বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫
গল্প/কবিতা: ৫৩টি

সমন্বিত স্কোর

৫.০৭

বিচারক স্কোরঃ ৩.১৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৯২ / ৩.০

কোথায় পাব তারে

প্রেম ফেব্রুয়ারী ২০১৭

সূতোর প’রে যে জীবন

আমার আমি অক্টোবর ২০১৬

ভালোবাসার অন্তরালে

ঘৃণা সেপ্টেম্বর ২০১৬

অসহায়ত্ব (আগস্ট ২০১৪)

মোট ভোট ১৬ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.০৭ খসে যাওয়া তারা

রীতা রায় মিঠু
comment ১৪  favorite ১  import_contacts ১,৩৬৯
একটি কক্ষ, কক্ষের একদিকে আসবাবপত্র বলতে আছে একখানা বাহারী খাট, একখানা গদীমোড়া চেয়ার, ওয়ার্ড্রোব, অন্যদিকে জানালার পাশেই লেখার টেবিল, টেবিলের সাথে বসার চেয়ার, টেবিলের পাশের জায়গাটা অবশ্য এখন ফাঁকা পড়ে আছে, এখানে আগে বিশাল বড় বুকসেলফ ছিল, বুকসেলফ ভর্তি থরে থরে বই সাজানো ছিল। বছর দুয়েক আগে বুকসেলফটি ভাঙ্গা হয়েছিল, পরে ভাঙ্গা বুকসেলফ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। টেবিলটাতেও তেমন কিছু নেই, একসময় অবশ্য এই টেবিলে কাগজের দিস্তা, বলপেনের বান্ডিল, কিছু কবিতার বই থাকতো। টেবিলের এক কোণে ক্রিস্টালের ফুলদানীতে রাখা হতো তাজা বশরাই গোলাপ, গোলাপ অবশ্য কিনতে হতো না, বাগানের গোলাপেই ফুলদানী সাজানো হতো। ক্রিস্টালের ফুলদানীটা আর নেই, দুই বছর আগে ওটাকেও ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।
যে কক্ষের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে, কক্ষটি মেহেদীর, জেলে যাওয়ার আগে মেহেদী এই কক্ষেই থাকতো, ছয় বছর বয়স থেকে ২৬ বছর বয়স পর্যন্ত মেহেদী এই কক্ষে থেকে বড় হয়েছে। দুই বছর আগে একদল উন্মত্ত লোক এই কক্ষে ঢুকে মেহেদীর বুকসেলফটাকে কুঠার দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে টুকরো করে ফেলে, বুকসেলফের বইগুলোকে বাগানের মাটিতে আছড়ে ফেলে আগুন ধরিয়ে দেয়, বুকসেলফ কোপানোর সময় উন্মত্ত মানুষের ধাক্কা লেগে টেবিল থেকে গোলাপসহ ফুলদানী মেঝেয় পড়ে ভেঙ্গে যায়। তখনই কয়েকজন উন্মাদের নজর পড়ে টেবিলে থাকা বইগুলো, লেখার কাগজ আর বলপেনের দিকে, সেগুলো তখনই ওরা টেনে নিয়ে বাগানের আগুনে ছুঁড়ে ফেলে।

একজন মানুষ, নাম জাভেদ আনসারী, বয়স ৬০ এর আশেপাশে, কিন্তু ইদানিং তাঁকে দেখে মনে হয় ভাঙ্গাচোরা দেহের অসহায়, ক্লান্ত, হালভাঙ্গা নৌকার বৃদ্ধ মাঝি! দুই বছর আগেও এই ক্লান্ত বৃদ্ধ চেহারার মানুষটিকে দেখে যে কেউ আন্দাজ করতে পারতো, সুঠাম দেহের প্রৌঢ় ভদ্রলোকটি কোন এক সম্ভ্রান্ত, স্বচ্ছল পরিবার প্রধান। এবং পরিচয় শেষে আন্দাজকারীর অনুমান সঠিক বলেই প্রমাণিত হতো। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি একদল উন্মত্ত জনতার হাতে ভেঙ্গে গুঁড়ো হওয়ার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত জাভেদ সাহেব তাঁর নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়ে সদা ব্যস্ত সময় পার করতেন। তখন তাঁর চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে ছিল না, মাথা মাটির দিকে ঝুঁকে থাকতো না, দুই বছর আগেও তাঁর চেহারায় ছিল দারুণ উদ্যমী ছাপ, টানা টানা দুই চোখে ছিল গভীর আস্থার দৃষ্টি, এ কারণেই বন্ধুবৎসল, পরোপকারী মানুষটিকে ঘিরে অতিথি পাখীদের ভীড় লেগে থাকতো। উনি তাঁর প্রিয়তমা পত্নীর জন্য এতটুকু অতিরিক্ত সময় বের করতে পারতেননা, এখন অবশ্য উনার প্রচুর অবসর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুঁড়ো হয়ে যাওয়ার পর থেকে অবসর সময়ের জন্য উনাকে হাহাকার করতে হয় না, দিন-রাতের চব্বিশ ঘন্টাই উনার অবসর, এখন উনার আশেপাশে আর কোন বসন্তের কোকিলদের দেখা যায় না, এমনকি জাভেদ সাহেবের নিজের মায়ের পেটের ভাই-বোনেরাও তাঁকে ত্যাগ করে চলে গেছে।

দিনের অধিকাংশ সময় জায়নামাজে বসে থাকেন যিনি, উনি একজন মানুষ, নাম সায়রা বানু, দেখে মনে হয় আশি বছরের বৃদ্ধা, কুঁকড়ে যাওয়া দেহের দিকে তাকিয়ে, তোবড়ানো দুই গালের দিকে তাকিয়ে মনে হয় উনার বুঝিবা আল্লাহর দরবারে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। আসলে এই বৃদ্ধার বয়স গত এপ্রিলে তেপ্পান্ন পূর্ণ হয়েছে, জাভেদ সাহেবের প্রাণপ্রিয় পত্নী, মেহেদী এবং শাহরুখ নামের দুটি অসাধারণ মেধাবী পুত্রের মা।দুই বছর আগে, মেহেদীকে উনার কোল থেকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত উনি ছিলেন দারুণ রূপসী, স্নেহময়ী, নিরহংকারী, গৃহকর্মে নিপুণা এক নারী, দুই পুত্রের তো বটেই, আশেপাশের আরও অনেকের কাছে ‘আম্মি’ হিসেবে বিশেষ পরিচিত ছিলেন। উনার দুটি পুত্রই ছিল ভীষণভাবে মাতৃভক্ত, দুই বছর আগেও উনার বড় বেটার রূপ, গুণ, মেধা, মাতৃভক্তি দেখে আত্মীয়-বন্ধুরা উনাকে নিয়ে মনে মনে ঈর্ষা করতো, উনি তার সবই টের পেতেন কিন্তু কাউকেই কিছু বুঝতে দিতেন না, সকলের সাথে মিষ্টি ব্যবহার করতেন।
মেহেদীকে উনার বুক থেকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে এখন আর কেউই উনার ধারে কাছে আসেনা, যারা একসময় উনাকে আম্মি ডাকতো, তারাও আসেনা, যারা উনাকে নিয়ে মনে মনে ঈর্ষা করতো, তারাও কেউ এ বাড়ীর পথ মাড়ায় না, উনি এখন দিনের বেশীর ভাগ সময় জায়নামাজে বসে থাকেন, কারো কাছে নালিশ করেন না, শুধুমাত্র আল্লাহর দরবারে মেহেদীর প্রাণভিক্ষা চান, আল্লাহর দরবারে প্রতিদিন কোটি কোটি মুসলমান তাদের ফরিয়াদ জানায়, এত মানুষের কান্নাকাটির আওয়াজে সায়রা বানুর দূর্বল কন্ঠের আওয়াজ খোদার আসশ পর্যন্ত পৌঁছায় কিনা উনি বুঝতে পারেন না! আজ পর্যন্ত মেহেদীর চাঁদপানা মুখখানা দেখার সৌভাগ্য হয়নি, প্রতি সপ্তায় মেহেদীর আব্বা জেলে গিয়ে বেটার সাথে সাক্ষাত করে আসেন ঠিকই, বাড়ী ফিরে উনি মেহেদীর কথা কিছুই বলেন না। সায়রা বানু মনে মনে ঠিকই জানেন, বেটার জন্য জাভেদ সাহেবের দিল পুড়ে আংড়া হয়ে গেছে, কী সুপুরুষ ছিলেন মানুষটা, আজ উনার মুখের দিকে তাকানো যায় না। সায়রা বানুও মেহেদী সম্পর্কে উনাকে কিছুই জিজ্ঞেস করেন না। উনি মানত করেছেন, যেদিন খোদা উনার কলিজার টুকরাকে উনার বুকে ফিরিয়ে দিবেন, সেদিনই উনি বেটার মুখখানা প্রাণভরে দেখবেন। এইজন্যই উনি আরও অনেক বেশী মরীয়া হয়ে উঠেছেন, রান্না-খাওয়া বাদ দিয়েছেন, প্রায় প্রতিদিন রোজা রাখেন, একটু শরবত মুখে দিয়ে সেহেরী করেন, শরবত মুখে দিয়েই রোজা ভাঙ্গেন, এখন আল্লাহকে ডাকা ছাড়া উনার জীবনে আর কোন কাজ নেই, মহান আল্লাহতায়ালা ছাড়া আর কেউ মেহেদীকে বাঁচাতে পারবেনা, কেউ মেহেদীকে বাঁচাতে এগিয়ে আসবেনা, সবাই উনাদেরকে একা ফেলে চলে গেছে।
এই সেদিনও কত মানুষের জন্য উনি রান্না করেছেন, বিশাল সাইজের হাঁড়ি ভর্তি তেহারী, মাটন বিরিয়ানী, ফিরনি রেঁধেছেন, এই বাড়ী সেদিনও আত্মীয় বন্ধুতে গমগম করতো, মেহেদী যেদিন আমেরিকা থেকে ফিরে এলো, এই তো সেদিনের কথা, কতজনাই তো এলো, সায়রা বানুর পুত্র ভাগ্য নিয়ে কত আহ্লাদী কথা শুনিয়ে গেলো, তারা আজ কোথায় হারিয়ে গেছে, মেহেদীর খোঁজ নিতেও কেউ আসেনা। সবাই ভেবেছে তাঁর মেহেদী বুঝি খুনী, মেহেদী বুঝি ডাকাত, মেহেদী বুঝি আল্লাহ-রাসুল বিরোধী। আত্মীয়-স্বজনেরই বা দোষ কী, ওরা তো শুনেছে পুলিশ যখন মেহেদীকে ধরে নিয়ে যায়, একদল উন্মত্ত মানুষ পুলিশ ভ্যানের পেছন পেছন ছুটছিল আর নারায়ে তকবীর, আল্লাহু আকবর’ বলে মহল্লা কাঁপিয়ে তুলেছিল। পুলিশের ভ্যান চলে যেতেই লোকগুলো আবার ফিরে এসেছিলো, তাদের হাতে ছিল কুঠার, শাবল, আরও কত কী। সবাই একসাথে হুড়মুড় করে বাড়ীর গেট ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে পড়েছিল, হাতের কাছে যে যা পায় সবই লুটে পুটে নিয়ে গেলো, যাওয়ার আগে হাতের কুঠার দিয়ে কোপাতে কোপাতে মেহেদীর ঘরের সব কিছুভেঙ্গে ফেললো, মেহেদী পড়ুয়া ছেলে, কত ব্যই ছিল ওর, অনেক দামী ব্যই সব, বইগুলোকে বাইরে নিয়ে এলো, এরপরেই আগুন ধরিয়ে দিল। উনারা বোবার মত সব তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলেন, বুঝতেও পারলেন না, জানতেও পারলেন না, কোন আক্রোশে একদল মানুষ এভাবে বেসামাল হয়ে উনার সংসার ধ্বংস করে দিয়ে গেল!
এরপর থেকে এ বাড়ীতে কেউ আসেনা, ভয়ে আসেনা নাকি ঘৃণায় আসেনা, তা উনি জানেননা। অথচ মানুষগুলোকে উনি কত ভালবাসতেন, বন্ধু জানতেন। বিপদে বন্ধুর পরিচয়, আজ উনি বুঝেছেন, ওদের কেউই বন্ধু ছিল না, অন্যের কথা বাদ দেয়া গেলেও নিজের ভাইদের কথা উনি ভুলবেন কী করে! সায়রা বানুর তিন ভাই, তিন ভাইই আজ দূরে চলে গেছে, ফোন দিয়েও বোনের খোঁজ নেয় না, হয়তো ভাবে, এই বাড়ীতে ফোন করার অপরাধে উনারাও বিপদে পড়বেন, সেধে সেধে কেইবা নিজের বিপদ ডেকে আনে।

সায়রা বানু সেদিন কিছুই বুঝতে পারেননি, মেহেদীকে কেন পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গেলো, মেহেদীর মত এমন অমায়িক, মেধাবী ছেলের শত্রু থাকতে পারে! পুলিশ সেদিন মেহেদীর আব্বাকে শুধু বলেছিল, মেহেদীর জানের নিরাপত্তা দিতেই এই ব্যবস্থা। নাহলে ‘নারায়ে তকবীর’ ধ্বনি উঠানো মানুষগুলো নাকি মেহেদীকে মেরে ফেলবে। একটু একটু আন্দাজ করেছিলেন, কয়েকদিন আগেই মেহেদী বঘের তাড়া খাওয়া হরিণের মত দৌড়ে বাড়ি ফিরেছিল, উনারা জানতেন, আমেরিকা থেকে ফিরে যে ইউনিভার্সিটিতে মেহেদী লেকচারার হিসেবে জয়েন করেছিল, সে ইউনিভার্সিটিতে মেহেদীর কিছু শত্রু তৈরী হচ্ছিল। ছেলেটা খুবই মেধাবী, চাকরীতে জয়েন করতে না করতে ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যানের সুনজরে চলে আসে, ও পড়াতো খুব ভালো, কাজে মনোযোগী ছিল, কখনও ফাঁকী দেয়নি, পরীক্ষার আগেই কোর্স কমপ্লিট করে ফেলতো, ওর সহকর্মীরা এটি খুব ভালো চোখে দেখতোনা, এর মধ্যেই বেটা একটা ইন্টারন্যাশনাল আওয়ার্ড পায়, এরপর থেকেই বোধ হয় শুরু হয় মূল যন্ত্রণা। মেহেদী একদিন বলেছিল, “আম্মি, আমি বোধ হয় এই নোকরীটা আর করতে পারবো না। সহকর্মীরা ভীষণ পেছনে লেগেছে”।
সায়রা বানু বলেছিলেন, “ বেটা, মনে অশান্তি নিয়ে নোকরী করার দরকার নেই। তোমার খাওয়া-পরার অভাব তো নেই, ঝগড়া, ঈর্ষা বহুত খারাপ জিনিস, মানুষের আত্মাকে ছোট করে। তুমি তো অনেক বড় কবি, কিছুদিন ঘরে বসে কাব্যচর্চা করো, পছন্দমত নোকরী মিলুক, তখন আবার দেখা যাবে। তুমি যদি ফের আমেরিকা যেতে চাও, সেটাও যেতে পারো”।
মেহেদী বলেছিল, “ আমি আমেরিকা গেলে তোমার কষ্ট হবে না?”
-আগে হলে কষ্ট হতো, এখন কষ্ট নাও হতে পারে, ওখানে তোমার মাম্মি আছে, আমার কথা মনে হলেই মাম্মির কাছে চলে যাবে, ওখানে পারিজাত আছে, পারিজাত তোমার ছোট বোনের মত, কত ভালোবাসে তোমায়, কী দরকার এখানে শত্রুর মাঝে থেকে,
-আমাকে না দেখে তুমি থাকবে কী করে?
- আমার আর কষ্ট কি, তোমাদের সুখেই আমার সুখ। তোমার আব্বা আছেন, শাহরুখ আছে, তোমার চাচা-চাচী, মামা-মামী সকলেই তো আছে, আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না।
তার কয়েকদিন পরেই ভয়ার্ত হরিণ শিশুর মত ছুটতে ছুটতে মেহেদী বাড়ী ফিরে এলো, সায়রা বানুকে বলল, “আম্মি, তুমি কী আমাকে বিশ্বাস করো?”
-এ কেমন প্রশ্ন বেটা?
-কেউ যদি বলে যে আমি আল্লাহ রাসুলের নামে বাজে কথা বলি, তুমি বিশ্বাস করবে?
-মরে গেলেও না। তুমি ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে যত জানো, মসজিদের একজন ইমামও তত জানেন না। তুমি কত ছোট বয়সে কোরাণ খতম করেছো, তোমার মৌলভী স্যার কত গর্ব করেন তোমাকে নিয়ে, তুমি তো শুধু মৌলভী সাহেবের কাছেই পড়োনি, নিজে নিজেও তো কত কিতাব পড়েছো, শুধু তো ইসলাম নয়, অন্য সব ধর্মগ্রন্থও পড়েছো, মনে পড়ে, জানতে চেয়েছিলে, অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থ পড়লে আমি দুঃখ পাবো কিনা। আমি কী বলেছিলাম, মনে নেই?
-জী, মনে আছে, বলেছিলে, জানার কোন শেষ নেই, তুমি পড়ো, যত খুশী, যেটা ইচ্ছে হয় পড়ো, সব ধর্মেই মূল কথা এক, নিজ ধর্ম ঠিক রেখো, তাহলেই হবে।
-আম্মি, খোদার কসম, আমি কোনদিন আল্লাহ-রাসুলকে নিয়ে কোন বাজে কথা ভাবিওনি, বলিওনি, কিন্তু আজ আমাকে ইউনিভার্সিটি থেকে মিথ্যে অপবাদ দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে, যারা আমাকে পছন্দ করে না, তারা কিছু পছন্দের ছাত্র সাথে নিয়ে আমার বিরুদ্ধে খোদা বিরোধী শ্লোগান দিয়ে সবাইকে ক্ষেপিয়ে দিয়েছে, প্রিন্সিপ্যাল স্যার আমাকে রুমে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন যেন খুব দ্রুত ইউনিভার্সিটি চত্বর ত্যাগ করি।
এরপর থেকে যা কিছু ঘটেছে, সেগুলো নিয়ে ভাবতে চান না সায়রা বানু, সেদিনগুলোর কথা মনে এলেই বুকের মধ্যে রক্তক্ষরণ হয়, দিনকে রাত মনে হয়, স্বামীকে অচেনা মনে হয়, শাহরুখকে চিনতে ভুল হয়! অনেক কেঁদেছেন, অনেক কেঁদেছেন, এখন আর কাঁদেন না, অথবা কাঁদতে ভুলে গেছেন।


দুই
আজ সোমবার, মেহেদীর সাথে দেখা করতে যাবেন বলেই জাভেদ সাহেব বিছানা ছেড়েছেন কাকভোরে, সেই কাকডাকা ভোর থেকেই মেহেদীর কক্ষে এসে ওর চেয়ারটিতে বসে আছেন, অদূরেই মেঝেতে জায়নামাজে বসে আছেন সায়রা বানু, শাহরুখ ঘুমাচ্ছে পাশের ঘরে, শাহরুখ কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। জাভেদ সাহেব মাঝে মাঝেই পড়ার টেবিলে মাথা নুইয়ে রাখছেন, মাথা নুইয়ে সায়রা বানুকে আড়াল করে চোখের পানি ফেলছেন।
আজকের সকালটি অন্যসব সকালের চেয়ে একটু অন্যরকম, আশা জাগানিয়া সকালের মত। মেহেদীর কক্ষের চেহারায়ও কিছু বদল এসেছে, ফাঁকা টেবিলটা আজ একেবারে ফাঁকা নয়, টেবিলে দুটো কাগজ খুব সযত্নে রাখা আছে, দুটোই চিঠি, ইংলিশে লিখা, দুটোই এসেছে আমেরিকা থেকে, মেহেদীর মাম্মি পাঠিয়েছেন একটি, আরেকটি পাঠিয়েছে পারিজাত নামের এক তরুণী। গতরাতে জাভেদ সাহেব ই-মেইল চেক করেছিলেন, প্রতি রাতেই একবার করে ই-মেইল চেক করেন যদি হিউম্যান রাইটস এসোসিয়েশান থেকে কোন আশার বাণী শোনা যায়! আশার বাণী কেউ শোনায় না, তবুও আমেরিকান হিউম্যান রাইটস এসোসিয়েশানের মিস মেরিডিথ প্রতিনিয়ত মেহেদীর মুক্তির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।
আশার আলো একবার একটু দেখেছিলেন উনারা, পাকিস্তান হিউম্যান রাইটস এসোসিয়েশানের আঞ্চলিক চেয়ারম্যান স্বয়ং মেহেদীর পক্ষে আইনী লড়াইয়ে নেমেছিলেন। তখন জাভেদ সাহেবের বুকে বল ফিরে আসে, উনি স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছিলেন, মেহেদী মুক্তি পেয়ে ফুলের মালা গলায় জেলগেট থেকে বেরিয়ে আসছে। গত দুই বছর মেহেদীর পক্ষে কোন আইনজীবী পাওয়া যায়নি, ব্লাসফেমী আইনে নির্দোষ, নিষ্পাপ এক উচ্চশিক্ষিত তরুণের মৃত্যুদন্ড হতে যাচ্ছিল, বিখ্যাত আইনজীবী রেহমান রাশিদ মেহেদীর হয়ে আইনী লড়াই করতে চেয়েছেন। তাতেই জাভেদ সাহেব নিশ্চিন্ত বোধ করেছেন। কিন্তু কেইস শুরু হওয়ার পনের দিনের মাথায় রেহমান রাশিদকে প্রকাশ্য দিবালোকে একদল লোক গুলী করে হত্যা করে, সেদিন থেকে জাভেদ সাহেব একেবারেই নীরব হয়ে গেছেন। প্রতি সোমবার মেহেদীর সাথে দেখা করতে যান ঠিকই, খুব কষ্ট লাগে ছেলের শুকনো মুখখানার দিকে তাকালে। মেহেদীর মুখের দিকে উনি তাকান না, যেটুকু সময় ছেলের সামনে থাকেন, মাথা নীচু করে থাকেন।
এমন একটি পুত্রের জন্মদাতা পিতা, পুত্রের গর্বে উনার বুকের ছাতি সব সময় চওড়া দেখাতো, যে পুত্র উনার বুকের ছাতি চওড়া করেছিল, সেই পুত্রের দুঃখের দিনে তিনি কিছুই করতে পারছেন না। মনে মনে ভাবেন, পুত্রের কপালে কী ফাঁসীর দড়ি ঝুলছে, হায় আল্লাহ! এ কেমন পরীক্ষা নিচ্ছো? আমি কী এমন গুণাহ করেছি যে আজ পুত্রের মুখের দিকে তাকাতে ভয় পাচ্ছি!” উনার আরও বেশী কষ্ট লাগে যখন মেহেদী জানতে চায়, আমেরিকা থেকে ওর কোন বন্ধু ওর খোঁজ করেছে কিনা। ছেলেটা খেতে ভালোবাসতো, উনি ভুল করেও ছেলেকে জিজ্ঞেস করেন না, জেলে কী খেতে দেয়া হয়! ছেলেটা বই পড়তে ভালোবাসতো, আকাশ দেখতে ভালোবাসতো, বাগানের বসরাই গোলাপ নিয়ে কত কবিতা লিখতো, সেই ছেলে আজ চব্বিশ ঘন্টা একটি অন্ধকার ঘরে আটকা পড়ে আছে। ছেলেকে উনি কী সান্ত্বনা দিবেন, ছেলেই উনাকে পালটা সান্ত্বনা দেয় এই বলে যে ‘কবিদের মৃত্যু হয় না”। ছেলেটা মাঝে মাঝে উনাকে জিজ্ঞেস করে, “ আব্বা, ওরা আমাকে ব্লাসফেমী আইনে বিচার করছে, হয়তো আমাকে মৃত্যুদন্ড দিবে, আমার মৃত্যুতে ভয় নেই, একটাই শুধু খারাপ লাগে, তোমাদের মত ধার্মিক পিতা-মাতার সন্তানকে মিথ্যে অপবাদ মাথায় নিয়ে মরতে হচ্ছে। আব্বা, তুমি কী বিশ্বাস করো যে আমি ইংলিশ লিটারেচার পড়াতে গিয়ে আল্লাহ-রাসুলের নামে বাজে কথা বলেছি”? জাভেদ সাহেব ছেলের হাত দুটো ধরে বলেছিলেন,
“বেটা, স্বয়ং আল্লাহপাকও যদি ইশা্রায় বলেন যে তুমি নবীজী সম্পর্কে, আল্লাহ সম্পর্কে বাজে কিছু বলেছো, আমি বিশ্বাস করবোনা, আল্লাহপাকের দরবারে আমি জোর গলায় বলবো, ইয়া মাবুদ, কোথাও কোন ভুল হয়ে যাচ্ছে, আমার মেহেদী হাসান জমজমের পানিতে ধোয়া তাজা, পবিত্র একটি ফুল, সে কখনও এমন অন্যায় করতে পারেনা।

জাভেদ সাহেবের মনটা দুই বছর আগেই মরে গেছে, যেদিন উনার আদরের বেটা ভয়ার্ত চোখে মুখে দৌড়ে বাড়ীর ভেতর ঢুকলো, সেদিন থেকেই মনের অসুখটা শুরু হলো, এরপর মনের অসুখ বাড়তেই থাকলো, বাড়তেই থাকলো, একসময় মনটা একেবারেই মরে গেলো। মন যেদিন মারা গেলো, সেদিনের কথাও মনে আছে জাভেদ সাহেবের।
ভয় পেয়ে ইউনিভার্সিটি থেকে দৌড়ে বাড়ী ফেরার পর থেকে মেহেদী তখনও বাড়ীর ভেতরেই থাকে, সারাদিন লেখার টেবিলে বসে কাটিয়ে দেয়, কবিতা লিখে, আবার ছিঁড়েও ফেলে, ছেঁড়া কাগজে ঘর ভর্তি হয়ে যায়, আরও কত কিছু যে লিখে, জাভেদ সাহেব মেহেদীর দিকে তাকান, বুক থেকে বড় দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। কী থেকে কী হয়ে গেলো।

বেটা মাত্র তো আমেরিকা থেকে ফিরেছে বছর খানেক আগে, ইংলিশ লিটারেচার আর থিয়েটারের উপর আমেরিকান ডিগ্রী নিয়ে মুলতানে ফিরেছে। ছোটবেলা থেকেই তার বেটা বহুত জিনিয়াস, স্কুল ফাইনালে বোর্ডে ফার্স্ট হয়েছে, গোল্ড মেডেলিস্ট, ডাক্তারী পড়তে গেছে, সেখানেও অনেক ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করছিল, কিন্তু কী মনে করে যেন থার্ড ইয়ার পড়ার পর ডাক্তারী পড়া ছেড়ে দিল। ডাক্তারী বাদ দিয়ে ইংলিশে অনার্স পড়তে শুরু করলো। এই তো দুই বছর আগেই আমেরিকা গেলো ফুল ব্রাইট স্কলারশীপ নিয়ে, ইংলিশ লিটারেচার এবং থিয়েটারের উপর এক বছরের একটি কোর্স করতে, খুব ভালোভাবে সেই কোর্স শেষ করে গত বছর সে দেশে ফিরে এসেছে।

বড় আদরের বেটা, কলিজার টুকরা সন্তান তার, প্রথম সন্তান, এই তো সেদিন তোয়ালে পেঁচিয়ে হাসপাতাল থেকে সায়রা বানুর কোলে চড়ে বাড়ীতে এলো, বাড়ীতে ঢুকেই প্রথম উনার কোলে চড়লো, বেটার মুখ দেখে নাম রাখলেন মেহেদী হাসান, গজল সম্রাট মেহেদী হাসানের নামে নাম।
আহ! এই তো সেদিনের কথা, মেহেদী কীরকম লেপ্টে থাকতো উনার বুকে, সায়রা বানু হাসতেন মিটিমিটি করে, উনি বলেছিলেন,
“ হাবীবি, দেখো, মেহেদী হাসান দেখতে হয়েছে এক্কেবারে তার আম্মির মত, কিন্তু সে তার আব্বার বুকে থাকতে বেশী পছন্দ করে”।
সায়রা বানূ বলেছিলেন, “ হাঁ, তাই তো দেখছি, আম্মির জায়গা বেটা দখল করে নিয়েছে। কিন্তু মেহেদী হাসান কী শুধুই আমার মত হয়েছে দেখতে? আপনার মত কী কিছুই পায়নি?”
-আমার মত কিছু না পেয়ে ভালো হয়েছে, পুত্র যদি হয় মাতৃমুখী, সে হয় প্রকৃত সুখী। আমার মেহেদী সুখী হোক, এটাই চাই।
-জ্বী না, মেহেদী পুরোপুরি আমার মত হয়নি, এজন্য আমি অনেক খুশী, এই ছেলে তার আব্বার দিল পেয়েছে, বড়ই নরম দিল, বড়ই কোমল মনের মানুষ হবে সে, আমি চাই, সে তার আব্বার মত ভালো মানুষ হোক।
-এত ছোট বাচ্চার দিল তুমি কীভাবে বুঝলে?
-আমি বুঝবো না তো কে বুঝবে? আমি তার আব্বাকে জানি, আমি আমার বেটাকে জানি কারণ একে দশ মাস দেহের ভেতরে রেখে বড় করেছি, আমার দেহের ভেতরে ওর প্রতিটি স্পন্দন থেকে টের পেয়েছি, এ আপনার দিল নিয়ে দুনিয়াতে আসছে। আল্লাহ ওকে সুখী করুন, আমিন!
-আমিন!

হায়, এইতো সেদিনের কথা, মেহেদী তো ঠিকই কোমল দিল পেয়েছে, সায়রা বানু বলেন আমার দিল নরম, আমি জানি সায়রা বানুর দিল নরম, দুজনের দিল নিয়ে যে বেটা দুনিয়াতে এলো, সে কেন আজ কিছু মানুষের তাড়া খেয়ে বাড়ী ফিরলো। মেহেদী তো অনেক উঁচুদরের ছেলে, কত মেধাবী, মাত্র এক বছর হয়েছে মুলতানে ফিরেছে, এসেই ইউনিভার্সিটিতে লেকচারারের চাকরী পেয়ে গেলো, এর মধ্যেই ওর নাম ডাক হতে শুরু করেছে, ছয় মাস আগেই একটা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে, আর সেই ছেলের নামেই কিনা এমন মিথ্যে অভিযোগ। আমি আপনার ফুল ব্রাইট স্কলারশীপ নিয়ে আমেরিকা পড়তে গেছিল। ছোট হলে কী হবে বেটা তার কবি, অনেক বড় সাহিত্যিক,আদরের টুকরা, কলিজার টুকরা বেটা, যেমন চেহারা তেমন স্বাস্থ্য, এমন সুন্দর, ঝলমলে জোয়ান লেড়কাকে মুখ চোখ শুকিয়ে বাড়ীর ভেতর বসে থাকতে দেখে এমনিতেও ভালো লাগতোনা জাভেদ সাহেবের, কিন্তু মেহেদীকে বাইরে বেরোতে দিতেও মন সায় দিত না। আশপাশের অবস্থা সুবিধের ছিল না, দিনে রাতে বাড়ীর চারপাশে সব আনজান আদমীর আ্নাগোনা শুরু হয়েছে, সায়েরা বানু তো বাড়ীর ভেতর থাকেন, বাইরের সংবাদ রাখেন না, মেহেদীর শুকনো মুখ দেখে জানতে চেয়েছিলেন, বেটার তবিয়ত ঠিক আছে কিনা। সেই ছেলেকে হঠাৎ একদিন পুলিশ এসে নিয়ে গেলো, তখনই জাভেদ সাহেবের মনটাও মরে গেলো।


গত রাতে ইমেইল চেক করে না-দেখা দুই নারীর কাছ থেকে চিঠি পেয়ে জাভেদ সাহেব অনেক কেঁদেছেন। একে তো রাশভারী পুরুষ উনি, তার উপর মেহেদীর এই অবস্থা, শাহরুখের লেখাপড়া বন্ধ রেখেছেন, ব্যবসা-বানিজ্য বন্ধ, আত্মীয়-বন্ধু সকলেই আজ দূরে সরে গেছে, এমন এক বৈরী সময়ে অত দূর থেকে দুই নারী মেহেদীকে এমন মায়াবী চিঠি লিখে পাঠিয়েছে যে ওটা পড়ার পর থেকে চোখের পানি বাধা মানতে চাইছেনা, পৃথিবীতে এখনও মানুষ আছে, এখনও মানবতা আছে, কিছুই শেষ হয়ে যায়নি! মায়ের পেটের ভাই ভাইয়ের বিপদের দিনে ভাইকে একা ফেলে চলে গেছে, অথচ আমেরিকার কোন এক কোণে আরেক বোন এই ভাইয়ের জন্য কেঁদে আকুল হচ্ছে! বেশী আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন জাভেদ সাহেব, ভোর হতেই চলে এসেছেন মেহেদীর কক্ষে, ঝিম মেরে বসে আছেন বেতের সোফায়, আজ জায়নামাজে বসতে পারেননি, চেয়ারে বসেই নামাজ আদায় করেছেন। চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করলে সেই নামাজ কী সহী নামাজ হয়?

মেহেদীর আম্মি, সায়েরা বানু জায়নামাজে বসে আছেন, মানুষটির দিকে তাকালে এখন আর বুঝা যায় না, পাঁচ বছর আগেও তিনি কী পরিমান সুন্দরী ছিলেন। মেহেদী পেয়েছে মায়ের চেহারা, মাতৃমুখী পুত্র নাকি ভাগ্যবান হয়, এ কেমন ভাগ্য নিয়ে মেহেদী এই দুনিয়ায় এসেছিল, এর চেয়ে বেটা না জন্মালেই ভালো হতো মাত্র ছাব্বিশ বছর!
ই-মেইল এসেছে মেহেদীর নামে। এমন ই-মেইল প্রতি রবিবারেই আসে, সোমবারে যখন জাভেদ সাহেব মেহেদীর সাথে ত্রিশ মিনিটের জন্য মোলাকাত করতে মুলতানের ভয়ংকর কারাগারে যান, কোটের ভেতরের পকেটে করে ই-মেইলগুলো নিয়ে যান। জেলার সাহেবের চোখ আড়াল করে খুব সাবধানে ই-মেইল মেহেদীর হাতে দেন।
আজকের সকালটা অন্যরকম লাগছে কারণ আজ আমেরিকা থেকে মেহেদীর ‘মাম্মি’ চিঠি পাঠিয়েছে। মেরিডিথের মাধ্যমেই এসেছে চিঠিটি। মেহেদীর যে একটা মাম্মি আছেন, আমেরিকায়, এই তথ্যটি জাভেদ সাহেবের মনে থাকার কথা নয়। এটি মনে আছে মেহেদীর আম্মি, সায়রা বানুর।

অন্যের চিঠি পড়তে নেই, তবে মেহেদীর মাম্মীর চিঠি বলে কথা, কী লিখেছেন এই মানুষটি! চিঠিতে চোখ বোলাতেই জাভেদ সাহেব সত্যিকারের আপ্লুত হয়ে পড়েছেন, আজ বেটা দারুণ খুশী হবে। এতদিন কেবল জানতে চেয়েছে আমেরিকা থেকে কেউ খোঁজ নেয় কিনা, আজ মেহেদী পাবে তার মাম্মির চিঠি, মেহেদীর মাম্মী নাকি কিছুদিন আগেই পত্রিকায় একটি লেখা পাঠিয়েছিল, “হারিয়ে গেছে যেই ছেলে” শিরোণামে। এই লেখা পড়েই কেউ একজন মেহেদীর মাম্মিকে জানিয়েছে মেহেদীর বর্তমান অবস্থা। ভদ্রমহিলাকে চোখে দেখার সুযোগ নেই, সুযোগ পেলে উনার হাত দুটো ধরে বলতেন,
“ বোন, আমার মেহেদী পথ ভুল করে আকাশ থেকে টুপ করে পাকিস্তানের মাটিতে পড়েছিল, ওর তো তোমার কোলে জন্মানোর কথা ছিল, বোকা ছেলে পথ ভুল করে আজ সেই ভুলের খেসারত দিচ্ছে, তুমি ওকে নেবে? আমি আমার মেহেদীকে তোমার হাতে তুলে দিলাম, ছেলেটার খুব কবিতা লেখার শখ, ও খুব ভাল কবিতা লিখে, গোল্ড মেডেলিস্ট, ফুল ব্রাইট স্কলার, অনেক পুরস্কার পেয়েছে এই ছোট্ট জীবনে, আজ ও কোথায় পৌঁছে যেতো, পথ ভুল করে আজ ফাঁসীর দড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে।তুমি ওকে নিয়ে যাও, ওকে বাঁচাও, মেহেদী আমার দিকে যখন তাকায়, আমি ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাই, আমি ওকে সাহায্য করতে পারলাম না, ওর আম্মি বেশীদিন বাঁচবেন না, আমিও কী করবো কিছুই জানিনা, শাহরুখের লেখাপড়া বন্ধ, আমাদের উপর দিয়ে বিনা মেঘে বজ্রপাত হয়েছে, আমরা বজ্রাঘাতে পুড়ে গেছি, তুমি শুধু তোমার পুত্রকে বুকে আগলে নিয়ে যাও!”
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন