বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৬ মে ১৯৮৭
গল্প/কবিতা: ৫৩টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৬

বিচারক স্কোরঃ ১.৮৬ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৭৪ / ৩.০

তুই না হয় আর একবার কাছে ডাকিস

আমার আমি অক্টোবর ২০১৬

এ গল্পটা শুধু তোমায় নিয়ে

ঘৃণা সেপ্টেম্বর ২০১৬

ভুলে যাসনে!

এ কেমন প্রেম? আগস্ট ২০১৬

পরিবার (এপ্রিল ২০১৩)

মোট ভোট ২৯ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৬ চেনা-অচেনা-২

পন্ডিত মাহী
comment ১৮  favorite ০  import_contacts ৭২৩
কলেজে লম্বা বন্ধ পেয়ে রুদ্র ভাবছিলো- গ্রামের ঠিকানায় একবার ঘুরে আসলে কেমন হয়! ওর বাবা প্রায়শই বেশ চাপাচাপি করেন, কখনো কখনো তো গাল মন্দও করেন। ওনার ধারণা, ওনি না থাকলে গ্রামের সহায় সম্পত্তি কিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। তাই, গত কুরবানি ঈদের পরের দিন ও যখন মিতু কে নিয়ে ডেটে বের হব হব বলে ভাবছিলো, ঠিক তক্ষনি বাবা ডেকে এনে কড়া নির্দেশ দিয়ে বলেন- আমরা কিছুক্ষণ পরই গ্রামের বাড়ি রওনা দিবে, ড্রাইভারকে দুই দিনের ছুটি দিয়ে দিচ্ছি গাড়িটা তুমি ড্রাইভ করবে। রুদ্রের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরে। পরের দুই ঘণ্টায় ও চারবার টয়লেটে গিয়ে বসে বসে এম.পি.থ্রি গান শোনে, আর ওর সহজ সরল মা বুঝে নেন ওর ফুড পয়জনিং এর কথা। পার পেয়ে যায় সে দফায় !! কিন্তু আজ নিজে থেকেই কেন যেন গ্রামে গিয়ে ঘুরে আসতে ইচ্ছে হচ্ছে ভীষণ। গত কয়দিন যাবত দেহের গতি আর মনের গতি'র মাঝে কিছুটা পার্থক্য লক্ষ্য করছে সে। সব ভেবে চিনতে তাই রুদ্র মামুন কে ফোন দি। ও জানে - রুদ্র যেখানে যাব মামুন নির্দ্বিধায় সেখানে যাবে.. তবুও জিজ্ঞেস করে নেয়া ভালো... ফোন বাজছে
মামুন কে বলতেই কোন প্রশ্ন নয়,এক কথায় রাজী হয়ে গেল। তাই একদিনের মধ্যেই তৈরি হয়ে ওরা দুই বন্ধু নেমে পড়লাম গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। মামুন এর আগে কখনো গ্রামে যায় নাই। তাই ওর মাঝে উচ্ছ্বাসটা অনেক বেশী। রুদ্র গাড়ী ড্রাইভ করছিল, ওর মনের মাঝে কত কিছু ঘুরছে, নিজের মাঝেই নিজের হাজারো প্রশ্ন। তবে এদিকে সে প্রায় ক্লান্ত এই বড় পাগলটার প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে। গ্রাম কেমন হবে, মাটির রাস্তা আছে নাকি, বাড়িতে কয়টা পুকুর, পুকুরে কি মাছ আছে?, বাঁশ ঝাড় কি আছে, ফসলের ক্ষেত কেমন দেখতে, এখন কি হচ্ছে, অনেক অনেক গাছ আছে নিশ্চয়ই? রুদ্র চুপচাপ উত্তর দিয়ে গেলো। মামুনের মাঝে এই আনন্দ দেখে ওর খুব ভালো লাগছে, যেন ছোট এক বাচ্চা হাত নেড়ে নেড়ে প্রশ্ন করছে, যেন খুশিতে এখনি লাফ দেবে। গাড়ী নিয়ে ফেরী ঘাটে পৌঁছতেই, মামুন এক লাফ দিয়ে উঠল, ও কিছুতেই উঠবে না। কেন জানতে চাইতেই বললো, ও সাঁতার জানে না। রুদ্র হো হো করে হেসে ওঠে, ও বুঝিয়ে বলল, ফেরী ডুববে না তোর ভয় নেই। অনেক কষ্টে বুঝিয়ে ওকে নিয়ে ফেরীতে উঠে বসল। ফেরী ছাড়তেই রুদ্রের ডান পকেটে সিরসিরে অনুভূতি লাগতেই চমকে কেঁপে উঠল। ফোন এসেছে...
পর পর দুইবার ফোন বেজে উঠার পরও ফোন না ধরায় মামুন অনেকটা নিশ্চিত সুরে বলে উঠলো- কিরে মিতু'র সাথে আবার লেগেছিস নাকি ? তাইতো বলি, শহর ফেলে বন্ধু আমার হঠাৎ গ্রামের উদ্দেশ্যে কেন? মামুন'র সাথে গত চার দিন ধরে রুদ্রের তেমন একটা যোগাযোগ ছিল না। সে জানেনা, ঐ নম্বরটা থেকে শেষ কল রিসিভ করা হয়ে গেছে। যাই হোক, ফেরী গিয়ে ঘাটে পৌছাতে আরো ৪০ মিনিট লাগবে প্রায়। ওরা ভাবছিল সময়টুকু কিভাবে কাটানো যায়? এরই মাঝে মামুন গাড়ি থেকে গিটারটা নিয় রুদ্রের দিকে এগিয়ে এলো । রুদ্র কিছুটা বিরক্তির সুরে বলল - এখানে আবার এটা বের করলি ক্যান? মুখে খানিকটা বিরক্তির ভাব দেখালেও মনে মনে ও এটাই চাইছি। কিন্তু ওর বিরক্তির ভাব দেখে মামুন খুব একটা পাত্তা দিল না। গিটারটা নিয়ে নিজেই খুব ভাব নিয়ে বসে পড়ল। রুদ্র জানে ওর এই ভাবটা সারে চার মিনিটের জন্য। কিন্তু টেনশন একটাই, এই সারে চার মিনিট গিটারের তারগুলো টিকে থাকবে তো ? মামুন খুব বুজুরগান একটা ভাব নিয়ে রুদ্রকে বলল - কিরে, গিটারটা " সি শার্পে " টিউন করে রেখেছিস ক্যান ? রুদ্র বলল- ব্যাটা তুই "সি" চিনিস না, "সি শার্প" চিনলি কবে, গিটার দে...। মামুন নিজেও গিটার নিয়ে বসে থাকতে চাইছিলনা, ও বলা মাত্রই সুযোগটা নিয়ে নিল । এরই মধ্যে দু চারজন অতি উৎসুক ওদের কাছাকাছি এসে দাড়িয়ে যায়। রুদ্র জানে কিছুক্ষণের মধ্যেই সব দৌড়ে পালাবে কারণ তারা ওদের টাইপের শ্রোতা না.. মামুন বলে উঠল - "নকিং অন দ্যা হেভেনস ডোরস" গানটা ধর। রুদ্র সামনের শ্রোতাদের দিকে এক পলক তাকিয়ে বলল – - তুই সাতার জানলে, রিস্কটা নিয়ে নিতাম!! ভেবে চিনতে নিজের স্টক থেকে একটা গানও বের করতে পারছিল না যেটা এরকম পরিবেশে গাওয়া যেতে পারে। নগর জীবনের সাথে গ্রামবাংলার বহুমাত্রিক পার্থক্য যেন ধীরে ধীরে এখান থেকেই ধরা পড়তে শুরু করলো..


দুই
-ফিরে আসার পর, সবাই খুব সমাদর পাবে। এটাই তো স্বাভাবিক। সবাই তা আসাও করে।
জয়ী মুখ শক্ত করে তাকালো অনিকের দিকে। অনিক গা করলো না। চেয়ারে হেলান দিয়ে আরেকটু আরামের খোজে নিজেকে এলিয়ে দিলো।
-তুই কেন এসেছিস জয়ী? আমাকে দেখতে! নাকি কোন কিছুর হিসাব বুঝে নিতে?
জয়ী ফুঁসে উঠলো
-খুব তো চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলতে শিখেছিস। ভালোই বদলেছিস।
- ওমা! বদলাবো না! মানুষ বদলাবেই... ঐ যে কথা শুনিসনি... কি যেন...
মানুষ বেঁচে থাকলে বদলায়, মরে গেলে পঁচে যায়... না কি ছাই একটা কথা ছিলো? কি যেন...?
-দেখ অনিক অনেক হয়েছে। আমি তোর এখানে লেকচার শুনতে আসিনি। তোর ফিরে আসার অর্থ কি?
-কিসের অর্থ? অর্থই সব অনর্থের মূল। হা হা হা...
-তুই কি সোজা ভাবে কিছু বলবি...
-শোন জয়ী। আমি তোর কাছে বলতে বাধ্য নই। পেছনের কথা নিয়েও আমার মাথা ব্যথা নেই। এই যে ফিরে এসে আগের জায়গায় এসে উঠলাম। তুই বা ও আমার খোঁজ পেয়ে দেখতে আসবি। আমি আবেগে আপ্লুত হয়ে যাবো... সে বাসনাও আমার নেই। কোন এক শালারপুত চামে খবরটা দিয়ে দিছে। তাই তুই কপাল জোরে দেখতে পাচ্ছিস। আমি ভুলে গেছি তোদের।
- ফারিয়ার বিয়ে হয়ে গেছে।
-ও। ভাল তো। তুই করেছিস?
-ভালো মানে?
-তুই চলে যা...
-মানে?
-বাংলায় বলছি তোকে, চলে যা। গেট আউট।
-তুই আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছিস
-হহুম, দিচ্ছি
-কেন?
-বড্ড বিরক্তিকর মনে হচ্ছে তাই... আচ্ছা বোস। চা খাবি। রঙ চা হবে... সাথে কড়া লেবু... বোস আনছি...

অনিক উঠে পড়ে। জয়ী হতভম্ব হয়ে বসে থাকে। বিশ্বাসই হতে চায় না, এই সেই লাজুক অনিক! মানুষ এত পালটে যায়। এত বদলায়।
প্রায় মিনিট বিশেক পরে অনিক হাতে দুই কাপ চা নিয়ে ফেরে। কাপ থেকে ধোঁয়া উড়ছে। হালকা লেবুর ঘ্রাণ বেরোচ্ছে। কড়া লেবুর কথাটি সত্য না। এলাচের গন্ধও পাওয়া যাছে।
চায়ে হালকা একটা চুমুক দিয়ে, তৃপ্তির স্বাদের শব্দ করে অনিক।
-খেয়ে দেখ... তেমন ভালো হয়নি। চিনি কম হয়েছে...
জয়ী খায় না।
-আরে খা... বিষ দেইনি... সিম্পল চা দিয়েছি... এবার বল কি শুনতে চাস?
-তোর কিছু বলা লাগবে না।
-ওরে মেয়ের ন্যাকামী দেখো! শোন, আমার সাথে চালবাজি করবি না। এসব আমার বহুত দেখা হয়েছে। ঝেরে কাশ...
-আমি চালবাজি করছি না। আমি উঠবো। পেছনে যাই হয়ে থাকুক। সে আমি ফেরাতে পারবো না। তোর জীবন এখন কেমন চলছে জানি না। তবে যা গেছে তাও আমি ফিরিয়ে দিতে পারবো না। আমি শুধু বলতে পারি, আমি লজ্জিত, আমি দুঃখিত।
-বোস। তোর তো তাড়া নেই। আমারো নেই। ক্ষমা-টমা চাওয়ার দরকার নেই। তোর লজ্জা কম, আর এত লজ্জা নতুন করে পাওয়ারও দরকার নেই। আমি কিছু মনে রাখিনি। যা হয়ে গেছে তা নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করার মানসিকতা আমার নেই। তুই কি এখন ভালবাসিস?
-মানে?
-ন্যাকা...
-হহুম...
-সত্যি...
-হহুম...
-নিশ্চয়ই আমাকে নয়...?
-কে বলেছে?
-আমি প্রশ্ন করেছি...
-আমি আসলে জানি না...
-তুই বড্ড দ্বিধায় ভুগিস। নিজেই জানিস না কি করছিস। অনেকের সাথে তোর তোলপাড় করা সম্পর্কে জড়ালি। এবার একটু শান্ত হ। এবার সংসারে ঢোক।
-মানে? তুই কি করে জানলি? সমীরের কথাও কি তুই জানিস? তুই কি এই কারনেই ফিরে এসেছিস?
-দিন দিন দেখি আরো মোটা বুদ্ধির হচ্ছিস। ভালো। জানি। খবর পাই। যেমন আমার খবর তোরা পেলি। আমি কিন্তু এসব কারনে ফিরে আসিনি।
-তাহলে? ফারিয়াকে দেখতে?
-দেখা তো করিনি...
-কথা তো বলেছিস। কোন “শালারপুত” তোর কথা ওকে জানায় নি। তুই নিজেই জানিয়েছিস... তাই নয় কি?
-তুই গোয়েন্দা হলে ভালো নাম কামাতে পারতি। সাথে অপূর্ব শরীর। ক্রিমিনালদের মাথা উঠত। ওরা তোর হাতে ধরা পাওয়ার জন্য তোর বাড়ির সামনে লাইন দিত। হা হা হা...
-চুপ থাক... একটা কথা বলবি?
-একটাই তো!
-ধুর...
-বল...
-তুই কি আমাকে এক মুহূর্তের জন্য...
-জয়ী...
-এক মুহূর্তের জন্য... ভালবেসেছিলি...
-জয়ী...
অনিক ধমকে ওঠে। জয়ী থামে না। কেমন অপ্রকিত্বস্থের মত বলে যায়।
-একবার। আমি তো অনেক খারাপ মেয়ে। যার তার সাথে মিশেছি। উচ্ছৃঙ্খল। অনেক খারাপ আমি। তবু কি একবার...
অনিক উঠে দাঁড়ায়।
-তোকে এখন এখান থেকে সত্যি সত্যি বের করে দিতে ইচ্ছে করছে। তবু তোকে একটা কথা বলি।
-কি বল...
-একদিন হয়তো সব বলবো... তবে আজ নয়।


তিন
মনের ভিতর গুন গুন করতে থাকা সুরটা অনেক তাড়া দিচ্ছিল রুদ্রর। মায়ের মুখে বেশ ক'বার শোনা। যদিও কেমন গেঁয়ো গেঁয়ো লাগতো। অমন সুরের গান কি আর এখন চলে। তবে ও যে সেই সুর মাঝে মাঝে নিজের অজান্তেই গলায় তুলত না, তা নয়। এটাই কি মায়া? এখন মনে হচ্ছে মায়া খুব খারাপ জিনিস, পিছু ছাড়তে জানে না। মামুন তাড়া দিচ্ছে, কিরে ব্যাটা লিবার্টি স্ট্যাচু হয়ে গেলি দেখি, গান গা... । রুদ্র নিজেকে ফিরে পেয়েই গীটারে সুর তুলল, তারপর গলায় গান, প্রথম বারের মত আমার দেশের গান।
""গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙ্গা মাটির পথ, আমার মন ভুলায়রে
ওরে কার পানে হাত বাড়িয়ে লুটিয়ে যায় ধুলায়রে
আমার মন ভুলায় রে...
ও যে আমায় ঘরের বাহির করে, পায়ে- পায়ে পায়ে ধরে—
ও যে কেড়ে নিয়ে যায় রে, যায় রে কোন চুলায় রে
আমার মন ভুলায় রে
ও যে কোন বাঁকে কী ধন দেখাবে, কোনখানে কী দায় ঠেকাবে—
কোথায় গিয়ে শেষ মেলে যে, ভেবেই না কুলায় রে
আমার মন ভুলায় রে...""
রুদ্র আকাশের দিকে তাকিয়ে এক নিমেষেই গানটা গেয়ে উঠলাম ও জানে মামুন এত বড় হা করে আছে যে ওর মধ্যে দিয়ে হাজার খানেক মশা অনায়াসে চলাচল করতে পারবে। তবে ওর বেশ হালকা লাগছে এখন, চেপে থাকা অস্বস্তিটা একটু কম মনে হচ্ছে।
মামুন এতক্ষণে চিৎকার দিয়ে উঠল, রুদ্র এইটা কী, কী গাইলি। তুই আজকাল এইসব গাওয়া শুরু করছস, ওসাম ম্যান ওসাম। আই ক্যান্ট বিলিভ ইট। । রুদ্র কিছু বলল না, কারন মামুন এমনই- একটু পাগলামি করবেই, একটু পরেই আড়ালে গিয়ে ফোন করবে আর সবাই কে নিশ্চিত। এই দ্যাখো ও তাই করতে যাচ্ছে। যাক! বুক থেকে ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো রুদ্রর। বেশ ক'বছর আগের কথা মনে পড়ছে। তারপর থেকে ওর আর গ্রামে যেতে ইচ্ছে করে নাই। ছবির এ্যালবামে যখন পুরনো স্মৃতিগুলো ভেসে ওঠে, রুদ্র দেখে ঝলমলে অতীতকে। অতীত শব্দটা যেন কেমন। কেমন পুরনো ঝুল মেখে আছে। অতীত বললেই পেছনের কথা, ব্যথা। একটা পুরনো খাতার কথা মনে পরে। যেখানে কষা অংক গুলো অনেক ক্লাস আগেই করা হয়ে গেছে। এখন আর প্রয়োজন নেই। বড় হবার সাথে সাথে সেই অতীতের ডালপালা বেড়েছে, অতীতে রঙ লেগেছে কিংবা হয়তো না কিছু অতীত রঙ নিয়ে জন্মায়, রঙ নিয়েই অতীত হয়। স্মৃতির পাতায় খুঁজে খুঁজে রুদ্র আপন মনেই বলতে থাকে, আমার এত আনন্দের জায়গাটা এত মলিন হলো কেনো, কে জানে? কেউ জানে না, তবু অনেক বছরপর আমি আমার শৈশব খুঁজতে বের হয়েছি, আমার প্রিয় শৈশব।



চার
জয়ী।
এখন সন্ধ্যে ছাড়িয়ে রাত রাত ভাব। একটু আগেই সেই চিনি কম চা খেয়ে জীবনের হিসাব বাদ দিয়ে সংসারের হিসাব মেলাতে বসেছি। হ্যাঁ, তোর কথা মনে আছে। মনে আছে বলেই তো লিখছি। বলেছিলাম না কিছু বলবো... বলছি...
পঁচিশ বছর পরে যখন গ্রামের পথে হাঁটছিলাম আমি অনেক পরিবর্তন ধরতে পারছিলাম না। আজ প্রায় এক বছর হতে চলল তাও পারছি না, হয়তো সব আগের মতোই আছে, পাঁচিশ বছর কি খুব বেশী সময়! তবে অনেক কোলাহল বেড়েছে, ব্যস্ততা বেড়েছে, স্কুলের সংখ্যা এক থেকে তিনে এসেছে, নতুন বাজার হয়েছে। এখন আর খেলার মাঠে তেমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না, এখন সবাই ছেলে-বুড়ো মোড়ে মোড়ে চায়ের দোকানে গোল হয়ে তাসের আড্ডায় মেতে ওঠে। নাহ এসব কে খুব বেশী পরিবর্তন বলা যায় না। তবু বুকের মাঝে একটা শূন্যতা ঘিরে ধরে, জীবনের রঙ ছলকে পড়া পথ-ঘাট আজ বড় মলিন মনে হয়। চিরচেনা সবকিছু আজ সহাস্যে আমায় উপহাস করে যাচ্ছে। মনের উপর একটা ধুলোর মোটা আস্তরণ পড়েছে যা সহজে মোছার নয়।
ছবির এ্যালবামে যখন পুরনো স্মৃতিগুলো ভেসে ওঠে, আমি দেখি পেয়ারা গাছের সেই চাল কুমড়োর মতো অতীত কে ঝুলে থাকতে। চার ভাই আর দুই বোনের এই যৌথ-সম্পত্তি, আর পারিবারিক উপলক্ষের এই এ্যালবাম। এই ছবি গুলোই আমার সবচেয়ে আপন আর মূল্যবান।
প্রতিদিনই বড় রাস্তা পেড়িয়ে একটু সামনে এগোতেই একটা শিরশিরে অনুভূতি জাঁকিয়ে ধরে আমায়। অনেক গুলো কবর পাশাপাশি, এখনো তাদের মায়া বোধহয় গেলো না। ছোটবেলায় একটা কবরের পাশদিয়ে খুব জোরে দৌড়ে যেতাম ভয়ে, কিন্তু এখন আমি অনেক সাহসী। এত গুলো কবর আমার মনে একটুও ভয় আনতে পারেনি, ওগুলো যে আমার অনেক চেনা এখনও। স্মৃতির পাতায় খুঁজে খুঁজে বেড়াই, ঐখানে না একটা বাঁশঝাড় ছিল, ঐখানে না সুমিদের সেই পাকা দেয়ালের বাড়ীটা সাথে লাগানো পুকুর, কেমন যেন পোড়ো হয়ে গেছে।পাশেই আমার দাদু বাড়ী, অজস্র আনন্দময় দিন কেটেছে এখানে, আজ কত শান্ত কত চুপচাপ।
নেই কিছুই। তবু আমি নতুন করে দেখি। দেখি চোখের সামনে হলদে পাতারা ঝুলে থাকে। বাতাস এলে নড়ে। দোল খায়। আগামী দিন হয়তো ও আর থাকবে না।
তুই ভালো থাকিস। বিয়ে কি করেছিস?
--- অনিক
পুনশ্চ: ফারিয়ার কি কোন প্রোডাকশন হয়েছে?


পাঁচ:
রুদ্র আর মামুন। একজন শৈশব খুঁজতে বেড়িয়েছিলো। আর একজন শুধু স্বাদ নিতে। নতুন একটা জগতের স্বাদ। গ্রামে পা ফেলেই রুদ্রর শরীর দিয়ে শিহরন বয়ে যায়। মাটির পথ গুলো কালো কালো পিচে মসৃণ রূপ নিয়েছে। রাস্তার পাশের ছোট-বড় পুকুর গুলো ভরাট হয়ে এখন বসতি। কোথাও কোথাও ধান উড়ানো এখন চলছে। অথচ মওসুম অনেক আগেই শেষ হয়েছে। সবচেয়ে মজার বিষয় গ্রামে ঢুকতেই দুটো ভিখেরি চোখে পড়া। গ্রামটা আর গ্রাম থাকছে না, আধ-একটু শহর হচ্ছে।
রুদ্র, মামুনকে নিয়ে নিজ বাড়িতে যাওয়ার আগে বড় চাচা মুসলিম উদ্দিন এর বাড়িতে উঠলো। পোড়া-বাড়িতে এখন তো কেউ থাকে না।
খবর পেয়ে বড় চাচা তৎক্ষণাৎ বাজারে গিয়ে মাছ-মাংসের খোঁজে লোক পাঠালেন। বাজার আসলো। দুই চাচী মিলে রান্নার মহাযজ্ঞ শুরু করলো। মুসলিম উদ্দিন দুই বিয়ে করেছেন। দু’জনই জীবিত। বড় জনের দুই ছেলে, দুজনই খুলনায় পড়ে। আর ছোট বৌয়ের ঘরে এক মেয়ে। সে ক’দিন আগেই এস.এস.সি দিয়েছে। কোন এক ছেলের সাথে তার প্রেমের খবর তার বাবার কানে রটে যাওয়াতে এখন তার বিয়ের কথা চলছে। রুদ্রর আরো দুই চাচা আছেন। একজন বরিশালে থাকেন। আর একজন নিখোঁজ।
রুদ্র খুব একটা স্বাছন্দ্যবোধ করে না এখানে এলে। তবু আসতে না চেয়ে হঠাৎ এখানে আসার একটা তীব্র টান অনুভব করে। একটা মায়ার টান।
বড় চাচাকে তার সবচেয়ে বেশী অপছন্দ। সে তুখোড় সুদখোর আর প্রচুর মিথ্যা কথা বলে। গল্প-টল্প বা সিনেমাতে যেমন একটা ভিলেন থাকে। উনি এই পরিবার ও গ্রামের ভিলেন। মহা ত্যাঁদড় ভিলেন।
তার ছেলেদের সাথে রুদ্রর তেমন দেখা সাক্ষাৎ নেই। তবে ছোট চাচী আর তার মেয়েকে তার খুব ভালো লাগে। কথা-বার্তায়, চালচলনে তারা স্বভাবতই আলাদা।

রাতের খাওয়ার সময় বড় চাচার সাথে রুদ্র কথায় কথায় অনেক কথা হলো। মামুন হেসে খেলে কাটছে। নতুন নতুন গ্রাম দেখা খানিকটা তাজমহলের রাতের সৌন্দর্যের মত, ক্ষণে ক্ষণে একেক রূপ ধারণ করে। সকালের মিষ্টি রোদ, দুপুরের আম গাছের ছায়া, বিকেলের আলসি রোদ। সন্ধ্যায় জোনাক আর রাতের শুনশান নীরবতা কেটে ঝি ঝি পোকার গান।

‘কাল সকাল হলে ও কি করে সেটাই দেখার বিষয়।‘ মামুন মনে মনে ভাবলো। এত এত ঝামেলার মাঝে কেমন যেন একটা প্রশান্তি বুকের মাঝে খেলছে। প্রতিবার এখানে আসলেই এমনটি হয়। কেন হয়?

ফোনের মিষ্টি টোনটা বেজে সময়টা আরো তেতো করে দিলো। মিতুর ফোন। অথচ আজ একবারো মিতুর কথা মনেই আসেনি! হোয়াট দ্যা হেল...
রুদ্র ফোন তুলে কানে দিল।


ছয়:
জয়ী,
আচ্ছা তোকে ঠিক কতদিন আগে লিখেছিলাম? আমার মনে নেই। তুই উত্তর দিসনি। অথবা সেটিও আমার মনে নেই। আরেকটা কারন হতে পারে, আমি অনেকদিন শ্রীমঙ্গলে গিয়েছিলাম। বাড়িতে কেউ ছিলো না। তুই ভালো আছিস? বিয়ে করেছিস না পাতানো বিয়েতেই চলছিস। তোর জন্য এই নিয়ে আমার চিন্তা হয়।
তারপর। শ্রীমঙ্গল থেকে এই ক’দিন হলো ফিরলাম। মায়া পরে গিয়েছিলো জায়গাটায়। ওটার গল্প আরেকদিন বলবো। ভাবলাম তোকে লেখা হয় না কত দিন যেন! ঠিক জানি না কতদিন হতে পারে। এদিকে আমার গল্পটা শোন। প্রতিদিন চুলোয় চায়ের পাতিল চড়িয়ে একটা বই নিয়ে নরম সোফায় বসে পড়তাম গা এলিয়ে। পানি শুকতে শুকতে আবার নতুন করে দেবার সময় হয়ে যেতো আমার খেয়াল হতো না। ঠিকানা-বিহীন আমি আজ এই আছি বেশ, চেনা চায়ের কাপ, তেল মশলার চেনা স্বাদ ভুলে রাস্তার মোড়ে বসে সিগারেট ফুঁকি আর সাদা রঙ কালো হতে থাকা চায়ের কাপে রুটি ভিজিয়ে চাবাও। ব্যস্ততা গিলে খেতে চায়… আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে গাল দেই- শালা, কে তোরে বলছিল এই করতে। সিগারেট ফুরাতেই আবার ডাক দেই বাইরে বসা হার-জিরজিরে মানুষ গুলোর কাউকে। নানা অভিযোগ শুনতে শুনতে তখন সূর্য ঝুলে পড়ে, আমি আবার চলতে থাকি… আর ভাবি একটু থিতু হওয়া গেলো। তবু আগের মতো মাথায়-মনে জানান দিতে থাকলো, আধো আধো কথার সেই সুর, সেই গাছের ডালে ঝুলে ঝুলে দোল খাওয়া আর সেই কথা- “সুখ নাইরে পাগলা” আসলে সুখ নেই। সেই যে আমাদের নানা রং এর সুখগুলোও রইলো না। এক সঙ্গে থাকার সুখটুকু হারালে কি হবে?
জয়ী, একদিন তোকে স্বপ্ন দেখেছি। খুব খারাপ স্বপ্ন। ঐ যে তুই নিজেকে মেলে ধরলি। আমি লজ্জায় মাথা নিচু করেছিলাম। জানিস স্বপ্নে আমি কিন্তু মাথা নিচু করিনি। করতে ইচ্ছে হয়নি। আচ্ছা তুই, ও আমার কত ভালো বন্ধু ছিলি। চলে গেলি কেনো। তোদের শহুরে ভালোবাসা আমি আজো বুঝতে পারি না। বড় তাড়াতাড়ি বদলে যায় তোদের ভালোবাসার হাত-পা-গন্ধ। খানিকটা ফি বছর বাড়ির রঙ পাল্টানোর মত। আমার সিগারেট ফোঁকার জীবনই ভালো রে... কোন ধান্দাবাজি নাই...
জানিস আমি যে বাড়িতে থাকি। এটা প্রায় একটা জমিদার বাড়ির মত বড়। এ বাড়িতে কেউ থাকে না, আমি আর আমার দু’জন লোক ছাড়া। আজ এ বাড়ী মালিকের ছেলে এসেছে। চোখ দিয়ে এমন ভাবে চারিদিক দেখছিলো যেন নিজের সবচেয়ে প্রিয় কিছু খুঁজছে। মানুষ কাঁদা হারিয়ে যাওয়া মূল্যবান রত্ন যেভাবে খোঁজে। ঠিক সেভাবে...
আমিও তার সাথে সাথে খুঁজলাম। সে খোঁজায় আনন্দ আছে। আমি তোকে খুঁজলাম, ও কে খুঁজলাম। আমাকেও সাথে সাথে। তুই ভালো থাকিস জয়ী।

--অনিক
পুনশ্চ: একদিন সব বলবো... শুধু আজ আর নয়।

(চলবে)
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • ছালেক আহমদ  শায়েস্থা
    ছালেক আহমদ শায়েস্থা জয়ী, একদিন তোকে স্বপ্ন দেখেছি। খুব খারাপ স্বপ্ন। ঐ যে তুই নিজেকে মেলে ধরলি। আমি লজ্জায় মাথা নিচু করেছিলাম। জানিস স্বপ্নে আমি কিন্তু মাথা নিচু করিনি। করতে ইচ্ছে হয়নী। ভাল লাগল। ধন্যবাদ আপনাকে।
    প্রত্যুত্তর . ২৪ এপ্রিল, ২০১৩
  • লুতফুল বারি পান্না
    লুতফুল বারি পান্না একটা ধ্রুপদী টোন আছে গল্পটায়। ছোট ছোট কারুকাজগুলোও ভাল লাগল। লেখাটা ধারাবাহিক বলে একটু একগেয়েমি চলে আসছে। তবে এই গল্পের জন্য এটাই সেট। দারুণ হয়েছে মাহী।
    প্রত্যুত্তর . ২৪ এপ্রিল, ২০১৩
  • খন্দকার আনিসুর রহমান জ্যোতি
    খন্দকার আনিসুর রহমান জ্যোতি পরিপক্ক হাতের ছোয়া.....অসাধারণ গল্পের বর্ণনা ....ধারাবাহিক হলেও গল্পের রেশ টেনে নেয় অন্য পর্বে ....খাপছাড়া মনে হয়নি খুব ভাল লাগলো....মাহি ভাই আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ.........
    প্রত্যুত্তর . ২৮ এপ্রিল, ২০১৩