বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ মার্চ ১৯৮০
গল্প/কবিতা: ২৪টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৬৮

বিচারক স্কোরঃ ২.৩৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৩৫ / ৩.০

সাপের যুদ্ধ

বিজয় ডিসেম্বর ২০১৪

ভয়

ক্ষোভ জানুয়ারী ২০১৪

রয়েল বেঙ্গল কেট

ক্ষোভ জানুয়ারী ২০১৪

বাংলা ভাষা (ফেব্রুয়ারী ২০১৩)

মোট ভোট ৪৩ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৬৮ রসগোল্লায় বিষ

বিন আরফান.
comment ১৮  favorite ২  import_contacts ৬৭৭
১৯৫২ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ছিল পূর্ব পাকিস্তান। সে দেশের মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাঙলা। কিছু কিছু লোক বাঙলা-উর্দু তথা মিশ্র ভাষায় কথা বলত । তৎকালীন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ঘোষণা এল উর্দু হবে রাষ্ট্র ভাষা। যাদের মাতৃভাষা বাঙলা, তারা কিছুতেই মানতে নারাজ উর্দু হবে রাষ্ট্র ভাষা। তাঁরা বাঙলার জন্য লড়াই করেন এবং অনেক আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাঙলাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। বিজয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আরো বহু আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান নামক পরাধীন রাষ্ট্র হতে স্বাধীন একটি রাষ্ট্র বাংলাদেশ এর জন্ম হয়।

মা মরা পঞ্চম শ্রেণী শিশু ছাত্রী আবিদা তার সংসদ সদস্য পিতার সম্মুখে এসব পড়ছিলেন। অভ্যাস বলি আর বদ অভ্যাস বলি শিশু কালে সব শিশুদের মধ্যেই লক্ষণটি পাওয়া যায়, একের পর এক প্রশ্ন করার। আবিদার বেলায়ও ব্যতিক্রম ছিল না। প্রশ্ন ছুড়লেন পিতার নিকট।
‘বাবা, রাষ্ট্র ভাষা কি?’
সাংসদ পিতা জানালেন, এই যে তুমি স্বাধীন ভাবে আমার সাথে যে ভাষায় কথা বলছ, তাই। তুমি বাঙলায় বলছ, আমাদের রাষ্ট্রভাষাও বাঙলা।
এরূপ উত্তরে আবিদার মন ভরল না। শুরু করে দিল ক্যাচাল। আমরা যে ভাষায় কথা বলি তাতো মাতৃভাষা। স্যার বলেছেন,যে ভাষায় দেশের সার্বিক কার্যক্রম চলে তাই রাষ্ট্রভাষা, কিন্তু তুমি তো দেশ চালাচ্ছ ইংরেজি ভাষায় লিখে।

সাংসদ পিতা জবাব দিলেন, আরে পাগলি, আমি তো সংবিধান বিশেষজ্ঞ নই। কেবল মাত্র সংসদ সদস্য। সংবিধান ইংরেজি ভাষায় লিখিত। তাই বাধ্য হয়েই আমাকে ইংরেজি চর্চা করতে হয়।
ও তাই! মেয়েটি এই অনুভূতি প্রকাশ করে এবং আরো জানতে চায়, আচ্ছা বাবা পাকিস্তানের সাথে ভাষা আন্দোলনের পর কি বাঙালীরা ইংরেজদের সাথে ভাষা আন্দোলনের পরাজিত হয়েছিল?
সাংসদ বিব্রতকর প্রশ্ন শুনে ধমকের সুরে বললেন, ইংরেজদের সাথে ভাষা নিয়ে কোন যুদ্ধ হয়নি।

তাহলে সংবিধান উর্দুতে না হয়ে ইংরেজিতে লিখিত কেন? অথচ বাঙলায় হবার কথা ছিল!
একথা শোনা মাত্রই মেয়েকে কষে একটি চড় দিলেন। উর্দু শব্দটি আমার সামনে উচ্চারণ করবি না। পাকিস্তানিরা আমাদের অনেক নির্যাতন করেছে।

আবিদা বলল, ইংরেজরা কি কম করেছে? এছাড়া তোমরা যখন ‘আই এম একদম ফেডআপ’ ‘লোকিং ফর শত্রুস ’ এসব বলো তখনতো কেহ গলা চেপে ধরে না। তাছাড়া অনেকেই বাং ইং হিং চাং চিং ভাষার মিশ্রণেও কথা বলে তখন তো গায়ে ফুসকা পড়ে না!!
সাংসদ ক্ষেপে গিয়ে বললেন, তুই গেলি এখান থেকে!!!
আবিদা পাশের কক্ষে চলে যায়।

হঠাৎ কয়েকজন এলাকাবাসী সংসদ সদস্যের বাসায় প্রবেশ করলেন। দরজা খোলাই ছিল। কেননা একের পর এক লোকজন আসতেই থাকে, কতবার দরজা খোলা-বন্ধ করা যায়? তাই সর্বদা খোলা থাকে।

এলাকাবাসীর আগমন উপলক্ষে সাংসদ কাজের মেয়েকে বললেন, বাড়িতে কাঁঠাল আছে, ওদের খেতে দাও। বলে ভিতরে ব্যক্তিগত কাজে চলে গেলেন।
কিছুক্ষণ পর আসলেন। এসে কাজের মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলেন, ওদের কাঁঠাল খেতে দিয়েছ?
কাজের মেয়ে জানালেন, আজ্ঞে জি স্যার। প্রত্যেককে দু--ই কোষ করে দিয়েছি।
দু----ই কোষ! আরেকটি করে দে। আরে ওরা তো আমার বাড়িতেই খাবে। এখানে পেট পুরে খেতে না পারলে খাবে কোথায়!!
খাওয়া-দাওয়া শেষে আলাপ-আলোচনা করে জনতা চলে গেলে।

এদিকে ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, চড় খাওয়ার রাতেই শিশু আবিদার জ্বর এল। কয়েকদিন জ্বরে ভোগে একদিন পরপরে পাড়ি জমাল।

প্রথমে স্ত্রীকে তারপর মেয়েকে হারিয়ে সাংসদ শোকে পাথর হয়ে গেছেন। মৃত্যু সৃষ্টিকর্তার ইশারায় হলেও তিনি মেয়ের মৃত্যুর জন্য সর্বদা নিজেকে দোষী মনে করেন এবং প্রায় অন্যমনস্ক থাকেন। নিজের দুঃখ যতই থাকুক জন প্রতিনিধিদের ঘরে বসে থাকলে চলবে না। তাদের সুখ দুঃখ নিয়ে জনগণ না ভাবলেও জনগণের চাহিদা পূরণে সর্বদা মগ্ন থাকতে হবে। আজ সংসদ অধিবেশন। তাকে যেতেই হবে।

অন্যদের পাশাপাশি আবিদার বাবাও সংসদে উপস্থিত। উন্নয়ন মূলক আলোচনা না করে ক্ষমতায় কিভাবে বারবার বহাল থাকা যায় আর বিরোধীদল কিভাবে ক্ষমতায় আসতে পারে সেই আলোচনায় তুমুল হট্রোগোল চলছিল। দু’একজন মহিলা সাংসদ অশ্লীল বাঙলা প্রয়োগ করে সংসদে ডার্টি পিকচার সিনেমার পূনঃ শব্দ বিন্যাস করছিলেন বলেও মনে হচ্ছিল।

কিন্তু আবিদার পিতার তাতে কোনো মনোযোগ ছিল না। তিনি মেয়ের স্মৃতিতে মশগুল হয়ে আছেন। ভাবতে ভাবতে একসময় আসনে বসা অবস্থায় ঘুমিয়ে গেলেন।
ঘুমের মধ্যে তিনি নিজেকে মৃত হিসাবে আবিষ্কার করলেন। তিনি দেখছেন, পরকালের ময়দানে এক ভয়ংকর আকৃতির আজাবদাতা তাকে তাড়া করছেন। তিনি আজাবদাতা হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য লাগামহীন ছুটছেন। ছুটতে ছুটতে এক সময় এক দল লোকের সামনে পড়লেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শহীদ সালাম, রফিক, বরকত সহ আরো অনেক ভাষা সৈনিক। যারা রাষ্ট্রভাষা বাঙলার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি দেখেন, তাদের কোলে আপন মনে শুয়ে আছেন তারই কন্যা আবিদা।

আবিদাকে সাংসদ কিছু জিজ্ঞাসা করবেন কিন্তু তা হয়ে উঠল না। আজাবদাতা তার সামনে এসে হাজির। সাংসদ আজাবদাতাকে সুধালেন, কেন আমার পিছু নিচ্ছ, আমি কি দোষ করেছি?
আজাবদাতা এর সদুত্তর দিলেন তবে উত্তরে কি বললেন সাংসদ বুঝতে পারছেন না। আজাবদাতার ভাষা ছিল মিশ্র। একপ্রকার বাংলাদেশের ধনাঢ্য দুলাল ও বিভিন্ন বাংলিশ অনুষ্ঠান প্রচারের মত। তার মেয়ের নিকট জানতে চাইলেন, আজাবদাতা কি বলছেন?

আবিদা বললেন , তোমাকে সেদিনই আমি এর ইঈিত দিয়েছিলাম। তুমি বুঝতে পারো নি। মুখে বল রাষ্ট্রভাষা বাংলা অথচ দেশের বিভিন্ন কার্যক্রম চালাও ভিন্ন ভাষায়। আজাবদাতা বলতে চাচ্ছেন, তোমরা কিছু সংসদ সদস্যরা নিজেদের নিয়েই ভাব। দেশ ও জনগণ নিয়ে নয়। অথচ তোমরা ক্ষমতায় এসে ঠিকই পাশাপাশি বসে কুশল বিনিময় করো এবং বন্দি থাকা অবস্থায়ও একে অন্যের জন্য খাবার পাঠাও কিন্তু মুক্ত থাকা অবস্থায় কয়জন কয়েদির খবর নিয়েছিলে যে, তারা ঠিকমত খাবার পাচ্ছে কিনা? আপসোস কিছু নির্বোধ জনগণ তোমাদের জন্য রক্তারক্তির মাধ্যমে আত্মহত্যা করছে আর তোমরা তাদেরকে শহীদ ঘোষণা দিয়ে প্রচার চালায়ে জনমত বৃদ্ধি করছ।
তাই তোমাকে সাজা ভোগ করতে হবে।

সাংসদ বললেন, তাদের কাতারে আমি নেই। তাতে কি, তুমি আজাবদাতাকে এ কথা বুঝাবে কি করে? সে তো তোমার মিশ্র ভাষা বুঝে না।
এসব শ্রবণ করা শেষ হতে না হতেই আজাবদাতা সাংসদের দিকে আগুনের গোলা নিক্ষেপ করছিলেন। মুহূর্তেই সাংসদ চিৎকার করে বলতে লাগলেন, আমাকে ক্ষমা করে দাও, আমিও রাষ্ট্র ভাষা বাঙলা চাই।
তার ‘রাষ্ট্রভাষা বাঙলা চাই’ চেঁচামেচি শোনে অধিবেশনে উপস্থিত সকল সংসদ সদস্য থ মেরে গেলেন।
অল্প সময়ের মধ্যেই আবিদার পিতার হুশ এলো। তখন তিনি দাঁড়িয়ে স্পিকারের উদ্দেশ্যে বলছেন, রাষ্ট্রভাষা বাঙলা চাই, করা হোক।

তা শোনে সরকার দলের সাংসদরা হাসাহাসি করছিলেন আর বলছিলেন, লোকটি স্ত্রী-কন্যা শোকে পাগল হয়ে গেছেন।
বিরোধী দল বললেন, আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই। ওনি পাগল হন নি, দ্রব্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সম্ভবত ভাত না খেয়ে ঘাস খেয়ে এসেছেন তাই পাগলামি না ছাগলামি করছেন।
আবিদার বাবা বললেন, আপনারা আমাকে ছাগল-পাগল যাই বলেন বলুন তবে সংবিধান বাংলাতেই করতে হবে। নইলে বাঙালিরা বুঝবে কি করে সংবিধানে কি আছে? সবচেয়ে বড় কথা ধোঁকাবাজি দিয়ে দেশ চালালে পরকালে কঠিন আজাবের সম্মুখীন হতে হবে।

(৮ জানুয়ারি ২০১৩, রাত-৩টা// উৎসর্গ: বোন ‘রওশন জাহান’ কে)
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন