বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৬৬
গল্প/কবিতা: ৮৪টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

শেকড়ে

আমার আমি অক্টোবর ২০১৬

গোধুলী

আমার আমি অক্টোবর ২০১৬

আধুনিক দাস

এ কেমন প্রেম? আগস্ট ২০১৬

দেশপ্রেম (ডিসেম্বর ২০১৩)

মোট ভোট অচেনা অবেলা

এনামুল হক টগর
comment ৭  favorite ০  import_contacts ৭২১
পেছনে অনেক রাত। সামনে স্মৃতি দিয়ে ভরা বেদনা বিধুর ছেলে বেলার এই ইস্টিশন।
অতীতে অনেকবার সেলিনা রশিদ বাবার হাত ধরে এই ইস্টিশনে এসেছে।
শত বিচিত্র শত স্বপ্নছায়া আর দীর্ঘ রক্তাক্ত ইতিহাস দিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে এই সৈয়দপুর ইস্টিশন।
বহুপথ পাড়ি দিয়ে আজ নতুন করে এই ইস্টিশনে এসেছে কবি সেলিনা রশিদ। চারিদিকে কোলাহলভরা দীর্ঘ প্রান্তর, এরই মাঝে অচিন মানুষের আসা যাওয়া।
ইস্টিশনে বেশির ভাগ অচিন মানুষেরাই যাতায়াত করে। ইস্টিশনে বেশীর ভাগ অচিন মানুষের মধ্যে একজন। হঠাৎ কবি সেলিনা রশিদ আর আমি বিষ্ময়ভাবে মুখোমুখি হই। কেউ কাউকে চিনি না। সেলিনা রশিদ একজন কবি প্রকৃতির সাথে তার আন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব।
কবি আমার দিকে চেয়ে বললো আপনাকে খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছে। আসলে সেলিনা রশিদের সাথে আমার কোনদিনই দেখা হয়নি। কবির মনে যে সত্য উদয় হয়, তাই হয়তো আমাকে চেনা চেনা মনে হচ্ছে। কারণ আমিও একজন লেখক।
আমি বললাম হয়তো কোন দিন আমাদের দেখা হয়েছিল সাথে কথাও হয়েছিল। আপনি কেমন আছেন। ভালো তবে খুব ভালো না। বহুদিন পড়ে এই ইস্টিশনে এসে দাঁড়ালাম। চিরযৌবনভরা এই ইস্টিশনটি আমার খুব পরিচিত।
আমি বললাম ইস্টিশনটার চারপাশ দিয়ে সবুজেভরা অঢেল বৈভব।
দূরবর্তী সূর্যের আলো জ্বল জ্বল করে জ্বলছে, প্রকৃতির ভালোবাসা রূপ ঐশ্বর্য।
কবি বললেন এই সৈয়দপুরেই স্বাধীনতার সময় বাবা যুদ্ধে শহীদ হয়েছিল। মাসটি ছিল অক্টবরের ১৫ তারিখ ১৯৭১।
বাবার মৃত্যুার পর মা আর আমরা চার বোন ছিলাম খুব অসহায়। সবচেয়ে ছোট বোন হোসনেআরা তখন মায়ের পেটে।
বাবার মৃত্যুর পর চাচারা মায়ের উপর নির্যাতন চালাতো। তাই মা তার বাবার বাড়ী গাজীপুরে চলে আসে এবং নানার পরিত্যাক্ত বাড়ীতে বসবাস করতে থাকেন।
আমি বললাম এটাই জীবন। যেখানে বেদনা আর আনন্দ একসাথে বাস করে। অবুঝ অণুরক্ত প্রেমের মমতা বিরহে কাঁদে। কবি বলেন আপনিতো আমাকে জীবন চিনিয়ে দিলেন। অবশ্যই আপনি একজন লেখক কারণ, লেখক ছাড়া এত সুন্দর দর্শন ভিক্তিক কথা বলা সম্ভব নয়। আমি বললাম মাঝে মাঝে লিখি কিন্তু খুব বেশি নয়।
কবি বললেন আপনার কথায় তো মনে হচ্ছে বেশি বেশি লেখা লেখি করেন।
পরপর দুইটি ট্রেন ইস্টিশন ভেদকরে চলে গেল, দুর মেঘালয় শান্ত বাতাস বইছে। স্পষ্টভাবে চোখে পরছে ভালোবাসার গ্রামগুলো। আমার অন্ধকার এই প্রিয় স্বদেশ। যার বুকে আমি খুঁজি আগামী সকালের নতুন আলো।
আমি বললাম তারপর আপনাদের জীবন কি ভাবে বেড়ে উঠলো। কবি বললেন মা সেলায়ের কাজ করতেন। বাবা শহীদ হওয়ার কারণে সরকারের পক্ষথেকে কিছু সন্মানি ভাতা দিতেন। পাশাপাশি মা হোমিও প্যাথিক কলেজের লেখাপড়া শেষ করে ডাক্তারি করতেন।
মায়ের সহযোগিতায় আমরা চার বোন উচ্চ শিক্ষা লাভ করি। মায়ের মৃতু্যৃর পর আমাদের জীবনে অসহ মন্ত্রণা নেমে আসে।
মায়ের দশ বিঘা জমি ছিল কিন্তু জমিগুলো মামাদের দখলে থাকায় আজও আমরা দখল পাইনি।
ইস্টিশনে আস্তে আস্তে সন্ধা নেমে আসছে। উজ্জ্বল দিনটি আঁধারের বুকে ঢেকে যাচ্ছে। আগামী প্রিয় তিলোত্তমা সকালের আশায়।
আমি বললাম বহুদিন আগে পৃথিবীতে প্রথম যাকে দেখেছিলাম তিনি আমার মা। তার ছিল মমতাভরা ভালোবাসার চোখ।
জগত জুরে তার ভালোবাসা এখনও মমতা ছড়ায় এক বৃহৎ আলোর রূপে।
আমি বললাম একদিন আমাদের সবাইকে ফিরে যেতে হবে অন্যভূবণে। যেমন আমাদের ছেড়ে বাবা মা চলে গেছে, অধরা অদৃষ্টের সীমানা পেরিয়ে।
কবি বললেন মায়ের ছবিটা এখন দেয়ালে আঁকা আছে, জীবন্ত মানুষের মতো সে তাকিয়ে থাকে নিবির অপলক আবেগে।
যেন ঈশ্বরের অবারিত এক নূরের রঙ। ইস্টিশনে রাত গভীর হচ্ছে। শেষ রাতে আমাদের ট্রেন আসবে। আমি সঠিক সময় ট্রেনটা ধরতে পারিনি তাই কবির সাথে কথা বলছি। একজন কবির সাথে কথা বলতে বেশ ভালোলাগে।
আমি বললাম দ্যাখো দুর্লভ আলৌকিক এক শিল্পকর্মের এই রাত। যেন শূণ্য বাতাস ভেদ করে হাজারও কোলাহল ভেসে আসছে উদ্যম নীলাকাশ একাকার করে। পৃথিবী যেন এক প্রাণোচ্ছাস বিরহের বন্ধনে কাতর। অবিচ্ছেদ্য আমাদের ভালোবাসার চোখ জোয়ায়ের নদীতে রূপবর্তী চাঁদ দেখছে।
কবি বললো গোপনে কান পেতে শুনতে হয় সে কথা সেই বেদনা ব্যথা।
আমি বললাম এ-এক বিষাদের শ্বাশত স্মৃতি, অতীত জীবনগুলোকে ঘিরে আছে। পেছনে দীর্ঘ রাত দীর্ঘ দিন আমাদেরকে ডাকছে। সেতু বন্ধনের ভালোবাসা বার বার ভেঙে যায়।
কবি বললেন শৈশবের সমভূমি ছেলে বেলার এই ইস্টিশন কত সুন্দর বিচিত্র রূপ ধারণ করে আছে। উত্তপ্ত সূর্যের বুক থেকে কত আনন্দ ভালোবাসা ছুটে আসছে।
পৃথিবীর এক প্রান্তে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। বেদনার মর্মপীড়া বুকে নিয়ে।
সামনে অসীম আকাশ আমাদের দেখছে। এক চা বিক্রেতা এসে বললো চা খাবেন ? অনেক রাত হয়ে গেছে, জাগতে হলে বেশ গরম চা খাওয়া প্রয়োজন। চা বিক্রেতা বললেন শুধু চা খাবেন, সাথে বিস্কুট দেই? আচ্ছা ছোটো এক প্যাকেট বিস্কুট দাও।
আমরা চায়ের সাথে বিস্কুট ভিজিয়ে মজা করে খেয়ে নিলাম। আমি বললাম আপনার সংসারে কতজন সদস্য। কবি বললেন চার ছেলে আর স্বামী। ছোট ছেলে ছাড়া সবাই বিবাহ করেছে।
আমি একটি এনজিও চালাই। স্বামী তেমন সহযোগিতা করেনা।
কেন করে না? ওটা পুরুষ জাতের স্বভাব। আমি বললাম পুরুষ জাতের তো ভালো স্বভাবও আছে। আপনার ছেলেরা সহযোগিতা করেনা। হ্যা ছেলে আমাকে সব সময়ই সহযোগিতা করে।
হাসতে হাসতে কবিকে বললাম আপনি দেশকে ভালোবাসেন। অবশ্যই আমি দেশকে ভালোবাসি। আমার বাবা নিজের প্রাণ দিয়ে এই দেশকে ভালোবেসে শহীদ হয়েছেন। সেই বাবার রক্তই আমার শরীরে প্রবাহিত। তারপর কবি বললেন আমার সারাটা শরীর জুড়ে এক বেদনা বিধুর আঁধার। সেই আঁধারের ভেতর দেশের নিপীড়ন ক্ষুধার্ত মানুষের কান্নার শব্দ শুনতে পাই। পরিপূর্ণ আলো দিয়ে তাদের জাগাতে ইচ্ছে করে কিন্তু জীবন এক রহস্যময় গতি, যার ভেতরে দুঃখরা কাঁদে।
মানুষ বন্দি থেকে মুক্তি চায় কিন্তু মানুষ কখনও বন্দি থেকে মুক্তি পায় না। বন্দি থেকে মুক্তির একটি দরজা ভাঙলেও সামনে শত-শত দরজা দাঁড়িয়ে থাকে।
বাবা দেশকে ভালোবেসে যে প্রেমের বীজ এই মাটিতে পুঁতে দিয়েছিল তা আজ অচেনা অবেলার আঁধারে ঢেকে গেছে।
এদেশে কয়জন মানুষ বাঁচার আনন্দে মুক্তি পেয়েছে, কয়জন মানুষ সৎ আছে। দেশের অসংখ্য মানুষ না খেয়ে রাত্রি যাপন করে।
আমরা কি দেখি, আমরা কি তাদের কথা ভাবি। সবাই আমরা নিজের জন্য ভাবি। এই নিজের ভাবনা কবে শেষ হবে। যেদিন থেকে নিজের ভাবনা শেষ হতে থাকবে, সেদিন থেকে দেশের মানুষ মুক্তি পেতে থাকবে।
আমি বললাম কবি তুমি তো অনেক কিছুই জানো, হাজার বছর ধরে কোন অদৃশ্য ভ্রুণ থেকে প্রশান্ত মায়ের পবিত্র জঠরে মানুষের প্রথম এসেছিল। তারপর নতুন জীবনের কলতানে মাটির বুক দিয়ে এক সময় হাটতে থাকে।
এই ভাবে মানুষকে চিন্তাশীল হতে হয়েছে। গবেষণা আর সাধনা দ্বারা মানুষকে নতুন নতুন বিষয় সৃষ্টি আর নির্মাণ করতে হয়েছে। পরিশ্রম দ্বারা জ্ঞান অর্জন করতে পারলে তারপক্ষে দেশেকে কিছু দেওয়া সম্ভব।
জীবনকে বিশ্বাস করতে হবে যে কোন এক অদৃশ্য শক্তির প্রজ্ঞা আমাদেরকে জ্ঞান আর নির্দেশ দেয়। বিবেক আমাদের ন্যায় অন্যায়ের প্রতিক্রিয়া বর্ণনা করে। আমাদেরকে সত্য দর্শনের পথে এগিয়ে যেতে হবে। আমিত্ব ভেঙে গেলে তবেই জ্ঞান শুরু হবে। প্রত্যক্ষ দর্শন ছাড়া বিশ্বাস বহুতার মধ্যে ছুটাছুটি করে আর বার বার রঙ বদলায়।
সত্য দর্শন সন্দেহের রঙকে মুছে দেয়। কামনাকে কর্মে রূপান্তর করে। আর তখনই বিচিত্র রঙের সমাহার এক বিন্দুতে গিয়ে মিলিত হয়। তিনি আর বিশ্বাস ছাড়া কিছুই থাকে না।
কবি একটু হেসে বললেন কোন অণুই তার সত্তা থেকে বিরাজিত হতে পারে না। একের ভেতরে বহুরূপ আবার ঘুরে ফিরে এক রূপ। যেন মহাএককের ভেতর অখন্ড।
গুপ্ত রহস্যের প্রবাহমান ধারা প্রতিটি বীজের গভীরে লুকিয়ে থাকে। এক নূরময় বিচিত্র বিষ্ময় যেন কাল কাউসারের প্রেম।
আমি কবির চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম চিন্তার দৃশ্যায়ন মনোজ্ঞ করার জন্য সব চেয়ে বেশী প্রয়োজন জ্ঞান। জ্ঞান মানুষের অনুভূতির চেতনাকে জীবন্ত করে। তখন আদর্শের সাহস থেকে মুক্তির দোয়ার খুলে যায়।
রাত আরো গভীর হচ্ছে। পৃথিবী যেন ঘুরছে অসীম শূণ্যতার ভেতর। জীবন মৃত্যুর এক চিরন্তন আবর্তনে।
কবি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন মানুষের মধ্যে জীবনের প্রত্যাশা আর মৃত্যুর গোপন রহস্যভেদ এক সাথে বাস করে। মৃত্যু হলো জীবনের এক গভীর সহচর বন্ধু।
মানুষ তার অস্তিত্বের চক্র থেকে মৃত্যুকে অতিক্রম করতে চায়। প্রতিটি মানুষের বেঁচে থাকার বাসনা মৃত্যুর চেয়ে প্রবল। তারপরেও মৃত্যু আমাদের কাছে আসে। অন্তরঙ্গঁ ভাবে বন্ধুর মতো বুকের ভিতর বাস করে।
আমি বললাম সত্য উদঘাটনের জন্য প্রত্যেক মানুষকে নিজের সাথে যুদ্ধ আর সাধনা করতে হয়। শেষ রাতের নির্জন বাতাস এসে শরীরে লাগছে কিছু বধির কুষ্টরোগী আর ভিখারী ইস্টিশনে ঘুমিয়ে আছে। কিছু পরেই নতুন সকাল আসলে ওরা হয়তো জীবনের প্রয়োজনে হাটতে আরম্ভ করবে। চারিদিক থেকে পৃথিবীর লোভ লালসা কামনা বাসনা প্রলোভন ছুটে আসছে, যার যার অধিকার নিয়ে। জন্ম থেকে মৃত্যু আর মুক্তির আশায় মানুষ প্রজ্ঞার জগত খুঁজছে।
কিছুক্ষণের মধ্যে দুইটি ট্রেন ইস্টিশনে এসে দাঁড়ালো। আমরা সারারাতের গল্প শেষ করে গাড়ীতে গিয়ে উঠলাম। কবি সেলিনা রশিদের ট্রেনটি সীমান্তের দিকে ছুটে যাচ্ছে আর আমার ট্রেন গাড়ীটি ঢাকার পথে রওনা হয়েছে।
সকালের পাখিরা উড়ছে অন্তহীন অজানার দিগন্তে। নিরব দৃশ্যপট নিরিবিলি দিনের প্রকৃতির ফাঁকে ফাঁকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে অচিন বৃক্ষ। জীবনের রুদ্ধদ্বার ভাঙা গান ভেসে আসছে। কবির চোখ দিয়ে শান্ত নিরব অশ্র“ ঝরছে। তার স্বপ্নের ইচ্ছেগুলো পেছনের অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে। অদৃশ্য আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে ট্রেনগাড়ী ছুটে যাচ্ছে।
তার পিতা আর মাতার দুঃখভরা দুটি চোখ কবিকে শান্তনা দিচ্ছে। পিছনে স্বামীর অসহায় সংসার পড়ে আছে। কিছু আনন্দ কিছু বিরহ ব্যথা দূর থেকে উঁকি দিচ্ছে। কবির বিশাল শূণ্যতার ভিতর সীমাহীন নিস্তব্ধের এক নৈঃশব্দ আঁধার অতীতকে ধীরে ধীরে ডাকছে। রহস্যময় দর্শনের গভীর সত্তা বুকে নিয়ে কবি ছুটে যাচ্ছে দূর অচেনা অবেলার পথে...
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন