বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫
গল্প/কবিতা: ৫৩টি

সূতোর প’রে যে জীবন

আমার আমি অক্টোবর ২০১৬

ভালোবাসার অন্তরালে

ঘৃণা সেপ্টেম্বর ২০১৬

মন দোলা

ঘৃণা সেপ্টেম্বর ২০১৬

গল্প - প্রেম (ফেব্রুয়ারী ২০১৭)

মোট ভোট কোথায় পাব তারে

রীতা রায় মিঠু
comment ০  favorite ০  import_contacts ৪২
“আমি কোথায় পাব তারে
আমার মনের মানুষ যে রে”
পাশের রুম থেকে ভেসে আসছে গান, সাথী গাইছে। এঘর থেকে রোদেলা মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। সাথী যখন গায়, পৃথিবীতে নিঃস্তব্ধতা নেমে আসে, সাথীর ধ্যানমগ্ন কন্ঠ ছাড়া আর কোথাও কোন শব্দ শোনা যায়না। সাথী এমন বিভোর হয়ে গাইছে, মনে হচ্ছে যেন বিরহিণী রাধা কেঁদে ফিরছে শ্যামের লাগি।
রোদেলা বুঝতে পারে, দিদির জীবনে কিছু একটা ছন্দ পতন হয়েছে। ওর ইচ্ছে করছিল দিদির সাথে কন্ঠ মেলাতে, কিন্তু রোদেলার কন্ঠে সুর নেই। গুন গুন করার একটু চেষ্টা করতে গিয়ে মনে হলো, গান ওর জন্য নয়।
দিদির কন্ঠ অমন সুরেলা হবেনা কেন, ছোটবেলা থেকেই রোদেলা তার দিদিকে দেখেছে সকাল- সন্ধ্যা নিয়মিত হারমোনিয়ামে রেওয়াজ করতে। মাঝে মাঝে তানপুরাও বাজাতো। চিত্তরঞ্জন দাদুর কাছে গান শিখতো দিদি, মা রোদেলাকে অনেক সাধাসাধি করতো দাদু এলে দিদির পাশে বসে গান শেখার জন্য। কেন জানি রোদেলার কাছে এই গান শেখার ব্যাপারটি অসহ্য মনে হতো। হারমোনিয়ামে প্যাঁ পোঁ আওয়াজ শুরু হওয়ার আগেই রোদেলা ছুটে পালাতো। মা’কে বলতো, “ মা, গান ভালো লাগেনা। আমি গান শিখবোনা”।


সাথী আর রোদেলা দুই বোন, ওদের ভাই নেই। কলকাতার রিষড়াতে ওদের বাড়ি। সাথী শান্তিনিকেতনে থেকে লেখাপড়া করেছে, পরে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সঙ্গীতে উচ্চশিক্ষা নিয়েছে। আর রোদেলা যাদবপুর ইউনিভারসিটি থেকে বাংলায় এম এ করেছে। দুই মেয়েকে ভাল ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে বাবা মা কাশীবাসী হয়ে গেছেন। সাথীকে অবশ্য বাবা মা বিয়ে দেননি, সাথী নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছে। সাথীর বর জ্যাকব কেরালার ছেলে, খৃষ্টান ধর্মের হলেও অনেকটাই এথিস্ট টাইপের। ধর্ম নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই, ওরা কোর্টে ম্যারেজ করেছে। বিয়ের সময় ইন্ডিয়া টাইমসের রিপোর্টার ছিল জ্যাকব, এখন আনন্দবাজারে উপসম্পাদক হিসেবে কাজ করছে। আর সাথী গান নিয়েই ছিল, মাঝে চানক্য হলো, চানক্যকে লালন পালন করতে গিয়ে গানে বিরতি দিয়েছিল। চানক্যকে দার্জিলিং পাঠিয়ে দেয়ার পর দিদি নতুন করে গানে মন দিয়েছে। এখন দিদি গান নিয়ে খুব ব্যস্ত, মাঝে মাঝেই বাংলাদেশে যায় প্রোগ্রাম করতে।
আর সাথীর বিয়ে হয়েছে বাবা মায়ের পছন্দ করা ছেলের সাথে। পিদিম পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, বড় কোম্পানীতে বড় বেতনের চাকরি। ট্র্যান্সফারেবল জব, কত বড় বড় শহরে ওকে ট্র্যান্সফার করা হয়, পিদিমের সাথে সাথী জায়গায় জায়গায় বসত গাড়ে। ওদেরও এক ছেলে, নাম প্রতিম। প্রতিমকে নিয়ে অবশ্য ওদের তেমন চিন্তা হয়না, যখন যে শহরে পিদিমের ট্র্যান্সফার হয়, সেই শহরের সবচেয়ে ভাল স্কুলে প্রতিমের ভর্তির ব্যবস্থা পিদিমের কোম্পানী থেকেই করে দেয়া হয়।
সাথী আর রোদেলার বয়সে পার্থক্য সাত বছর। ফলে দুই বোনে চুলোচুলি হয়নি কোনদিন, রোদেলাকে পেয়ে সাথী খুব খুশী হয়েছিল। রোদেলাকে পুতুল মনে করতো সাথী, ওভাবেই রোদেলা বড় হয়েছে দিদির কোলে চড়ে। দুই বোনের মধ্যে রোদেলা এক কথায় সুন্দরী, সাথির গায়ের রঙ চাপা বলে প্রথম দেখায় কেউ ওর সৌন্দর্য বুঝে উঠতে পারেনা। সাথীর সৌন্দর্য সাথীর অপূর্ব দেহবল্লরীতে, সাথীর স্নিগ্ধ স্বভাবে এবং মায়াবী দুটি চোখে খেলা করে যায়। মা মাসীদের বুঝবার সাধ্য নেই সাথীর রূপে কখন কার মনে তড়িৎ খেলে যায়। রোদেলা সুন্দরী বলে পাড়ার ছেলেরা সেই ছোট বয়স থেকেই পিছু নিয়েছিল। কিন্তু রোদেলার মায়ের তীক্ষ্ণ নজরের কাছে কেউ তেমন সুবিধা করতে পারেনি। সাথীর বেলায় অন্যরকম ঘটেছিল, সাথীকে পাড়ায় সবাই ভালোবাসতো, বড় হয়ে ওঠার আগেই সাথীকে মা শান্তিনিকেতনে পাঠিয়ে দেয়। দুই মাসে তিনমাসে দুই একদিনের জন্য সাথী বাড়ি আসতো, আর সামার ভ্যাকেশানে আসতো। তখন সাথী গান নিয়েই মজে থাকতো, পারার ছেলেরা পাবে কোথায় সাথীকে। জ্যাকবের সাথে খুব সম্ভব স্কুল জীবনের শেষদিকে পরিচয়, এরপরে প্রেম। জ্যাকব কেরালার ছেলে হলেও দুই পুরুষ ধরে কলকাতায় বাস ওদের, ফলে ভাল বাংলা জানে। দিদি যখন জ্যাকব দাদাকে বিয়ে করবে বলে জানিয়েছিল, মা বেঁকে বসেছিল। কিছুতেই এ বিয়ে হবেনা বলেছিল, কিন্তু দিদি কখন জানি জ্যাকব দাদার সাথে রেজিস্ট্রি বিয়ে করে ফেলেছিল তা রোদেলা বলতে পারেনা। পরে অবশ্য ধীরে ধীরে মা মেনে নেয়, অথবা মেনে নিতে পারেনি বলেই কাশী চলে যায় কে জানে! রোদেলার বিয়ে হওয়ার আগেই মা কাশীতে বাড়ি দেখা শুরু করেছিল, রোদেলার বিয়ে হতেই মা বাবা চলে গেলো। রোদেলা বছরে একবার যায় মা বাবার সাথে দেখা করতে, সাথীও যায় মাঝে মাঝে। তবে দিদির কাছে বছরে দুইবার রোদেলার আসা চাইই চাই।
রোদেলার বর পিদিমের পোস্টিং এখন শিলিগুড়িতে, তাতে সবচেয়ে খুশী হয়েছে সাথী। খুব খুব খুশী কারণ চানক্য যে স্কুলে পড়ে, প্রতিমকেও সেই স্কুলেই ভর্তি করা হয়েছে। এখন মাসে দুমাসে একবার রোদেলা চানক্যকে দেখতে যেতে পারবে। চানক্য দার্জিলিং সেন্ট পল’স স্কুলে টুয়েলভ ক্লাসে পড়ছে। এটাই ওর শেষ স্কুল বর্ষ। চানক্যকে ওর বাবা সাথীর অনিচ্ছা স্বত্বেও সেই কিশোর বয়সেই দার্জিলিং পাঠিয়ে দিয়েছিল। জ্যাকব কাজ করে প্ল্যান অনুযায়ী, চানক্যকে নিয়ে তার পরিকল্পনা একেবারে পাক্কা। দার্জিলিং কনভেন্ট স্কুলে যখন অ্যাডমিশান হয়ে গেলো চানক্যর, পর পর তিন রাত সাথী ঘুমাতে পারেনি। কিন্তু জ্যাকবের পরিকল্পনায় বাধাও দেয়নি, সাথীর অভিমান খুব তীব্র। আত্মসম্মানবোধ আরও বেশী তীক্ষ্ণ! জ্যাকব বুঝতেই পারলোনা সাথীর বুকের মধ্যে ব্যথা কেমন মুচড়ে মুচড়ে উঠেছিল।

দিদির বাড়িতে বেড়াতে আসার কথা উঠলেই রোদেলার মন তা ধিন তা ধিন নেচে উঠে। কী যে ভাল লাগে দিদিকে, দাদাবাবুকে সে আর বলার নয়। আর কিউট বাবুসোনা চানক্যের জন্যতো মন ভরা ভালোবাসা আর ভালোবাসা। চানক্য এখন অনেক বড় হয়ে গেছে, আগামী বছর হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষা দিবে, ওকে বাবুসোনা বলে ডাকলে লজ্জা পায়। সেদিন ওর স্কুলে গেছিল, প্রতিম খুব খুশী চানক্য দাদাকে পেয়ে, চানক্যও খুশী প্রতিম ভাইয়াকে পেয়ে। চানক্যকে যখন রোদেলা বলল, “ বাবুসোনা, তুইতো বেরিয়ে যাবি সামনের বছর, ভাইয়াকে তুই একটু এই স্কুলের অলিগলি ভাল করে বুঝিয়ে দিস।“
বাবুসোনা ডাক শুনেই মনে হয় চানক্য লজ্জা পেয়েছিল। কী মিষ্টি লাগছিল দেখতে, চানক্য বাবা মা মিলিয়ে চেহারা পেয়েছে। বাবার মত লম্বা, মায়ের বিখ্যাত হাসি মিলিয়ে চানক্য খুব হ্যান্ডসাম হয়ে উঠছে।



দিদির গানের রেওয়াজ শেষ হয়ে আসছে, রোদেলা কিচেনে গেলো। দারুণ করে চা বানাবে এখন, দুই বোনে চুক চুক করে চা খাবে আর গল্প করবে। দাদাবাবু এক সপ্তাহের জন্য কাশ্মীর গেছে, বাড়িতে দিদি আর রোদেলা। দাদাবাবু ফিরে আসার তিনদিন পর রোদেলা শিলিগুড়ি ফিরে যাবে।




দুই


রোদ, আজকাল তোকে সারাক্ষণ ফেসবুকে দেখি, ব্যাপার কি বলতো? কারো প্রেমে টেমে পড়িসনি তো!
আমি কারো প্রেমে পড়িনা, অন্যে আমার প্রেমে পড়ে।
অন্যে তোর প্রেমে পড়ে সে তো তোর ছেটবেলা থেকেই দেখছি। তোকে নিয়ে মায়ের কত দুশ্চিন্তা ছিল, পরীর মত সুন্দরীকে বাগে না পেয়ে আক্রোশ মেটাতে কে কখন মুখে এসিড ফ্যাসিড ছুঁড়ে মারে!
হা হা হা! দিদি, উফ! সেসব দিনের কথা ভাবলে আমার এখনও হাসি পায়। মা আমাকে এত্ত জ্বালিয়েছে! মায়ের ভয়ে কোন ছেলের দিকে চোখ তুলে তাকাতেই পারিনি। তোমাকে কিন্তু মা আমার মত জ্বালাতন করেনি।
আমাকে নিয়ে মায়ের ভয় ছিলনা, আমি তো তোর মত সুন্দরী ছিলামনা, পাড়ার ছেলেরা কেউ রাতের বেলায় জানালার কাছে ঘুরঘুর করতো না।
বেশী বকোনা দিদি, তুমি সুন্দরী ছিলেনা আবার! তুমি তো হটপ্যাটিস ছিলে! হটপ্যাটিস বলেই রোদেলা থমকে গেলো, দিদিকে হটপ্যাটিস বলা উচিত হয়নি। দিদি কি মনে করবে! রোদেলা কখনও রকের ভাষায় কথা বলেনা। আজ মুখ ফসকে বেরিয়ে গেলো।
হটপ্যাটিস কথাটা পিদিম বলেছিল। পিদিমের সাথে একদিন মেয়েদের রূপ দেখে ছেলেদের পাগলামী নিয়ে হাসি ঠাট্টা করছিল রোদেলা। রোদেলা বলেছিল, “ জানো, আমার মায়ের মনে খুব দুঃখ ছিল। একই পেটে জন্মেও এক মেয়ে ফর্সা টুকটুকে হয়েছে, আরেক মেয়ে হয়েছে চাপা বর্ণের। আমার পেছনে পাড়ার ছেলেরা এমন ঘুরঘুর করতো, আজ একে দিয়ে চিঠি পাঠাতো, কাল ওকে দিয়ে গল্পের বই, সিনেমার টিকেট পাঠাতো। অতিষ্ঠ হয়ে মা বলতো, “ আগে মনে করতুম, সাথীটা যদি আমার গায়ের রঙ পেতো, বিয়ের জন্য টাকা জমাতে হতোনা। এখন রোদেলাকে নিয়ে এমন জ্বালা হয়েছে, এই মেয়ে গৌর বর্ণ পেয়ে আমার রাতের ঘুম নষ্ট করে দিয়েছে। পাড়ার ছেলেদের যন্ত্রণায় আর বাঁচিনা, রাত দুপুরে জানালার কাছে ঘুরঘুর করে। তার চেয়ে রোদেলাও যদি সাথীর মত বাপের গায়ের রঙ পেতো, আমি শান্তিমত ঘুমুতে পারতাম।
তখন পিদিম মজা করে বলেছিল, “ তোমরা দুবোন দুই রকমের সুন্দর। উদাহরণ দিচ্ছি, তুমি সুন্দরী, একেবারে ঠান্ডা কুলফির মত, গরমের দিনে খেতে মজা। আর দিদিভাই তোমার মত সুন্দরী না হলেও অনেক ছেলেদের কাছে বেশী আকর্ষণীয়া, একেবারে হটপ্যাটিসের মত।“
পিদিমের কথা প্রথমে বুঝতে পারেনি রোদেলা, কিন্তু এটুকু বুঝেছে পিদিমের কাছে রোদেলার চেয়ে দিদিকেই বেশী সুন্দর লাগে। তবুও হটপ্যাটিসের মানে জানতে চেয়েছে। পিদিম কিন্তু ভীষণ ভাল ছেলে, দিদি সম্পর্কে অমন বলে নিজেই জিভ কেটেছে। তারপর অনুনয়ের সুরে বলেছে, “ রোদেলা, আমি কিছু খারাপ ভেবে বলিনি কথাটা। তুমি আমার বউ, দিদিভাই আমার বড় শ্যালিকা। বউ আর শ্যালিকাকে নিয়ে একটু আধটু ইয়ার্কি করতেই পারি। কি বলো, পারিনা?

তাই বলে তুমি দিদিকে হটপ্যাটিস বলবে? হটপ্যাটিস মানে কি?
হা হা হা! হটপ্যাটিস হচ্ছে হটপ্যাটিস, কোন মানে নেই। শোন, পুরুষের কাছে মেয়েদের সৌন্দর্য দুই রকম, একটা সৌন্দর্য দেখলে পুরুষ শুধু বলে ‘ আহা, কী সুন্দরী, বউ হলে কত ভাল হতো! আরেক সৌন্দর্য দেখলে পুরুষ বলে, “ ইস! মাইরী বলছি, কী আবেদনময়ী, পুরোপুরি টরেটক্কা। একেবারে হাজার ভোল্টেজের বাতি। একবার ছুঁতে পারলে হতো, জল দিয়ে গিলে ফেলতাম”।

ছি ছি, এসব কি বলো!

শোন রোদেলা, মজা করেছি একটু। আমার কাছে তুমি হচ্ছো স্বচ্ছ সরোবর, ওকে? আমি তোমাতে ডুব দিয়েছি, আর ভাসবোনা। ওকে?
ফাজলামো ছাড়ো, এখনও বলোনি দিদিকে হটপ্যাটিস বললে কেন?
দিদিভাইও সুন্দরী, তবে একটু ‘ইয়ে’ আর কি! মানে, সুপার হট। এই হট থেকেই হটপ্যাটিস। আমাদের আই আই টির বন্ধুরা দিয়েছিল এই নাম। কোন সেক্সী মেয়ে দেখলেই বলতাম ‘হটপ্যাটিস’।

এ মা! এতক্ষণে বুঝলাম, তুমি আমার দিদিকে সেক্সী বলছো? দিদি যে তোমার থেকে বয়সে এক বছরের বড়!

সেক্সী চেহারা হওয়া খারাপ কিছু তো নয়। ছেলেরা পছন্দ করে।
তার মানে তুমি আমাকে পছন্দ করোনা?
তোমার মত সুন্দরীকে শুধু আমি কেন, মা মাসীমা, পিসীমা থেকে শুরু করে সকলেই সুন্দরী বলবে, কিন্তু দিদিভাইকে সবাই সুন্দরী বলবেনা, যারা দিদিভাইয়ের সৌন্দর্য্য বুঝতে পারবে তারাই শুধু দিদিভাইকে সুন্দরী বলবে। জ্যাকব দাদাকে জিজ্ঞেস করে দেখো, জ্যাকব দাদা দিদিভাইয়ের প্রেমে পড়েছিল কি দেখে? এবার আসল কথা বলি, দিদিভাইকে আমি অন্য কারণে পছন্দ করি, দিদিভাইয়ের ব্যক্তিত্ব। আমি এত পছন্দ করি দিদিভাইয়ের প্রতিটি বিষয়, কথা বলা থেকে শুরু করে গান, এরপর বাহারী রান্না, সবশেষে নিজের সামনে পাতলা একটি দেয়াল তুলে রাখার কৌশল, কেউ সেই দেয়াল অতিক্রম করতে পারবেনা।


রোদেলার মুখে ‘হটপ্যাটিস’ শুনে সাথীর যতখানি চমকে ওঠার কথা ছিল, সাথী ততটা চমকায়নি। যদিও রোদেলা খুবই সরল সহজ আদুরে মেয়ে একটা, এসব রকের ভাষা ওর বলার কথা নয়, তবুও আজকাল রোদেলা খুব ফেসবুকের পোকা হয়ে উঠেছে। এসব বিটকেলে শব্দ ফেসবুক থেকে পেয়েছে।
সাথী বলল, “ রোদ, আজকাল খুব বেশী সময় দিচ্ছিস ফেসবুকে, এরই ফল এটা। দিদিকে কেউ হটপ্যাটিস বলে?
-সরি, দিদি মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। ঠিকই বলেছো, ফেসবুক থেকেই শিখেছি হটপ্যাটিস।


তুমি আর ফেসবুকে যাওনা কেন?
ঐ যে, সবাই আমাকে হটপ্যাটিস ভেবে বসে থাকে।
যাও দিদি, মুখ ফসকে বলে ফেলেছি, এর মানে এই নয় যে তোমাকে বলেছি।
নারে, ফেসবুকে আমার আর ভালো লাগেনা, অনেক সময় চলে যায়। আমি ইদানিং যখন অবসর পাই গান নিয়ে কাজ করি। তুই ফেসবুকে এত থাকিস, দেখিস কখন কার পাল্লায় পড়ে যাস। শেষে পিদিমের বিপদ হবে।
কী যে বলোনা, এই বয়সে আবার কার পাল্লায় পড়তে যাব। তবুতো তুমি দাদাবাবুর সাথে প্রেম করেছো, আমাকেতো মা কোন সুযোগই দেয়নি প্রেম করার। আমি বুঝতেও পারবোনা বন্ধুদের কে আমার সাথে প্রেম করতে চাইছে আর কে চাইছেনা।
আহা! নেকু এসেছে। সে বুঝতে পারবে না কোনটা প্রেম, কোনটা প্রেম নয়। শোন, প্রেম বলে কিছু নেই, কাম আছে, প্রেম নেই।
দিদি, দাদাবাবুর সাথে তোমার কি ছিল গো? একেবারে এন্টনি ফিরিঙ্গির গল্প! প্রেম নাথাকলে কি করে পেরেছিলে বাবা মায়ের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে দাদাবাবুকে বিয়ে করতে?
হুম! তখন মনে হয়েছিল প্রেমে ডুবে গেছি, ধীরে ধীরে বুঝেছি, প্রেম কিছু নয়, তোর দাদাবাবুও আমাকে হটপ্যাটিস ভাবে।
দিদি, এই কান ধরলাম, আর মুখ ফসকে কিছু বলবোনা। তবুও তুমি বার বার হটপ্যাটিস বলো না তো।
রোদ, মুখ ফসকে সত্যি কথা বলেছিস রে। আমি কি সাধে ফেসবুক ছেড়েছি? কথা নেই বার্তা নেই, হাঁটুর বয়সী ছেলেপুলেও আমাকে ইনবক্সে অশ্লীল ছবি পাঠাতো, আমাকে নোংরা প্রস্তাব দিত। হটি, সেক্সিতো বলতোই। তবে ‘হটপ্যাটিস’ শুধু তুইই বললি, মজা লেগেছে আমার।

দু বোনে রাতের খাবার খেতে বসেছিল একসাথে, সাথীর খাওয়া হয়ে গেছে কিন্তু রোদেলার প্লেটে ভাত, মুরগীর ঝোল যেমনটা তেমনই আছে।

সাথী বলল, এই পাগলী, প্লেটের ভাত ঠান্ডা হয়ে গেছে তো। যা, মাইক্রোওয়েভ ওভেনে দিয়ে ত্রিশ সেকেন্ড গরম করে নে। আর কথা নয়, খাওয়ার সময় মা কথা বলতে বারণ করতো, মনে আছে?
খুব মনে আছে, মায়ের বারণ আমরা খুব শুনতাম, তাইনা?
হা হা হা হা! সত্যি, মা আমাদের সাথে পেরে উঠতো না। যা, ভাতটুকু গরম করে আন। আমি বসছি তোর সাথে, তুই আরাম করে খা।

রোদেলা প্লেট নিয়ে মাইক্রোওয়েভ ওভেনের কাছে গেলো, ত্রিশ সেকেন্ড গরম করে প্লেট হাতে টেবিলে ফিরে এলো। ভাত মুখে দিতে দিতে বলল, “ দিদি, তোমার রান্না এত ভাল, আমি কেন পারিনা বলোতো। পিদিম মাঝে মাঝে বলে, তোমাকে ফোন করে জেনে নিতে মোচার ঘন্টের রেসিপি।
ফোন করলেই পারিস।
দূর! আমি চেষ্টা করলেও লাভ নেই। যতই ভাল রাঁধি, পিদিম বলবে, নাহ, দিদিভাইয়ের রান্নার মত হয়নি।

বরেরা অমনই বলে। বরদের কাছে পাশের বাড়ির বৌটাকে বেশী সুন্দরী মনে হয়, বেশী গুণী মনে হয়, নিজের বউয়ের কাছে বরের এক্সপেক্টেশান খুব বেশী থাকে। এজন্যই অন্যের ভাতে পোলাওয়ের গন্ধ পায়।

রোদেলার বুকে ধাক্কা লাগলো। দিদি এভাবে এর আগে কখনও কথা বলেনি। দিদির কিছু একটা হয়েছে, দাদাবাবুর সাথে দিদির কত রোমান্টিক সম্পর্ক দেখে এসেছে রোদেলা, কিন্তু দিদি কেন এমন বলছে?
দিদি, তুমি এমন করে বলছো, আমার ভয় লাগছে। দাদাবাবুর সাথে কি তোমার ঝগড়া হয়েছে? কিন্তু তোমাদের দুজনের কেউইতো ঝগড়া করতে পারোনা। ইন ফ্যাক্ট, আমি আর পিদিমেরও এক অবস্থা, ঝগড়া করতে পারিনা। কিন্তু তোমার কথাগুলো কেমন লাগছে।

সাথীর বুকে মোচড় দিয়ে উঠলো, রোদেলা খুব সহজ স্বচ্ছ মনের মেয়ে। ওর বাইরেটা যেমন সুন্দর, ভেতর তার চেয়ে বেশী সুন্দর। ওর মনের আয়নায় সাথীর কষ্টের কথা ফুটে উঠেছে। সাথী আপনমনে বলল,
যা পাওয়া হয়ে যায়, তার প্রতি থাকে না কোন টান
মম বুকে জ্বলে আগ্নেয়গিরি, ক্ষণে ক্ষণে উদগীরণ হয় লাভা
দমকে দমকে ধুয়া বেরিয়ে আসে, বুক হালকা হয়ে যায়।

ও দিদি, এসব কি বলছো? আমাদের সবার চোখে তুমি আর দাদাবাবু হচ্ছো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দম্পতি, তোমাদের দুজনের প্রেম কাহিনী আমাদের পাড়ায় আজও অমর হয়ে আছে। তুমি কত সুখী, তোমার বাড়ির চারদিকে সুখ আর সুখ।

রোদ,
মেয়েদের সুখের রঙ হয়
একেক জনের একেক রকম,
কারো সুখ লাল, তো কারো গোলাপী
সবুজ অথবা কমলা।
সোনালী অথবা রুপোলী সুখ বলে কিছু আছে কি!
কে জানে, হয়তো আছে হয়তো নেই, আমার জানা নেই।

আর দুঃখ? মেয়েদের দুঃখের রঙ কি হয়? নীল?

মেয়েদের দুঃখগুলো সবারই একই রঙের হয়,
হয় নীল নয়তো বাদামী অথবা কালো!
জলরঙ হলে আরও ভাল, দুঃখ চিরস্থায়ী হবে না।

রোদ, মনের অনেক রঙ!
ক্ষণে সোনালী ক্ষণে ধূপছায়া
দিন শেষে দুটোই মায়া, সবই মায়া।

দিদি, তুমি কি আর কারো প্রেমে পড়েছো? শুনেছি, প্রেমে পড়লে নাকি সবাই কবিতার ছন্দে কথা বলে, তুমিও তাই বলছো।

হা হা হা হা! শোন, প্রবল চাওয়া আর নিস্ফল পাওয়ার নাম 'প্রেম'। হ্যাঁ, আমি তার প্রেমে পড়েছিলাম, সেও আমার প্রেমে পড়েছিল। দুজনেই প্রবলভাবে চেয়েছিলাম দুজনকে, কিন্তু কেউই কাউকে পাইনি। তাই আমি বুঝি প্রেম কি! কেউ কাউকে নাপেয়ে ভালোই হয়েছে, প্রেমের মর্ম বুঝতে পারছি। পেয়ে গেলে তো কামের খিদে মেটাতে গিয়ে প্রেমের ফাগুন ফুরিয়ে যেত। যেমনটি হয়েছে আমার আর তোর দাদাবাবুর মধ্যে।

দিদি, এভাবে বলোনা, ভয় লাগে! তবে কি পিদিমের সাথেও আমার সম্পর্ক অমনই হয়ে যাবে?
সে কি রে!! হয়ে যাবে বলছিস কেন, এখনও সম্পর্ক তেমন হয়নি? তোর কি মনে হয়না যে প্রেম এখন শুধু রাতের বিছানায় গড়াগড়ি খায়! তোদের অবশ্য আলাদা কথা, তোরা প্রেম করে বিয়ে করিসনি, তাই বিয়ের পর প্রেম করছিস এখনও। আমাদের প্রেম এখন রাতের বিছানায় কাঁদে।
দিদি, তোমার কি মন খুব খারাপ? তুমি এমন করে এর আগে কথা বলতেনা। দাদাবাবুর সাথে ঝগড়া হয়েছে? আমাকে বলো।

দূর পাগলী, দাদাবাবুর সাথে কথাই হয়না আজকাল, ঝগড়া করবও কখন? দেখিসনা, দাদাবাবু অনেক ব্যস্ত। এত বড় পত্রিকার উপসম্পাদক সে, কত কাজের চাপ। মাসের বেশীর ভাগ সময়তো তাকে হিল্লী দিল্লী করতে হয়, আমাদের দেখা হয় কতটুকু সময়? যখন দেখা হয় তখন আমরা ঝগড়া করিনা, শুধু কিছুটা সময় প্রেম করি।---বলে হাসতে হাসতে সাথি টেবিল ছেড়ে উঠলো।


সাথী কিচেনে গেছে, বুধুর মা’কে খেতে দিবে। বুধুর মা দেরী করে খায়, বাবুলোকদের মত সাঁঝবেলায় খেতে পারেনা। বুধুর মা নিজে নিয়েও খায়না, সাথীকে খাবার বেড়ে দিতে হয়। এটা একদিক দিয়ে ভালো, বুধুর মা নিজে হাতে খাবার নিতে গেলে হয়তো ভয়ে কম নিবে, বৌদিমণি খাবার দিলে অনেক বেশী করে দেয়। নিজে খেয়েও খাবার বুধুর জন্য থেকে যায়। প্রতি রাতে কারখানা থেকে ফেরার সময় বুধু মায়ের সাথে দেখা করে যায়, মা তখন খাবার ভর্তি বাটি ছেলের হাতে দিয়ে দেয়।

রোদেলা এখনও টেবিলেই বসে আছে। দিদির কথা শুনে রোদেলার ভয় করছে, দিদি কত্ত ভাল একটা মেয়ে। দিদি যে এমন মনোকষ্টে আছে, বাড়িতে বাবা মা কেউ জানেনা। রোদেলা নিজেও জানতে পারতো না যদি আজ প্রেম নিয়ে কথা না তুলতো। রোদেলা বুঝতে পারছেনা ভুল করেই দিদিকে খুব বেশী কষ্ট দিলো কিনা। নাকি এটাই ভালো হয়েছে তবুও দিদি মনের ভেতর জমে থাকা কষ্টের কথাগুলো প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু, দাদাবাবুকেতো দিদির প্রতি আগে এতটা উদাসীন মনে হয়নি। আসলেইতো এটা অনেক কষ্টের, দিদির একটামাত্র সন্তান চানক্য, সেই ছোটবেলাতেই বোর্ডিং স্কুলে পড়ছে, দিদি চায়নি ওকে দূরে পাঠাতে। দাদাবাবুই পাঠিয়েছে, এখানে আপনার জন কেউ নেই, দাদাবাবু কেন দিদিকে একা রেখে এত ঘুরে বেড়ায়? কাজ একটু কম করলে কি হয়? একা বাড়িতে দিদির মন খারাপ হয়না বুঝি! হঠাৎ করেই দাদাবাবুর উপর অভিমান জন্মাতে শুরু করলো রোদেলার মনে। দাদাবাবু ভালো মানুষ, কিন্তু দিদি তার চেয়েও বেশী ভাল রোদেলার কাছে।


একটু আগে দিদি রোদেলার মাথা আঁচড়ে চুল দুই বেনি করে দিয়েছে। এরপর দুই বোনে ফেসওয়াশ দিয়ে ভাল করে মুখ ধুয়ে নাইট ক্রিম মেখেছে, তখন কিন্তু দিদির মুখ খুব হাসিখুশী। দিদি ঘুমাতে চলে যাবে, রেওয়াজ করার জন্য ভোর রাতে বিছানা ছাড়তে হয় বলে সকাল সকাল ঘুমাতে যেতে হয় দিদিকে। রোদেলার মনে পড়ে, ছোটবেলায় দুবোন পাশাপাশি শুয়ে ঘুমাতো, ভোর রাতে ঘুম থেকে উঠে দিদিকে গলা সাধতে হতো, রোদেলার তখন কী যে বিচ্ছিরি লাগতো। কানের কাছে হারমোনিয়ামের প্যাঁ পোঁ, আর দিদির গলায় সা, গা মা---অসহ্য লাগতো। কিছু বলতেও পারতোনা, আবার সইতেও পারতোনা। কানে বালিশ চাপা দিয়েও পাঁ পোঁ বন্ধ করতে পারতো না। মায়ের কাছে অভিযোগ করার প্রশ্নই উঠতোনা, এমনিতেই রোদেলাকে মা গান শেখাতে রাজী করাতে পারেনি, মায়ের কত দুঃখ। তার উপর দিদি গানে এত ভাল করছে, প্রতিযোগীতায় যায় ফার্স্ট প্রাইজ নিয়ে ঘরে ফিরে। সেই দিদিকে যদি রেওয়াজ করতে না দেয়া হয়, মা রোদেলার পিঠের ছাল তুলে ফেলবে। বাধ্য হয়েই বালিশ কানে চেপে ওপাশ ফিরে শুতে হতো রোদেলাকে। দিদি অবশ্য রেওয়াজ শেষ করে এসে রোদেলার মাথায় হাত বুলিয়ে বলতো, “ বোনু, তোকে কষ্ট দিলাম সোনা। এতক্ষণ ঘুমাতে পারিসনি আমার জন্য, আয় তোকে চুলে বিলি কেটে ঘুম পাড়িয়ে দেই”।

সব বিরক্তি চলে যেতো, রোদেলা দিদির কোলে মাথা দিয়ে বাকী সময়টুকু ঘুমাতো। এখন রোদেলা অপেক্ষা করে ভোর হওয়ার জন্য, কী যে ভালো লাগে দিদির রেওয়াজের সময়টুকু। তানপুরায় দিদি রেওয়াজ করে, গান সম্পর্কে রোদেলার জ্ঞান খুব কম, শুধু জানে ভোরে রাগ ভৈরবী, আর সন্ধ্যায় রাগ ইমন কল্যাণ করে। ওসব নাম জেনে দরকার নেই, সুরের মূর্ছনায় ডুবে যায় দিদি, ডুবে যায় রোদেলা। দাদাবাবু কি এখন আর দিদির গানে আগের সেই ছন্দ খুঁজে পায় না? পিদিম যদি দাদাবাবুর জায়গায় থাকতো, পিদিম নিশ্চয়ই চাকরি বাকরি ছেড়ে দিয়ে দিদির পায়ের কাছে বসে থাকতো। পিদিম মাঝে মাঝে দিদির গানের প্রশংসা করে, রোদেলার তখন ভালো লাগার চেয়েও বেশী আফসোস হয়। ইস! ও যদি মায়ের কথা শুনতো, দিদির সাথে গান শিখতো তাহলে পিদিম নিশ্চয়ই রোদেলার গানের প্রশংসা করতো।

দিদির বাড়িতে তিনখানা বেডরুম, মাস্টার বেডরুম ওদের স্বামী স্ত্রীর জন্য, একটি রুম চানক্যর জন্য, অন্যটি গেস্টরুম কিন্তু দিদি বলে ‘রোদেলার রুম’। কারণ এই বাড়িতে রোদেলা বছরে দুবার বেড়াতে আসে, দিন পনেরো থাকে। আর কেউ এসে থাকেনা। তাই এটা রোদেলার রুম। রোদেলা ওর রুমে আইপ্যাড খুলে বসেছে, দিদি শুতে চলে গেছে। রোদেলার মনে কদিন থেকেই চাপা অস্বস্তি আছে। দিদি যে বলল, রোদেলা সারাক্ষণ ফেসবুকে পড়ে থাকে, কথা মিছে বলেনি দিদি। রোদেলা আগে ফেসবুকে ঢুকতোইনা বলতে গেলে, বন্ধুদের সবাই ফেসবুকে আছে তাই রোদেলাও একটা একাউন্ট খুলেছে।

ওর বন্ধুও তেমন বেশী নেই, প্রতিদিন প্রচুর ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আসে যদিও কিন্তু রোদেলা একসেপ্ট করেনা। ছোটবেলা থেকেই রোদেলা এমন রিকোয়েস্ট পেয়ে অভ্যস্ত, সুন্দরী বলে সবাই ওকে তোয়াজ করে। অনেকে ইনবক্সে মেসেজ পাঠায় ওর সাথে প্রেম করতে চেয়ে। কেউ কেউ অশ্লীল কথা বলে, নিজেদের পেনিসের ছবি দিয়ে আহবান জানায় বিছানায় যাবার। এগুলো দেখে রোদেলা ফেসবুক ছেড়েই দিতে চেয়েছিল কিন্তু তার মধ্যেই উদ্যমকে পেয়ে গেলো। হ্যাঁ, উদ্যম ওর নাম, নামেও উদ্যম সে কাজেও ভীষণ উদ্যমী। উদ্যম একজন এলিজিবল ব্যাচেলর, দেখতে দারুণ হ্যান্ডসাম। সবচেয়ে বড় কথা উদ্যম কবিতা লিখে। বাংলায় এম এ করা রোদেলার কবিতা খুব প্রিয় বিষয়, পিদিম কবিতা বুঝেনা, পিদিম বুঝে কমপিউটার আর মাঝে মাঝে দিদির গান। হ্যাঁ, দিদির গানই শুধু বুঝে পিদিম, দিদির গানের প্রশংসা ছাড়া ওন্য কোন শিল্পীর গানের প্রশংসা করেনা পিদিম। এমনও হতে পারে, রোদেলার কাছে রোদেলার দিদির প্রশংসা করে, মনে মনে অন্য শিল্পীর গানও পছন্দ করে।

আজকাল ফেসবুকে বসে থাকতেই ভালো লাগে, উদ্যমকে পাওয়া যায়। উদ্যম যেন ওর অপেক্ষাতেই থাকে। সমস্যা হলো, উদ্যমের সাথে রোদেলার সময়ের পার্থক্যটা, এগারো ঘন্টার পার্থক্য। উদ্যম স্টেটসে থাকে, রোদেলা কলকাতায়। উদ্যমের যখন দিন, রোদেলার রাত। উদ্যম যখন অফিসে থাকে, রোদেলা থাকে বিছানায় ঘুমে অচেতন। ফলে ফেসবুক অন রাখতেই হয় এক ফাঁকে দুটো কথা বলার জন্য। উদ্যম আজকাল রোদেলাকে চায়, স্পর্শে চায়, ভালোবাসায় চায়, অবচেতন মনে চায়, জাগরণে চায়, ঘুমের মধ্যে চায়, চায়ের কাপে চায়, ফুল বাগানে চায়, পাশাপাশি চায়, মুখোমুখি চায় এবং একটু সময়ের জন্য ওর প্রশস্ত বুকের মাঝে চায়। অত দূর থেকে এভাবে চেয়ে পাওয়া যায়? হ্যাঁ, উদ্যম বলেছে পাওয়া যায়। রোদেলা যদি ‘হ্যাঁ’ বলে, তবেই উদ্যম রোদেলাকে ইচ্ছে অনুযায়ী পাবে। যখন যেভাবে ইচ্ছে করবে, সেভাবেই পাবে। রোদেলার অনুমতি ছাড়া উদ্যম রোদেলাকে স্পর্শই করবেনা।

এর নাম কি? এর নাম কি প্রেম? রোদেলা কি করে অনুমতি দিবে? ও একজনের স্ত্রী, পিদিমকে সে প্রচন্ড ভালোবাসে। তাহলে উদ্যমকে কি করে বলবে, ‘হ্যাঁ’? উদ্যমকে রোদেলা খুবই পছন্দ করে, বলতে কি এখন রোদেলা ফেসবুকে বসে উদ্যমের জন্য। বাজে মেসেজ খোলার আগেই সব ডিলিট করে দেয় যেন কোন কুৎসিত কথা বা ছবি ওকে আহত না করে।
উদ্যমকে রোদেলা সরাসরি ‘না’ বলতে পারেনি এখনও, পাছে উদ্যম কষ্ট পায়। আবার ‘হ্যাঁ’ বলাও সম্ভব নয়। উদ্যমকে ফিরিয়ে দিতে পারছেনা রোদেলা, কারণ ওর জীবনে উদ্যমই প্রথম পুরুষ যে ওকে নিয়ে একটার পর একটা কবিতা লিখে যাচ্ছে। ওকে আজ পর্যন্ত কত ছেলে কবিতার মাধ্যমে প্রেম নিবেদন করেছে, সেসব কবিতা হয় রবীন্দ্রনাথ, নাহয় জয় গোস্বামী, নাহয় রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লা থেকে ধার করা। উদ্যম কারো কাছ থেকে ধার করেনা, উদ্যম নিজেই লিখে কবিতা। এমন প্রেমিককে ‘না’ বলতেও সাহস দরকার হয়, রোদেলার সেই সাহস নেই। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলেছে শুধু, এটা সম্ভব নয়। তাতেই উদ্যম মেসেজ দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

উদ্যম মেসেজ দেয়া বন্ধ করেছে, তাতে রোদেলার খুশী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রোদেলা খুশী নয়, বারবার ফেসবুকে ঢুকে ইনবক্স চেক করে, রাশি রাশি মেসেজের ভীড়ে উদ্যমের মেসেজ খোঁজে, কিন্তু পায় না। বুকে ধাক্কা লাগে, প্রচন্ড অভিমানে চোখ ফেটে জল আসে। উদ্যমের ওয়ালে যায়, সেখানে নিত্য নতুন কবিতার চরণ পোস্ট হচ্ছে, রোদেলা বুঝার চেষ্টা করে, কবিতার মধ্যে উদ্যম রোদেলাকে কিছু বলছে কিনা। রোদেলা বিভ্রান্ত হয়, একবার মনে হয় ওকেই বলছে, আবার মনে হয়, হয়তো নতুন কোন প্রেয়সী খুঁজে পেয়েছে!

আজ দিদির সাথে কথা বলার পর রোদেলার মনে অন্য ভাবনা ঢুকে পড়েছে। প্রেম বলে কিছু নেই, যা আছে তা ‘কাম’। সত্যি কি তাই? উদ্যম রোদেলাকে বুকে পেতে চায় কেন? বুকে পাওয়ার পর উদ্যম কি করবে? রোদেলা যদি ‘হ্যাঁ’ বলে, তবেই উদ্যম রোদেলাকে বুকে জড়িয়ে ধরবে। এরপর কি করবে? রোদেলার ঠোঁটে চুমু খেতে চাইবে? চুমু খাওয়ার আগে উদ্যম অনুমতি চাইবে? কি করে অনুমতি চাইবে? রোদেলা কলকাতায়, উদ্যম স্টেটসে, দিন আর রাতের পার্থক্য। একবার রোদেলাকে বুকে পেলে চুমু খাওয়ার জন্য অনুমতি চাওয়ার কথা মনে থাকবে উদ্যমের? অত ধৈর্য থাকবে? চুমু খেয়ে নেয়ার পর কি করবে? কি করবে? কি করবে?

দিদি কি ঠিক বলেছে? দিদি বেঠিক বলার মানুষ নয়। বাংলাদেশে গিয়ে দিদির কিছু একটা হয়েছে। ফেসবুক থাকলে দিদির জন্য ভাল হতো, ফেসবুক হচ্ছে এখন সবচেয়ে শক্তিশালী যোগাযোগ মাধ্যম। দিদির গানের কথা ফেসবুকে ছড়িয়ে দিতে পারতো। দিদি ফেসবুক ছেড়ে দিয়েছে, বলেছে সেখানে সকলেই দিদিকে সেক্সি হটি বলে। দাদাবাবু সম্পর্কেও একই কথা বলেছে। দিদি ওর চেয়ে সাত বছরের বর, অভিজ্ঞতা বেশী। দিদি বলেছে, প্রচন্ড চাওয়া এবং নিষ্ফল পাওয়ার নাম প্রেম। তার মানে, উদ্যমের সাথে রোদেলার সম্পর্কটা প্রেমের দিকেই যাচ্ছিলো, দুজন দুজনকে প্রচন্ডভাবে চাইছিলো, কিন্তু কেউ কাউকে পাবেনা জানতো। হঠাৎ করে দিদির কথায় রোদেলার হিসেব পালটে গেলো। উদ্যম আসলে রোদেলাকে পেতে চাইছে, কাছে থেকে নাহোক কল্পনায়। পাওয়ার পর রোদেলাকে এপিঠ ওপিঠ ঘুরিয়ে ভাল করে চেখে দেখবে উদ্যম, সব দেখা হয়ে গেলে একটু দূরে সরিয়ে রাখবে।

হায় হায়! এ কিভাবে হয়? একটা মাত্র পুরুষ যে সত্যি সত্যি রোদেলার প্রেমে পড়েছিল, সেও তাকে বুকে পেতে চাইছে! প্রেম থেকে তার বুকে কাম জেগে উঠছে! এটাতো হতে দেয়া যায়না, কামনার নৈবেদ্যতো পিদিমের পায়েই সমর্পণ করে দিয়েছে রোদেলা, বাকী ছিল হৃদয়। হৃদয়ের নৈবেদ্যটুকু উদ্যমকে দিতে চেয়েছিল, সেই উদ্যমও ওকে ভুল বুঝলো। যেইমাত্র শুনলো, রোদেলাকে পাওয়া সম্ভব নয়, অমনি সরে গেলো!
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন