বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৬ মে ১৯৮৭
গল্প/কবিতা: ৫৩টি

মে দিবস (মে ২০১৩)

এক মধ্যদুপুরে

পন্ডিত মাহী
comment ৩  favorite ০  import_contacts ২৬১
-আজব!! তুমি এমন কেন? তোমার কি বোধ-বুদ্ধি নেই?
গত আধা-ঘণ্টা ধরে শান্তনু হাঁটছে। আর তার মাথার ভেতর এই একটা কথা বারংবার বেজে চলছে। ধানমন্ডিতে লাবনীদের বাসা থেকে বের হবার পর থেকেই এমন অবস্থা। নিজের চুল টেনে টেনে ছিঁড়তে পারলে ভালো লাগতো। কোন আক্কেল হলো না। খানিকটা অপমান তো লাগছেই। এমন লাগার পেছনে কারণটা খুব একটা সামান্য কিছু তাও নয়।

ঘটনা-১
লাবনী-শান্তনু ইউনিভার্সিটিতে একই ডিপার্টমেন্টে পড়ে এবং গভীর জলে ডুবু ডুবু। বেশ অনেকদিন ধরেই এমনটা চলছে। বোঝাপড়া এখন পর্যন্ত ভালো। বাসায় এসব নিয়ে কোন কেলেংকারী হোক লাবনী তা চায় না। অন্তত পড়াটা শেষ না হয়া পর্যন্ত। তাই শান্তনুর লাবনীদের বাসার গেটের ভেতরেও ঢোকা নিষেধ ছিলো। কিন্তু শান্তনু ঢুকেছে। এবং খানিকটা জোর করেই। এর প্রমাণ অবশ্য আছে। শান্তনুর শার্টের উপর থেকে দ্বিতীয় বোতামটি লাপাত্তা।
ঘটনা-২
লাবনীর লইয়ার বাবা বাসাতেই ছিলো। দেশের অবস্থা বেশী ভালো না। তিনি তাই বাসা থেকে কম বের হন। তবে তার ইনকাম বেশ ভালো। দেশের খারাপ অবস্থা যত হয় ততই তার ইনকাম ভালো। লাবনীর বাবার সাথে শান্তনুর দেখা হয় দরজা দিয়ে ঢুকতেই। লাবনীর বাবা একরাম জোয়ার্দার, উনি কফি খেতে খেতে দাবা খেলছিলেন।

ঘটনা-৩
শান্তনুর পকেট খালি ছিলো। মোটে ২২ টাকা পকেটে নিয়ে লাবনীদের বাসায় গিয়েছিল। তার বেশ কিছু টাকার দরকার ছিলো। আসলে তার জন্য নয়, অন্য একটি জরুরী দরকারে। তাই মিষ্টি জাতীয় কোন দ্রব্যাদি নিয়ে পৌছতে পারেনি। উপরন্তু লাবনীর বন্ধু পরিচয় দেওয়াতে তাকে খুব বিপাকেই পড়তে হলো। উকিল সাহেব তার চৌদ্দ-গুষ্টির কথা জেনে নিলেন। মামলা করতে চাইলে পরে বেশ সুবিধে হবে তার।
সবচেয়ে ভয়ানক যেটা ছিলো, কথায় কথায় শান্তনু বলে ফেলল তার খুব টাকার দরকার। যত বেশী হয় তত ভালো। টাকাটা না হলে তার চলছে না। আর এর ফল খুব একটা ভালো হলো না। উকিল সাহেব তাকে পুরো ২০০ পৃষ্ঠা জ্ঞান, আইন, ন্যায়-অন্যায় সম্পর্কে একটা ছোটখাটো লেকচার দিলেন। আরও বললেন, ইয়াং ম্যান, এই লাইনে তুমি নতুন। জানো তো এক্সপেরেয়িন্স ছাড়া কোথাও টেকা যায় না। বাবা-মা কষ্ট করে তোমাকে পড়তে ঢাকা পাঠিয়েছে। তাদের অন্ন ধ্বংস করছ। আর তাদের টাকার শ্রাধ্য করছ। সে যাই করো, কিন্তু এসবে তোমাকে মানায় না। আমার মনে হয় তুমি দূরত্বটা ট্রাফিক আইন মোতাবেক মেনে চলবে। তাতে তোমার উপকার হবে।

ঘটনা-৪
এটাই শেষ ঘটনা ঐ বাসাতে। লাবনী তার বাবা সাথে কথা কাটাকাটি করে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসেছিল।
তার প্রথম কথাই হলো,
-ভুলেও তুমি এই ত্রিসীমানাতে আসবে না।
শান্তনু মাথা নেড়ে সায় দিলো। লাবনী তাতে আরও খেপে গেলো। শান্তনুর হাতের মাঝে কিছু টাকা গুজে দিয়ে বলল, এখন যেতে পারো তুমি।
আর কিছুটা শব্দ করেই দরজা লাগিয়ে দিলো। আরেকটা ব্যাপার, শুরুর কথাটা এই ফাঁকে বলে যায়।


রোদের তাপ বেড়েছে। শান্তনু গা করলো না। এই রোদ তার সওয়া আছে। রাস্তায় খানিক যা বাতাস আছে তা ওর শার্টের বুকের কাছের ফাঁকা জায়গা দিয়ে বেশ ভালো পরিমাণেই ঢুকছে। ওখানের হারানো বোতামটা ফেরার পথে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে এই বাতাসে সমস্যা একটাই ঘাম শুকিয়ে বুকে ঠাণ্ডা লেগে যাওয়ায় চান্স আছে। সাইন্স ল্যাবের মোড়ে এসে একটা বেনসন কিনে ঠোঁটে ঝোলায় শান্তনু। এখানে সতর্কীকরণ কোন বার্তা মনে রাখবার প্রয়োজন মনে করলো না। আর পকেটেও এখন বেশ ভালোই টাকা আছে। লাবনী যতই রাগ করুক সে ব্যাপারটা যে সিরিয়াসলি নিয়েছে এটাই বেশী। আর যা হয়েছে তা নিয়ে এখন অত মাথা-ব্যথা নেই। শান্তনু আরেকবার টাকাটা গুনে নিলো। পুরো সাড়ে চার হাজার আছে। তার সারা মাসে চলতে ফিরতে এত টাকা লাগে না। সাড়ে তিন হাজারেই চলে যায়। আর এখন মাসের শেষ দিক। বাড়ি থেকে টাকা চলে আসবে কাল-পরশুর মধ্যেই।
শান্তনু সিগারেট শেষ করে সাইন্স ল্যাব থেকে গাড়ি ধরল শাহবাগের। শাহবাগে গিয়ে এখন সেই আমেজটা পায় না সে। আগের সেই তারন্যের সৃষ্টির জোয়ার আর নেই। সব যেন কেমন গভীর ষড়যন্ত্রে মিয়িয়ে গেছে।



শাহবাগ নেমে শান্তনু প্রথম যে কাজটা করলো সেটি হলো টাকা হস্তান্তর। সে ফোন-ফ্যাক্সের দোকান থেকে বিকাশ করলো অজানা নম্বরে। অপর প্রান্তের মানুষটাকে সে চেনে না। পুরো সাড়ে চারহাজার টাকাই। টাকা পাঠাতেই তার মনে খুব স্বাভাবিক ভাবেই উকি দিলো কাল-পরশু যদি টাকা না আসে!

চিন্তাটাকে পাত্তা দিলো না শান্তনু। দ্বিতীয় কাজটা হলো একটু কঠিন। কারণ সারাদিন আজ তেমন কিছু খাওয়া হয়নি। শুধু সকালে মেসের আলু-ডিমের ঝোল ভাত। শান্তনু অস্থায়ী রক্ত-সংগ্রহকারীদের সামনে গিয়ে নাম লেখাল। খুব সাধারণ পজিটিভ রক্তের গ্রুপ তার। এত বছরেও যা ঠিক ভাবে চায়নি কেউ, দিতে গেলে হয়তো আগেই বলে দিয়েছে, আপনি স্ট্যান্ডবাই হিসেবে আছেন। অথচ আজ রক্তের খুব দরকার। রক্তের বের হবের গতি বাড়তেই শান্তনু বার্তা পেল সেলফোনে।
- টাকাটা পেয়েছি। এ অমূল্য সাহায্যের জন্য শুধু ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবো না।

শান্তনু ছোট হতেও চায় না।




শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এখনো অনেক মানুষ আটকা পড়ে আছে। কেউ জীবিত, কেউ মৃত। আহত মানুষগুলো কাতরাচ্ছে। সরকারি রিলিফ পার্টি এখনো আসেনি। বিল সংসদে পাশ হতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট দরকার!!

শান্তনু আবার হাটতে শুরু করলো। এবার গন্তব্য আজিমপুর। তার মাথার মাঝে একটা ঝিম ঝিম ভাব। নবীন ডাক্তার বলেছে সপ্তাহ খানেক ভালো খাবার খেতে। সিগারেট না খাওয়াই ভালো। ওর পকেটে এখন আরও চৌদ্দ টাকা অবশিষ্ট আছে। শান্তনু বাড়ি ফেরে।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন