বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৬ এপ্রিল ১৯৬২
গল্প/কবিতা: ৫টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

জীন যখন বন্ধু

ভৌতিক নভেম্বর ২০১৪

অচেনা মন

দেশপ্রেম ডিসেম্বর ২০১৩

একটি ছবির জন্য

শৈশব সেপ্টেম্বর ২০১৩

প্রত্যয় (অক্টোবর ২০১৪)

যাবো কী যাবো না

মোহাম্মদ সালেক
comment ৪  favorite ০  import_contacts ৫৭৮
তুমি আজ কতদূরে......
রাত্রির নীরবতাকে বিদীর্ণ করে ইথারে ইথারে ছড়িয়ে পড়ে বড় সকরুন সুর। না, জগস্ময় মিত্র নয়, গান গাইছে সবুজ পাগলা। সবুজ পাগলা মোটেই পাগল নয়; উচ্চ ডিগ্রীধারী এবং উপজেলা হাসপাতালের প্রধান ডাক্তার। নিয়মিত অফিস করে। সরকারি ওষুধ পথ্য যাতে রোগীরা ঠিকমত পায়, সে ব্যাপারে তীক্ষ্ণ নজর রাখে। রোগী দেখার ক্ষেত্রে নিজেও ফাঁকিবাজি করে না, কাউকে করতেও দেন না। কিন্তু অফিস ছুটির পর সেই যে বাসায় ঢুকে, পরদিন অফিসে যাওয়ার আগে আর বের হন না। কারো সাথে মেলামেশা করে না। ফার্মেসী ওয়ালারা অনেক চেষ্টা করেও বিকেলবেলা বসার জন্য রাজি করাতে পারে নি। আসলে বলা যায় যে সবুজই দেশের একমাত্র ডাক্তার যে জীবনে একদিনের জন্যও প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে নি। সবুজ বিয়ে থা করে নি। তার বাসায় একজন পুরুষ চাকর আছে। সবুজ অফিসে যাবার ঘণ্টা খানেক পূর্বে প্রতিদিন আসে আর সবুজ ফেরার ঘণ্টা আধেক পরে চলে যায়। এই সময়ের মধ্যে সে ধোয়া-মোছা, রান্না-বান্না, হাট-বাজার সব শেষ করে। সবুজকে নিয়ে পাড়া-পড়শিদের কৌতূহলের অন্ত নেই। কিন্তু কৌতূহল মেটানোর সুযোগও তারা পায় না। তাই শেষমেশ আড়ালে-আবডালে নাম দিয়ে দিল ‘সবুজ পাগলা’ ওরফে ‘পাগলা ডাক্তার’। আরেক গ্লাস হুইস্কি পান করে ডাঃ সবুজ। এ বদ অভ্যাসটা আগে ছিল না, সম্প্রতি ধরেছে। বেশ কিছুদিন যাবৎ সবুজ বড্ড নস্টালজিয়াতে ভুগছে। সুতরাং সে মদের নেশায় চুর হয়ে সে সব ভুলে যেতে চায়। কিন্তু স্মৃতি বড় জ্বালা! যত বার ভাবে সব ভুলে যাবে, তত যেন বেশী করে মনে জাগে। স্মৃতি ভারাক্রান্ত বেদনা বহন করতে করতে সবুজ এখন প্রায় নিঃশেষ। অনেক ভেবে চিন্তে সে চরম সিদ্ধান্তটি নিয়েই ফেলেছে। কি হবে বেঁচে থেকে ? সোহানা নেই। অতএব, তারও বেঁচে থাকার কোন মানে হয় না। অবশ্য সোহানা সবুজের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে অনেক অনেক আগে, সে তো প্রায় তিরিশ বছর হবে। তার পরেও তো এই পৃথিবীতেই ছিল। তাই পৃথিবীটাও ছিল আলোকময়। কিন্তু দিন দশেক আগে অফিসে গিয়ে সহকর্মীদের মুখে শুনে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে ডাঃ সোহানা চৌধুরী মারা গেছে। প্রথমে পাত্তা দেয় নি। ভেবেছিল কত সোহানাই তো দুনিয়াতে আছে। কিন্তু পরে বিস্তারিত খবর নিয়ে যখন জানল যে, এই সোহানা আর কেউ নয়, তার সেই সোহানা, তখন থেকেই দুনিয়াটা আঁধার হয়ে আসতে থাকে। সোহানাশূন্য পৃথিবীর কোন রূপ-রস নেই। অতএব, এই পৃথিবী থেকে সে চিরবিদায় নেবে। দরকার হলে সে আত্নহত্যা করবে। কারণ ভাগ্যলিপিতে লেখা মৃত্যুর দিন-ক্ষণ কত দূরে ? কে জানে ? আজ তার সেই নির্ধারিত দিনটি। সময়টিও ঠিক করা আছে। রাত ঠিক ১২-০০ টার সময় কর্মটি সারতে হবে। তাহলে তার সিদ্ধান্তের সত্যতা বজায় থাকবে, অর্থাৎ আজ-ই হবে তার জীবনের শেষ দিন। আচ্ছা! সোহানা তো তার হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হল না কেন ? দায়ী কে ? সোহানা ? সে ? নিয়তি ? সোহানার সাথে প্রথম পরিচয়! সেই ছোট্ট বেলায়; ক্লাস টু থেকে। সবুজ প্রথম হত, সোহানা হত তৃতীয়। ক্লাস টেন পর্যন্ত এটাই ছিল বাঁধা সিরিয়াল। মাঝখানে আকাশ হত দ্বিতীয়। আকাশ আর সোহানার মাঝে নাম্বারের ব্যবধান খুব বেশী ছিলনা। বেশ কয়েকবার ত্রৈমাসিক/ষাণ্মাসিক পরীক্ষায় সোহানা আকাশকে পিছনে ফেলেছিল। কিন্তু সবুজ ছিল ওদের নাগালের বহুত বাইরে। এস.এসসি পরিক্ষার পর সবাই আলাদা হয়ে গেল। সবুজ ভর্তি হল ঢাকা কলেজে, সোহানা হলিক্রসে আর আকাশ নটরডেমে। দেখতে দেখতে দু’বছর কেমন করে যেন চলে গেল। কারো সাথে কারো কোন যোগাযোগ হয় নি। একে অন্যের হদিস পেল উচ্চমাধ্যমিকের ফল বিবরণীতে। তিনজনেই বোর্ডে স্ট্যান্ড করেছে। সবুজ সপ্তম, আকাশ দ্বাদশ, সোহানা সতেরতম। তারপর আবার বেশ কয়েক মাস কেটে গেল ভর্তির দৌড়াদৌড়িতে। সবুজ ভর্তি হল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে। পরিচিত এক ছাত্রের কাছে শুনল যে আকাশ ভর্তি হয়েছে বুয়েটে। তবে সোহানার কোন খবর পেল না। ১ম বর্ষের ১ম ক্লাস শুরু হওয়ার দু’দিন আগে ঘুরতে গেল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে; অনেকটা মনের অজান্তেই। এই যে, সবুজ! দাঁড়াও। নারী কণ্ঠের ডাক শুনে থমকে দাঁড়াল সবুজ। তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। আরে! সোহানা যে, কি করছ এখানে? কি করছি মানে ? ভর্তি হয়েছি। পরশু ক্লাস শুরু। আগেভাগে একটু দেখতে এলাম। তা, তুমিও কি এখানে ভর্তি হয়েছো ? হাঁ, মৃদু মাথা নেড়ে সবুজ জানায়। বাহ! খুব ভাল হল। একরাশ হাসি ছড়িয়ে পড়ে সোহানার ঠোঁটে, মুখে, চেহারায়। মূল কথা এ টুকুই। বাকীটুকু তেমন কিছুনা; তোমার বাবা মা কেমন আছে ইত্যাদি। সোহানার সাথে আরো একটা মেয়ে ছিল। তাই কথাবার্তা বেশী এগোয় না। তিন-চার মিনিটের কথা শেষে বিদায় নেয় সবুজ। বাসায় ফিরে আসে, মনে কেমন একটা আজব অনুভূতি। নিজেও ঠিকমত বুঝেনা। ক্লাস শুরুর কয়েক মাস না যেতেই সবাই জানল যে সবুজ এবং সোহানা পরস্পরের পরিচিত এবং ঘনিষ্ট। তাদেরকে একটা জুটি হিসেবে সবাই মেনে নিল এবং অনেকে ঈর্ষা করতে লাগল। সবুজ সুন্দর, সোহানা সুন্দরী। দুজনই অসাধারণ মেধাবী। প্রায় সকল পরীক্ষাতেই সেরা বিশ জনের মাঝে দু’জনের অবস্থান নিশ্চিত। অধিকন্তু সবুজ দক্ষ দাবাড়ু। ১ম বর্ষেই সে ‘আন্তঃমেডিক্যাল কলেজ দাবা’ প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়। কিন্তু কেউ জানত না যে, সবুজের এক বিরাট মানসিক সমস্যা ছিল। না জানার অবশ্য কারণও ছিল। যারা বুঝত, তাদের অনেকে চেষ্টা করত সবুজকে সে বিষয়ে সতর্ক করতে। কিন্তু ফল হত উল্টো। মেধাবী সবুজের তীক্ষ্ণ যুক্তির সামনে পরাভূত হয়ে তারা উপস্থিত স্বীকার করে নিত যে, ওটাও সবুজের একটি বিশেষ গুণ। তৃতীয় বর্ষের ক্লাস শুরু হয়েছে, ২ দিন হয়েছে। সোহানা অনুপস্থিত! সবুজ কী করবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। যাহোক, সবুজের কষ্ট চরমে পৌছার পূর্বেই, তৃতীয় দিনে ক্লাস শুরুর ঠিক দু’মিনিট আগে সোহানা ক্লাসে ঢুকল। কেমন যেন ক্লান্ত, বিধ্বস্ত চেহারা! যেন সারারাত ঘুমায় নি। সবুজের মধ্যে এক ধরণের পেরেশানি পয়দা হয়। ক্লাস শেষে ক্যান্টিনে দু’জনে মুখোমুখি হল। সবুজ জানতে পারল যে, সোহানার মা খুব অসুস্থ। তাই দু’দিন আসতে পারে নি। ঘনিষ্ঠ জনদের দুঃসংবাদ সর্বদা পরিস্থিতি ভার করে দেয়। দুজনেই চুপচাপ চা পান করতে থাকে। সবুজ! একটি প্রশ্ন করব। সত্যি জবাব দেবে কিন্তু! সোহানা আচমকা বলে ওঠে। আচ্ছা, দেব। প্রশ্নটি কি ? সবুজের স্বরে কৌতুক আর কৌতূহলের মিশ্রণ। সবুজ! তুমি কি আমাকে ভালবাস ? সবুজের মনে হল তাকে যেন আকাশ থেকে মাটিতে নিক্ষেপ করা হয়েছে। ভাগ্যিস, প্রায় দুই বছর মাথা ঘামিয়ে জবাবটা রেডি করে রেখেছিল। অতএব, সোহানার চোখে চোখ রেখে জবাবটা দিয়ে দিল। অবশ্যই। এ ব্যাপারে আমি শতভাগ নিশ্চিত। আর তুমি ? আমিও। এবং সেটা অনেক আগে থেকেই। অতঃপর আবার নিরবতা। সবুজের মাথায় ঢুকছে না যে, মনের এই অবস্থায় সোহানার এমন ‘সিরিয়াস’ বিষয় নিয়ে কথা বলার কী বা কারণ থাকতে পারে! সোহানার চেহারা বলছে সে যেন আরো কিছু বলতে চায়। দেখা যাক, সবুজ অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল। সোহানা কথা বলল। অনেকক্ষণ পর। সোহানার স্বর ছিল ধীর, শান্ত এবং ব্রীড়াবনত। সবুজ! তুমি আমাকে বিয়ে কর। সবুজ এমনিভাবে চমকে ওঠল যেন বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে। চমকের ধাক্কায় ক’ ফোটা চা-ও ছলকে শার্টে পড়ল। সেদিকে চেয়ে বিব্রত হাসি হেসে সবুজ বলে, এমন একটা ঠাট্টা না করলেই পারতে। মোটেও ঠাট্টা নয়। আমি একশ ভাগ সিরিয়াস। প্লিজ, না করো না। সোহানার কণ্ঠ স্বরের ব্যাকুলতায় সবুজ হতভম্ব হয়ে যায়। কিন্তু কেন ? কিছুই কি বলা যায় না ? ছেলেমেয়েরা নিজে নিজে বিয়ে করে ফেলে যখন বাবা মা জোর করে বিয়ে দিতে চায়। খালু খালাম্মা তেমন কিছু করতে যাচ্ছেন বলে আমার মনে হয় না। তোমার কথা ঠিক। কিন্তু কাল সারাদিন সারারাত নিজের সাথে সংগ্রাম করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মেয়ে হয়েও লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে এই কথা বলার জন্য আজ এখানে বসেছি। আরো একটু ব্যাখ্যা কর। আম্মা গুরুতর অসুস্থ। বোধহয় ৩-৪ দিনও টিকবে না। গত কয়েকদিন ধরে আম্মা বার বার একটি কথাই বলছে, আমি জীবনে একটিমাত্র আফসোস নিয়ে মরতে যাচ্ছি । সোহানারে, তোকে বিয়ে দিয়ে যেতে পারলাম না। এমনকি, কার সাথে তোর বিয়ে হবে সেটা জেনে যেতে পারলেও অনেক শান্তিতে মরতাম। একথা শুনার পর থেকে নিদারুণ অস্থিরতায় ভুগতে লাগলাম। মায়ের অন্তিম আকাঙ্খা পূরণের জন্য আমি কি কিছুই করতে পারি না ? হতাশার আর অস্থিরতার এই ভয়াবহ অবস্থায় হটাৎ করে, সবুজ, তোমার কথা মনে পড়ল। কেন জান ? বুঝতে পারলাম যে, তোমাকে আমি ভালবাসি এবং অনেক আগে থেকেই। কিন্তু তুমি ? তুমি তো কোনদিন কিছু বলনি। হয়তো এ কারনেই যে তুমি আর দশটা ছেলের মত হ্যাংলামো করতে জান না। তোমার এ রুচিকে আমি সম্মান করি। কিন্তু এ মুহূর্তে আমি দিশাহারা। হয়তো জীবনে অনেক কিছুই পাব, কিন্তু একটি না পাওয়ার কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য তোমার দারস্থ হয়েছি । চল সবুজ, আমরা দু’জনেই এমন বয়সে পৌঁছে গেছি যে আইনগত কোন সমস্যা নেই। কোর্টে গিয়ে হাজির হই। অতঃপর তোমাকে নিয়ে আম্মাকে দেখাই। তোমাকে তো আম্মা চিনেই, সুতরাং সব শুনলে খুশীই হবে। সবুজের চা পান বন্ধ হয়ে গেছে। মহা ফাঁপরে পরেছে সে। দীর্ঘ দেড় বৎসর লেগেছে তার এই সিদ্ধান্ত নিতে যে সোহানাকে ভালবাসে। তারপরে তিন মাস লেগেছে এই সিদ্ধান্ত নিতে যে সোহানাকে ভালবাসার বিষয়টি জানানো যাবে। আরো দুই বৎসর লাঘবে তার বিয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্তে পৌছতে। সবুজের মতে বিয়ে হচ্ছে জীবনের সবচে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সুতরাং বুদ্ধিমান মাত্রই এ ব্যাপারে ভেবে চিন্তে পদক্ষেপ নেবে। আর সবুজ সর্বদা সব ব্যাপারে যতটুকুন সম্ভব ‘লিক প্রুফ’ প্লান নিয়ে এগোনর পক্ষপাতী। সুতরাং সোহানাকে কী বলা যায়, সবুজ ভেবে পায় না। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এত চটজলদি সিদ্ধান্ত কিভাবে দেই। সবুজ আমতা আমতা করে। কি যে তুমি। ছেলে মানুষ হয়ে এত দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভুগলে চলবে নাকি? তাছাড়া পাত্রি হিসাবে আমি মনে হয় খুব একটা ফেলনা নয়। একটু হাল্কা স্বরে সোহানা বলে ওঠে। ওগুলো ঠিক আছে। কিন্তু এত তাড়াহুড়ো করে ………। সবুজ থেমে যায়। তুমি বোধহয় ভাবছ তোমার আম্মা বিষয়টা কী ভাবে নেবে। সবুজের বাবা নেই, সোহানা জানে সেটা। সেটা একটা পয়েন্ট বটে, তবে সবটুকু কিম্বা প্রধান নয়। তাহলে! তাহলে সবুজ! এত দ্বিধা কিসের ? সোহানার বিস্ময়ের মাত্রা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কোন সবুজ! এতো ভীতু!! যত পাণ্ডিত্যই থাকুক না কেন, এমন চরিত্রের মানুষ কোনদিন কারো কোন কাজে লাগে না। সবুজের জন্য তার করুণা হয়। আসলে সোহানা, তোমাকে আমি ঠিকমত বুঝাতে পারছি না যে হুট করে এত বড় কাজ করতে নেই। এবারে শেষ একটা কথা সবুজ। সত্যি সত্যি যদি আমাকে ভালবেসে থাক, তবে না করবে না। কি সেটা ? সবুজ ইতস্ততার সাথে জানতে চায়। আমাদের বাসায় চল। আম্মাকে বলব, আমরা পরস্পরকে ভালবাসি। পাস করার পর বিয়ে করব। মা তুমি আমাদের জন্য দোয়া করে যাও। এতে কি লাভ হবে ? যদি কোন কারণে বিয়েটা না হয় ! তোমার কোন লাভ নেই। কিন্তু আমার আছে। আম্মার অন্তিম শখটা আংশিক হলেও তো পুরো করতে পারলাম। আর এই ব্যাপারে সাহায্য করার জন্য তোমার প্রতি আমরণ কৃতজ্ঞ থাকব। বিয়ে হোক বা না হোক, আমার অন্তরে তোমার এমন একটা স্থান থাকবে, যেখানে কেহ কোনদিন পৌছবে না। প্লিজ, সবুজ না করো না। আমি খুব অসহায়। আর এটি এমন একটি বিষয় যেটা যারে-তারে বলাও যায় না। দাঁড়াও। আমাকে একটু গভীরভাবে ভাবতে দাও। কতক্ষণ লাগবে তোমার ভাবনা শেষ করতে ? ক্ষণ নয়, বল কয় দিন ? তবে আমি চেষ্টা করব যত দ্রুত পারি সিদ্ধান্তে পৌঁছতে। চরম হতাশা গ্রাস করল সোহানাকে। বেশ কিছুক্ষণ টেবিলের ওপরে মাথা গুঁজে বসে রইল। তারপর কথা বলতে শুরু করল। নয়ন ভরা জল, কিন্তু কণ্ঠস্বরটা অকম্পিত, শীতল এবং একটু বেশীই যেন শীতল। সবুজ, তোমার প্রতিভা অনেক, কিন্তু পৌরুষ শূন্য। আমার জীবনের সবচে বড় ভুল তোমাকে ভালবাসা। এই ভালাবাসাকে তাই আজ এই মুহূর্তে কবর দিলাম। কারণে অকারণে আর কখনো তোমার সময় নষ্ট করব না। বিদায়, এবং চিরবিদায়। তবে যাবার আগে Shakespeare এর একটা কথা মনে করিয়ে দিই, “ You have too much respect upon the world.
They lose it that do buy it with much care.” *
ওড়নার আঁচলে অশ্রু মুছতে মুছতে সোহানা চলে গেল। সবুজ স্থানুর মত বসে রইল আরও এক ঘণ্টার মত। হয়তো আরও অনেকক্ষণ থাকত। কিন্তু এক ঘনিষ্ঠ সহপাঠীর ডাকে উঠে দাঁড়াল। অতঃপর অনেকটা এলোমেলো পায়ে হাটতে হাটতে হলে গেল। হতবাক বন্ধুর বারংবার জিজ্ঞাসাতেও হ্যাঁ হু কিছুই বলল না। সে তখনো ভাবছে কী করা উচিত! পরবর্তী এক সপ্তাহ সোহানা ক্লাসে আসে নি। কার কাছে যেন শুনল সোহানার মা মারা গেছে। দিন দশেক পরে গিয়েছিল সোহানাকে সান্তনা জানাতে। কিন্তু সোহানা ছিল পাঁথরের মূর্তি, একটি বর্ণও উচ্চারণ করে নি। ততদিনে সবুজের উপলব্ধিতে এল যে, তার স্বপ্নের পাসাদ হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। শোকটা সামলাতে পারল না। মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ল। পড়ালেখায় অমনোযোগী হয়ে গেল। সিরিয়াল হারিয়ে ফেলল। কোনমতে M.B.B.S. টা পাস করল। তবে পরবর্তীতে একটু সুস্থির হলে আরো কিছু ডিগ্রী নেয়। কিন্তু সংসার করা আর হয় নি। অনেকে অনেক চেষ্টা করেছিল, কাজ হয় নি। আর সোহানা ? মা হারানোর শোক সামলে নিয়ে লেখাপড়ায় মনপ্রাণ ঢেলে দেয়। দুর্দান্ত ফল করে ডাক্তারি পাস করে। পরবর্তীতে উচ্চতর ডিগ্রী নেয়। বড়মাপের ডাক্তার হিসাবে পরিচিতি পায়। কিন্তু সেও বিয়ে শাদী করে নি। কেন ? কেউ জানে না। তবে জীবন চলতে থাকল তার আপন গতিতে। শত চেষ্টা করেও সবুজ সোহানাকে ভুলতে পারে নি। তবে সে যেমন থাকুক, সোহানা ভাল আছে এবং বেঁচে আছে, এটিই ছিল সবুজের নিকট অনেক আনন্দের। কিন্তু দশ দিন আগের সেই দুঃসংবাদ সবুজের সব আনন্দ নিঃশেষ করে দিল। তার অনিবার্য পরিণতি হিসাবে সবুজের এই ভয়ংকর সিদ্ধান্ত। বিশাল এক দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল সবুজের বুক চিড়ে। সোহানার সাথে অতিক্রান্ত জিন্দেগীর প্রতিটি ক্ষণ দাড়ি-কমা সহ মনে পরছে। হায়াত শেষ হয়ে আসলে কি এমন হয় ? কে জানে, হতেও পারে। এমন দিন তো আগে আর আসে নি। সবুজ তাকিয়ে আছে ছাদের দিকে। হটাৎ মনে হল ছাদ থেকে বিরাট এক হা করে বিশাল এক সাপ তাকে ধরতে আসছে। আতঙ্কে দিগ্বিদিক হারা সবুজ হুইস্কিভরা হাতের গ্লাসটি ছুঁড়ে মারল সাপের মাথা লক্ষ্য করে। নিখুঁত সই! গ্লাসটি মেঝেতে পরে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল। তবে সাপ কোথায় ? দৃষ্টি বিভ্রম! ঝুলানো দড়িকে সাপ আর দড়ির লুপকে সাপের হা মনে হয়েছিল সবুজের নিকটে। চেয়ার ছেড়ে ওঠে দাঁড়াল সবুজ। ঘরময় পায়চারী শুরু করল। মাজে মধ্যে দু’ এক ঢোক পান করতে লাগল। আজ তার অনেক শক্তি দরকার। শারীরিক এবং মানসিক। শেষ মুহূর্তে ভেঙে পড়লে চলবে না। সবুজের মনে পড়ছে না, আত্মহননের সিদ্ধান্ত নিতে তার যতটুকু সময় লেগেছে, তার চেয়ে কম সময়ে কোন সিদ্ধান্ত আদৌ সে নিতে পেরেছে কী না! অবশ্য স্বভাব মোতাবেক, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরেও সবুজ ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে যায় যে, আত্মহত্যার ঘটনাটি কিভাবে কার্যকরী করা যায় ? সবুজ প্রথমেই ভাবল যে এক বোতল কীটনাশক পান করলেই কাজ হয়। কিন্তু পরক্ষণেই তার আত্মশ্লাঘায় ঘা লাগল, সে কি ইঁদুর বিড়াল না কি যে কীটনাশক পান করবে ? it’s a matter of prestige. অতএব, ঐ পদ্ধতি বাতিল। অনেকগুলো ঘুমের বড়ি খাওয়া যেতে পারে। তাহলে চিরকালের তরে ঘুমিয়ে পড়বে। পর ক্ষণেই ভাবনাটা দূর করে দিল। এটা কোন পদ্ধতি হল না কি ? সকালবেলা যথাসময় গেদু এসে ডাকাডাকি করবে। সাড়া না পেয়ে ভয় পেয়ে যাবে। তারপরে পাড়া প্রতিবেশী সবাইকে ডেকে আনবে। দরজা ভাঙা হবে। অতঃপর জরুরী বিভাগে ভর্তি এবং চিকিৎসা। একজন ডাক্তার হয়ে সবুজ ভাল করেই জানে যে, মানব দেহের immunity system কত শক্তিশালী! কপালে মরণ না থাকলে অনেক কষ্টের পর বেঁচে থাকবে। তার ওপরে রয়েছে পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে দেশব্যাপী হাসির পাত্র হওয়া। সবুজের ধারণা, আসলে যারা নামের কাঙাল তারাই ঘুমের বড়ি খেয়ে আত্মহত্যার ব্যর্থ চেষ্টা চালায়। অতাঃপর দশ জনের সহানুভূতি অর্জন করে। বুদ্ধি বটে! কিন্তু সবুজের দরকার না প্রচার, না সহানুভূতি। তাছাড়া নিজেও যে এই পদ্ধতি অবলম্বন করে ব্যর্থ হয়েছিল, সে দুঃখ মন থেকে এখনো মুছে যায় নি। পটাশিয়াম সায়ানাইড খেলে কেমন হয়! পৃথিবীর ভয়ংকরতম বিষ! মনে পড়ল কলেজ জীবনে পড়া থ্রিলার সিরিজের কাহিনি। প্রায় বইতে পড়া হত যে, ভিলেনরা ধরা পরার পরে সাথে লুকিয়ে রাখা পটাশিয়াম সায়ানাইড পিল গিলে আত্মহত্যা করত। কিন্তু নিজকে ভিলেন ভাবতে সবুজ মন থেকে কোন সাড়া পেল না। অতএব, এটাও বাতিল। ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেবে না কী! মারাত্নক ব্যাপার! হাত পা কেটে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। পেশাগত জীবনে ট্রেনে কাটা অনেক মড়া দেখেছে। সহ্য করার মত নয়। তাছাড়া বিশাল এক ট্রেনকে যখন ছুটে আসতে দেখবে, তখন দুটো ঘটনার একটি ঘটতে পারে। একঃ প্রাণের ভয়ে শেষ মুহূর্তে খিঁচে দৌড় দেয়া হতে পারে। দুইঃ অতিরিক্ত ভয়ে হার্ট ফেল করতে পারে। কিন্তু উভয় ঘটনাই চরম অপমানজনক। সুতরাং সে চিন্তা বাদ। ট্রাকের নিচে লাফ দিয়ে পরলে কেমন হয়। এক্কেবারে ভর্তা হয়ে যাবে। বড্ড বিচ্ছিরী ব্যাপার। তারমত একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার পক্ষে পুরোপুরি বেমানান। রুচির একটা ব্যাপার আছে না! অতএব, এটাও বাদ। নদীতে ডুবে মরবে ? সবুজ সাতার জানে না। একবার একটু গভীরে যেতে পারলেই হয়। ডুবে মরা নিশ্চিত। কিন্তু নদীর পানিতে তাকে নামাবে কে ? সবুজ চিরকালই খাল বিল পুকুর নদী ইত্যাদিকে ভীষণ ভয় পায়। এটা অনেকটা বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার মতই কঠিন কাজ। কক্সবাজার দেখতে গিয়েও হাঁটু পানির বেশী নামে নি, তাও বহুজনের বহু অনুরোধের পর। শত চেষ্টা করেও বাইক্কা বিলে তাকে কেউ নৌকাতে ওঠাতে পারে নি। অধিকন্তু সিনেমাতে নায়িকাদেরকে দেখা যায় নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করতে। সর্ব বিবেচনায় এটা একটি অগ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। পিস্তল ব্যবহার করা যেতে পারে। হৃদপিণ্ড বরাবর কিংবা কপালে ঠেকিয়ে একবার ট্রিগার টিপতে পারলেই হয়। কিন্তু পিস্তল যোগাড় হবে কিভাবে এবং কোত্থেকে ? বেশী খোঁজা খোঁজাখুঁজি করতে গেলে পুলিশে ধরে নিয়ে যাবে। আর এই কারণ তো কাউকে বলাও যাবে না। আত্মহত্যার একটি সঠিক ও সম্মানজনক পদ্ধতি বাছাই করতে করতে সবুজ যখন মানসিকভাবে ক্লান্ত, ঠিক তখুনি বিদ্যুৎ চমকের মত তার মনে পড়ল ফাঁসী পদ্ধতির কথা। আরে! সে তো ভুলেই গেছিল যে ফাঁসী দিয়েও আত্মহত্যা করা যায়। পৃথিবীর প্রাচীনতম পদ্ধতি এবং সে দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে অভিজাত বলে স্বীকার করতে হয়। পদ্ধতিটিও রাজকীয়। বুক চিতিয়ে সটান দাঁড়িয়ে বেটার মত ফাঁসির রজ্জু গলায় নিতে হয়। জাতীয় কবি বলেছেন, “ ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান।” ঠিক তার মনের কথা। এই কণ্টকময় দুঃসহ দুনিয়াতে আর নয়। যেতে হবে এমন জগতে যেখানে সোহানা আছে। একজন আধুনিক কবির কবিতাও মনে পড়লঃ
যদি দেশদ্রোহী বলে, মোর গলে
রাষ্ট্র পরায় ফাঁসী
ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে যাব গান
দেশটাকে ভালবাসি। +
ইশ! তাকে যদি কোন কোন ভুয়া অযুহাতে ফাঁসী দেয়া হত, তবে সেও ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে সগৌরবে বলে যেত, “ সোহানাকে ভালবাসি ”। মনে পড়ল যে পৃথিবীর অনেক নামী-দামি নেতাকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছিল। সন্দেহ নেই যে ভবিষ্যতেও হবে। ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের গাছগুলি এখনো ১ম স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর শহীদানদের ফাঁসির অম্লান স্মৃতি ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে। আসলেই ফাঁসী কাষ্ঠে মৃত্যুর একটা ভিন্ন ধরণের আভিজাত্য আছে। অতএব, ফাঁসিতে আত্মহত্যার স্ট্যাটাসটাও ভিন্ন ধরণের হবে। শেষমেশ ডাঃ সবুজ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারল। সে ফাঁসী দিয়ে আত্মহত্যা করবে। সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পেরে নিজকে ধন্যবাদ দিল। একটি চিরকুট রেখে যাবে কি ? উঁহু, ঠিক হবে না। ওটা সিনেমার নায়কেরা করে। সেও তো ট্র্যাজেডির নায়ক, তবে জীবনের, সিনেমার নয়। তাছাড়া চিরকুটটি তার মৃত্যুর রহস্য নিমিষে সমাধান করে দেবে। মানুষ তাকে খুব দ্রুত ভুলে যাবে। এটা মানতে কষ্ট হয়। এত বড় একজন ডাক্তার আত্মহত্যা করল; তার আত্মহত্যার ঘটনায় রহস্য না থাকলে কি হয় ? পুলিস আর গোয়েন্দারা একটু খাটাখাটি করুক। ব্যাটাদেরকে সরকার বেতন দেয় কি করতে ? আর বেতন যা পায়, ঘুষ তার দশগুণ খায়। অতএব, এমন কোন ক্লু রাখা যাবে না, যাতে চট করে আত্মহত্যার কারণ আবিষ্কৃত হয়ে যায়। পরবর্তী সমস্যা দাঁড়ালো দড়ি কোথায় পাওয়া যায়। প্রথমেই মনে পড়ল ম্যানিলা রোপের কথা। এক বিখ্যাত মামলায় দণ্ড প্রাপ্তদেরকে ম্যানিলা রোপের সাহায্যে ফাঁসী দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ম্যানিলা রোপ বাজারে সহজলভ্য নয়। মানুষটা সে বেশ বড়সড়, ওজনে ৯০ কেজির ওপরে। বাজারে মোটা মোটা দড়ি পাওয়া যায়, গরু বাঁধার কাজে ব্যবহৃত হয়। দূ---র! আবার সেই গরু। ঐ দড়ি চলবে না। শুরু হল সবুজের দড়ি খোঁজা এবং বাছা। তিন দিন নিয়মিত হার্ডওয়ারের দোকানে গেল। শেষমেশ মনের মত দড়ি যোগাড় করতে সমর্থ হল। পরবর্তী সমস্যা দিনক্ষণ ঠিক করা। একটি ঐতিহাসিক দিন বেছে নিলে কেমন হয় ? স্রেফ গর্দভের মত কাজ হয়। ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতিচারণের ভিড়ে সে হারিয়ে যাবে। এটা মানা যায় না। কিন্তু ঐতিহাসিক দিন নয় কোনটি ? পত্রিকার পাতায় ‘আজ এই দিনে’ পড়া তার খুব প্রিয় সখ। এমন একটি দিনও সে পায়নি যেদিন ঐতিহাসিক কিছু ঘটেনি। অতএব, শুভস্য শীঘ্রম। চলতি মাসের শেষ দিন। রাত ঠিক ১২-০০ টার সময়। দেখতে দেখতে সবুজের সেই বিশেষ দিনটি এসে গেল । সকালে ঘুম ভাঙার পর থেকেই সবুজের অন্যরকম লাগছে। গত এক সপ্তাহ যাবৎ সে এই দিনটির প্রতীক্ষা করে আসছে। আজ সে আত্মহত্যা করবে এবং এর মাধ্যমে ঐ জগতে যাবে, যে জগতে তার আগেই সোহানা চলে গেছে। যে বিচ্ছেদ পৃথিবীতে ঘটেছিল, পরপারে গিয়ে তার পরিসমাপ্তি হবে। রবিঠাকুর মন্দ বলেন নি, “মরণের তুঁহুঁ মম শ্যাম সমান।” অফিস থেকে ফেরার পরে খাওয়া দাওয়া সেরে ঘুম দেয়। সন্ধ্যায় মেঘের গর্জনে ঘুম ভাঙে। অতঃপর শুরু হয় প্রহর গোণা আর স্মৃতিচারণা। এখন বেশ রাত। সন্ধ্যা থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টির বেগ বাড়ছে, বাড়ছে এবং বাড়ছে। চমৎকার! আজ রাতে ঘটতে যাওয়া বিশেষ ঘটনাটির জন্য বিশেষ প্রাকৃতিক পরিবেশ। সব আয়োজন সারা আছে। বিকাল বেলা বাসায় ফিরেই ফ্যান ঝোলানর অব্যবহৃত আংটার মধ্যে দড়িটি ঝুলিয়ে দিয়ে উহার নিচের মাথায় একটি লুপ তৈরি করেছে। তার নিচে একটি টুল রেখে দিয়েছে। আর মাত্র ২ মিনিট! দেরি করা যাবে না। তাহলে হায়াতের মধ্যে আর একটি দিন বেড়ে যাবে। এটা কিছুতেই ঘটতে দেয়া যাবে না। এত যত্ন করে সাজানো প্লানটা ভণ্ডুল হয়ে যাবে। অতএব, বিদায়! হে পৃথিবী এবং পৃথিবীবাসী, তোমরা বেঁচে থাক চিরকাল। টুলটির উপরে উঠে দাঁড়াল সবুজ। ফাঁসির রজ্জুটা লুপ করা আছে। গলায় ঢুকিয়ে লাথি মেরে টুলটা ফেলে দিলেই হবে। বাকি কাজ আপনা আপনিই হয়ে যাবে। চাইলেও আর ফেরতে পারবে না। ধারে কাছে কেউ নেই যে তাকে উদ্ধার করবে। ষোল আনা লিক প্রুফ প্লান। সময় দ্রুত চলে যাচ্ছে। লুফটা শক্ত করে ধরল সবুজ। ধীরস্থির ভাবে মাথার ওপরে ধরে রাখল। ছেড়ে দিলেই গলায় নেমে আসবে। সবুজের দৃষ্টি দেয়াল ঘড়ির ওপরে স্থির। অপেক্ষা করছে অন্তিম মুহূর্তটির। আচ্ছা, কাজটা কেমন হচ্ছে ! ডাহা বেকুবের মত নয় কি ? পরপারে না হয়, যাওয়া গেল, কিন্তু সোহানাকে পাওয়ার কোন নিশ্চয়তা আছে কি ? যদি না যায় ? তাহলে তো আম-ছালা দুটোই গেল। তবে কি সিদ্ধান্ত পালটাবে ? তাই বা কি করে হয় ? বুক ভরা জ্বালা নিয়ে আর কত দিন বেঁচে থাকা যায়। তাছাড়া কাল যখন এই টুল, এই দড়ি দেখবে তখন নিজের কাছেই নিজকে হাস্যস্পদ মনে হবে। অতএব, পিছিয়ে যাবার প্রশ্নই আসে না। তাছাড়া সবুজ নিজের কাছেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে, আজই হবে তার জিন্দেগীর শেষ দিন। তা ঠিক। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। এই সিদ্ধান্ত যদি ভুল হয়ে থাকে, তবে পুনঃ মূল্যায়নের কোন সুযোগ থাকছে না। ইসস! মহা মুশকিলে পড়ল ডাঃ সবুজ। একটি ঠুনকো বিষয়েও ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে সিদ্ধান্ত নিতে যে হিমশিম খেত, তাকে কী না জীবন মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নিতে হবে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। ১১:৫৯:৫০ । অর্থাৎ যা করার এখুনি করতে হবে। হয় দড়ির লুপটা ছেড়ে দিতে হবে কিম্বা টুল থেকে নেমে যেতে হবে। হাঁদারামের মত দাঁড়িয়ে থাকার মানে হয় না। বেশীক্ষণ দাঁড়ানো যাবেও না। ঠ্যাং দুটো একটু একটু কাঁপছে। কি করা যায়! শেষ সময়ে সব এলোমেলো হচ্ছে কেন ? বিজলীর আলোতে গোটা রুম ঝলমল করে ওঠল। পর মুহূর্তেই নিকষ কাল অন্ধকারে দুনিয়া ছেয়ে গেল। বিদ্যুৎ চলে গেছে। বজ্রপাতের গগনবিদারী শব্দে ভুবন-ভবন কাঁপতে থাকল। কেনেডি সাহেবের বাড়ীর ভয়ালদর্শন বিদেশী কুকুরটি ভয় পেয়ে প্রলম্বিত সুরে ককিয়ে উঠল। ধারে কাছে কোন বাড়ীতে পুরান আমলের দেয়াল ঘড়ি রাত ১২ টা বাজার ঘোষণা দিচ্ছে ...... ঢং ঢং ঢং ......।

:সমাপ্ত:
* The Merchant of Venice; Act-1,Scene-1.
+ মুহিব খান, লাল সাগরের ঢেউ।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন