বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ১৯টি

বৃষ্টি এবং নিছক প্রেমের গল্প

প্রেম ফেব্রুয়ারী ২০১৭

প্রেমের এপিটাফ

প্রেম ফেব্রুয়ারী ২০১৭

সূর্যের তীব্রতা নয়, চন্দ্রের স্নিগ্ধতা চাই

এ কেমন প্রেম? আগস্ট ২০১৬

প্রত্যয় (অক্টোবর ২০১৪)

স্ফুলিঙ্গ

মনোয়ার মোকাররম
comment ৭  favorite ০  import_contacts ৫৩৪
১.

ওমর ফারুকের মেজাজ খারাপ। না, ইনি খলিফা ওমর ফারুক নন। ইনি মোঃ ওমর ফারুক। পিতা মুরাদ মিয়া, মাতা জোবেদা খাতুন, গ্রাম মুরাদনগর, জেলা কুমিল্লা। গ্রামের নামের সাথে তার বাবার নামের মিলটা কোন কাকতালীয় ব্যাপার নয়। ওমর ফারুকের দাদা তার ছেলের নাম তার জন্মস্থানের সাথে মিলিয়েই রেখেছিলেন মুরাদ মিয়া। ওমর ফারুকের মন খারাপ এজন্যে নয়। তার বাপের নাম যা খুশি তা হোক। মুরাদ মিয়া বা কুমিল্লা মিয়া যা খুশি হোক। এটা তার মাথা ব্যাথার বিষয় নয়। তার মেজাজ খারাপ অন্য কারনে। আজ তার বার্ষিক পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে। এই বার্ষিক পরীক্ষা অন্যসব বার্ষিক পরীক্ষার মত নয়। এটাকে বলে নির্বাচনী পরীক্ষা। এসএসসসি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হবার আগে নির্বাচনী পরীক্ষা নামক একটি পুলসিরাত পার হতে হয়। সেই পুলসিরাত পার হতে গিয়ে সে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। সেটাও তার মেজাজ খারাপ হবার কারন নয়। সে দশ বিষয়ের মধ্যে ইংরেজি দুই পার্ট, গণিত, বিজ্ঞান আর ভূগোলে অনুত্তীর্ণ হয়েছে। অর্থাৎ সে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিতে পারবে না। এতেও তার কোন আক্ষেপ নেই। দু একবার এসএসসি পরীক্ষা দিতে না পারলে তার এমন কিছু আসবে যাবে না। কিন্তু তার বাবা মার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়বে। তার মা সারাক্ষণ মন খারাপ করে বসে থাকবে। সেটাও তেমন চিন্তার কোন বিষয় নয়। তার মার মন অল্পতেই খারাপ হয়ে যায়। সিনেমার নায়ক নায়িকা মারা গেলেও তিনি সারা দিন মন খারাপ করে বসে থাকেন। সুতরাং তার মা মন খারাপ করবেন সেটা ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। আসল ঝামেলাটা পাকাবে তার বাবা। সারাক্ষণ চোখ পাকিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকবে। এমনিতে তার বাবা ছোটখাট ধরনের মানুষ। মোটাসোটা থলথলে শরীর। সে তুলনায় চোখ দুটি ছোট ছোট আর সরু। সেই সরু আর ছোট ছোট চোখ যখন তিনি পাকিয়ে তাকান মনে হয় যেন তার চোখ দুটো ব্যাঙ-এর চোখের মতো কোটর থেকে বেরিয়ে আছে। ভয়ঙ্কর একটা দৃশ্য হওয়ার কথা। সমস্যা এখানেই। ওমর ফারুকের ভয় লাগে না। প্রচণ্ড হাসি পায়। সে ব্যস্ত থাকে হাসি লুকাতে। হাসি চেপে রাখা সহজ কাজ নয়। সে মনে মনে চেষ্টা করে এমন কিছু কথা মনে করতে যাতে তার বাবার হাস্যকর চাহনি থেকে মনকে দূরে সরিয়ে রাখা যায়। কিন্তু খুঁজে পায় না। তার জীবন বড় নিরস জীবন। তেমন কোন ঘটনাই নেই। তার ঠিকই হাসি চলে আসবে। তার বাবার চোখ রাগে কোটর থেকে আরো বেরিয়ে আসবে। ওমর ফারুকের ঠোট আরো বিস্তীর্ণ হবে। অবশেষে যা ঘটবে তা হল তার বাবা ছুটে এসে দড়াম দড়াম করে তার পিঠে দু চার ঘা বসিয়ে দিয়ে ক্ষান্ত হবেন। আর রাগে গড় গড় করে বলতে থাকবেন- গরুর বাচ্চা গরু। গরুর বাচ্চা গরু কিভাবে হয় তা ওমর ফারুক ভেবে পায় না। গরুর বাচ্চা হবে বাছুর। তার বাবা মুরাদ মিয়া এসএসসি তে ব্যকরনে কত পেয়েছিলেন তা নিয়ে ওমর ফারুকের মনে কিঞ্চিৎ সন্দেহ আছে।

২.

আরিফুল ইসলামের ও মন খুব একটা ভালো নেই। আপনার নিশ্চয় জানতে ইচ্ছে করছে কে এই আরিফুল ইসলাম। ওমর ফারুকের মেজাজ খারাপের সাথে তার মন খারাপের কোন সম্পর্ক আছে কিনা? আরিফুল ইসলাম তেমন বিখ্যাত কেউ নয়। আবার একদম অখ্যাতও বলা চলে না। আরিফুল ইসলামের এলাকা গোবিন্দপুরে মোটামুটি অনেকেই তাঁকে চেনে। সেও এবার এসসসি পরীক্ষা দিবে। এবং সবাই শতভাগ নিশ্চিত যে আরিফুল ইসলাম চোখ বন্ধ করে পরীক্ষা দিলেও গোল্ডেন ফাইভ পাবে। যদি সারা বাংলাদেশের মধ্যে একটা মেধা তালিকা তৈরী করা হয়, তাতেও আরিফুল ইসলাম অনায়াসে প্রথম দশের মধ্যে ঢুকে যাবে। আরিফুল ইসলাম তার এই ছোট্ট জীবনে কখনো কোন পরীক্ষায় প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হয়নি। সুতরাং তার এলাকায় তার একটা নাম ডাক থাকবে, লোকে তাঁকে চিনবে এতে অবাক হবার কিছু নাই। কিন্তু আরিফুল ইসলামের মন খারাপ কেনো? আজ তারও নির্বাচনী পরীক্ষার ফল বেরোবার কথা। সে কি ভালো করতে পারে নি? নাকি তাঁকে ল্যাং মেরে কেউ এবার প্রথম হয়ে গিয়েছে? না, তেমন কিছু হয় নি। সে যথারীতি এবারো প্রথম হয়েছে। সকল বিষয়ে এ প্লাস পেয়েছে। কিন্তু তবু তার মনে কোন আনন্দ নেই।

৩.

ওমর ফারুকের হাসি পাচ্ছে। তার বাবার সরু ছোট চোখ ধীরে ধীরে কোট থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আর ওমর ফারুকের ঠোটের হাসি প্রশস্ত হচ্ছে। সে প্রানপণে চেষ্টা করে যাচ্ছে কিছু একটা দুখের স্মৃতি মনে করে হাসিটা থামিয়ে রাখতে। একবার ক্লাস থ্রি তে পড়ার সময় পড়া পারে নি বলে তার বাবা তাকে স্কেল দিয়ে এমনভাবে পিটিয়েছিল যে পিঠ কেটে রক্ত বেরিয়েছিল। ধুর, এটা কোন ঘটনা হলো, পড়া না পারলেতো মারবেই,বিশেষ তার বাপের মত বাপ হলে তো কথাই নেই। মুরাদ মিয়ার চোখ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসছে, আর ওমর ফারুকের ঠোট প্রশস্ত থেকে প্রশস্ততর হচ্ছে। ফলাফল অবধারিত। চপেটাঘাতের মুহুর্মুহু শব্দে পুরো ঘর কাঁপিয়ে তার বাবা শান্ত হলেন। ওমর ফারুকের একটু ব্যাথা লাগে, কিন্তু এই মারপিটের পরে মানসিক একটা যে অশান্তি থাকে সেটা থেকে যখন তার মুক্তি মেলে, তখন আর মারের শারীরিক ব্যাথাটা মনে থাকে না। বরং সে মনে মনে অপেক্ষাতেই থাকে কত তাড়াতাড়ি এই দুশ্চিন্তা নিরোধক নাটকের প্রদর্শনী শুরু হবে। এই সমীকরন ওমর ফারুকের জন্যে যতটা সরল, আরিফুল ইসলামের জন্যে ততটা নয়। এই পুরো নাটকের সেও একজন দর্শক। তার জন্যে মোটেও এটি সুখকর নয়। একেতো এতো ডামাডোলের ভীরে তার ভালো রেজাল্ট নিয়ে কেউ মাথাই ঘামায় না, সে ভালো করবে এটাই স্বাভাবিক। তার উপর তার সামনে তার থেকে তিন বছরের বড় অতি প্রিয় ভাইটির এই পরিনতি সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। এই নিয়ে তৃতীয় বারের মত নির্বাচনী পরীক্ষার বৈতরনী পার হতে ব্যর্থ হল ওমর ফারুক । নিচ থেকে উঠে এসে আরিফুল ইসলাম তাকে ধরে ফেলছে। এবার তো আরিফুল ইসলাম তাকে টপকেই যাবে। ওমর ফারুকের অবশ্য এতে কিছু আসে যায় না। কিন্তু আরিফুল ইসলামের খুব খারাপ লাগে ভাইয়ের জন্যে।

৪.

গোলাপ কুড়ি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এনায়েত উদ্দিন খুব রাশভারী মানুষ। অল্প কথা বলেন। তার সামনে বসে আছেন মুখ কাচুমাচু করে ওমর ফারুকের মা বাবা। হুম, ওমর ফারুকের মা বাবা হিসেবেই তারা এনায়েত সাহেবের সামনে বসে আছেন। তাই তাদের মুখ কাচুমাচু । আরিফুলের মা বাবা হিসেবে যখন আসে তখন তাদের মাথা থাকে উচু। নিচু মাথায় আরিফের মা-বাবা এসেছেন ফারুককে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় যেনো অংশ নিতে দেয়া হয়, সেই সুপারিশ করতে। এইবার যদি ওমর ফারুক পরীক্ষা দিতে না পারে, তাহলে আত্মীয় স্বজনের সামনে মুখ দেখাতে পারবেন না তারা। ছোট ছেলেটা যদি বড়টাকে ডিঙ্গিয়ে যায় তাহলে কেমন দেখায়। আর এক রেজিষ্ট্রেশনে চার বারের বেশী পরীক্ষা দেয়া যায় না। এবার পরীক্ষা না দিলে সামনের বার হবে লাস্ট চান্স। ওমর ফারুকের মা বাবার বিশ্বাস পরীক্ষাটা দিতে পারলে একটা কিছু হয়েও যেতে পারে। বোর্ড পরীক্ষায় অনেক কিছু সহজে দেখা হয়। এতো কড়াকড়ি না। সহজে ফেল করানো হয় না। কিন্তু শুধু এই ভরসায় বসে নেই তারা। ওমর ফারুক যে চিজ তাতে, কোন ফর্মুলায় তাকে পাশ করানো যাবে না । তারা হেড মাস্টার সাহেবের কাছে যে মাস্টার ফর্মুলা নিয়ে এসেছে তা হলো প্রথমে তাকে এসএসসি পরীক্ষার জন্যে অনুমতি দেয়া, দ্বিতীয়ত, একটু সিস্টেম করে আরিফুল ইসলামের পিছনে ওমর ফারুকের সিট ফেলা। আরিফুল যদি একটু ছিটেফোটা হেল্প করে, দুই একটা শুন্যস্থান পূরন, এমসিকিউ, কয়েকটা অংক তাহলেই হয়ে যাবে। ফেল করলেও ওমর ফারুক বিশ পচিশ করে সব বিষয়েই পায়। খালি আর দশ টা নাম্বার। ২৫ পেলেও নাকি বোর্ড পরীক্ষায় স্যারেরা ফেল করান না। টেনেটুনে ৩৩ পাইয়ে দেন। এনায়েত উদ্দিন অনেক্ষন ধরে তাকিয়ে রইলেন। মাস্টার প্লান তার পছন্দ হয়নি। তিনি কোন অন্যায় কাজ করেন না। অন্য কেউ হলে ভদ্র ভাষায় এতক্ষনে চলে যেতে বলতেন। কিন্তু বলতে পারছেন না, কারন তারা যে আরিফের ও বাবা মা। চক্ষু লজ্জায় কিছু বলতে পারছেন না। তার সামনেই ওমর ফারুকের মা কান্নায় ভেংগে পড়াতে হেড মাস্টার সাহেব শেষ মেষ রাজী না হয়ে পারলেন না। তবে জানিয়ে দিলেন তিনি পরীক্ষায় অনুমতি দেবার কেউ না। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির প্রভাবশালী সদস্য আখতার পাটোয়ারীর কাছ থেকে যদি অনুমতি নিতে পারে ফারুকের বাবা মা তবে ফারুকের পরীক্ষা দেবার ব্যবস্থা তিনি করবেন। আর তখন ফারুকের সিট আরিফের পেছনে যাতে হয় সে ব্যবস্থাও করে দিতে তিনি ব্যবস্থা নিবেন। এর জন্যে খুব বেশি পাপ হবে বলে মনে হয় না। কারন আরিফুল ইসলাম আর তার বাবা মায়ের সম্মতিতেই তা হবে, ওমর ফারুকের পরিবারের মান সম্মানের জন্যেই হবে। এর বাইরে যেটুকু পাপ হবে, তার জন্যে তিনি তওবা করে নিবেন। তওবা যদি কবুল হয় তো ভালো, না হলে তার পাপের ভাগ তিনিই নিবেন।

৫.

ম্যানেজিং কমিটির সদস্য পাটোয়ারী সাহেবের দেখা পেতে অনেক বেগ হতে হলো। তার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে তার সাথে যোগাযোগ করলেন ফারুকের বাবা মা। আখতার সাহেবের মাছের ব্যবসা। পরে দুইটা হোটেলও দিয়েছেন। সেসব নিয়েই তিনি ব্যস্ত। স্কুলে খুব একটা আসতে পারেন না বিশেষ সভা ছাড়া। এখন তিনি গোলাপ কুড়ি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির একজন সক্রিয় সদস্য। তার আট ছেলে মেয়ের সর্ব কনিষ্ঠটি তৃতীয় শ্রেনীতে পড়ে এই স্কুলে। তিনি আরিফুলের বাবা মাকে তার মাছের আড়তে ডেকে পাঠালেন। তারা গেলেন মাছের আড়তে দেখা করতে। হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে পড়াতে তিনি তাদেরকে আরেক দিন দেখা করতে বললেন। এই সুবাদে আখতার সাহেবের দুই হোটেলও দেখা হয়ে গেলো ফারুকের বাবা মার। তাতেও কিছু সুরাহা হলো না। অবশেষে একদিন গোলাপ কুড়ি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের হেড মাস্টারের রুমে ওমর ফারুককে নিয়ে তার বাবা মা আসলেন। মাছের আড়ৎ আর হোটেল ঘুরে ঘুরে অনেক দিন পার হয়ে গেছে। আর দুই দিন আছে এসএসসি পরীক্ষার রেজিষ্ট্রেশনের। হেডমাস্টার সাহেব ইচ্ছে করেই তার স্কুলের মানবিক গ্রুপের রেজিষ্ট্রেশনের তারিখ পিছিয়ে শেষ দিনের আগের দিন রেখেছেন। তিনিও আশায় আছেন যদি কিছু একটা হয়। আরিফুলের বাবা মার অনুরোধ তিনি ফেলতে পারেন নি। কিন্তু কাল রেজিষ্ট্রেশনের ওএমআর ফর্ম পূরণ করে পাঠাতেই হবে। আখতার সাহেব ফারুকের বাবা মাকে বললেন, ‘ছেলের খোজখবর কি ঠিকমত রাখেন না নাকি? খোজ খবর রাখলে এত খারাপ করে ক্যামনে? খালি ছেলে মেয়ে নিলেই তো হবে না। ঠিক মতন লালন পালন করা লাগে তো, নাকি?’ ওমর ফারুকের খুব অস্বস্তি লাগছিলো। তার জন্যে তার বাবা-মার এই বেইজ্জতিতে তার খুব খারাপ লাগছে। তার চেয়েও বড় কথা বাসায় গিয়ে কি রকম মার খেতে হবে তাই সে ভাবছে। আরিফুলের মা সাহস করে বললেন, ‘আমার ছোট ছেলেটা এই স্কুলের সেরা ছাত্র। সবার মাথা একরকম হয় না’। এনায়েত সাহেবও সাহস দিলেন। আরিফুল ইসলাম যে এই স্কুলের বিগত ১০-১৫ বছরের মধ্যে সেরা ছাত্র সেই সার্টিফিকেট দিলেন। আখতার সাহেব কিছুক্ষন বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে রইলেন। একজন নিশ্চিত ফেল করা ছাত্রের কারনে তার স্কুলের যে ক্ষতি হবে তা তিনি কিভাবে বরদাশত করবেন তাই বোধ হয় ভাবছিলেন।




৬.

বাসায় ফিরে ওমর ফারুকের বাবা শান্ত হয়ে বসে রইলেন। এই শান্ত সেই শান্ত না। ঝড়ের আগে সব কিছু যেমন শান্ত থাকে এ সেই রকম শান্ত পরিবেশ। আজ যে পরিমান বেইজ্জতিটা হলেন তিনি, তার ইচ্ছে করছে এরকম ছেলের হাড় মাংস আলাদা করে রেখে দিতে। কিন্তু উনার এখন আর ইচ্ছে করছে না কিছুই। শুধু একবার ফারুকের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বললেন, তোর লজ্জা শরম থাকলে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যা এখন। ওমর ফারুক তার বাপের নির্বুদ্ধিতা দেখে অবাক হয়ে যায়। এখন বাজে রাত বারটা। এই রাতে সে কোথায় যাবে। আর তার কি আরেকটা বাবা-মা আছে নাকি যে সেখানে চলে যাবে। আর এইসব পরীক্ষা-টরীক্ষা নিয়ে এসব বলার কি মানে? তার বাবার জ্ঞান বুদ্ধির লেভেল দেখে সে যারপরনাই বিস্মিত। ফারুকের মা অনেকক্ষন কান্নাকাটি করেছেন বাসায় এসে। ফারুকের মার খাওয়ার হাত থেকে বেচে যাবার এটাও একটা কারন। আগামীকাল আরিফ আর ফারুক এক সাথে রেজিষ্ট্রেশনে করবে। ফারুকের পরীক্ষা দেবার অনুমতি মিলেছে অবশেষে। ফারুকের ভালোই লাগছে। আর টেস্ট পরীক্ষা দিতে হবে না। দেখে-টেখে পাশ হয়ে গেলেতো ম্যাট্রিক্টাও পাশ। উফ, বড় বাচা বেচে যাবে। আরিফটাকে একটু এক্সট্রা খাতির করতে হবে।

৭.

দুপুরে দু ভাই একসাথে বেড়িয়েছে স্কুলের পানে। তার বাবা সকাল বেলাতেই এক চোট দেখিয়ে অফিসে গেছে। যাবার সময় তার মাও বললো, ‘দেখিস ঠিকঠাক মতন ফর্ম টর্ম পূরণ করিস। আবার উলটা-পালটা করে দিস না। কোন কিছুই তো ঠিক ঠাক করতে পারিস না। তোকে যে কেমন করে পেটে ধরেছিলাম’। মার অভিমান দেখে ওমর ফারুক একটু অবাক হয়। কিন্তু পরক্ষনেই ভুলে যায়। তার মা বরাবরই অভিমানী। তার কথা কানে তোলার কোন মানে হয় না। ঠিক ঠাক মতো রেজিশট্রেশনটা করে নিতে পারলেই হয়। অনেক সময় বৃত্ত ভরাট করতে গিয়েও উলটা-পালটা হয়ে যায়। কোন ভুল করা যাবে না। আরিফটার কাধে চড়ে আল্লাহ আল্লাহ করে কোনমতে পুলসিরাতটা পার হয়ে যেতে হবে। মনের খুশীতে সে স্কুলের দিকে রওয়ানা দিলো।






৮।

আরিফুলদের ঘরে সবাই চুপচাপ বসে আছে। বাবা, মা, আরিফ, ফারুক - সবাই চুপচাপ। কারো মুখে কোন কথা নেই। কিন্তু তার আগে বিরাট এক কাণ্ড ঘটে গেছে। ফারুকের কোন খোজ পাওয়া যাচ্ছিল না সারা দিন। এখন রাত বারোটা বাজে । কোথা থেকে ফারুক উদয় হয়েছে।

৯।

ফারুকের উধাও হবার পর থেকে ফিরে আসার মাঝের খবর হলো ফারুক রেজিষ্ট্রেশন করে নি। অগত্যা আরিফকেই রেজিষ্ট্রেশন করতে হয়েছে। তবে উধাও হবার আগে ফারুক, আরিফকে জানিয়ে গেছে, ‘আমি পরীক্ষা দিব না। তুই রেজিষ্ট্রেশন করে নিস’। একথা বলেই সে এক দৌড়ে উধাও। তার আর কোন খোজ নেই। সে এক হুলস্থুল কাণ্ড। আরিফ ফোনে তার মাকে জানিয়েছে। মা জানিয়েছে বাবা কে। তার বাবা অফিস ফেলে দৌড়ে এসেছেন। ফারুকের মা সারাদিন খুজেছেন ছেলেকে। তার বাবাও খুজেছেন। কিন্তু কোথাও খুজে পায় নি। অগত্যা, আরিফ একাই রেজিষ্ট্রেশন করেছে। ফারুককে নিয়ে হারিয়ে যাবার চিন্তা ছাপিয়ে তার পরীক্ষা না দেবার এই বজ্জাতিতে ফারুকের বাবার মাথায় রক্ত উঠে গিয়েছে। তিনি বাজার থেকে বিশ টাকা দিয়ে কিনে আনা মোটা জালি বেতটা বের করে রেখেছেন। আজ এটা তিনি ফারুকের পিঠে যদি না ভাঙ্গেন তবে তিনি মানুষের বাচ্চা নন।

আর ওদিকে ফারুক পরীক্ষা না দেবার সিদ্ধান্ত নিয়ে বারো নাম্বার বাসে চড়ে ১০ টাকা ভাড়া দিয়ে গুলিস্তান চলে গেছে। সেখানে গিয়ে সে বঙ্গভবন শিশু পার্কের শতায়ু বৃক্ষের নিচে সারাদিন বসে ছিল। পরে বিকেল বেলা ফিরে এসে তাদের এলাকার ক্লাবে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলা দেখেছে। বাংলাদেশ মাত্র দুই রানের জন্যে হেরে গিয়েছে। অনেক কান্না পেয়েছে তার। এই পরাজয় মেনে নেয়া যায় না। ক্লাবের অনেকেই কেদে ফেলেছে।

১০।

- কোথায় ছিলি সারাদিন? অতি মিহি কন্ঠে ফারুককে তার বাবা জিজ্ঞেস করলেন।
- বঙ্গভবন শিশু পার্কে ছিলাম। গুলিস্তানে, তোমার অফিসের আশেপাশেই। বিকেলে ফিরেছি, তারপর ক্লাবে খেলা বাংলাদেশ- পাকিস্তান ফাইনাল খেলা দেখেছি, খেলা খুব জমেছিলো। বাংলাদেশ ২ রানে হেরে গেছে। ফারুক নিজেও অবাক। এতো সাহস কোথায় সে পেলো সে নিজেও বুঝতে পারছে না।
- রেজিষ্ট্রেশন না করে পালালি কেন? পরীক্ষা নাকি দিবি না? অতি কষ্টে রাগ থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
- পরীক্ষা দিব না তাতো বলিনি।
- তবে ? পালালি কেনো?
- না পালালে তোমরা জোর করে রেজিশট্রেশন করিয়ে দিতে, তাই পালিয়েছি।
- রেজিষ্ট্রেশন না করলে পরীক্ষা দিবি কিভাবে? আরিফের সাথে না বসলে পাশ করবি কিভাবে? এবার ফারুকের মা চিৎকার করে উঠেন।
- এবার দিব না মা। সামনের বার দিব। অনেক পড়াশোনা করে দেবো মা। একা একাই দিব। তুমি যে একদম গাধা ছেলে পেটে ধর নি আমি প্রমাণ করে দেব মা, তুমি দেখো।

ফারুকের বাপের মনে হলো তিনি অনেক সহ্য করেছেন। বিশ টাকায় কেনা জালিবেতটার সদ্যবহারের এখুনি সুযোগ। তবেরে, বলে তিনি ফারুকের কলার চেপে ধরলেন। ফারুকের মা চিৎকার করে উঠলেন, থামো! আমার ছেলের গায়ে একটা ফুলের টোকাও দিবে না তুমি। ফারুক দোড়ে তার মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে হাঊমাঊ করে কাঁদতে লাগলো। মা ছেলেকে শক্ত করে জড়িয়ে রাখলেন। তার চোখ থেকে আনন্দ অশ্রু টপ টপ করে ফারুকের মাথায় আশীর্বাদের মত ঝরে পড়ছে।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন