বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৯০
গল্প/কবিতা: ১টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

৪৫

গ্রাম-বাংলা (নভেম্বর ২০১১)

মোট ভোট ৪৫ পরাজয়

রিনতি
comment ২৫  favorite ১  import_contacts ২৬৮
আউটডোরে প্রচণ্ড ভীড় ।মেজাজ বিগড়ে আছে ।সকাল থেকে রোগীদের অবিরাম প্রশ্ন এবং নার্সদের বিরতিহীন উত্তর । যথারীতি একঘেয়ে ক্লাস চলছে ।স্যার হার্নিয়া পরাচ্ছিলেন । মগজে কিছুই ঢোকাতে ইচ্ছে হচ্ছিল না । একেতো পরীক্ষার চিন্তা তার সাথে স্যার এর বকবকানি । বার বার ঘড়ি দেখছিলাম । সময় যেন সেখানেই থেমে আছে । একজনের পর এক জন রোগী আসছে । হটাৎ ই এক বৃদ্ধ গট গট করে ঢুকে গেলেন । তারপর ই তো শুরু হয়ে গেল যার ভয় করছিলাম এতক্ষণ । কর্তব্যরত নার্স তাকে নিয়ম নীতি সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিলেন যার কানাকড়ি ও বৃদ্ধ বুঝতে পারলেন না । যাইহোক কিছুক্ষণ পর কোনভাবে তাকে মোটামুটি শান্ত করা গেল । স্যার আমাদের বৃদ্ধের হিস্ট্রি ( রোগী সংক্রান্ত তথ্য ) নিতে বললেন এবং উনাকে পরীক্ষা করতে বললেন। ক্লাসের আর ১৫ মিনিট বাকি ছিল । কোনমতে হিস্ট্রি নিয়ে এবং বৃদ্ধকে পরীক্ষা করে দিলাম ছুট পরবর্তী ক্লাসের জন্য। দিনটা কোনমতে কেটে গেল । তারপর সন্ধ্যায় আবার ওয়ার্ড এর দিকে ধাবিত হলাম। ওয়ার্ডে গিয়ে বিভিন্ন রোগীদের সাথে কথা বলছি এবং হিস্ট্রি নিচ্ছি তখন দেখি সকালের সেই বৃদ্ধ । কাছে গিয়ে সালাম দিলাম । উনি আমাদেরকে দেখে সুন্দরভাবে হাসলেন । কিছুহ্মণের মধ্যেই উনি আমাদের এত আপন করে নিলেন যে উনার সাথে যে আজই আমাদের পরিচয় সেটা বেমালুম আমাদের সবার মাথা থেকেই চলে গিয়েছিল । আমরা সবাই তাকে নিজের অজান্তেই দাদু বলে ডাকতে শুরু করেছিলাম । উনিও আমাদের সাথে হেসে হেসে কথা বলছিলেন । সময়ের দিকে আমাদের কারো খেয়াল ছিল না । ওয়ার্ড শেষ করে দাদুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রুমে ফিরে আসলাম । পরদিন যথারীতি পরীক্ষার চিন্তা , ক্লাস , পড়াশোনা , ওয়ার্ড । দাদুর কথা বেমালুম ভুলে গেলাম সবাই । তিনদিন পরে পোস্ট অপারেটিভ রুমে (অপারেশনের পর রোগীদের যেখানে রাখা হয়) আবার দাদুর সাথে দেখা । উনি আবার সেই ভুবন ভোলানো হাসি দিয়ে আমাদের স্বাগত জানালেন । মনে মনে একটু সংকোচ বোধ হচ্ছিল কিন্তু এ নিয়ে উনার মধ্যে কোন বিকার দেখালাম না। প্রথম দিনের মতই সেই ভালবাসা নিয়ে আমাদের সাথে কথা বলছিলেন । আমরা জিজ্ঞেস করলাম যে উনাকে কেউ দেখতে এসেছিল কিনা । উনি জানালেন উনার বাড়ি অনেক দূরে এবং সেখানকার যাতায়াত ব্যবস্থাও সুবিধার নয় । কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর যখন চলে আসার জন্য পা বাড়ালাম তখন দাদু বললেন, ‘‘দাদু, আমারে দুই দিন পর ছুটি দিয়া দিব । তোমরা আইবা না দাদু ?’’যেতে যেতেই থেমে গেলাম । কথাটার আন্তরিকতা সেদিন আমাকে সিক্ত করে তুলেছিল । আমরা সবাই তাকে আশ্বস্ত করলাম যে আসব । দুই দিন পর অনেক কষ্টে দশ মিনিট বাঁচিয়ে দাদুর সাথে দেখা করতে গেলাম । উনি আমাদের রীতিমত জোর করতে লাগলেন উনার বাড়িতে যাওয়ার জন্যে ।এক রকম জোর করেই উনার বাড়ির ঠিকানা আমাদের হাতে গুঁজে দিলেন , আমাদের ফোন নাম্বার রাখলেন । এবং বারবার অনুরোধ করলেন যাওয়ার জন্যে । আমরা তাকে কোনও মতে আশ্বস্ত করে সেদিন পালিয়ে বেঁচেছিলাম , ভেবেছিলাম এইখানেই হয়ত শেষ । কে মনে রাখে কার কথা ? কিন্তু আমরা ভুলে গেলেও সে দিনের সেই সাদা মনের সরল মানুষটি আমাদের কথা ভুলেন নি । তিনি আমাদের সাথে যোগাযোগ করে আবার অনুরোধ করলেন যাওয়ার জন্য । বিবেকের তাড়নায় এই ব্যস্ত জীবন থেকে কিছু সময় বের করতে বাধ্য হলাম ।এক ছুটির দিনে বেরিয়ে পরি আমরা সবাই । আমরা ৬টায় রওনা দিয়ে ৯টায় গিয়ে পৌঁছালাম । বাস থেকে নেমে দেখি দাদু আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন । পরে জানতে পারি আমরা আসব বলে উনি ভোর ৭টা থেকে বাস স্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছেন । আমি যতই দেখছিলাম দাদুকে ততই অবাক হচ্ছিলাম । আজকাল কার যুগে এরকমও হয় নাকি । তারপর দাদু আমাদের উনার বাড়িতে নিয়ে গেলেন । সেখানে দাদুর পরিবারের সবাই ছিলেন । সবার ব্যস্ততা সত্ত্বেও সেদিন শুধু আমাদের সাথে দেখা করার জন্য সবাই কাজ ফেলে ছুটে এসেছিলেন । সেদিন গ্রামের সভ্যতার কাছে শহর যেন বার বার পরাজিত হচ্ছিল ।এত আন্তরিকতা আমাকে প্রত্যেক পদক্ষেপে নিজেদের সংকীর্ণতা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছিল । দাদু এত টানাটানির সংসারের মধ্যেও আমাদের জন্য যে আয়োজন করেছিলেন তার মধ্যে যে ভালবাসাটুকু মিশ্রিত ছিল তা বড় বড় হোটেলের দামী দামী খাবারে পাওয়া যায় না ।
খাওয়া দাওয়ার পর তিনি আমাদের গ্রাম ঘুরিয়ে দেখালেন ।আমি মুগ্ধ চোখে দেখছিলাম বাংলার সৌন্দর্য । গ্রামের সরল মানুষগুলোর মতই সরল তার সৌন্দর্য ।নেই কোনও কৃত্তিমতা তবু কত সুন্দর, কত নির্মল ।
দেখতে দেখতে বিকেল নেমে আসলো । দাদু আমাদের চা খাওয়াতে নিয়ে গেলেন চায়ের দোকানে । দোকানদার আমাদের দেখে বললেন, ‘‘আপনাগোর কথা তো উনি অনেক বলছেন ।আপনারা আইছেন এডাতে অনেক খুশি হইছি । আপনাগোর দেখার অনেক ইচ্ছা ছিলো।’’ তার প্রত্যেকটা কথা থেকে আন্তরিকতা ঝরে পরছিল । উনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আরো কিছুক্ষণ ঘুড়লাম । এরপর বিদায় নেবার পালা । চলে আসার সময় দুঃখভারাক্রান্ত মনে দাদু হাতটি ধরে বললেন, ‘‘দাদু তোমাগো কিছুই খাওয়াইতে পারলাম না । তোমরা কিন্তু আবার আইবা । আমার অনেক ইচ্ছা ছিল তোমাগো মোরগের গোশত খাওয়ামু কিন্তু এইবার তো হইল না আবার কিন্তু আইবা ।’’ আমি তাড়াতাড়ি হাত ছাড়িয়ে দাদুকে আশ্বস্ত করলাম পাছে দুর্বলতা ধরা পরে যায়। চোখের সামনে নিজের পরাজয় কেই বা মেনে নেয় । সেদিন অনেক ভেবেছিলাম আজকের যুগের সভ্য সমাজকে নিয়ে । হিসেব করতে গিয়ে দেখেছিলাম সংকীর্ণতা ছাড়া কিছুই দিতে পারেনি এ সমাজ । গ্রামের এক সহজ সরল বৃদ্ধ কত সহজে তার সরলতার পবিত্রতায় এ সমাজকে পরাজিত করেছে । সেদিন ভেবেছিলাম সব সংকীর্ণতা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে নতুন করে শুরু করবো কিন্তু মনের কথা মনেই রয়ে গেছে । সমাজের যে শৃংখল পায়ে বেড়ীর মত আটকে গেছে তা আমার মত দুর্বল মানুষের পক্ষে খোলা সম্ভব নয় । তাই নিজের মনকে শান্তনা দিয়ে আবারও ডুবে যাই নিজের জগতে। পড়াশোনা আর বন্ধুবান্ধব নিয়ে মেতে উঠি । এর মধ্যেও দাদু অনেকবার যোগাযোগ করেছিলেন কিন্তু আর যাওয়া হয়ে উঠেনি ।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • ম্যারিনা নাসরিন সীমা
    ম্যারিনা নাসরিন সীমা গল্প কবিতায় স্বাগতম ! মুকুল ভাইয়ের সাথে একমত । প্যারা করলে পড়তে সুবিধা হত । তবে লেখার স্টাইল ভাল লাগলো ।
    প্রত্যুত্তর . ২৯ নভেম্বর, ২০১১
  • সূর্য
    সূর্য বাস্তবতায় পরাজিত আবেগ। সরলতায় হেরে যাওয়া শহর- সুন্দর গল্প। [সেদিন গ্রামের সভ্যতার কাছে শহর যেন বার বার পরাজিত হচ্ছিল ।] বাক্যটা বেশি ভাল লেগেছে এবং এটা সব সময়ই সত্যি থাকবে।
    প্রত্যুত্তর . ২৯ নভেম্বর, ২০১১
  • রিনতি
    রিনতি আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ । দোয়া করবেন যেন আর ভালো লিখতে পারি ।
    প্রত্যুত্তর . ৮ ডিসেম্বর, ২০১১