বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৯২
গল্প/কবিতা: ৬টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

৪০

পুরানোকে আঁকড়ে ধরে

নতুন এপ্রিল ২০১২

একজন মর্জিনা

মুক্তির চেতনা মার্চ ২০১২

হারিয়ে যাওয়ার দিনে

শীত জানুয়ারী ২০১২

গ্রাম-বাংলা (নভেম্বর ২০১১)

মোট ভোট ৪০ ফেরা না ফেরার গল্প

মিষ্টি
comment ২৬  favorite ১  import_contacts ৫৪৩
আজ চার বছর হলো আমি গ্রামে যাইনা । আমার নাম আনিস । আমি নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে । আমার বাবা গ্রামের স্কুলের একজন সামান্য শিক্ষক । বাবার অনেক স্বপ্ন ছিল আমি লেখাপড়াটা ভালভাবে শিখব । তাই যেদিন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলাম মনে হলো আকাশের চাঁদ হাতে পেলেও এত খুশি হতাম না । তারপর চলে এলাম ঢাকায় ।এখন আমি হলে থাকি ।
চার বছর পর এবার ঈদের ছুটিতে আমি গ্রামে যাব । গ্রামে যাব কথাটা চিন্তা করতেই আমার গত চার বছরের কষ্ট গুলো ঝাপসা হয়ে আসতে শুরু করেছে । আমার গ্রাম , গ্রামের আকাশ , বাতাস , মাটি, বাঁশঝাড়, পুকুর সব কিছু ফেলে আমি ঢাকায় পড়ে আছি গত চারটা বছর ।

গত চার বছরে যে গ্রামে যাবার ইচ্ছা হয় নি তা নয় । যেতে পারিনি নিদারুন আর্থিক সংকটের কারনে । বাড়ি থেকে টাকা পয়সা পাইনা , নিজের কোন বাড়তি রোজগারও নেই । ধার দেনা করে , একটি মাত্র টিউশনির অল্প কিছু টাকা দিয়ে গ্রামে ফেরা হয়নি ।

খুব ছোটবেলা থেকেই আমার বই পড়ার খুব শখ । বাবাই আমাকে পড়তে দিয়েছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী । পড়তে পড়তে এতই মগ্ন হয়ে যেতাম যে বুকের উপর বই নিয়েই ঘুমিয়ে যেতাম । যেদিন আমি ঢাকায় চলে আসি সেদিনও বইটি আমার সাথে ছিল । ঢাকায় চলে আসার দিনটির কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে । আমাকে বাসে উঠিয়ে দিতে বাবা , মা আর আমার বোন এসেছিল । ঢাকার উদ্দেশ্যে যখন বাস ছাড়লো এক অজানা কষ্টে আমার ভেতরটা কেঁপে উঠলো । জানালা দিয়ে সাবাইকে বিদায় দেয়ার জন্য হাত নাড়তে নাড়তে চোখ দু’টো ভিজে উঠলো । কোন এক অদৃশ্য বাঁধন ছিড়ে সেদিন আমি চলে এসেছিলাম ঢাকায় । আমি যেন পথের পাঁচালীর সেই অপু যাকে তার নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে চলে যেতে হয়ে ছিল । প্রচন্ড দুঃখে আচ্ছন্ন হয়ে নিজেকে নিজেই সান্ত্বনা দিয়েছিলাম , আমি আবার ফিরব আমার গ্রামে । পুকুর পাড়ে বসে থাকব ঘন্টার পর ঘন্টা । আবার আমি শিশির ভেজা ঘাসের উপর খালি পায়ে হাঁটবো । বিকেলের নরম আলোয় উদাস হয়ে হেঁটে যাব অজানায় । সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরে মায়ের বকুনি খাব ।

ঢকায় আমার দিন গুলো কেমন কেটেছে আমি নিজেও জানিনা। গ্রামের ছেলে বলে মানিয়ে নিতে যে খুব কষ্ট হয়েছে তা নয় । দিন গুলো আমার পড়াশোনা , বন্ধু-বান্ধব আর রোজগারের ধান্দায় কেটে গেলেও রাত গুলো হয়ে উঠতো দীর্ঘ । কিছু কিছু রাত আসত একেবারে নির্ঘুম । শত চেষ্টাতেও ঘুম আসতো না । চোখ বন্ধ করলেই আমি আমার গ্রামের সরু রাস্তাটা দেখতে পেতাম , যার মাথায় আমার বাড়ি । উঠোনের এক কোনে আমার বোন মুরগি গুলোকে খাবার দিচ্ছে । মা লাল গরুটাকে নিয়ে ব্যস্ত । সকালের নরম রোদে উঠোনটা যেন ঝকঝক করছে । পুকুরে ঘাই মারছে বড় মাছ । বাঁশঝাড়টার ছায়া হয়তো বেলা বাড়ার সাথে সাথে দীর্ঘতর হচ্ছে । বৃষ্টি ভেজা মাটির গন্ধ , শীতের মধ্যে মায়ের বানানো গরম গরম পিঠে আরও কত কি যে আমি ভাবতাম ।

আমার শৈশবের স্মৃতির সবটুকুই আমার গ্রামের । আমি খুব দুরন্ত ছিলাম না । নিজের মনে ঘুরে বেড়াতাম গ্রামের পথ ধরে । স্কুলে পড়ার সময় বাবা একবার ঢাকা থেকে আমার জন্য একটা দামি কলম নিয়ে এসেছিলেন । কলমটা আমার খুব প্রিয় ছিল। কিন্তু একদিন সেই কলমটা আমি বাঁশঝাড়ের মধ্যে হাড়িয়ে ফেলি । সারাটা দুপুর আমি কলমটা খুঁজেছি । তারপর খুঁজে না পেয়ে আমার সেকি কান্না । ভাবতেই অবাক লাগে, যে ছেলে একটা কলমের শোকে এত কাতর হয়েছিল সে তার শৈশবের স্মৃতির সমস্তটাই পিছনে ফেলে রেখে এসেছে ।

গত ঈদেও বাড়ি যেতে চেয়েছিলাম । পরে ভাবলাম না । আরও কিছুদিন অপেক্ষা করি । আর কিছু টাকা-পয়সা জমলে মার আর বোনের জন্য শাড়ি , বাবার জন্য একটা পাঞ্জাবি কিনে নিয়ে মহাসমারোহে বাড়ি ফিরবো । প্রিয়মানুষ গুলোর হাসি মাখা মুখ দেখার জন্য আমি না হয় আর কিছুদিন অপেক্ষা করবো । বাড়ি ছেড়ে কোনদিন এক সপ্তাহও বাইরে থাকিনি । তাই চার বছরের অপেক্ষাটাকে আমার কাছে মনে হয়েছে অনন্ত কালের মতো । নিজেকে বুঝিয়েছি , আর কিছুদিন পড়েই আমি ফিরে যাব মার কাছে, আমার শান্তিময় , ছায়াঘেরা গ্রামে ।

আজ সেই দিন । আজকে আমি বাড়ি যাব। বিকেলের বাসে অনেক কষ্টে একটা টিকিট কেটেছি । মায়ের জন্য শাড়ি , বাবার জন্য পাঞ্জাবি কেনা হয়েছে । বোনের জন্য কিনেছি লাল টুকটুকে একটা শাড়ি ।

আমি এখন বাসে বসে আছি । আর একটু পরেই বাস ছাড়বে । মা আজ সারাদিন পার করবে আমার জন্য রান্না করে ।চার বছর পরে আমি মাকে দেখবো । বাবা নিশ্চয় আমাকে নিতে আসবেন। ছোট বোনটি অপেক্ষা করে আছে কখন আমি উঠানে পা রাখব আর তার নাম ধরে ডাকাডাকি শুরু করবো। সেই সাথে কি বাড়ির উঠান , পুকুর , লাল গরুটা আর সেই বাঁশঝাড় – এরাও কি আমার জন্য অপেক্ষা করছে না ? আমি কিন্তু অধীর হয়ে অপেক্ষা করছি আমার গ্রামের মাটির মিষ্টি গন্ধটার জন্য ।

হঠাৎ প্রচন্ড একটা ঝঁকুনি দিয়ে বাস কেঁপে উঠলো । আনিস বুঝতে পারলো না কি হলো । তীব্র একটা ব্যাথ্যা তার চেতনাকে আচ্ছন্ন করে ফেললো । কিছু বুঝে উঠার আগেই তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসলো । তারপর সবকিছু অন্ধকার ।

আনিসের লাশ তার বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে । তার মা আর বোনের অপেক্ষার অবসান হয়েছে । আনিসের বাবা আনিস কে নিয়ে এসেছেন । কিন্তু আনিস এভাবে ফিরে আসুক এটা কি তারা চেয়েছিলো ? আনিস কে কবর দেয়া হয়েছে তার বাড়ির পাশে, পুকুরটার কাছে । যে পুকুরের পাড়ে আনিস ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতো । বেলা বাড়লে যখন ঝকঝকে রোদে চারদিক ঝলমল করে তখন আনিসের কবরের উপর বাঁশঝাড়টার ছায়া পড়ে । যে বাঁশঝাড়ে সে তার প্রিয় কলমটা হাড়িয়ে ফেলেছিলো ।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন