বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৬টি

সমন্বিত স্কোর

৬.৭৮

বিচারক স্কোরঃ ৪.৩৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৪ / ৩.০

প্রাপ্তি

পূর্ণতা আগস্ট ২০১৩

অন্তঃসলিলা

ইচ্ছা জুলাই ২০১৩

এ যে রাত্রি

অন্ধকার জুন ২০১৩

পরিবার (এপ্রিল ২০১৩)

মোট ভোট ৪৪ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৬.৭৮ ঢেঁকি অবতার

অদিতি ভট্টাচার্য্য
comment ৩২  favorite ১  import_contacts ১,৪৫৪
অফিস থেকে ফেরার পথের মুদিখানার দোকানে ঢুকেছিল সন্তু, কয়েকটা জিনিস কেনার ছিল। কিনে জিনিসক’টা ব্যাগে পুরে দাম মিটিয়ে যেই ঘুরেছে অমনি জেঠুর মুখোমুখি। খুবই অস্বস্তিতে পড়ল সন্তু। মুখ ঘুরিয়ে চলেও যাওয়া যায় না, আবার বিশেষ কথাও বলা যায় না। এত বছরের অনভ্যাস, আড়ষ্টতা। তবুও ভদ্রতার খাতিরে জিজ্ঞে‌স করল, ‘কেমন আছ?’
‘ভালো, তোমরা সবাই ভালো আছ তো?’ শিবশঙ্কর মানে জেঠু বললেন।
‘হ্যাঁ,’ বলেই সন্তু পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল।
কারণ সে জানে এরপরই কথা ফুরিয়ে যাবে, আরো অস্বস্তিতে পড়তে হবে দুজনকেই। অথচ ভাবলে অবাক লাগে ইনি সন্তুর নিজের জ্যাঠামশাই, সন্তুর বাবার নিজের বড়ো ভাই। ছোটবেলা থেকেই সন্তু দেখে আসছে যে শিবশঙ্করের সঙ্গে কারুর সদ্ভাব নেই। শুধু যে সদ্ভাব নেই তা নয় বরং ওনার সম্পর্কে চিরকাল ব্যঙ্গোক্তি, বক্রোক্তিই শুনে এসেছে। আত্মীয়স্বজনরা তো বরাবর ঢেঁকি অবতার বলেই ব্যঙ্গ করে এসেছে। ঠাকুরদা, ঠাকুমাও বড়ো ছেলের ওপর সন্তুষ্ট ছিলেন না একেবারেই। ঢেঁকি অবতার নামটা নাকি ঠাকুরদা উমাশঙ্করেরই দেওয়া, বড়ো ছেলের অকর্মণ্যতা, জেদী, অনমনীয় মনোভাবের জন্যে।
সন্তুরা এ অঞ্চলের বহু পুরোনো বাসিন্দা। কয়েক প্রজন্ম তারা এখানে আছে। জমিজমা, বাড়ি ভাগাভাগি হয়েছে, পুরনো বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট উঠেছে কিন্তু কেউই এ তল্লাট ছেড়ে যায় নি। আশেপাশে ছড়িয়েছিটিয়ে আছে সবাই। শুধু শিবশঙ্করই ফ্ল্যাট নেন নি। একটু দূরে একটা ছোট্ট বাড়িতে থাকেন। জমিটা মার অনেক জোরাজুরিতে নিয়েছিলেন, নাহলে বোধহয় তাও নিতেন না। শেষ বয়সে কি হয়েছিল কে জানে বুড়ি মার বড়ো ছেলের জন্যে খুব মন খারাপ করত। নামকরা বংশ সন্তুদের। উমাশঙ্কর তো খুব বিখ্যাত ছিলেন। লক্ষ্মী ও সরস্বতী দুজনেরই কৃপা দৃষ্টি ছিল এই পরিবারের ওপর। বংশগৌরবের অহঙ্কার ভালোই ছিল উমাশঙ্করের মধ্যে। সন্তুর মনে হয় তার বাবা, কাকা, পিসীদের মধ্যেও যথেষ্ট আছে। তাদের মধ্যেও বা কম কি? নইলে কই, তারা কোনো ভাই বোনও তো জেঠুর সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখতে পারেনি।
ছোটবেলা থেকেই শিবশঙ্কর অন্যরকম। পুরো পরিবারের মধ্যে খাপছাড়া। সবার প্রয়োজনে যেতেন। রাতে বিরেতে, বিপদে আপদে কেউ কখনো তাঁকে ডেকে ফিরে গেছে এমন হয় নি। অশান্তির শুরু এখান থেকেই। যখন তখন যার তার জন্যে এইভাবে নিজের সময়, পরিশ্রম ব্যয় করা উমাশঙ্করের মোটেই পছন্দ ছিল না। একবার কোনো বিয়েবাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়ে উমাশঙ্কর দেখলেন দেখলেন সেখানে শিবশঙ্কর লুচি পরিবেশনে ব্যস্ত। সঙ্গে উমাশঙ্করের এক বন্ধু ছিলেন, তিনি অবাক হয়ে বললেন, ‘এ তোমার বড়ো ছেলে না?’
বাঁকা হেসে উমাশঙ্কর উত্তর দিয়েছিলেন, ‘হ্যাঁ, কি আর করা যাবে বলো? ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে! এর বেশী কিছু ওর দ্বারা হবে না।’
শিবশঙ্কর কিন্তু পড়াশোনায় খারাপ ছিলেন না। পড়াশোনা শেষ করে একটা সাধারণ চাকরীতে যোগ দেন। বলা বাহুল্য এটাও উমাশঙ্করের পছন্দ হয় নি। এরপরের ঘটনা তো আরো মারাত্মক। উমাশঙ্করদের পাশের বাড়ি ডাকাতি হল। মেয়ের বিয়ের জন্যে অনেক গয়না বাড়িতে রাখা হয়েছে জেনেই ডাকাতদের আগমন। গোলমাল বুঝে শিবশঙ্কর কারুর বারণ না শুনেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। ডাকাতরা তখন পালাচ্ছিল। রাস্তার অল্প আলোয় তিনি একজনকে চিনতে পেরে যান। উড়ো চিঠি, শাসানিতেও কোনো কাজ হয় নি। এক সন্ধ্যেয় তাঁর ওপর শারীরিক আক্রমণও হয়। কিন্তু তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরেন নি। থানায় গিয়ে যা দেখেছেন সব বলেন। এই ঘটনার পর উমাশঙ্কর অত্যন্ত রেগে যান ছেলের ওপর, ‘উনি কখনো নুইতে জানে না। সব সময় সোজা থাকবেন। রাস্তায় মার খাবেন কিন্তু মাথা সোজা রাখবেন। মাথা না থাকলে যে মাথা কি করে সোজা রাখবেন সেটা তো বুঝছেন না! ঢেঁকি অবতার! এরকম চললে একজনের জন্যে পুরো পরিবারের বিপদ হতে পারে।’
এরপরই শিবশঙ্কর বাড়ি ছাড়েন। প্রচুর সমালোচনা, তিরস্কার সহ্য করতে হয়েছিল তাঁর এই পরোপকারী মনোভাবের জন্যে। দোষ সবাই তাঁকেই দিয়েছিল, উমাশঙ্করকে নয়। কিন্তু কোনো পরিবর্তন তাঁর হয় নি। ঢেঁকি অবতার নামটাও সেই থেকে চালু হয়ে গেল। অন্যায়ের সঙ্গে আপোস না করা, জেদী মনোভাবের জন্যে কর্মস্থলেও অনেক বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে তাঁকে। এসব কথাই সন্তু বাবা, কাকাদের কাছ থেকে শুনেছে। ছোটোবেলায় ঢেঁকি অবতার নামটা শুনতে বেশ মজা লাগত। ঠাকুরদাকে জিজ্ঞে‌স করতে বলেছিলেন, ‘ঢেঁকি দেখিস নি? ঢেঁকি? সোজা, লম্বা। সেরকম। বুদ্ধি নেই কোনো, কিন্তু জেদী, একরোখা। কোনো কম্মের নয়, গুণের মধ্যে শুধু ওই জেদ।’
মাঝে মাঝে সন্তু ভাবে কি করে মানুষ এভাবে একা একা স্বজন ছাড়া, পরিবার ছাড়া বেঁচে আছে, তাও আবার নিজেকে একটুও না পালটিয়ে। বিয়েও করেন নি যে দিনের শেষে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরে একটু যত্ন আদর পাবেন, কারুর সঙ্গে মন খুলে কথা বলবেন। থাকবার মধ্যে আছে শুধু বহুদিনের পুরোনো চাকর গোপাল। সারা পৃথিবীর সঙ্গে লড়া যায় যদি জানা যায় তোমার পরিবার, তোমার স্ত্রী, সন্তান, তোমার মা, বাবা, ভাই, বোন তোমার সঙ্গে আছে। অন্তত কাউকে তো দরকার পাশে দাঁড়ানোর জন্যে। সন্তুর এখন যেন খুব বেশী জানতে ইচ্ছে করে। এই যে ও কোন সকালে অফিসে বেরিয়ে যায়, সারা দিন অফিসের খাটুনি, যাতায়াতের ধকল – কিন্তু সব কিছু ভুলিয়ে দেয় ওর এক বছরের মেয়ের আধো আধো বুলি, তার খিলখিল হাসি আর ওর স্ত্রীর মুখের পরিতৃপ্তি। যেদিন অফিস থেকে ফিরে কোনো কারণে মেয়েকে বাড়িতে পায় না, মনে হয় দিনটাই মাটি।
ছোটোবেলা থেকে জেঠুকে আলাদা থাকতে দেখলেও তখনো বোধহয় অবস্থাটা এতটা খারাপ হয় নি। বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান হলে নিয়মরক্ষার খাতিরে হলেও জেঠু আসত। ওদের সঙ্গে কথাটথাও বলত। সম্পর্কের একেবারে কাটানছেড়ান হল একটা ঘটনার পরে। সন্তুর ভালোই মনে আছে। সেটা ছিল একটা রবিবার। খবরের কাগজের সঙ্গে একটা হাতে লেখা লিফলেট ওদের বাড়িতে তুমুল আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল। না, মারাত্মক কিছু ছিল না তাতে। বরং বেশ সাদামাটা ভাষায় লেখা ছিল, আপনি কি একা এই শহরে? আত্মীয়স্বজন ছেলেমেয়ে কাছে থাকে না? বয়সের ভারে অনেক কাজ করতে কষ্ট হয়? বা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে কি করবেন? যোগাযোগ করুন আমাদের। চব্বিশ ঘন্টা আপনাদের জন্যে হাজির আমরা, আপনাদের আপনজনের মতোই।
নীচে ছিল স্বজন বলে একটা প্রতিষ্ঠানের নাম ও ফোন নম্বর। প্রতিষ্ঠাতার নামের জায়গায় ছিল শিবশঙ্করের নাম আর ঠিকানাটাও তাঁরই বাড়ির। ওটাই স্বজনের কার্যালয়।
ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন সন্তুর বাবা, ‘ঠিকই বলেছিলেন বাবা, এর বেশী কিছু দাদার দ্বারা হবে না। ছোটোবেলা থেকেই তো শুধু মড়া পোড়ানো, রুগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া, পরিবেশন করা এসব করে এসেছে, এখন দলবল জুটিয়ে তাই করবে আশ্চর্য কি? এবার বাড়ি থেকে বেরোনো মুশকিল হবে। লোকে বলবে, এই যে তোমার দাদা এখন এসব করছে।’
এরপর থেকেই শিবশঙ্করকে অলিখিত বয়কট করা শুরু হয়ে গেল। ছোটোদের শিখিয়ে দেওয়া হল সামনাসামনি দেখা হলেও কেউ যেন জেঠুর সঙ্গে কথা না বলে। যা হয় প্রথম প্রথম। কেউই স্বজনকে ভালো চোখে দেখে নি। কারণ স্বজন যেসব ছেলেদের নিয়ে তৈরী হয়েছিল তারা বেকার, অকর্মণ্য বলেই পরিচিত ছিল, যাদের ওপর কোনো আশা তাদের পরিবার পরিজনেরও ছিল না। সবাই এটাকে বদ বখাটে ছেলের একটা আড্ডাখানা বলেই মানত। কিন্তু আস্তে আস্তে স্বজনের জনপ্রিয়তা বাড়তে লাগল। অনেকেই দরকারের সময়ে সত্যিকারের সহায়তা পেল। তাছাড়া সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে এই ছেলেরা অনেক দরকারী কাজও করে দিত।
‘বড়দা বটে দেখাল! ছোটোবেলা থেকে বাড়িতে কত চাকর বাকর দেখে এসেছে আর এখন কয়েকটা পয়সার জন্যে নিজে লোকের টেলিফোনের বিল, ইলেক্ট্রিকের বিল জমা দিচ্ছে। সোজা কথায় চাকর বাকরের কাজ। একটা চাকরী তো করে, নিজের খাওয়া পরা চালানোর তো অসুবিধে হওয়ার কথা নয়, তাহলে এসব উঞ্ছবৃত্তি কেন?’ সন্তুর এক কাকা একদিন বললেন।
স্বজনের প্রয়োজনীয়তা কিন্তু একদিন প্রায় সবাই বুঝতে পারল। শিবশঙ্করকে অনেকে সাধুবাদও দিত এজন্যে। এরপর একদিন শহরের এক অনুষ্ঠানে এই অভিনব প্রচেষ্টার জন্যে শিবশঙ্করকে সংবর্দ্ধিত করা হয়। বলা বাহুল্য সন্তুদের বাড়ি থেকে কেউ যায় নি কিন্তু অনুষ্ঠানে শিবশঙ্করের বক্তব্য সন্তুদের বাড়ি পর্যন্ত ঠিকই পৌঁছে গেল এবং বিস্ফোরকের কাজও করল যাথারীতি। কি না শিবশঙ্কর একগাদা লোকের সামনে বলেছেন যে স্বজনই হচ্ছে তাঁর সব কিছু। তাঁর পরিবার বলতে তিনি বোঝেন তাঁর পরিচারক গোপালকে আর স্বজনের ছেলেদের। যারা শুধু অন্যের প্রয়োজনে নয়, তাঁর দরকারেও তাঁর পাশে সব সময় আছে। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা একদিনও গোপালের ভুল হয় না অফিস যাওয়ার সময়ে তাঁর টিফিন প্যাক করে দিতে, সে ভোলে না তার দাদাবাবু কি খেতে ভালোবাসে আর কি পছন্দ করে না, ছুটির দিনে কখন কখন তাঁর চা চাই সেও গোপালের মুখস্থ। ভালোবাসা না থাকলে কি শুধু টাকার বিনিময়ে এসব হয়? স্বজনের ছেলেরাও ভালোবেসেই লোকের পাশে দাঁড়ায়, শুধু পয়সার জন্যে নয়। ভবিষ্যতেও তা বজায় থাকবে বলেই তাঁর বিশ্বাস।
বহু লোক শিবশঙ্করের সঙ্গে একমত। অনেকে এর প্রমাণও পেয়েছেন। কিন্তু শিবশঙ্করের ভাই বোন আত্মীয়স্বজনরা এতে যারপরনাই বিরক্ত হলেন। সব কিছু ভুলে গিয়ে শেষে কিনা ওই চাকরটাকে আর কতগুলো বাউণ্ডুলে ছেলেকে নিজের সব কিছু বলা? নিজে না হয় বিয়ে থা করস নি, কিন্তু ভাই বোনেরা রয়েছে, তাদের ছেলেমেয়েরা রয়েছে, তাদের কথা একবার মনেও পড়ল না? রক্তের সম্পর্ক ভুলে গিয়ে পরিবার হল শেষ পর্যন্ত ওই স্বজন?
সন্তু এসব দেখেশুনেই বড়ো হয়েছে। তার বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বজনের আকারও বেড়েছে। এখন এসব গা সওয়া হয়ে গেছে।একান্ত সামনা সামনি পড়ে গেলে একেবারে মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতে পারে না, তাই ওই ‘কেমন আছ’ টুকু। সেদিন দোকানে দেখা হওয়ার ক’দিন পরে সন্তু বন্ধুদের কাছ থেকে খবর পেল যে শিবশঙ্করের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, নার্সিংহোমে ভর্তি রয়েছেন। সন্তু বাড়িতে কিছু বলল না, বলেও তো কোনো লাভ নেই। কি মনে হতে একদিন অফিস ফেরত চলেও গেল নার্সিংহোমে। তখন শিবশঙ্কর অনেকটা ভালো। সন্তু আড়ষ্টতার কারণে দেখা করল না, কেবিনের বাইরেই দাঁড়িয়ে রইল। সেই প্রথম সন্তু বুঝল শিবশঙ্কর একা নন, বোধহয় কোনোদিনই ছিলেন না। নিজের ছেলেমেয়েরাও বোধহয় এতটা করবে না যতটা স্বজনের ছেলেরা করছে। সবচেয়ে খারাপ লাগল গোপালকে দেখে। দেখে মনে হল তার একান্ত আপন জনই অসুস্থ।
সন্তুকে দেখে কেঁদে ফেলল, বলল, ‘দেখো তো কি হল। খালি আমাকে বলত, গোপাল তোর চোখে ছানি পড়েছে, যা অপারেশন করিয়ে আয়। তোর কোনো চিন্তা নেই, ক’টা দিন আমার ঠিক চলে যাবে। শেষে কি অন্ধ হবি নাকি আমার জন্যে? আর দেখো নিজেই এখানে ভর্তি।’
একটি ছেলে কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল, গোপালের কাঁধে হাত দিয়ে বলল, ‘তুমি ঘাবড়াচ্ছো কেন গোপালদা? জেঠুর কিচ্ছু হবে না। ক’দিন বাদেই বাড়ি ফিরে আসবে। কিন্তু ফিরে এসে যদি তোমার এই হাল দেখে তাহলে আমাদের কি দশা হবে সেটা ভেবে দেখেছো? চলো তুমি বাড়ি চলো, বিশ্রাম করবে।’
সন্তু অবাক হয়ে দেখল ওদের চলে যাওয়া। একটি অল্প বয়স্ক ছেলে একজন বয়স্ক লোককে হাত ধরে যত্ন করে নিয়ে যাচ্ছে। একজন স্বজনের কর্মচারী, আরেকজন চাকর। রক্তের সম্পর্ক তো দূরের কথা কোনো রকম আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই কিন্তু আত্মীয়র বাড়া। এই রকম অজস্র সম্পর্ক সারা জীবন ধরে তৈরী করেছেন শিবশঙ্কর, রক্তের সম্পর্ক ছাড়াই গড়ে তুলেছেন এক শক্ত, মজবুত পরিবার।
শিবশঙ্কর সারা জীবন নিজের আত্মীয়স্বজনদের থেকে দূরে থেকেছে, তাদের কোনো সাহায্য নেন নি। কিন্তু নার্সিংহোম থেকে ফিরে এসে একটি মোক্ষম ভুল করে বসলেন। এক দূর সম্পর্কের ভাইএর সাহায্য নিলেন। এই ভাইটি উকিল। শিবশঙ্কর তাঁর কাছে উইল করার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন এবং কারা তাঁর স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি পাবে তাও জানালেন। এসব জেনে ভাইটি এতই উত্তেজিত হয়ে উঠলেন যে যাবতীয় নৈতিকতায় জলাঞ্জলি দিলেন, নিজের পেশার কিছু নিয়মের কথাও বিস্মৃত হলেন। খবর চলে গেল সন্তুর বাবা কাকাদের কাছে।
‘আশ্চর্য সমস্ত সম্পত্তি ওই স্বজনের নামে হবে? দাদা ভুলে যাচ্ছে জমিটা আমাদের ছিল। একটা পাশে দাদা বাড়ি করেছে, কিন্তু এখনো বেশ কিছুটা জমি পড়ে আছে। মা বেঁচে ছিল, মা দাদাকে ওই জমি দিয়ে গেছে, মার কথা ভেবে আমরা তখন কিছু বলি নি কিন্তু এখন সব ওদের দিয়ে যাবে তা কিছুতেই হবে না,’ সন্তুর বাবা বললেন।
‘ওই জায়গার দাম এখন কত বলো তো মেজদা? যেকোনো প্রোমোটার পেলে লুফে নেবে। মার যে বুড়ো বয়েসে কি ভীমরতি হয়েছিল, দাদাকে পুরো জমিটা দিয়ে দিল। এখন বোঝো ঠ্যালা!’ বক্তব্য সন্তুর আরেক কাকার।
সন্তুর ঠিক ভালো লাগল না, সে মৃদু প্রতিবাদ করে বলল, ‘থাক না, ওই জমি নিয়ে আমাদের কি হবে?’
সন্তুর বাবা আরো রেগে গেলেন, ‘যার জন্যে চুরি করি সেই বলে চোর! এসব তোমাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই বলা। দাদার জমি নিয়ে কি আমরা স্বর্গে যাব?’
সন্তুর কোনো প্রতিবাদই টিঁকল না। একদিন এও জানতে পারল যে ওর বাবা আর দুজন কাকা নাকি জেঠুর বাড়ি গিয়েছিলেন ওনাদের আপত্তি জানাতে। সন্তুর খুব খারাপ লাগল। ওর অন্তরাত্মা কিছুতেই এই নির্লজ্জ, বেআব্রু লোভকে সমর্থন করতে পারল না। কাউকে না জানিয়ে একদিন সেও শিবশঙ্করের বাড়ি গেল। বাড়িতে ঢুকতেই স্বজনের কতগুলো ছেলের সঙ্গে দেখা হল। ওদের চোখের নীরব ভাষা সন্তু পড়তে পারল, বুঝল সব খবর এরাও জানে। ওরাই সন্তুকে শিবশঙ্করের ঘরে নিয়ে গেল।
‘বোসো। কিছু বলতে এসেছো নিশ্চয়ই,’ বললেন শিবশঙ্কর।
সন্তু নিজের জেঠুর চোখের দিকে তাকাতেই পারছিল না। অনেক সাহস, শক্তি সঞ্চয় করে সে অবশেষে বলল, ‘বাবারা যা বলতে এসেছিলেন তাতে আমার বিন্দুমাত্র সমর্থন নেই। তোমার জমি, বাড়ি তুমি যাকে খুশী দেবে, তাতে আমাদের বলার কোনো অধিকার নেই।’
শিবশঙ্কর একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘আমি তো বরাবরই খাপছাড়া। কিন্তু আমি ছাড়া আর একজনও যে অন্যরকম ভাবছে তা জানতে পেরে ভালো লাগল। আমার ভাইদের বক্তব্য যে আমি আমার পরিবার, স্বজনদের বঞ্চিত করছি তাদের প্রাপ্য থেকে। আমি ওদেরকেও জিজ্ঞে‌স করেছিলাম, উত্তর না দিতে পেরে ওরা তো রাগ করে চলে গেল। তোমাকেও জিজ্ঞে‌স করছি, পরিবার বলতে তুমি কি বোঝো? শুধুমাত্র রক্তের সম্পর্কের কয়েকজন মানুষ? নাই বা বুঝুক তারা তোমায়, নাই বা পাশে থাকুক তারা তোমার, করুক তারা তোমায় পরিহাস ব্যঙ্গ চিরদিন – তবুও তারা তোমার পরিবার? নাকি তারা, যাদের সঙ্গে তোমার কোনোকালে কোনো সম্পর্ক ছিল না, সামাজিক অবস্থানেরও বিস্তর ফারাক ছিল, কিন্তু সময়ে অসময়ে তারাই তোমার পাশে। হার্ট অ্যাটাকের সময়ে দেখলাম তো ওদের সেবা যত্ন। সে তো পয়সার বিনিময়ে নয়, শুধু আমাকে ভালোবেসে। শুধু আমার নয়, এই ছেলেগুলো প্রকৃত অর্থে অনেকের স্বজন হয়ে উঠেছে যাদের সঙ্গে তথাকথিত রক্তের সম্পর্কের পরিবার নেই। এবার বলো আমার যা কিছু আছে তা যদি আমি স্বজনকে না দিয়ে অন্য কাউকে দিই তাহলেই কি আমার পরিবারকে বঞ্চিত করা হবে না?’
নীরব সম্মতি ছাড়া আর কোনো উত্তর ছিল না সন্তুর কাছে।
এর মাস চারেকের মাথায় শিবশঙ্করের দ্বিতীয় বার হার্ট অ্যাটাক হল। এবার আর স্বজনের ছেলেরাও কিছু করতে পারল না। ইহলোক থেকে বিদায় নিলেন শিবশঙ্কর। সন্তু তো গিয়েছিলই, সন্তুর বাবা, কাকারাও গিয়েছিল। আর কিছু না হোক কৌতূহল যথেষ্ট ছিল। জানতে হবে না ঢেঁকি অবতারের উইলে শেষ পর্যন্ত কি লেখা হয়েছে! আবার একবার শিবশঙ্কর নিজের অনমনীয় মনোভাব, জেদের পরিচয় দিলেন। উকিল পাল্টেছিলেন কিন্তু নিজের মত নয়। প্রায় সব কিছুই স্বজনের নামে করে গেছেন, গোপালের জন্যেও কিছু রেখে গেছেন, ব্যবস্থা করে গেছেন যাতে আমৃত্যু গোপাল ওই বাড়িতে থাকতে পারে।
সারা বাড়ি লোকে লোকারণ্য। গোপাল, স্বজনের ছেলেরা নিজেদের প্রিয়জন হারানোর বেদনায় স্তব্ধ। ওদেরকে দেখতে দেখতে সন্তুর শিবশঙ্করের কথাটা আবার মনে পড়ল, ‘পরিবার বলতে তুমি কি বোঝো?’ উইলের কথা জেনে তার বাবা ও কাকারা তখন বিরক্ত মুখে চলে যাচ্ছেন। সন্তুর মনে হল শিবশঙ্করের নিজের পরিবার হল রক্ত আর স্বার্থের সম্পর্ক ছাড়া অন্য রকম পরিবার আর স্বার্থ নেই বলেই বোধহয় তার ভিত অত্যন্ত শক্ত। এসব তার বাবা, কাকাদের কোনোদিনই বোধগম্য হবে না। সেও তো বুঝল কতো পরে, যখন পূর্বপুরুষদের ভুল সংশোধনের কোনো সুযোগই আর নেই। তার খুব খারাপ লাগল। এতদিনে যেন সত্যিকারের মানুষটাকে চিনতে পারল। অজস্র লোকের বেদনাহত মুখ আর চোখের জলে শিবশঙ্করের শেষ যাত্রা দেখতে দেখতে সন্তুর মনে হল এক হিসেবে ঢেঁকি অবতার নামটা সার্থক। শত ব্যঙ্গ, শত লাঞ্ছনা সত্ত্বেও জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি সটান সোজা, টানটানই রয়ে গেলেন। কোনো চাপের কাছেই এই ঢেঁকি বেঁকল না, ঝুঁকল না।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন