বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৫ আগস্ট ১৯৮২
গল্প/কবিতা: ১৫টি

রাত্রি

রাত মে ২০১৪

স্বপ্নের খুব কাছে

কৈশোর মার্চ ২০১৪

বেঁচে থাকার মুহুর্ত

ভালবাসি তোমায় ফেব্রুয়ারী ২০১৪

ক্ষোভ (জানুয়ারী ২০১৪)

টানাপোড়েন

ইন্দ্রাণী সেনগুপ্ত
comment ১৮  favorite ০  import_contacts ৫১০

-‘তাহলে আইডি কার্ডটা আমাকে দিয়ে যাও’
-‘আমার সময় হবেনা,তুমি এসে নিয়ে যাও’
-‘এখন যাব?’
-‘এখন না,আমি বাইরে। কাল সকালে এস’
-‘কিন্তু,আমি তো রাতে ও বাড়ি চলে যাচ্ছি’
-‘তাতে কি ? সকালে এসে নিয়ে নেবে’
-‘এক্সট্রিম সাউথ থেকে এক্সট্রিম নর্থে আসতে হবে আমায়। স্কুলটা তো ঐ দিকেই’
-‘তার আমি কি করতে পারি? নিজের মেয়ের জন্য এইটুকু করতে পারবেনা?’
রাগে গা’টা জ্বলে যাচ্ছিল সমন্বিতার। সাথে তীব্র অপমানবোধ। ভিড় বাসে দাঁড়িয়ে জবজবে ঘামে ভিজে যাচ্ছে শরীর,সাথে কিছু কৌতুহলি চোখের দৃষ্টি,বুঝতে পারছিল সমন্বিতা, অনেকেই কান খাড়া করে শুনছে তার একতরফা সেলফোনে কথোপকথন আর সেই সঙ্গে মনগড়া কল্পনাও হয়ত করে ফেলছে অনেকেই। আরো অস্বস্তি হচ্ছিল সেই কারণে। কিন্তু, কিছুই করার নেই। কথা তাকে এখনই বলতে হবে। মিতুনকে হস্টেল থেকে কাল নিয়ে আসবে সমন্বিতা, ওর স্কুল ছুটি পড়ছে। রাজীবের সাথে ঠিক হওয়া কোর্টের শর্ত অনুযায়ী এই ছুটিটা মিতুন কাটাবে সমন্বিতার সাথে। কিন্তু, রাজীবটা এতই অসভ্য, ইচ্ছে করে হ্যারাস করছে ওকে, বুঝতে পারছে সমন্বিতা। কিন্তু, কিছু উপায় নেই। মেয়েকে কাছে পেতে ঐ অসভ্য লোকটার ইতরামি সহ্য করে যেতেই হবে। যথাসম্ভব সহজ গলায় সমন্বিতা বলল –‘তুমি বললে সেটাই করতে হবে।কিন্তু, কার্ডটা আজ পেয়ে গেলে আমার সত্যিই খুব সুবিধা হত। কোন উপায়ই কি নেই?’
ওপাশে নীরবতা ক্ষণিকের। সমন্বিতার মনে হল যেন অদৃশ্য চোখদুটো সেলফোন ভেদ করেই জরিপ করছে তাকে। অবশেষে উত্তর মিলল –‘ঠিক আছে,ন’টা নাগাদ এস,আমি ফিরে আসব’
-‘ন’টা! তাহলে আমি ও বাড়ি যাব কখন?’
-‘সেটা তোমার হেডেক, আমার নয়’
কট করে কেটে গেল ফোনটা। -‘কি অসভ্য ছেলে রে বাবা’। বেশ জোরেই বলে ফেলল সমন্বিতা। কৌতুহলি লোকজন আবার ফিরে তাকিয়েছে। কিছুটা সঙ্কুচিত হয়ে গেল ও। মনে হল যেন ওর সব কথাই প্রকাশ হয়ে পড়েছে এই অচেনা মানুষগুলোর কাছে। ব্যাগের চেন খুলে ফোনটা ঢুকিয়ে রাখল সমন্বিতা,ভিড় বাসে ফোন হাতে নিয়ে দাঁড়ান মুশকিল। সামনের সিটের ভদ্রমহিলা অকাতরে ঘুমোচ্ছেন,মুখটা হাঁ হয়ে আছে অনেকটা।কাছাকাছি খালি হওয়ার আশা আছে বলে মনে হয়না। এই ভিড় গরম চ্যাঁচামেচিতে কি করে ঘুম আসে কে জানে! আধঘন্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থেকেও বসার জায়গা পেলনা সমন্বিতা,স্টপেজ এসে পড়াতে ঠেলেঠুলে নেমে পড়ল কোনক্রমে। মনটা বিরক্তিতে ভরে আছে। রাত ন’টায় রাজীবের ওখানে গেলে আর কি ও বাড়িতে যাওয়া হবে আজ! অথচ যাওয়াটা খুব দরকার ছিল, কাল সকালে মা’কে নিয়ে ব্যাঙ্কে যাওয়া আছে একদম ফার্স্ট আওয়ারে, সেখান থেকে মিতুনের হস্টেল। দেখা যাক যাওয়া যায় কি না। না হলে কাল ভোরে বেড়িয়ে পড়তে হবে। এলোমেলো ভাবনাতেই ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়ল সমন্বিতা। এখন সবে পাঁচটা বাজে। এত তাড়াতাড়ি কোনদিনই বাড়ি ফেরে না ও। আজ অফিসে হাফ ডে নিয়ে কিছু প্রয়োজনীয় কাজ সারতে হয়েছে, তাই এত জলদি। রাজীবের ওখানে রাত ন’টায় যাওয়া, সাড়ে আটটাতে বেরলেই হবে। হাতে এখনও সাড়ে তিন ঘন্টা সময়। চায়ের জল বসিয়ে হাত মুখ ধুয়ে এল। বারান্দার বেতের চেয়ারে শরীর এলিয়ে চায়ের কাপ হাতে কেটে গেল আধঘন্টা। এবার ঘর গোছানোর পালা। কাল মেয়ে আসছে মাস সাতেক পরে। মাঝে দেখা হয়েছিল কয়েকবার, কিন্তু সে তো পনের মিনিট করে হস্টেলের গার্ডিয়ান্স মিট রুমে। টুকটাক ছুটিছাটায় রাজীবের ওখানেই যায় ও। কোর্টের অর্ডার সেরকমই। সমন্বিতা বছরে দু’বার এক সপ্তাহের জন্য মেয়েকে কাছে রাখতে পারে শুধু। বছরের এই দু’টো সপ্তাহের অপেক্ষাতেই কেটে যায় দিনের পর দিন। মিতুনের ঘরটা ভাল করে পরিস্কার করা হল। গোলাপি রং মিতুনের ভীষণ প্রিয়। এই ঘরটার রং তাই গোলাপি, একটা গোলাপি আর লালের প্রিন্টেড বেডকভার পাতল সমন্বিতা। মিতুনের জন্য কেনা নতুন জামাকাপড়গুলো গুছিয়ে রাখল আলমারিতে। বাথরুমে নতুন গোলাপি টাওয়েল রাখল একটা। কাজ সেরে ঘরের দরজা ভেজিয়ে রেখে নিজের ঘরে গেল ও। জামাকাপড় পাল্টে বিশ্রাম নিল কিছুক্ষণ। পৌনে আটটা বাজে প্রায়,চোখটা লেগে এসেছিল, ঘোর কাটল সেলফোনের আওয়াজে, ওপাশে রাজীব।
-‘বল’
-‘আজ আমি ফিরতে পারছি না, স্যরি!’
-‘মানে! তাহলে আমি কার্ডটা নেব কি করে?’
-‘নেবে না’
-‘মানে?’
-‘মানে এই উইকটা ও আমার সাথেই কাটাবে’
মাথাটা দপ করে উঠল সমন্বিতার –‘এ আবার কি ইয়ার্কি হচ্ছে?’
-‘ইয়ার্কি না,সত্যি। এই উইকটা ও যাচ্ছে না তোমার কাছে’
-‘অসভ্যতামোর একটা লিমিট আছে। কোর্টের অর্ডার তুমি অস্বীকার করতে পার না!’
-‘অর্ডারে বলা ছিল তেমন বিশেষ কারনবশত আমি মেয়েকে নাও ছাড়তে পারি’
-‘হ্যা,কিন্তু, যথাযথ কারণটা কোর্টে বলতে হবে’
-‘বলব’
-‘কি বলবে?’
-‘কারণটা’
-‘তুমি এরকম করতে পার না!’
চিৎকার করে উঠল সমন্বিতা, অনেকটা আর্তনাদের মত শোনালো যেন নিজের কানেই।
-‘স্যরি সমা, এই উইকটা ও আমার কাছেই থাক’
ফোনটা কেটে গেল। কিছুক্ষণ হতবুদ্ধি বসে রইল সমন্বিতা, তারপর ভেঙে পড়ল কান্নায়।লোকটা সারাটাজীবনে শান্তি দিল না একদন্ড। কতদিন ধরে অপেক্ষা করে আছে সপ্তাহটার জন্য। প্রচন্ডভাবে আকাঙ্কিত কোন বস্তু না পাওয়া গেলে কষ্টটা আরো তীব্র রূপ নেয়। কিছুতেই মেনে নিতে পারে না সমন্বিতা এই অসহায়তা। বারবার ফোন করে রাজীবের সেলে,কিন্তু সুইচড অফ! বাড়িতে গিয়েও লাভ নেই কোন, জানে সমন্বিতা, লোকটা বাড়িতে থাকবে না। নিঝুম বসে থাকে সমন্বিতা, ঘন্টার পর ঘন্টা একই ভাবে। চোখের জল শুকিয়ে আসে একসময়।ক্রোধের মাত্রা বাড়তে থাকে ক্রমশ।ইচ্ছে করে এই খেলাটা খেলল লোকটা, শুধুমাত্র সমন্বিতাকে আরো অসহায় করে দেওয়ার জন্য। সমন্বিতাকে কষ্ট দিয়ে চিরকালই লোকটা সুখ পেয়ে এসেছে। এতটা নির্দয় এতটা ক্রুর একটা মানুষ, এই মানুষটার সাথে পাঁচ পাঁচটা বছর কাটিয়েছে সমন্বিতা,ভাবলেই ঘৃনায় কুঁকড়ে যায় শরীর। এত সহজে ব্যাপারটা ছেড়ে দেবে না সমন্বিতা,কোর্টে অ্যাপিল করবে কজ ভেরিফিকেশানের জন্য। তেমন বিশেষ কারন ছাড়া রাজীব মেয়েকে ছাড়তে বাধ্য। আবোলতাবোল চিন্তার মাঝে কখন যেন চোখটা লেগে এসেছিল। ঘুম ভাঙল ভোরের নরম আলোয়। সারারাত জানলাটা হাটপাট খোলা, পর্দাটাও দেওয়া হয়নি। তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে হাতমুখ ধুয়ে নিল। চা খেতে খেতে কি যেন ভাবল একবার, চটপট উঠে রেডি হয়ে নিল, ঘড়িতে তখন সাড়ে ছ’টা। এই সকালে রাজীব বাড়িতে থাকবে নিশ্চয়ই।একবার শেষ চেষ্টা করে দেখা যাক। সমন্বিতার ফ্ল্যাট থেকে রাজীবের বাড়ি অটোতে মিনিট পনের লাগে। ব্যাগ কাঁধে বেড়িয়ে পড়ল সমন্বিতা। অটো থেকে নেমে পাঁচ মিনিটের হাঁটা রাস্তা পেরিয়ে এসে দাঁড়াল অমৃতভবনের সামনে,বহুকাল বাদে। বাড়িটার সামনে এসে কেমন যেন একটা কষ্টের অনুভূতি চাড়িয়ে গেল শরীরে। পাঁচ বছর সময়টা হয়ত খুব বেশি নয়, খুব কমও কি? দুঃখের হোক, অপমানের হোক, বিষাদের হোক, অথবা সুখের, তবু তো স্মৃতি। সময়ের ঘেরাটোপে আটকে পড়া প্রায় ভুলে যাওয়া অনুভূতিগুলো আবার জীবন্ত হয়ে উঠল যেন এই বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে। অবশ হয়ে আসা শরীরটা টেনে নিয়ে সমন্বিতা এগিয়ে গেল গেটের দিকটায়। বড় একটা তালা ঝুলছে গ্রিলের দরজায়, ভেতরের কাঠের দরজাটাও তালা বন্ধ। নাহ, আর কোন উপায় নেই। সুড়কি ফেলা রাস্তা ধরে ফিরে চলল সমন্বিতা। পিছনের বাড়িটা দাঁড়িয়ে রইল একা। একা সমন্বিতাও। জমে থাকা ক্রোধ পরিণত হল অদ্ভুত এক বিষন্নতায়।


কেটে গেল মাসখানেক। সমন্বিতা আবার ফিরে এসেছে নিজস্ব ছন্দে। কোর্টে ভেরিফিকেশানের অ্যাপিল করা হয়েছে, এখনও উত্তর মেলেনি,উত্তরের আশা যদিও দুরাশা,তবু সমন্বিতা একেবারে নিরাশাবাদী নয়।অফিসে প্রচুর খাটুনি গেছে আজ, মাথাটা ধরে আছে। একটা স্যারিডন খেয়ে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল সমন্বিতা। রান্না করতে ইচ্ছে করছে না আর,রাতে ইচ্ছে হলে একটু আলুসেদ্ধ ভাত ফুটিয়ে নেওয়া যাবে। মিনিট কুড়ি পর মাথাব্যাথাটা কমতে শুরু করল আস্তে আস্তে, ওষুধটা কাজ করছে। ঘন্টাখানেক পর, প্রায় ঘুমিয়েই পড়েছে, হঠাৎ করে বেজে উঠল সেলফোনটা, একরাশ বিরক্তিতে হাতে নিল সমন্বিতা, অচেনা একটা নম্বর। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না একফোঁটাও,সাইলেন্ট করে দিল কলটা। কিন্তু,কেউ একজন যোগাযোগের জন্য ব্যগ্র,একের পর এক কল করেই চলেছে, চারটে মিসড কল হয়ে গেল। আবার বাজছে ফোনটা। নাহ, কারো তো বিশেষ কোন দরকারও হতে পারে, ফোনটা এবার ধরল সমন্বিতা –‘বলছি’
-‘মা!’
ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হ্রদযন্ত্র। এ কার গলা শুনছে ওপারে! ধড়মড় করে উঠে বসল ও –‘মিতুন!!’
-‘হ্যাঁ মা’
-‘তুই! কোথা থেকে!’
-‘হসপিটাল’
-‘কেন? ওখানে কেন!’
-‘বাবা এখানে ভর্তি মা’
-‘সেকি! কি হয়েছে বাবার?’
হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল মেয়েটা।
-‘হ্যালো হ্যালো! মিতুন কথা বল মা!কি হয়েছে বাবার?’
কিছুক্ষন পর ওপাশে একটা ভারি কন্ঠস্বর শোনা গেল –‘নমস্কার মিসেস মুখার্জী, আমি ডঃসিনহা কথা বলছি। আপনার হাজব্যান্ড, ইয়ে মানে, এক্স-হাজব্যান্ড আমার আন্ডারে ভর্তি আছেন। আপনি হয়ত জানেন ওনার অসুখটা। মিস্টার মুখার্জি আমাকে আপনার সাথে যোগাযোগ করতে বলেছেন আপনাদের মেয়ের ব্যাপারে। আপনার নম্বরটা আমি ওনার কাছ থেকেই পেয়েছি’
-‘আমি জানি না। কি হয়েছে ওঁর !’
-‘ওহ সর্যি ম্যাডাম। উনি তাহলে আপনাকে ইচ্ছে করেই জানাননি। আসলে ওনার লিউকেমিয়ার লাস্ট স্টেজ, অসুখটা আজকের দিনে অনেকাংশেই কিয়োরেবল, কিন্তু ওনারটা এতটাই দেরিতে ধরা পড়েছে যে আর কিছুই করার নেই। আপনি কাল একবার চলে আসুন প্লিজ’
-‘আমি এখনই যাব’
-‘কিন্তু,এখন তো প্রায় ন’টা বাজে। আপনার বাড়ি তো নর্থতে। এটা কিন্তু এক্সট্রিম সাউথ’
-‘আপনি জায়গাটা বলুন,আমি আসছি’
লোকেশানটা বুঝে নিয়ে ফোনটা রেখে হতভম্বের মত বসে রইল সমন্বিতা। মিনিট দুয়েক। সময় নেই আর। অফিসের শাড়িটা ছাড়া হয়নি ফিরে, ব্যাগ গুছিয়ে বেড়িয়ে পড়ল রাস্তায়। রাতের দিকে একা ট্যাক্সিতে ওঠা নিরাপদ নয়, তবু আজ আর উপায় নেই। বড়রাস্তার মোড়ে একটা ট্যাক্সি পাওয়া গেল। উঠে বসল সমন্বিতা। দ্বিধাবিভক্ত মন আর অসাড় শরীরটা নিয়ে ছুটে চলেছে ট্যাক্সি রাতের শহর পেরিয়ে। নিয়নবাতিগুলো হুশহুশ করে ছুটে চলেছে অতীতে। শহর এখন জমজমাট। ফুটপাতে ব্যস্ত মানুষজন, রাস্তায় ব্যস্ত যানবাহন,এগিয়ে চলেছে নিজস্ব গন্তব্যে। সার সার হেডলাইটের আলো ছুটে চলেছে আপন কক্ষপথ ধরে। শুধু দ্বিধাবিভক্ত সমন্বিতার একাংশ বারবার পিছিয়ে পড়ছে পনের বছর আগের ফেলে আসা সময়ের কাছে, যে সময়ের সবটাই স্বপ্ন, সবটাই সুন্দর,সবটাই জীবনে পরিপূর্ণ। তেইশের সমন্বিতা আর পঁচিশের রাজীব হেঁটে চলেছে কলেজস্ট্রিটের বইপাড়া ধরে, বাঁ হাতের তর্জনী জড়িয়ে রেখেছে ডানহাতের তর্জনীকে। আরো একটু এগিয়ে চলে সময়। সমন্বিতা ছাব্বিশ, নতুন বউ এসেছে অমৃতভবনে, শাঁখ-উলু-পাড়াপড়শি- আত্মীয়স্বজনে বাড়িটা সরগরম। শ্বাশুড়িমায়ের হাত ধরে লাল পায়ে এগিয়ে চলা ভিতরবাড়িতে। তারপরের দু’টো বছর কেটে যায় স্বপ্নের মত। কোলজুড়ে আসা ছোট্ট মেয়েটাকে ঘিরে তাদের সুখি দাম্পত্য। দিনগুলো এগিয়ে চলে ঝড়ের গতিতে, যেন স্পর্শ করার আগেই ফুরিয়ে যায়। পাঁচটা বছরের স্মৃতিতে পরিপূর্ণ মন। কিন্তু,অদ্ভুত! তার পরের স্মৃতিগুলো আর মনেও নেই সে ভাবে। কত বিতৃষ্ণা,কত অপমান লাঞ্ছনা, কত হতাশা, কিন্তু কই সেভাবে তো মনে করতে পারছেনা সমন্বিতা। কোথায় যেন পড়েছিল, মানুষ যা মনে রাখতে চায়না, অবচেতন সেগুলোকে মুছে ফেলে স্মৃতি থেকে। সত্যিই তাই। খারাপ সময়টা সত্যিই মুছে গেছে, সেই সময় পেরিয়ে কাছে চলে এসেছে ঐ পাঁচটা বছরই। ভাবনার জালে আটকে থাকা মন আবার ফিরে আসে বাস্তবে, ট্যাক্সি এসে দাঁড়িয়েছে হাসপাতালের গেটে। টাকা মিটিয়ে নেমে পড়ে সমন্বিতা। ডঃসিনহা অপেক্ষা করছিলেন চেম্বারে –‘আসুন ম্যাডাম,বসুন’
যন্ত্রচালিতের মত বসে পড়ে সমন্বিতা।
-‘মিতুনকে খেতে পাঠিয়েছি সিস্টারের সাথে,চলে আসবে এখুনি’
-‘ও কেমন আছে’
-‘ভাল না ম্যাডাম,আপনাকে তো বললাম, লাস্ট স্টেজ। এখন সেন্স প্রায় নেই বললেই চলে’
-‘আমার সাথে তো মাসখানেক আগেই কথা হয়েছিল’
-‘তখন অনেকটা ভাল ছিলেন। অবশ্য জানতেন নিজের শরীরের কথা। আমি বলেছিলাম ওনাকে, ডেস আর নাম্বারড। তারপর তো দিন পনের কোথায় উধাও হয়ে গেলেন মেয়েকে নিয়ে,বললেন জীবনের সব আনন্দ একবারেই শুষে নিতে হবে ডাক্তার,আর তো সময় নেই।আমি যেতে বারণ করেছিলাম,কিন্তু শুনলেন না। মেয়ের সাথে পাহাড় সমুদ্রে ঘুরে ঘুরে যখন আর শরীর সায় দিচ্ছে না একেবারেই,তখন ফিরে এলেন কলকাতায়। আমাকে অবশ্য বলেছিলেন আপনার সাথে যোগাযোগ করতে ওনার অবর্তমানে। কিন্তু,এখন ওনার যা অবস্থা, আমার মনে হল আপনাকে জানানো উচিত। কতরকম সেন্টিমেন্ট জড়িয়ে থাকে এক একটা সম্পর্কে’
কিছুক্ষণের নিরবতা। সমন্বিতা বসে রয়েছে মাথা নিচু করে। ফোঁটা ফোঁটা জল ভিজিয়ে দিচ্ছে কোলের ওপর রাখা হ্যান্ডব্যাগটা।
-‘আপনি কি একবার দেখবেন ওনাকে?’
চোখ তুলে তাকাল সমন্বিতা।
-‘আসুন,আসুন আমার সঙ্গে’
ডঃসিনহার পিছন পিছন সমন্বিতা এগিয়ে চলল আই সি ইউর দিকে। কাঁচের দরজা ভেদ করে ঢুকল শীততাপ নিয়ন্ত্রিত চারবেডের কামরায়। ৩০৪ নম্বর পেশেন্ট রাজীব মুখার্জি। অক্সিজেন মাস্ক,রাইস টিউব,স্যালাইন, আরো হাজারটা নলে বেষ্টিত শরীরটা দেখে চেনা যায় না হঠাৎ করে। শরীরটা শুকিয়ে যেন মিশে গেছে বিছানার সঙ্গে। ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া শীর্ণ হাতের আঙ্গুলগুলো কেঁপে উঠছে মাঝে মাঝে। কি অসহায় মানুষটা। শুষ্ক চোখে তাকিয়ে রইল সমন্বিতা। বুকটা ফেটে যাচ্ছে কেন! কেন কষ্ট হচ্ছে শ্বাস নিতে! কেন মনে হচ্ছে সারাটা পৃথিবী একটা শূণ্যস্থান ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষটা তো ছিলই না তার কাছে, আজ না হয় পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে যাওয়ার সময় আসন্ন, তাতে সমন্বিতার কি আসে যায়! কত মানুষই তো চলে যাচ্ছে পৃথিবী ছেড়ে প্রতিমুহূর্তে। আরও একটা সংখ্যা বাড়বেই না হয়। সমন্বিতার জীবনে তো কোন বদল আসা উচিত নয় এই কারণে। তবু কেন মনে হচ্ছে জীবনটা অর্থহীন হয়ে গেল হঠাৎ করে!
-‘চলুন ম্যাডাম,বেশিক্ষণ থাকা উচিত হবে না’
সমন্বিতা বেড়িয়ে এল কামরা থেকে। ডাক্তারের চেম্বারে বসে রয়েছে মিতুন। মা’কে দেখে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল কোমর, কেঁদে ভাসাচ্ছে মেয়েটা। মেয়ের মাথায় হাত দিতেই কান্নার দমক বেড়ে গেল আরো।
-‘আপনি ওকে আপনার সাথে নিয়ে যান ম্যাডাম’
-‘কিন্তু...’
-‘অনেক রাত হয়ে গেছে অবশ্য,আমি আপনাদের ফেরার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি’
ব্যস্ত হাতে ফোন লাগালেন ডঃসিনহা। নিজের ড্রাইভারকে ডেকে পাঠালেন।
-‘আমার আজ নাইট শিফট। আমার ড্রাইভার আপনাদের পৌঁছে দেবে’
-‘আমি মায়ের কাছে যাব। ওখান থেকে যাওয়া আসার সুবিধা হবে, কাছেই একদম’
-‘বেশ। ড্রাইভারকে রাস্তাটা বলে দেবেন একটু’
মেয়েকে সঙ্গে করে সমন্বিতা বেড়িয়ে পড়ল হাসপাতাল থেকে। হঠাৎ করে সব কেমন যেন ওলটপালট হয়ে গেল। এত একাকিত্ম এত শূণ্যতা কার কাছে বন্দক দেওয়া ছিল কে জানে!
মিতুনকে রাতে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে ওর দিম্মা। সকাল আটটা বেজে গেছে, মেয়ে এখনও ঘুমোচ্ছে। ঘুমোক। যতক্ষণ পারে থাক স্বপ্নের জগতে। ঘুমই মানুষকে মুক্তি দিতে পারে সাংসারিক শোক দুঃখ থেকে,সাময়িক মুক্তি অন্তত। সমন্বিতা স্নান সেরে তৈরি হয়ে নিচ্ছে, যেতে হবে হাসপাতালে। ফোনটা বেজে উঠল হঠাৎ -‘হ্যালো’
-‘হ্যালো ম্যাডাম,আমি জীবক থেকে বলছি’
-‘হ্যাঁ হ্যাঁ বলুন’
-‘৩০৪ নম্বর পেশেন্ট ডিটরিয়রেট করছে। আপনি এখুনি চলে আসুন’
ফোন রেখে দিল সমন্বিতা। প্রচন্ড এক তোলপাড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে অন্তর। এবার বোধহয় শেষবেলা আসন্ন। যেই মানুষটাকে গত দশবছর ধরে কেবল ঘৃনাই করে গেল, আজ তার মৃত্যুচিন্তায় নিজের অস্তিত্বই হারিয়ে যাচ্ছে কেন! অদ্ভুত মানুষের চরিত্র! দরজা খুলে বেরতে যাবে, আবার ফোনকল।অচেনা নম্বর। ধরবে কি ধরবে না ভেবে ধরেই ফেলল সমন্বিতা –‘হ্যালো’
-‘নমস্কার। আমি অ্যাডভোকেট রায় কথা বলছি’
-‘বলুন’
-‘মিস্টার মুখার্জি আমাকে অ্যাপয়েন্ট করেছেন। আপনাদের মেয়ে মিতুন মুখার্জির কাস্টডি উনি ট্রান্সফার করতে চান আপনার নামে। কাগজপত্র সব রেডি। আপনার বাড়িতে গিয়ে একদিন সই করে নিয়ে আসতে হবে শুধু। কবে যাব একটু বলবেন প্লিজ। হ্যালো ম্যাডাম, আপনি শুনতে পাচ্ছেন? হ্যালো হ্যালো হ্যালো .........’
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন