বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৬ মার্চ ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ১৫টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৮১

বিচারক স্কোরঃ ২.৪৬ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৩৫ / ৩.০

অপলাপ বা নিছক বাস্তবতা

বাংলা ভাষা ফেব্রুয়ারী ২০১৩

অমীমাংসিত গল্প

ঈর্ষা জানুয়ারী ২০১৩

দ্বিচারী

ঈর্ষা জানুয়ারী ২০১৩

মুক্তির চেতনা (মার্চ ২০১২)

মোট ভোট ৪৭ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৮১ সাহেদের বাবার গল্প

সাইফুল করীম
comment ০  favorite ০  import_contacts ৪৯২
মার্চ আর ডিসেম্বর এই দুই মাস আসলে সাহেদের বিরক্ত লাগে-তার বাবার কথা মনে পড়ে। তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিল, এই তো গত বছর আবার নতুন করে বিয়ে করেছেন। সাহেদের খোঁজ বা তার মা- বোনদের খোঁজ নেওয়ার ন্যুনতম প্রয়োজন বোধ করেন না এখন আর। সাহেদরাও আর তার খোজ রাখে না। অথচ তার বাবা কে সে কত ভালবাসত, আদৌ বাসত কী? ভালই হয়েছে-সবার কী বাপ-ভাগ্য কপাল হয়?
মুক্তিযুদ্ধের কথা মনে হলেই তার বাবার কথা মনে পরে। আর মনে পরলেই পিছনে তাকিয়ে দেখে খুব পুরাতন একটা ছবি। তার বাবা রাজাকারদের বিচার চাওয়ার জন্য পত্রিকায় লেখালিখি করছেন, এর-ওর সাথে কথা বলছেন।
-সাহেদ, দেখত লিখার কলম টা কই? তোর মায়ের ত আমার দিকে কোন খেয়াল নাই।
সাহেদের মা দৌড়াতে দৌড়াতে আসে। সামান্য এক কলমের জন্য তার মায়ের সাথে এক চোট যুদ্ধই হয়ে যায়।
এই জন্যই সাহেদ বাড়ি আস্তে চায় না-কাজ ফেলে। কিন্তু ছোট বোনটাকে না দেখে এক মাস দূরে থাকতেও পারে না। তাই এই কেচাল-টেচাল সহ্য করেও সে আসে দিনাজপুর থেকে। বাবার সাথে তার খুব এক টা খাতির নেই- ছোট বেলা থেকেই। এটা হয়ত তার স্বভাব দোষ বা বাবাকে কম করে বাড়িতে পাওয়ার জন্য হয়েছে। আজ নওগা- কাল জয়পুরহাট, তার বাবার সরকারি চাকরি- বদলির চাকরি-বাবাকে সে এই জন্যই হয়ত বাবা হিসেবে পায়নি কোনকালে।
একবার বাজারে গিয়েছিল বাবার সাথে সাহেদ। বাজারের এমন কোন দোকানী নাই যে তার বাবাকে চেনে না।
-কি আব্দুল? খবর কি? দাও দেখি এক বিরা পান তোমার ভাবির জন্য।
আব্দুল নামের দোকানি সাহেদ কে দেখে হাসতে হাসতে বলে- স্যার, এই টা আপনার পোলা? আপনার মতই চেহারার কাটিং-মাশাল্লা।
সাহেদ কে তার বাবা বলে- সালাম দাও বাবা, তোমার কাকু হয়।
সালাম দিয়ে পানটা আব্দুলের হাত থেকে নিয়ে বাজারের ব্যাগে ঢুকাতে ঢুকাতে সাহেদ ভাবে- সবার সাথে এত আন্তরিক তার বাবা -তার সাথে কেন এত চুপচাপ থাকে- কথা হয় না যে তা না। কথা হয়-বাজারে আসলে কেমন করে কম দামে জিনিস পাওয়া যাবে-কেমন করে টাটকা সবজি চিনতে হয়- এই গুলা নিয়ে অনর্গল কথা বলে তার বাবা তার সাথে।
-সাহেদ, টাটকা ঢেড়স চিনবি কিভাবে জানিস?
-জ্বী না, আব্বা।
-ঢেড়সের পিছনটা নখ দিয়ে দেখতে হয়- নরম নাকি, দে ব্যাগ টা আমার হাতে, ভারি হইছে না?
সাহেদ শশব্যস্ত হয়ে না না করে উঠে।
আজো তার বাবার কথা কেন মনে পরে এইটাই সে বুঝে না। সবে অনার্স পাশ করে ভার্সিটি থেকে বাসায় এসেছে রোজা করার জন্য। একদিন ইফতারির পর সবাই মিলে খেতে বসা হয়েছে। তার বাবা হুট করে বলে উঠল- আমার কলিগের ছেলে এক মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি পাইছে- চল্লিশ হাজার টাকা বেতন। তার মা বুঝতে পেরে বলেছিল- সাহেদ ও করবে-সমস্যা কি? সেই দিন ভাতের সাথে সাহেদ যে কি খেয়েছিল সেটা রাতের অন্ধকারে মশারির ভিতর গরমে সারা রাত বুঝতে পেরেছে-তার বাবা তাকে আড়ালে চাকরি করতে বলছে।
সেবার ভার্সিটি গিয়েই চাকরির জন্য পড়া শুরু করে সে- কয়েকটা দেবার পর হয়েও যায় এক ব্যাংকে। কিন্তু তার বাবার কথা বি,সি,এস ছাড়া সব চাকরি নাকি কেরানির চাকরি- যেমন তিনি করছেন। ব্যাংকে চাকরি করলে আর পড়াশুনা করা যায়না-এই কথা টা তার বাবা কে সে বুঝাতেই পারল না।
-আব্বা, আমি ব্যাংকেই চাকরি করব। প্রবলেম কি? টাকা ত আছে।
-প্রবলেম টাকার না। কলম পিষার চাকরি করবি জানলে তোরে পড়াতামই না।
সাহেদের মুখ ভরে থুথু জমে আসে- মাথা টলে উঠে। তারপর থেকে বাড়িতে সে আর যেতো না বললেই চলে।
কিন্তু তার বাবার মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট ছিল না। কতবার তার বাবাকে বুঝিয়ে সে- সার্টিফিকেট থাকলে বি,সি,এস পেতে সহজ হয়ে যায়। কিন্তু তার বাবার এক কথা- “যুদ্ধের সাথে তোর চাকরির কি সম্পর্ক এইটাই ত বুঝিনা। কিছু পাবার জন্যে যুদ্ধ করিনি-এটা তোকে বুঝতে হবে।“
সাহেদও আর মাথা ঘামায় নি ও ব্যাপারে। পরে ত ফ্যামিলির দায়ভার পুরোটাই তার উপরে হুট করে চলে আসলো এক দুপুরে।
তার মা কাদতে কাদতে একদিন ফোন করে দিয়েছিল খবর তাকে। প্রথমে বিশ্বাস হয়নি তার। পরে বাসায় গিয়ে নতুন শাড়ি পরা এক মহিলাকে দেখে বুঝতে পেরেছে-ঘটনা সত্যি। বাসা থেকে সেদিনই সে তার মা আর স্কুল থেকে ছোট বোনটাকে টি,সি দিয়ে নিয়ে চলে আসে তার নিজেদের বাড়িতে- নাটোরে। সাহেদের বৈষয়িক চিন্তা খুবই বেশি- সাথে করে তার মায়ের নামে লিখা বাড়ির দলিলটা নিয়ে আসতে ভুল করেছিল না সে- তাইত এই অগ্নিমূল্যের বাজারে ছোট চাকরি করেও অন্তত মাথাগোঁজার ঠাঁই টুকু নিয়ে তার একদম চিন্তা করতে হয়নি। এখন একটাই চিন্তা- বোনটার পড়াশুনা, তার বিয়ে দিতে হবে-বাকি সব গোল্লায় যাক।
এখন তার বাবাকে মনে পরে না। কিন্তু বছরের দুটো মাস আসলে সে তার বাবার ডাক উপেক্ষাও করতে পারেনা। তার বাবার সাথে মুক্তিযুদ্ধ মিশে আছে বলেই হয়ত বছরের দশটা মাস সে কাউকে না মনে করে ভাল থাকে। এক জীবনে ভাল থাকা আর না ভাল থাকা মেলানো যায় না-সাহেদ মেলাতে পারেনা।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন