বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৮০
গল্প/কবিতা: ১২টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

২৭

বাংলা হবে বিশ্বভাষা

বাংলা ভাষা ফেব্রুয়ারী ২০১৩

ঈর্ষা জয়

ঈর্ষা জানুয়ারী ২০১৩

বৃষ্টি তুমি

বৃষ্টি আগস্ট ২০১২

গ্রাম-বাংলা (নভেম্বর ২০১১)

মোট ভোট ২৭ সুখের গ্রাম-বাংলা

খান শরীফুল ইসলাম
comment ২০  favorite ৪  import_contacts ৫৮২
রহিম গায়ের ছেলে। সহজ সরল একটা মানুষ। গায়ের সবাই যেনো তার অন্তরের ভালবাসার মানুষ। সুখে দুঃখে ভাল মন্দে গ্রামের সবাই রহিমের কাছে ছুটে আসে। ছোট বেলায় রহিমের বাবা মারা গেছে। সংসারে মা আর ছোট দুটি বোন ছাড়া আর কেউ ছিল না হাল ধরার মত সংসারের। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে সংসারের বোঝা রহিমের মাথায় এসে পরে। রহিম গায়ে খাটা মানুষ, বাবার জমি ছিল বিঘা পাচেক নিজে গায়ে খেটে চাষ-বাস করে সোনার ফসল ফলায়, তাই লেখা পড়ার সুযোগ তার হয়নি। শিক্ষিত না হলেও রহিম খুব বুদ্ধিমান। রহিম বুদ্ধিমান বলেই ছোট বোন দুটো কে লেখা পড়া করিয়ে বিয়ে দিয়েছে ভাল ঘর দেখে। বোন জামাই দুটোই সরকারী চাকুরী করে। বোন দুটো বিয়ে হয়ে গেছে, মা ধরেছে এবার রহিম কে বিয়ে করাবে। গায়ের মধ্যে ভাল ছেলে থাকলে কেউ কি আর ছাড়তে চায়। লেখা পড়া না জানুক রহিমের মত কাজের ছেলে আর ক'টা আছে গায়ে। প্রতিবছর দু এক বিঘা করে জমি রাখে রহিম। তাই তো গায়ের মাদবরের সুন্দর মেয়েকে রহিমের সাথে বিয়ে দিতে ভুল করলো না সিরাজ মাদবর সাহেব। খুব ধুম ধাম করে দশ গায়ের মানুষ দাওয়াত করে বিয়ে দিল।
রহিম মূর্খ মানুষ তাই বলে রহিম নিজেকে কোন সময় ছোট করে দেখেনি কখনো। রহিম নিজে লেখাপড়া করতে পারে নাই তাই রহিমের ইচ্ছ রহিম তার বাবা মায়ের নামে একটা স্কুল করে দেবে গ্রামে। মা মারা যাওয়ার পর রহিম গায়ের লোকজন ডেকে বলে দিল তার মনের কথা। স্কুল করার জন্য জমি আর নগদ টাকা দিয়ে দিল কমিটির হাতে। রহিমের একটাই শর্ত স্কুলে যেনো ছেলে মেয়েদের জোরে জোরে লেখা পড়া করানো হয়। সবাই রহিমের শর্ত মেনে নিল। কিছুদিনের মধ্যে গায়ে গড়ে উঠলো স্কুল। স্কুলে ছেলে মেয়েরা জোরে জোরে লেখা পড়া করে রহিমের শুনে মন ভড়ে যায়।
সমাজের আর দশটা মানুষের চেয় রহিম সচেতন কম নয়। নিজেদের সুখের কথা চিন্তা করে একটা মেয়ে আর একটা ছেলে সন্তান নিয়ে পরিকল্পিত একটা সংসার গড়ে তুলেছে রহিম। মেয়ে বড় হয়েছে গায়ের মধ্যে লেখাপড়ায় ভাল। উপজেলা সদরে গিয়ে কলেজে লেখা পড়া করে। প্রতিদিন রহিম সাইকেলের পিছনে বসিয়ে মেয়েকে কলেজে দিয়ে আসে আবার সময় হলে কলেজ থেকে নিয়ে আসে। মেয়ের লেখা পড়া শেষ না হতেই বিয়ের সমন্ধ আসতে শুরু করেছে। পাচ পুরুষ গায়ে বসবাস করে রহিমের। মনে অনেক স্বপ্ন রহিম শহরে যাবে। কিন্তু চোদ্দ গুষ্টির ভিতরে কেউ তো শহরে থাকে না রহিম যাবে কার কাছে? কিন্তু আসার কথা রহিম কাউকে কোন দিন বলে নাই। মেয়ের একটা বিয়ে এসেছে ছেলে শহরে বড় চাকুরী করে। শহরে মেয়ের বিয়ের কথা শুনে রহিমের বুকটা ভরে গেলো। ছেলেদের ঢাকা শহরে নিজেদের বাড়ী আছে। পাশের গায়ে ছেলের দাদার বাড়ী কিন্তুু দাদার বাড়ীতে কেউ থাকে না। সবাই শহরে থাকে বলে ভিটে বাড়ী পতিত পরে আছে। বছরে দু-একবার বেড়াতে আসে। আর বেড়াতে এসেই রহিমের মেয়েকে দেখে তাদের পছন্দ হয়েছে। রহিম তার একটা মেয়েকে বিয়ে দেবে সবকিছু ভালভাবে না দেখে কি আর বিয়ে দেয়া যায়। ছেলেরা ভাল বংশের সেটা না হয় জানা আছে, কিন্তু ছেলেরা কোথায় থাকে কি করে সবকিছুতো ভাল ভাবে দেখা দরকার। ছেলেদের বাড়িতে থেকে তো সব জানা সম্ভব না।
অনেক ভেবে চিন্তে রহিম ঠিক করলো শহরে একটা বাসা ভাড়া করবে, মেয়ের বিয়ে সাধি হয়ে গেলে দুএক মাস শহরে বেড়িয়ে বাসা ছেরে আবার চলে আসবে। গায়ের অনেক লোক ঢাকা শহরে থাকে। তাদের বলে রহিম শহরে একটি বাসা ভাড়া করল। জীবনে এই প্রথম রহিম শহরে যাবে, মন অনেক খুশি। গায়ের প্রতিটি মানুষের কাছে রহিমের বলা শেষ। যেদিন রহিম শহরে রওনা হল গায়ের অনেক মানুষ এসছে রহিমকে আগায়ে দিতে উপজেলা সদরে। রহিম স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে নিয়ে ভ্যান গাড়ীর উপর বসে আছে আর পিছনে পিছনে হেটে আসছে গায়ের অনেক লোক। যেন কোন নির্বাচনী মৌন মিছিল যাচ্ছে। মনের আনন্দে আনন্দে রহিম মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা শহরে চলে এলো। রাতের বেলা শহরের রঙ বেরঙের আলো দেখে রহিমের মন আরো পুলকিত হয়ে গেলো। বাস থেকে নেমে রিঙ্া নিয়ে যাওয়ার সময় শহরের গলির মধ্যে যেতেই ছিনতাইকারী ধরে রহিমের নিকট থেকে মানিব্যাগ আর মেয়ের নিকট থেকে ভেনেটি ব্যাগ, ঘড়ি, জিনিসপত্র নিয়ে গেলো। বাসায় গিয়ে রহিমের মন খারাপ, ভাবছে গ্রামে মানুষ বেড়াতে গেলে সবাই ভাল মন্দ খবর নেয় আর শহরে ঢুকতেই ছিনতাই কারী টাকা পয়সা নিয়ে গেলো, হায়রে ঢাকার শহর! রহিম চালাক মানুষ তাই বাড়ী থেকে চাউল তরি-তরকারী সবকিছু নিয়ে গেছে বস্তা ভরে। রাস্তায় ছিনতাই হতে পারে বলে খরচের টাকা ছাড়া বাকী টাকা চাউলের বস্তার ভিতরে নিয়ে এসেছে। বাড়ী থেকে আনা রান্নাকরা খাবার খেয়ে রাতে ঘুমিয়ে পরল।
সকালে রহিম ঘুম থেকে উঠে টয়লেটে গিয়ে বিপাকে পরেছে, বার বার সুধু টয়লেটের ভিতরে ঢুকছে আর বাহির হচ্ছে কিন্তু কোন কাজ করতে পারছে না। বাড়ীতেও পাকা পায়খানা গোসলখানা কিন্তু এইরকম পায়খানা তো দেখেনি কোনদিন। হাই কমোট, রহিম ব্যাবহার করবেতো দুরের কথা নাম পর্যন্ত সোনেন নাই। কোথায় পা রাখবে আর কেমন করে কি করবে। রহিমের শরির ঘেমে অস্থির হয়ে যাচ্ছে কি করবে বুঝতে পারছে না। আর কোন উপায় না দেখে রহিম হাই কমোটের উপর পা দুটি তুলে উপরে উঠে বসে কোনমত কাজ শেষ করলো। সকালে রহিম গামছা আর লুঙ্গি কাধে নিয়ে বেড়িয়ে পরল বাসা থেকে। সারা মহল্লার অলিগলি ঘুরে রহিম অস্থির হয়ে গেলো কিন্তু রহিম গোসল করার মতো কোন পুকুর খুজে পেল না। ঢাকা শহরের কতো বড় বড় শিক্ষিত মানুষ বসবাস করে অথচ একটা পরিস্কার পুকুর নাই। আমরা গায়ের মানুষ শিক্ষিত না হলেও কত সুন্দর সুন্দর পুকুর আছে। মন খুলে সাতার কেটে গোসল করা যায়। ভাত খাওয়ার সময় পানি নেই। মেয়েকে বলতেই একগ্লাস পানি এনে দিল কিন্তু পানি গরম, বাবা ঢাকা শহরে পানি ফুটিয়ে খেতে হয়। রাতে পানি ফুটিয়েছি কিন্তু পানি এখনো ঠান্ডা হয় নাই।
একদিন দু-দিন যেতেই রহিম প্রায় অসুস্থ হয়ে গেলো, এভাবে কি মানুষ বাচতে পারে। সারাদিন এই ছোট্ট বাসার ভিতর বন্ধি হয়ে থাকা যায়? কেউ কারো সাথে সহজে কথা বলে না, মিসতে চায় না। ইট পাথরের এই নিষ্ঠুর শহরে রহিম অতিস্ট হয়ে গেলো, আর ভাল লাগে না, দম বন্ধ হয়ে আসছে রহিমের। সস্তিতে নিঃশাষ ফেলার মতো একটা ফাকা যায়গা বা মাঠ নাই কোথাও। রাস্তায় বাহির হলে অসয্য যানজট, গাড়ীর ভিরে হাটা যায় না, ফকির, হকার আর মানুষের ভিরে ফুটপাত দিয়ে হাটতে হাটতে গলা শুকিয়ে গেছে রহিমের, পাসের দোকানে গিয়ে বল্ল এক গ্লাস পানি খাওয়ানো যাবে। দোকানদার জিজ্ঞাসা করলো ঠান্ডা না নরমাল, রহিম বল্ল ঠান্ডা, এক গ্লাস ঠান্ডা পানি খেয়ে রহিমের প্রাণটা জুড়িয়ে গেলো মনে মনে ভাবছে ঢাকা শহর তো ভাল মানুষ আছে, মানুষকে ঠান্ডা পানি খাওয়ায়, ভাবতে ভাবতে রহিম চলে যাচ্ছে হঠাৎ দোকানদার পিছন থেকে ডাকলো কই টাকা না দিয়ে চলে যাচ্ছেন যে, টাকা দিতে হবে? হ্যা ঠান্ডা পানি দুই টাকা আর নরমাল এক টাকা। পানি টাকা দিয়ে কিনে খেতে হয়! আমার বাড়িতে তিনটা টিউবয়েল। একটা তো রাস্তার পাসে শুধু পথের মানুষের জন্য। যার যেমন খুশি পানি নিয়ে যায় কোন টাকা পয়সা তো কোন দিন নেই না, হায়রে সাধের ঢাকা!
এই শহরের মানুষ যান্ত্রিক রোবটের মতো বসবাস করছে। রহিম মেয়ের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারছে না, সব কিছু তাই মানিয়ে নিতে চাইছে নিজের সাথে। শহরের ভাল একজন চাকুরী জীবি ছেলের সাথে বিয়ে হলে মেয়ে সুখে থাকবে। কয়েকদিন যেতেই রহিম অসুস্থ হয়ে পড়ল। মেয়ে রিমি বুঝতে পারলো রহিমের মনের বিষয়। গ্রামের সবুজ শ্যামল প্রকৃতি, খোলা আকাশ, মুক্ত বিশুদ্ধ বাতাস, সকালে পাখির কিচির মিচির কলতানে, মোড়গের কুকুর-কুক ডাকে ঘুম ভাঙ্গে। মাঠে মাঠে সবুজ কচি ফসলের দোলা, সহজ সরল মানুষের সাথে মানুষের মধুর মিলন, কারো বিপদে সকলের এগিয়ে আসা। নদি-নালা খাল-বিল আর পুকুরের পানিতে মনের সুখে সাতার কাটা। খাটি গরুর দুধ, তাজা সজিব শাক-শব্জি, তরকারী, নদি নালা খাল-বিল থেকে জেলেদের ধরা তাজা মাছ। সব মিলিয়ে বাংলার গ্রাম প্রকৃতির বিশাল রাজ্যে যেনো সুখের আবাস। সুখের সেই আবাস থেকে বঞ্চিত বাবার এই যান্ত্রিক শহর বিষাদাগার হয়ে উঠেছে। গায়ের অনেক সন্মান আর ভালবাসা নিয়ে বেচে থাকা মানুষ শহরে এভাবে থাকতে পারবে না। মেয়ে রিমিরও ভাল লাগছে না শহরের এই জীবন যাপন। বাবা অসুস্থ হওয়ায় মেয়ে বল্ল বাবা একটা কথা বলি, বল মা , বাবা আমি চাইনা টাকা দিয়ে কেনা শহরের এই রঙিন সুখ। আমি আমার সুখের গ্রাম-বাংলা ছেরে এই শহরে যান্ত্রিক মানুষ হয়ে বাচতে পারবো না। বাবা, চলো গায়ে ফিরে যাই। তুমি গ্রামের সহজ সরল শিক্ষিত একটা ভাল ছেলে দেখে আমাকে বিয়ে দিও, তাতে আমি অনেক সুখি হবো...।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন