বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭৬
গল্প/কবিতা: ৩টি

শৈশব (সেপ্টেম্বর ২০১৩)

মেঘের কোলে রোদ হেসেছে

বিদিশা চট্টপাধ্যায়
comment ৯  favorite ০  import_contacts ৪৬১




টি ভি তে ডোরেমন দেখছে রিংগো। ডোরেমনের কাছে একটা অদ্ভুত গ্যাজেট। এমন একটা ক্যামেরা যাতে টাইম আর ডেট ঠিক করে দিলে তাতে অতীতের সেই দৃশ্য দেখিয়ে দেয়। সোনার হার, আংটি চুরি যাচ্ছে বাড়ী থেকে। তারই তদন্তে একে কাজে লাগানো হচ্ছে। ক্লাইম্যাক্সের মুহূর্তে বিরতি। বিরতির সময় রিঙ্গো মীনামাসির মোবাইলে গেমস খেলে। এমন কিছু মহার্ঘ মোবাইল নয় মীনামাসির। আদ্যিকালের লজঝড়ে একটা সেট। এখানে ওখানে সেলোটেপ দিয়ে এঁটে এর ধিকিধিকি প্রাণবায়ুকে জিইয়ে রাখা হয়েছে। বাবা-মার মোবাইল এর থেকে হাজার গুন উন্নত হলেও তাতে ওর হাত দেওয়া মানা। তাছাড়া বাবা-মা দুজনেই আইটি সেক্টরে চাকুরিরত। কতটুকুই বা তাদের কাছে পায় রিংগো। সকালে চরম ব্যাস্ততার মধ্যে বাবা-মা দুজনেই হেভী ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে যায় আটটা নাগাদ। তখন হয়তো সবে রিঙ্গোবাবুর ঘুমটা ভেঙেছে। গুডবাই কিসি দিয়ে দুজনেই ---লক্ষ্মী হয়ে থেক কিন্তু/ দুষ্টুমি করবে না/ মন দিয়ে লেখাপড়া করবে/ খেয়ে নেবে সব / মিনামাসিকে বেশী জ্বালাবে না ইত্যাদি জ্ঞ্যানগর্ভ বাণী শুনিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বেড়িয়ে যান। ফিরতে ফিরতে সেই সন্ধে সাতটা – আটটা। সারাটা দিন শুধু সে আর মিনামাসি।

আজকে আর ইস্কুলে যেতে হবেনা রিঙ্গোকে। মিনামাসিই বলেছে। গতকাল থেকে গাটা কেমন ছ্যাঁকছ্যাঁক করছে। গলার কাছটা ব্যাথা-ব্যাথা। ঢোঁক গিলতে গেলে লাগছে। রিঙ্গোর আবার ফ্যারেঞ্জাইটিসের প্রবলেম আছে। খেতে ভালই বেগ পেতে হচ্ছে। তবু মিনামাসি এক বাটি দুধ- করনফ্লেক্স সামনে নিয়ে এসে হাজির। দেখেই মুখটা বেঁকাল রিঙ্গো। নাঃ তার একদম পছন্দ নয়। কষ্ট করে যদি খেতেই হয় তাহলে ম্যাগি বা পাস্তার জন্য কষ্ট করবে। দুধ- করনফ্লেক্সের জন্য নৈব নৈব চ! মিনামাসিও কম যায় না ।
---না খেলে মোবাইল নিয়ে গেমস খেলাও বন্ধ।
---ওই তো দু-চারটে গেমস। খেলতে খেলতে বোর হয়ে গেছি। আরও কটা লোড করতে পার না।
---এতেই আমার চার্জ ফুরিয়ে যাচ্ছে। বলে কিনা আরও!চল চল খেয়ে নাও। লক্ষ্মী ছেলের মত খেয়ে নাও । নাহলে মাম্মা-পাপাকে বলে দেব কিন্তু।
-এইজন্য তোমাকে ভাললাগেনা মিনামাসি! ঠিক আছে আমি খাব কিন্তু আমাকে বারান্দায় নিয়ে যেতে হবে। ওইটুকু বেরোলে কিছু হবে না।

রিঙ্গোর আবার অ্যাকুইট ডাস্ট অ্যালার্জি আছে। সবসময় পল্যুশান মাস্ক পড়ে বেরোয়। তাই তাদের একতলার বসত বাড়ী ছেড়ে বারোতলার এই আকাশচুম্বী ফ্ল্যাটে শিফট করেছে।
বারান্দায় নিয়ে এল মিনামাসি । এক ফালি স্বচ্ছ নীল শরতের আকাশ। অন্যান্য হাই রাইজ বিল্ডিং-এর জন্য দিগন্ত বিস্তৃত সুনীল আকাশ যার মাঝে ইতস্ততঃ সাদা মেঘের ভেলা ভেসে বেরাচ্ছে---এমন কিছু দেখার অবকাশ নেই। সেই এক টুকরো আকাশে ঘুড়ি উড়ছে এবং জানান দিচ্ছে সামনেই বিশ্বকর্মা পুজো। আর এক মাস বাদেই দুর্গা পুজো। লাল-সাদা-হলদে-নিল ঘুড়ি। আবার কিছু ঘুড়ি অ্যাড-এর পাতা কেটে বানানো। এদের আকাশে লড়ালড়ি আর ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে রিংগো দুধ করনফ্লেক্স গলাধঃকরন করে নিয়েছে।
---আচ্ছা মিনামাসি ,তুমি ঘুড়ি ওড়াতে জান?
---ছোটবেলায় দাদার সাথে কত উড়িয়েছি। সুতোয় মাঞ্জা দেওয়ার যা রেলা ছিল না!
----আমায় একটা ঘুড়ি এনে দেবে মিনামাসি।আমিও ওড়াব।
---না না একদম না । পাপা-মাম্মা বকবে।
---প্লিজ ,কেউ জানতে পারবে না। আমি আর তুমি এই বারান্দা থেকেই ওড়াব।
--- ওরে বাবারে! তারপরে দাদা বৌদি জানতে পারলে আর রক্ষে নেই।
---তুমি মিছিমিছি এত ভয় পাচ্ছ।

স্কুলে গেলে বন্ধুদের সাথে দিনটা কেমন কেটে যায়। তারপর আঁকার ক্লাস, ক্যারাটে ক্লাস , গীটার শেখা, সাঁতার, প্রাইভেট টিউটর --- ছোটাছুটির শেষ নেই। পরশু দিন আবার ম্যাথস আর ইংলিশ টেস্ট আছে রিঙ্গোর। অনিচ্ছা স্বত্তেও কম্পিউটার অন করল। মেরিটনেশান ডট কমে গিয়ে পড়াশোনা শুরু করল। অ্যানিমেশানের সাহায্যে এখানে লেখাপড়াটা করতে মন্দ লাগে না। তাছাড়া মিস কিংবা স্যারেদের চোখ রাঙ্গানিও নেই। নিজে স্বাধীনভাবে পড়াশোনা কর। ঘন্টাখানেক পড়ে উঠে পড়ল রিঙ্গো । জ্বরটা এবার ভাল মত আসছে। হাতপাগুলো ব্যাথা করছে। চোখটা টনটন করছে। মিনামাসি প্যারাসিটেমল দিল। মাথা ধুয়ে, গাটা স্পঞ্জ করে অল্প একটু ভাত খেয়ে রিঙ্গো শুয়ে পড়ল। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে রিঙ্গো স্বপ্ন দেখল সে বড় একটা নদীর ধারে তাদের দেশের বাড়ীতে গেছে। একটা বড় মাঠে অনেক অনেক বন্ধুদের সাথে খেলা করছে।বল এর পায়ে ওর পায়ে ঘুরে ঘুরে----সে এক তুমুল হইচই আর উত্তেজনা।


রাজা ঘড়ি দেখতে জানে না ঠিকই কিন্তু নটা বাজে কখন তা সে এতদিনে ভালভাবেই বুঝে গেছে। যখনই ঘড়িটা ট্র্যাফিক পুলিশের মত বাঁ হাত ওপরে তুলে দিয়ে ছয় আর ডান হাত দিয়ে চার মারা দেখায় তখনই নটা বাজে। রাজা তাড়াহুড়ো করতে থাকে। দশটায় তার ক্লাস আছে। তাদের পথশিশুদের ইস্কুলে এখন এক নতুন দিদিমনি এসেছেন। ভীষণ কড়া। দেরী হলে ভীষণ বকেন। দিদিমনি বলেছেন তাঁকে ঘড়ি দেখা শিখিয়ে দেবেন। টাকাপয়সা গোনা শিখিয়ে দেবেন। হিসাব করা, জমা-খরচ—সব। শুধু রোজ ইস্কুলে আসতে হবে আর মন দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। আরে আরে ওটা কি রে? মোবাইল নাকি রে! সেলোটেপ আঁটা। ধুস! ফালতু পিস। কিন্তু এ তো চলছে দেখছি। থাক। পকেটে থাক। এদিক ওদিক আরও কটা জিনিস কুড়িয়ে নিয়ে রাজা জোরে পা চালাল। স্নানটা সেরে ছুটে গিয়ে ক্লাসে ঢুকতেই ঘণ্টা পড়ে গেল। দিদিমনি একটু রাগত চোখে তাকালেন। কাঁচুমাচু মুখ করে রাজা ক্লাসের এক কোনে গিয়ে বসে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করল। ইদানীং লেখাপড়াটা তার ভালই লাগে। আজকাল কুড়িয়ে যদি পেনটা বা পেনসিলটা পায় তাহলে আর বিক্রি করে না। তার আর তার ছোট বন ফুলির জন্য রেখে দেয়।অন্য ভাই বোন দুটো নেহাতই শিশু। দিদিমনি বলেছেন,
---রাজা তুমি দারুন ব্রাইট ছেলে। তোমার মাথা পরিষ্কার। মন দিয়ে লেখাপড়া করলে আমি তোমাকে সাহায্য করব প্রতিষ্ঠিত হতে। এই পাতা-কাগজ কুড়ুনির জীবন থেকে তুমি বেরিয়ে আসতে পারবে। মাথা উঁচু করে বাঁচবে ।
লেখাপড়ার পর তাদের ভরপেট খাওয়ার ব্যাবস্থা থাকে। আজ ভাত ডাল আলুসেদ্ধ আর ডিমের কারী। আধখানা করে ডিম ওদের প্রত্যেকের ভাগে জোটে। আগে সেও অন্যদের মত এই খাবার লোভেই আসতো। এখন ইস্কুলেও মন বসে গেছে। ক্লাস থেকে বেরিয়ে গঙ্গার ধারে এল রাজা। এই বিরাট নদীর ওপর অনেক বড় ব্রিজ। তারই একটা লোহার পিলারের খাঁজে সে বই খাতা রাখে। ওদের বাড়ী ঘরদোরের এমন অবস্থা যে, যে কেউ অসাবধানতার চোটে বেচে দিতে পারে । কিংবা ঝড়জলের দিনে ঘরে জল ঢুকে সব গ্রাস করে নিল। ইঁদুর- আরশোলাদের আড্ডাও ওদের বাসস্থানে কম নয়। সাবধানের মার নেই! তাই ও নিজ দায়িত্বে অনেক উঁচুতে এক লোহার থাম্বার এক খাঁজে মা সরস্বতীকে সুরক্ষিত রাখে। বাঁদরের মত দক্ষ হাতে পায়ে তরতর করে উঠে গিয়ে বইখাতাগুলো রেখে আসে প্রতিদিন। জুত করে নদীর জলে পা ডুবিয়ে বসতেই মোবাইলটা কেমন সুরেলা সুরে বেজে উঠল। চমকে উঠল রাজা।পথেঘাটে লোকজনকে চলতে ফিরতে কথা বলতে দেখেছে সে মোবাইল হাতে। কিছুটা আন্দাজ তো আছেই। তাই সে হাতে নিয়ে সবুজ রঙের ফোন আঁকা চিহ্নটা টিপে কানে ধরল।
---হ্যালো, কে বলছেন?
----আপনি কে বলছেন?
---আমি রিঙ্গো।
----আমি রাজা।
----এই ফোনটা কি করে পেলে?
----বাসস্ট্যান্ডে কুড়িয়ে পেয়েছি।
----এটা আমার মিনামাসির ফোন। মাসি রোজ বাসে করে আসে তো, হয়তো পড়ে গেছে। এটা মাসির কাছে না থাকলে মাসির ভারী অসুবিধে হয়।আমারও।
---মিনামাসির বাড়ী কোথায় বল, আমি গিয়ে দিয়ে আসব।
----আচ্ছা ওটা কিসের আওয়াজ?
---ওই একটা নৌকা গেল। নৌকা দাড় বাইছিল, তাইতে জলের আওয়াজ হচ্ছিল।
---তুমি বুঝি কোন নদীর সামনে বসে আছ?
---হ্যাঁ, আমি তো রোজই এই সময় আসি। নদীর পাড়ে বসে থাকতে আমার খুব ভাললাগে। মাথার ওপর বিশাল আকাশ আর সামনে বিরাট নদী দেখলে মনের প্রসারতা বাড়ে--- এমনটা আমার দিদিমনি মনে করেন।
---ও তোমারও বুঝি আনটি আসে পড়াতে?
---অ্যান্টি? কই না তো! আমার ইস্কুলের দিদিমনি।
---তুমি কোন ইস্কুলে পড়?
---আঁধারমনি, আমাদের পথশিশুদের স্কুল।
---পথ শিশু! মানে তুমি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াও সারাদিন!কি মজা গো তোমার!
---সেরকমই। নানান জিনিস কুড়িয়ে বেড়াই। তারপরে আমাদের একটা বিশেষ জায়গা আছে ,সেখানে গিয়ে বিক্রি করি। না হলে আমাদের চলে না। দু বেলা খাবার জোটে না। আমরা চার ভাই বোন। বাবা নেই। মা লোকের বাড়ী কাজ করে।
---আই অ্যাম সরি রাজা। আমি ভাবলাম তোমার বুঝি খুব মজা। তবে তোমার অনেক ফ্রিডম। আবার রেস্পন্সিবিলিটিও আছে।
---তোমার সব কথা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
---আরে ছাড়ো তো! জান তো আমাদের দেশের বাড়ীতে, মানে দাদুর কাছে যেতে হলে একটা বড় নদী পেরোতে হয়। অনেক ছোটবেলায় নৌকা করে গেছিলাম। ওপরে কত্ত বড় আকাশ। এখানে হাই রাইজ বিল্ডিং এর চোটে আকাশ দেখাই যায়না। কাক চড়াই আসে না। আমাকে একদিন পাখিদের আওয়াজ শোনাবে রাজা!
---নিশ্চয়ই শোনাবো ।এ আর কি এমন কথা! আমার মা যে বাড়ীতে কাজ করে,তাদের বাড়ীতে চন্দনা পাখি আছে। কি সুন্দর কথা বলে ।তোমাকে শোনাবো একদিন। আর আমাদের ইস্কুলের পাশে যে বটগাছটা আছে তাতে অনে—ক পাখির বাসা। আমি গাছে উঠে মোবাইলটা অন করে দেব।



মন দিয়ে রিঙ্গো অংক কষে যাচ্ছে। পাপা-মাম্মা প্রমিস করেছে সামনের ম্যাথস টেস্টে ফুল মার্কস পেলে মিনামাসিকে নতুন মোবাইল সেট কিনে দেবে। মাসির লজ্জার অন্ত নেই।
---কি যে কর না রিঙ্গোবাবু! আমি ঠিক পুরনো ফোনটা খুঁজে নিতাম। ওই কাগজকুড়ুনী ছেলেগুলোকে ধরলেই পাওয়া যেত।
সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে ওঠে রিঙ্গো।
---না না মাসি,ওই ফোনটা আর চলত না। তোমার নতুন ফোনে আরও বেশী আর ভাল ভাল গেমস থাকবে।
----সেটাই হচ্ছে আসল কথা। তাই তো রিঙ্গোবাবু।
রিঙ্গোবাবু কিন্তু আসল উদ্দেশ্য তার মনের মণিকোঠায় সযত্নে তুলে রেখেছে। ওই মোবাইল দিয়ে, রাজার চোখ দিয়ে সে রোজ প্রকৃতির মানসভ্রমনে বেরোয়। রাজা কোনদিন তাকে জলের কলকল শব্দ শোনায় তো পরক্ষনেই পাখিদের শিস। আবার কোনদিন হাওয়ার শরশরানি অথবা পাতার মর্মরধ্বনির ফাঁকে কোকিলের কুহু তান। ভাগ্য ভাল থাকলে টিনের চালে টাপুরটুপুর বর্ষারানীর নূপুরধ্বনি। রিঙ্গো তখন চোখ বন্ধ করে এক অভূতপূর্ব অনাস্বাদিত মানসলোকে বিচরণ করে। থেকে থেকেই এই খোলা আকাশ-নদী-নালা-পাখ-পাখালির জন্য তার মনটা হু হু করে ওঠে।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন