বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৩
গল্প/কবিতা: ৬২টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৫২

বিচারক স্কোরঃ ১.৮৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৬৫ / ৩.০

ডাম্বুলার প্রেম

প্রেম ফেব্রুয়ারী ২০১৭

নীরবতা

প্রেম ফেব্রুয়ারী ২০১৭

রসায়নের কথা

কি যেন একটা জানুয়ারী ২০১৭

রাত (মে ২০১৪)

মোট ভোট ১১ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৫২ বানেছা পরী

জসীম উদ্দীন মুহম্মদ
comment ১১  favorite ০  import_contacts ৮১৯
এক

উজাড় বাড়ি । আসলে এটি কোন বাড়ি নয় । জনমানবহীন বিরান জংলা ভুমি । এর আশেপাশেও কেউ বাস করে না । অবশ্য বাস করা তো দূরের কথা; দিনেও একলা কেউ যেতে চায় না । আর রাতে তো এই বাড়ির ত্রিসীমানায় কেউ যায় না । যত বড় সাহসী লোকই হোক না কেন ! এ বাড়ির নাম শুনলেই গা ছমছম করে । উজাড় বাড়ির ভিতরে বড় বড় গাছ । গভীর জংগল । ঝোপ-ঝাড় । এর ঠিক মাঝ খানে একটি গভীর খাদ । এই খাদ নিয়ে নানান জনশ্রুতি আছে । কারো কারো মতে, এই খাদের গভীরতা প্রশান্ত মহাসাগরের চেয়েও বেশি ! আবার কেউ কেউ বলে, এই খাদের তলদেশের দিকে যে কেউ দৃষ্টি দিবে তাঁর চোখ অন্ধ হয়ে যাবে । এক চোখের দৃষ্টি দিলে এক চোখ আর দুই চোখের দৃষ্টি দিলে দুই চোখ । আবার কারো কারো মতে, এখানে কোন খাদই নেই ।মায়া ।সব কিছুই জিন-পরীদের মায়া জাল । গভীর রাতে এই খাদের জায়গায় কখনও কখনও একটি সুরম্য প্রাসাদ দেখা যায় । ভিতর থেকে ভেসে আসে বেহালার নানা সুর । নুপুরের নিক্কন । সুরেলা কণ্ঠের গান আর উদ্দাম নৃত্য । অবশ্য কেউ কোন দিন একা একা এর কাছে যাওয়ার মত দুঃসাহস দেখায়নি । আর দেখাবেই বা কিভাবে ? একবার ছমির শেখ নামের এক যুবক । গানের সুরে পাগল হয়ে উজাড় বাড়ির দিকে গেল । তখন রাত প্রায় দুটা । সাথের লোকজন সবাই নিষেধ করল । সে কারো কথাই শুনল না । সেই যে গেল, আর ফিরে এল না ।

পরদিন দেখা গেল, খাদের টলমলে নীল জলে ছমির শেখের মৃত দেহ ভাসছে । পাড়াশুদ্ধ লোক সারাদিন চেষ্টা করল; কিন্তু লাশ খাদ থেকে তুলতে পারল না । হঠাত সকলের চোখের সামনে ছমির শেখের লাশ হাসতে লাগলো । পৈশাচিক হাসি । যেন গান শুনে আনন্দ উল্লাস করছে । মুহূর্তেই একটা হুলস্থূল বেঁধে গেল । যে যার মত পারল দৌড়ে গিয়ে পালিয়ে বাঁচল । সেই থেকে আর কেউ কোনদিন এই খাদের ধারে কাছেও যায় না ।

এই উজাড় বাড়ির পাশেই রাতুলদের বাড়ি । বাড়ি মানে দাদার বাড়ি । রাতে কারো উজাড় বাড়ি পাড়ি হওয়ার বিশেষ প্রয়োজন হলে রাতুলের দাদা সাথে করে নিয়ে যান । তিনি সিদ্ধ পুরুষ । তাঁর কোন ডর ভয় নেই । রাতুলরা ঢাকায় থাকে । বছরে দু তিন বার দাদু বাড়িতে বেড়াতে আসে ।এর মধ্যে দু ঈদের দুই বার কমন। বাবা-মা আর ছোট বোন অহনার সাথে । রাতুলের বয়স সতের বছর । সবে মাত্র এস এস সি পরীক্ষা দিয়েছে । পরীক্ষা খুব ভাল হয়েছে । এ প্লাস পাওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই। অবশ্য এ প্লাস এখন প্রায় সবাই পায় । তাই এখন শুধু এ প্লাস পেলেই চলবে না । গোল্ডেন এ প্লাস পেতে হবে। পাওয়ারও জোরালো সম্ভবনা আছে । তাই এখন সে বেশ খোশ মেজাজে আছে । গায়ে ফু দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে । আর মনে মনে ভাবছে কোথাও বেড়িয়ে আসা যায় কিনা ? কোথায় যাওয়া যায়? এই ভাবনায় কদিন থেকে মনের ভেতর অদ্ভুত এক শিহরণ অনুভব করছে । মন পবনের নৌকায় ভেসে ভেসে রঙের ঘোড়া দৌড়াচ্ছে । বার বার কেন জানি দাদু বাড়ির কথা হচ্ছে ।
দুই
এমন সময় দাদু বাড়ি থেকে জামশেদের মোবাইল । জামশেদ রাতুলের বন্ধু । সমবয়সী । সহপাঠী । ছোট বেলায় পাড়ার স্কুলে একসাথে লেখাপড়া করেছে । খুব ভাল আড় বাঁশি বাজায় । শোনা যায়, তার বাঁশির সুরে মুগ্ধ পরীরা দল বেঁধে চলে আসে । একদিনের ঘটনা ।দুপুর বেলা । জামশেদ হাওরে গরু ছেড়ে দিয়ে ছাতা মাথায় নরম ঘাসের বুকের উপর শুয়ে শুয়ে বাঁশি বাজাচ্ছে । কখনও একমনে । আবার কখনও আনমনে । কিছুক্ষণ পরেই শোনা গেল ঝুমুর ঝুমুর নাচ আর গান । কিন্ত কাউকে দেখা যাচ্ছে না । জামশেদ কিছুটা হতচকিত হয়ে এদিক সেদিক থাকাল । না কাউকে দেখা গেল না । ভয়ে তার গলা শুকিয়ে গেল ।ভাবল, এ কোন তেলেসমাতি! আশেপাশে কেউ নেই । শুধু মাথার উপর সূর্য । তীব্র উত্তাপ ছড়াচ্ছে । জামশেদ ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল,
কে তোমরা ?
আমরা পরী ।
জামশেদ অবাক হয়ে গেল । তবু জিজ্ঞেস করল, তোমরা কেন এসেছ ?
তোমার বাঁশির সুর শুনতে ।
আমার বাঁশির সুর শোনার কি আছে ?
তোমার বাঁশির সুর শোনে আমরা পাগল হয়ে গেছি ।
তুমি কে কথা বলছ ?
আমি বানেছা ।পরী রাজকন্যা । সাথে আমার সখিরা । আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই ।
তোমাকে আমরা এখন ধরে নিয়ে যাব । আমাদের পরী রাজ্যে । সেখানে মহাধুমধামে তোমার
সাথে আমার বিয়ে হবে !
এবার জামশেদ বুকে একটু সাহস সঞ্চয় করে বলল, মানুষের সাথে আবার পরীদের বিয়ে হয় নাকি ?
কেন হবে না ? তোমাকে বিয়ে করার পর আমিও মানুষের রূপ ধরে থাকব ।
তাই নাকি ? তুমি মানুষের রূপ ধরতে পারো ?
অবশ্যই পারি ।
তাহলে এখন মানুষের রুপ ধরো । আমি তোমায় দেখতে চাই ।
ঠিক আছে আমার প্রিয়তম ------ ।
এই কথা বলে পরী রাজকন্যা বানেছা সাথে সাথে মানুষের রুপ ধারন করল । সখিদের নিয়ে খিল খিল করে হাসতে লাগলো ।
আর এদিকে বানেছার রুপ দেখে জামশেদের মাথা ঘুরতে লাগলো । একি দেখছে সে ? এত সুন্দর ! এত সুন্দর! এত সুন্দর ! কিভাবে সম্ভব ? এ যে তার কল্পনারও অতীত ! চোখ, মুখ, নাক, কান, চুল, হাত, পা, বুক, চিবুক সব কিছু ! সব কিছু এত সুন্দর ! এত, এত অপরূপ ! সে ধীরে ধীরে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল ।

সেই জামশেদও এবার এস এস সি পরীক্ষা দিয়েছে । পরীক্ষা ভাল হয়েছে । কিন্তু সে এক ভীষণ সমস্যায় পড়েছে । সমস্যার নাম পরী রাজকন্যা সমস্যা । যে কোন সময় সে কিডন্যাপ হতে পারে । সব সময় আতংকের মধ্যে তার দিন কাটছে । সমস্যাটি সে কারো সংগে শেয়ার ও করতে পারছে না । এমন কি রাতুলকেও বলেনি । নিজের মনে নিজেই জ্বলে পুড়ে মরছে । অনেক চিন্তা ভাবনা করে ছোট বেলার বন্ধু রাতুলকে মোবাইল করে আসতে বলেছে । জরুরি ভিত্তিতে । রাতুলও সাথে সাথে সম্মতি জ্ঞাপন করেছে । কিন্ত সমস্যা একটা আছে । অহনা । সে সাথে যেতে চায় । অহনার বয়স তের । সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে । খুব বুদ্ধিমতী । সারাক্ষণই কিশোর গোয়েন্দা উপন্যাস পড়ে । যে কোন জায়গায় রহস্যের গন্ধ পায় । রাতুল রহস্যকন্যা বলে ওকে ক্ষ্যাপায় । রাতুলের সাথে চার বছরের পার্থক্য । তবু দুজনে সারাক্ষণই শিশুর মত ঝগড়া করে । অবশ্য সাথে সাথে মিলেও যায় । এস এস সি পরীক্ষা শেষে বেড়ানোর জন্য দাদু বাড়ির চেয়ে উত্তম স্পট আর কিছুই হতে পারে না । তার উপর জামশেদের জরুরি কল । সব মিলিয়ে রাতুল সিদ্ধান্ত পাকা করে ফেলল ।
দাদু বাড়িতেই যাবে সে । আর সঙ্গে যাবে চির শত্রু-বন্ধু অহনা । যেই ভাবা সেই কাজ । পরদিন তারা দুজনে বাবা-মায়ের অনুমতি নিয়ে দাদু বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা হল । ট্রেনে । কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস । ভারী সুন্দর ট্রেন । নতুন চালু হয়েছে । ঝক ঝকে দেখতে । এর আগে আর এই ট্রেনে চড়ে সে দাদু বাড়ি যায়নি । সব সময় গিয়েছে এগারসিন্ধুর এক্সপ্রেসে । নতুন জামা, নতুন বাড়ি, নতুন গাড়ি আর নতুন বউয়ের রাঁধা তরকারির মজাই আলাদা ।

তিন
রাতুলের দাদা মাওলানা মনির উদ্দিন । খুব জানা শোনা মানুষ । বয়স প্রায় সত্তরের কাছাকাছি । স্বনাম ধন্য ব্যক্তি । বিভিন্ন কাজে তাঁর কাছে সর্বদাই লোকজন আসতে থাকে ।
তিনি একজন সাদা মনের মানুষ । সবার উপকার করার চেষ্টা করেন যথাসাধ্য । জিন-ভুতে ধরা রোগীদের তিনি আরোগ্য করে থাকেন । রাতুল যেই দিন দাদু বাড়িতে পৌঁছল, তার পরের দিনের ঘটনা । সকাল সাতটা বাজে । নরম সূর্য । জামশেদ, রাতুল আর অহনা একসঙ্গে তাদের বাড়ির সামনের আম বাগানে দাঁড়িয়ে কথা বলছে । গাছ ভর্তি আমের মুকুল । ছোট ছোট আম । একটু দুরেই একটা সজনে গাছ । মাথার চুলের মত সজনে ধরে আছে । খুব মনোহর দৃশ্য । ধারে কাছেই শোনা যাচ্ছে দোয়েলের শিস । টুনটুনির টুনটূন । রাখাল গরু নিয়ে যাচ্ছে । বড় হাওড়ের দিকে । একটু দূরেই উজাড় বাড়ি । তিন জনেই বার বার সেদিকে তাকাচ্ছে । ভয়ে ভয়ে । কখন কী ঘটে যায় কে বলতে পারে ! গল্প করার এক ফাঁকে রাতুল বন্ধু জামশেদকে জিজ্ঞেস করল,
তোমার সমস্যার কথা তো কিছু বললে না ?
বলব । সে জন্যই তো মোবাইল করে আসতে বললাম ।
শুরু কর ।
জামশেদ ইংগিতে অহনাকে নির্দেশ করল । রাতুল বলল, কোন সমস্যা নেই । ওর সামনে বলতে পার । ও হল আমাদের রহস্যকন্যা । তোমার সমস্যার সমাধান হয়ত ও ই তোমাকে বলে দিতে পারবে ।
অহনা কিছুটা অপমানিত হল । সে চলে যেতে চাইছে । জামশেদ সরি বলে অহনার মান ভাঙাল । তারপর বলল, বন্ধু, আমার সমস্যা সেই একটাই । পরী রাজকন্যা ।বানেছা ।খুব ডিস্টার্ব করছে ।রাত-বিরাত নাই । যখন তখন আমার ঘরে চলে আসে । সহজে যেতে চায় না । এসেই বলে, বাঁশি বাজাও । বাজাইতে না চাইলে হুমকি ধামকি দেয় ।
অহনা বলল, এখন আর আগের মত বিয়ে করতে চায় না ?
তা চায় । কিন্তু আমি রাজি হই না ।
কেন রাজি হও না ? রাতুল প্রশ্ন করল ।
পরী আর মানুষে কোনদিন বিয়ে হয় ?
কেন হবে না ? বিয়ে হতে তো কোন বাঁধা নেই । কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়।বলল অহনা।
কোন জায়গায় ? বলল জামশেদ ।
অহনা বলল, আসলে সে তোমাকে ভালোবাসে না । ভালোবাসে তোমার বাঁশির সুর ।যখন তোমার বাঁশিতে সুর থাকবে না; তখন কী হবে ? সে তোমাকে কলার খোসার মত ছুড়ে মারবে ।
রাতুলও অহনার সাথে সহমত পোষণ করল । আর জামশেদ অহনার বুদ্ধি দীপ্ত মন্তব্য শুনে মুগ্ধ হয়ে গেল । তারপর অহনার উদ্দেশ্য বলল, তাহলে আমার উপায় কী ?
উপায় একটা আছে । কিন্তু সে তুমি পারবে না । বিজ্ঞের মত বলল অহনা ।
কী ? জিজ্ঞেস করল জামশেদ ।
তুমি উল্টো সুরে বাঁশি বাজাবে । তোমার বাঁশির যে সুর শুনে বানেছা মুগ্ধ হয়েছিল; এর বিপরীত সুর । কিন্তু আমি আবারও বলছি, সে তুমি পারবে না ।
কেন পারব না ? আমি অবশ্যই পারব । বলল জামশেদ ।
না । তুমি অবশ্যই পারবে না । অহনা জোর দিয়ে বলল ।
জামশেদ মাথা নিচু করে আছে । রাতুল বলল, কেন পারবে না, সেইটা বল ।
পারবে না; কারণ জামশেদ ভাই বানেছাকে ভালোবাসে । গভীরভাবে ভালোবাসে । সে আমি তার চোখ মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছি । কি জামশেদ ভাই আমি ঠিক বলিনি ?
জামশেদ কোন জবাব দিল না । চুপ করে থাকল । কারো বুঝতে বাকি থাকল না যে, এই নীরবতা সম্মতির লক্ষণ ।

চার
তারা তিন জনেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে । কেউ কথা বলছে না । একেক জনের মনে একেক রকম চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে । রাতুলই প্রথম নীরবতা ভাঙল । জামশেদের দিকে তাকিয়ে বলল, ভালো যেহেতু বেসেছ তাহলে চিন্তা ভাবনা করে লাভ নেই । বানেছার সাথে পরীস্থান চলে যাও। সুখেই থাকবে ।
জামশেদ মাথা নিচু করেই বলল, তা কি করে সম্ভব? এ হতে পারে না । আমি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান । আমি এভাবে চলে গেলে তারা খুব কষ্ট পাবে ।
তাহলে বানেছাকেই এখানে থেকে যেতে বল ।
বলেছিলাম । ও রাজী হয়নি । বলল, ধরা পড়ে যেতে হবে ।
তাহলে এভাবে ডুবে ডুবে আর কতদিন ?
সেটাই তো সমস্যা । আর এজন্যই তো তোমাকে আসতে বললাম ।
অহনা এতক্ষণ চুপচাপ ছিল । এবার একটু রেগে গিয়ে বলল, আসলে সমস্যা তুমি নিজেই । এর সমাধান কেউ তোমাকে দিতে পারবে না । তোমাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে ।
জামশেদ কিছু বলল না । রাতুল বলল, তুই এত রেখে যাচ্ছিস কেন ? আমরা ওকে হেলফ না করলে কে করবে বল দেখি ?

এমন সময় ঘটল আরেক ঘটনা । একজন মহিলাকে অন্য কয়েকজনে জোর করে রাতুলদের বাড়ির দিকে নিয়ে আসছে । তাকে জিনে ধরেছে । সে পাগলামি করছে । বয়স খুব বেশি নয় । সাতাশ-আটাশ হবে । নাম ফালানি । বেশ সুন্দর দেখতে । সে একই কথা বার বার বলছে ।
আইজ আমি লতুর বাপেরে খাইয়্যা ফালবাম ----- ।
ঘাড় ভাইঙ্গা চিবাইয়া চিবাইয়া রক্ত খাইয়াম ------।
লতু হইল মহিলার মেয়ের নাম । অন্যদের কাছ থেকে শোনা গেল, কিছুক্ষণ আগে এই মহিলা উজাড় বাড়ির পাশ দিয়ে একা একা হেঁটে কোথাও যাচ্ছিল । উজাড় বাড়ির জিনের আছর তার উপর পড়েছে । এই জন্য সে এমন আবোল তাবোল বকছে । মহিলার মা কাঁদতে কাঁদতে বলছে, তোমরা ছোট হুজুরকে তাড়াতাড়ি খবর দেও । আমার ফালানিরে জিনে মাইরা ফালাইল ।
এই ছোট হুজুর হল রাতুলের দাদা । তাঁকে সবাই ছোট হুজুর বলে ডাকে, কারণ তাঁর বাবা আমির উদ্দিনও বড় মাওলানা ছিলেন । আর তিনিই ছিলেন এ বাড়ির বড় হুজুর ।
এই অবস্থা দেখে রাতুল দৌড়ে দাদার কাছে গেল । মনির উদ্দিন সাহেব কিছুক্ষণ পরে ধীর পদক্ষেপে রোগীর কাছে আসলেন । ইতিমধ্যে অনেক লোক সমাগম হয়েছে । তিনি গভীরভাবে ফালানিকে পর্যবেক্ষণ করে বললেন,
ইয়ামলিকা জিনে ধরেছে । বড়ই শক্ত জিন । আপনারা যারা সুরা জিন জানেন, তারা সবাই মনে মনে তেলাওয়াত করতে থাকেন । আর যারা জানেন না, তারা সুরা নাস সাত বার পড়েন । আউজুবিল্লাহ-বিসমিল্লাহ দিয়ে শুরু কইরেন । খুব শক্ত জিন । সহজে ছাড়বে বলে মনে হচ্ছে না । আপনারা কিছু রশি আর লাঠি সোটা প্রস্তুত রাখেন ।

এই কথা শুনে ফালানির মা ছমিরন বিবির অন্তরাত্মা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল । সে তাড়াতাড়ি হুজুরের পায়ে পড়ে গেল । আর বার বার বলতে লাগলো, ছোট হুজুর আমার মেয়েটারে বাঁচান । আমার মেয়েটারে বাঁচান । আপনে আমারার মা-বাপ । আপনে ছাড়া আমরার আর কেউ নেই হুজুর । আমরা গরীব মানুষ । ফালানি মইরা গেলে আমি কারে নিয়া থাকবাম ।

পা ছাড় ফালানির মা । চিন্তা কইরো না । দেখি কি করা যায় !
এদিকে হুজুরকে দেখা মাত্র ফালানি আরও ক্ষেপে গেল । হাত-পা ছুড়তে লাগলো । কয়েকজন লোক তারে জবরদস্তি ধরে রেখেছে । সে সমানে বকে যাচ্ছে,
ছোট হুজুরের মাথায় আইজ টুপি নাই,
আমি তারে ধইরা চিবাইয়া চিবাইয়া খাই !!
এই কথা বলে সে খিল খিল করে হাসতে লাগলো । হুজুরও ক্ষেপে গিয়ে বলল, দাঁড়া, আজ তোকে দেখাচ্ছি মজা । কত ধানে কত চাল
এখনই টের পাবি ।

জামশেদ, রাতুল আর অহনা এই তিন জন একসাথে দাঁড়িয়ে আছে । মনির উদ্দিন সাহেব রাতুলের দিকে ইংগিত করে বললেন,
একটু সরিষার তেল নিয়ে আসো তো দাদা ভাই । একে আইজ শায়েস্তা করতে হবে ।
রাতুল মনে মনে নিজেকে খুব গর্বিত ভাবল । এই রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দাদা তাকে দিয়ে তেল আনাচ্ছে -- এতো কম বড় কথা নয় ।বড়ই সৌভাগ্যের ব্যাপার । অন্য কাউকে দিয়েও তো দাদা তেল আনাতে পারতেন । ইতিমধ্যে শত শত লোক এসে জড়ো হয়েছে । জিন ধরার খবরটি মুহূর্তেই সারা গ্রামে রাস্ট হয়ে গেছে । নারী-পুরুষ, ছেলে-বুড়ো সকলেই এসেছে । একটা খুশি খুশি ভাব সকলের মাঝে । স্বচক্ষে জিন দেখতে পাবে । একেকজন জিন সম্পর্কে একেক রকম মন্তব্য করছে । তবে অনেকই কিছুটা ভীত । আতংকিত । কী হয় কেবল আল্লাহ তায়ালাই জানেন । এরিমধ্যে হন্তদন্ত হয়ে রাতুল তেল নিয়ে হাজির হয়ে গেল ।

পাঁচ
হুজুর একটি চেয়ারে বসে আছেন । ফালানি ছটফট করছে । এখন ছাড়া পেতে চাইছে সে । চারপাশে বৃত্তাকারে মানুষের সারি । রাতুল দাদার হাতে তেল দিয়ে কোনরকমে বলল, এই নিন দাদা । অনেক কষ্ট করে আনলাম । দাদু ঘরে নেই । পুকুর ঘাটে । খুঁজতে খুঁজতে আমার অনেকক্ষণ চলে গেল । এইটুকু বলেই সে হাফাতে লাগলো ।

মনির উদ্দিন সাহেব ওর কথা শুনল কী শুনল না - কিছুই বুঝা গেল না । তিনি তেল হাতে নিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন । সবাই উদ্বিগ্ন । যে কোন মুহূর্তে জিন ধরা পড়বে । মনির উদ্দিন সাহেব ভিড় ভিড় করে কী যেন জপলেন । তারপর সরিষার তেলে দিলেন এক ফুঁ । সরিষার তেলের কোন পরিবর্তন হল না । যেমন ছিল তেমনই রইল । অনেকের ধারনা
ছিল যাদুকরী কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে । তবে তেমন কিছুই ঘটল না । এতে অনেকেই কিছুটা হতাশ হল । আবার হুজুর সম্পর্কে যাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল, তারা বলতে লাগল, আরে দেখ দেখ এখনই জিন ধরা পড়ল বলে ! এই ধরনের ঘটনা রাতুল আর অহনা জীবনে আর কোনদিন দেখেনি । দাদার প্রতি রাতুলের অগাধ আস্থা । তাই সে দাদুর পিছু পিছু সব কিছু দেখে যাচ্ছে । ভিতরে ভিতরে তার আরও একটি উদ্দেশ্য আছে; যা আর কেউই জানে না । সেটি হল দাদার নিকট থেকে কিভাবে জিন ধরা শেখা যায় ।

মনির উদ্দিন সাহেব পড়া তেল ফালানির দুচোখের ভিতরে ঢেলে দিলেন । আর একটি শক্ত রশি দিয়ে তার হাত পা বেঁধে দিলেন । সে সমানে চেঁচাচ্ছে। লাফাচ্ছে । ছুটে যেতে চাইছে । কিন্তু ছুটতে পারছে না । তারপর তিনি ফালানির একটি আঙুলে শক্ত করে ধরলেন । এবার জিন কথা বলে উঠল ।
হুজুর আমারে ছাইড়া দেন । আমি আর কোনদিন মানুষেরে ধরুম না ।
তরে আর ছারতাম না । বোতলের মধ্যে বন্দি কইরা রাইখা দিবাম ।
হুজুর আপনার পায়ে পড়ি । মাফ চাই । আমারে ছাইড়া দেন । আমি আর এ এলাকায় আসুম না ।
আগে বল তোর নাম কী ?
আমার নাম ইয়ামলিকা ।
এই নাম শুনে একজন মন্তব্য করল, এই দেখ হুজুর তো আগেই এই নামটা বলেছিল । তাই না ? কয়েকজন সাথে জবাব দিল, হ হ । এই হইল হুজুরের কেরামতি ! এদিকে হুজুর প্রশ্ন করেই চলেছে --- ।
তোর বাড়ি কোথায় ?
পরীস্থান ।
তুই জিন না পরী ?
আমি পরী ।
তোর বয়স কত ?
পাঁচশ বছর ।
তুই কি একাই এসেছিস ?
না ।
সাথে আর কে কে আছে ?
পরী রাজকন্যা বানেছা আর তার সখিরা । আমিও রাজকন্যার সখি ।
এখানে তোরা কোথায় থাকিস ?
উজাড় বাড়িতে ।
তোরা এখানে এসেছিস কেন ?
রাজকন্যা জামশেদ নামের এক বাঁশিওয়ালার প্রেমে পড়েছে । তার বাঁশি না শুনে রাজকন্যা থাকতে পারে না ।
এই কথা শোনে সকলেই চমকে উঠল । শুধু চমকে উঠল না তিনজন । রাতুল, অহনা আর জামশেদ নিজে । সে মাথা নিচু করে রেখেছে । সবাই তাকে এমন ভাবে দেখছে যেন ভুত !
কেউ কেউ আবার বাহাবা দিচ্ছে । ধন্য ধন্য করছে । অহনা জিজ্ঞেস করল, দাদা ভাই, জিন আর পরী কি একই জাতের ?
মনির উদ্দিন সাহেব বললেন, একই জাতের দাদু ভাই । আমরা মানুষেরা যেমন নারী-পুরুষ । ওরাও তেমনি । পরী হল নারী জিন । জিন জাতি মানুষের পূর্বে পৃথিবীতে এসেছে । তারা আগুনের তৈরি ।আমরা তাদের দেখি না। কিন্তু তারা আমাদের দেখে ।আমরা অন্য কোন প্রাণীর রুপ ধরতে পারি না । কিন্তু তারা পারে । অভিশপ্ত শয়তানও একজন জিন । তার পিতার নাম খবীস আর মাতার নাম নীলবিস । মানুষের যেমন হাশরের মাঠে বিচার-আচার হবে; তেমনি জিনদেরও হবে ।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআন শরীফে বলেছেন, আমি মানুষ ও জিন জাতিকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদতের জন্য ।
সবাই মুগ্ধ হয়ে হুজুরের কথা শুনছে । শুনসান নীরবতা ।দাদার জ্ঞানের পরিসর দেখে রাতুল মনে মনে নিজেকে ধন্য ভাবছে । অহনা সব কিছু যুক্তি ও বিজ্ঞানের আলোকে চিন্তা করছে ।কোনটা সঠিক আবার কোনটা বেঠিক পরিমাপ করতে পারছে না ।
মনির উদ্দিন সাহেব পরীকে আবার জিজ্ঞেস করলেন,
আচ্ছা, তুই ফালানিরে ধরছস কেন ?
আমি রইদে চুল শুকাইতেছিলাম । হে আমার চুলে পাড়াইছে ।
হে কি তোর চুল দেইখ্যা পাড়াইছে ?
না ।
তাহলে ধরলি কেন ?
আর ধরুম না হুজুর । আমারে মাফ কইরা দেন ।
মাফ করতে পারি এক শর্তে ?
কী ?
তুই আর জীবনে মানব সমাজে আসবি না ।
ঠিক আছে ; আসব না ।
আর একটি শর্ত আছে ?
কী ?
তুই বল, আমি মানুষের হাগু খাই, পেচ্ছাব খাই ।
পরী কিছু বলল না; সে চুপ করে থাকল ।হয়ত তার আত্ম সম্মানে লেগেছে । কিন্তু হুজুর ছাড়বার পাত্র নন । তিনি আঙুলে আরও জোরে চাপ দিয়ে বললেন,
চুপ করে আছিস কেন? দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা । এই বলে দুচোখে আরেকবার তেল ছিটিয়ে দিলেন ।
পরী বাবাগো, মাগো বলে কান্নাকাটি করতে লাগলো ।
হুজুর আবার ধমক দিলেন, কী বলবি না ?
এইবার পরী স্বীকার গেল । ঠিক আছে আমি মানুষের হাগু খাই, পেচ্ছাব খাই ।
এই কথা শুনে উপস্থিত সকলেই হাসতে লাগলো । কেউ কেউ বলল, ঠিক আছে হুজুর । ওরে
সত্যি সত্যি হাগু- মুতু খাওয়ান দরকার । রাতুল বলল, দাদু, একটু নিয়ে আসব নাকি ?
হুজুর বললেন, না । তারপর পরীর দিকে তাকিয়ে বললেন, মনে থাকবে ?
থাকবে হুজুর ।
তাহলে যা । আমি তোরে ছাইড়া দিলাম । সঙ্গে সঙ্গে আঙুল ছেড়ে দিলেন । হাত পায়ের বাঁধন খুলে দিলেন । সা সা করে আওয়াজ হল । পরীর চলে যাওয়ার শব্দ সকলেই নিজ কানে শুনতে পেলেন । এক শ্বাসরুদ্ধকর সময়ের অবসান হল । সকলেই একসঙ্গে হাততালি দিল । এদিকে পরী চলে যাওয়ার সাথে সাথে ফালানি জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল । হুজুর ফালানির চোখে মুখে জলের ছিটা দিলেন । ফালানির জ্ঞান ফিরে আসল । যে যার মত কেটে পড়ল ।
শুধু রাতুল দাদুর পেছনে পেছনে ঘুরতে লাগলো । আর মনে মনে ভাবতে লাগলো, কিভাবে
দাদুকে আসল কথাটা বলা যায় !

ছয়
রাত প্রায় একটা বাজে ।অমাবশ্যা । ঘোর অন্ধকার । কোন ঘরে বাতি নেই । পরিষ্কার আকাশ । দু একটি তারা মিটিমিটি জ্বলছে । অহনার ঘুম ভেঙে গেল । বিছানা ছেড়ে উঠে বসল । কোথা থেকে ভেসে আসছে সানাইয়ের সুর । মিষ্টি মধুর । অন্ধকারে হাতড়িয়ে টর্চ খুঁজে বের করল । পাশেই রাতুল ঘুমাচ্ছে । আস্তে করে ডাকল, রাতুল ভাইয়া, রাতুল ভাইয়া।
রাতুল কোন সাড়া দিল না । অহনা রাতুলের পা ধরে আস্তে আস্তে ঝাঁকুনি দিল । রাতুল আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠল । অহনার দিকে তাকিয়ে অবাক চোখে জিজ্ঞেস করল,
কী হয়েছে ? এত রাতে ঘুম ভাঙালি কেন ?
অহনা কণ্ঠস্বর একেবারে খাদে নামিয়ে এনে বলল, এই শোন সানাইয়ের শব্দ । উজাড় বাড়ির
দিক থেকে আসছে ।
রাতুল গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনল । হ্যা, ঠিক তাই ।
অহনা বলল, মনে হয় উজাড় বাড়িতে কারো বিয়ে হচ্ছে । চল যাই । দেখি কী হয়েছে ।
এত রাতে কার বিয়ে হবে ? আমার মাথায় তো কিছুই ঢুকছে আছে না ।
আমার একটি বিষয় সন্দেহ হচ্ছে । চল গিয়ে দেখি ।
তোর মাথা খারাপ হয়েছে ? এত রাতে উজাড় বাড়িতে যাই; আর ছমির শেখের মত আমাকেও ------ ।
অহনা ওকে থামিয়ে দিল । বলল, এত কাছে যাব না । আম বাগান পর্যন্ত যাব ।
ঠিক আছে । তাহলে চল ।
দুজনে পা টিপে টিপে ঘর ছেড়ে বের হল । আম বাগানের এক পাশে একটি বিশাল রেইন ট্রি । এই জায়গাটি তাদের বাড়ি থেকে উজাড় বাড়ির সবচেয়ে কাছে । তারা রেইন ট্রির নিচে এসে দাঁড়াল । উজাড় বাড়ির দিকে তাকিয়ে দুজনে বিস্ময়ে বিমুঢ় হয়ে গেল । উজাড় বাড়ির ঠিক মাঝখানে । আচানক ঝলমলে সুরম্য প্রাসাদ । চোখ ধাঁধানো আলোকসজ্জা । এমন লাইটিং তারা জীবনে আর দেখেনি । এমন কি ঢাকা শহরেও না । চলছে নাচ, গান, বাদ্য ।
প্রসাদের সামনের দিকের একটি কক্ষে মঞ্চ । মঞ্চের ঠিক মাঝখানে পাশাপাশি দুটি আসন । স্বর্ণ খচিত । উজ্জ্বল আলোয় ঝক ঝক করছে । চারপাশে অনেক লোক । সকলেই ব্যস্ত । যেন কিছুক্ষণ পরেই একটি নাটক মঞ্চস্থ হবে ।
অহনা রাতুলকে কানে কানে বলল, ভাইয়া, আমি যা ভেবেছিলাম তাই ঘটতে যাচ্ছে । রাতুল কিছু বলল না । সে ভয়ে কাঁপছে । অহনার হাত ধরে টানতে টানতে বলল,
আমার এসবে কাজ নেই; চল আমরা এখান থেকে চলে যাই ।
অহনা বলল, তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন ? স্বাভাবিক হও । ভয়ের কোন কারণ নেই । ওরা এদিকে আসবে না ।
ওখানে কী হতে যাচ্ছে ? রাতুল জিজ্ঞেস করল ।
অহনা বলল, আমার ধারনা জামসেদ ভাইকে ওরা তুলে এনেছে । আজ জামশেদ ভাইয়ের সাথে বানেছার বিয়ে । এখন সেই অনুষ্ঠান চলছে । দেখছ না পাশাপাশি দুটি আসন । কিছুক্ষণ পরে এখানে বর-কনে এক সঙ্গে বসবে ।
তাহলে চল জামশেদ বাড়িতে আছে কিনা দেখে আসি ? বলল রাতুল ।
অহনা বলল, উত্তম প্রস্তাব । চল চল । তাড়াতাড়ি চল ।
এক দৌড়ে তারা জামশেদের বাড়িতে চলে আসল । জামসেদ যে ঘরে থাকে; সেই ঘরের দরজা
খোলা । বাতি জ্বলছে । টেবিলে একটা বই । অর্ধ বন্ধ । অহনার আর বুঝতে বাকি থাকল
না কী ঘটেছে ! যা অনুমান করেছিল তাই ।
রাতুল বলল, তোর ধারণাই ঠিক ।
অহনা বলল, না ঠিক নাও হতে পারে । বাথরুমেও যেতে পারে । কতক্ষণ অপেক্ষা করা যাক।
ঠিক আছে । বলল রাতুল ।
এরপর দুজনে মিলে আশেপাশে জামশেদকে খুঁজল । এমন কি বাথরুম এবং বাড়ির পেছনের জংগলও বাদ দেয়নি । কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না । তাদের অনুমান সত্যি ধরে নিয়ে দুজনে তাড়াতাড়ি উজাড় বাড়ির দিকে হাঁটা দিল । পথে কয়েকটি শিয়ালের সাথে দেখা হল । তারা নির্ভীক পথ হেঁটে যাচ্ছে । কোনদিকে পরওয়া নেই । আশেপাশে কারো বাড়িতে কুকুরের ঘেউ ঘেউ শোনা গেল । মনে হয় কুকুর গুলি শেয়ালকে দেখতে পেয়েছে । কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা উজাড় বাড়ির পাশের আমবাগানে এসে উপস্থিত হল । পা টিপেটিপে রেইন ট্রির নিচে গেল । দুজন এক সাথে উজাড় দিকে দিকে দৃষ্টি দিয়ে ভূত দেখার মত চমকে উঠল । মঞ্চের মাঝ খানে পাতা আসন দুটিতে জামশেদ আর বানেছা পরী পাশাপাশি বসে আছে । তারা উভয়েই বর কনের পোশাকে সজ্জিত । কী অপরূপ লাগছে দেখতে!জামশেদকে একটুও ভীত ও শঙ্কিত মনে হল না । বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসে আছে । মাঝে মাঝে বানেছা পরীর সাথে কথা বলছে । মুচকি মুচকি হাসছে । অন্যান্য জিন পরীরা দ্রুত বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা করে যাচ্ছে।
রাতুল আর অহনা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে; যেন বন্ধুর বিয়েতে নিমন্ত্রণ খাচ্ছে । আর বড় বড় মশারা তাদের রক্ত খেয়ে মোটা তাজা হচ্ছে । সেদিকে কারো খেয়াল নেই । মন্ত্র মুগ্ধের মত দেখে যাচ্ছে । কারো মুখে কোন কথা নেই । যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছে । রাত তিনটার দিকে বিয়ে শেষ হল । সাথে সাথে ধপ করে নিবে গেল আলোকসজ্জা । গভীর অন্ধকার নেমে এল উজাড় বাড়িতে । আবার যেমন ছিল তেমনি হয়ে গেল। কিছুই যেন হয়নি সেখানে।
রাতুল আর অহনা ধীর পদক্ষেপে ঘরে ফিরে আসল । সব কিছু তাদের কাছে কেমন যেন স্বপ্নের মত মনে হচ্ছে । বিশ্বাস করতে মন চাইছে না । কিন্তু এ যে বাস্তব ! স্বচক্ষে দেখা। স্বকর্ণে শোনা । সারারাত আর তাদের ঘুম আসল না । কেবলই মনের পর্দায় ভেসে উঠছে জামশেদের হাসি মাখা মুখ আর বানেছা পরীর লাজরাঙা মুখ।

পরদিন সকাল বেলা । বিছানায় শুয়ে শুয়ে রাতুল আর অহনা হট্টগোল শুনতে পেল । লোকেরা সব দল বেঁধে তাদের বাড়িতে জড়ো হচ্ছে । রাতুলের দাদা মাওলানা মনির উদ্দিন সাহেবকে সবাই খোঁজাখুঁজি করছে । রাতুল আর অহনা আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে আসল। লোকজনের কাছে শুনতে পেল, জামশেদকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না । তারা কিছুই বলল না। এখনও রাতের দৃশ্য তাদের চোখে জ্বলজ্বল করছে । এ দিকে জামশদের মায়ের কান্নায় আকাশ বাতাস বিগলিত হচ্ছে । এদিকে হুজুর নামাজে দাঁড়িয়েছেন । কিছুক্ষণ পরে হয়ত এখানে তাশরীফ আনবেন।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন