বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৫ নভেম্বর ১৯৮১
গল্প/কবিতা: ৩টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৩৭

বিচারক স্কোরঃ ২.৮৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৫ / ৩.০

দুঃখ (অক্টোবর ২০১৫)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৩৭ যদি সে থাকতো পাশে

Muntasir Maruf
comment ৭  favorite ০  import_contacts ৫৪২
রাতে কয়েকটা গুটি গুটি চাকা দেখা যায় মুখের এখানে ওখানে। সকাল হতে হতেই গুটির সংখ্যা বাড়ে, সারা শরীর জুড়েই স্থানে স্থানে দেখা দেয়। জ্বর, শরীর ব্যথা, চুলকানি শুরু হয়। সকালেই মেডিসিন বিভাগে সিনিয়র এক চিকিৎসককে দেখিয়ে ছেলেটি নিশ্চিত হয়, তার হাম হয়েছে। ‘একলাম্পশিয়া’ ওয়ার্ড শুরুর দিনটিতেই হোস্টেল ছেড়ে বাড়ি চলে আসে সে। চৌদ্দদিন বাসার ভেতর বন্দী। অসহ্য যন্ত্রণা- চুলকানি সারা শরীর জুড়ে। বিছানায় শরীর, মাথা রাখলেই চুলকানি বেড়ে যায় কয়েক গুণ। হাত দিয়ে চুলকানোও যায় না। রাতের পর রাত নির্ঘুম বসে থাকতে হয়। একা।
কখনো কখনো কান্না পায় ছেলেটির।
মনে হয়, মেয়েটি যদি পাশে থাকতো।
অথবা থাকতো ডাক দেয়া দূরত্বে।
পাশের রুমটাতে থাকতো!
অথবা কিছু ক্ষণ যদি মেয়েটার সাথে কথা বলতে পারতো! একটু ক্ষণ।
হয়তো কষ্টটা কমে যেত তার। হয়তো মেয়েটির কন্ঠ সারাটা শরীর জুড়ে ভাল লাগা ছড়িয়ে যন্ত্রণা উপশম করে দিত! হয়তো!
কিন্তু ছেলেটি তো জানে - সেটি সম্ভব নয়!
....................................................................
বাবা-মার সায় নেই। আকারে-ইঙ্গিতেই কেবল নয়, সরাসরিই তারা তাদের অসন্তোষ জানিয়ে দেন। তবু ছেলেটি ‘অফ-ট্র্যাক’-এর বিষয়েই পড়াশোনা করতে চায়, উচ্চতর ডিগ্রি নিতে চায়। বাবা-মাকে অনেকটা মিথ্যা কথা বলেই এফসিপিএস-১ম পর্বের জন্য পড়ালেখা চালিয়ে যায়। হোস্টেলে সবাই গ্রুপ বেধে পড়তে পারে, ছেলেটি পারে না। অন্যান্য বিষয়ের প্রতিটি পরীক্ষা দিতে আগ্রহী শিক্ষার্থী কয়েকজন করে, ফলে তারা একসাথে পড়তে পারে। ছেলেটি তার বিষয়ে পরীক্ষা দেয় একা। তাই পড়তেও হয় একা। ছয় বছর পর একা পড়তে বসে সে। সে-ই মেডিকেল-বুয়েট ভর্তি পরীক্ষার সময় একা পড়তো সে। সেই শেষবার। এর পর মেডিকেলের প্রতিটি পরীক্ষায় কারো না কারো সাথে পড়তে হয়েছে তাকে। শেষ পেশাগত পরীক্ষাটা তো মেয়েটিই পড়িয়ে পাস করিয়েছে তাকে। একা পড়ার অভ্যাস তাই বলতে গেলে নষ্ট হয়ে গেছে। এমন একটা বিষয় পড়ছে সে যেটা বুঝিয়ে দেওয়ার মতোও কেউ নেই। খুব একাকী লাগে মাঝে মধ্যে। মনে হয়, মেয়েটি যদি থাকতো এ সময়!
নাহ! - মেয়েটি তার বিষয় পড়তো না, তাকে পড়া বুঝিয়ে দিত না- সেটা ঠিক। কিন্তু দিনে কয়েকবার ফোনে আর এক-দুবার সামনাসামনি কথা তো হতে পারতো তাদের- দেখা তো হতে পারতো! অন্তত দ্বিতীয় পেশাগত পরীক্ষার সময় যেমনটা ছিল। অন্যের সাথে হোস্টেলে পড়লেও প্রায় প্রতিদিন মেয়েটির সাথে দেখা হওয়াটা তার পড়ার জন্য ছিল অন্যতম প্রেরণা। তেমন প্রেরণা নিয়ে অনেকটা স্বস্তিতে, অনেকটা নির্ভার চিত্তে এবারও পড়তে পারতো ছেলেটি।
কিন্তু ছেলেটি জানে - এ তার অবাস্তব চাওয়া মাত্র!
.........................................................................................
বারো দিন প্রচন্ড জ্বরে বাসায় পড়ে থাকার পর মুখে খাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিকে কাজ না হওয়ায় মেডিসিনের অধ্যাপকের পরামর্শ নিতে গিয়ে তার নির্দেশে সেদিনই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যায় ছেলেটি। সে রাত থেকেই ইনজেকশন সেফট্রায়াক্সন ২ গ্রাম করে ১২ ঘন্টা পর পর দিতে হয়। নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে। কিন্তু ঠিক কি কারণে জ্বর তা নিশ্চিত জানা যায় না। আট দিন ইনজেকশন চলার পরও সে জ্বর কমে না । চার ঘন্টা পর পর জ্বর ১০৪-১০৫ ডিগ্রি স্পর্শ করে। প্যারাসিটামল খাওয়ার দু ঘন্টা পর কমে দাঁড়ায় ১০২ এ। সারাদিন ঘাম হতে থাকে। এক মুহূর্ত যেন ঘাম মোছার বিরতি নেই। হাসপাতালে মা-বাবা থাকেন। সারাদিন দেখতে আসে আত্মীয়-বন্ধু-শুভাকাঙ্খীরা। তবু কেন যেন একা একা লাগে ছেলেটার। মনের ভেতর জল গড়ায়। গভীর রাতে সবাই কোন এক ফাঁকে কিছুক্ষণের জন্য ঘুমিয়ে গেলে চোখ বেয়েও গড়ায় তা। মনে পড়ে - বছর আড়াই আগে হাসপাতালের এই রুমটিতেই তার অসুস্থতার সময়ে তার পাশে, তার সাথে ছিল মেয়েটি। তেমন দিন আর আসে না এবার, তেমন রাত আর আসে না।
আসবেও না কোনদিন - জানে ছেলেটি।
.......................................................................
বিসিএস-আর্মি কোনটিতেই যাওয়ার ইচ্ছে নেই ছেলেটির। কিন্তু বাবা-মার বড় ইচ্ছে। একটি বিসিএসে প্রিলি-ই উতরাতে পারেনি ছেলেটি। এক সাথে পড়বে - পরীক্ষা দেবে, এ ভাবনায় চাকরীর ইচ্ছে না থাকলেও একসাথেই আবেদনপত্র পূরণ করে তারা। কিন্তু মেয়েটি আর পরীক্ষা দেয় না। ছেলেটিও একা পড়ার ব্যাপারে কোন আগ্রহ পায় না। প্রিলিতেই আটকে যায়। পরের বিসিএস-ও পড়ে না ছেলেটি। কিন্তু সকাল বেলায় ফাঁস হওয়া প্রশ্ন পেয়ে যাওয়ায় প্রিলি উতরে যায় এবার। কিন্তু গুরুত্বের সাথে পরীক্ষা-সংক্রান্ত কাজগুলো না করায় ভাইভায় বাদ পড়ে। কারণ ছিল - অবহেলায় ঠিকানা সংক্রান্ত তথ্য দু জায়গায় দু রকম দেয়া। ঘটনাচক্রে সেই ভাইভা যখন দ্বিতীয়বার অনুষ্ঠিত হয়, তখন ভাইভা বোর্ডে ছেলেটি সেটা জানতে পারে। ঠিকানা পরিবর্তন সংক্রান্ত একটা আবেদন পরীক্ষকরা রেখে যেতে বলেন তাকে, কিন্তু দ্বিতীয়বারেও কোন আশার বাণী শোনান না। ঠিকানার ব্যাপারে আবেদন করলেও ছেলেটি নিশ্চিত ভেবে নেয়- প্রথমবারের মতো একই কারণে দ্বিতীয়বারও ফেল করতে যাচ্ছে সে! এরই মধ্যে প্রথমবার বিসিএসে উত্তীর্ণ হতে না পারায় বাবা-মার চাপে আর্মিতে পরীক্ষা দিতে হয় ছেলেটিকে। বিসিএস-এর ভাইভা দ্বিতীয়বার দেয়ার দুদিন আগে আর্মির স্বাস্থ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারায় আটকে যায় সেবারকার মতো আর্মিতে যোগদানও। মাত্র দুদিনের ব্যবধানে পারিবারিকভাবে স্পর্শকাতর দু’দুটি ব্যর্থতার খবরে দিশেহারা অবস্থা হয় ছেলেটির। প্রথমবার বিসিএস-এ অকৃতকার্য হওয়ায় বাবা-মার প্রতিক্রিয়া দেখেছে সে। কিছুদিনের মধ্যে যখন জানাজানি হবে আরো দুটি অকৃতকার্যতার খবর - কিভাবে নেবেন বাবা-মা? এর পর কোন পথে এগোবে ছেলেটির ভবিষ্যত? জীবন ও ঘটনাপ্রবাহ কেমন যেন নিজ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে - মনে হতে থাকে ছেলেটির।
মনে হতে থাকে - মেয়েটি যদি এ সময় থাকতো কাছে?
অথবা দেখা হওয়া দূরত্বে?
অথবা কিছুক্ষণ যদি কথা বলা যেত তার সাথে!
কিন্তু জানে ছেলেটি - মেয়েটি শারীরিক ভাবে তখন তার থেকে সহস্র-লক্ষ মাইল দূরে - মানসিকভাবে আরো অনেক বেশী!
.........................................................................
আবেদনপত্রটা কাজে লেগে যায়। বিসিএস-এর দ্বিতীয়বারের ভাইভায় টিকে যায় ছেলেটি। বাবা-মার মুখে হাসি ফোটে। চরম অনীহা নিয়ে ছেলেটিকে যোগ দিতে হয় চাকরীতে। প্রথম পোস্টিংটাই হয় প্রত্যন্ত এক গ্রামাঞ্চলে। থাকতে হয় পরিত্যক্ত একটা ভবনে। সেখানে সারা দিনে বিদ্যুৎ থাকে বড় জোর চার ঘন্টা। তারও সাড়ে তিন ঘন্টা রাত দশটার পর! গরমের সময়ে কোন কোন দিন সব মিলে এক ঘন্টাই বিদ্যুৎ থাকে। প্রতিদিন কয়েকবার করে নিচ তলার কল থেকে বালতিতে করে পানি তুলতে হয় দোতলায়। সে পানিতে চলে গোসল-টয়লেট। আলাদা বোতলে করে রাখতে হয় খাবার পানি। আশপাশে কোন হোটেল নেই। বুয়ার হাতের চূড়ান্ত ঝাল আর অনেকটা সময় আগে রেঁধে যাওয়া ঠান্ডা খাবার পছন্দ না হলেও খেতে হয়। রাতে দূরের বাজারে যেতে হলে কোন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভকে ফোন করে আনতে হয়। সন্ধ্যার পর ঘোর অন্ধকারে শুয়ে-বসে দিন কাটানো। কথা বলার লোকও নেই। সন্ধ্যার পর ডাক্তার বলতে পুরো কম্পাউন্ডে ছেলেটি একা। বাবা-মার উপর প্রচন্ড অভিমানে সেখান থেকে পোস্টিং পরিবর্তন করতেও কোন আগ্রহ পায় না ছেলেটি। কার জন্যে করবে? কোথায় করবে? প্রচন্ড একা আর অসহায় লাগে ছেলেটির।
মেয়েটি যদি পাশে থাকতো - তাহলে কি এই অজ পাড়াগায়ে আসতো সে চাকরি নিয়ে? - ভাবে ছেলেটি।
ভাবে - অন্তত প্রতিদিন যদি কথা বলা যেত মেয়েটির সাথে তবুও এতটা অসহ্য লাগতো না এই চাকরী জীবন। একটা সময় ছিল যখন মোবাইলে প্রতি মিনিট ৬ টাকা ৯০ পয়সা করে বিল আসতো। হিসাব করে কল করতে হতো। ল্যান্ড ফোনে কথা হলেও মোবাইলে খুব বেশী কথা মেয়েটির সাথে বলা হয় নি তার। এখন এই ফ্রী টক-টাইম আর এফএনএফের যুগে ঘন্টার পর ঘন্টা মেয়েটির সাথে কথা বলা কি যেত না? বিরক্তিকর এই গ্রাম-বাসও আনন্দের হয়ে উঠতে পারতো।
জানে ছেলেটি - কেবলি ফ্যান্টাসী তার এ ভাবনা!
...................................................................................
দেড় দিন অজ্ঞান থাকার পর হাসপাতালের জরুরী বিভাগে ছেলেটির হাতের উপর মারা যায় তার বাবা। আত্মীয়-বন্ধুরা আসে, সান্ত¦না দেয়। চুপচাপ তাদের কথা শোনে ছেলেটি। কবর দিয়ে এসে তিন দিনের মাথায় আবার হাসপাতালে কাজে যাওয়া শুরু করে। প্রতিটা দিন প্রতিটা রাত কেন যেন শুধু একবার মেয়েটির সাথে কথা বলার ইচ্ছে হয় ছেলেটির। কি বলবে জানে না সে; কেন ইচ্ছে হয় কথা বলতে - বোঝে না সে। শুধু ইচ্ছে জাগে - একবার, মাত্র একবার যদি মেয়েটির কন্ঠ শুনতে পেত।
অথবা একবার যদি তার পাশে এসে বসতো মেয়েটি।
কোন কথাই না হয় না বলতো! একবার কিছুক্ষণ তার হাতটা শুধু নিজের হাতের মাঝে রাখতো। একবার।
মৃত্যুর ছয় মাস আগে থেকে প্রতি মাসেই বাবাকে সপ্তাহখানেক করে হাসপাতালে ভর্তি রাখতে হচ্ছিল। পুরো সপ্তাহ হাসপাতালে কাটাতে হচ্ছিল মা-ছেলেকে। যন্ত্রণাকর সে দিনগুলোতে কেবলি মনে হচ্ছিল - মেয়েটি যদি থাকতো! যদি একবার এসে কিছুক্ষণ বসে থাকতো তার পাশে, তার বাবার পাশে- সমস্ত যন্ত্রণা কি ধুয়ে-মুছে যেত তার?
জানে ছেলেটি - তা আর হবার নয়!
...................................................................................................
গত প্রায় দশ বছরে এমন একটি দিন যায়নি যেদিন মেয়েটি ভাবনায় আসেনি ছেলেটির। তার মাঝে, এমন কিছু কিছু সময় গেছে, যে সময়গুলোতে মেয়েটির ভাবনা গাঢ় হয়ে ঘিরে ধরেছে তাকে।
কষ্টের সময়ে প্রবল করে পাশে পেতে ইচ্ছে করেছে তাকে।
দুঃখের সময়ে একবার দেখতে ইচ্ছে করেছে সামনাসামনি।
যন্ত্রণার সময়ে একটি বার কথা শুনতে ইচ্ছে হয়েছে তার।
কঠোরভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেছে ছেলেটি। মনের এক অংশ প্রবলভাবে বিদ্রোহী হয়ে উঠতে চেয়েছে। ফোন আর ইন্টারনেটের এই যুগে সাত সাগর তেরো নদীর ওপারের কারো সাথে কথা বলা বা তাকে চোখের সামনে হাঁটতে-চলতে দেখা যেখানে একটা বাটন টেপার অপেক্ষা মাত্র - সেখানে কেন এত যন্ত্রণা সয়ে যাওয়া!
মনের অপর অংশ নিবৃত করেছে তাকে। বলেছে - এটা তোমার একার কষ্ট - একার যন্ত্রণা। এ নিয়ে মেয়েটিকে তুমি কেন বিরক্ত করবে? ছেড়ে যাওয়ার পর মেয়েটি তো আর কখনো চায়নি তোমার সাথে এক দন্ড কথা বলতে! তোমার দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণার ব্যাপারে মেয়েটির তো কখনো কোন আগ্রহ ছিল না!
এখন মনে হয়, হয়তো মেয়েটি ছেলেটির জীবনের কোথাও কখনো ছিলই না!
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন