বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৯ অক্টোবর ১৯৯৬
গল্প/কবিতা: ৫টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

২৫

অচেনা বাঙলা

বাংলা ভাষা ফেব্রুয়ারী ২০১৩

রোদ বৃষ্টির দিনে

ঈর্ষা জানুয়ারী ২০১৩

প্রজন্মের বিজ্ঞান খেলা

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নভেম্বর ২০১২

পরিবার (এপ্রিল ২০১৩)

মোট ভোট ২৫ শেষ চিঠি

মিনহাজুর রহমান জয়
comment ৯  favorite ০  import_contacts ৬৪৬
মিথিলা পরীক্ষা দিয়ে নিচে নামছে।
এমনস্থ কলেজের পিয়ন এসে মিথিলার হাতে একটা চিঠি বাড়িয়ে দিলেন। মিথিলা হতভম্ব হয়ে সেই পিয়নটার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ করে এই পিয়নটা কেন ওকে চিঠি দিবে? মিথিলার সব জল্পনা-কল্পনাকে উড়িয়ে দিয়ে পরণে পিয়নটা বলল, নেন, আপনের লাইগা রাইখা গেছে।
মিথিলা নির্বিকারে জিজ্ঞেস করল, কে রেখে গেছে?
আরিফ স্যারে।
ক্যান? স্যার কি কোথাও গেছেন? এখনো চিঠিটি নিজের হাতে নিলো না মিথিলা।
হ। হেয় গেছে গিয়া। হেরে বাইর কইরা দিছে।
ক্যান?
এতকিছু আমি জানি না। আমার জাইনা লাভও নাই। আমারে খালি আরিফ স্যার চিঠিডা দিয়া কইলেন আপনের কাছে দিয়া দিতে। এই লন।
মিথিলা হাত বাড়িয়ে চিঠিটা গ্রহণ করল।

নিচে ক্যাম্পাস গ্রাউন্ডে এসে দাঁড়ালো।
এখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু সাতপাঁচ ভাবছে মিথিলা।
কেন স্যার হঠাৎ করে কলেজের চাকরি ছেড়ে চলে যাবেন? উনার কি কেউ মারা গেছেন যার জন্যে তিনি তার সবচে’প্রিয় ছাত্রীর সাথে দেখা না করেই চলে গেলেন? গেলেন তো গেলেন কোথায়? এরকম হাজারও প্রশ্ন উঠছে মিথিলার মনে। আরিফ স্যার তাঁর জীবনের সবগুলো সিক্রেট মিথিলার সাথে আলোচনা করেছেন। তাঁর জীবনের সব দু:খ-সুখের ঘটনা বলেছিলেন মিথিলা। মিথিলাও স্যারকে খুবই সম্মান করতো। স্যারের সাথে পড়াশুনা করার চেয়ে তার সাথে আড্ডা দিতেই ভাল লাগতো ওর। শুধু মিথিলারই না সব শিক্ষার্থীরাই অনেক হাসিঠাট্টা করতো আরিফ স্যারের সাথে।
মনে হয় সবার আগে মিথিলা পরিক্ষা শেষ করে ফেলেছে।
তাই এখনো গ্রাউন্ড পুরো ফাঁকা।
কিন্তু সবাইকে আরিফ স্যারের চলে যাবার খবরটা জানানোর জন্য মরিয়া হয়ে পরেছে মিথিলা। অবশেষে স্যারের দেয়া চিঠিটা খুলে পড়ার প্রস্তুতি নিল মিথিলা। স্যারের কোনো ব্যক্তিগত তথ্যও থাকতে পারে। তাই একা একাই চিঠিটা পড়াকে উত্তম মনে হল মিথিলার।
চিঠিটা খুলেই পড়া শুরু করল মিথিলা। চিঠিটাতে লেখা ছিল:


প্রিয় মিথিলা,

খুব ইচ্ছে ছিল তোমার সাথে কথা বলে যাব। কিন্তু তুমি পরিার হলে ছিলে। তাই চুপচাপ তোমাকে দেখে চলে যাওয়াকেই ভাল মনে হল আমার। আমি জানি তুমি আমার উপরে অনেক রেগে আছ। আর যখন তুমি রগচটা মেজাজ নিয়ে থাক তখন তোমাকে দেখতে খুবই ভাল লাগে। কেননা তোমার এরকম রূপ খুবই কম সময় দেখা যায়। আমি জানি, তুমি আমার হঠাৎ করে চলে যাবার কারণ জানতে চেয়ে ব্যাকুল হয়ে উঠছো। পৃথিবীর আর কাউকেও যদি আমি কথাটা না বলি তবুও তোমাকে আমি বলব।

আমি কখনো বিয়ে করিনি। কিন্তু আমার একটা বোনের একটা মেয়ে ছিল। দেখতে ঠিক তোমার মতো রূপবতী। একদিন সড়ক দুর্ঘটনায় আমার বোন আর দুলাভাই মারা যান। তারপর থেকে আমার বোনের মেয়ে মারিয়া আমার কাছে থাকতো। একদিন যখন আমি মারিয়াকে স্কুল থেকে আনতে যাচ্ছিলাম তখন ও আমাকে দেখে রাস্তার ঐ পার থেকে ছুটে আসতে নেয়। খানিকবাদে একটা ট্রাকের চাকার নিচ থেকে ওর লাশ বের করা হয়। তারপর থেকেই আমি শিক্ষকতা করার সিদ্ধান্ত নেই। কারন এই কলেজেই আমি মারিয়ার মতো অনেক মেয়েকে খুঁজে পাই। বিশেষ করে তোমাকে। তুমি দেখতে হুবহু আমার মারিয়ার মতো। আমি সবাইকে বলতাম মারিয়া আমার মেয়ে। আর সেই মেয়েকে হারিয়ে তুমিসহ নিজের আরো অনেক মেয়েকে পাই। সবার নাম মনে রাখতে একটু-আধটু সমস্যা হয়। বুঝো না কেন? আমার তো এখন অনেক বয়স হয়েছে। তবুও যখন প্রত্যেকবছর তোমার মতো কয়েকজন মেয়ে এসে আমাকে বলে, ‘স্যার ভাল আছেন?’ তখন আমি তাদের চিনতে পারি না। যখন নিজের পরিচয় দিয়ে বলে, ‘স্যার, আমি ১৭তম ব্যাচের। এখন ডাক্তার/পাইলট/উকিল হয়েছি’ কথাটা শুনে আমি এক আজব তৃপ্তি পাই। যদি আজ মারিয়া বেঁচে থাকতো নিশ্চয়ই সেও এরকম কিছু একটা হতো।

আমি শিক্ষকতাকে কখনো আমার পেশা হিসেবে নেইনি। এটাকে আমি একটা পূন্যের পথ হিসেবে বিবেচনা করেছি। কাস শেষে যখন কোনো ছেলে আমাকে বলতো, ‘স্যার আমাকে একটু গিটার বাজানো শিখাবেন?’ তখন প্রফুল্ল মন নিয়ে আমি তাকে গিটার বাজাতে শিখাতেম। হঠাৎ আমার নামে কোনো এক অভিভাবক অভিযোগ দেন অধক্ষ্য মহোদয়ের কাছে। অভিযোগপত্রটি খুবই মজার ছিল। সেই অভিযোগ পত্রে লিখা ছিল আমি নাকি মেয়েদের সাথে প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশি মেলামিশা করি। আমি তোমাদের কোচিং কাস করাই না দেখেও আমার নামে অভিযোগ দেওয়া হল। এতে আমার দোষ কি তুমিই বলো? মাস শেষে প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর কাছ থেকে কিভাবে আমি হাজার-পনেরশ টাকা নিতে পারি। না নিলেও ওরা জোর করে দিয়ে যাবে। নিশ্চয়ই আমি আমার মেয়ে মারিয়াকে পড়ালে ওর কাছ থেকে টাকা নিতাম না। তাই এমনিতেই যখন কেউ কোনো সমস্যা নিয়ে আমার কাছে আসলে আমি সমাধান করে দিতাম। অনেকবার অভিভাবকেরা এসে আমাকে বলেছে, ‘স্যার, আপনি আমার বাসায় এসে আমার মেয়েকে আলাদাভাবে পড়ান। আমি আপনাকে মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে বেতন দিব’। তাদের কথা শুনে আমি মুখেমুখে না করে দিয়েছি। সম্ভবত উনারা মনে করেছেন আমি বেশি টাকার লোভে না করেছি। আর তাই অধ্য মহোদয়কে আমার কথা বলে কান ভরিয়েছেন। আর তাই এতো অভিযোগ শেষে অধ্য মহোদয় আমাকে চাকরি ছেড়ে চলে যেতে বললেন।

আমি তোমাকে সবসময় আমার মেয়ে মনে করেছি। তাই মেয়ে হিসেবে তোমার কাছে আমার একটা আবদার। আমার এই চিঠিতে আমি যত কিছু লিখেছি তা কাউকে বলার দরকার নেই। তুমি তোমার লেখাপড়ায় মনযোগ দাও। যেভাবেই হোক তোমাকে ভাল রেজাল্ট করতে হবে। আমার সময় হয়ে যাচ্ছে। আমি চললাম। আজকেই চলে যাব। ভাবছিলাম এখন থেকে যখন আর তোমাদের সাথে দেখাই হবে না, তোমাদের মাঝে আমি আমার মারিয়া খুঁজে পাবার সুযোগই পাব না, তাই একেবারেই মারিয়ার কাছে চলে যাব। ভাল থেকো। আর যাই কর না কর মুখে সবসময় একটা হাসি রেখ। দূর থেকে দেখতে আমার খুবই ভাল লাগবে।

ইতি
সম্ভবত তোমার প্রিয় একজন শিক্ষক
আরিফ স্যার

চিঠিটা পড়া শেষ করে চোখের অশ্রু বন্যা মুছছে মিথিলা।
কয়েকজন বান্ধবীও ইতিমধ্যে পরিক্ষা শেষ করে চলে এসেছে। তাদের দেখে তাড়াহুড়ার মধ্যে চিঠিটা ব্যাগের একটা বইয়ের মাঝখানে ভাঁজ করে রেখে দিয়েছে মিথিলা। বান্ধবীদের মধ্য থেকে একজন বলল, মিথিলা, চল আরিফ স্যারের কাছ থেকে একটা উপন্যাসের বই নিয়ে আসি। তিনি তো রবীন্দ্রনাথের অনেক বই পড়েন। তাঁর কাছে চাইলে তিনি নিশ্চয়ই দিবেন। এমনিতেও আজকে পরীক্ষা শেষ।
বান্ধবীর কথা শুনে আড়ালে গিয়ে আবারো নিজের চোখের পানি মুছছে মিথিলা। সম্ভবত এই দৃশ্যটা অদূর কোনো স্থান থেকে লক্ষ্য করেছেন আরিফ স্যার।



আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন