বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৪ জানুয়ারী ১৯৮৫
গল্প/কবিতা: ২২টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

১৫

শিক্ষা নিয়ে ভাবুক

শিক্ষা / শিক্ষক নভেম্বর ২০১৫

নিশাদের দুঃখ

দুঃখ অক্টোবর ২০১৫

চিরম্ দুঃখ

দুঃখ অক্টোবর ২০১৫

মা (মে ২০১১)

মোট ভোট ১৫ মায়ের দোয়ায় বেঁচে গেল শরীফ

জুনাইদ আলহাবিব
comment ২২  favorite ০  import_contacts ৪৭৪
মায়া-মমতা,স্নেহ-ভালবাসা মহান আল্লাহ তা'য়ালা মানুষের মাঝে কম-বেশী সবাইকে দিয়ে-ই সৃষ্টি করেছেন। এর মাঝে সব চেয়ে বেশী যাকে দেয়া হয়েছে তিনি হলেন মা-জননী। আল্লাহ তা'য়ালা বান্দাদেরকে যার পর নাই ভালবাসেন। তার কোন তুলনাই হয় না। কিন্তু এই বারিধারায় যাকে বেশী ভালবাসা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন তিনি হলেন মা-জননী। মায়ের ভালবাসার আতিশয্যে-ই সন্তানেরা আদরে বড় হয়ে উঠে। যিনি সন্তানদের দুঃখ-কষ্ট দেন না তিনি হলেন মা-জননী। আর সব সময় লক্ষ্য রাখেন সন্তানের কোন দিকে মঁঙ্গল রয়েছে, মা-জননী সেই দিকটাই বেচে নেন সর্বক্ষেত্রে। যদিও সন্তান এটাকে অমঙ্গল বা তার অসুবিধে মনে করে। তারপরও সন্তানের জন্য এটাই মঁঙ্গলজনক। মায়ের কথামত চললে অনেক সময় বিপদ-আপদ থেকে রক্ষাও পাওয়া যায়। এমনিক কোন সময় জীবনটাও ফিরে পায় সন্তান তার মায়ের দোয়ার বরকতে। যা সে নিজেও টের পায় না। এমন ঘটনা আমরা ইতিহাসে তো পাই-ই, তার সাথে সাথে আমরা বর্তমানেও মায়ের দোয়ার বরতকে বেঁচে যায় এমন ঘটনাও স্ব-চক্ষে দেখতে পাই। আবার অনেকে মুখেও বলতে থাকে যে, আল্লাহ আমাকে আমার মায়ের দোয়ার বরকতে বাঁচিয়েছেন। এমনকি আপনি/আমিও বলে থাকি। পক্ষান্তরে যারা মায়ের কথামত চলে না বা চলতে চায় না, তারা কত যে বিপদ-আপদের সম্মুখীন হয়, তা বলাই বাহুল্য। কোন কোন সময় জীবনটাও দিতে হয় মায়ের অবাধ্যতার কারণে। তাই তো গ্রামের একজন মায়ের আদরের ২টি ছেলে সন্তান ছিল। তাদেরকে নিজের প্রাণের চেয়েও ভালবাসতেন। তাদের কোনদিন মা-জননী অমঙ্গল কামনা করেন নি। শুধু সর্বক্ষন ভাল দোয়া-ই করতে জানেন। তাদের একজনের নাম রফিক। আরেক জনের শরীফ। দুনুজনেই আস্তে আস্তে মায়ের আদরে বড় হয়ে উঠে। শিশুকাল থেকে মা-জননী তার নিজ গৃহে-ই স্বরবর্ণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণ শিক্ষা দেন। পরে মা-জননী তাদের দু'জনকে আরো পাকাপোক্ত হওয়ার জন্য গণশিক্ষার প্রাক-প্রাথমিক কেন্দ্রে ভর্তি করান। যখন তারা দুজন প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় ১ম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়, তখন মায়ের আনন্দ আর ধরে না। সেই খুশিতে মা-জননী তাদের দু'জনকে সাথে সাথে প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি করান। পড়ালেখার ধারাবাহিকতায় দুনুজন ক্লাস নাইনে উন্নীত হয়। দেখতে দেখেত একটি বছর কেটে গেল। ভাল রেজাল্টে তারা দুনুজন পাশ করল। এবার রফিক এবং শরীফ দশম শ্রেণীর ছাত্র। এভাবেই দেখতে দেখতে শরীফ এবং রফিকের এস.এস.সি পরীক্ষা সামনে এসে গেল। তবে এর পূর্বে তাদের এস.এস.সি পরীক্ষা দিতে গেলে টেষ্ট পরীক্ষায় এলাও হতে হবে। এক সময় তাদের টেষ্ট পরীক্ষার তারিখ হল এবং নিয়মিত পরীক্ষাও হল। অল্পদিনের ব্যবধানে আবার ফলাফল ঘোষণাও করা হল। ফলাফল ঘোষণায় দেখা গেল যে, তারা দু'ভাই এ প্লাস পেয়ে ভাল রেজাল্টে উত্তীর্ণ হয়েছে। কারণ, রফিক এবং শরীফ দু'ভাই মেধাবী এবং এ প্লাসের ছাত্র পূর্ব থেকেই বোঝা গেয়েছিল। কিন্তু তাদের দু'জনের স্বভাব-চরিত্রে আকাশ-পাতাল তফাৎ। শরীফ একজন সৎচরিত্রের অধিকারী এবং বাধ্যগত সন্তান। সে তার মায়ের কথামত চলে। মা যা করতে বলেন, তা পালন করে। যা করতে নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকে। একদম মায়ের অমান্য কাজ করতে বিবেকে বাধা দেয় শরীফের। শরীফ অনর্থক সময় নষ্ট করে না। বাজে আড্ডায় বসে না। কাউকে গালি-গালাজ দেয় না। যা বলে বিবেচ্য কথাবার্তাই বলে। নইলে নিরব-নিস্তব্ধ থাকে। অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় না। মানুষকে যথাসাধ্য সাহায্য-সাহযোগিতা করতে ভালবাসে। আর সবচেয়ে গুরুত্পূর্ণ বিষয় হলো যে, শরীফ মাকে ছাড়া থাকতে পারে না। মাও তাকে ছাড়া থাকতে পারে না। শরীফ ক্লাস থেকে সোঁজা বাড়ীতে ফিরে। বাড়ীতে এসে মাকে খানা দেয়ার জন্য বললে, মা বলে বাবা শরীফ তোমার অপেক্ষায় আমিও খাই নি। তোমাকে নিয়ে একসাথে খাব। শরীফও তার মাকে ছাড়া খায় না। মা কাজের ব্যস্ততায় থাকলেও শরীফ একসাথে খাওয়ার জন্য বসে থাকে মায়ের জন্য অপেক্ষা করে। প্রয়োজন ছাড়া শরীফ মায়ের কাছ থেকে এক মুহুর্তের জন্যও দূরে সরে যায় না। পড়ালেখা ছাড়া সর্বক্ষন মায়ের পাশে থাকতে চায়। দূরে চলে গেলে যেন মনে হয়, শরীফের মাথায় পাহাড় ভেঙ্গে পড়ে যায়। শরীফ মাকে কতটুকু ভালবাসে। তা বলে বা লিখে প্রকাশ করার মত নয়। মায়ের প্রতি শরীফের অবর্ণনীয় ভালবাসা। পক্ষান্তরে রফিক সম্পূর্ণ শরীফের বিপরীত। একগর্ভের দুই ভাই। কিন্তু দু'জন দুমুখী। কেউ কার সাথে কোন দিক থেকেই খাপ খায় না। রফিক অসচ্চরিত্রের অধিকারী এবং মায়ের অবাধ্যতগ সন্তান বটে। দুষ্টামীতে এক নম্বর। পাড়া-পড়শী সন্তানেদর মারধোর এবং যন্ত্রনা দেয়। ঝগড়াটে প্রকৃতির লোক। অকথ্য ভাষায় গাল-মন্দ করে। অহেতুক সময় নষ্ট করতে দ্বিধাবোধ করে না। আজে-বাজে দুষ্ট ছেলেদের নিয়ে আড্ডা বসায়। রফিক মায়ের কথামত চলে না। মায়ের কথা শুনে না। মাকে গালি-গালাজ করে। মা যা আদেশ করেন, তা পালন করে না। যা নিষেধ করেন, তা থেকে তো বিরত থাকেই না বরং নিষেধাজ্ঞা কাজগুলি আরো বেশী বেশী করে। ক্লাস শেষে বাড়ী ফিরলেও কোনমতে বই রেখে ঘর থেক বের হয়ে চলে যায়। খাওয়া-দাওয়া তো দূরের কথা, মায়ের সাথে নেই কোন কথাবার্তা। রফিক আছে শুধু খেলাধুলায়। মাকে সর্বক্ষণ উপেক্ষা করে চলে। মায়ের কথায় কান দেয় না। নিজের স্বাধীনতায় চলা-ফেরা করে । তার ভেতরে মায়ের ভালবাসা নেই বললেই চলে। এভাবে চলতে থাকল রফিক এবং শরীফের দিনকাল। এস.এস.সি পরীক্ষা নিকটবর্তী। মাত্র আর বাকী ১৫ দিন। হাইস্কুল থেকে পূর্বঘোষিত ডেট অনুযায়ী সবাইকে তৈরী থাকার জন্য বলা হয়েছে। আর এরমধ্য দিয়েই হাইস্কুলে এস.এস.সি পরীক্ষার্থীদের বিদায়ী অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। তারপর দেখতে দেখতে চলে আসল কাঙ্খিত সেই যাওয়ার পালা। যেতে হবে পরীক্ষা দিতে বহুদূর। শরীফ এবং রফিক যে হাই-স্কুল থেকে পরীক্ষার্থী, সেই হাই-স্কুলের সেন্টার পড়ল তাদের অদূর শহরের পার্শ্ববর্তী একটি ঐতিহ্যবাহী আজমিরীগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ে। প্রধান শিক্ষক এস.এস.সি পরীক্ষার্থীদের সবাইকে জানিয়ে দিলেন যে, বাবারা তোমরা সবাই প্রস্তুত হয়ে থেকো। আমরা আগামীকাল ৬টায় এখান থেকে রওয়ানা হয়ে যাব। যাতে করে আমরা দিন-দুপুরের ভেতরে গন্তব্যস্থলে পৌছে যেতে পারি। কারণ, ভাটি এলাকায় মানুষেরা অধিকাংশ-ই নৌকাযুগে যাতায়াত করে। এখানকার এলাকায় যদিও মাঝে মাঝে প্রাইভেটভাবে সি.এন.জি ভাড়া করে কত মানুষ আসে, তারপরও উক্ত এলাকায় সুবিধাগত দিক দিয়ে নৌকাযুগে যাতায়াত করা-ই শ্রেয় মনে করে প্রাক্তন গ্রাম্য লোকেরা। কিন্তু যেহেতু নৌকাযুগে যাতায়াত সময় নষ্ট হয়, সেহেতু প্রধান শিক্ষক সবাইকে বলে দিলেন যে, আমরা আগামীকাল প্রাইভেটভাবে ২টি সি.এন.জি ভাড়া করে সময় নষ্ট না করে দ্রুত পৌছে যাব। কারণ, তোমরা ছাত্র হলে মাত্র ১০জন। ২টি সে.এন.জি-ই যথেষ্ট। সবাই একবাক্য "ওকে" স্যার বলে সায় দিল। এস.এস.সি পরীক্ষা দিতে নিম্মে ১ মাস সময় লাগবে। এদিকে শরীফ মনমরা। এই ১মাস মাকে ছাড়া শরীফ কীভাবে দিনগুলো কাটাবে? সেই চিন্তায় শরীফের দিন কাটছে না। রাতে ঘুম আসছে না। চোখে ঘুম আসতেই ফের চোখ খুলে যায়। বার বার মায়ের কথা মনে পড়ছে। মনভাঙ্গা শরীফ ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ে। আর তার ভাই রফিক আনন্দে আত্নহারা। কারণ, সে শহরে যাবে।কত কি দেখবে! কত যে ভাল লাগছে রফিক তা অনুভব করতে পারছে না। তার খুশিতে ঘুম আসছে না। মনে মনে বলছে, কখন সকাল হবে। কারণ, রফিকের রাত পোহালেই তাঁড়াতাঁড়ি শহরে পৌছানোই মনের ইচ্ছা। তাই তো রাত সংকীর্ণ হওয়া স্বত্ত্বেও আজকের রাতকে অনাকাঙ্খিতভাবে লম্বা মনে করছে। যেন অন্ধরাচ্ছন্নরাতের পোষাক আজ বিদীর্ণ না হয়ে সূর্য্য আর উদয় হবে না। এমনটাই চিন্তা করতে করতে রফিক এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে। বই-পত্র আর কাপড়-চোপড় রাতেই গুছিয়ে রেখেছিল রফিক। সকাল ৫টা। আনমনা শরীফ আযানের সুমধুর-ধ্বনি শুনে নামাজের জন্য উঠে গেল। তারপর অজু করে ফজরের নামাজ আদায় করে নিজের বই-পত্র এবং কিছু কাপড়া-চোপড় নিজের মত করে গুছিয়ে নিল। তারপর কাজ শেষে মায়ের কাছে গিয়ে কাঁন্নাজড়িত কন্ঠে বলল, মা আমি তোমায় ১মাস যাবত দেখতে পাব না। মা আমার বড় কষ্ট হচ্ছে। তোমায় ছাড়া কেমনে থাকব? মা! বলো না মা? বাচ্চা কন্ঠের স্বর শুনে শরীফের মাও কেঁদে কেঁদে বলে বাবারে তোমাকে আমি আল্লাহর হাওলা করে দিলাম, আর সব সময় আমার দোয়া তোমার সাথে থাকবে। এই বলে মা সন্তানকে বুকে জঁড়িয়ে আদর করে কপালে চুমু দিয়ে শান্তি দেন। এদিকে এখন ঘড়িতে বাজে ৫টা ৩০ মিনিট। রফিকের সবেমাত্র ঘুম ভাঙ্গল। রফিক বাথরুম সেড়ে মুখ ধুয়ে আলতুভাবে একটু ক্রীম ব্যবহার করে নিল। তারপর শার্ট-প্যান্ট পড়ে মায়ের কাছে থেকে বিদায় নেয়ার জন্য আসে এবং বিদায়ও নেয়। শরীফকে একপার্শ্বে দাঁড়িয়ে দেখে বড় ভাই রফিক বলল, এই চল না, সময় নাই, তাঁড়াতাঁড়ি চল। রফিক শরীফের অপেক্ষা বড়। তখন মা তাদের দুনুজনকে উপদেশমুলক কয়েকটি কথা বলেন যে, বাবারা তোমরা গ্রামের নবীন ছেলে শহরে যাচ্ছ, সাবধানে চলাফেরা করবে। রাস্তার একপার্শ্ব দিয়ে চলবে। শহরে বড় বড় গাড়ী দেখে-শুনে হাঁটবে। মানুষের সাথে ভাল ব্যবহার করবে। ঝগড়া-ঝাটি করবে না আর বিশেষ করে গাড়ীর ছাদে চড়বে না। শরীফ তার মায়ের উপদেশগুলো মন দিয়ে শুনছিল। কিন্তু রফিক তার মায়ের কথার মধ্য দিয়ে আসি বলে চলে গেল। কে কার কথা শুনে! শরীফ মায়ের কাছ থেকে হাত নেড়ে আবারও বিদায় নিলো। অবশেষে সবাই মিলে-মিশে সি.এন.জিতে উঠে পড়ল এবং ঘন্টা- দেড় ঘন্টা পর তাদের কাঙ্খিত গন্তব্যস্থলে পৌছে, যার যার অবস্থানস্থলে চলে গেল। আগামীকাল থেকে পরীক্ষা শুরু। ক্লান্তিপূর্ণ জার্নিতে সবাই ছিল টায়ার্ড। তাই সবাই কিছু সময় পড়ে শুয়ে পড়ে। কুকিলের কুহু-কুহু এবং কাকের কা কা শব্দে সকাল শাপলা ফুলের মত ফুটে উঠল। আকাশে নেই মেঘমালা। নেই কোন কুয়াশা। ফলে আকাশের নীলিমা দেখা যাচ্ছে। ধীরে ধীরে সূর্য্যোদয়ের কারণে রৌদ্র প্রখর থেকে প্রখর হচ্ছে। ছাত্ররা আজ বাংলা সাবজেক্টের আদ্যোপান্ত শেষে গোসল এবং খাওয়া-দাওয়া সেড়ে পরীক্ষার হলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। হলে ঢোকার আর মাত্র ৩০ মিনিট বাকী। সবাই আস্তে আস্তে হলের দিকে যেতে শুরু করল এবং ঠিক ১৫ মিনিট পূর্বেই তারা সবাই হলে পৌছে। তারপর সমস্ত ছাত্রদের পরীক্ষা নিয়মতান্ত্রিকভাবে দিতে শুরু করল। পরীক্ষা শেষ হলো দুপুর ১টায়। এভাবে ছাত্ররা পরীক্ষা দিতে দিতে পূর্ণ হল ১ মাস। বাড়ী ফেরার পালা। সবাই নিজ নিজ জিনিস-পত্র গুছাতে শুরু করল। শরীফ এবং রফিক তারা দু' ভাইও অন্যান্য ছাত্রদের সাথে তাদের জিনিস-পত্রও গুছিয়ে নিল। আগামীকাল গ্রামের বাড়ীতে ফিরে আসবে। মাকে দেখব। সেই খুশিতে শরীফ আনন্দে আত্নহারা। এদিকে, রফিকের কোন চিন্তা নেই। তার আনন্দ সে গাড়ীতে চড়বে। আনন্দ উপভোগ করবে। প্রাকৃতিক দৃশ্য অবলোকন করবে। রফিকের ইচ্ছে সে আগামীকাল গাড়ীর ছাদে উঠে বাড়ীতে যাবে। মায়ের উপদেশ গাড়ীর ছাদে উঠার নিষেধাজ্ঞার কথা ভুলে গেছে রফিক। রাত হলো। পরীক্ষার্থী ছাত্ররা রাতের ঘুমের স্বাদ পেতে অযথা গল্প-স্বল্প না করে শীঘ্রই ঘুমিয়ে পড়ল। সবাই নিথর হয়ে গভীর ঘুমে বিভোর। রাত নিঝুঁম। কোন সাড়া-শব্দ নেই। যেন আকাশ-বাতাসও ঘুমুচ্ছে। কিন্তু শরীফ তার মায়ের কথা বার বার স্বরণ করছে আর কাঁদছে। মায়ের ভালবাসায় শরীফের আর চোখে ঘুম আসছে না। কখন জানি রাত পোহাবে এবং মায়ের কাছে যাবে। সেই ভাবনায় সে বিছানায় ছটফট করছে আর এপাশ ওপাশ করছে। শরীফের এক সময় ঘুমের ভারে চোখের পাতা বন্ধ হয়ে গেল। গভীর ঘুমে বিভোর শরীফ। পক্ষান্তরে রফিক রাতটা ভালই কাটাল। কোন অশান্তি তাকে স্পর্শ করে নাই। পূর্ব দিগন্ত থেকে সূর্য্যের লালিমায় দুনিয়া আলোকিত হতে লাগল। খোলা জানালা দিয়ে রফিকের চোখে সূর্য্যের আলো এসে পড়তেই রফিক চোখ খোলে তাকাতেই দেখে সূর্য্যের আলোয় আকাশ ফেড়ে দিয়ে দুনিয়া আলোকিত করে তুলেছে। এদৃশ্য দেখে তার সহপাঠী সবাইকে জাগ্রত করে। বাড়ী ফিরে যাওয়ার আনন্দে সবাই বাথরুম সেড়ে নিজেরা প্রস্তুত হয়ে গেল। একটু পরেই তারা সবাই গাড়ীতে উঠবে। তাদের সাথে থাকা শিক্ষকের অনুমতির অপেক্ষায় আছে তারা। কোন্ সময় অর্ডার দিবেন, আর সাথে সাথে গাড়ীতে উঠে বসবে। এ কথা ভাবতে না ভাবতেই স্যার তাদের গাড়ীতে উঠে বসার অনুমতি প্রদান করতেই শিক্ষার্থী সবাই বাসে উঠে বসল। বাসের সিট আরো কয়েকটা ফাঁকা রয়ে গেল। স্যার সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমরা কি সবাই গাড়ীতে উঠেছি? সবাই সবার দিকে তাকিয়ে বললেন জ্বি- হ্যা। কিন্তু ছোট ভাই শরীফ বলল, স্যার! আমার রফিক ভাইয়া কোথায়? তাকে তো দেখছি না। এই বলে খুঁজাখুঁজি শুরু করে দিল। পরে দেখা গেল যে, রফিক কয়েকজন বেপরোয়া ছাত্রদের সাথে বাসের ছাদে উঠে তারা তাদের মনের আনন্দে গান গাইছে। আর হাঁসি-ঠাট্টা করে মজা করছে। তখন ছোট ভাই শরীফ বড় ভাইকে লক্ষ্য করে বলল, ভাইয়া নেমে আসুন । গাড়ীর ভেতরে এসে বসুন। বার বার ভাইয়া, ভাইয়া নেমে আসুন বলে চিৎকার করছে এবং বলছে ভাইয়া তুমি কি মায়ের উপদেশের কথা ভুলে গেছ? কিন্তু ভাইয়া কি তার কথার কর্নপাত করছে? কে কার কথা শুনে। বরঞ্চ সে তার নাচ-গান গেয়ে-ই চলেছে। পরে শরীফ স্যারকে বলল, স্যার! হয়তো আপনি বললে ভাইয়া নেমে আসতে পারেন। স্যারও এই ছাত্র ছেলেদেরই মত। তিনার ছাত্র জীবনও এভাবেই দুষ্টামীতে ছিল ভরপুর। তাই তিনি বললেন, এখানকার উঠতি বয়সের ছেলেরা এরকম কত কিছু করবে। সব কিছু দেখেও না দেখার ভান করতে হয়। আচ্ছা তুমি যাও। কিছু হবে না বলে শান্তনা দিয়ে স্যার শরীফকে বাসের ভেতরে পাঠিয়ে দেন। গাড়ী ছাড়তে আর মাত্র ২ মিনিট বাকী। ২ মিনিট পার হয়ে গেল গাড়ী তো ছাড়ছে না। ড্রাইভার কোথায় গেছে বলে ছাত্ররা স্বর-চিংকার করতে থাকে। একটু দূরে দেখা যাচ্ছে ড্রাইভার পান-সিগারেট আনতে দোকানে গিয়েছিল। ছাত্রদের হৈহুল্লড় এবং স্বর-চিংকার শুনে তাঁড়াতাঁড়ি গাড়ীর ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ে। গাড়ী ছাড়ছি বলে সিটে বসে সিগারেট জ্বালিয়ে এবং পান মুখে পুরে গাড়ী স্টার্ট দিল। স্লোলিভাবে গাড়ী সামনে অগ্রসর হচ্ছে এবং রানিং বেগও বাড়ছে। বাসের ভেতর থাকা ছাত্রদের কেউ হিমেল বাতাসের আর্দ্রতায় তন্দ্রাভাব আসছে। আবার কেউ নাক ডাকিয়ে ঘুমুচ্ছে। কেউ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দু'চোখ ভরে দেখছে। কেউ আবার "আল্লাহ" "আল্লহ" স্বশব্দে যিকির করে মাথা উপর-নিচ করছে। অন্যদিকে, ছাদে থাকা কয়েকজন ছাত্র বেশামাল হয়ে উদভ্রান্ত পথিকের গান গাওয়ার মত গাইতে-ই আছে। হাঁসি-খুশিতে তারা একে-অপরের উপর হেলে-ধুলে পড়ছে। আবার উঠছে, আবার পড়ছে। এভাবে গাড়ী ছুটছে আর চলছে। ড্রাইভার তার ড্রাইভিং সুদক্ষের পরিচয়ের সাথেই চালাচ্ছে। কিন্তু ড্রাইভারের মাথায় যেন কি করছে? মাথা ঘুঁরপাক খাচ্ছে, মাথা নয়, যেন সারা দুনিয়া ঘুরছে। ড্রাইভার এটাই অনুভব করছে। ড্রাইভার পানের সাথে মাত্রাতিরিক্ত জর্দা খাওয়াতে এমন হচ্ছে টের পেয়েও গাড়ী থামায় নি। চলতে চলতে ড্রাইভারের দু'চোখ ঝাঁপসা ঝাঁপসা মনে হচ্ছে। সামনে আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। গাড়ী এদিক-সেদিক পড়ে যাচ্ছে পড়ে যাচ্ছে টের পেয়ে ঘুমন্ত ছাত্ররা জেগে উঠে। সবাই একবাক্যে ড্রাইভারকে গাড়ী থামানোর জন্য অনুরোধকরছে। কিন্তু ড্রাইভার সে আর এই বাস্তব দুনিয়ায় নেই, সে স্বপ্নের দুনিয়ায় ঘুরপাক খাচ্ছে। যার কারণে ড্রাইভার ছাত্রদের কথা আর শুনতে পারছে না এবং কোন কিছু বুঝতেও পারছে না। গাড়ীও যেন থামাতে সে অক্ষম হয়ে গেল। এমতাবস্থা দেখে কোন এক ছাত্র উঠে গিয়ে তাকে গাড়ী থামানোর কথা বলার জন্য উঠতেই, গাড়ী তার নিয়ন্ত্রণ হাঁরিয়ে এক বিশাল, মোটা এবং খুব শক্তিশালী লম্বা গাছের সাথে ধাক্কা লেগে গাড়ীটি ধুমড়ে-মুচড়ে যায়। এভাবে গাড়ীটা নিম্নে ৫ মিনিট তার অবস্থাতেই পড়ে রইল। এদিকে, এক্সিডেন্টের পূর্বেই গাড়ীর অবস্থা দেখে কিছু সংখ্যক প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান যে, আমরা গাড়ীটাকে দেখছিলাম। এক্সিডেন্টে করবে করবে বলতে দেরী হয়, কিন্ত্র দুর্ঘটনা ঘটতে দেরী হয় নাই। কিছুক্ষণ পর আশ-পাশের মানুষ দুর্ঘটনা কবলিত গাড়ীতে থাকা মানুষদের উদ্ধারকার্যে লেগে যান। উদ্ধার কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর দেখা গেল যে, ছাদে থাকা সব ছাত্র শরীফের বড় ভাই রফিকসহ অধিকাংশরাই নিহত হয় আর ড্রাইভার একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এবং বাসের ভেতরে থাকা শরীফসহ মাত্র কয়েকজন বেঁচে আছে। তবে এদের মাঝেও আবার কেউর হাত নেই, কেউর নেই পা । আবার কেউ মারাত্বক আহত হয়েছে। কিন্তু এদের মাঝে সম্পূর্নরূপে ছহি-সালামতে অক্ষত অবস্থায় যাকে উদ্ধার করা হয় সে হল রফিকের ছোট ভাই শরীফ। পরিশেষে বুকভরা দুঃখ-বেদনা নিয়ে শরীফ তার বড় ভাই রফিককে ছাড়া বাড়ীতে ফিরলে মা হতভম্ব হয়ে পড়েন এবং জিজ্ঞেস করেন, খোকা শরীফ, আমার রফিক কোথায়? ছোট ছেলে শরীফ অশ্রুসিক্ত চোখে মাকে সমস্ত দূর্ঘটনার কথা খুলে বলল। দূর্ঘটনার কথা শুনামাত্র-ই মা-জননী নিজেকে আর সামলিয়ে রাখতে পারলেন না। অচেতন হয়ে পড়লেন মা-জননী। ছেলে যতই খারাপ হোক-দুষ্ট হোক, মায়ের সন্তান সব সময়-ই মায়ের কাছে ভাল। একথা আমরা সর্বজন স্বীকৃত। কোন মা-ই তার ছেলে খারাপ বলে দূরে ঠেলে দিতে পারেন না। শরীফ মায়ের উপদেশ পালনার্থে, সাথে থাকা মায়ের দোয়ার বরকতে করুন মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেল। আর গাড়ীর ছাদে উঠে মায়ের আদেশ অমান্য করতঃ অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল তারই বড় ভাই রফিক।
পাঠক/পাঠিকা বন্দুরা! এখানে আসলে কেউ-ই মায়ের নিজস্ব দোয়া অথবা বদদোয়ার কারণেই মরে বা বাঁচে নাই। মুলত যারা মায়ের আদেশ-নিষেধ মেনে চলবে, তাদের-ই সাথে মায়ের আন্তরিক দোয়া থাকবে। আর তাদেরকেই আল্লাহ চাইলে রক্ষা করবেন। কিন্তু যারা অমান্য করবে তারা তাদের মায়ের বদদোয়ায় বিপদ-আপদের সম্মুখীন হবে।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন