্প/কবিতা: ৩৭টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

বালুকায় পদচিহ্ন

শ্রমিক মে ২০১৬

ফারাক

শ্রমিক মে ২০১৬

আছমাদের কাব্য

ফাল্গুন ফেব্রুয়ারী ২০১৬

পূর্ণতা (আগস্ট ২০১৩)

মোট ভোট গতি প্রতিবন্ধক

মোঃ মোজাহারুল ইসলাম শাওন
comment ৫  favorite ১  import_contacts ৫৬৮
জরিনা, এই নাম কুদ্দুসের কাছে অতীত। কিন্তু প্রায় ৫ বছর আগে যখন তার মুবাইল ফোনটা পেল, কেন যেন সেভ করে রাখল মনের অজান্তেই। ২ সপ্তাহ আগে ক্লান্ত কুদ্দুস বাসে চড়ে অফিস থেকে ফিরছিল, এমন সময় তন্দ্রালু চোখে বেজে চলা মুবাইল ফোনে তাকিয়ে দেখে জরিনা নামটি ডেকে চলেছে অবিরাম...।
কুদ্দুস বোতাম টিপে জরিনাকে জীবন্ত করল। দূর থেকে ভেসে আসা জরিনার ভাংগা আওয়াজ খুব মায়াবী লাগছিল কুদ্দুসের। জরিনা জানাল যে, প্রায় ১ মাস হলো ছোটমেয়েকে নিয়ে সে ঢাকায় এসেছে কোচিং করাতে, যদি সময় হয় তাহলে যেন দেখা করে। দ্রুত সে তার মেয়ের ক্লাসের দিন গুলো বলে গেল, সেইসাথে সময় এবং ঠিকানা।
বাস্তব ও ব্যস্ততায় কুদ্দুস ঘটনাটা ভুলেই গেছিল। গত রাতে হটাত তার জরিনার ফোনের কথা মনে পড়লো। শুয়ে শুয়ে জরিনার সাথে তার অতীতের কিছুকথা মনে করার চেষ্টা করল। মানুষ তার হৃদয় মাঝে কত শক্তিশালি ভিডিও ধারন করে আছে, মহান সৃষ্টিকর্তার সৌজন্যে, তা কি উপলব্ধি করে ? কুদ্দুছের কাছে একেবারেই জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠল ২৫-৩০ বৎসরের অতীত, যেন এই সেদিনের কথা; একেবারেই রঙ্গিন ভাবে। এ এক অসাধারন অনুভুতি, এক অনন্য শিহরণ!
জরিনার সাথে কুদ্দুছের সেই ৮০র দশকে কলেজ জীবনে পরিচয় হয়েছিল। যৌবনের প্রথমায় জরিনা ছিল যেন এক সাক্ষাৎ উর্বশী! জরিনাকে দেখার প্রথমদিন কিশোর পেরনো কুদ্দুসের মাঝে হটাত করেই কি যেন এক বিদ্যুতের ঝলকানির শিহরণ বয়ে গেলো এবং সারাদিন রাত কাটানোর পর মনে হলো জরিনাকে ছাড়া তার জীবন অচল! যে কোন মুল্যেই জীবনের সাথে তাকে জড়াতেই হবে অথবা জরিনার শরিরের প্রতিটি বাঁকে তার মিশে যেতে হবে। মধ্যবিত্তের উদ্যোমী ভাবালুশ কুদ্দুস, ধর্মের গণ্ডি ভাংগার সাহস করে উঠতে পারলনা বটে , কিন্তু সাহস করে তার সঙ্ঘ বর্জনও করল না। সময় গড়িয়ে চলল। দুই জনেই বুঝে তাদের দুর্বলতা, কিন্তু মুখ খোলেনি কেউই।
সেই ৮০র দশকে উচ্চতর লেখাপড়ার জন্য কুদ্দুস ঢাকায় প্রায় ৪ বছর। তলে তলে বয়স বেড়েছে জরিনার। গ্রামের পরিবেশে বিয়ের জন্যে উঠে পড়েছে সবাই। প্রস্তাব আসছে মন্দ নয়, কিন্তু জরিনার কথায় কেমন যেন নিরমেশ একটা ভাব!
৮৮-৮৯ এর কোন এক ঈদের ছুটিতে কুদ্দুস গেল জরিনাদের বাড়িতে। জরিনার মা, যে কুদ্দুস কে খুব আদর করত, সে কথায় কথায় বলে ফেললঃ “বাবা কুদ্দুস, তোমারে আমার খুব ভালো লাগে। আমার এক ছেলে হয়ে যদি আমাদের সাথে থাকতে...!”
কুদ্দুস স্বভাব দুষ্টুমি ভরেই বললঃ “খালাম্মা, কোন মেয়েকে দিতে চান ?” প্রসঙ্গতঃ জরিনারা ৪ বোন। এবার সরল গ্রাম্যবধু কিন্তু তার চাল দিতে ভুল করলেন না। উনি তার কিঞ্চিত কালো যে মেয়ে, তার জন্য প্রস্তাব রাখলেন।
কুদ্দুস হেসে বললঃ “তা কি করে হয়! ওদেরকে তো প্যান্ট পরা অবস্থায় কাধে নিয়ে ঘুরলাম এইত সে দিন, ওটা সম্ভব নয়”।
জরিনার মা আবার বললঃ “তুমি কাকে নিতে চাও?”
কুদ্দুস বললঃ “ঢাকায় যাই, চিন্তা করে পরে আপনাকে জানাব”।
কুদ্দুস, পরের দিন ওদের বাড়ি থেকে চলে এলো; তার পর ঢাকা। সময় গড়িয়েও গেল কয়েকদিন। পড়ার চাপে ভুলেই গেছিল। আবারো কোন এক বৃষ্টিরদিন তার ঐ কথা মনে পড়লো। কাগজ কলম নিয়ে খালাআম্মাকে লিখতে বসল এবং শেষমেশ মনের কথা জানালঃ “যদি জরিনারে দিতে আপত্তি না থাকে, তবে আমি বিয়ে করতে আপত্তি করব না”।
পত্র আলাপের দিনের কথা । কোন খবর নাই। চিঠি পেয়েছে কিনা জানার উপায়ও নাই, অপেক্ষা করা ছাড়া ! সবরে মেওয়া ফলে। অপেক্ষা মানুষকে দৃঢ় বানায়। ৩ মাস পর উত্তর এলো, কিন্তু খালাম্মার নয়, সরাসরি জরিনার চিঠি।
জরিনা লিখেছে ২ পাতার ঘন চিঠি। এই ৩ মাস সে নিজের সাথে এবং পরিবারের সাথে যুদ্ধ করেছে। জয়ী হয়েই আমাকে এ পত্র লিখছে। বিরাট পত্রের মাঝামাঝি কোড করে লেখাঃ “আমার এইবুক, শুধু তোমারি অপেক্ষায় চিতার আগুন নিয়ে জ্বলছে। তুমি, হে আমার জীবনের রাজপুত্র! এসে, নিবাও সেই জ্বালা!”
কুদ্দুস গোটা চিঠির মাঝের এই কোড করা চরন বারবার পড়ে আর ভাবে, কি আছে ঐ বুকের আগুনে! কুদ্দুস দগ্ধ হতে উন্মুখ, কিন্তু ... ... ... বিরাট এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে যায় কুদ্দুসের মনের অজান্তেই! সেদিনের সেই কিন্তুর উত্তর হলো আজকের অবস্থান। দায়ী কুদ্দুস নয়, জরিনাও নয়... ...দায়ী ওদের পরিবার! তারা একমত হতে পারে নি।
আজ মধ্য বয়েসে জরিনার ডাকে কি দেখা করা যায়? জীবনের এইরুপ দন্দকে অতিক্রম করে বাস্তবের পোড়খাওয়া কুদ্দুস জরিনার মুখোমুখি হল। সেই লাবন্য না থাকলেও পটলচেরা চোখের চাহুনি ছিল প্রায় আগের মতই। বুকের অচেনা গহিনে কাপন ধরায় যে শক্তি ! কুদ্দুস সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
জরিনা মৃদু কণ্ঠে বললঃ “আরে, আপনি এমন হয়েছেন কেন? আমি তো চিনতেই পারিনি!”
মনের আসল কথা কিনা বুঝা গেলনা! এই ২৩ বছর পর, নিশ্চয় কুদ্দুসের রাজপুত্রের মত থাকার কথা নয়? বাস্তবতার কষাঘাতে জঠোরের জ্বালায় কুদ্দুসেরতো এমন থাকারই কথা! কি জানি, প্রেম এবং এর মাঝের সানিত শক্তি হয়ত সবসময় ধীমান পুরুষকেই কল্পনা করে... সব নারী, সব সময়...! নারিদের সময় জ্ঞা্‌ন, অর্থ জ্ঞানের চেয়ে বেশি নয় বলেই কুদ্দুসের একান্ত ভাবনা। তাই, জরিনার এই কথায় কুদ্দুসের চোখেমুখে তেমন ভাবান্তর দেখা গেল না।

তারপর জীবন যুদ্ধের কিছুকথা হলো দুইজনের মধ্যে, প্রায় ১ ঘণ্টা যাবত। খুব কাছে নয়, স্বাভাবিক দুরুত্বে কোচিং সেন্টারের সোফায় বসে কাটল সময়। কাটল অতীত, অতীতের মুগ্ধতা মাখা নীরব স্মৃতি!
সময় বড়ই নির্মম...বহমান, নিষ্ঠুর! কিন্তু মন মায়াবি, কেউ তাকে তার মুগ্ধতা থেকে ফেরাতে পারে না। যত কথাই হোক না কেন, কোথায় যে এক ভালোলাগা ভালোলাগা অনুভুতি বিরাজমান। মনের এই দুর্বার শক্তিই মানুষ কে বাঁচায়।
ক্ষুধার্ত কুদ্দুসের এক সময় বাড়ি ফিরতেই হয়। আস্তে বিদায় নিয়ে লিফটের জন্য অপেক্ষা করে লিফটের সামনে। পাশে জরিনা প্রায় দৌড়ে এসে দাঁড়ায়। হটাত লিফট এসে পড়ায় দ্রুত কুদ্দুস উঠে পড়ে লিফটে। পিছনে ক্ষিন কণ্ঠের আওয়াজঃ “আবার আসবেন!”
দ্রুত ধাবমান লিফটে চড়ে কুদ্দুস ভাবে, জীবন কে যত গতি দিয়েই চালানো হোক না কেন, অতীতের কোন একমুহূর্ত তাকে ধীর গতিতে চলতে বাধ্য করবেই। ঠিক যেন মহাসড়কের গতি প্রতিবন্ধকদের মত...! জীবন কে আনন্দ-অশ্রু দিয়েই চালাতে হবে, মানুষ কোথায় যেন অসহায় !
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন