বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫
গল্প/কবিতা: ৫৩টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৬

বিচারক স্কোরঃ ৩.৩১ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.২৯ / ৩.০

কোথায় পাব তারে

প্রেম ফেব্রুয়ারী ২০১৭

সূতোর প’রে যে জীবন

আমার আমি অক্টোবর ২০১৬

ভালোবাসার অন্তরালে

ঘৃণা সেপ্টেম্বর ২০১৬

বাংলা ভাষা (ফেব্রুয়ারী ২০১৩)

মোট ভোট ৪২ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৬ অগ্নিকন্যা

রীতা রায় মিঠু
comment ২৫  favorite ১  import_contacts ১,২৯৯
বিকেল চারটা বাজার সাথে সাথেই পারমিতার চায়ের তৃষ্ণা পেয়ে যায়। আজকেও এর ব্যতিক্রম হলো না। এবার নিউইয়র্কে বেশ ঠান্ডা পড়ার কথা ছিল, কিন্তু পড়ে নি। কম্ফর্টারের উষ্ণতায় সে এতোক্ষণ ভালোই ছিল, এবার আরামের শয্যা ছাড়তেই হলো।

রেস্টরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে চায়ের কেটলী চূলায় চাপিয়ে পারমিতা দরজা খুলে বাইরে গেলো, মেইল বক্স চেক করার জন্য। মেইল বক্সের ডালা খুলে বেশ ক’খানা খাম পেলো, বেশীর ভাগই জাংক মেইল, মানসীর একখানা চিঠি আছে অবশ্য। মানসী, পারমিতার ছোটবেলার বন্ধু, প্রাণের বন্ধু।

জাংক মেইলগুলো গার্বেজ করে দিল। চায়ের জল ফুটছে। কেটলীতে দুধ, চাপাতা দিয়ে কিছুক্ষণ ফুটিয়ে কাপে ছেঁকে চামচে টুং টাং আওয়াজ তুলে চিনি মেশালো। চামচ আর কাপে যে টুং টাং আওয়াজ উঠে, পারমিতার খুব ভালো লাগে। দুটো কুকী নিয়ে চায়ের কাপসহ সোফায় বসেই মানসীর চিঠি খুললো। পাগলী বেশ বড় একখানা চিঠি লিখেছে তো!

প্রিয় পারমিতা,

সরি, একটু দেরী হয়ে গেলো তোর চিঠির উত্তর দিতে। বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানের পর পরই ব্যস্ত হয়ে গেলাম সংসার নিয়ে। মানস আর তাপসীর উইন্টার ব্রেক ছিল, ভাই বোন দুজনে মিলে আমাকে একটা দন্ড কোথাও বসতেই দেয় নি। খুব ভালো কেটেছে কয়েকটা দিন।

বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে দুইজন মুক্তিযোদ্ধাকে সংবর্ধনা জানানোর কথা ছিল, একজন আসতে পেরেছিলেন, আতিকুর রহমান। উনাকে দেখেছি কাছে থেকে, একবার ইচ্ছে হচ্ছিল, হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখি, কিন্তু ইচ্ছে দমন করে ফেলেছি। বয়স্ক একজন লোককে যদি ছুঁয়ে দেখতে চাইতাম, কী হাস্যকর ব্যাপার হতো বল তো! খুব ভালো লেগেছে এমন একটি অনুষ্ঠানে থাকতে পেরে। আমার খুব ইচ্ছে ছিল, উনাকে আমার বাড়ীতে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াই। কিন্তু উনার খুব ব্যস্ততা ছিল, পরের দিনই চলে গেছেন।

এখন বলি আসল গল্প, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা নারীর সন্ধান পেয়েছি! অবশ্য নারী দু’জন, মা আর মেয়ে। কাকে রেখে কাকে মুক্তিযোদ্ধা বলবো, তাও বুঝতে পারছি না। তবে আমার দৃষ্টিতে মা হচ্ছেন আসল মুক্তিযোদ্ধা, মেয়ে তাঁর উত্তরসূরী। আমার সাথে অবশ্য একজনের দেখা হয়েছে। কার সাথে দেখা হয়েছে, সেটা এখনই বলছি না, চিঠিটা আগে পড়। খুবই গুরুত্বপূর্ণ চিঠি এটা।


এর আগের চিঠিতেও তোকে লিখেছিলাম, আমার এত বছরের জীবনে কোন মুক্তিযোদ্ধাকে সামনাসামনি দেখিনি, এই প্রথমবার দেখবো আমাদের বিজয় দিবস অনুষ্ঠানে। তোদের নিউইয়র্কে তো অনেক মজা, সব থাকার দেশে তুই থাকিস। একবার যদি আমাদের এই ধ্যাদধেরে গোবিন্দপুর’ মার্কা মিসিসিপি স্টেটে আসতে পারতি, তাহলে বুঝতে পারতিস, কিসের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।


শোন, সেদিনের বিজয় দিবস অনুষ্ঠানে এসেছিল বহ্নিশিখা বাড়ৈ রজার্স। বহ্নিশিখা বাংলাদেশের মেয়ে তবে বিয়ে করেছে একজন আমেরিকানকে। ্মেয়েটি এখানে জ্যাকসান স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ম্যাথম্যাটিকসে অধ্যাপনা করে। বয়স প্রায় আমাদের কাছাকাছিই হবে। দেখে অবশ্য আমার চেয়ে ছোট মনে হয়। আমেরিকান বিয়ে করলেও ওর কথাবার্তা, চালচলন, খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে সবকিছুতেই বাঙ্গালীয়ানা ধরে রেখেছে। চেহারাতেও বেশ ‘বাংলা মা’ ভাব আছে। ‘বাংলা মা’ কথাটা মানস খুব বলে। কারো চেহারাতে শান্ত- স্নিগ্ধ ভাব দেখলেই বলবে, “ ওর চেহারায় বাংলা মা ভাব আছে”। যাই হোক, যে কথা বলছিলাম, লোকমুখে বহ্নিশিখার নাম আগেই শুনেছি, কিন্তু এতোদিন দেখা হয় নি।

সেদিনের অনুষ্ঠানে “ ও আমার বাংলা মা তোর রূপের সুধায় হৃদয় আমার যায় জুড়িয়ে” গানটি গেয়েছিলাম। স্টেজ থেকে নেমে আসার পর, সব সময় যা হয়ে থাকে, এ ডেকে বলে, “ দারুণ গেয়েছেন”, ও ডেকে বলে, “ খুব ভালো লাগলো”, প্রশংসা শুনে নিজের চেয়ারে বসতেই বহ্নিশিখা এসে দাঁড়ালো। হালকা সবুজ জমিন, টকটকে লাল চওড়া পাড়ের শাড়ীতে ওকে খুব উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। গলায় পরেছিল রুদ্রাক্ষের মালা, কানে মাটির গয়না, হাতে মাটির বালা। মেয়েটা লম্বা গড়নের, গায়ের রঙ ফর্সা, সবচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে মেয়ের হাঁটু ছাড়ানো চুল। একেবারে দীঘল কালো কেশ যাকে বলে। মুখের চেহারা অবশ্য খুব একটা শার্প না। ওর দিকে মুখ তুলে তাকাতেই ও বলে,

-আমার নাম বহ্নিশিখা, এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেমেয়েদের অংক শেখাই।

-ও হ্যাঁ, আপনার নাম অনেকের মুখেই শুনেছি, আপনার সাথে পরিচয় হয় নি।

-পরিচয় হয় নি, কারণ, আমি কারো সাথে খুব একটা মিশতে পারি না, ছোটবেলার অভ্যেস। মিশনারী স্কুলে পড়াশোনা করেছি, খুব বিধিনিষেধের মধ্যে থেকে থেকেই এই অবস্থা। আপনার কন্ঠে খুব পরিচিত গানটি শুনে আবেগ সামলাতে পারলাম না।

-তাই নাকি? কিন্তু আপনি বলছেন, কারো সাথে মিশতে পারেন না, অথচ দেখে মনে হয়, আপনি খুব মিশুক। অনেকের কাছেই শুনেছি, যে কোন বাঙ্গালী অনুষ্ঠানেই আপনি অংশগ্রহণ করেন, মোটা অংকের চাঁদা দেন। মিশুক না হলে কী এগুলো করতে পারতেন?

- আমার মায়ের কাছ থেকে ইনহেরিট করেছি। মায়ের মত এমন খাঁটি বাঙ্গালী আর কোথাও দেখিনি।

-তাই? আপনার মা কোথায় থাকেন?

-আমার মা শান্তির দেশে চলে গেছেন। আপনি যখন গান করছিলেন, আমি যেনো চোখের সামনে আমার মা’কে দেখতে পাচ্ছিলাম। মা এই গানটি খুব বেশী গাইতো, এতো দরদ দিয়ে গাইতো, যে আমার চোখ ভিজে উঠতো।

-আহারে! কবে মারা গেলেন উনি? বাবা বেঁচে আছেন?

-আমার বাবা নেই।

-সরি! এর মধ্যেই বাবা-মা দুজনকেই হারিয়েছেন, শুনে খুব খারাপ লাগছে। বসুন না এই চেয়ারটি তে। আপনার আর কোন ভাই-বোন নেই?

- না, আমি একা। আপনাকে কী বলে সম্বোধণ করলে আপনি খুশী হবেন?

-যে কোন সম্বোধণেই আমি খুশী। আমার এক বন্ধু আছে, নাম পারমিতা, ওকে সবাই ‘দিদি’ ডাকে। ওর ছেলের বয়সীরাও দিদি ডাকে, স্বামীর বয়সীরাও দিদি ডাকে, বাবার বয়সীরাও দিদি ডাকে। হা হা হা হা !!!

-আপনি এতো চমৎকার করে কথা বলেন! তা আপনার বন্ধু কী দেখতে খুব সুন্দরী আর খুব ইয়াং লুকিং লেডী?

-হ্যাঁ, সুন্দরী, তরুণী এবং কর্মঠ। নিউইয়র্কে আছে গত পনের বছর যাবৎ, নিউইয়র্কের প্রতিটি বাঙ্গালী পারমিতা রায় কে চেনে। প্রতিটি সামাজিক কর্মকান্ডে সে আছে, ইদানিং আবার ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিতে’ যোগ দিয়েছে। ছেলেমেয়ে বড় হয়ে গেছে তো, অনেক কিছুই করতে পারে।

- আপনি নিজেও তো খুব সুন্দর দেখতে। তা, আপনার বন্ধু ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’তে আছেন, ঐ কমিটিতে উনার কী কাজ! মানে কী কাজ করেন?

-দেশে তো আলবদর-রাজাকার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছে। পারমিতা নিউইয়র্ক থেকে কাজ করে, হয়তো তথ্য, উপাত্ত দিয়ে সাহায্য করে দেশের মূল ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিকে। আমি খুব বেশী ডিটেলস জানি না।

- আমাকে কি আপনার বান্ধবীর ফোন নাম্বারটা দিতে পারেন? উনার সাথে জরুরী ভিত্তিতে কথা বলতে চাই। এমনই একজনকে আমার খুব প্রয়োজন।

-তা দিতে পারি, কিন্তু কিছু যদি মনে না করেন, প্রয়োজনের ব্যাপারে আমাকে কী একটু হিন্টস দেয়া যাবে? আমি তাহলে পারমিতাকে একটু আগে থেকেই ব্রীফ করে দিতে পারি।

-আপনি জিজ্ঞেস করলেন, আমার বাবা বেঁচে আছেন কিনা! আসলে এর উত্তর আমি নিজেও জানিনা, এমন কি আমার জন্মদাতাকে চোখেই দেখিনি কখনও।

-আরেকটু খোলাখুলি বলা যায়?

-আচ্ছা বলি, চলেন পাশের ক্যাফেটেরিয়াতে গিয়ে কথা বলি, এখানে অনেক মানুষ, যে গল্প আপনাকে শোনাব, সে গল্প সবার সামনে করতে চাই না।

- চলো, ক্যাফেটেরিয়াতে গিয়ে বসি। তুমি করেই বলছি কিন্তু।
- কোন সমস্যা নেই, তুমি অনেক আপন সম্বোধণ। আরেকটু সহজ হতে পারলে আমিও হয়তো আপনাকে তুমি করেই বলবো।


ক্যাফেটেরিয়াতে গিয়ে দু’জনে দু’কাপ কফি নিয়ে বসেছি। বহ্নিশিখা কথা শুরু করেছেঃ

তখন বললাম, আমার মা আপনার গাওয়া গানটি খুব গাইতেন। মায়ের নাম ছিল দীপশিখা বাড়ৈ। বরিশালের মেয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বয়স ছিল বাইশ বছর। বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যাথমেটিক্স অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী তখন। রোকেয়া হলে থাকতেন। উনার বাবা ছিলেন সরকারী অফিসার। ৭ই মার্চের ভাষণের পরেই দীপশিখা তার বাবা মায়ের সাথে ঢাকা ছেড়ে বরিশাল চলে যা্য। অনার্স ফাইন্যাল পরীক্ষার শেষেই তার পছন্দের পাত্রের সাথে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। যার সাথে আমার মায়ের বিয়ে হতে পারতো, তার নাম অঞ্জন, তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফিফথ ইয়ারের ছাত্র, বরিশালের ছেলে। কৈশোরের প্রেম যৌবনে এসে পরিনতি পাওয়ার জন্য প্রস্তুত!

যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, সরকারী চাকুরীতে যোগ দিতে দীপশিখার বাবা কে ঢাকা চলে আসতে হয়। গ্রামে তখনও যুদ্ধের দামামা বাজেনি, দীপশিখা আর তার মা বাড়ীতে ছিল, পাশের গ্রামেই অঞ্জনরা থাকতো। মে মাসের দিকে গ্রামের হাওয়া বদলে যায়, অচেনা লোকের আনাগোনা বাড়তে থাকে, হঠাৎ করেই একদিন গ্রামের পাঁচটি ছেলেসহ অঞ্জন নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। যুবক ছেলে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া মানেই বর্ডার পার হয়ে ইন্ডিয়া চলে যাওয়া, ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযোদ্ধার বেশে দেশের এলাকায় ঢুকে পড়া। অঞ্জন মুক্তিযুদ্ধে গেছে, খবরটি জানাজানি হয়ে যায়। এদিকে দীপশিখার বাবা আটকে যান ঢাকাতে। ফোন ছিল না বলে কারো সাথেই কারো যোগাযোগ ছিল না।

একদিন অঞ্জনের ছেলেবেলার বন্ধু কলিমুদ্দীন আসে দীপশিখাদের বাড়ীতে। সংবাদ দেয়,

-আইজ রাতে অঞ্জন আসবে, খবর পাঠাইছে। তোমারে বলতে বলছে, রাত ঠিক দশটার দিকে পুকুরপাড়ে থাকতে।

কলিমুদ্দীনকে দীপশিখা ভালোভাবে চিনতো, অঞ্জনের ছেলেবেলার বন্ধু, তবে লেখাপড়া বেশীদূর এগোয়নি, বাপের কাপড়ের ব্যবসায় লেগে গেছিল।

মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার দুইদিন আগে পুকুরপাড়েই দীপশিখার সাথে দেখা করেছিল অঞ্জন। তাই কলিমুদ্দীনের কথা শুনে দীপশিখার মনে কোন সন্দেহ হয়নি। রাত দশটার দিকে কলিমুদ্দীন আবার আসে ওকে ডাকতে, দীপশিখাকে ওর পিছু পিছু আসতে বলে। কলিমুদ্দীন সামনে যাচ্ছিল, পেছন পেছন দীপশিখা। হঠাৎ করেই পেছন থেকে কেউ এসে দীপশিখার মুখ জাপটে ধরে, কিছু বুঝে উঠার আগেই আরও দুজন মিলে ওকে জাপটে ধরে একেবারে কাঁধের উপর তুলে দেয় ছুট। নিয়ে তোলে ভাঙ্গা শিব মন্দিরের ভেতর।

বহ্নিশিখা দম নেয়। ওর মুখচোখ লাল হয়ে উঠে। আমি বলি, থাক না হয় আজকে, আমি বোধ হয় বুঝে গেছি, গল্পের শেষে কী আছে!

-না, বুঝেন নি, প্রথমবার মা’কে ধরে নিয়ে ওরা তিনদিন রেখেছিল, আমার দিদিমা শোকে পাথর হয়ে গেছিলেন। ততদিনে পাশের গ্রামের স্কুল দালানে পাকিস্তানী আর্মি এসে আস্তানা গেড়ে বসেছে। গ্রামের যুবক, পুরুষদের মধ্যে থেকে অনেককেই গুলী করে মেরে ফেলেছে, যারা পেরেছে, আগেই পালিয়েছে। কলিমুদ্দীন ততদিনে রাজাকার বাহিণীর সর্দার বনে যায়। গ্রামে গ্রামে ঘুরে মেয়েদের তুলে নিয়ে আসে, মিলিটারী ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়। শুধু আমার মায়ের প্রতি তার দূর্বলতা ছিল বলে তাকে মিলিটারীর কাছে পাঠায়নি। সে ধরেই নিয়েছিল অঞ্জন কোনদিন ফিরবে না, দীপশিখাকে বিয়ে করার জন্য নিজেই তৈরী হচ্ছিল। তার এই দূর্বলতাকে মা কাজে লাগায়। কলিমুদ্দীনকে শর্ত দেয়, অঞ্জনসহ যে পাঁচ পরিবার থেকে ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল, তাদের পরিবারের পূর্ণ নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

হঠাৎ করে একদিন খবর আসে, আমার দাদুকে ঢাকাতেই মিলিটারীরা মেরে ফেলেছে, আমার দিদিমা তো এমনিতে শোকে স্তব্ধ হয়েছিলেন, দাদুর সংবাদ পাওয়ার পর আর বেশীদিন বাঁচেন নি। এদিকে কলিমুদ্দীনের সাথে মা খুব খাতির রাখতো, আর গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগাযোগ করতো। স্কুল বাড়ীর ক্যাম্পের নানা তথ্য পাচার করে দিত, একদিন কলিমুদ্দীনের কাছে ধরা পড়ে যায় মা। শাস্তি হিসেবে মায়ের স্থান হয় স্কুল বাড়ীর মিলিটারী ক্যাম্প।

দেশ স্বাধীন হয়, আমার মায়ের হবুবর বিজয়ীর বেশে ফিরেও আসে। এসে দেখে মায়ের পেটের আয়তন ফুলে ফেঁপে ঢোল হয়ে আছে। পাশের বাড়ীর কাকীমার সাহায্যে আমাকে মায়ের পেট থেকে বের করে আনা হয়। চারদিকে সব কিছু এলোমেলো, কার খবর কে নেয়! আমাকে নিয়ে মা একা, একটা ফুটফুটে শিশুকে গলাটিপে মারতেও পারে না, কোলে নিতেও ঘেন্না করে, মায়ের অবস্থা তখন উন্মাদের মত। অঞ্জন কিন্তু দীপশিখাকে বিয়ে করতে চেয়েছে, কিন্তু মা রাজী হয়নি কিছুতেই।

একদিন বিদেশী মানবাধিকার সংস্থার টীম বরিশালের আগৈলঝরা গ্রামে এসে পৌঁছায়। মা ছিল গ্রামের সবচেয়ে সুন্দরী, শিক্ষিত মেয়ে, তার সাথে কথা বলে টিমের সদস্যদের মধ্যে দারুণ প্রতিক্রিয়া হয়। মায়ের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, কোন পিছুটান না রেখে আমাকে কোলে করে মা ওদের সাথে সমুদ্র পাড়ি দেয়। বাকী জীবন মা বিয়ে করেনি, আমেরিকা এসে সেই টিমের সাথে নানা দেশ ঘুরে ঘুরে কাজ করতে থাকে। একটি আমেরিকান পরিবারের সাথে ঘর শেয়ার করে আমরা থাকতাম। মা আমাকে বাংলা বলতে ও পড়তে শিখিয়েছেন, একা হলেই মা রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর ভাঁজতেন, দেশাত্মবোধক গান গাইতেন। আপনি যে গানটি গাইলেন, এই গানটি গাইতেন আর অঝোরধারায় কাঁদতেন। মা আর কোনদিন দেশে ফিরে যান নি। পাঁচ বছর হলো মা মারা গেছেন, আমার জন্য রেখে গেছেন একখানি ডায়েরী। সেই ডায়েরী পড়েই জানতে পারি, আমার বাবা বলে কেউ নেই এবং আমি একজন যুদ্ধশিশু। আমার বহ্নিশিখা নামটি মায়ের দেওয়া। আমি সেই থেকে সুযোগ খুঁজছি, ডায়েরী নিয়ে দেশে যাব, গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কাছে তা জমা দেবো, নিজের পরিচয় দেবো মুক্তিযোদ্ধা দীপশিখা বাড়ৈএর সন্তান হিসেবে।

আমাকে আপনার বন্ধুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিন। কলিমুদ্দীনকে খুঁজে বের করবো, আমার নামের মাঝেই আমার মা ‘আগুন’ জ্বেলে গেছেন, সেই আগুনে পুড়িয়ে মারবো কলিমুদ্দীনদেরকে। আর খুব ইচ্ছে, আমার হলেও হতে পারতো মুক্তিযোদ্ধা বাবাকে এক নজর দেখে আসার”।



বহ্নিশিখাকে তোর মোবাইল নাম্বার দিয়েছি, যে কোনদিন ওর কল পাবি। কল পেয়ে চমকে উঠিস না। আমার মনে হয়, ওর ভাগ্যই ওকে আমার কাছে নিয়ে এসেছিল সেদিন। আমি জানি, তোর সাথে যোগাযোগ হলে ওকে আর খুব বেশী কষ্ট করতে হবে না।

এবার বল, তুই কেমন আছিস? সেদিন বলেছিলি, ক্রনিক ইউ টি আই সমস্যায় কষ্ট পাচ্ছিস। ডাক্তার দেখা ভালো করে। মেয়েদের এই ইউরিন ইনফেকশান সমস্যাটা অনেকটাই মৌলবাদী রাজনীতির মত, বাইরে থেকে এদের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ টের পাওয়া যায় না, ভেতরে ভেতরে কুরে কুরে শেষ করে দেয়। অবহেলা করিস না, ডাক্তার দেখা। দাদাকে আমার নমস্কার জানাস। সামাজিক কর্মকান্ড করতে গিয়ে উনাকে না খাইয়ে মারিস না। একবেলা অন্তঃত রান্না করিস। আগে ঘর, পরে তো দেশ!

মানসী





দুই

চিঠি পড়ে পারমিতা বেশ কিছুটা সময় চুপ করে বসে থাকলো। মানসী তার জন্য কত বড় এক কাজ পাঠিয়েছে। বহ্নিশিখা অলরেডী ফোন করেছিল, পারমিতা বাড়ী ছিল না। বহ্নিশিখা ভয়েস মেসেজ রেখেছে, ওর সাথে কথা বলতে চায়। বাংলাতেই রেখেছে মেসেজ, পরিষ্কার উচ্চারণে, পারমিতা এখনও কল ব্যাক করে নি। এমন অনেকেই ওকে ফোন করে, নানারকম সমস্যার কথা বলে। এটাও তেমনই একটা কল ভেবেছিল ও। আজ মানসীর চিঠি পেয়ে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেছে।

মানসীটা যে কী করে, পারমিতাকে সবার কাছে হিরো সাজাতে চায়। নিজে ক্রেডিট নিতে চায় না। হুট করে বহ্নিশিখাকে বলে দিল, পারমিতার সাথে যোগাযোগ করার জন্য, ও মেয়ে হয়তো ভেবে বসে আছে, পারমিতা অনেক কিছু করতে পারবে। তবে এটা ঠিক, পারমিতার মধ্যে ‘শেষ দেখে ছাড়বো’ ধরণের জেদ কাজ করে। মানসী যতটা আবেগ নিয়ে, আশা নিয়ে বহ্নিশিখাকে ওর কথা বলেছে, ও আপ্রাণ চেষ্টা করবে মেয়েটাকে সাহায্য করতে। মানসীকে চিঠির উত্তর দিতে হবে। গুড্ডুর আসার সময় হয়নি, পিয়ানো লেসন নিয়ে ওর পাপার সাথেই ফিরবে, হাতে সময় আছে, চিঠিটা এখনই লিখে ফেলা যায়।


মানসী,

তোর চিঠি পেলাম। চিঠি পাওয়ার আগেই ভয়েস মেসেজে বহ্নিশিখার খুব ছোট্ট মেসেজ পেয়েছিলাম। কল ব্যাক করা হয় নি। আজ তোর চিঠি পড়ে বিশদ জানলাম। চিঠির বিষয় নিয়ে আর কিছু লিখছি না, চিঠিটা পড়ে আমাদের কিশোরীবেলার একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে গেলো। আশা করি, তোরও মনে আছে সেদিনের সেই ঘটনা।

১৯৭৭ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারীর সকালে আমরা শাড়ী পরে স্কুলে হাজির হয়েছিলাম। সেদিনই প্রথম শাড়ী পড়ে ঘরের বাইরে কোথাও যাওয়া। এখন এই মধ্য বয়সে এসে বুঝতে পারি, সেই তেরো-চৌদ্দ বছর বয়সে কী ভাবাবেগ নিয়ে কাটিয়েছি। সবেমাত্র ক্লাস নাইনে উঠেছি, মনের মধ্যে পরিবর্তন টের পেতে শুরু করেছি। কৈশোরের প্রেম উঁকী মারে, অল্পেই মুখ চোখ রাঙা হয়ে উঠে, সে কী অনুভূতি আর আবেগ তখন। এগিয়ে এসেছে ২১শে ফেব্রুয়ারী, আমরা কয়েকজন মিলে ঠিক করেছিলাম, শাড়ী পড়ে প্রভাত ফেরীতে যাবো। সমস্যা হয়েছে, শাড়ীর সাথের অনুষঙ্গে অভাব দেখা দেয়ায়। শাড়ীতো সবার বাড়িতেই আছে, কিন্তু ব্লাউজ, ব্রা, পেটিকোট তো আমাদের ছিল না। তখনও আমরা স্কার্ট, ব্লাউজ, আর মায়ের হাতে সেলাই করা সেমিজ পড়তাম। মনে আছে তোর, তুই তোর বড় আপার তিনটি ‘ব্রা’ লুকিয়ে এনেছিলি তোর, আমার আর সীমার জন্য? আর আমি এনেছিলাম মায়ের পেটিকোট। ছেলেদের যেমন বিড়ি বা সিগ্রেটে টান দিলেই নিজেদেরকে ‘হিরো’ মনে হয়, মেয়েদের বেলাতেও মনে হয় বড়দের মত ব্রা, ব্লাউজ সহ শাড়ী পড়তে পারলে নিজেদেরকে ‘নায়িকা’ মনে হয়। হা হা হা!! আমি আর তুই কীভাবে যোগাড় করেছিলাম সবকিছু, সেগুলো মনে পড়লে এখনও হাসি পায়।

শাড়ী পড়ে তো প্রভাত ফেরী করলাম, বাড়ী ফেরার পালা এবার। কিন্তু এত সহজেই শাড়ী বদলাতে ইচ্ছে হলো না, আরও কিছুটা সময় শহীদ মিনারের পাদদেশে কাটাতে চাইলাম। আমাদের শহীদ মিনারের মূলস্তম্ভে শ্বেত পাথরে লেখা ছিল,

.।।.....................।“ মোদের গরব, মোদের আশা
...........................।।আ’মরি বাংলা ভাষা”।

ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল ছিলাম আমি, তুই ছিলি সেকেন্ড গার্ল। বন্ধু গ্রুপের সকলেই আমাদের দু’জনকে খুব মান্য করতো। আমি বলেছিলাম,“এখনই বাড়ী যাবো না, আজকে শহীদ দিবস, বাড়ী বসে থেকে কী করবো? আয়, আজকে এমন কিছু করি, যাতে শহীদের প্রতি সম্মান দেখানো হয়”। সবাই আমাকে সমর্থণ জানালো।

কোন পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই আমি তোদের সবাইকে নিয়ে মিনারের মূলস্তম্ভের পাদদেশে গিয়ে দাঁড়ালাম। বললাম,

“আয়, আমরা আজকে শপথ নেই, জীবনেও কোন অন্যায় করবো না, কাউকে ঠকাবো না, মানুষের মত মানুষ হতে চেষ্টা করবো। আয়, আরও বলি, সহজে প্রেম করবো না, আর যদি কারো সাথে প্রেম হয়েই যায়, তাকেই বিয়ে করবো, প্রতারণা করবো না। বাবা, মায়ের কথা শুনবো, শহীদদের সম্মান করবো”।


কী যেনো কী হলো, সকলেই কেমন যেনো নেশাগ্রস্তের মত কথাগুলো উচ্চারণ করে গেলো। মানসী, আমাদের সেদিনের শপথের সম্মান কিন্তু আমরা রেখেছি, গ্রুপের আর সবার কথা বাদ দেই, সবাই স্বামী নিয়ে সুখে আছে। শুধু ফারিয়া আর সীমার কথা আলাদা। সীমা অসবর্ণ ছেলের সাথে প্রেম করেছিল, সেই প্রেমিককে বিয়েও করেছিল। বিয়ের কয়েক বছর পর ওর স্বামী ওকে ছেড়ে চলে যায়। সীমা ছিল ব্রাহ্মণের মেয়ে, ওর বাবা এই অসবর্ণ বিয়ে মেনে নিতে পারেননি, মেয়েকে ত্যাজ্য করেছেন। তবুও সীমা ভেঙ্গে পড়ে নি। দুইটা মেয়ে আছে ওর, এখন বড় হয়েছে ওরা, দু’জনেই ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করছে ইউনিভার্সিটিতে। দ্যাখ, শহীদ মিনারের শপথের কী শক্তি! আর ফারিয়া? শপথ ভেঙ্গে কত ছেলের সাথে যে ও প্রেম করেছে, তাদের একজনকেও বিয়ে করেনি। যাঁর সাথে বিয়ে হয়েছে, উনি খুবই ভালো মানুষ, শিক্ষিত, ভদ্র। অথচ ফারিয়া তাঁর সাথে যাচ্ছে তাই আচরণ করে। নিউইয়র্কেই থাকে ওরা। মাঝে মাঝে ওর সাথে কথা হয়, অনেক বুঝিয়েছি। কে শোনে কার কথা! আমার কথা তুই জানিস, শামীম আর দেবাশিস, দু’জনেই পাগল ছিল আমাকে বিয়ে করার জন্য। কিন্তু আমি জানতাম, আমাদের পরিবার থেকে প্রেমের বিয়ে মেনে নিবে না, তাই ওদের ডাকে সাড়াই দেই নি। বাবার পছন্দ করা পাত্রের সাথে বিয়ে হয়েছে, শপথ ভাঙ্গিনি বলেই হয়তো ভালো আছি সেই থেকে।

কী অবাধ স্বাধীনতা পেয়েছি, তুই আর আমি। এত বছর বিদেশে পড়ে আছি, ছেলেমেয়েদের সবকটাকে ঘাড়ে ধরে বাংলা শিখিয়েছি, তুইও একই কাজ করেছিস। এখন চেষ্টা করছি, দেশের জন্য ভালো কিছু করতে। শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে শপথ করেছিলাম, এতো সোজা কথা নয়। তোর সুযোগ কম, আমার এখানে অনেক বেশী সুযোগ। ভালো কাজ করতে চাইলে করা যায়। আমি আমার ক্ষুদ্র ক্ষমতাবলে দেশের জন্য সম্ভাব্য সবরকম ভালো কাজে অংশগ্রহণ করি। নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি সমর্থণ থাকলেও কাজ করি সবার সাথে। আমি সব রাজনৈতিক দলের অনুষ্ঠানে যাই, চেষ্টা করি ভালো মানুষদের সাথে যোগাযোগ করতে।


আসলে আমাদের ইচ্ছে ও চেষ্টা দুইই আছে, একটু সুযোগের অপেক্ষায় থাকি। আজকে তোর চিঠি পড়ে সেই শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে যে শপথ করেছিলাম, সেই কথা মনে পড়ে গেলো রে! বহ্নিশিখাকে আমি আমার সাধ্যের বাইরে গিয়ে হলেও সাহায্য করবো। তোকে আমার ভালোবাসা, সেই শহীদ মিনারের ভালোবাসা। সুযোগ কম, তারপরেও খুঁজে খুঁজে সুযোগ বের করিস। কবীর ভাইয়ের মত বন্ধুস্বামীকে পাশে পেয়েছিস, তোর পাগলামী সহ্য করে যায়। আর আমার স্বামীর কথা কী আর বলবো, বাংলা মায়ের ছেলেরা এমনই ভালো হয়, তাদেরকে ভালো হতেই হয়।

তুই সব সময়েই ভালো থাকিস জানি, তবুও আরও ভালো থাক, এই প্রার্থণা করি। আমি ডাক্তারের কাছে যাবো, নাহলে আগামীর ‘বহ্নিশিখাদের’ দেখবো কী করে!

** বিঃদ্রঃ হাঁদারাম, বহ্নিশিখার বয়স আমাদের কাছাকাছি হয় কী করে? ওর জন্ম হয়েছে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে। ও যুদ্ধ দেখেনি, কিন্তু যুদ্ধের কালিমা, বীর জননীর রক্ত শরীরে নিয়ে জন্মেছে, ও আমাদের চেয়ে ছয় কি সাত বছরের ছোট হবে। অংকে তুই বরাবর কাঁচা রয়ে গেলি। গাধা কোথাকার! আরেকটি কথা বলতে ভুলে গেছি, তুইই ঠিক বলেছিস, দীপশিখা বাড়ৈ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, বহ্নিশিখা উনার উত্তরসূরী। ভেবে দ্যাখ, কত যত্নে, পরম মমতায় তিনি বাংলাকে লালন করেছিলেন, মেয়েও হয়েছে তেমনই, একেবারে অগ্নিমায়ের অগ্নিকন্যা!

পারমিতা
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন