বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৮৫
গল্প/কবিতা: ১২টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৩৯

বিচারক স্কোরঃ ২.৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮৯ / ৩.০

বড় চাচা

রম্য রচনা জুলাই ২০১৪

ভালোবাসার পত্র

ভালবাসি তোমায় ফেব্রুয়ারী ২০১৪

সাধের পাবলিক বাস

ক্ষোভ জানুয়ারী ২০১৪

দেশপ্রেম (ডিসেম্বর ২০১৩)

মোট ভোট ২২ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৩৯ বিরল দেশপ্রেম

জায়েদ রশীদ
comment ৯  favorite ০  import_contacts ৪৫৯
তেঁতে ওঠা চওড়া ব্রীজস্টোন টায়ারগুলো প্রায়ই আর্তনাদ করে উঠছে। তাতে কি, মাজদা আরএক্সএইট ২০০৮ মডেলের ছাব্বিশশো সিসির ইঞ্জিনটা ভালই সামলে নিচ্ছে। অবশ্য বাংলাদেশ সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স প্রথমে রাজী ছিল না। কিন্তু মারুফের পিড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত গাড়িটা জুটেছে। আর তাই সবসময় খুব যত্নের সঙ্গে কাদা-ধুলো এড়িয়ে চলে। কিন্তু এখন কাজের সময়, গাড়ির সর্বোচ্চ অবদানটাই ও আশা করছে। ওর চঞ্চল চোখদুটো ঘনঘন রিয়ারভিউ মিরর থেকে ঘুরে আসছে। নাহ, পেছনে কোন ছায়াও নজরে আসছে না। কিন্তু ও নিশ্চিত, প্রতিবেশী দুটো দেশই ওকে সার্বক্ষণিক নজরদারীতে রেখেছে। একটি ওর নিজ মাতৃভূমি, অন্যটি ভারত। অথচ আশ্চর্য ব্যাপার, মাথার ওপর শান্ত গোধূলির ঐ বর্ণীল আকাশ দেখলে মনেই হবে না বর্ডারের দিকে ধেয়ে চলা এই মারুফকেই হন্যে হয়ে খুঁজছে দুটি দেশ। তাও আবার গত আড়াই ঘণ্টা যাবৎ!

মারুফের ভাগ্যটা নেহাতই ভাল বলতে হবে। কারণ বিষয়টা প্রায়োরিটি লেভেল এক্সট্রিম আর টপ সিক্রেট ইনফরমেশন সার্ভিস এর আওতাধীন হওয়ায় দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করা যাচ্ছে না। শুধু সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ ইউনিট মারুফের পিছু নিয়েছে।

মারুফের ডানহাতটা স্টিয়ারিং খামচে ধরেছে। অন্য হাতটা ক্লাচের সঙ্গে সঙ্গে গিয়ার চেঞ্জে ব্যস্ত। এরই ফাকে ও একবার প্যান্টের পকেট হাতড়ে নেয়। যাক, মোবাইলটা আছে। হ্যাঁ, যথেষ্ট দামী মোবাইলই বটে! হালের আইফোন ফাইভ এস গোল্ড। কিন্তু সেটা কোন বিষয় না। ব্যাপার হল ২০০ কিলোবাইটেরও ছোট একটা ফাইল আজ দুপুরে ও মোবাইলে লোড করেছে। আর সোর্স ডকুমেন্ট গুলো করাপ্ট করে দিয়েছে। হ্যাঁ, ছোট্ট একটা ফাইল মাত্র। কিন্তু নিমেষেই ধূলিসাৎ করে দিতে পারে দীর্ঘদিনের বন্ধু দুটো রাষ্ট্রের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক। এমনকি যুদ্ধ ঘোষণাও হয়ে যেতে পারে যে কোন মুহূর্তে। কারণ স্বার্থ রক্ষায় কোন রাষ্ট্রই তিল পরিমাণ ছাড় দেয় না। বরং ভয়ঙ্কর বিষয় হল তথ্য সবাই নিজের মত ব্যাবহার করতে চায়। আর তা যদি স্পর্শকাতর হয় তবে তো কথাই নেই। কিন্তু এই দুর্ঘটনার শর্ত একটাই। তথ্যটা পৌঁছতে হবে যে কোন এক রাষ্ট্রের হাতে। কিন্তু কী সেই তথ্য? নির্ভুল না বানোয়াট? তার থেকেও বড় কথা সঙ্গে মোটিভ আছে। কিন্তু এ তো হতেই পারে... আজকাল দিনে-রাতে তো কত তথ্যই চুরি হয়। বিষয়টা এখানে থেমে গেলেই বুঝি ভাল ছিল কিন্তু কান গরম করা ব্যাপার হল তথ্যসুত্র ১৯৭১ সাল!

ব্রিগেডিয়ার নওরোজের মুখটা মনে ভাসছে মারুফের। কী দুঃখেই না চুল ছিঁড়ছে লোকটা। নিজেই ইন্টেলিজেন্সকে দায়িত্ব দিয়েছিল তথ্যটা উদ্ধারের জন্য। কিন্তু হিসেবে ছিল সামান্য ভুল। আর তা হল মারুফকে লোকটা আমলে নেয়নি। কাজ আদায়ের পর মারুফকেও নিভিয়ে দিতে চেয়েছিল চিরতরে। প্রমাণ বলে কথা! হাজার হলেও নওরোজের কাছে মানুষের গুরুত্ব তথ্যকে ছাপিয়ে যাবে... এ যে অসম্ভব। নওরোজের দুর্ভাগ্য যে ইন্টেলিজেন্সের সবচেয়ে তুখোড় ছেলেটাই এ দায়িত্ব পেয়েছিল। সেই ছেলে বয়সে তরুণ হলেও দায়িত্ব সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল। আর মারুফের সৌভাগ্য যে, দীর্ঘ কাজের অভিজ্ঞতা ওকে প্রাণনাশের হুমকি থেকে বেঁচে থাকতে তৃতীয় দরজা খোলা রাখতে শিখিয়েছে। আর তাই কোন রকম গোলাগুলি ছাড়াই মোবাইলটা নিয়ে গাড়ির কাছে আসতে পেরেছিল। তারপরের কৃতিত্বের দাবীদার উজ্জ্বল রঙের মাজদা গাড়িটা। মারুফের জীবনের অনেকগুলো অভিযানের উজ্জ্বল সাক্ষী হয়ে আছে এই কিংবদন্তীর ফোর হুইলার। আর তাই ও আদরও করে খুব।

সন্ধ্যা প্রায় হল হল। মারুফও চাইছে পৃথিবীতে দ্রুত অন্ধকার নেমে আসুক। গা ঢাকা দেয়ার জন্য এই একবিংশ শতাব্দীতেও ব্যাপারটা অসাধারণ কাজ দেয়। কিন্তু ওর স্বপ্ন কর্পূরের মত উড়িয়ে দিয়ে উদয় হল কপ্টারের শব্দ। ক্রমশই এগিয়ে আসছে শব্দটা। মারুফও গাড়ি ছোটাল তুমুল গতিতে। কিন্তু আর কত জোরে ছুটবে! গাড়ি স্পোর্টসকার হলেই তো হবে না, রাস্তাটাও সেরকম হওয়া চাই। ওদিকে রাস্তার সামান্য এবড়ো থেবড়ো গর্তে পড়ে ভয়ানকভাবে দুলে উঠছে গাড়িটা। মারুফ বুঝতে পারছে... বিপদ একেবারে মাথার উপর এসে পড়েছে। এমন সময় মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে ওপর থেকে সার্চ লাইটের আলো এসে চোখে বিঁধল। মারুফের মনে হল যেন, অন্ধকার হাইওয়েতে সূর্যের আলো উদয় হল। তীব্র আলোর ছটায় দূরের রাস্তা সব অস্পষ্ট হয়ে গেল। সামনের সোজা রাস্তায় একটা মোড় থাকলেও এখন আর কিছুই বোঝার উপায় নেই।

গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে মারুফের মস্তিষ্কও ধেয়ে চলেছে ভয়ানক গতিতে। এখন কী করবে মারুফ? গাড়ি থামাবে? দিয়ে দেবে মোবাইলটা ওদের হাতে? ধ্বংস হয়ে যাক দেশ... দেশের মানুষ, ওর কী? প্রাণে তো বেঁচে যাবে। কিন্তু নওরোজ আছে ওদের পিছে। ও কী মারুফকে এত সহজে ছেড়ে দেবে? যদি মেরে ফেলার হুকুম থাকে? অর্থাৎ দাঁড়াচ্ছে যে মারুফ মরুক কী বাঁচুক, তথ্য নিয়ে ওরা দুই দেশে একটা বৈরী সম্পর্ক ঠিকই তৈরি করবে। দেশের শান্তি বিনষ্ট হবে। আর যদি মারুফ তথ্য না দেয়... আইন অমান্যের দরুন দেশদ্রোহী সাজানো হবে ওকে। যে সিক্রেট ইন্টেলিজেন্সে ওর এত সুনাম, ওদেরকেও হয়তো বুঝ দেয়া হবে সেভাবেই। দেশের ষোল কোটি মানুষের হৃদয়ের ঘৃণার বিষবাষ্প নরকে বসেও অনুভব করবে মারুফ। তবে ও কোন পথ বেছে নেবে... আসাইনমেন্ট, না বিবেক? দায়িত্ব না দেশপ্রেম?

রাস্তার দুপাশে শুধুই আঁখক্ষেত। আর একটু এগুলেই বাংলাদেশের বর্ডার, তারপর মায়ানমারের সীমানা শুরু। একবার ওদের ভেতর ঢুকতে পারলে মোটামুটি নিরাপদ। অন্তত মারুফের পেশায় বর্ডার পাস কোন ব্যাপার না। পরে ভেবেচিন্তে পরবর্তী পরিকল্পনা নেয়া যাবে। কিন্তু এখন মারফের মনে হচ্ছে কূটনৈতিক স্বার্থ না, দেশের স্বার্থ তথা মানুষের স্বার্থটাই বড় হওয়া উচিৎ। জীবনের মায়া ত্যাগ করেই ওর প্রতিটি পদক্ষেপ। কিন্তু তাই বলে অন্ধের মত দায়িত্ব পালন করে দেশের শান্তি ছিনিয়ে নেয়ার অধিকার ওকে কে দিয়েছে? মারুফ লক্ষ্য করল, কপ্টারটা ওকে অনুসরণ করছে ঠিকই কিন্তু এখনও একটি গুলি ছোড়েনি। অর্থাৎ ওরা তথ্যের জন্য ওকে জীবিত চায়। মারুফ এক মুহূর্তে ভেবে নেয় সবকিছু। তারপর ধীরে ধীরে নামিয়ে শূন্যে আনে স্পীডমিটারের কাটা। সুইচ টিপে ফুয়েল কাভার খুলে ফেলে। তারপর গিয়ার নিউট্রাল করে হ্যান্ডব্রেক টেনে দেয়। একদম স্থির হয়ে যায় উন্মত্ত গাড়িটা। মারুফ বাঁহাতে সীটবেল্ট আর ডানহাতে শার্টের বোতাম খুলতে থাকে। তারপর গা থেকে শার্টটা খুলতে খুলতে দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসে। ওপরে ততক্ষণে আনাউন্স শুরু হয়ে গেছে। গাড়ির বনেটের ওপর হাত ছড়িয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়তে বার বার করে বলা হচ্ছে। কিন্তু মারুফের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। বরং ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ওকে সাহস দিচ্ছে, ওরা গুলি করবে না। কপ্টারের তীব্র সার্চ লাইটে ও সাবলীল ভঙ্গীতে গিয়ে ফুয়েল কাভারের সামনে দাঁড়াল। ইচ্ছে করেই একটু আড়াল করে রাখল শার্টটা। ডানহাতে মোবাইলটা কপ্টারের উদ্দেশে উঁচিয়ে ধরল আর বাঁহাত পিঠের আড়ালে রেখে শার্টটাকে ফুয়েল টাঙ্কের ভেতর দ্রুত গুঁজে দিল। প্রায় পুরোটা শার্ট ভেতরে ধুকতেই হেঁচকা টান দিল। অকটেনের ঝাঁঝাল গন্ধে বুঝল শার্টের ভেজা অংশ বেরিয়ে এসেছে।

এর পরের কাজটা অবশ্য খুবই সহজ। মোবাইলটা ফুয়েল টাঙ্কে পুরে লাইটার জ্বালান। আর শেষ দৃশ্যটা আন্দাজ করা পাঠকের জন্য কঠিন হবে না। তবু পাঠ সুবিধার্থে..., মারুফ দ্রুত আঁখক্ষেতে অদৃশ্য হয়ে যায়। কপ্টারটাও তড়িঘড়ি ওপরে উঠে যায়। বিকট শব্দে অন্ধকার চিরে আলোকিত হয়ে ওঠে মাজদা আরএক্সএইট ২০০৮ মডেলের ঝকঝকে গাড়িটা। শুধু রয়ে যায় অচেনা এক অঙ্গার মূর্তি। যেন অনল ঝাণ্ডা তুলে পৃথিবীকে জানান দিচ্ছে প্রভুর দেশপ্রেম। আর সেই অনবদ্য প্রেমে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আর যুদ্ধ-বিগ্রহের আতিশয্য।


[মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও সর্বোপরি দেশের প্রতি অকৃত্তিম শ্রদ্ধা নিবেদন পূর্বক উল্লেখ্য যে উল্লিখিত গল্পের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, চরিত্র ও কাহিনীচিত্রের পুরোটাই কাল্পনিক। এর সঙ্গে বাস্তব জীবনের কোন যোগসাজশ কিংবা সামঞ্জস্যতার উদয় হলে তা নিতান্তই কাকতালীয় বলে গণ্য হবে।]
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন